কার্ডিনাল রিশল্যু (১৬২৪-১৬৪২)

Cardinal Richeliew ( 1624-1642) 

কার্ডিনাল রিশল্যু  : ( Cardinal Richeliew )

কার্ডিনাল রিশল্যু ছিলেন ফ্রান্সের মহাপ্রতাপশালী  ও চরম ক্ষমতা ধর রাজশক্তির অধিকারী । ১৬২৪থেকে ১৬৪২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ফ্রান্সের প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ও হর্তাকর্তা । তিনি ছিলেন রাজা ত্রয়োদশ লুইয়ের প্রধানমন্ত্রী । কিন্তু রাজা ছিল নামে মাত্র রাজা । সকল প্রশাসনিক কার্যক্রমকার্ডিনাল রিশল্যু কর্তৃক পরিচালিত হতো । তার প্রচেষ্টার ফ্রান্সে একচ্ছত্র রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। 

কার্ডিনাল রিশল্যু উত্থান: 

কার্ডিনাল রিশল্যু ১৫৮৫ সালে ফ্রান্সের এক সাধারন অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । ধর্মযাজক রূপে তিনি জীবন শুরু করেন।  মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি লুকোন নামক একটি জেলায় চার্চের বিশপ নিযুক্ত হন।  এই লুকোন এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৬১৪ সালে স্টেট জেনারেল( States General ) এর সভায় প্রতিনিধিত্ব করেন । এই সভাতে   রিশল্যু তার অসাধারণ প্রতিবার দ্বারা রানী মেরি-ডি-মেডিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । রানী মেরি তাকে রাজকীয় কাউন্সিলরের একটি পদ দান করেন এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল পদে নিযুক্ত করেন । রাজকীয় কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি ক্রমে ক্রমে ফ্রান্সের সকল ক্ষমতার শীর্ষে নিজেকে স্থাপন করতে সক্ষম হন । তিনি অর্থাদি কুশলতা ও দ্রুততার সাথে ফ্রান্সের সমস্যাবলীর সমাধান করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তিনি প্রথমে রানী মেরি ও পরে তার পুত্র ত্রয়োদশ লুইয়ের মন জয় করার কাজে অগ্রসর হন । এক পর্যায়ে রাজা ত্রয়োদশ লুই রাজ মাতা মেরিকে অবসরে যেতে বাধ্য করেন এবং  রিশল্যু কে বরখাস্ত করেন । কিন্তু   রিশল্যু নিজেকে এমন অপরিহার্য করে তুলেছিলেন যে তাকে ছাড়া রাজকার্য অচল হয়ে যাচ্ছিল । ফলে রাজা তাকে পছন্দ না করলেও তাকে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হন । ১৬২৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন । ১৬২৪ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক । 

  রিশল্যু উদ্দেশ্য :

কার্ডিনাল রিশল্যু উদ্দেশ্য ছিল দুইটি যথা : 

১) অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের রাজশক্তিকে সর্বময় করে গড়ে তোলা এবং 

২) বিদেশনীতিতে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সের একাআধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা । 

এ দুটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে তিনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সেগুলো কে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় : 

ক) অভ্যন্তরীণ নীতি ( Internal Policy ) এবং 

খ) বৈদেশিক নীতি ( Foreign Policy ) 

অভ্যন্তরীণ নীতি : ( Internal Policy )

হুগেনোদের দমন: ফ্রান্সের প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম মতের অনুসারীদের বলা হয় হুগেনো । এরা ছিল প্রভাবশালী। তারা রাষ্ট্রের ভেতর একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিল। রাজা চতুর্থ হেনরি নিকট থেকে নান্টেস এর  চুক্তি ( Edict of Nantes ) বলে হুগেনোর ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্থা গঠনের অধিকার পায় । তাদের ছিল নিজস্ব আমলা, বিচারক । এমনকি তারা কতিপয় শহর নিজস্ব দখলে রেখেছিল । এদের মধ্যে লা রশেল নামে একটি সুরক্ষিত শহর ছিল অন্যতম। ফলে তারা ফ্রান্সের রাজশক্তিকে অমান্য করার দুঃসাহস দেখাতো । ১৬২৫  সালে হুগেনোরা বিদ্রোহ করলে রিশল্যু কঠোর হস্তে তাদেরকে দমন করেন । নান্টের এর চুক্তি বাতিল করা হলো । লা রশেল দুর্গ অবরোধ করা হলো । দীর্ঘ 15  মাস পর হুগেনোরা  রিশল্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করে । রোমান ক্যাথলিক চার্চের একজন কার্ডিনাল হলেও রিশল্যু যতখানি ধার্মিক ছিলেন তার চেয়ে বেশি ছিলেন রাজনীতিবিদ । তিনি তাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছিলেন, ধর্মীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে নয় । তিনি চেয়েছিলেন হুগেনোরা  রাজার প্রতি অনুগত থাকুক । অবশেষে ফরাসিরা রাজা ও হুগেনোরা  মধ্যে অ্যালেয় ( Edict of Alais )  এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এতে হুগেনোরা  ধর্ম পালনের অধিকার পেলেও দুর্গ বানানোর অধিকার ও রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়  । ফলে হুগেনোরা  সরকারের বিরুদ্ধে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে সুযোগ পায়নি । 

