ইউরোপের ইতিহাসে রেনেসাঁর সৃষ্টিতে মানবতাবাদী লেখকদের অবদান আলোচনা করো ।

ক) মানবতা পন্ডিতদের অবদান

ইউরোপের রেনেসাঁ সৃষ্টিতে মানবতাবাদী লেখকদের অবদান অকল্পনীয়। জ্ঞানের সাধক এসকল পণ্ডিতেরা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য মানুষকে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন ।অতীত যুগের ইতিহাস, সাহিত্য বিজ্ঞান শিল্পকলা দর্শন প্রভৃতি অর্জিত জ্ঞান সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করায় ছিল তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্প ও সাহিত্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ।এগুলোর বিষয়বস্তু ছিল মানুষ ও প্রকৃতি ।মানবতাবাদি  ওই রূপ ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান বৃদ্ধির চেষ্টা করতেন বলেই তাদেরকে এ নামে অভিহিত করা হতো।তাদের প্রধান কাজ ছিল প্রাচীন পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা অনুবাদ করা প্রতিলিপি প্রদত্ত করা এবং প্রচার করা।মানবতাবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পেত্রার্ক ও বোককাচো ।

১)ফ্রান্সিস পেত্রার্ক(১৩০৪-১৩৭৮):

ইতালির মানবতাবাদি পণ্ডিতদের মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন ফ্রান্সিস পেত্রার্ক। তিনি অনেক পরিশ্রম করে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান যুগের প্রায় দুইশত পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। তাঁর সংগ্রহীত ল্যাটিন পান্ডুলিপির মধ্যে সিসেরাল পত্রাবলী ,এবং গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ১৬ খানা গ্রন্থ এবং হোমারের একটি মহাকাব্য উল্লেখযোগ্য ।এসব আবিস্কার তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত এবং আকৃষ্ট করে ।এসব তরুণ সমাজকে প্রচলিত বিদ্যার ত্যাগ করে পেত্রার্ককের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ।ফলে বহু অভিভাবক তাকে যুবকদের সর্বনাশকারী বলে মনে করতেন। তার প্রভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এক প্রবল যুক্তিবাদের দ্বারা সৃষ্টি হয়।ফ্রান্সিস পেত্রার্ক   এর বড় কৃতিত্ব হল তিনি তরুণদের মনে নতুন নতুন জিজ্ঞাসা অনুসন্ধিতসা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি সনেট নামক ১৪ লাইনের কবিতার জনক ।তার অনুসন্ধিসা আজ ও মানুষকে জ্ঞান অর্জনের দিকে ধাবিত করে।ফ্রান্সিস পেত্রার্ককে রেনেসাঁস যুগের মানবতাবাদ এর জনক বলা হয় ।

২)বোককাচো(১৩১৩-১৩৭৫) :

ইতালির আরেকজন নামকরা মানবতাবাদি পন্ডিত হচ্ছেন গিওভান্নি বোককাচো ।তিনি ছিলেন পেত্রার্ককের  শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ।তিনি ইতালির গদ্য সাহিত্যের জনক ।তাঁর লিখিত ডেকামেরন গ্রন্থ ইতালির গদ্য সাহিত্যের পথপ্রদর্শক ভূমিকা পালন করছে ।তিনি পেত্রার্ককের প্রাচীন সাহিত্য ও শিল্প প্রীতির আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন।তিনি গ্রিক ভাষা শিক্ষা লাভ করেন ,এবং মহাকবি হোমার এর দুটি মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসি ল্যাটিন ভাষা অনুবাদ করেন ।বোককাচোরএকটি কৃতিত্ব হল গ্রিকো-রোমান যুগের প্রাচীন পান্ডুলিপি সংগ্রহ এবং এগুলোর কপি প্রস্তুত করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা ।তার লেখনী ও চিন্তাধারা ইতালির তরুণদের গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল।

৩)মেনুয়েল ক্লাইসোলোরাস:

