ত্রিশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ ( ১৬১৮-১৬৪৮ )

Thirty years War ( 1618-1648 ) 

ত্রিশ বর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ (১৬১৮-১৬৪৮ ) একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘটিত অনুক্রমিক যুদ্ধ । সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় । ধর্মই এই যুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল নয় বরংচ ধর্ম ও রাজনীতির কারণে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এটি একটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নেয় । সংস্কার আন্দোলন ও প্রতি সংস্কার আন্দোলনের সংঘর্ষের ফলে যে সকল যুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছিল তার মধ্যে ত্রিশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ ছিল সর্বাপেক্ষা ভয়ানক ও ধ্বংসাত্মক । 

ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের কারণ : ( Causes of Thirty Years War)  

১) ধর্মীয় কারণ : 

ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে জার্মানি ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে । উভয় সম্প্রদায়ের অনমনীয় ও আপোষহীন মনোভাব পোষণ করে এবং আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয় । প্রোটেস্ট্যান্টরা আবার লুথারপন্থী ও কেলভিনপন্থী এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে । এমনই এক পর্যায়ে ১৫৫৫ সালে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে সম্পাদিত হয় অহসবার্গ  শান্তিচুক্তি উভয় গ্রুপের মধ্যে আপোষরফা রক্ষার্থে । কিন্তু এই চুক্তির রোমান সাম্রাজ্যের কোন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বা অমীমাংসিত বিষয় সমূহের কোন সম্মানজনক মীমাংসা দিতে পারেনি । যেমন:- 

ক) লুথারবাদের স্বীকৃতি : 

অগসবার্গ শান্তিচুক্তি ক্যাথলিক ও লুথারবাদদের স্বীকৃতি দিলেও ক্যালভিনপন্থীদের স্বীকৃতি দেয়নি ।  অচথ ১৬ শতকের শেষার্ধে সমগ্র ইউরোপের কেলভিন পন্থীদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে । মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ক্যালভিনবাদ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় । ক্যালভিনবাদিরা নব্য জার্মানির বোহেমিয়ায়, রাইনল্যান্ড, দক্ষিণ ও পশ্চিম জার্মানি এমনকি ফ্রান্সের ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে । জার্মানি এ সময় ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যালভিনিস্ট এই তিনটি পরস্পর বিদ্যমান ধর্মালম্বী গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে । তবে শুধু ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিল না বরং প্রোটেস্ট্যান্ট গ্রুপসমূহের মধ্যে অন্ত দ্বন্দ্ব এবং বিরোধ ও ছিল তুঙ্গে। লুথারবাদ ও ক্যালভিনবাদ এর সুযোগে ক্যাথলিক পন্থীরা নিজেদের রক্ষা ও শক্তি সঞ্চার পথ বেছে নেন । প্রতি সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীগণ বিশেষত জেসুইটরা ক্যাথলিকবাদ প্রচার করতে থাকে । দক্ষিণ ব্যাভেরিয়অ, অস্ট্রিয়ার হাপসবার্গ এবং রাইনে ক্যাথলিক ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয় । আবার জার্মানির উত্তরাংশ ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মালম্বী । এভাবে জার্মানিতে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপের মধ্যে আত্মকলহ মারাত্মক রূপ ধারণ কর। 

খ ) এক্লেসিয়াসটিক্যাল রিজারভেশন: 

এই নীতি অনুসারে কোন ক্যাথলিক বিশপ যদি প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম গ্রহণ করে তাহলে তিনি পদবী এবং চার্চের সকল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন । কিন্তু এই নীতি প্রোটেস্ট্যান্টরা সর্বত্র অগ্রাহ্য করে । এদিকে আবার পঞ্চম চার্লস চার্চের জমিকে নিরপেক্ষ করার বিরুদ্ধে ডিক্রি দেন । এর ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট, লুথারবাদ এবং ক্যাথলিকদের মধ্যে প্রচন্ড বিদ্বেষ ও অস্থিরতা দেখা দেয়। 

