দ্বিতীয় ফিলিপ

সম্রাট পঞ্চম চার্লস স্বাস্থ্যগত কারণে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করলে ১৫৫৬ সালে তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ স্পেনের সিংহাসনে আহরণ করেন । উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি স্পেন, নেদারল্যান্ড, স্পেনীয়, ইতালি এবং স্পেনীয় আমেরিকর অধিপতি হন । ইংল্যান্ডের রানী মেরি টিউডরকে বিয়ে করার ফলে তিনি ইংল্যান্ডের রাজাও হন । পরবর্তীকালে তিনি পুর্তগাল জয় করেন । এভাবে তিনি সম্রাটের দায়িত্ব না নিয়েও এক বিশাল সাম্রাজ্যের   অধিকারী হন । তিনি ছিলেন সে যুগের সম্রাটের চেয়ে অধিকতর ক্ষমতাধর অধীশ্বর । 

  তার চরিত্র : 

ফিলিপ ছিলেন রাজনীতিতে অনভিজ্ঞতা, চিন্তায় সংকীর্ণ, বুদ্ধিতে কম, অপরের প্রতি সন্দিযুক্ত, পরমধর্মে অসহিষু ,শাসক হিসেবে স্বৈরাচারী এবং ক্ষমতার প্রতি লোভী । পিতার কোন গুণ এই তার মধ্যে পাওয়া যায় না । তিনি ছিলেন স্বাধীনতা অগ্রগতি এবং উদারনীতির ঘোর বিরোধী । তার দমননীতি ছিল বর্বোরচিত । ইউরোপের রাজাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম ঘৃণিত রাজা । তবে তার আত্মসংযম, অধ্যবসায়  প্রচেষ্টা ছিল অক্লান্ত ।

তার উদ্দেশ্য : 

দ্বিতীয় ফিলিপে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দুইটি যথা :

১) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্পেনকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করা এবং 

২) ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ কে  নির্মূল করে এবং  ক্যাথলিক ধর্মকে সর্বজয়ী করা । 

তার এ দুই আদর্শ ও উদ্দেশ্য কে কাজে পরিণত করতে গিয়ে তিনি তার সকল শক্তি, অর্থ , সম্পদ নিয়োজিত করেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলেন । 

তার অভ্যন্তরীণ নীতি : 

তার অভ্যন্তরীণ নীতির উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতা ও শাসনতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা সব তুলে নিয়ে নিজ ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ ও স্বৈরাচারী করা ।

১) কর্টেস এর ক্ষমতা হ্রাস : 

তার মাতামহ ( নানা ) ফার্ডিনান্ডের সময় ক্যাস্টাইলের  জাতীয় সভা কর্টেস ( Cortes ) যথেষ্ট শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা উপভোগ করত । কিন্তু সম্রাট পঞ্চম চার্লস ওই সভার ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দেন । আর দ্বিতীয় ফিলিপ ওই সভার ক্ষমতা আরো কমিয়ে দেন এবং একে রাজার মনোনীত ব্যক্তিদের একটি সভার  পরিণত করেন । 

২) ইনকুইজিশন :

এটি ছিল এক ধরনের ধর্মীয় আদালত। ক্যাথলিক ধর্মে অবিশ্বাসী বা ধমাদ্রোহী অথবা যারা প্রোটেস্ট্যান্ট তাদেরকে ধরে এনে এই আদালতে বিচার করা হতো। যারা ক্যাথলিক ধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন তাদেরকে কঠোর ও নিষ্ঠুর শাস্তি দেওয়া হতো । এই আদালতে আসামীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হতো না । দ্বিতীয় ফিলিপ এ আদালতের সাহায্যে শুধু ক্যাথলিক বিরোধীদের কেই শাস্তি দিতেন তাই নয় বরং যারা রাজতন্ত্রের কোন প্রকার বিরোধিতা করত তাদেরকে এই আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হতো । এভাবে তিনি নিজ ক্ষমতাকে সর্বময় করলেন । ব্যক্তি স্বাধীনতা ও শাসনতান্ত্রিক স্বাধীনতা হরন করলে । 

৩) পরধর্ম সহিংসতা ও স্পেনের ক্ষতি : 

দ্বিতীয় ফিলিপ ছিলেন গোড়া ক্যাথলিক এবং ক্যাথলিক ধর্মের ও প্রতি সংস্কার আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক । তার উগ্র  ধর্মান্ধতার কারণে অসংখ্য মুর এবং  ইহুদিদের কে হত্যা করা হয় । মুররা ছিল মুসলমান ।এদের অনেকে ক্যাথলিক ধর্মের দীক্ষিত করা হয়।  অনেকে বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাসন দেওয়া হয় । মুর, ইহুদি এবং অক্যাথলিকরা ছিল পরিশ্রমই, বিত্তশালী,শিল্পী , সুদক্ষ কারিগর । এরা দলে দলে স্পেন ত্যাগ করে চলে যেতে থাকে।  এতে স্পেনের সমৃদ্ধি দিনদিন কমতে থাকে । 