তিনি ছিলেন গ্রিক পন্ডিত।১৩৯৬ সালে তিনি কনস্টান্টিরনোপল হতে ইতালিতে আসেন এবং ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন । তার উৎসাহ যেখানে গ্রিক ভাষা সৃষ্টি হয়।গ্রিক ভাষা শিক্ষার ফলে  প্রাচীন গ্রীক শিল্প ,সাহিত্য, দর্শন ,বিজ্ঞান ইতিহাস জানার আগ্রহ বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এটাও রেনেসাঁ সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে দেয় । 

৪) দান্তে(১২৬৫-১৩২১):

আধুনিক ইতালির ভাষা ও সাহিত্যের জনক হলেন  দান্তে।Divine Comedy হলো তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ।তার গন্থে ইতালির কথ্য ভাষাকে সাহিত্য রচনা ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন ।তার লেখনী ও চিন্তাধারা ইতালির রেনেসাঁ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে । তার অপর বিখ্যাত গ্রন্থটি হল La Vita Nuova(Th New Life) ।

৫)ক্যাস্টিগোলিয়ন :(১৪৭৮-১৫২৯):

ইতালি লেখক ।তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম”(The Courtier)” এটি ছিল সামাজিক শিষ্টাচার সম্পর্কিত গ্রন্থ ।এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি মানুষকে বুঝাতে চেয়েছিলাম মানুষকে প্রতিবাদী হওয়ার এবং সবকিছুকে নিজেদের অধিকারে আয়ত্ত করার আকাঙ্ক্ষা ।

খ) মানবতাবাদী শিল্পীদের অবদান :

পনেরো শতকের মানবতাবাদী শিল্পীরা রেনেসাঁ সৃষ্টি এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।মধ্যযুগের শিল্পকলা বিষয়বস্তু ছিল ঈশ্বর ও যীশু।আর মানবতাবাদী শিল্পীদের শিল্পকলা বিষয়বস্তু ছিল মানুষ ও প্রকৃতি। পৃথিবীতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ,আনন্দ ,বেদনা ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে এ সকল শিল্পীরা শিল্পী বিপ্লব সাধন করে।

 শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হলেন :

১)লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯):

তিনি ছিলেন একাধারে একজন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, কবি, সঙ্গীত, বৈজ্ঞানিক।তিনি ছিলেন রেনেসাঁসের প্রতীকস্বরূপ। শিল্পকলার দুটি শাখা ভাস্কর্য ও চিত্রকলা তিনি অবাধে বিচরণ করেছেন। তার মোনালিসা ও ইতালির মিলান গির্জার দেওয়ালে অঙ্কিত শেষ ছবি দুটি বিশ্বের চিত্রশিল্পীদের কাছে বিষয়বস্তু ।

২)অন্যান্য শিল্পী :

অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীরা হলেন রাফায়েল(১৪৮৩-১৫২০),মাইকেল অ্যাঞ্জেলা(১৪৭৫-১৫৬৪)এবং টিশিয়ান(১৪৭৭-১৫৭৫)।রাফায়েলের কুমারী চিত্র এবং মাইকেলে অ্যাঞ্জেলার রুমের সিস্টাইন অঙ্কিত শেষ বিচারসারা বিশ্বের চিত্র ভান্ডারের অমূল্য সম্পদ ।তাদের কর্ম ,চিন্তা, ও দর্শন আধুনিক শিল্পকলার ভিত্তি তৈরি করে, এবং সেইসাথে ইউরোপের রেনেসাঁ সৃষ্টিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে ।

গ)বিজ্ঞানীদের অবদান:

এ সময় কয়েকজন নামকরা বৈজ্ঞানিক আর্বিভাব ঘটে ।যারা ইউরোপের রেনেসাঁসের গতিকে ত্বরান্বিত করে ।তাদের নাম নিচে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো :-

১)কোপার্নিকাস(১৪৭৩-১৫৪৩):

পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে এ সত্য  আবিষ্কার করেন ।প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিদগন ও এরূপ ধারণা ছিল। কিন্তু মধ্যযুগের জ্যোতির্বিদগন মনে করতেন যে পৃথিবী কে কেন্দ্র করে সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ঘুরছে। কোপার্নিকাস এই ভুল ধারণা থেকে সঠিক ধারণা সবার কাছে তুলে ধরেন ।

২)স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭):