গ) রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম : 

অগসবার্গ শান্তির একটি দ্বারা ছিল রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম । ইউরোপের রাজারা যে ধর্মালম্বী হবে প্রজারা ও সে  ধর্মের অনুসারী হবে । যেসব রাষ্ট্রে প্রোটেস্ট্যান্ট রাজা শাসন করতো লুথারবাদ সেই এলাকায় রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায় । এই নীতির সুবাদে রাজারা তাদের ভিন্নধর্মী প্রজাদের উপর অত্যাচার করার সুযোগ পায় । ক্যাথলিক রাজাগণ এর অধীনে প্রোটেস্ট্যান্ট এবং প্রোটেস্ট্যান্ট রাজাগণ এর অধীনে ক্যাথলিকগন অত্যাচারিত হতে থাকে । এতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় । 

২) রাজনৈতিক কারণ : 

ধর্মীয় কারণে ৩০ বছর ব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলেও এর পিছনের রাজনৈতিক কারণও ছিল । ধর্ম বিষয়ে ইউরোপ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । যথা: প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক  । এতে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয় । রোমান সম্রাটের দ্বিতীয় ফার্ডিনান্ড এ দ্বন্দ্বের  সুযোগে জার্মানিতে নিজ প্রাধান্য স্থাপনের চেষ্টা করেন । আবার সুইডেনের রাজা গাস্টাভাস নিরাপত্তা বিধানের উদ্দেশ্য এবং বাল্টিকের সুইডেনের প্রভাব বিস্তার ও  ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্টদেরকে  রক্ষা করার নামে যুদ্ধে যোগদান করেন। অপরদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী রিশল্যু নিজে ক্যাথলিক হয়েও স্পেন ও অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গের প্রাধান্য খর্ব করার উদ্দেশ্যে প্রোটেস্ট্যান্টদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন । পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য রাজন্যবর্গের নেতৃত্বে দুইটি পরস্পর বিরোধী জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে । ১৬০৮ সালে প্রোটেস্ট্যান্টরা প্যালাটিনেট ও ক্যালভিনিস্ট রাজকুমার ফ্রেভারিখের নেতৃত্বে  একটি ” ইভানজেলিক ইউনিয়ন “ গঠন করে । এর বিরুদ্ধে ১৬০৯ সালে ব্যাভারিয়ার ম্যাক্সিমিলিয়ানের নেতৃত্বে ক্যাথলিকরা হোলি লীগ (Holly League ) নামে অনুরূপ একটি সংস্থাপন করে । এভাবে উভয় সম্প্রদায় যুদ্ধংদেহী জোট গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানিতে দ্বন্দ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে । 

৩) প্রাগের বিদ্রোহ: 

ত্রিশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধের আসন্ন বা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল বোহেমিয়ার রাজধানী প্রাগের বিদ্রোহ । বোহেমিয়ার অভিজাত শ্রেণী ছিল কেলভিনপন্থী । তারা অভিযোগ করে যে, চার্চ তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করছে । যেহেতু তাদের কোন ধর্মীয় মর্যাদা ছিল না । এজন্য তারা সোচ্চার হয়ে ওঠে । ১৬০৯ সালে রোমান সম্রাট  রূডলফ তাদের ধর্মীয় মর্যাদা দিলেও গির্জা নির্মাণের জন্য জমি দানের ক্ষেত্রে সামন্ত প্রভুদের ইচ্ছা জুড়ে দেয় । সামন্ত প্রভুরা জমিতে গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেননি । এমত অবস্থায় দ্বিতীয় ফার্ডিনান্দ রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মনোনীতহু হয়েই প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন । একটি প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে জাতীয় চেতনার সৃষ্টি করে । তারা সম্রাটের কাছে এর প্রতিকারের আবেদন করে সাড়া না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । তারা রাজপ্রসাদে ঢুকে দুইজন রাজ প্রতিনিধিদেরকে জালানা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় এবং প্যালানিটের প্রোটেস্ট্যান্ট ফ্রেডারিখকে তারা বোহেমিয়ার রাজা বলে ঘোষণা করেন । এতে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং তা দ্রুত সমগ্র জার্মানি, ফ্রান্স ,নেদারল্যান্ড, হল্যান্ড ,সুইডেন ,ডেনমার্ক অথবা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ১৬১৮-১৬৪৮ সাল পর্যন্ত বহাল থাকে।  ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধির মাধ্যমে এর  পরিসমাপ্তি ঘটে। 

ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের ফলাফল ( Result of the Thirty Years War )

ইউরোপের ইতিহাসের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ হিসেবে ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধ স্মরণীয় হয়ে আছে । এ যুদ্ধে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ,সামাজিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । নিচে তার ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো : 

১) রাজনৈতিক ফলাফল : 

পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য এই যুদ্ধের পর একটি ছায়ামূর্তি নিয়ে বেঁচে থাকে এবং ঐক্যবদ্ধ করার বদলে ওয়েস্টফেলিয়া শান্তিচুক্তি জার্মানিকে তিনশত স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দেয় । প্রত্যেক শাসক তাদের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি এবং আলাদা প্রতিরক্ষা ও শুল্ক নীতি গ্রহণ করে । এই সব রাষ্ট্রের উপর সম্রাটের প্রভাব কমে যাওয়ায় সাম্রাজ্যর, দুর্বল ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে । এর ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে উত্তর জার্মানিতে ব্রানডেনবার্গের ( পরবর্তীকালে প্রাশিয়া ) হিসাবে গড়ে উঠে । এটি অস্ট্রিয়ার আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব কে চ্যালেঞ্জ (Challange ) করে এবং শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জার্মানির অভ্যুত্থান এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । উনিশ শতকের রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিসমার্ক এর নেতৃত্বে জার্মানির একত্রীকরণ হয় । 

২) সামাজিক ফলাফল : 

প্রত্যেক যুদ্ধের ফলে কত দুঃখ দুর্দশা সৃষ্টি হয় । কিন্তু আধুনিক যুগের ইতিহাসের ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধ দুঃখ-দুর্দশার কোন তুলনা হয় না । জার্মানির খুব কম স্থানেই ছিল সেখানে এই যুদ্ধ স্পর্শ করেননি । এই যুদ্ধে প্রমাণিত হয় যে,  যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, নির্মমতার কাছে মানুষের জীবন তুচ্ছ । এই যুদ্ধে সৈনিকদের অত্যাচার, ধর্মীয় উন্মাদনা ও অবাধ হত্যাকান্ড জার্মানির বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । গ্রামের পর গ্রাম জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত হয় । জার্মানির বহু অংশে জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে । জার্মানির দুই-তৃতীয়াংশ লোক নিহত হন । বহু গ্রাম জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় । জার্মানির একটি অংশে ১৬০২  সালে জনসংখ্যা যেখানে ছিল ২২১ হাজার , ১৬৪৮ সালে তা নেমে আসে ১০ হাজারে । কৃষকের জমিতে বন্ধ্যা পরিণত হয় । অসহায় শিশু, বৃদ্ধ, নর-নারীর রক্তে এই যুদ্ধে ছিল অভিশপ্ত । 

৩) নৈতিক ফলাফল : 

দৈহিক উৎপীড়নের সঙ্গে মানুষের নৈতিকতার পতন ঘটে । ফলে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকটি দেশেই এক একটি পশুর শক্তিতে পরিণত হয় । যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে একমাত্র ফ্রান্স ভিন্ন অপরাপর সকল দেশেই গভীর হতাশা ও অবসন্নতা দেখা দিয়েছিল । অনেক লোক এই যুদ্ধের পর নিঃশেষিত হয় এবং তারা লুটতরাজ খুন -খামারি ও ডাকাতিতে অংশ নেয় । দয়া মায়া ও সহমর্মিতার স্থলে মানুষ নির্মম পশুতে পরিণত হয় । মানুষের অভ্যাস রীতিনীতি নৈতিকতা বিরোধী হতে থাকে । 

