ধর্ম সংস্কার ও প্রতি সংস্কার আন্দোলন :

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন :

মধ্যযুগে ইউরোপে পোপ নিয়ন্ত্রিত সার্চ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে শোষণ, নির্যাতন করতো ।একশ্রেণীর যাজক ধর্মকে ব্যবহার করে ভোগবাদিতার মত্ত হয়ে মানবতাবিরোধী আদেশ জারি করতে থাকে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর বেশ কয়েকজন মানবতাবাদী ধর্মযাজক ও সাধক ক্যাথলিক ধর্মের এসব বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করে। খ্রিষ্টধর্মের নতুন নতুন সংস্করণ এর জন্য আন্দোলন গড়ে তোলেন । এক কথা চার্যকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য এবং প্রচলিত ধর্মীয় রীতি কে বাইবেলের মূল নীতি অনুযায়ী সংস্কার করার জন্য যে আন্দোলন করা হয়, তাই ইউরোপের ইতিহাসে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত ।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের কারণ :

১) ধর্মের নামে অধর্ম ও কুসংস্কার :

 মধ্যযুগে ইউরোপে চলত ধর্মের নামে অধর্ম । লোকজন অলৌকিক ও কুসংস্কার কে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে পৃথিবীতে চলার এবং পরকালে মুক্তির পথ খুঁজতো। অনেকের বিশ্বাস ছিল যে সকালবেলা খ্রীষ্টের উপাসনা উৎসব অবলোকন করলে সারাদিন সে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে । অনেকে  ধর্ম উৎসবের খাবার না খেয়ে জামা রেখে দিত উদ্দেশ্য যে এর ফলে দুষ্ট শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে অথবা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে ।অনেকে পবিত্র খাবার গুঁড়ো করে ফসলের জমিতে ছড়িয়ে দিত । তাদের বিশ্বাস ছিল এতে ফসল ভালো হবে । খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের অলৌকিক ক্ষমতাকে  যদু বা মায়ার সমপর্যায়ে ধরা হতো । প্রত্যেক সন্ন্যাসীর আলাদা আলাদা বিশেষত্ব আছে বলে মনে করা হতো ।যেমন চক্ষুর জন্য  সেন্ট ক্লারে , দাঁতের জন্য সেন্ট এ্যাপোলিনে , জলবসন্তের জন্য সেন্টে , স্তনের ব্যাধি থেকে নিরাময়ের জন্য সেন্টা অ্যাথাতে  প্রার্থনা করা হতো । যীশুখ্রীষ্ট বা সন্নাসীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র কে রোগ নিরাময়ের জাদুশক্তি বলে মনে করত এবং এগুলোর রমরমা বাজার ছিল। যারা ধর্ম বুঝতেন তাদের জন্য এই অবস্থা ছিল বিবৃতকর । 

২) নিষ্কৃতি পত্র বিক্রয়  : 

যাজক শ্রেণি ধর্মবিশ্বাসী জনসাধারণের জ্ঞানের অভাবের সুযোগ নিয়ে তারা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করত । আত্মার মুক্তির জন্য ইনডালজেন্স নামক এক প্রকার ছাড়পত্রের কেনাবেচা হতো ।

ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বে ইনডালজেন্স হচ্ছে পোপ কর্তৃক ইস্যুকৃত এক ধরনের মুক্তিপত্র যার দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পাপ ইহকালে ও পরকালে মিটে যায় এমন আশ্বাসের ছাড়পত্র । যাকে বলে পাপমোচনের ছাড়পত্র । অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি করা হতো । একাদশ শতাব্দীতে জনসাধারণকে ক্রুসেডে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে প্রথা চালু করেছিলেন । ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ চতুর্থ সিক্সটাস, ঘোষণা করলেন যে,  ইনডালজেন্সর সুবিধা এখন জীবিত এবং মৃত ব্যক্তি উভয়ই লাভ করতে পারবে । এর অর্থ হল এটা কেবল জীবিত ব্যক্তি কে তার পাপ থেকে মুক্তি দেবে না । উপরন্তু তার আত্মীয়স্বজন কেউ পরকালের কঠিন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে । অনেকে বউ ছেলেমেয়েকে পরিবারকে অসহায় রেখে ঘর বাড়ি বিক্রি করে এ ইনডালজেন্স ক্রয় করত । আর যাজকরা পাপ কাজ   না করার পক্ষে যুক্তি না দেখিয়ে কিভাবে অর্থ দিয়ে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সে বিষয়ে যুক্তি দেখাতো । এতে পাপকর্ম না কমে বরং বৃদ্ধি পেত । খ্রিস্টধর্মে চাচাতো বা মামাতো বোন বিয়ে করা নিষিদ্ধ হলেও টাকার বিনিময় গির্জায় সম্মতি পাওয়া যেত । তালাক নিষিদ্ধ থাকলেও টাকার বিনিময়ে তালাকের অনুমতি পাওয়া যেত । এসব অপকর্মের চার্চের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে । 

