রেনেসাঁসের ফলাফল আলোচনা করা ?

অথবা  রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা ?

রেনেসাঁস এর ফলাফল বা রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য :

রেনেসাঁসের ভাবধারা সমগ্র ইউরোপে প্লাবনে ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। প্লাবনের ন্যায়েই এটি পুরাতন ও জরাজীর্ণ সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে এক নতুন চেতনার সৃষ্টি করে। এ চেতনা বা জাগরন মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি ধর্মীয় জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার শক্তি যোগায়।   রেনেসাঁস বা নবজাগরণের কেবলমাত্র শিল্প-সাহিত্য অনুরাগে সীমাবদ্ধ ছিল না এর ফলাফল ছিল সুদুরপ্রসারী ।নিম্নে তা আলোচনা করা হল :-

১)মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণ:

রেনেসাঁস মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণ ঘটায় । উত্তোলনের মধ্য দিয়ে একদিকে মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্য সমূহ পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্যদিকে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য জাগ্রত হয়ে উঠে। মধ্যযুগের সামাজিকতা কুপ্রবনতা, রক্ষণশীলতা স্বেরমানসিকতা ইত্যাদির যা মধ্যযুগকে স্থবির করে রেখেছিল রেনেসাঁস দূরীভূত করে দেয় ।মানুষের বিবেক বুদ্ধি জাগ্রত হয় যুক্তি ,জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, মুক্ত চিন্তা, উদারতা ,তথা মানুষ গতিশীল দ্বারা প্রভাবিত হয় ।পুরনো সংস্কার চিহ্ন হয়ে যায়, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান যুক্তিবাদ, চিন্তা ,চেতনার আলোকে জীবন হয়ে ওঠে গতিময় ।

২)গোঁড়ামিপূর্ণ চিন্তা থেকে যুক্তিবাদের উত্তরণ:

রেনেসাঁর নবজাগরণের মূলমন্ত্রটি ছিল যুক্তিবাদ ।কুসংস্কারচ্ছন্নতা অন্ধত্ব আর গোড়ামি ছিল মধ্যযুগীয় চিন্তা চেতনার মূল বৈশিষ্ট্য ।রেনেসাঁর নবজাগরণের যা চিন্তা-চেতনাকে প্রচলিত গোঁড়ামিপূর্ণ অবস্থান থেকে যুক্তিবাদী উত্তরণ ঘটায়। যুক্তিবাদের মূলকথা যে কোন বিষয়কে প্রশ্নের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করা ,এবং বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধান পরিচালনা করা । এ অনুসন্ধিতসা ও যুক্তিবাদ মানুষকে চিন্তা-চেতনা ও মনোলোকে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করার মাধ্যমে আধুনিক অগ্রসর চিন্তাশীল ব্যক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যুক্তিবাদ মানে কোন কিছু ভালোভাবে জেনে তা যুক্তি তর্কের দ্বারা বুঝে যা কিছু ভাল তা গ্রহন করা ,আর এটাই ছিল রেনেসাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

৩) ধর্মান্ধতা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতায় উত্তরণ:

মধ্যযুগের ধর্ম বিষয়ে কোন স্বাধীনতা ব্যক্তিগত মতামত পোষণ করা সম্ভব ছিল না ।মানুষের মন ও চেতনা আবর্তিত হতো ধর্ম ও বাইবেলকে ঘিরে। বাইবেলে নেই এমন কিছু সমাজে গৃহীত হতো না ।  আর ধর্মের সর্বময় কর্তা ছিলেন পোপ এবং তাঁর অধীনস্থ গুরুগণ । তাদের কঠোর অনুশাসন ও অত্যাচারকে মানুষ নিয়তি বলে মেনে নিত। সাধারণের মধ্যে যাজকের অনুভূতি ছারা ঈশ্বরের রাজ্য পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু রেনেসাঁস ধর্মের যুক্তিবাদিতা ,উদারতা, নির্ভীকতা ,পরম সহিংসতার বিশ্বাসী এবংধর্ম বিষয়ে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ এনে দেয় ।ধর্মীয় স্বাধীনতার সুযোগ এর মাধ্যমেই পরধর্ম সহিংসতার সৃষ্টি হয় ।যাজকের অনুগ্রহ ছাড়াও ঈশ্বরের রাজ্যে পৌঁছানো সম্ভব এটি সকলের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে ।সমাজ থেকে ধর্মান্ধতা বিতাড়িত হতে থাকে এবং সৃষ্টি হওয়ার ধর্মনিরপেক্ষতার ।

৪)ভূমিদাস থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্তরণ :

মধ্যযুগের সামন্তবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তিনটি শ্রেণি ছিল। যথা :ক)যাজক শ্রেণী খ)অভিজাত শ্রেণী গ)ভুমিদাস শ্রেণী বা সার্ফ।রোমান সমাজে ভূমি দাসরা ছিল উৎপাদনকারী কিন্তু সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত শ্রেণি। এদের কোনো অধিকার বা সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না । কিন্তু রেনেসাঁস সমাজ ব্যবস্থা শ্রেণি ব্যবধান বিতাড়িত করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্তরন ঘটায়। সমাজের চাকরিজীবী ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ সামন্ত অর্থনীতির নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিতরাই ওই সময়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই শ্রেণী  ছিল শিক্ষা চিন্তা ও মননের সমাজের অগ্রণী অংশ । তারাই জাতীয় রাষ্ট্রের সমর্থক, ধারক ও বাহক ।