৪) অর্থনৈতিক ফলাফল : 

এই যুদ্ধে জার্মানির অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায় । জার্মানির সমৃদ্ধশালী শহরগুলোর ধ্বংসযজ্ঞে নিঃস্ব হয়ে যায় । বিশেষ করে উত্তর জার্মানির দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সমূলে ধ্বংস হয়ে পড়ে । ব্যাপক খাদ্যের অভাবে জার্মানি বহুৎ স্থানের লোক মৃত্যুর মুখে পতিত হয় । খাদ্যের অভাবে মানুষ তৃণভোজী হতে বাধ্য হয় । অনেক জায়গায় মানুষ মানুষের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে । অতিরিক্ত খাজনার চাপে মানুষ দাসে পরিণত হয় । যুদ্ধের পর ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায় । ব্যবসা-বাণিজ্য ফরাসি ও ডাচদের হাতে চলে যায় । যুদ্ধের পর শিল্পক্ষেত্রে জার্মানির অধঃপতন আরো বেড়ে যায় । ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্র হ্যাসান, লিপজিগ,ম্যাগেডেবার্গ, হামবুর্গসহ  বহু শহর ঘুমন্ত শহরে পরিণত হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে তুর্কীরা ভেনিসের বাণিজ্য দখল করে নেয় এবং পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড ,তাদের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বিশ্ববাণিজ্য নিজেদের অধিকারে করে নেয় । সুতরাং বাণিজ্য ক্ষেত্রে জার্মানির পতন ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে । 

৫) সাংস্কৃতিক ফলাফল : 

ত্রিশ বছর যুদ্ধে জার্মানির শিল্পসাহিত্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় । শতধাবিভক্ত জার্মানির সৃজনীশক্তি সৃষ্টিশীলতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে । পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে জার্মান সাহিত্য ,দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি ইতালি এবং ফ্রান্সের সমপর্যায়ভুক্ত ছিল । জার্মান ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন ক্রমশই নিম্নমুখী হতে শুরু করে , তেমনি জার্মানির বুদ্ধিজীবী জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির পরিমাণ কমতে থাকে । ফ্রান্স ওয়েস্টফেলিয়ার সন্ধির পর শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি ঘটলেও জার্মানির এই অধঃপতন হতে পুনরুদ্ধার করতে বেশ সময় লাগে । 

পরিশেষে বলা যায় যে, এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্বক । অনিশ্চিয়তা অস্থিরতা জার্মানিকে ক্রমশ তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং জরাগ্রস্ত করে তোলে । তাদের জাতীয় নীতি ঐতিহ্য , কৌশল ভীতিজনিত  অবস্থার মধ্যে পড়ে । সবকিছু হারিয়ে জার্মানি হতোদ্যম হয়ে পড়ে । তবে এর মধ্যে থেকেই জার্মানির আবার ক্রমশ চেতনা হতে শুরু করে । তাদের দুঃখ দুর্দশা অভাবগ্রস্ত তা পরবর্তীকালে জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি করে এবং জার্মানি ক্রমশই একটি শক্তিশালী দেশে পরিণত হয় । সুতরাং প্রাগের যে ঘটনার মধ্য দিয়ে যে ধ্বংসস্তূপের সূত্রপাত হয়েছিল পরবর্তীকালে সে ধ্বংসস্তূপ কে অপসারণ করে আধুনিক জার্মানির সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে । 

ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি , ১৬৪৮ ( The peace of Westphalia , 1648)

ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি হলো ইউরোপের ইতিহাসে প্রথম শান্তির সম্মেলন । ইউরোপের ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে ১৬১৮ সালে যে ভীতিকর ও ধ্বংসাত্মক ত্রিশ বছরের ধর্মযুদ্ধ শুরু হয় ,তার অবসান ঘটে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধির মাধ্যমে। এর যুদ্ধ ধর্মের কারণে সংঘটিত হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল। ধর্ম ও রাজনৈতিক বিরোধ সমাধানের লক্ষ্যে ইউরোপের প্রায় সকল দেশের প্রতিনিধিরা ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া মিলিত হয়ে দুটি শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে । একটি মুনষ্টারে হাপসবার্গ ও ফ্রান্সের মধ্যে এবং অপরটি ওনাব্রকের । এ দুটি শান্তিচুক্তি কে একত্রে সন্নিবেশ করে ১৬৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় । এটি ইতিহাসের এক নতুন যুগের নতুন গতিধারা ও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সূচনা করে । 

ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধির দ্বারা বা শর্তসমূহ : 

এ সন্ধির শর্ত সমূহ কে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

 যেমন: ক)  ধর্মীয় শর্তসমূহ।

খ)  রাজনৈতিক শর্তসমূহ । 

ক) ধর্মীয় ধারা বা শর্তসমূহ : 

১) ১৫৫৫ সালের অহসবার্গ সন্ধি দ্বারা লুথারপন্থীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছিলতা ক্যালভিনপন্থীরা ও ভোগ করতে পারবেন । 

২) কোন চার্চের সম্পত্তি বা জমিজমা বাজেয়াপ্ত করা যাবে না । ১৬২৪  সালে ১ জানুয়ারি ভাগ্য পরীক্ষার দিন ( Test day ) হিসেবে ধার্য হয় এবং ওই তারিখ হতে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এর অধিকারে যেমন স্থান ছিল, সেগুলোর উপর নিজ নিজ অধিকার অব্যাহত থাকবে ।

৩) পবিত্র রোমান সম্রাটের বিচারালয় সমানসংখ্যক ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট প্রতিনিধিকে বসার অনুমতি দেওয়া হয় । 

৪) রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম নীতি গ্রহণ করা হয় । 

৫) রোমের পোপ নতুন ধর্ম ব্যবস্থা অনুযায়ী ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এর সমান অধিকার অনুমোদন না করার আন্তর্জাতিক বিরোধের মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা তার চিরদিনের জন্য লোপ পায় । 

খ) রাজনৈতিক ধারা বা  শর্তসমূহ : 

১) জার্মানি : 

এ সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির উপর পবিত্র রোমান সম্রাট এর রাজনৈতিক ক্ষমতা লোপ পায় । জার্মানি প্রতিটি রাষ্ট্রকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় । এর ফলে জার্মানিতে প্রায় ৩০০ স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় । তবে একটি শর্ত ছিল যে , এসব স্বাধীন রাষ্ট্র রোমান সম্রাটের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি করতে পারবেনা । 

২) বোহেমিয়া : 

বোহেমিয়ার সিংহাসনে পবিত্র রোমান সম্রাটের অধিকার স্বীকৃতি হয় । অস্ট্রিয়ার উত্তরাংশ তিনি বেভারিয়ার নিকট বন্ধ করে দিয়েছিলেন , এ সন্ধির ফলে তিনি তা ফিরে পান । সম্রাট তার নিজ রাজ্যে ইচ্ছামত ধর্ম ব্যবস্থা প্রবর্তনের অধিকার লাভ করেন । 

৩) হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড : 

এ সন্ধির দ্বারা হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড কে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় । 

৪) সুইডেন : 

সুইডেনকে পোমারানিয়অ, ব্রিমেন ও ভার্দেন এরে বিশপ অধিকৃত অঞ্চলসমূহ দেওয়া হয় । এছাড়া স্টেটিন উইজমেন নামক দুটি শহর ও অলীন নামক দ্বীপ এবং জার্মান ডায়েটের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার সুইডেন লাভ করে । জার্মানি থেকে সুইডেনর  সৈন্য অপসারণের ক্ষতিপূরণ হিসাবে সুইডেনকে থেকে প্রচুর অর্থ দেওয়া হয় । 