৩) নৈতিক অধঃপতন :

যাজক শ্রেনীর জীবনযাত্রা কোন কোন ক্ষেত্রে অভিজাত শ্রেণী অপেক্ষায় বস্তুবাদী ছিল । তারা ধর্মের নামে অধর্ম কর্মে লিপ্ত ছিল । নানা দেশ থেকে অর্থ রোমের ক্যাথলিকদের ধর্ম স্থানে আসতে লাগলো । এতে তারা বিলাসিতা ও ইন্দ্রিয় -পরায়ণতায় নিমজ্জিত হতে লাগলো । আর এর সাথে অর্থ চাহিদা ও বাড়তে থাকল । এতে যাজকদের প্রতি সাধারণ মানুষের অভক্তি জেগে উঠতে লাগলো । 

৪) অর্থনৈতিক কারণ :

রাষ্ট্র ও ধর্ম স্থানের দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ কারণ এই ছিল অর্থনৈতিক কারণ । পোপ নিয়ন্ত্রিত চার্চ টাইদ, এ্যানেট ইত্যাদি নানা প্রকার ধর্মকর বিভিন্ন দেশের লোক ও ধর্ম প্রতিষ্ঠান থেকে আদায় করা হতো । যাজকদের বিলাসী ও ইন্দ্রিয়- পরায়ন জীবন-যাপনের ফলে এসকল অর্থর  দাবী দিনদিন বেড়েই চলেছিল । মধ্যযুগে ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের এর দাবি অস্বীকার করার মত জ্ঞান বা মানসিক বল সাধারণ মানুষের ছিল না । কিন্তু ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব যখন জেগে উঠে তখন তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে ।জনগণ নিজ দেশের অর্থ অন্য দেশে পাঠাতে আর রাজি হচ্ছিল না, সে সাথে রাজা গণ । 

৫) রাজনৈতিক কারণ : 

ক্ষমতার প্রাধান্য নিয়ে ধর্মযাজক ও রাজাগণ এর মধ্যে সংঘাত শুরু হয় । পোপ ও যাজক সম্প্রদায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দাবি করলে প্রত্যেক দেশের রাজা এবং জনগন নিজ নিজ দেশকে ধর্মানুষ্ঠানের প্রাধান্য থেকে মুক্তি করার চেষ্টা করতে থাকেন । এতে প্রত্যেক দেশেই জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পেতে লাগল । 

মধ্যযুগের শেষ দিকে প্রত্যেক দেশের জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠা শুরু করল । ধর্মের জগত ছেড়ে বাস্তবের উপর প্রাধান্য দাবি করে যাজক সম্প্রদায় জাতীয় রাজাদের বিরাগভাজন হন । এতে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন গতি পায় । 

৬) মানবতাবাদী সাধকদের আর্বিভাব :

ইউরোপের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পেছনে মানবতাবাদী ধর্মযাজক ও সাধকদের অবদান অপরিসীম । এই সকল সাধকেরা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য মানুষকে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন । ক্যাথলিক ধর্মের অনাচারের বিরুদ্ধে মানবতাবাদীরা লেখকরা যেমন : পের্ত্রক  বোককাচো, লিওদার্দো দ্যা ভিঞ্চি , রাফায়েল, মাইকেল এ্যাঞ্জেলো, টিশিয়ান, ইরাসমাস, জোহান রিউচলিন প্রমূখ কলম ধরেন। কিন্তু তারা রোমেরএর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চাননি । রোমের পোপ এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্যাথলিক ধর্ম সংস্কার করে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ সময় কিছু লোকের আর্বিভাব হয় । যেমন জার্মানিতে মার্টিন লুথার, সুইজারল্যান্ডে জুইংলি, ফ্রান্সে ক্যালভিন ইত্যাদি ধর্মগুরুর আর্বিভাব ঘটে । ক্যাথলিকরা পোপএবং যাজকদের অবান্তর ঊর্ধ্বে এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করত এবং তাদের মাধ্যমেই ঈশ্বর লাভ করা যায় একথা বিশ্বাস করত । অপরদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মগ্রন্থ বাইবেল কে অবান্তর মনে করত এবং বিশ্বাস করতে ব্যক্তি চেষ্টা করে আত্মার মুক্তি পেতে পারে । লুথারবাদ, ক্যালভিনবাদ,  জুইংলিবাদ, এ্যানাব্যাপটিজম, এ্যাঙ্গলিকানিজম ইত্যাদি ধর্মমত প্রোটেস্ট্যান্টবাদের অন্তভুক্ত । ধর্ম সংস্কারকগন প্রচলিত ক্যাথলিক  ধর্ম মতবাদের উপর আস্থা হারিয়ে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি কে সন্তুষ্ট করতে পারে এমন ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করতে থাকে । এই নিয়ে খ্রিস্টজগত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । রক্তারক্তি হানাহানি জীবনের আবেগপ্রবণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । 

 ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলাফল :

১) ধর্মীয় ফলাফল:

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন খ্রিস্টান চার্চে বিভক্তি আনয়ন করে । চার্চের সর্বজনীনতাকে   প্রত্যাখান করে । খ্রিস্টান জগতের এক বৃহৎ অংশ পোপের আনুগত্য থেকে বের হয়ে আসে এবং অন্য দল চার্চের প্রতি আনুগত্যশীল থাকে । যারা ক্যাথলিক চার্চের প্রতি অনুগত ছিলেন তাদের বলা হতো রোমান ক্যাথলিক । যারা পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন তাদের বলা হয় প্রোটেস্ট্যান্ট । জার্মানি, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, প্রতিবাদী ধর্ম গ্রহণ করে । অপরদিকে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, রোমান ক্যাথলিক ধর্মের প্রতি অনুগত থাকে । ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পর খ্রিস্টধর্ম অধিকতর উদার ও যুক্তিবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে । ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয় গ্রুপ এই যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দানের মাধ্যমে তাদের ধর্মের মূলনীতি ও তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে এগিয়ে আসে । প্রোটেস্ট্যান্ট নেতারা ছিলেন মনেপ্রাণে মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী । অন্ধত্বের মুক্তি ছিল এদের মূল মন্ত্র । কিছু সুনির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসন দ্বারাে এ মতবাদ পরিচালিত হয় ।মধ্যযুগের ধর্ম বিষয়ে কোন স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত মতামত পোষন করা সম্ভবপর ছিল না । ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে গোঁড়া ক্যাথলিকরাও তাদের গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসে । ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইউরোপে আরও একটি ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয় যা প্রতি সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত । 

২) রাজনৈতিক ফলাফল: 

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন পোপতন্ত্রকে দুর্বল করে রাজতন্ত্রকে সবল করে। ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টি হয় । এমন এক সময় ছিল যখন পোপেরা সহজে রাজাদের সকল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন । সংস্কার আন্দোলন যাজকদের হাত থেকে রাজাদের মুক্তি করে।  রাজারা ক্রমশই রাষ্ট্র ও চার্চের  উপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।  Divine Rights of Pope এর স্থলে Divine Right of King প্রতিষ্ঠিত হয়। Secular চিন্তা বিকাশ লাভ করতে থাকে ।

৩) অর্থনৈতিক ফলাফল : 

সংস্কার আন্দোলনের ফলে চার্চের অধীনস্ত বিশাল সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে চলে আসতে থাকে এবং উন্নয়নমূলক কাজে তা ব্যবহার হতে থাকে । জনগণ জাযক শ্রেণীর শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়। ক্যাথলিক ধর্ম মত পুঁজিবাদ ও সুদ কারবারি বিপক্ষে ছিল । পক্ষান্তরে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ পুঁজিবাদ সুদের পক্ষে ছিল।ফলে ব্যাংকার, বণিক, কারখানা এর মালিক ইত্যাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটতে থাকে । ক্যাথলিকরা যেখানে সুদকে পাপ মনে করত প্রোটেস্ট্যান্ট রা সেখানে সুদকে আধুনিক বাস্তবসম্মত মনে করে । ফলে দ্রুতগতিতে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রচারিত প্রসারিত হয় সেখানে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে । 

৪) সামাজিক ফলাফল :

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে পিউরিটানবাদের উদ্ভব হয় তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক চরিত্রের উন্নতিসাধন । ইনকুইজিশনের মাধ্যমে চরম শান্তির স্থলে মানবিক শান্তির ব্যবস্থা করা হয় । যাদুবিদ্যার প্রভাব কমতে থাকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। স্কটল্যান্ডে জনলক্স প্রতিটি প্যারিতে একটি পাঠশালা , প্রতিটি মফস্বল শহরে একটি স্কুল, প্রতিটি বড় শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলেন । নারীদের সামাজিক শিক্ষার পথ উম্মুক্ত করা হয়।  নারীরা বাইবেল পড়ার অনুমতি পায়। পুরুষ-নারী উভয়েই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পায়। ফলে নারী ও পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়তে থাকে। অপরদিকে বাইবেলের বহুল প্রচার ও প্রসারের ফলে সৎও সংযত জীবনের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়। ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির ফলে ন্যায় পরায়নতা বৃদ্ধি পায়। এতে পেপের অনৈতিকতা ও শোষণ নীতির অবসান ঘটে । 

৫) শিল্প ও সাংস্কৃতিক ফলাফল:

বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলন হলেও বিজ্ঞান, মুক্ত বুদ্ধির চর্চা ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় নানাবিধ প্রভাব রাখে । প্রচলিত বিশ্বাস ও ধর্ম ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে ।ভৌগলিক আবিষ্কার আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং সব কিছুকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় । এই সময়ে মানবতাবাদীরা হিউম্যানিস্ট দার্শনিকরা Classical বা প্রাচীন গ্রিকদের জ্ঞান- বিজ্ঞানের উপর নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে জ্ঞানের জগতকে বৃদ্ধি করার কথা বলেন । বৈজ্ঞানিক তথ্যের উদ্ভাবনের ফলে দর্শনের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন সূচিত হয় । ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে ছাড়াও ইতিহাস, ভূগোল, নৈতিকতা, আধুনিক ভাষা শিক্ষা, পদার্থবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, গণিত ,আইন, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান চর্চা হতে থাকে । অথচ পূর্বে ধর্মীয় শিক্ষাকে জ্ঞানচর্চার একমাত্র উপায় মনে করা হতো । আগে ইতিহাস লেখা হত সাহিত্যের ঢংয়ে । সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে ইতিহাস লেখার প্রচলন হয় আধুনিক তথ্য ও উপাত্ত যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে । আর শিল্পকলার ক্ষেত্রে পুরনো গথিক রীতির পরিবর্তে বারূক রীতি প্রচলিত হয়, যা স্থাপত্য-শৈলীর নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে । 

উপরে উল্লেখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রোটেস্ট্যান্ট প্রভাবিত ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । পোপের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব হয় । এতে জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটে । পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ হয় ।সাহিত্য শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শুধু সংস্কার নয় বরঞ্চ সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুগউপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক যুগের উত্তরন কে নিশ্চিত করেছিল এই ধর্ম সংস্কার আন্দোলন  ।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের মার্টিন লুথারের অবদান বা ভূমিকা :

মার্টিন লুথার প্রচলিত খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মের মধ্যে অনাচার-অবিচার কুসংস্কারের, দুর্নীতি, ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা প্রভেূতি দেখে প্রতিবাদমুখর হয়ে ছিলেন । তিনি ছিলেন সেন্ট অগাস্টিনের অনুসারী ।  সেন্ট অগাস্টিনের সমর্থন করে তিনি ও বলেছিলেন যে ধর্মের বাহিক্য আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা মানুষ রক্ষা পেতে পারেনা বা ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান এর উপর মানুষের পারলৌকিক মুক্তি নির্ভর করে না ।ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের উপরেই মানুষের মুক্তি নির্ভর করে । তাই বিশ্বাসের স্থান সর্বাগ্রে ।তিনি বলেন যে ঈশ্বরের কঠোর শাসন বা শাস্তি দ্বারা মানুষের আত্মার মুক্তি মিলবে না।ঈশ্বরের দয়াতেই মানুষের মুক্তি মিলবে ।লুথারের মতে,  যাজকরা নয় ধর্মগ্রন্থই (বাইবেল ) মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেবে। তাই তিনি বলতেন যে চার্জের আচার-অনুষ্ঠান বা ঐতিহ্যের চেয়ে বাইবেলের আক্ষরিক অর্থ কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে । আর সকল বিশ্বাসী ব্যক্তি এই ঈশ্বরের প্রতিনিধি।  প্রত্যেক ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত । পূর্বে মনে করা হতো যজকরাই শুধু ঈশ্বরের দূত বা প্রতিনিধি। লুথারের এসব বক্তব্যের ফলে বাস্তব ধর্মে অনেক পরিবর্তন হলো ।যেহেতু লুথার লৌকিকতা বা আচার পালনে আতিশয্যকে  সমর্থন করেনি। সেহেতু প্রচলিত উপবাস, তীর্থযাত্রা, স্বারক চিহ্নর প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যদি প্রবর্তিত ধর্মের বাতিল হল ।

শিশু জন্মের পর তার পাপ মুক্তির অনুষ্ঠান বা ব্যাপ্টিজম এবং রুটি ও মদ প্রার্থনার পর অলৌকিকভাবে যীশুর রক্তমাংসে পরিণত হয় যা ইউখারিস্ট নামে পরিচিত এ সমস্ত আচারে এমন অলৌকিকত্ব নেই যা ঈশ্বর থেকে দয়া আনতে পারে । 

