ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য ।

) আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য গুলো পর্যালোচনা করা

=কোন একটি যুগের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প সাহিত্য, প্রভৃতি আলোকে  যুগের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। যুগসন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে পুরানো যুগের বৈশিষ্ট্য বিলুপ্তি ঘটে এবং নতুন যুগের বৈশিষ্ট্য সমূহ বিকশিত হতে শুরু করে ।আর এ নতুন বৈশিষ্ট্যসমূহ মৌলিক পরিবর্তনের সূচক। ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য গুলো আলোচনা করা হলো :-

  1. ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশ।
  2.  জাতীয় রাষ্ট্র।
  3.  রেনেসাঁস বা নবজাগরণ।
  4. ভৌগলিক আবিষ্কার।
  5.  ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।
  6.  মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ।
  7.  পুঁজিবাদ ও বাণিজ্যবাদ ।

১)ব্যক্তিত্বের বিকাশ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশ:

ইউরোপের আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ বা  ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বিকাশ ।  আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশ । মধ্যযুগের সামন্তবাদী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে  ব্যক্তিত্বের কোন অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে । তখন সমাজ ও রাষ্টে তিন শ্রেণীর মানুষ বসবাস করত,ক) প্রথম শ্রেণীর যাজক সম্প্রদায় ,যারা ছিল ধর্ম কর্মের সর্বময়কর্তা খ)দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিজাত সম্প্রদায় ,যারা দেশ শাসনের সঙ্গে জড়িত থাকত এবং গ)তৃতীয় শ্রেণি ছিল বাকি জনগণ, যারা শুধু উৎপাদন করত কিন্তু ফল ভোগ করতে পারত না ।ফল ভোগ করত যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ ছিল সুবিধাবঞ্চিত তারা শুধু গাদায় ন্যায় পরিশ্রম করত। সামন্তপ্রথার কৃষকরা ছিল ভূমিদাস । রাজা ছিলেন দেশের সর্বমযকর্তা। রাজার অধীনে ছিল সামন্ত জমিদার শ্রেণী ।রাজাগণ নিজেদেরকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা পেরিত পুরুষ বলে অভিহিত করতো ।সুতরাং কোনো কাজের জন্য রাজাকে সমালোচনা করা মানেই ঈশ্বরকে সমালোচনা করা। আর ঈশ্বরকে সমালোচনা করা মানে মহাপাপ। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট অভাব নীরবে সহ্য করত, বা হিসেবে কপালে আছে বলে মেনে নিত। এছাড়াও সমাজের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষকে কঠিন নিয়ম-নীতি, আচার-আচরণ ,ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হতো ।ব্যক্তির ধর্মজীবন চিন্তাধারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো গির্জা তথা যাদব সম্প্রদায় দ্বারা। কিন্তু মানুষ তো আর জোর পদার্থ নয়। মধ্যযুগের শেষ দিকে মানুষের মধ্যে মানসিক বিকাশের একটা বিবর্তন চলতে থাকে। এ সময় পশ্চিম ইউরোপে বিশেষ করে ইতালিতে সমুদ্রতীরে নতুন নতুন শহর উঠতে থাকে ।শহরগুলোতে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এ সময় মানুষের মাঝে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নতুন এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জেগে উঠে।পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালি কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় রেনেসাঁর নবজাগরণ।ব্যক্তির মুক্তি ব্যক্তির প্রকাশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যুক্তিবাদমানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। এবং মানবতাবাদের মূল কথা মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয় মানুষকে অধিকার সচেতন ও যুক্তিবাদী করে তুলে। আর ব্যক্তির মুক্তি মূলত সম্ভব হয়েছিল আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং যুক্তিবাদ বিকাশ এর মধ্য দিয়ে।পূর্বে মানুষ যেখানে রাজা ও ধর্মযাজকদের নিকট নিজেদেরকে সমর্পণ করে দিত, সেখান থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে শুরু করে ।আর এভাবেই সৃষ্টি হতে থাকে ব্যক্তির মুক্তি, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, যা ইউরোপে আধুনিক যুগের বিকাশকে   ত্বরান্বিত করে থাকে ।

2)জাতীয় রাষ্ট্র:

ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের দ্বিতীয় হল জাতীয় রাষ্ট্র। মধ্যযুগের ইউরোপে জাতিয় রাষ্ট্রের কোনো ধারণা ছিল না। রাষ্ট্রের ধারণা বলতে যা কিছু তা হলো পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ।এই সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে ছিল বহুতলবিশিষ্ট সামন্তবাদী আর্থসামাজিক কাঠামোর উপর। ইউরোপীয় ভিন্ন ভিন্ন জাতি যেমন:- ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান ,কোন জাতি ছিল না। ছিল খ্রিস্টান সাম্রাজ্য ।ধর্মই ছিল একমাত্র আদর্শ ঐক্য ।ধর্মের ক্ষেত্রে পোপ এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে রোমান সম্রাট ছিল সর্বসেরা ।তবে ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মের বিষয়াবলী ও আইন ব্যাখ্যা করতেন পোপ ও যাজকগান ।রোমান সম্রাট, সামন্ত প্রভু, এবং আঞ্চলিক রাজাগণ এ আইন প্রয়োগ করতেন ।মধ্যযুগের শেষ দিকে এসে ধর্ম ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে পোপ ও সম্রাটদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে সাম্রাজ্যের উপর উভয়েই কৃতিত্ব দাবি করেন। একদিকে সামন্ত অর্থনীতির অবক্ষয় অন্যদিকে ক্ষমতায় দ্বন্দ্বে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে । এ পরিস্থিতিতে পঞ্চদশ ষোড়শ শতাব্দীতে থেকে ইউরোপের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজা ও জমিদারগণ অনেকটা স্বাধীন হয়ে পড়েন ।স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ রাজার পক্ষে অবস্থান নেন ।কারণ তারা দীর্ঘকাল ও রোমান সাম্রাজ্যের দুর্নীতি নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন ।আবার ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের আর্বিভাব এর ফলে খ্রিস্টান জগৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে ।এই অবস্থা পোপের ক্ষমতা লোপ পায়। এমতাবস্থায় জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকে। জাতীয় রাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে। আধুনিক জাতীয়তাবাদ আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের বিকাশের গতিকে ত্বরান্বিত করে। 

৩)রেনেসাঁস বা নবজাগরণ :

=ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের ভিত্তি প্রস্তর হল রেনেসাঁস বা নবজাগরণ।রেনেসাঁস একটি ফরাসি শব্দ যার অর্থ হলো পুনঃ জন্ম। পুনজন্মের কথা শুনলে কয়েকটি প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। যেমন:-  পুনজন্মের মানে দ্বিতীয় জন্ম।   পুনর্জন্ম হল জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা চিন্তা চেতনা, তথা মানসিকতার। এটা ছিল প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় ।৪৭৬  সালে বর্বর জার্মান জাতির হাতে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ।দীর্ঘ প্রায় একহাজার বছর পরে পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে তা আবার জেগে উঠে। তাই রেনেসাঁস বলতে প্রাচীন গ্রিক ,ও রোমান যুগের শিল্প সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর, যুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞান ,ইতিহাস ইত্যাদি জানার আগ্রহ এবং সবকিছু জেনে যুক্তিতর্কের দ্বারা বুঝে যা কিছু সত্য সুন্দর,যুক্তিতর্কের মাধ্যমে   গ্রহণ করা এবং অসত্য অযৌক্তিকতা কে বর্জন করা বোঝা ।১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতন ঘটলে, সেখানকার শিল্পী-সাহিত্যিক পণ্ডিতগণ ,ইউরোপে পাড়ি জমায় তথা ইতালিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা শুরু করেন। তারা নতুন করে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত করেন ।ইতালিতে প্রথম রেনেসাঁ সূত্রপাত ঘটে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে ।

ইউরোপীয় রেনেসাঁর নবজাগরণের মূল আদর্শ ছিল বন্দিদশা থেকে মানুষকে মুক্তি মানবতাবাদ যুক্তিবাদ বলিষ্ঠ সমালোচনা এবং ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।অথচ  মধ্যযুগের ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের কারণে এ জ্ঞান-বিজ্ঞান ঢাকা পড়ে যায় ।স্তব্ধ হয়ে যা প্রগতি যুক্তিবাদ, ও মানবতাবাদ। পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয় ।সামন্ত নির্ভর আর্থ সামাজিক কাঠামো আইন ,শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে ।জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জেগে উঠে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের আধুনিক যুগের উত্থান ও বিকাশ ত্বরান্বিত করে।

)ভৌগলিক আবিষ্কার :

=ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের অন্যতম দিক হচ্ছে ভৌগলিক আবিষ্কার। মধ্যযুগের সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে পৃথিবীর ভুমধ্যসাগরকেন্দ্রিক এবং এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, নিয়ে পৃথিবী গঠিত । কিন্তু পনেরো শতকে এর ধারণা পরিবর্তন হয় । বিভিন্ন দেশের সাথে জলপথ, আবিষ্কারের মানুষ বেরিয়ে পড়ে । নতুন নতুন জলপথ দেশ ও মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলে। এ আবিষ্কারের পেছনে দুটি কারণ ছিল ক) রেনেসাঁসের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অজানাকে জানার জন্য আপনাকে চেনার জন্য এবং অদেখাকে দেখার জন্য মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় খ)১৪ শতক থেকে অটোম্যান তুর্কি শক্তি অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগুতে থাকে ।১৪৫৯ সালে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ এর হাতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতন ঘটে। এছাড়াও 1১৪৫৯  সালে সার্বিয়া,১৪৭০ সালে  আলবেনিয়া, ১৪৮০ সালে ইতালির ওরান্টো শহর তুর্কিদের দখলে চলে যায় ।এতে পাচ্য দেশ গুলোর সাথে  ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালনা করা ইউরোপের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইউরোপীয় পাচ্যদেশের মসলার চাহিদা মানুষকে উৎসাহী করে তোলে। কিন্তু দুঃসাহসী পূর্তগীজ স্পেনীয় নাবিক উত্তাল আটলান্টিক সাগর পাড়ি দেওয়া শুরু করে ।ইউরোপের ভৌগোলিক আবিষ্কারের পথপ্রদর্শক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পর্তুগালের যুবরাজ নাবিক ইনফান্ট হেরনি। তার প্রচেষ্টার ণাবিকগন পাচ্যদেশের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সমুদ্রপোত আবিষ্কারের সচেষ্ট হন। এরই ধারাবাহিকতা ১৪৮৭ সালে পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলুমিউ দিয়াজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত পোছেন।

স্পেনের রানী ইসাবেলার পৃষ্ঠপোষকতায় ইতালির নাবিক কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেন ।১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন ।১৫১৩ সালে ব্যালবোয়া নামক একজন স্পেনীয় নাবিক প্রশান্ত মহাসাগর আবিষ্কার করেন ।১৫১৯ সালে আরেকজন স্পেনীয় নাবিক ম্যাগেনাল ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ পোছেন এবং সর্বপ্রথম জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন।তাদের আবিষ্কার শীঘ্রই ইউরোপকে বিশ্বের প্রভু বানাবার রাস্তা তৈরি করে দেয়। ফলে ইউরোপীয়রা বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে ।সে সঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষা, দর্শন, এবং খ্রিস্টধর্ম ,রপ্তানি করতে থাকে, যা আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য বহন করে ।

৫)মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ:

ইউরোপের আধুনিক যুগের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ । মধ্যযুগে ইউরোপে তিন শ্রেণীর মানুষ ছিল যথা:-ক) যাজক সম্প্রদায় খ)অভিজাত শ্রেণী গ) তৃতীয় শ্রেণি 

) যাজক সম্প্রদায়:যারা ছিল ধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নেতা এবং পরিচালক। সমাজ ও রাষ্ট্রের এদের প্রভাব ছিল অপরিসীম ।

) অভিজাত শ্রেণী: যারা ছিল সামন্তবাদ বা জমিদার শ্রেণি। এরা ছিল ভূ-স্বামী বা জমির মালিক এবং শাসক ।

) তৃতীয় শ্রেণি :প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং যাজক অভিজাত ব্যতীত সকলে ছিল তৃতীয় শ্রেণি ।এরা ছিল পরিশ্রমী উৎপাদনকারী কিন্তু এরা কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারতোনা ,সকল সুবিধা ভোগ করত যাজক অভিজাত শ্রেনীর লোকেরা। মধ্যযুগের শেষে এবং আধুনিক যুগের শুরুর দিকে তৃতীয় শ্রেণি থেকে বের হয়ে আসতে থাকে ব্যবসায়ী ,ডাক্তার ,প্রকৌশলী ,আইনজীবী ,সাংবাদিক ,শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, কারিগরি ইত্যাদি ।এরা জমিদারের মত ধনীর নয়, আবার কৃষকের মতো দরিদ্র নয় ।সমাজের উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মাঝামাঝিতে এদের স্থান ।তাই এর নামকরণ করা হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যে কোন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা শহরে বাস করত, শহর সৃষ্টি করত, বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আধুনিক পুঁজিবাদের জন্ম তারাই দেয়। আবার অভিজাত্যের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় শাসন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে অপসারণ করে তদস্থলে মধ্যবিত্তের নিযুক্ত হতে থাকে ।পরবর্তীতে রাজশক্তি সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব হয় ।মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে প্রজাতন্ত্র কায়েম করে ।কোন দেশের প্রগতি উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে   মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইউরোপের আধুনিকযুকে করেছে গতিশীল ও প্রাণবন্ত। 