৪) নিশংসতা : 

ধর্মীয় ব্যাপারে তিনি ছিলেন অতি নির্মম, অমানবিক। তিনি তার প্রথম বিবাহের সন্তান ডন কার্লোসকে প্রোটেস্ট্যান্ট প্রীতীর জন্য কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং তার নির্দেশে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় । 

৫) হল্যান্ডের স্বাধীনতা : 

ফিলিপ তার ইতালীর রাজ্য নেপলস, মিলান ও সিসিলিতে সহজেই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে সমর্থ হন । কিন্তু নেদারল্যান্ডে তার স্বৈরাচারী নীতির ফলে এক দারুণ বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় । ক্রমে ক্রমে এ বিক্ষোভ প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয় । শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের একাংশ হল্যান্ড স্বাধীন হয়ে যায় । 

৬) স্থায়ী সামরিক বাহিনী : 

ফিলিপের স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার ছিল একটি স্থায়ী সামরিক বাহিনী । এজন্য তিনি তার সেনাবাহিনীকে স্থায়ী বাহিনীতে পরিণত করেন । তিনি পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি করেন । তাদেরকে নিয়মিত বেতন দেন । পূর্বে যুদ্ধের জন্য সামন্ত শূণ্যের উপর নির্ভর করতে হতো। এখন বেতনভোগী স্থায়ী সৈন্য রাজশক্তি কে প্রতিহত করে তুললো । 

৭) ভূল বাণিজ্য : 

দ্বিতীয় ফিলিপের বাণিজ্যনীতি ও ভুল ছিল । সে যুগে মানুষের মনে বিশ্বাস ছিল যে , বিদেশ হতে মাল আমদানি না করে কেবল বিদেশে মাল রপ্তানী করতে পারলে দেশের সোনা ও রুপার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে ।এতে দেশ সমৃদ্ধিশালী হবে । স্পেনের অবশ্যই সে প্রশ্ন ছিল না। কেননা স্পেনের আমেরিকার উপনিবেশ থেকে প্রচুর সোনা, রুপা আসতো । সেজন্য স্পেন বিদেশে মাল রপ্তানি করার প্রয়োজন মনে করে না। অচথ অন্যান্য দেশে যখন বিদেশে রপ্তানি করে নানাবিধ শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে লাগল তখন স্পেনে তখন আলস্য ও আরামপ্রিয় তা দেখা দিল । কিছুকাল পরেই দেখা গেল স্পেনের জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । ফিলিপ মূল্যস্তর নামিয়ে আনার চেষ্টা করলেন । খাদ্যশস্য সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী রপ্তানি বন্ধ করে দিলেন । এ ব্যবস্থার ফলে স্পেনে কৃষি ও শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ল। স্পেনের বৈদেশিক বাণিজ্য ক্রমে বিদেশীদের হাতে চলে যেতে লাগলো । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক জনগণ উল্লেখ করেছেন, “ It has been Computed that five-sixths of the home, and nine-tents of the Indian trade were monopolised by the foreigners. “ একদিকে বাণিজ্যের এ অবস্থা, অপরদিকে ফিলিপের করভার ও ঋণভার স্পেনের জনসাধারণকে দারিদ্র্যে চরমে পৌঁছে দেয় । 

অভ্যন্তরীণ নীতির ফলাফল : 

দ্বিতীয় ফিলিপ এর অভ্যন্তরীণ নীতি ও শাসন পর্যালোচনা করলে এ কথা বলা যায় যে, তার শাসন কেবল মাএ স্বৈরচারী ছিলনা অত্যাচারী ও ছিল বটে। তার রাজত্বকালে স্পেনের পতন শুরু হয় । তার শাসনের ফলে :-

১) রাজ কর্মচারীদের দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় । 

২) ব্যক্তি স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয় । 

৩) ক্যাথলিক ধর্ম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম পালনের সুযোগ ছিল না । 

৪) তার ধর্মান্তর নীতির কারণে মুর, ইহুদী, এবং অন্যান্য অক্যাথলিকদের যারা ছিল পরিশ্রমই, বিত্তবান ,শিল্পী, কারিগর তারা দিন দিন স্পেন ত্যাগ করতে থাকে । এতে স্পেনের জাতীয় সংহতি বিনষ্ট হয় এবং সমৃদ্ধি দিনদিন কমতে থাকে । 

৫) তার ভুল নীতির কারণে স্পেনবাসীর পরধর্ম বিদ্বেষ, একদেশদর্শিতা আলস্য ও অহংকার চরমে পৌঁছেছিল ।