লুথার ল্যাটিন এর পরিবর্তে ভাষা ‍হিসাবে  মাতৃভাষা নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। তিনি আরও বলেন যে যাজকদের যেহেতু অলৌকিক ক্ষমতা নেই তাই তারাআধ্যাত্মিক উপদেষ্টা মাত্র ঈশ্বরের দূত নয় ।পোপ বা অন্য কারও হাতে স্বর্গের চাবি নেই।  মন্ত্রতন্ত  বা সন্ন্যাসবাদ এর কোন দরকার নেই।  সাধারণ মানুষ আর যাজকদের মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত নেই।  তাই যাজকরা ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পারেন । তিনি নিজে ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে একজন স্ত্রী গ্রহণ করেন । লুথার তার তথ্যের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন । ১৫১৭ সালে এমন এক ঘটনা ঘটলো যে , তিনি প্রচলিত ধর্মের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন এবং জার্মানির মেইনজের আর্চবিশপ আলবার্ট অর্থ তোলার উদ্দেশে ( রোমের সেন্ট টিটারের গির্জার সংস্কারের জন্য ) ইনডালজেন্স বা মুক্তি পত্র বিক্রয় শুরূ করলেন ।টেটজেল নামক এক যাজক এ অনুমতি পত্র জার্মানিতে বিক্রি শুরু করেন । টেটজেল জনগণকে ধারণা দিয়েছিলেন যে, ইনডালজেন্স ক্রয় করলে পাপের জন্য অনুশোচনা কোন ব্যক্তি নিজে বা তার মৃত আত্মীয় স্বর্গে যেতে পারবে।  টেটজেলের এমন প্রচারণা লুথারের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না । তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ১৫১৭ সালের ৩১  অক্টোবর উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গির্জার দরজায় 35 দফা  একটি প্রতিবাদ পত্র পেরেক দিয়ে লাগিয়ে দেন।  এ কাজের মাধ্যমে তিনি সূচনা করলেন প্রতিবাদী খৃস্ট ধর্মের বা  প্রোটেস্টানিজমের । লুথার তার প্রতিবাদ পত্রটি ল্যাটিন এর পরিবর্তে জার্মান ভাষার লিখেছিলেন। তিনি আরও বলেন যে, পোপ ও  যাজক কেউ ভুলের উর্ধে নয়। এতে পোপ, যাজক ও তাদের সমর্থকরা লুথারের তার বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য ডেকে পাঠা । এতে লুথার পিছু হাঁটার পরিবর্তে আরো সাহসী হয়ে উঠেন । শুরু হলো লুথার পন্থী ও ক্যাথলিক পন্থীদের মধ্যে বিরোধ, মারামারি ,যুদ্ধ ।১৫১৯ সালের লিপজিগের ঘোষনা , ১৫২১ সালে ওয়ার্মসের সভা , ১৫৩০ সালের অগসবার্গের স্বীকারোক্তি এর্ব সর্বশেষে ১৫৫৫ সালের অগসবার্গের সন্ধি বা শান্তি চুক্তির মাধ্যমে লুথার প্রবর্তিত প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম স্বীকৃতি লাভ করে । জার্মানি তথা ইউরোপের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ধর্ম মতে রূপান্তরিত হয় । 

পরিশেষে বলা যায় যে মাটির লুথার ছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রেরণার উৎস।  তার পূর্বে বা তার সময় অনেক মানবতাবাদি ধর্ম সংস্কার চেয়েছেন ।কিন্তু রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি।  কিন্তু লুথার রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন।  মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান তথ্যকে ভেঙ্গে দিয়েছেন । ধর্মসংস্কার আন্দোলন করে এবং সে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সফল হয়েছেন । নতুন ধর্মমত প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।  অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে তিনি তার ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের জনগণের সমর্থন পেয়েছিলেন। যাহোক ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের ভূমিকা অবদান চিরস্মরণীয় এবং অপরিসীম । 

প্রতিসংস্কার আন্দোলন:

প্রতিসংস্কার আন্দোলন ছিল ক্যাথলিক ধর্মমতের পুনরুজ্জীবন ঘটানোর আন্দোলন । ক্যাথলিক ধর্ম অনাচার , অত্যাচার,  দুর্নীতি,  ভরে গেলে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্মসংস্কার আন্দোলন তথা প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে । এমত অবস্থায় রোমান ক্যাথলিক চার্চ নিজেরাই নিজেদের অসংগতি, অনাচার, দুর্নীতি ,ও গ্রাফি- লতি দূরীকরণের লক্ষ্যে এক নতুন আন্দোলন গড়ে তোলেন, ইউরোপের ইতিহাসে এটি প্রতি সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। ষোড়শ শতাব্দীতে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পর প্রতি সংস্কার আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল । 

প্রতিসংস্কার আন্দোলনের উদ্দেশ্য: 

ক) ক্যাথলিক চার্চের এর বিরুদ্ধে প্রধান প্রধান অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং ক্যাথলিক চার্চের এর সকল অন্যায় ,অত্যাচার, অসংগতি, দুর্নীতি অনৈতিকতা দূরীকরণ করা ।

খ) ক্যাথলিক ধর্ম মতের মধ্যে সত্যিকার অর্থে আধ্যাত্মিক , অপার্থিব এবং পবিত্রাকে ভালোকরে জাগিয়ে তোলা ও , 

গ) যে সমস্ত অঞ্চলের জনগণ ক্যাথলিক ধর্ম ত্যাগ করে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদেরকে পুনরায় ক্যাথলিক মতবাদে ফিরিয়ে আনা । 

এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেসব কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল অবিশ্বাসীদের শাস্তিদান, সংস্কারমূলক কর্মকান্ড এবং সমাজ সেবামূলক কর্মকান্ড। ক্যাথলিক ধর্ম বিচ্ছেদের  শাস্তিদানের জন্য ইনকুইজিশন এবং সংস্কার ও সেবামূলক কর্মকান্ডের জন্য সোসাইটি অব জেসুইট( Society of Jesuite ) গঠন করা হয় ইত্যাদি । 

প্রতিসংস্কার আন্দোলন বিকাশের প্রধান কারণ সমূহ :

১) প্রটেস্ট্যান্টদের  অন্তঃকলহ : 

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।  কিন্তু তাদের বিভিন্ন দল এবং উপদলের মধ্যে দলাদলি, অন্তঃকলহ, গৃহযুদ্ধ অনৈক্য দেখা দেয় ।এ সুযোগে ক্যাথলিকরা  নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে । জনগণ বুঝতে পারে রোমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারী ধর্মীয়মতাদর্শে সত্যিকার অর্থে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি । প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমত ও একটি আদি অকৃত্তিম খ্রিস্ট ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয় । ক্যাথলিক রাজারাও ক্যাথলিক ধর্মের পুনরুদ্ধারের সর্বশক্তি নিয়োগ করে । এ সময়কার ক্যারাফা, ইগনেসিয়াস লয়লা , ল্যাইনেজ, জেভিয়ার প্রমূখ মানবতাবাদী সংস্কার ও শিক্ষায় বিশ্বাসী। তারা ক্যাথলিক ধর্মমতের  প্রতি অনুগত ছিলেন। ফলে প্রতি সংস্কার   আন্দোলন জোরদার হয় ।

২) চরিত্রবান পোপদের আর্বিভাব: 

ষোড়শ শতাব্দীতে কতিপয় ধর্মপরায়ণ এবং চরিত্রবান পোপের আর্বিভাব ঘটে । তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দৃঢ়তা প্রতিসংস্কার ক্ষেত্রে এক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।  তারা সকল প্রকার অনাচার ,দুর্নীতি থেকে মুক্তি ছিলেন এবংখ্রীষ্টের আদেশের অনুকরণে নৈতিক মান উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন ।পোপদের  মধ্যে তৃতীয় পল ,চতুর্থ ও পঞ্চম পায়াস এবং ষোড়শ সিক্সটাস ছিলেন উজ্জ্বল চরিত্রের অধিকারী ।

  এভাবে ক্যাথলিক চার্জ যখন আত্মশুদ্ধির জন্য সংশোধনের পথে এগিয়ে আসে তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রেরণা ও আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং তারা চার্চের প্রতি সমর্থন করে ।

৩) ইনকুইজিশন : প্রতি সংস্কার আন্দোলন বিকাশের ওপর একটি যন্ত্র ছিল ইনকুইজিশন । ক্যাথলিক ধর্ম মতে অবিশ্বাসীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এর কাজ। এটা ছিল এক ধরনের আদালতে।এই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ ছিল না ক্যাথলিক মতবাদ এর দোষ প্রমাণিত হোক বা না হোক তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হতো যে কোন শাস্তি দেওয়া হতো । ১৫৪২ সালে পোপ পল ( Supreme Tribunal of Inquisition ) গঠন করেন । এর শাস্তি প্রক্রিয়া ছিল নিষ্ঠুর, নির্দয় ও বর্বর ।এতে জনপ্রিয়তা হ্রাস পেলেও ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা জন্য এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমতকে রুখে দেওয়ার জন্য ইনকুইজিশন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল । 

৪) ট্রেন্টের ধর্মসভা : প্রতিসংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে কাউন্সিল অব টেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এ সভায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ক্যাথলিক চার্চের  এর ত্রূটি  দূরীকরণ এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গৃহীত হয় । পোপ তৃতীয় পল পোপতন্ত্রের বিভিন্ন সংস্কার আনার ক্ষেত্রে ১৫৪২  খ্রিস্টাব্দে কাউন্সিল আহ্বান করেন । দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।  অস্ট্রিয়ার ট্রেন্ট নামক রাজকীয় শহরে এ সভা অনুষ্ঠিত হয় বলে এর নাম হয়েছে ট্রেন্টের ধর্মসভার ।এ সভাগুলোতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তা নিচে দেওয়া হল :

ক) রোমান ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ প্রভু এবং একমাত্র গ্রহণযোগ্য কর্তৃপক্ষ  হিসেবে স্বীকৃত হয়।তিনিই হবেন খ্রিস্টানদের প্রধান ব্যাখ্যাকারী। বিশপ  ও যাজকরা  তার অধীনস্থ হিসাবে ঘোষিত হয় ।

খ) প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের লোকদের সাথে  কোন আপস করা যাবে না ।

