ডাচদের স্বাধীনতা যুদ্ধ :

নেদারল্যান্ডের স্বাধীনতা : 

ষোড়শ শতকে ইউরোপের ইতিহাসে ওলন্দাজ বা ডাচদের  স্বাধীনতা যুদ্ধ স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ এর রাজত্বকালে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । ১৫৫৬ সালে সম্রাট পঞ্চম চার্লস স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করলে তার পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ স্পেনের সিংহাসনে আহরণ করেন এবং পিতার নিকট থেকে স্পেন, স্পেনীয়, ইতালি, নেদারল্যান্ড ও স্পেনীয় উপনিবেশ আমরিকা লাভ করেন । নেদারল্যান্ড ছিল তার পিতৃভূমি।  তিনি যখন নেদারল্যান্ডের ক্ষমতা প্রাপ্ত হন তখন এর প্রজাবর্গ ছিল শান্ত এবং অনুগত । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে দ্বিতীয় ফিলিপের বিচারবুদ্ধি বিবর্জিত নীতি এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে নেদারল্যান্ড বাসীর মনে ঘৃণা অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় । পুঞ্জিভূত এ ক্ষোভ অচিরেই সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপান্তরিত হয় । এ আন্দোলনে নেদারল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণী নেতৃত্ব দিয়েছিল । অভিজাতদের মধ্যে উইলিয়াম অব অরেঞ্জ, কাউন্ট এগমেন্ট ওএডমিরাল হর্ন উল্লেখযোগ্য । তবে ডাচ বা ওলন্দাজদের স্বাধীনতা আন্দোলনে উইলিয়াম এই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন । 

নেদারল্যান্ড নামকরণ : 

নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা ওলন্দাজ বা ডাচ নামে পরিচিত । নেদারল্যান্ড অর্থ নিম্নদেশ বা নিম্নভূমি । কারণ এর অবস্থান সমুদ্র সমতল হতে অনেক নিচু । তাই সমুদ্র সমতল হতে অনেক নিচে বিদায় এর নামকরণ করা হয়েছে নেদারল্যান্ড । একসময় হল্যান্ড ও বেলজিয়াম নেদারল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল । 

ফিলিপ পূর্ব নেদারল্যান্ড : 

পূর্বে নেদারল্যান্ড ১৭ টি প্রদেশে  বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত ছিল । কতক  পরিমাণে এরা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো । প্রত্যেক প্রদেশে নিজস্ব আইন, আইন পরিষদ ও সরকার ছিল । প্রদেশগুলোতে ভাষাগত জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদ বিদ্যমান ছিল । সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ছিল ফ্লেমিশ বা ডাচ এবং ধর্ম ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট । এদের বসবাস ছিল উত্তরাঞ্চলে । দক্ষিণা অঞ্চলের ভাষা ছিল ডায়ালেক্ট নামক ফরাসি ভাষা এবং ধর্ম ছিল ক্যাথলিক । তবে সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্টেট জেনারেল নামে একটি সাধারণ আইন পরিষদ ছিল । সম্রাট পঞ্চম চার্লস এর শাসনভারের পূর্বেই নেদারল্যান্ডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো মোটামুটি একাত্মতাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল । পঞ্চম চার্লস এ সকল অংশের শাসন ব্যবস্থা কে এককেন্দ্রিক ও স্বৈরাচারী করতে চেষ্টা করেন এবং আংশিকভাবে সফল ও হন । তিনি নেদারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় শাসন ভার অভিজাত দের হাতে এবং শহরগুলোর শাসনভার বণিকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন । তবে তিনি নেদারল্যান্ডে লুথার ও ক্যালভিন মতবাদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতির গ্রহণ করেন । তার পরেও নেদারল্যান্ড বাসি তাকে শ্রদ্ধা করে । কারণ তার জন্মস্থান ছিল নেদারল্যান্ড । ১৫৫৬ সালে যখন দ্বিতীয় ফিলিপ নেদারল্যান্ডের শাসনভার প্রাপ্ত হন তখন নেদারল্যান্ডের প্রজাবর্গ ছিল শান্ত ও অনুগত । কিন্তু অল্পকালের মধ্যে তিনি তার ভুল নীতির কারণে এ প্রজাবর্গের শ্রদ্ধা হারান এবং বিরাগভাজন হন । এক পর্যায়ে প্রজা বর্গ বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে । 

ডাচদের/ ওলন্দাজদের বিদ্রোহের /স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণ : 

নেদারল্যান্ডের ডাচদের বা ওলন্দাজদের স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণগুলি ছিল প্রধানত ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক । 

১) ধর্মীয় কারণ : 

