পঞ্চম চার্লস ও দ্বিতীয় ফিলিপ :

সম্রাট পঞ্চম চার্লস এর শাসন ( ১৫১৬-১৫৫৫) 

ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের ইতিহাসে সম্রাট পঞ্চম চার্লস ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তি । ইউরোপের ইতিহাসে সম্রাট শার্লেমান ভিন্ন অন্য কোন সম্রাটের পঞ্চম চার্লস ন্যায় এত বড় বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন না  । তার সম্রাজ্য ইউরোপ আফ্রিকা এবং আমেরিকায় বিস্তৃত ছিল।  এজন্য তার সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্ত যেত না । তার সাম্রাজ্য যেমন ছিল বিশাল তদ্রূপ তার সমস্যা ছিল বহুবিধ । 

তার পরিচয়: 

সম্রাট ছিলেন স্পিনরাজ ফার্ডিনান্ডের দেীহিত্র, অস্ট্যিয়ার রাজা ম্যাক্সিমিলিয়ানের পেীত্র এবং নেদারল্যান্ডের ডিউকের  পুত্র । তার পিতার নাম ফিলিপ দি ফেয়ার এবং মাতার নাম জোয়ানা । পিতার মৃত্যুর পর তিনি নেদারল্যান্ডের শাসনভার প্রাপ্ত হন । তাঁর পিতামহ ম্যাক্সিমিলিয়ানের মৃত্যুর পর তিনি অস্ট্রিয়ার সিংহাসন প্রাপ্ত হন। মাতামহ  ফার্ডিনান্ডের  মৃত্যুর পর তিনি স্পেন, সিসিলি, স্পেন অধিকৃত আমেরিকা এবং আফ্রিকার তিউনিসিয়া অধিকার লাভ করেন । ১৫১৬ সালে যখন তিনি স্পেনের রাজা হন তখন তিনি প্রথম চার্লস নামে পরিচিত ছিলেন। ১৫১৯ সালে জার্মানির ইলেকট্রন কর্তৃ রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হয়ে তিনি পঞ্চম চালর্চ উপাধি ধারণ করেন । পঞ্চম চার্লস যোগ্যতার দিক দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট তাদের উপযুক্ত ছিলেন না। তার কোন সামরিক প্রতিবা বা উদ্ভাবনী শক্তি কিছুই ছিল না ।  তার দেহসৌষ্ঠব রাজোচিত  ছিল না। তবে তিনি অপরের কথা শ্রবন করতেন। তার ধৈর্য ছিল অপরিসীম এবং সাহস ছিল বীরোচিত ।  সিংহাসন লাভের পর থেকে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল । 

তার সমস্যা ও দায়িত্ব : 

সম্রাট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর পঞ্চম চার্লস এর দায়িত্ব যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয় । সেগুলো কে মোকাবেলা করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়। 

১) স্পেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য রক্ষা করা এবং নিরাপদ রাখা । 

২) ইতালি ও স্পেনে উপকূল মুসলমান জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা । 

৩) দানিয়ুব অঞ্চলে তুর্কি শক্তির বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা করা ।

৪) ইতালিতে ফরাসিরাজ ১ম ফ্রান্সিসের অভিযান ব্যর্থ করা ।

৫) নেদারল্যান্ডের শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা । 

৬) জার্মানিতে নিজ প্রাধান্য রক্ষার্থে লুথারবাদ বা প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ দমন করা প্রভৃতি । 

এরকম বহুবিধ সমস্যা তার দায়িত্ব কে বহুগুণ জটিল করে তুলেছে

অভ্যন্তরীণ কার্যাবলী : 

১) স্পেনে চার্লসের শাসন : 

রোমান সম্রাট পদে পঞ্চম চার্লসর নির্বাচিত হওয়ায় ছিল স্পেনের জন্য দুর্ভাগ্য। পঞ্চম চার্লস উত্তরাধিকারসূত্রে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন । এ বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বহুবিধ সমস্যা সমাধানে তিনি স্পেনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন । তিনি স্পেনের সৈন্য ও অর্থ ব্যয় করে সম্রাটপদ ও সম্রাটএর মর্যাদা বজায় রেখেছিলেন ।এতে স্পেনের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। তার সাম্রাজ্যের স্বার্থ আর স্পেনের স্বার্থ এক ছিল না । সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের প্রতি দৃষ্টি দিতে গিয়ে তিনি স্পেনের শাসন উপহার দিতে পারেননি । বরং তাদের প্রতি অবিচার করেছিলেন। তার শাসনামলে স্পেনের জনসাধারণের উপর সামরিক শাসন চালানো হয়। এতে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ বিসর্জিত হয় । 