গ) চার্চের দুর্নীতিও অনাচার দূরীকরণের লক্ষ্যে কিছু নিয়ম নীতি বলবৎ করা হয় । 

ঘ) যাজক ও বিশপদের  অজ্ঞতা দূর করতে নিয়মিত ধর্ম বিষয়ক সেমিনার এবং ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় এবং তাদের নৈতিক উন্নতি সাধনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয় । 

ঙ) এ ধর্মসভা নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা বের করে এবং খ্রিস্টানদের জন্য তা পঠন পাঠন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । 

এভাবে ট্রেন্টের ধর্মসভা প্রতিসংস্কার আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে ।

৫) জেসুইট সংঘ : 

যে কারণে প্রতিসংস্কার আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তা হল জেসুইট সংঘ । ইগনেসিয়াস লয়লা (১৪৯১-১৫৫৬) জেসুইট সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । প্রথম জীবনে তিনি সৈনিক ছিলেন । যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে শেষপর্যন্ত পঙ্গু হয়ে পড়েন । ওই অবস্থায় তিনি খ্রিস্ট ধর্মের সেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন । তার লেখা “ The Spritual Exercise “ বইটি জেসুইটরা  খ্রিস্ট ধর্মের (Hand book ) বলে মনে করেন। 

এ সংঘ ধর্মনীতি মেনে চলত । 

ক) চারিত্রিক পবিত্রতা খ ) স্বেচ্ছায় দারিদ্র বরণ এবং গ) আঞ্জানুবর্তিতা । 

নিজের ব্যক্তিত্বকে সংঘের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বিলিন করে দেওয়াই ছিল এর  উদ্দেশ্য । ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে পোপ তৃতীয় পল এ সংঘকে স্বীকার করে নিলে তারা পোপের আদেশ পালন করাকে তাদের চতুর্থ নীতি হিসেবে গ্রহণ করে । 

এছাড়াও এ সংঘের আরো কয়েকটি লক্ষ্য ছিল :

ক) তরুণদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা ।

খ) বিভিন্ন অনুশীলনী ও চর্চার মাধ্যমে খ্রিষ্টান সমাজের ধর্মীয় আন্তরিকতা ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করা ।

গ) ক্যাথলিক ধর্ম হতে যারা বেরিয়ে গিয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের দীক্ষা নিয়েছে  তাদেরকে ক্যাথলিক ধর্মের ফিরিয়ে আনা । 

তবে তারা বেশি সাফল্য লাভ করে শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে।  ইউরোপের বাইরে ভারত,চীন, বাজিল উত্তর দক্ষিণ আমেরিকায় ৩০০০ স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এর সংঘের কারনে এর  ফলের শিক্ষা ও সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে ইউরোপের প্রতি সংস্কার আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে । 

প্রতিসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব /তাৎপর্য/ ফলাফল :

১) ক্যাথলিক ধর্মের পুনরুজ্জীবন : 

প্রতি সংস্কার আন্দোলনের ফলে ক্যাথলিক ধর্মমতের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ক্যাথলিক ধর্মের সকল অনাচার-অবিচার দূরীভূত হয় । ক্যাথলিক চার্চের অন্তর্নিহিত নীতিবাক্যের ভাব-গম্ভীর অনুষ্ঠান ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা প্রভাব বিস্তার সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয় । তাছাড়া শ্রদ্ধা ভক্তি রূপে সংরক্ষিত সাধুদের দেহের অংশ বা তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রতিমা প্রতিমূর্তি এর উপর পবিত্র ভাবে জাগিয়ে তোলা হয় । তবে ইনডালজেন্স বা মুক্তিপত্র বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। চার্চের নিয়ম আবর্তিত শৃঙ্খলা আইন বা সংবিধান মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় । বিশপ ও  যাজকদের অজ্ঞতা দূর করার জন্য সেমিনার ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয়। পোপের  ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্যাথলিক চার্চের খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর কাছে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয় । 

২) প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমতের অগ্রগতি ও পবা হ্রাস: 

প্রতি সংস্কার আন্দোলনের ফলে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম মতের অগ্রগতি ও প্রভাব কমতে থাকে । শিক্ষামূলক ও সেবামূলক সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জেসুইট পিতারা রোমান ক্যাথলিক চার্চকে মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলে ।  জেসুইট দের সহজ সরল অকপট সাধারণ জীবনযাপন উদার চিন্তা এবং আবেগপূর্ণ প্রচারণার অনেকেই আবার ক্যাথলিক চার্চের ফিরিয়ে নিয়ে আসে । বিশেষ করে বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ব্যাভারিয়া, চেকোশ্লাভাকিয়া, হাঙ্গেরি, স্পেন,নেদারল্যান্ডস এমনকি দক্ষিণ জার্মানিতে ও ক্যাথলিক ধর্মমত আবার স্বমহিমায় ফিরে আসে । 

৩) আন্তর্জাতিক ধর্ম হিসাবে ক্যাথলিক ধর্ম মতের প্রতিষ্ঠা লাভ : 