ক) পিতা পঞ্চম চার্লস এর মত দ্বিতীয় ফিলিপ ও  ছিলেন গোঁড়া  ক্যাথলিক । ১৫৫০ সালে  পঞ্চম চার্লস নেদারল্যান্ডে লুথার ও কেলভিন মতবাদের প্রচার ও প্রসার লক্ষ করে ঘোষণা করেন যে, ক্যাথলিকদের আগুনে পুড়িয়ে, গর্তে ফেলে বা তরবারি দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করা হবে । যারা বিধর্মীদের কোন প্রকার আশ্রয় দেবে , লুথার বা ক্যালভিনের মতবাদ সংক্রান্ত কোন পুস্তক রাখবে বা বিক্রয় করবে তাদেরকেও ওই একই শাস্তি ভোগ করিতে হইবে । দ্বিতীয় ফিলিপ স্পেনের রাজা হয়ে ধর্ম বিষয়ে পিতার নীতি অনুসরণ করে ১৫৫০ সালের পিতার ঘোষণা পুনরায় জারি করেন । এতেনতুন করে প্রোটেস্ট্যান্ট দের উপর অত্যাচার,  নির্যাতন বৃদ্ধি পায় । ফলে নেদারল্যান্ড বাসী অসন্তুষ্ট হন । কেননা নেদারল্যান্ডের অনেকেই ছিলেন লুথার বা ক্যালভিনদের  ধর্ম মতে বিশ্বাসী ।

খ) পূর্বে নেদারল্যান্ডে মাত্র চারজন বিশপ ছিলেন । দ্বিতীয় ফিলিপ আরো ১৪  জন নিযুক্ত করে মোট ১৮ জন বিশপকে নেদারল্যান্ডের বিভিন্ন অংশের নিযুক্ত করে ক্যাথলিক ধর্মের প্রাধান্য স্থাপনের চেষ্টা করেন । এতে জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা অপব্যবহার হচ্ছে , এ ধারণা জেগে উঠে । 

গ) তিনি তাঁর পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইনকুইজিশন ( ধর্মীয় আদালতকে) প্রোটেস্টান্টদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ ভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। এ আদালতের বিচার ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক । আসামিকে তাঁর আত্মপক্ষ কোন সুযোগ দেওয়া হতো না এই আদালতে । তিনি এ আদালতের সাহায্য ইহুদি ,মুর প্রোটেস্ট্যান্ট প্রভৃতি অক্যাথলিকদের উপর অত্যাচার চালানো হয় । তার উদ্দেশ্য ছিল জোর করে সকলকে ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত করা । দ্বিতীয় ফিলিপের এর ধর্মনীতি নেদারল্যান্ডের ডাচদের মনে দারুন ঘৃণা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে । 

২) রাজনৈতিক কারণ : 

ক) স্বৈরাচারী শাসন:

দ্বিতীয় ফিলিপ স্বৈরাচারী শাসন এ বিশ্বাসী ছিলেন । তিনি শাসনকার্যের সবকিছু এই নিজ হস্তে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন । নেদারল্যান্ড কে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তিনি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই  তার বৈমাত্রেয় ভগিনী মার্গারেটকে নেদারল্যান্ডের গভর্নর নিযুক্ত করেন । কার্ডিনাল ছিলেন মারগারেটের প্রধানমন্ত্রী । গ্রানভেলাকে সাহায্য করার জন্য কনসাল্টা নামে একটি গোপন সমিতি ছিল । দেশের শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে গ্র্যান্ডবেলা ও কনসাল্টা ছিল দ্বিতীয় ফিলিপের প্রকৃত প্রতিনিধি । মারগারেটের বিবেচনা বুদ্ধি যথেষ্ট ছিল বটে কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতের পুতুল ছিলেন । অভিজাত শ্রেণীর সদস্যদের নিয়ে যে জাতীয় পরিষদ ছিল তার ক্ষমতা কেড়ে নেন । এভাবে ফিলিপ অভিজাত শ্রেণীকে শাসনব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেন এবং স্পেন বাসীদের মধ্যে থেকে গভর্নর মন্ত্রী ও অন্যান্য প্রশাসক নিযুক্ত করেন । ফিলিপের এসব পদক্ষেপ নেদারল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণী সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি । 

খ) স্পেনীয় সৈন্য মোতায়েন : 

নেদারল্যান্ড কে স্পেনের পূর্ণ আয়ত্তে আনার জন্য ফিলিপস সেখানে স্পেনীয় শূন্য মোতায়েন করেন । দীর্ঘদিন সৈন্যরা নিয়মিত বেতন না পাওয়ার তারা বিত্তশালী ব্যক্তিদের সম্পত্তি ও শহর লুটতরাজ করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে । এতে নেদারল্যান্ড বাসী ফিলিপের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে । জনমতের চাপে স্পেনীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলেও বিদ্রোহ থেমে থাকেনি । 