৫) বেভারিয়া: 

বেভারিয়ার অধিপতি ম্যাক্সিমিলিয়ান কে ইলেক্ট্রোর উপাধি দেওয়া হয় । প্যালাটিনেটের একটি অংশ বেভারিয়ার সঙ্গে দেওয়া হয় । দক্ষিণ জার্মানিতে বেভারিয়া শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে পরিগণিত হয় । 

৬) প্যালটিনেট: 

প্যালটিনেটেনেটের আরেক অংশ নিয়ে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয় । মূল ইলেকট্রর ফ্রোডারিকের ক্ষমতাচ্যুত পুত্র চার্লন লুইসকে  এর ইলেকট্রন করা হয় । 

৭) ব্রান্ডেনবার্গ : 

এটি লাভ করেন কেমিন, মিনডেন, মেঘ বিভাগের অধিকাংশ পোমারানিয়অ, বাবস্টাডেট, ক্লিভস , মার্ক ও র‌্যাভেন্সবার্গ । পশ্চিম পোমারানিয়া না পাওয়ার জন্য ব্রান্ডেনবার্গকে ক্ষতিপূরন দেয়া হয় । 

৮) স্যাক্সনি: 

স্যাক্সনি লুসেনিয়অ ও ম্যাগডেবার্গের একাংশ লাভ করে । 

৯) ফ্রান্স :

এ সন্ধির মারফত ফ্রান্সের অর্জন ছিল সবচেয়ে বেশি । ফ্রান্স মেৎজ, টুল, ভার্দুন নামক তিনটি  ধর্মানুষ্ঠান লাভ করেন । তাছাড়া , ব্রাইসাক, ময়েনভিক এরং পিনেরোলা নামক তিনটি দুর্গ , ফিলিপবার্গে  সেনানিবাস স্থাপনের অধিকার এবং আলসেস নামক স্থানের অধিকাংশ লাভ করেন । এছাড়াও আলসেশিয়ার  দশটি শহরের উপর ফ্রান্সের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি হয় । ফলে ফ্রান্সের প্রাকৃতিক সীমারেখা সুদৃঢ় হয় এবং রাইন নদীর উপর ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । ফ্রান্স জার্মানির ডায়েটে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান । 

ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধির গুরুত্ব/ ফলাফল ( Significance / Result of the peace of Westphalia )

১) ধর্ম যুদ্ধের অবসান ও সহনশীলতা : 

এর সন্ধি ইউরোপের ত্রিশ বছরব্যাপী স্থায়ী যুদ্ধে রক্তাক্ত ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটায় । চার্লসের সম্পত্তি অধিগ্রহণ বাজেয়াপ্ত করা যাবে না । প্রোটেস্ট্যান্ট রাজ্যগুলোতে ক্যাথলিক মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না , সন্ধির এসব নীতি ইউরোপের ধর্মীয় সহনশীলতার ক্ষেত্রে তৈরি করে । ধর্মের গোঁড়ামি থেকেমুক্ত হয়ে মানুষ মানবতা ও যুক্তিবাদের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয় । 

২) রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিদায় : 

এ সন্ধি ১৫৫৫ সালের অগসবার্গের সন্ধির রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম এ নীতি গ্রহণ করে ক্যালভিনবাদকে লুথারবাদএর মূল্যায়ন করা হয় । অবশ্যই এর ফলে ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রাখা হয় । তথাপি ক্যালবিন পন্থী লুথারপন্থীগনকে সমপর্যায়ে স্থাপন এবং ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এর মধ্যে প্রত্যেক রাজার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় বিবেচনা করে ওয়েস্টফেলিয়া সদস্যরা রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিদায় দিতে সক্ষম হয় । এরপর থেকে ইউরোপে ক্রমাগত শুরু হতে থাকে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি । 

৩) রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় : 

এ সন্ধি ধর্মীয় ইস্যু কে পিছে ফেলে রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে এবং তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয় যেমন: –