 জেসুইট পিতারা বিশ্বের প্রায় সকল দেশে এবং মহাদেশের শ্রেষ্ঠ ধর্ম বিশেষত ক্যাথলিক ধর্ম মত ছড়িয়ে দিতে শুরু করে ।যারা খনিতে, আবাদি জমিতে, জমিদার শ্রেণীর বড় সম্পত্তিতে কিংবা উপনিবেশিক অঞ্চলে কাজ করত তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল । শ্রেণী বিভক্তি বা বর্নাশ্রী সমাজে নিচু বর্ণের অস্পৃর্শ্য জাতিচ্যুত ফেনীর দলে দলে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। এভাবে ইউরোপে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কাছে তাদের অবস্থান হারালেও ইউরোপের বাইরে এসে মিশনারী প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচার করে একে আন্তজাতিক ধর্ম রূপে প্রতিষ্ঠা করে । 

৪) ইউরোপের দেশে দেশে ধর্মীয় বিদ্রোহ গৃহযুদ্ধ: 

প্রতিসংস্কার আন্দোলনের ফলে প্রোটেস্ট্যান্টপন্থী ও ক্যাথলিক পন্থীদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সংঘাত এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে তাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় বিদ্রোহ গৃহযুদ্ধ দেখা দেয় । এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর তাদের ঘৃণা বিদ্বেষ ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দিতে দ্বিধা করত না ।প্রজারা বাধ্য না হলে তারা নিষ্ঠুর নির্যাতন হত্যার সম্মুখীন হতো । এতে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ,পর্তুগাল সহ অনেক দেশে প্রোটেস্ট্যান্টরা নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয় ।আবার ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডে ক্যাথলিকরা নির্যাতনের শিকার হন ।এক পক্ষ অপর পক্ষকে পুড়িয়ে মারতো।  এভাবে প্রতিসংস্কার আন্দোলন দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ রক্তপাত হত্যা ও ধ্বংস ডেকে আনে । 

৫) জেসুইটদেব তৎপরতা ও শিক্ষা বিস্তার :

সোসাইটি অব জেসুইট ধর্ম প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা  দেখিয়েছিল । তবে যে ক্ষেত্রটিতে জেসুইটরা সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করেছিল তা হলো শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে তাদের কর্মক্ষেত্রকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া ।জেসুইটদের  মূল স্লোগান ছিল ”আপনার শিশুকে স্কুলে পাঠান ” । ধর্ম ছাড়াও নানা বিষয়ে যেমন শরীরচর্চা ,ভূগোল, ইতিহাস, দর্শন ,সাহিত্য, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ,আধুনিক ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত । এরা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করে । এরা বিভিন্ন দেশে এবং মহাদেশের ৩০০০ স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে । জেসুইটরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অধ্যাপক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ফলে তাদের চিন্তা-চেতনার সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । 

৬) নারী শিক্ষার প্রসার :

প্রতিসংস্কার  আন্দোলন নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ক্যাথলিক ধর্ম প্রসারের ক্ষেত্রে নারীরা বাইবেল পড়ার অনুমতি এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্ম করার সুযোগ পায় । সেন্ট থেরেসা অব আফিল ( ১৫১৫-১৫৮২) সন্ন্যাসী পাদ্রীদর নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন । উরস্যালিন ও সিসটারস অব চ্যারিটি ছিল উল্লেখযোগ্য নারী সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ।  উরস্যালিনর এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্রেসিয়ার এ্যানঝেলা মেরি । এ সংগঠন কে তৃতীয় পোপ তৃতীয় পল অনুমোদন দেন । মেয়ে শিশুকে শিক্ষা ও যত্ন করা এবং অসুস্থদের সেবা করার ক্ষেত্রে এ সংগঠন বিশেষ অবদান রাখে । এভাবে নারীদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন গ্রুপ ও সংগঠনের মাধ্যমে নারী শিক্ষার হার এবং সমাজ সেবামূলক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায় । 

প্রতি সংস্কার আন্দোলন ছিল প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রতিবাদস্বরূপ । প্রোটেস্ট্যান্ট দের হাত থেকে ক্যাথলিক ধর্ম রক্ষা করার জন্য এ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে । এতে ক্যাথলিক ধর্মের ভিতরে যে অনিয়ম, অনাচার দুর্নীতি ছিল তা দূরীভূত হয় এবং ক্যাথলিক ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটে। চার্চের স্বেচ্ছাচারিতা ও বিলাসবহুল জীবনের লোপ পায় । চার্চের নিয়মানুবর্তিতা শৃঙ্খলা  আইনের মাধ্যমে গৃহীত হয় । শিক্ষা ও সেবামূলক বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় । এতে ক্যাথলিক ধর্মের প্রসার ঘটে এবং এটি একটি উন্নত ও বিশ্ব- ধর্মের পরিণত হয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

39 − 35 =