পরিশেষে একথা বলা যায় যে, দ্বিতীয় ফিলিপের রাজত্বকাল যখন শুরু হয় তখন স্পেন ছিল গৌরবের উচ্চশিখরে ।আর তার রাজত্বের শেষে স্পেনের ভবিষ্যৎ পতনের পথে বহুদূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল । অর্থাৎ তিনি স্পেনের পতনের বীজ রোপন করে গেলেন ।

দ্বিতীয় ফিলিপের পররাষ্ট্রনীতি : 

১) ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: 

সিংহাসনে আহরণ করার কিছু দিন পরেই দ্বিতীয় ফিলিপ ফরাসিরা দ্বিতীয় হেনরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । কারন দ্বিতীয় হেনরি পোপ চতুর্থ পলের সঙ্গে মিত্রতার স্থাপন করে ইতালি ও নেদারল্যান্ড স্পেনের প্রভাব ক্ষুণ্ণ করতে  ছেয়েছিলেন । ফিলিপ তার স্ত্রী ইংল্যান্ডের রানী মেরীর উপর প্রভাব বিস্তার করে ইংল্যান্ডকে তার পক্ষে যুদ্ধে টেনে আনেন । তিন ( ১৫৫৬-১৫৫৯ ) বছরব্যাপী যুদ্ধ চলে । অবশেষে ফ্রান্স কুইনটিন ও গ্রেভিলিনস এর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে  ১৫৫৯ সালে ক্যাটিউ ক্যামব্রিসিস এর সন্ধি মেনে নিতে বাধ্য হন । এ সন্ধির ফলে দ্বিতীয় হেনরি ইতালি ত্যাগ করতে এবং স্ত্রী সিসিলি, মিলান, নেপলসে স্পেনের  আধিপত্য স্বীকার করতে বাধ্য হন । ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় ফিলিপ ফরাসি রাজ দ্বিতীয় এলিজাবেথকে বিয়ে করেন । এ যুদ্ধের মাধ্যমে ফ্রান্স অবশ্যই ইংল্যান্ডের কাছ থেকে ক্যালে বন্দর দখল করতে সক্ষম হয়েছিল । 

২) ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিবাদ : 

এরপর দ্বিতীয় ফিলিপ নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহ দমনে লিপ্ত হন এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । কারণ :- 

ক) ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহীদের নানাভাবে সহায়তা করে ।

খ) ইংরেজ নাবিক ও স্পেনীয় নাবিকদের মধ্যে আমেরিকার বাণিজ্য নিয়ে বিবাদ ।

গ) ইংরেজ নাবিক গন কর্তিক স্পেনীয় জাহাজ লুণ্ঠন । 

ঘ) ইংল্যান্ডের রানী মেরি ছিলেন ফিলিপের স্ত্রী । তার মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডের উপর প্রাধান্য বজায় রাখার মন-মানসিকতায় এলিজাবেথকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান হয় । এতে তার বিদ্বেষভাব আরো বেড়ে যায় । 

ঙ) ফিলিপস দিলেন প্রতি সংস্কার আন্দোলনের নেতা । তাই তিনি ইংল্যান্ডে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচারে প্রয়াসী  ছিলেন । এসব নানা কারণে তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । ১৫৮৮ সালে আর্মাডা নামক অজয় এক বিরাট নৌ-বাহিনী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন । কিন্তু ইংল্যান্ডের হাতে তার বিখ্যাত আর্মাডানৌবহর বিধ্বস্ত হয় ।এর ফলে তখনকার জগতের শ্রেষ্ঠ শক্তি স্পেনের পতন ঘটে এবং স্পেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রাধান্য হারায় । সামুদ্রিক বাণিজ্য ইংল্যান্ডের হাতে চলে যায় । ইংল্যান্ড বিশ্বসেরা নেী- শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয় । 

৩) তিন হেনরির যুদ্ধ ও ফিলিপ : 

ফ্রান্সের তিন হেনরির মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে দ্বিতীয় ফিলিপ ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালান । তিন হেনরির হলো: 

ক) রাজা তৃতীয় হেনরির ছিলেন ভ্যালোস পরিবারের ( House of Valois ) সর্বশেষ রাজা এবং উদারপন্থী ক্যাথলিক।  