গ) ইনকুইজিশন : 

ইনকুইজিশন বিচারালয়ের মাধ্যমে ক্যাথলিক ধর্ম বিরোধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো । এ বিচারালয়ের সাহায্যে দ্বিতীয় ফিলিপ শুধু ক্যাথলিক বিরোধীদের কঠোর শাস্তি দেননি । তার রাজনৈতিক শত্রুদের ও কঠোর শাস্তি প্রদান করেন । এভাবে ইনকুইজিশনের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন ও ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন । তার এসব অপকার ও জঘন্য কার্যকলাপ ডাসদের বিদ্রোহী হতে বাধ্য করে । 

৩) অর্থনৈতিক কারণ : 

ক) অতিরিক্ত কর ধার্য :  

ষোড়শ শতকে নেদারল্যান্ডস ছিল অর্থনৈতিক ভাবে বেশ সচ্ছল । ডাচরা ছিল নগরবাসী বর্ধিঞ্ষু বণিক সম্প্রদায় । এদের মাথাপিছু আয় ছিল ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক । তাদের তাঁতশিল্প মাখন ও পনির ছিল খুবই সমৃদ্ধ । নেদারল্যান্ডের শহর নগর গুলো শিল্প বাণিজ্য কেন্দ্র । দ্বিতীয় ফিলিপ সাম্রাজ্য ছিল বিশাল ও বিস্তৃত । যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াও তিনি তার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির কারণে তীব্র আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েন । আর্থিক সমস্যার মোকাবিলার জন্য তিনি নেদারল্যান্ডের জনগণের উপর কর আরোপ করেন । ফলে নেদারল্যান্ডের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে পড়ে । 

খ) ভুল বাণিজ্যনীতি : 

স্পেনের বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নেদারল্যান্ডের বাণিজ্যের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেন । এর ফলে নেদারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ব্যাঘাত ঘটে । 

এভাবে দ্বিতীয় ফিলিপ এর বিবেক বিবর্জিত , একপেশে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক নীতি এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা কারণে ডাচদের  মনে তীব্র ঘৃণা অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে । এমত অবস্থায় উইলিয়াম এর নেতৃত্বে অভিজাত শ্রেণী একটি সংঘ স্থাপন করেন। এই সংঘ শুধু অভিজাত শ্রেণী নয় সাধারণ জনগণ যোগদান করেন ।এভাবে ডাচগন স্পেনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের সুশাসনের জন্য নেদারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন যাবৎ দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে । এরই মধ্যে দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৯৮ সালে মারা যান এবং স্পেনের রাজা হন তার জামাতা তৃতীয় ফিলিপ । ১৬০৯ সালে দ্বিতীয় ফিলিপ  কিছু বিবেচনা করে ডাসদের সঙ্গে দ্বাদশ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেন । এতে নেদারল্যান্ডের উত্তরাংশের স্বাধীনতা একপ্রকার স্বীকৃতি হয় । পরবর্তীতে ১৬০৯ সালে ওয়েস্টফেলিয়ার সন্ধির  ফলে স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি হয়। এভাবে দীর্ঘকাল ধরে জাতীয় সংগ্রামের পর হল্যান্ড স্বাধীনতা অর্জন করেন । 

ডাচ/ ওলন্দাজ স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্ব/ ফলাফল : 

ডাচ বা ওলন্দাজদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ইউরোপ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা । ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন শক্তিশালী রাজতন্ত্রের জয়যাত্রা উপনিবেশ স্থাপনের হিড়িক সে অবস্থা সুশাসনের জন্য ওলন্দাজদের স্বাধীনতা সংগ্রাম চাট্টিখানি কথা নয় । এটা একটা অভাবনীয় বিষয় এবং সাফল্য । এর সংগ্রামের মাধ্যমে ওলন্দাজরা যে সাহসী, সংগ্রামী , প্রতিবাদি ও দেশপ্রেমিক এবং বীরের জাতি তা প্রমাণিত হয় । নেদারল্যান্ডের উত্তরাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে হল্যান্ড নাম ধারণ করে স্পেনের নাগপাশ হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে । এটা ডাচদের জন্য যেমন সাফল্য স্পেনের জন্য হুমকিস্বরূপ । এতে স্পেনের ব্যর্থতা, দুর্বলতা প্রকাশ পায় । আন্তর্জাতিকভাবে স্পেন হেয়পতিপন্ন হয় । এরপর থেকে স্পেনের আন্তজাতিক আধিপত্য বিলুপ্ত হতে থাকে । স্পেন সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় । সে সঙ্গে আরেকটি নতুন শক্তির আর্বিভাব ঘটে ।  সেটি হলো ইংল্যান্ড । ইংল্যান্ড তার নতুন সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে । ইংল্যান্ড তার প্রতিপক্ষ স্পেনের বিরুদ্ধে ওলন্দাজদের সহযোগিতা করেছিল । 