ক) স্বায়ত্তশাসন বিলোপ: 

পঞ্চম চার্লস এর পূর্ববর্তী শাসকদের শাসনামলে ক্যাস্টাইলের শহর স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত ।ক্যাস্টাইলের পার্লামেন্ট এককালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট ন্যায় ক্ষমতাধর ছিল । আর পঞ্চম চার্লস এ পার্লামেন্ট এর সকল ক্ষমতা কেড়ে নিলেন । বিভিন্ন শহরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে স্বৈরশাসন কায়েম করলেন । 

খ) ধর্মীয় আদালত: 

পঞ্চম চার্লস এর পূর্ব হতেই স্পেনে মুর নামক মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ইহুদিদেরকে নানাভাবে নির্যাতন করা শুরু হয়েছিল । পঞ্চম চার্লস এর আমলে এ মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায় । ক্যাথলিক ধর্ম মতে অবিশ্বাসীদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার জন্য ইনকুইজিশন নামে এক ধরনের ধর্মীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করেন । এ আদালতে আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হতো না । এর শাস্তি দানের প্রক্রিয়া ছিল ভয়ানক ও নিষ্ঠুর । এই নিষ্ঠুরতা মানুষকে বিদ্রোহী ও অসহিংস করে তোলে । ফলে স্পেনে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারায় । তবে ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমতকে রুখে দেওয়ার জন্য ইনকুইজিশন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল । 

 উপনিবেশ স্থাপন :

পঞ্চম চার্লস এর আমলে আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশ স্থাপন ও বিস্তার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা । মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ভেনিজুয়েলা, নিউ গ্রানাডা ,পেরু,বলিভিয়া, এবং পশ্চিম চিলি প্রভৃতি স্থানে স্পেনের উপনিবেশ প্রাধান্য সুদূর হয়েছিল পঞ্চম চার্লস এর রাজত্বকালেই । 

২) নেদারল্যান্ডে পঞ্চম চার্লস এর শাসন : 

নেদারল্যান্ডস ছিল পঞ্চম চার্লস এর জন্মভূমি এবং পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত দেশ । তিনি নেদারল্যান্ডসকে তার সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী রাজ্য পরিণত করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু ফ্রান্স ও তুরস্কের সাথে বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ফলে তার সে ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি । তিনি তার পিতৃস্বসা(Father’s Sister )  এবং পরে তার  ভাগিনি মেরির হাতে নেদারল্যান্ডের শাসনভার ন্যস্ত করে নিজ প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখেন ।যেমন: – 

ক) স্টেট জেনারেল : 

পঞ্চম চার্লস সমগ্র নেদারল্যান্ডের শহরগুলোর প্রতিনিধি এবং জনগণকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় আইনসভা স্টেট জেনারেল ( State general ) প্রতিষ্ঠা করেন ।

খ) কেন্দ্রীয় আদালত : 

তিনি মেকলিন(Macllin ) নামক স্থানে একটি কেন্দ্রীয় আদালত স্থাপন করেন নেদারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রদেশিক থেকে এই আদালতে আপিল করা যেত । 

গ) শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রীভূত করণ : 

তিনি প্রিভি কাউন্সিল ( Privy Council ) কোর্ট অব ফিনান্স ( Court of Finance ) এবং কাউন্সিল অব স্টেট ( Council of State ) নামে তিনটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন । এ তিনটি বিভাগের উপর তিনি শাসনকার্যের বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করেন । প্রত্যেক প্রদেশের জন্য একজন করে স্ট্যান্ডট হোল্ডার ( Stadet holder )  বা প্রদেশ পাল তিনি নিজে নিয়োগ করতেন । এছাড়া অন্যান্য প্রধান প্রধান কর্মচারী সম্রাট কৃতিত্ব নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। এভাবে পঞ্চম চার্লস নেদারল্যান্ডের শাসনভার কেন্দ্রীভূত করে নিজ প্রভুত্ব বজায় রাখেন । 