ইংরেজি বৈজ্ঞানিক তার বিখ্যাত মধ্যাকর্ষণ তথ্য আবিষ্কার করেন ।তাতে তিনি দেখান যে প্রত্যেক বস্তু একে অপরকে কাছে টানে আকর্ষণ করে। এছাড়াও ছিল জার্মানির কেপলার, ডেনমার্কের টাইকোব্রাহে ইংল্যান্ডের গিলবার্ট,লর্ড ভেরোলাম ইত্যাদি এদের আবিষ্কার  চলতি চিন্তাকে আঘাত করে । নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বীজ রোপন করে। এজন্য এদেরকে রেনেসাঁস যুগের বৈজ্ঞানিক বলা হয় ।

গ) কনস্টান্টিনোপলের পতন (১৪৫৩):

পঞ্চদশ শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁসের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতন।১৪৫৩ সালে ওসমানীয় তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহম্মদেরএ শহরটি দখল করলে এখানকার পণ্ডিতরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইতালিতে পাড়ি জমায়। সঙ্গে তারা নিয়ে আসে গ্রিক সাহিত্যের মূল্যবান পান্ডুলিপি ।এসকল পণ্ডিতেরা  বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচীন গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক ও বাহক ছিলেন। তাদের ইতালিতে আগমনের ফলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান যুগের শিল্প সাহিত্য দর্শন ইতিহাস গণিত বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা জ্বলে ওঠে ।সৃষ্টি হয় চিন্তাজগতের মহা আলোড়ন যার পরিণাম শুরু হয় রেনেসাঁস বা নবজাগরণের ।

ঘ) মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কারের :

ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আরেকটি কারণ ছিল মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার।জার্মান নাগরিক জন গুটেনবার্গ(১৪০০-১৪৬৮) ১৪৫০ সালের দিকে আধুনিক টাইপ (সিসার) অক্ষর আবিষ্কার করেন ।গুটেনবার্গর মুদ্রণ যন্ত্র দ্বারা 1(১৪৫৪-১৪৫৬) সালে সর্বপ্রথম ল্যাটিন ভাষা বাইবেল ছাপানো হয়।এর পূর্বে বই-পুস্তক, ধর্মগ্রন্থ, হাতে লেখা হতো এবং বহুকষ্টে সেগুলো প্রতিলিপি প্রস্তুত করা হতো। জনসাধারণের মাঝে বাইবেল বা পুস্তক এর প্রচলন ছিল না বললেই চলে। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে বাইবেল ও অন্যান্য বই-পুস্তক সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এতে জনসাধারণের মাঝে সাড়া পড়ে যায়, এবং রেনেসাঁস সৃষ্টিতে  যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়।

ঙ) প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও সংরক্ষণ:

প্রাচীন পান্ডুলিপি আবিষ্কার উদ্ধার ও সংরক্ষণ করার সহজ কাজ ছিল না। এ কাজটি ছিল অতি পরিশ্রমসাধ্য এবং ব্যয়বহুল সাপেক্ষ ।যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কাজটা সফল হয়েছিল তারা হলেন পঞ্চম নিকোলাস(১৪৪৭-১৪৫৫), দ্বিতীয় জুলিয়াস(১৫০৩-১৫১৩), পোপ দশম লিও(১ ৫১৩-১৫২১),কসিমো মেডিসিন  এবং লরেঞ্জা ডি -মেডিসিন ।তাদের প্রচেষ্টা ও আর্থিক সাহায্যে রুমে বেশ কয়েকটি লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার নির্মিত হয়। সেখানে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য মূল্যবান প্রাচীন সাহিত্য নির্দেশক হিসেবে রাখা হতো। সেসব স্থানে বিনা বাধা সাহিত্যচর্চা, ও সাহিত্য বিষয়ে গবেষণা করতে পারত। জ্ঞান অর্জন করার কেন্দ্রে পরিণত হয় ,এবং তাতে রেনেসাঁসের গতিবেগ  হয়েছিল।

 পরিশেষে বলা যায় যে উপযুক্ত কারণ পনেরো শতকে ইউরোপে রেনেসাঁ বৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 × 1 =