স্পেনের নাগপাশ হতে মুক্ত হয় ফলে নিজেকে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসাবে সু প্রতিষ্ঠিত করে । নতুন এদেশটি অচিরেই বিশ্বের অন্যতম নেী – শক্তিতে পরিণত হয় এবং সমুদ্রপথে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ।কোথাও কোথাও উপনিবেশ স্থাপন করে উপনিবেশিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় । এ স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে ডাচরা নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার পায় । স্পেনীয় শাসনে ক্যাথলিক ধর্ম ব্যতীত অন্যান্য ধর্ম পালনে নিষিদ্ধ ছিল । স্বাধীনতার মাধ্যমে ডাচরা লুথারবাদ, ক্যালভিনবাদ বা ক্যাথলিকবাদ যার যেটা পছন্দ সেটা পালনের সুযোগ পায়। ধর্মীয় সহনশীলতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষতা। ঞ্জান,বিজ্ঞান, শিল্প ,চিত্রশিল্প ইত্যাদি নানা দিক দিয়ে জাতীয় উন্নত করতে থাকে। ডাচ বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন ইউরোপের মৌলিক শিক্ষা কেন্দ্র ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে । ডাচ শিল্পীদের প্রতিভা রেনেসাঁস যুগের শিল্পীদের প্রতিবার সাথে অনায়াসে তুলনা করা যায় । আর এ সবই সম্ভব হয়েছিল ওলন্দাজদের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে । 

ডাচ বা ওলন্দাজদের সাফল্যের কারণ : 

স্পেনের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামে ডাচরা দীর্ঘ ৪০ বছর সংগ্রাম করে সফলতা অর্জন করে । তাদের সাফল্যের পেছনে কারণ ছিল বহুবিধ ।

১) ডাচরা ছিল সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং বীরের জাতি । তাই তারা স্পেন সাম্রাজ্যের অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে লিপ্ত হয় এবং স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয় ।

২) নেদারল্যান্ডের ভৌগলিক অবস্থা বিশেষ করে নদীসমূহ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করেছে । 

৩) উত্তর নেদারল্যান্ডের জনগণ ছিল ক্যালভিন মতবাদে বিশ্বাসী ডাচদের গণতান্ত্রিক ধারণা এবং একাত্মবোধ করে ও  বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে । 

৪) ডাচরা ছিল ব্যবসায়ী ।  তারা সফলতার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত।  ব্যবসা-বাণিজ্য করে তারা বহু বন্দরনগরী গড়ে তুলেছে। তারা কৃষি ও শিল্পে ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়।  তাঁতশিল্পের, জাহাজ শিল্পে, মাখন ,পনির প্রভৃতি উৎপাদনের সুনাম অর্জন করে ।১৬০৯  সালে তারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে ডাচদের অর্থনৈতিক একটি শক্তি ভিতের উপর দাঁড়ায়। এজন্য ডাচরা  দীর্ঘদিনের সাম্রাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে সক্ষম হয়।  

৫) ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ ডাচদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। এটা তাদের সাফল্য লাভের বড় কারণ । 

৬) ১৫৮৮ সালে ইংল্যান্ডের নৌবাহিনীর হাতে স্পেনীয়ের অজেয়, অপ্রতিরোধ্য নৌবহর আর্মাডা পরাজিত বা ধ্বংস হলে ফিলিপ দুর্বল হয়ে পড়েন । 

৭) ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধে ফিলিপ ক্যাথলিকদের পক্ষে যোগদান করেন। ফলে ডাচদেরবিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে স্পেনের পূর্ণ শক্তি নিযুক্ত করা সম্ভব হয়নি । 

৮) দ্বিতীয় ফিলিপ এর শত্রু চতুর্থ হেনরি ফ্রান্সের রাজা হয়ে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে আবদ্ধ হন । এতে স্পেনের নেদারল্যান্ড বিজয়ের সকল আশা তিরহিত হয়।

৯) ১৫৯৮ সালে দ্বিতীয় ফিলিপ মারা গেলে তার জামাতা অস্ট্রিয়ার আর্ক ডিউক দ্বিতীয় ফিলিপ নাম ধারণ করে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন । তিনিও রাজ্যের বিদ্রোহ দমন করতে ব্যর্থ হন । ১৬০৯ সালে ডাচদের সঙ্গে ১২ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে ডাচদের স্বাধীনতা সংগ্রাম কাছে এ নিয়ে দেন । 