ক) ইউরোপের রাজবংশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে ,

খ) নিজ রাজ্যসীমা বিস্তৃত করে এবং 

গ) কোন দেশে যাতে অধিকতর শক্তিশালী হতে না পারে সেজন্য শক্তিসাম্য স্থাপনে নীতি গ্রহণ করে । 

৪) রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি : 

এ সন্ধির পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজনীতিক সত্ত্বাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়।  পূর্বে রোমান সম্রাট ছিলেন ইউরোপের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গুরু বা অভিভাবক। আর ধর্মক্ষেত্রে ছিলেন রোমান পোপ । উভয়ের ক্ষমতা চিরতরে লুপ্ত হয় । রোমান সম্রাট এর অস্তিত্ব এখন অস্ট্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় । 

৫) স্বাধীন জার্মান রাষ্ট্রসমূহ :

এর সন্ধির মাধ্যমে পবিত্র রোমান সম্রাটের অধীন থেকে মুক্ত হয়ে প্রায় ৩০০ স্বাধীন ও সার্বভৌম জার্মান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় । প্রতিটি জার্মান রাষ্ট্র স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ,নিজস্ব সেনাবাহিনী এবং নিজস্ব টাকশালের অধিকার পায় । 

৬) ফ্রান্সের মর্যাদা বৃদ্ধি : 

এর সন্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফ্রান্সের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় । ফ্রান্স বিশ্বশক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয় । ফ্রান্স আলসেস গ্রহণ করে রাইন অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে তার রাজ্যসীমা প্রাকৃতিক সীমায় পৌঁছে দেয় । 

৭) আন্তর্জাতিক কূটনীতি : 

এ সন্ধির পর ইউরোপে যেমন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠে ।  তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতি নীতির উদ্ভব ঘটে । এই নীতির মূল কথা হলো ইউরোপের শক্তিশালী বৃহৎ রাষ্ট্র সমূহ যেমন থাকবে , তেমনি দুর্বল রাষ্ট্রসমূহ থাকবে । সকল দেশেই একটি সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হবে । ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ,রীতিনীতি প্রবর্তনের ফলে একটি নতুন ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সৃষ্টি হবে । তখন থেকে বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের স্থায়ী দূত নিযুক্ত করে স্থায়ী দূতাবাস গড়ে ওঠে । এ সময় থেকে একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইনকানুন সম্পর্কিত নানা লেখক নানা গ্রন্থ প্রণয়ন আরম্ভ করে । এদের মধ্যে ডাচ মানবতাবাদি লেখক হুগো গ্রোসিয়াসের ( Hugu Grootius )  বিখ্যাত গ্রন্থ আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও সন্ধি বিষয়ক রীতিনীতি ( De Jure Belli ac pacis or On the Law of War and Peace, De Jure Praedae or On the Law of Prize and Booty )  সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য । 

এছাড়া এ সন্ধির ফলে উত্তর ইউরোপের সুইডেনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। উত্তর জার্মানির পার্শ্ববর্তী রাজ্য গুলো দখল করে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং প্রাশিয়ার নাম ধারণ করে । এ প্রাশিয়ার নেতৃত্বে একসময় জার্মানি একত্রিতকরণ হয়। দানিয়ুব অঞ্চলে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় । তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগে রাশিয়া তুরস্কের অধীনস্থ স্থানগুলো দখল করার লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করে । তবে এর সন্ধি স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের মধ্যে আরো ১১ বছর যুদ্ধ চলতে থাকে । এতে নতুন কয়েকটি দেশের সৃষ্টি হয় এবং তাদের রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা পরস্পর সহবস্থান নীতির পরিবর্তন সূচিত হয় । 

অতএব আমরা একথা বলতে পারি যে , ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি বা শান্তিচুক্তি । এটি দীর্ঘদিনের ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটায় । ধর্মীয় সহনশীলতা আনয়ন করে । আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে এবংএকটি যুগের অবসান ঘটিয়ে আরেকটি নতুন যুগের সূচনা করে।  

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 2 =