৫)ইউরোপীয় সাম্রাজ্য থেকে জাতীয় রাষ্ট্রের উত্তরণ:

মধ্যযুগে ইউরোপে রাষ্ট্র বলতে ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য। রাজতন্ত্র ওপোপতন্ত্র এ দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য।রেনেসাঁসের পটভূমিতে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে যেতে শুরু করে।সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে ।বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক রাজা ও জমিদারগণ শক্তিশালী ও স্বাধীন হয়ে উঠতে শুরু করে। পোপকে কর দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এভাবে ইউরোপের ইতিহাসে সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন এবং আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের চিন্তাধারা অগ্রসর হয় এবং তা প্রতিষ্ঠিত হয় ।

৬)সামন্তবাদ থেকে বাণিজ্য বাদে উত্তরণ :

মধ্যযুগের ইউরোপের অর্থনীতি এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থা   পুরাপুরি সামন্তবাদী অর্থনীতিকেন্দ্রিক ।এ ব্যবস্থায় সকলের উপরে ছিল রাজ,। রাজার ‍অধ:স্তন ছিল জমিদার শ্রেণী।সবার নিচে ছিল ভূমিদাস শ্রেনি।  এরা উৎপাদন করত কিন্তু ভোগ করতে পারতোনা ,ভোগ করত যাজক ও অভিজাত শ্রেণী। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় সামন্তবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে আর সে শূন্যস্থান পূরণ করে বনিকবাদ।বনিক শ্রেণী স্বাধীনভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করতো বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ফ্লোরেন্স ,ভেনিস, মিলন, জেনোয়া প্রভৃতি অঞ্চলের। বণিকরা এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ইতালি কে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন বাণিজ্যিক অর্থনীতির জন্ম দেয়। বাণিজ্যের প্রয়োজনে উন্মেষ ঘটতে থাকে ছোট ছোট কারখানা। শুরু হয় প্রাথমিক পুজি সঞ্জানের যুগ। তারপরে হয় শিল্প যুগ ।এভাবে রেনেসাঁসের ফলে ইউরোপের সামন্তবাদের স্থলে বাণিজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে ।

৭) রাষ্ট্রের আদর্শ পরিবর্তন :

মধ্যযুগের রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল যে, ঈশ্বর মানুষের উপর রাজত্ব করার জন্য রাজা বা সম্রাট নিযুক্ত করেছেন । রাজার জন্য রাষ্ট্র, রাজার জন্য জনগণ। জনগণের জন্য রাজা বা রাষ্ট্র নয়।কিন্তু রেনেসাঁসের ফলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার জ্ঞান মানুষকে মধ্যযুগের আদর্শিক আদর্শ তে উদ্বুদ্ধ করে। জনগণের জন্য রাজা, রাজার জন্য জনগণ নয় । জনগণের কল্যাণ সাধন করাই রাজার একমাত্র কাজ। রাজা হলো জনগণের সেবক মাত্র। তিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি ও না। আর এ ধারণা থেকেই আধুনিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় ।

৮)প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপলব্ধি :

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপলব্ধির তো দূরের কথা তার চিন্তা করাও ছিল ধর্মবিরুদ্ধ এবং মহাপাপ । রেনেসাঁসের ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপলব্ধি করার এবং যা কিছু ভাল তা গ্রহন করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি হল। সাহিত্য বিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনুভূতির প্রকাশ দেখতে পাওয়া গেল ।এর ফলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ,চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির উন্নতি ঘটতে লাগলো ।

৯) জ্ঞান ভান্ডার সাধারণের নিকট উম্মুক্ত:

একমাত্র স্বীকৃত ও অভিজাতদের ভাষা বলে বিবেচিত হতো । সাধারণ লোকে তা চর্চাও করতে পারত না। কিন্তু রেনেসাঁস এর ফলে সকল ভাষা, সকল জ্ঞান ,সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল ।

১০)ধর্ম সংস্কার আন্দোলন: 

নবজাগরণের ফলে মানুষ যুক্তিক সমালোচনার অধিকার পেল। সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গীতে মানুষ সব কিছুর বিচার বিবেচনা করতে লাগলো। ধর্মাধিষ্ঠানও তা  থেকে বাদ যায়নি। যাজক সম্প্রদায় ও ধর্মাধিষ্ঠানের সকল অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ শুধু সমালোচনা করে নি ,আন্দোলনে করেছিল। যা ইউরোপের ইতিহাসে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত ।

উপযুক্ত সমালোচনা থেকে একথা বলা যায় যে, রেনেসাঁস বা নবজাগরণের ফলে ইউরোপে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, এবং চিন্তাজগতে প্রগতিশীল ও কল্যাণ মূলক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।এ ক কথা বলা যায় যে, রেনেসাঁস মধ্যযুগের অবসান ঘটে আধুনিক যুগের সূচনা করে ।

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 7 =