এভাবে দীর্ঘ ৪০ বছর স্পেনের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম করে ডাচরা স্বাধীনতা অর্জন করে এবং অচিরেই ইউরোপের অন্যতম বাণিজ্যিক ও উপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত হয় ।

দ্বিতীয় ফিলিপের পরাজয়/ বিফলতা /ব্যর্থতার কারণ :

নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহ দমনে দ্বিতীয় ফিলিপের ব্যর্থতার নানাবিধ কারণ ছিল । যেমন: 

১) শুধু ধর্মীয় কারণে স্পেনের বিরুদ্ধে ডাচরা  বিদ্রোহ করেছিল তা ঠিক নয় । ধর্মীয় স্বাধীনতার পশ্চাতে তাদের যে জাতীয় স্বাধীনতা দাবি ছিল, ফিলিপ তা মোটেই উপলব্ধি করতে পারেননি । 

২) ফিলিপ স্পেনের সিংহাসন লাভ করার পর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে নানা পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করেন এসব ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে গিয়ে তিনি নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহীদের দমনে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেননি । 

৩) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধে জড়িয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হন । ফলে নেদারল্যান্ড বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি । 

৪) কেবল অত্যাচার ও দমননীতির দ্বারা কোন জাতীয় আন্দোলন দমন করা যায় না । তা তিনি বুঝতে চাননি । 

৫) ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করায় ফিলিপের পক্ষে বিদ্রোহীদেরকে দমন করা সম্ভব হয়নি । 

৬) ইংল্যান্ডের হাতে অজেয় অপ্রতিরোধ্য স্পেনীয় “আর্মাডা” বিধ্বস্ত হলে ফিলিপ দুর্বল হয়ে পড়েন । 

৭) বিদ্রোহীদের নেতা উইলিয়াম অফ অরেঞ্জ ছিলেন সুযোগ্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা তিনি নেদারল্যান্ড বাসীদের একাত্মতা বোধ করে সাফল্যের পথে নিয়ে যান । 

৮) ফিলিপ জলেযুদ্ধে তাদের পরাজিত করার কোন চেষ্টাই করেননি । 

৯) ফ্রান্সের সঙ্গে বিরোধ ফিলিপকে বেকায়দায় ফেলে দেয় তার সূত্র চতুর্থ হেনরি ফ্রান্সের সিংহাসন লাভ করে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের সঙ্গে মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধ হয়।  এতে ফিলিপের নেদারল্যান্ড বিজয়ের সকল আশা তিরোহিত হয় । 

উপযুক্ত কারণে দ্বিতীয় ফিলিপ নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ ও বিফল হন এবং ডাচ বা ওলন্দাজগন স্পেনিয়  দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৪০ বছর সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেন । 

নেদারল্যান্ডের ডাচদের/ওলন্দাজদের বিদ্রোহের/ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং উইলিয়াম অফ অরেঞ্জ এর অবদান । 

নেদারল্যান্ড ছিল স্পেনের অধীন।  আর স্পেনের রাজা ছিল দ্বিতীয় ফিলিপ । ১৫৫৬ সালে 

ফিলিপ যখন স্পেন সাম্রাজ্যের রাজা হন এবং নেদারল্যান্ডের অধিকারপ্রাপ্ত হন ,  তখন নেদারল্যান্ডের প্রজাবর্গের ছিল শান্ত ও অনুগত। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই তার বিচারবুদ্ধি বর্জিত নীতি ও স্বৈরশাসনের । কারণে প্রজাদের মধ্যে দারুণ ঘৃনা , অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় । এক পর্যায়ে এ ক্ষোভ বিদ্রোহ এবং বিদ্রোহ স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয় । আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন অভিজাত শ্রেণী। তবে এ বিষয়ে উইলিয়াম অব অরেঞ্জ কাউন্ট এগমন্টএবং এডমিরাল হর্নের নাম উল্লেখযোগ্য । এদের মধ্যে উইলিয়ামে ছিলেন অন্যতম প্রধান । 

১) নেদারল্যান্ডের জাতীয় আন্দোলন শুরু : 

উইলিয়াম এর নেতৃত্বে অভিজাত শ্রেণী একটি সংঘ স্থাপন করেন। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীকে গ্রানভেলাকে পদত্যাগ করা । দ্বিতীয় ফিলিপ পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে গ্রানভেলাকে স্পেনের প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেন । কিন্তু নেদারল্যান্ডের অত্যাচারী নীতির কোন পরিবর্তন করলেন না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মনৈতিক বিচার অর্থাৎ অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকে । আর এসবের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডের শুরু হতে থাকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন । 

২) ইনকুইজিশন বন্ধের দাবি : 