খ) নাভারির হেনরি ছিলেন হুগেনা (প্রোটেস্ট্যান্ট )এবং বুরবোঁ বংশদুত । 

গ)গাইজের হেনরি ছিলেন অগ্র-পন্থি ক্যাথলিক । 

রাজা তৃতীয় হেনরি প্রোটেস্ট্যান্ট নেভারির হেনরিকে তার পরবর্তী উত্তরাধিকার মনোনীত করেন । ক্যাথলিকদের নিকট এমন গ্রহণযোগ্য হয়নি । এ মনোনয়ন প্রতিরোধ করার জন্য গাইজের ডিউক হেনরির নেতৃত্বে ক্যাথলিক লীগ নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় । ফ্রান্সের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করে দ্বিতীয় ফিলিপ ক্যাথলিক লীগকে অর্থ ও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন । নেভারির হেনরি নিজ অধিকার অক্ষুন্ন রাখার জন্য অস্ত্র ধারণ করেন । ফলে ফ্রান্সে এক গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় । এ যুদ্ধ তিন হেনরির যুদ্ধে নামে পরিচিত । যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নেভারির হেনরি ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করে ফ্রান্সের সিংহাসন লাভ করেন এবং নিজ অধিকার রক্ষা করেন । ফলে ফ্রান্সের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ফিলিপের পরিকল্পনা ভেঙ্গে যায় । 

৪) তুর্কি দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ : 

দ্বিতীয় ফিলিপ এর রাজত্বকালে তুর্কি শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে । সোলেমান দে ম্যাগনিফিসেন্ট এর আমল হতেই তুর্কিরা দানিয়ুব নদী অতিক্রম করে দেশ জয় করতে শুরু করেছিল । তার পুত্র সেলিম সট পিতার নীতি অনুসরণ করে অস্ট্রিয়া আক্রমণ করেন । এ সময় পোপ  ইউরোপকে রক্ষা করার জন্য মাদ্রিদ ও ভেনিস নিয়ে একটি পবিত্র সংঘ সংগঠন করেন । ফিলিপ ও পোপ  একযোগে তুর্কি শক্তিকে প্রতিহত করতে অগ্রসর হন । তুর্কি শক্তিকে দমন করা স্পেনের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও স্পেনের উপকূল অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ প্রয়োজন ছিল । ফিলিপের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা অস্ট্রিয়ার রাজকুমার ডন জন এর নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী তুর্কি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয় । এই সম্মিলিত বাহিনী ১৫৭১ সালের লেপান্টোর যুদ্ধে সেলিম সটকে পরাজিত করে এবং তুর্কি নৌ-বহর প্রায় ধ্বংস করে দেয় । এরপর থেকে তুর্কি নেী- শক্তির পতন শুরু হয় । ইউরোপে তুর্কি শক্তি দিন দিন তাদের ক্ষমতা হারাতে থাকে । 

৫) পর্তুগাল অধিকার :

১৫৮০  সালে পর্তুগালের রাজার মৃত্যু হলে দ্বিতীয় ফিলিপ তার মাতার সাথে সবপরিবারের আত্মীয়তার সূত্রধরের সিংহাসনের দাবি করেন। তিনি আলভার ডিউক ( Duke of Alva ) এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করে পুর্তুগাল অধিকার করে নেন। ফিলিপ এর মৃত্যুর ৪০ বছর পর ১৬৪০ সালে স্পেনের দুর্বলতার সুযোগে পুর্তুগাল স্বাধীন হয়ে যায় । 

দ্বিতীয় ফিলিপের পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে , তার ধর্মান্ধতার কারণে স্পেনের সামুদ্রিক প্রাধান্য বিনষ্ট হয়ে যায় । ক্যাথলিক ধর্মের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি স্পেনকে ইউরোপের শক্তিধর রাষ্ট্র পরিণত করতে চেয়েছিলেন । এ সূত্রে ইংল্যান্ডের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয় । এ দ্বন্দ্বে তার নৌবহর ধ্বংস হয় । সামরিক আধিপত্য বিনষ্ট হয় । ফ্রান্সে তিন হেনরির অন্তর্দ্বন্দ্বে যোগদান করে তিনি স্পেনের অর্থ বল ও জনবল ক্ষয় করেছিলেন । বিনিময়ে কিছুই পায়নি । নেদারল্যান্ডে তার স্বৈরাচারী নীতির ফলে যে বিদ্রোহ দেখা দেয় তা হলেন্ডের স্বাধীনতার রূপক হিসাবে পরিণত হয় । কেবল ক্যাটো- ক্যামব্রিজের সন্ধির দ্বারা ফ্রান্সের ইতালি অধিকারের চেষ্টা ব্যর্থ করা হয় । কিন্তু যুদ্ধে তুর্কি শক্তির দমনে সাহায্য করা এবং পুর্তুগাল অধিকার দ্বিতীয় ফিলিপ এর সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে । ফিলিপের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত সাম্রাজ্যের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তার কার্য ও দায়িত্ব কে আক্রান্ত আরও জটিল করে তুলেছিল । ফিলিপের একদেশদর্শি নীতির ফলেই স্পেনের পতন শুরূ হয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 17 =