অভিজাতদের দমন : 

অভিযাত্রা বিভিন্ন প্রদেশের প্রশাসক বা  গভর্নর রূপে পরিচিত ছিলেন । তারা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দলের অধিনায়কত্ব করতেন । সমগ্র দেশ পরিপূর্ণ ছিল অভিজাতদের স্যাতো ( Chateaux )  দুর্ভেদ্য দুর্গ দ্বারা । ফলে তারা ক্রমেই প্রভু রূপে আত্মপ্রকাশ করেন । আইন-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা এবং রাজকীয় আদেশ বারবার অগ্রাহ্য করার দৃষ্টান্ত দেখাতেন । রিশল্যুর এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইলে অভিজাতরা ও রিশল্যুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন । আসলে অভিজাতদের দমন করার কাজটি ছিল কঠিন, যা করতে তিনি প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হন । রাজসভার পরিষদ বিন্দু তথা 

অভিজাতদের রানী মেরি -ডি- মেডিসিন ও তার অপর  পুত্র ডিউক অব আর্লির চক্রান্তে পরিচিত হয় রিশল্যুর  সব কাজ বাধা দান করতে থাকেন । রিশল্যুর  ক্ষমতা ছিল সর্বত্র । তারা এসব ষড়যন্ত্র উদঘাটন করতো এবং রিশল্যুর নির্মম হাতে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মূল করতেন । এব্যাপারে ভেদাভেদ বা যে কোন পদে অধিষ্ঠিত হোক না কেন তিনি রেহাই দিতেন না ।তিনি ২৬ জন ডিউক এবং একজন পরিষদকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন । 

দুর্গ ধ্বংস : 

রিশল্যু শুধু অভিজাত দের দমন করে থেমে থাকেননি । ১৬২৬ সালে একান জারি করে তিনি দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নয় এমন সব সুরক্ষিত দূর্গ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন । এ আইন কার্যকর করার সময়ে তিনি কৃষক ও নগরবাসীর সহযোগিতা লাভ করেছিলেন । কেননা তারা দীর্ঘকাল ধরে জমিদার শ্রেণীর দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছিল । 

শাসন ব্যবস্থার পুনঃগঠন : 

রিশল্যু স্বাধীনচেতা অভিজাত প্রশাসকদের নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন । তিনি তাদেরকে সরিয়ে না দিয়ে তাদের কাছ থেকে বেশিরভাগ ক্ষমতার সরিয়ে নিয়ে ইনটেনডেন্ট নামক এক ধরনের অফিসার নিয়োগ করে তাদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করেন । মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আগত এসব অফিসারদের রাজার প্রতি অনুগত ছিল সর্বোচ্চ । এরা বিভিন্ন জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন । এদের কাজ ছিল রাজকীয় করের পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং তা আদায় করা স্থানীয় পুলিশ বা মিলিশিয়া কে সংগঠিত করা আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং আদালত পরিচালনা করা। ইনটেনডেন্টর প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাতো। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণ করত। এরা রিশল্যুর অগণিত চক্ষু রূপে রাজ্যের সবকিছুর নিরীক্ষণ করত । পুরানো ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় প্রদেশগুলো পৌরসভা, গ্রামসমূহ, আইন পরিষদ, রাজকীয় জেলাসমূহ, আধা সামন্ত ও আধার রাজতন্ত্রের প্রশাসনিক এলাকায় ইনটেনডেন্ট  স্থানীয়  প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করা হয় । 

পার্লামেন্টকে অকার্যকর : 