দ্বিতীয় ফিলিপ নতুন ঘোষণা জারি করে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে নেদারল্যান্ড বাসীদের মধ্যে দারুন চাঞ্চল্য দেখা দেয় । তারা নতুনভাবে একটি সংঘ গঠন করে । এতে শুধু অভিজাত শ্রেণী নয় সাধারণ নাগরিক শ্রেণিই  যোগদান করেন । তারা মীমাংসার পত্র নামে একটি আবেদন ফিলিপের নিকট পেশ করেন । এ পত্রে তারা ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় আদালত বন্ধের দাবি জানান । কারণ এটি মানুষ ও ঈশ্বরের নিকট ঘৃনিত। গভর্নর মার্গারেট বিষয়টি বিবেচনা করতে চাইলেও ফিলিপের প্রতিনিধি বার্লেমন্ট ভিক্ষুকদের আবেদন এ বিত না হতে পরামর্শ দেন । এসময় থেকে নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহী প্রজাদের নাম হয় “ ভিক্ষুকের দল “ । 

৩) মূর্তি বঙ্গের দাঙ্গা : 

এরূপ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ক্যালভিন পন্থী যাজকরা নেদারল্যান্ডের সর্বত্র ক্যাথলিক চার্চ আক্রমণ করে । তারা চার্চের ভিতরে রাখা যীশুর মূর্তি চিত্র ইত্যাদি ভেঙ্গে চুরমার করে ফিলিপের অত্যাচারে নীতির প্রতিবাদ করে যা মূর্তি ভাঙ্গা নামে পরিচিত । 

৪) কাউন্সিল অব ব্লাড : 

এ দাঙ্গার সংবাদ ফিলিপিন নিকট পৌছা মাত্র তিনি ইনকুইজিশন পুনর্বহাল করেন । দাঙ্গাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য১৫৬৭ সালের ডিউক অব আলবা নামে এক সামরিক নেতার অধীনে 10000 সুদক্ষ স্পেনীয় সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন । । এমনকি এডমিরাল হর্ন এবং এগমন্ট কাউন্ট কেউ হত্যা করা হয় । এরপর দাঙ্গাকারীদের বিচারের জন্য একটি কাউন্সিল স্থাপন করা হয় । এক কাউন্সিলে যারা বিচার করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় । এজন্য এর নাম হয় কাউন্সিল অব ব্লাড । আলবার এ বর্বর ও অমানুষিক নির্যাতনে নেদারল্যান্ড বাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে  । 

৫) করভার : 

আলভাকে বাধাদানের অসম্ভব মনে করে উইলিয়াম জার্মানিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকে মাতৃভূমি উদ্ধারের প্রচেষ্টা নেন । আলবার হত্যাযজ্ঞকে বাধাদান করতে উইলিয়াম জার্মানিতে একদল সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং আলভাকে আক্রমণ করেন । কিন্তু আলবার হস্তে জেমিংজেনের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন । যুদ্ধ জয়ের উল্লাসে আলভা নেদারল্যান্ড বাসীকে কর ভাবে জর্জরিত করেন। সব ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর তিনি শতকরা 10 ভাগ কর ধার্য করেন। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। বহু নেদারল্যান্ড বাসী দেশত্যাগ করে ইংল্যান্ডে পলায়ন করেন। এতে নেদারল্যান্ডের শিল্প ও বাণিজ্যের সমৃদ্ধি ক্রমে ক্রমে বিনষ্ট হয় এবং ইংল্যান্ডের শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি করতে থাকে। 

৬) নেদারল্যান্ডের ব্যাপক বিদ্রোহ: 

 আলভার অত্যাচারে যারা নেদারল্যান্ড হতে বিতাড়িত হন তারা একত্রিত হয়ে ১৫৭২ সালে নেদারল্যান্ড আক্রমন করে ব্রিল নামক শহরটি দখল করেন । তারা সামুদ্রিক ভিক্ষুক নামে পরিচিত । কারণ তারা দেশ হতে বিতারিত হয়ে ইংল্যান্ডের উপকূলে বাস করত এবং জলদস্যুতা করে জীবিকা নির্বাহ করতো । ব্রিল  শহরের পতনের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর নেদারল্যান্ডে ব্যাপক বিদ্রোহ দেখা দেয় । লিউজ নামে এক নেতা মনোজ নামক স্থানটি দখল করেন । হল্যান্ড জিলেন্ট ফ্রিসল্যান্ড ও ইউট্রেক্ট অরেঞ্জ পরিবারে উইলিয়ামকে তাদের নেতা বলে স্বীকার করে নেন । দেশের সব জায়গায় জাতীয়তাবাদের এক প্লাবন পড়ে যায় । আলভা কয়েকটি শহর দখল করেন বটে কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ করার ফলে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন । ডাচ বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয় তিনি ১৫৭৩ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন । 

৭) ডন রিকুইসেন্স : 