ঘ) প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম দমন :

নেদারল্যান্ডে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম মত প্রসার লাভ করতে থাকলে পঞ্চম চার্লস তা কঠোর হস্তে দমন করেন । বহু সংখ্যক লুথারপন্থি ও কেলভিনপন্থিকে সম্রাটের আদেশে হত্যা করা হয় ।

ঙ) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি : 

পঞ্চম চার্লস এর যুদ্ধনীতির দলে বহুসংখ্যক নেদারল্যান্ডবাসী সামরিক চাকরি পায় । এছাড়া তাঁত শিল্প, মাখন ও পনিরের ব্যবসা করে নেদারল্যান্ডের বাসীরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট লাভ করেছিলেন পঞ্চম চার্লস নিজের নেদারল্যান্ড ছিলেন এবং তাঁর আমলে উপরিউক্ত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ দেখা দেয় নি । কিন্তু জনগনের অসন্তোষ তার পরবর্তী রাজত্বকালে বিদ্রোহের ইন্ধন যুগিয়েছিল । 

জার্মানিতে মার্টিন লুথার বনাম পঞ্চম চার্লস : 

সম্রাট পঞ্চম চার্লস যখন হোলি রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হলেন , তখন জার্মানীতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল । আবার, জার্মানি তখন বহু রাজ্য বিভক্তি । ধর্মের ভিত্তিতে তারা যদি ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ এ বিভক্ত হয় তাহলে জার্মানির উপর তার আধিপত্য বজায় রাখা কঠিন হবে ।এছাড়া তিনি ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক মতবাদে বিশ্বাসী। তাই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে তিনি লুথারবাদ দমন করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন । 

ক) ওয়ার্মসের ধর্মসভা :

১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর জার্মানির উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গির্জার দরজায় মার্টিন লুথার ইনডালজেন্স বিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ৯৫ দফা সম্বলিত প্রতিবাদ লিপি পেরেক দিয়ে আটকে দেন । এ কাজের মাধ্যমে তিনি সূচনা করলেন প্রতিবাদী খ্রিস্ট ধর্ম বা প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ। ১৫২১ সালে পোপ দশম লিওর পরামর্শে চার্লস ওয়ার্মস নামক স্থানে এক ধর্মসভার লুথার কে আহবান জানান ।এ সভায় লুথার কে তার মতবাদ প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। লুতার তার মতবাদে অবিচল রইলেন । তিনি আরো বললেন যে, বাইবেলের উপর ভিত্তি করে কেউ যদি যুক্তি-তর্কের দাঁরা  তার মতবাদ ভুল প্রমাণ করতে পারে তাহলে তিনি নিশ্চয়ই তার মতবাদ ত্যাগ করবেন । লুথারের নৈতিক আচরণকে ধর্মধিষ্ঠানের  বিরুদ্ধে বিদ্রোহ গন্য করা হলো । তখন সম্রাট লুথারের বিরুদ্ধে ( Edict of Warms ) জারি করেন ।ওয়ার্মসের ডিগ্রী দ্বারা লুথার কে চার্লসের সাম্রাজ্য নিষিদ্ধ করা হলো । ধর্মদ্রোহী হিসাবে তাকে গ্রেফতার এবং সম্রাটের নিকট হাজির করতে নির্দেশ দেওয়া হলো । সেই সাথে তার সমস্ত পুস্তাকাদি জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হল । স্যাক্সনির ইলেক্টর ফ্রেডারিখ ছিলেন লুথারের শুভানুধায়ী । তিনি লুথারের জীবন সম্পর্কে শঙ্কিত হয়ে তাকে ওয়ার্টবার্গ দুর্গে গোপনে লুকিয়ে রাখেন । 

খ) ডায়েট অব স্পিয়ার: 