রিশল্যু  গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রাজশক্তির অন্তরায় মনে করতেন । ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নাম ছিল স্টেটস জেনারেল (States General )  । তিনি এ পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকতে অস্বীকৃতি জানান । এবং একে একটি অকেজো প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন । যদিও তিনি একটি কে উচ্ছেদ করেননি । কারণ এর কাজ ছিল মূলত কর ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা ।প্রদেশের অন্যান্য সকল প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান ক্ষমতা তিনি কমিয়ে দিলেন । কয়েকটি প্রদেশে যেমন ব্রিটারি,প্রোভেন্স,বার্গান্ডি,ল্যাঙ্গোয়েডক এ রিশল্যু স্থানীয় সরকারকে টিকিয়ে রাখলেন।  কিন্তু এদের কার্যকলাপ রাজকীয় কর আদায়ের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখলেন । 

রাজার সার্বভৌম ক্ষমতা : 

পূর্বে প্রত্যেক জমিদারদের নিজস্ব কোষাগার ছিল । রিশল্যু  তা বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় রাজ কোষাগার প্রতিষ্ঠা করলেন । ফ্রান্সের বহু বিভক্ত সামন্ত বাহিনীর স্থলে প্রতিষ্ঠিত হল রাজকীয় সৈন্যবাহিনী । রাজা এখন থেকে কারো কাছে তার কার্যক্রমের জন্য দায়বদ্ধ নয় । তিনি নিজেকে ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল হলেও ফরাসি চার্চককে রাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন । এভাবে তিনি অর্থনীতি সামরিক বাহিনী  রাজ্যের উপর রাজারা একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন । 

নৌ বাহিনী প্রতিষ্ঠা : 

রিশল্যু  ফরাসি নৌবাহিনীর ভিত্তি স্থাপন করেন । তিনি সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে রণতরী ও বাণিজ্যতরী নির্মাণের কাজ শুরু করেন । টুলো,লাহাভার,ব্রেস্ট প্রভৃতির নৌবন্দরের উন্নতি সাধন করেন । 

সাংস্কৃতিক : 

শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারের জন্য তিনি যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করেন । ফরাসি ভাষার উন্নয়নের জন্য তিনি অ্যাক্যাডেমি অফ ফ্রান্স (Academy of France ) নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন । 

খ) বৈদেশিক নীতি : ( Foreign Policy )

ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সকে সর্বশেষ্ঠ শক্তিতে রূপান্তরিত করাই ছিল রিশল্যু  বিদেশ নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য । কিন্তু এ উদ্দেশ্য সাধনের প্রধান অন্তরায় ছিল হ্যাপসবার্গ বংশ দ্বারা শাসিত অস্ট্রিয়া ও স্পেন । তাই  হ্যাপসবার্গ রাজবংশ কে নাজেহাল করে রাইন নদী পর্যন্ত সীমানা বর্ধিত করা হয়েছিল তার উদ্দেশ্য । 

ত্রিশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ : 

কার্ডিনাল রিশল্যু যতখানি ছিলেন ধার্মিক তার চেয়ে বেশি ছিলেন রাজনীতিবিদ ও বাস্তবধর্মী । জার্মানিতে যখন প্রোটেস্ট্যান্ট লুথার পন্থী বনাম ক্যালভিন এবং প্রোটেস্ট্যান্ট বনাম ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ৩০ বর্ষব্যাপী ধর্মযুদ্ধ দেখা দেয় তিনি তখন নিজে ক্যাথলিক হয়েও প্রোটেস্ট্যান্ট দেরকে সাহায্য সহযোগিতা করেন । কেননা ফ্রান্সের বুরবোঁ রাজবংশের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গ রাজবংশ । তার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করে জার্মানিকে তথা অস্ট্রিয়াতে দুর্বল করা । তার কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে যুদ্ধ বিশারদ ক্যাথলিক সেনাপতি ওয়েলিনস্টার্নের পদচ্যুতি ঘটে । পরোক্ষ সাহায্য যখন তেমন কাজে আসছে না , তখন তিনি ১৬৩৫ সালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে যুদ্ধে নিয়োজিত করেন । এ  লক্ষে সুইডিস রাজা গাসটোভাস এডোলফাস যাতে জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট দেরকে অধিকতর সাহায্য করতে পারেন সেজন্য তিনি বিবদমান সুইডেন ও পোল্যান্ডের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাকে জার্মান ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রসদ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন ।

স্পেনের সাথে সম্পর্ক : 