আলভার সঙ্গে আসেন আরেক সামরিক নেতা , নাম ডন রিকুসেন্স । তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদার ছিলেন। কিন্তু তাকে ফিলিপের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। ফলে তিনি আপস-মীমাংসার পথে চলতে পারেন নি। তথাপি তিনি কাউন্সিল অব ব্লাড তুলে দেন এবং বিদ্রোহীদের ক্ষমা করার ঘোষণা দেন । 

৮) উইলিয়ামের দাবি : 

এসময় উইলিয়াম তিনটি দাবি উত্থাপন করেন : যথা: – 

ক) স্পেনীয় সেনাবাহিনীকে নেদারল্যান্ড ত্যাগ করতে হবে । 

খ) নেদারল্যান্ডের পূর্বেকার শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং 

গ) ধর্মীয় ব্যাপারে স্বাধীনতা দিতে হবে । 

এ তিন শর্ত পূরণ হলে নেদারল্যান্ড বাসিরা সম্পূর্ণভাবে বিদ্রোহ ত্যাগ করতে রাজি আছে । তবে স্পেন সরকার ঘৃণাভরে তা প্রদান করে । ফলে যুদ্ধ চলতে থাকে । এ সময় লিডেন নামক স্থানটি স্পেনীয় সৈন্য কৃতিত্ব অবরুদ্ধ হয় । দীর্ঘ ৭ মাস সেখানকার অধিবাসীরা যুদ্ধ চালান । ডাগ গন এ সময় বাঁধ কেটে দিয়ে সমগ্র দেশকে প্লাবিত করে । অবশেষে ১৫৭৪ সালে উইলিয়াম এসে স্পেনীয় অবরোধ মোচন করেন । ঐ শহরের বাসিন্দাদের বীরত্বের স্মৃতি রক্ষার্থে উইলিয়ামের নির্দেশে লিডেন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় । 

৯)স্পেনীয় সৈন্যদের লুটতরাজ : 

১৫৭৬ সালে রিকুসেন্সের আকস্মিক মৃত্যু হলে স্পেনীয় সৈন্যবাহিনী নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে এবং আর্থিক বকেয়া থাকার তারা বিভিন্ন নগর ও বাণিজ্য কেন্দ্র লুণ্ঠন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। স্পেনের সামরিক বাহিনীর এ অরাজকতা স্পেনীয় উন্মুক্ততা নামে পরিচিত । 

১০) ঘেন্টের শান্তি চুক্তি : 

স্পেনীয় সৈন্যের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একতা অনুগত দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাথলিকরা স্পেনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে উত্তরাঞ্চলের প্রোটেস্ট্যান্ট বিদ্রোহীদের মুক্তি সংগ্রামে শামিল হতে ইচ্ছা পোষণ করে । এ সময় উইলিয়াম উপলব্ধি করেন যে , ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ থাকা সর্বনাশের কারণ হবে । এজন্য তিনি উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যে অর্থাৎ প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে  স্থাপনের লক্ষ করে ঘেন্টের শান্তি চুক্তি নামে এক পরস্পর সেীহার্দে্যর  চুক্তি সম্পাদন করেন । এ চুক্তি দ্বারা নেদারল্যান্ডের প্রত্যেক অংশটি ১৭ টি  প্রদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং উইলিয়ামের নেতৃত্ব মেনে নেয় । স্পেনীয় সৈন্য অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত ফিলিপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর হয় । 

১১) চিরস্থায়ী ঘোষণা:

রিকুইসেন্সর এর মৃত্যুর পরে লেপান্টোর যুদ্ধের নায়ক ফিলিপের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ডন জন অব অফ অস্ট্রিয়া নেদারল্যান্ড শাসক নিযুক্ত হন । তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের শান্ত করার জন্য ঘেন্টের শান্তি চুক্তি স্বীকার করে চিরস্থায়ী ঘোষণা করা জারি করেন । তিনি নেদারল্যান্ড হতে স্পেনীয় সেনাবাহিনী অপসারণের শর্ত ও মেনে নেন । কিন্তু তিনি ফিলিপের সমর্থন পেলেন না । ১৫৭৮ ডন মারা যান । 

১২)ঘেন্টের শান্তি চুক্তি বাতিল : 

ডন জনের পর নেদারল্যান্ডের গভর্নর নিযুক্ত হন মারগারেটের পুত্র আলেকজান্ডার , ডিউক অফ পারমা । তিনি ছিলেন একদিকে সেনাপতি অন্যদিকে সুচতুর রাজনীতিবিদ । তিনি উত্তর ও দক্ষিণের ধর্মীয় বিরোধের সুযোগ নিয়ে দক্ষিণে ক্যাথলিকদের সহানুভূতি ও আনুগত্য লাভ করেন এবং উভয় গ্রুপের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তোলেন । তার পরোচনায় দক্ষিণের ক্যাথলিকরা ঘেন্টের শান্তি চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং তা বাতিল করেন । 