১৫২৬ সালের সম্রাট পঞ্চম চার্লস  স্পিয়ারের আরেকটি ধর্ম সভার আহবান করেন। যা “ ডায়েট অব স্পিয়ার “ নামে অভিহিত । এ সভায় সদস্যবিন্দু লুথারপন্থি ও ক্যাথলিকপন্থি এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে । ফলে লুথারের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা সম্ভব হয়নি।  ১৫২৯ সালে চার্লচ পূনরায় স্পিয়ারে আরেকটি ধর্ম সভার আহ্বান করেন এবং লুথারকে অবৈধ ঘোষণা করেন ।ওয়ার্মসের সভার  সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার নির্দেশ দেন । কিন্তু চার্লসের সাম্রাজ্য ছিল বিশাল। ফলে নানা স্থানে নানা সমস্যা দেখা দেয় এবং বিশেষ করে ফরাসি ও তুর্কিদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার ফলে লুথার এর বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি ।জার্মানির যেসকল রাজ্য লুথারবাদ এ বিশ্বাসী ছিল তারা ওয়ার্মসের সিদ্দান্ত বাস্তবায়নে রাজি হল না । তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রতিবাদ করে বেরিয়ে এল। আর এ প্রতিবাদ হতে প্রোটেস্ট্যান্ট নামের উৎপত্তি । 

গ) আগসবার্গের স্বীকারোক্তি : 

ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ শেষে চার্লস অগসবার্গ নগরের লুথারপন্থী ও ক্যাথলিকদের এক সভার আহবান করেন । ঐ সভায় লুথারপন্থীদের  তাদের মতের স্বপক্ষে যুক্তি দেখাবার আদেশ দেওয়া হয় । তখন লুথার পন্থীরা আগসবার্গের স্বীকারোক্তি নামে একটি দলিল পেশ করেন । ওই দলিলে প্রটেস্টান্ট গন তাদের ধর্মনীতির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা প্রদান করেন । ওই সময় হতে ওই দলিলের লিপিবদ্ধ নীতি এই প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের মূলনীতি হিসেবে পরিগণিত হয় । 

ঘ) সমবেত সংঘ : 

আগসবার্গের স্বীকারোক্তি সভা অগ্রাহ এবং ওয়ার্মসের সিদ্ধান্ত চার্লস কার্যকর করার উদ্যোগ নিলে প্রোটেস্ট্যান্টরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন । তখন তারা আত্মরক্ষার্থে ১৫৩১ সালে সমবেত সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ।এটা (Smallcaldy League ) সংঘ নামে পরিচিত ।

ঙ) আগসবার্গের সন্ধি : 

১৫৪৩ থেকে ১৫৫৫ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় । ১৫৪৫  সালে সম্রাট পঞ্চম চার্লস ধর্ম বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন ।তার অনুরোধে পোপ ট্রেন্টে এক ধর্ম সভার আয়োজন করেন ।পোটেস্ট্যান্টরা  এ সভায় যোগ দিতে অস্বীকার করেন ।তখন সম্রাট তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রথমদিকে যুদ্ধে সম্রাট জয়ী হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি লুথার পন্থীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন । অবশেষে ১৫৫৫ সালে এই দুই দলের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । যা আগসবার্গের সন্ধি নামে পরিচিত ।এ সন্ধি দ্বারা লুথারবাদ আইনের দ্বারা স্বীকৃতি পায় । রাজার ধর্ম  প্রজার ধর্ম হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।  অর্থাৎ যিনি দেশ শাসন করবেন তিনিই প্রজার ধর্ম স্থির করবেন। তবে লুথারবাদ ব্যতীত অন্য কোন প্রোটেস্ট্যান্ট কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি ।

বৈদেশিক কার্যাবলী : 

১) পঞ্চম চার্লস ও ফ্রান্স : 

ক) দ্বন্দ্বের কারণ : 

পঞ্চম চার্লস এর শত্রুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফরাসি রাজা প্রথম ফ্রান্সিস । শত্রুতা বা দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট পদ এবং ইতালির উপর প্রভুত্ব বজায় রাখা । ইতালি ওই সময় বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল । তাই ইতালিকে গ্রাস করতে স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল । 

খ) সম্রাট নির্বাচন :

স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ডের মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট পদ দাবি করেন ।তিনি ছিলেন ওই সময়কার বৃহৎ রাজ্যের রাজা । অপরদিকে ফরাসি রাজা প্রথম ফ্রান্সিস ও সম্রাট পদ দাবি করেন । কিন্তু ১৫১৯ সালে জার্মানির ইলেকট্রন দ্বারা  সম্রাট পদে নির্বাচিত হন ।নাম ধারণ করেন পঞ্চম চার্লস । 