স্পেনের অধিনস্তদের সমূহ নেদারল্যান্ডস , ফ্রান্সকতেঁ এবং ইতালির উত্তর অঞ্চলের ফ্রান্সকে ঘিরে রেখেছিল । ১৬১৮ সালে জার্মানিতে ধর্ম যুদ্ধ শুরু হলে জার্মান সম্রাট স্পেনের সাহায্য চান । রিশল্যু এ সুযোগে সৎ ব্যবহার করেন । স্পেন যাতে বিদ্রোহী নেদারল্যান্ড কে নিজ প্রভুত্ব কায়েম করতে না পারে এবং ৩০ বর্ষব্যাপী ধর্মযুদ্ধের জার্মান সম্রাট কে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতে না পারে সেজন্য তিনি স্পেনকে অন্য ক্ষেত্রে ব্যস্ত রাখার জন্য পরিকল্পনা করেন । তিনি উত্তর ইতালিতে স্পেনকে ব্যস্ত রেখে সেখানে তার সমস্ত শক্তি ও উদ্যম শেষ করার অভিনয় উদ্ভাবন করেন । 

ভল্টেলিন উপত্যকায়  উদ্ধার : 

ভল্টেলিন উপত্যকায় ছিল ফ্রান্সের আশ্রিত রাজ্য সুইজারল্যান্ড এর অধীনে । স্থানীয় ক্যাথলিক ওপর টেস্টের বিবাদের সুযোগ নিয়ে উক্ত উপত্যকাটি স্পেন নিজ অধিকার ভোগ করে নেয় । কাজেই এই উপত্যকা থেকে স্পেনকে বিতাড়িত করে নেদারল্যান্ড ও জার্মানির সঙ্গে স্পেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিশল্যু এ  ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । কেননা মিলন হতে জার্মানি এবং জার্মানি হতে নেদারল্যান্ডের ভ্রমণের জন্য ভল্টেলিন  স্পেনের খুবই দরকার ছিল ।তিনি  শক্তি ও কূটনীতি প্রয়োগ করে ভল্টেলিন উপত্যকায় পুনরায় সুইজারল্যান্ড এর অধীনে ফিরিয়ে দেন । 

রসিলন  অধিকার : 

বিশল্যু  অতি সাফল্যের সঙ্গে পর্তুগাল ও ক্যাটালোনিয়া প্রদেশকে স্পেনের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে স্পেনে মূল ভূখণ্ডে এক জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে দেন । ক্যাটালোনিয়া  বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে তিনি ১৬৪২ সালে পিরোনিজ পর্বতের পূর্বাঞ্চলের অবস্থিত রসিলিন অধিকার করেন । এছাড়া তিনি অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গদের নিকট থেকে আলসেস নিজের অধীনে আনতে সক্ষম হন । 

মূল্যায়ন : 

 বিশল্যু  ছিলেন একজন ধর্মযাজক । বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, বাস্তবধর্মী ,দেশের স্বার্থ ও রাজনীতিতে তিনি ধর্মের উপর স্থান দিয়েছেন । দেশের স্বার্থে ও রাজনীতিতে প্রোটেস্ট্যান্ট দের কে নিজ হাতে দমন করেন । আবার দেশের স্বার্থে বিদেশে ৩০ বছর ব্যাপী যুদ্ধে নিজে ক্যাথলিক হয়েও প্রোটেস্ট্যান্ট এর পক্ষে যোগদান করেন । এজন্য বলা হয় বিশল্যু  নিজদেশে ক্যাথলিক এবং ভিন দেশে প্রোটেস্ট্যান্ট ( ‘ Richeliew was catholic at home and protestant abroad “) ।  তারপর প্রচেষ্টায় ১৬৪২ সালে ফ্রান্স স্পেনের ছেয়ে  মহাশক্তিধর সামরিক শক্তির অধিকারী হয় । একদিকে অভিজাত দের দমন অন্যদিকে হুগেনোদের রাজনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে তুলেন । তিনি ফ্রান্সের রাজতন্ত্রকে গৌরবের শিখরে প্রতিষ্ঠা করেন । একাদশ লুই,প্রথম ফ্রান্সিস  ও চতুর্থ হেনরি ফ্রান্সের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বিশল্যু তা বাস্তবে রূপান্তরিত করেন ।পররাষ্ট্রনীতিতে  তিনি যে যোগ্যতা ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তার তুলনা তিনি নিজেই । কূটনীতিতে তিনি ছিলেন অতিশয় পাকা । শত্রুদের মিতরে পরিণত করতে এবং নতুন নতুন মিত্রতা স্থাপন করতে তিনি ছিলেন পন্ডিত । তিনি তার কূটনীতি দ্বারা তার শত্রুদের পরাজিত করে ফ্রান্সকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন । ১৬৪২ সালে বিশল্যু মৃত্যু হলে তার যোগ্য উত্তরসূরি ম্যাজারিন তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + 2 =