৬)ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও ধর্মনিরপেক্ষতা :

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ইউরোপের আধুনিক যুগের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। মধ্যযুগের ইউরোপের গির্জাগুলো, এবং যাজক সম্প্রদায় দুর্নীতি ও অনাচার, অবিচার ইন্দ্রিয়পরায়ণ ইত্যাদিতে ছিল ভরপুর । যাজকরা একসময় ইনডালজেন্স নামে এক ধরনের মুক্তিপণ বা বেহেশতের সনদ বিক্রি করতে থাকে। রেনেসাঁসের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে  মানুষ একসময় যাজকদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে এবং প্রতিবাদ করতে থাকে। এ প্রতিবাদকারীদের অন্যতম হলেন মার্টিন লুথার, কেলভিন,জুই লিংক, প্রমুখ। ১৫১৭ সালে একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মার্টিন লুথার প্রচলিত ধর্মের উপর আস্থা হারিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করছেন ।এ সময় পপ দর্শনীয় এবং জার্মানির আদালতে মেরামতের জন্য অর্থ তোলার উদ্দেশ্যে ইনডালজেন্স বিক্রি শুরু করেন ।টেটজেল নামক এক যাজক এ  অনুমতি পত্র উত্তর জার্মানিতে বিক্রি শুরু করেন। মানুষকে এমন ধারণা দিয়েছিলেন যে ইনডালজেন্স ক্রয় করলে পাপের জন্য অনুশোচনা ব্যতীত কোন ব্যক্তির নিজের তার মৃত আত্মীয় স্বর্গে যেতে পারবে। টেটজেলের এই ধরনের প্রচারণা লুথারের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না ।১৫১৭ সালের৩১, অক্টোবর জার্মানির উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা তিনি ইনডালজেন্স বিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ৯৫ দফা দাবি সম্বলিত একটি প্রতিবাদপত্র পেরেক দিয়ে আটকে দেন ।১৫২০  সালে “Babylian Captivity”নামক পুস্তক রচনা করে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং পোপোকে  ধর্মগুরুর পদাধিকার অস্বীকার করেন ।এভাবে লুথার সূচনা করেন প্রতিবাদী খ্রিস্টধর্ম প্রোটেস্টানিজমের।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে খ্রিস্টান ধর্মের শাসন-শোষণ অত্যাচার থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে একটি নতুন জীবন লাভ করে।  

৭) পুঁজিবাদ:

ইউরোপের ইতিহাসে আধুনিক যুগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল পুঁজিবাদের বিকাশ । মধ্যযুগের শেষ দিকে সামন্তবাদী আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙে যেতে শুরু করে গড়ে উঠে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। বিকশিত হতে থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর।মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা সমাজ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে ।নতুন নতুন শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প কলকারখানা গড়ে তুলে ।শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য দুর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থ বা পুজির। পুজির সহযোগিতার জন্য ব্যাংক-বীমা জয়েন্ট স্টক কম্পানি বা শেয়ারবাজার প্রভৃতির বিকাশ ঘটে ।ব্যাংকের অস্তিত্ব মধ্যযুগের থাকলেও গির্জার সুদকে ঘৃণা করা এ ব্যাপারটা মূলত ইহুদীদের হাতে ছিল ।কিন্তু মধ্যযুগের শেষ দিকে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের ফলে খ্রিস্টানদের মধ্যে ব্যাংক ব্যবসা চালু হয়।  যার ফলে ইউরোপ এশিয়া আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের উপনিবেশ স্থাপন করে ।এতে এসব দেশ থেকে কাঁচামাল ইউরোপে প্রবেশ করে, আবার শিল্পজাত পণ্য এসব দেশে বিক্রি করা হয়। এর ফলে হতে থাকে পুঁজিবাদী শ্রেণি বিকশিত হতে থাকে এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির পুঁজিবাদী অর্থনীতির আধুনিক যুগের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে ।

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

60 + = 67