গ) মিলান অধিকার : 

সম্রাট হওয়ার পর পঞ্চম চার্লস মিলান হতে ফরাসি আধিপত্য দূর করার লক্ষ্য ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন । ওই সময় তিনি ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি এবং ইতালির পোপকে নিজ পক্ষে টানতে সক্ষম হন । একত্রিত শক্তির সাহায্যে তিনি সহজেই মিলান হতে প্রথম ফ্রান্সিসকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন । 

ঘ) মাদ্রিদের  সন্ধি : 

প্রথম ফ্রান্সিস সহজে পরাজয় মেনে নেওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি পুনরায় মিলান অধিকার করতে অগ্রসর হলে প্যাভিয়া নামক স্থানে পঞ্চম চার্লস এর সঙ্গে যুদ্ধ হয় এবারও প্রথম ফ্রান্সিস পরাজিত ও বন্দী হন।বাধ্য হয়ে তিনি মাদ্রিদ এর সন্ধি স্বাক্ষর করেন । সন্দীপ শর্তানুসারে প্রথম ফ্রান্সিস আর্টয়েস, বাগান্ডি ও ফ্ল্যান্ডার্স স্পেনকে সমর্পন করতে বাধ্য হন এবং মিলান , নেপলস ও জেণোয়ার ওপর সকল দাবি প্রত্যাহার করেন । এভাবে ফরাসি রাজ্যের উপর অংশ দান করে এবং ইতালির উপর দাবি ত্যাগ করে প্রথম ফ্রান্সিস মুক্তি লাভ করেন । 

ঙ) ক্যাম্রের সন্ধি : 

প্রথম ফ্রান্সিস এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হলেন । সুযোগ পেলেন । সম্রাট পঞ্চম চার্লসের  ক্ষমতা বৃদ্ধি দেখে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি এবং পোপ চার্লসের পক্ষ ত্যাগ করে তারা প্রথম ফ্রান্সিস এর পক্ষে যোগ দান করে । তাদের মূলনীতি ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য ( Balance of Power )   বজায় রাখা । কিন্তু পঞ্চম চার্লস তাদের এই একত্রিত শক্তিকে সহজেই পরাজিত করেন । প্রথম ফ্রান্সিসকে  ও পোপ বাধ্য হয় ১৫২৯ সালে পঞ্চম চার্লস এর সঙ্গে ক্যাম্রের সন্ধি  স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন । এ সন্ধিতে প্রথম ফ্রান্সিস পুনরায় মাদ্রিদের এর চুক্তি সমর্থন করেন । যাই হোক ক্যাম্রের সন্ধি অনুসারে প্রথম ফ্রান্সিস শুধুমাত্র বার্গান্ডি নামক স্থানটি ফিরে পান । আর বাকী ফ্লান্ডার্স, মিলান এবং আর্টয়েস চার্লসকে সমপর্ন করেন । 

চ) ক্রেসপির  সন্ধি :

ক্যাম্বের শান্তিচুক্তির পরেও প্রথম ফ্রান্সিস ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন । এ সময় তুরস্ক অস্ট্রিয়া আক্রমণ করে বেলগ্রেড দখল করে । তুর্কি সুলতান সুলায়মানের সামরিক শক্তির পরিচয় পেয়ে প্রথম ফ্রান্সিস তার সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে আবদ্ধ হন এবং ক্যাম্রের  চুক্তি ভঙ্গ করে তিনি হারানো রাজাংস পুনরুদ্ধার করতে আবার ইতালি আক্রমণ করেন । ফলে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয় । শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে১৫৪৪ সালে  ক্রেসপির সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় । এ সন্ধির দ্বারা দুই পক্ষ পুনরায় ক্যাম্পের সন্ধির শর্ত মেনে নেয় । প্রথম ফ্রান্সিস ইতালির উপর তার দাবি ত্যাগ করেন এবং পঞ্চম চার্লস বার্গান্ডি প্রথম ফ্রান্সিসকে ছেড়ে দেন। এভাবে ইতালি দখল নিয়ে প্রথম ফ্রান্সিস ও চার্লসের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটে । 

২) পঞ্চম চার্লস ও তুর্কি শক্তি : 