১৩) ইউট্রেক্ট  ইউনিয়ন : 

ঘেন্টের শান্তি চুক্তি ফলে নেদারল্যান্ডের যে জাতীয় ঐক্য দেখা দিয়েছিল ওই চুক্তি বাতিল হওয়া তা ভেস্তে যায় । উইলিয়াম দেখেন যে সমগ্র নেদারল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভবপর হবে না । এ কারণে তিনি ১৯৭৯ সালে নেদারল্যান্ডের উত্তরাংশের হল্যান্ড, জিল্যান্ড, ইউট্রেক্ট, গিল্ডারল্যান্ড, ফ্রিসল্যান্ড ইউনিয়ন গঠন করেন । পরবর্তীকালে এর নাম রাখা হয় হল্যান্ড । ১৫৮১ সালে এদের স্টেট জেনারেল ( State General )  দ্বিতীয় ফিলিপকে অপসারণ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে । অতঃপর ইউরোপের মানচিত্রে এর নাম হয় ডাচ প্রজাতন্ত্র । 

১৪) ইউটেক্ট ইউনিয়নে ভাঙ্গন: 

ইউটেক্ট ইউনিয়নে মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ উত্তর নেদারল্যান্ড যখন স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছিল । তখন আরেক বিপত্তি দেখা দেয় । হল্যান্ড ও জিল্যান্ড উইলিয়ামের নেতৃত্ব মেনে নেয় । কিন্তু অপরাপর পাঁচটি রাজ্য ফ্রান্সের ডিউক অব আনজু কে তাদের রাজা বলে ঘোষণা করেন । তবে দুঃখের পর সুখের খবর হলো যে অল্পকালের মধ্যেই আনজু অত্যাচারী শাসক হয়ে ওঠেন । তখন ওই পাঁচটি রাজ্য পুনরায় উইলিয়াম এর অধীনে ফিরে আসে । 

১৫) উইলিয়াম কে হত্যা : 

দ্বিতীয় ফিলিপ পরাজয় স্বীকার না করে গোপনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উইলিয়াম কে হত্যা করেন । উইলিয়াম এর পুত্র মরিস নেতা নির্বাচন হন । ডিউক অফ পারমা উত্তর নেদারল্যান্ডের রাজ্যগুলো জয় করতে থাকেন । হল্যান্ড ও জিল্যান্ড প্রদেশ দুটি শুধু টিকে রইল । 

১৬) রানী এলিজাবেথের সাহায্য : 

এমন সময় ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করুন । এর সাহায্য পাবার পর বিদ্রোহীরা যেমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে অপরদিকে স্পেন তেমনি পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে । কেননা ইংল্যান্ডের সাথে যুদ্ধে স্পেনের অজয় আর্মডা  বিধ্বস্ত হয় । আবার দ্বিতীয় ফিলিপ ফ্রান্সের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন । এমতাবস্থায় ১৫৯৮ সালের দ্বিতীয় ফিলিপ এর মৃত্যু হয় । 

১৭) ১২ বছরের যুদ্ধ বিরোধী এবং হল্যান্ডের স্বাধীনতা লাভ : 

দ্বিতীয় ফিলিপ এর পর স্পেনের রাজা হন তার জামাতা তৃতীয় ফিলিপ , অস্ট্রিয়ার আর্ক ডিউক । তিনিও তার শ্বশুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুদ্ধ চালিয়ে যান । কিন্তু বিদ্রোহীদের দমন করতে ব্যর্থ হন । অবশেষে ১৬০৯ সালে তিনি অনন্যপায় হয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ১২ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেন । এ চুক্তির মাধ্যমে নেদারল্যান্ডের উত্তরাংশের স্বাধীনতা এক প্রকার স্বীকৃতি হয় । পরবর্তীকালে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি চুক্তি দ্বারা হল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয় । 

এভাবে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জাতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হল্যান্ড স্বাধীনতা অর্জন করে । ক্রমে প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে থেকে ওলন্দাজগন অনেক শক্তিশালী উপনিবেশিক ও বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয় । বিজ্ঞান ,কৃষি শিল্প, চিত্র শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ইত্যাদি নানা দিক দিয়ে এ জাতির সক্ষমতা প্রকাশ পেতে থাকে । আন্তর্জাতিক আইনের আদি চেষ্টা হুগো গ্রোসিয়াস ( Hugo Grotius ) , দার্শনিক, স্পিনোজ, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রেমব্রান্টেডেট, ফ্রান্স হাল্স প্রমুখ বহু  প্রতিভাবান ব্যক্তি হল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

35 − 30 =