পঞ্চম ও ষোড়শ শতকে অটোমান তুর্কি শক্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য । ১৪৫৩ সালে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদের হাতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী বা বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী  কনস্টান্টিনোপলের পতন হয় । ১৪৫৯ সালে সার্বিয়া , ১৪৭০ সালে আলবেনিয়া , ১৪৮০ সালে ইতালির টরেন্টো তুর্কিদের দখলে চলে যায় । পোপ দ্বিতীয় পিয়ার্স তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে দুঃখে বলে উঠেছিলেন “ আমি কোন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি ন “ । ষোড়শ  শতাব্দিতে সুলতান সুলেমান এর শাসনামলে ( Sulaiman the Magificent )  তুর্কি শক্তি ইউরোপের দানিয়ুব অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা শুরু করে । সোলেমান দানিয়ুব নদী অতিক্রম করে বিলগ্রেড দখল করে । হাঙ্গেরির অর্ধাংশ নিজ সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করে এবং ট্রানসিলভানিয়া ও মলদাভিয়া হতে বার্ষিক কর আদায় করেন । সোলেমান অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা অবরোধ করলে পঞ্চম চার্লস এর সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে চার্লস জার্মানির রাজশক্তি গুলোর সহযোগিতা পেয়েছিলেন। যাহোক সোলেমান যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দানিয়ুব ত্যাগ  করেন। 

৩) মুর জলদস্যু দমন ও তিউনিস অধিকার : 

আফ্রিকার  মুর জলদস্যুদের আক্রমণে ইতালিয় স্পেনের উপকূল অঞ্চলে গভীর উদ্বেগ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় । ইতালি ও স্পেনের ব্যবসা-বাণিজ্য হুমকির মুখে সম্মুখীন হয় । সম্রাট পঞ্চম চার্লস এ জলদস্যুদের দমন করতে বদ্ধপরিকর হন । তিনি জলদস্যুদের নেতা বারবারোসকে  পরাজিত করে আফ্রিকা উপকূলে তাদের বসতিস্থান তিউনিস( Tunis ) দখল করেন । এরপর উপকূল অঞ্চলে জলদস্যুদের উপদ্রব কিছুকালের জন্য বন্ধ হয় । 

সিংহাসন ত্যাগ : 

১৫৫৫ সালে অগসবার্গের সন্ধির পর ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে সম্রাট পঞ্চম চার্লস রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন । তিনি নিজ ত্রাতা ফার্ডিনান্ডকে অস্ট্রিয়ার সিংহাসন এবং রোমের সম্রাট পদ এবং নিজ পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ কে স্পেন,নেদারল্যান্ডস ,ইতালি, আমেরিকা, স্পেনের উপনিবেশ দান করে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেন । এ সময় থেকেই হ্যাপসবার্গ পরিবার অস্ট্রিয়া ও স্পেনের দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে । 

পঞ্চম চার্লস এর কৃতিত্ব বিচার  : 

সম্রাট পঞ্চম চার্লস এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন । তার সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্ত যেত না । তার সাম্রাজ্য ছিল ইউরোপ ,আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশবেশিব্যাপী বিস্তৃত । এরূপ বিশাল সাম্রাজ্য তার পূর্বের শুধু একমাত্র শার্লেমানের ছিল । তার সাম্রাজ্য যেমন ছিল বিশাল তেমনই তার সমস্যা ছিল বিশাল । 

১) তার পরিচয় : 

সম্রাট চার্লস ছিলেন স্পেনরাজ ফার্ডিনান্ডের দেীহিত্র, অস্ট্রিয়ার রাজা ম্যাক্সিমিলিয়ানের পেীত্র এবং নেদারল্যান্ডের পুত্র ডিউকের পুত্র । তার পিতার নাম ফিলিপ দি ফেয়ার এবং মাতার নাম জোয়ানা । পিতার মৃত্যুর পর তিনি নেদারল্যান্ডের শাসনভার প্রাপ্ত হন । মাতামহ ফার্ডিনান্ডের মৃত্যুর পর তিনি স্পেন, নেপলস্,সিসিলি,স্পেন আমেরিকা এবং আফ্রিকার তিউনিশিয়ার অধিকার লাভ করেন । ১৫১৬ সালে যখন তিনি স্পেনের রাজা হন তখন তিনি প্রথম চার্লস নামে পরিচিত ছিলেন। রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হয়ে তিনি পঞ্চম চার্লস উপাধি ধারণ করেন । পঞ্চম চার্লস যোগ্যতার দিক দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট তাদের উপযুক্ত ছিলেন না। তার কোন সামরিক প্রতিভা বা উদ্ভাবনী শক্তি কিছুই ছিল না ।তার দেহ সৌষ্ঠব রাজশ্রী ছিল না । তবে তিনি অপরের কথা শ্রবন করতেন। তাঁর ধৈর্য ছিল অপরিসীম এবং সাহস ছিল বীরোচিত । সিংহাসন লাভের পর থেকে ক্রমেই তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল । 

তার সমস্যা ও দায়িত্ব : 

সম্রাট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর পঞ্চম চার্লস এর দায়িত্ব যেমন বৃদ্ধি পায়।  তেমনি নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয় । সেগুলো কে মোকাবেলা করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয় ।

সমস্যা সমূহ :

ক) স্পেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য রক্ষা করা এবং নিরাপদ রাখা । 

খ) ইতালি ও স্পেনে উপকূল মুসলমান জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা । 

গ) দানিয়ুব অঞ্চলে তুর্কি শক্তির বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা করা ।

ঘ) ইতালিতে ফরাসিরাজ ১ম ফ্রান্সিসের অভিযান ব্যর্থ করা ।

ঙ) নেদারল্যান্ডের শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা । 

চ) জার্মানিতে নিজ প্রাধান্য রক্ষার্থে লুথারবাদ বা প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ দমন করা প্রভৃতি । 

এরকম বহুবিধ সমস্যা তার দায়িত্ব কে বহুগুণ জটিল করে তুলেছিল । 

৩) বিফলতার যুগ : 

এরূপ বহুবিধ জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির প্রয়োজন ছিল সম্রাট পঞ্চম চার্লসের তা ছিল না । তিনি বলেন , “ The head of this vast empire was a man wholly devoid of Charm, magnetism or Chivalry. He was no Soldier , he had no imagination. He was incapalele of original thought in any subject. “ সুতরাং তিনি বহু সমস্যার সমাধান করতে সকল ক্ষেত্রেই বিফলতার পরিচয় দেন । এজন্য অনেক ঐতিহাসিক তার রাজত্বকালকে বিফলতার যুগ এমনকি কুগ্রহ বলে অভিহিত করেন । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রান্ড বলেন , “ He was, even Still is, regarded by some one of the evil forces of the time. ‘ তবে সম্রাট পঞ্চম চার্লস এর রাজত্বকালে শুধু নেতিবাচক দিক এই নয় কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে । 

নেতিবাচক দিক :

১) স্পেনের ক্ষতি : 

স্পেনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে,  স্পেনের অর্থবল ও জনবল ক্ষয় করে তিনি তার সম্রাট পদ রক্ষা করেছিলেন।  স্পেনে তিনি কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু করেন । এতে বাক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয় । এতে স্পেনের কোন লাভ হয়নি।  এদিক থেকে বিচার করলে স্পেন ও স্পেনবাসীদের জন্য তার রাজত্বকাল ক্ষতিকর হয়েছিল । তাই ঐতিহাসিক Thatcher এবং Schwill  বলেন , “ From a Spanish national point of view it was a great misfortune that Charls I was elected to the Empire in 1519 and becam Emperor Charls V . 

2) নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহের দায়িত্ব :

নেদারল্যান্ডে তার পতিপত্তি অক্ষুন্ন ছিল বটে। কিন্তু তার শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণ নীতি নেদারল্যান্ড বাসির মনমত ছিল না । তার এ নীতি পরবর্তী রাজত্বকালে নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহের জন্য আংশিক হলেও দায়ী ছিল। একথা সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায়।  

৩) রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে বিফলতা:

তিনি জার্মানিতে বা ইতালিতে কোন রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন  করতে পারেননি । চালস তার অধীনস্থ রাজ্যসমূহ কোন অভিন্ন  শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেননি । তারকোন রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাজেট ছিল না । 

৪) ধর্মান্ধতা : 

তিনি ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক।  তাই ধর্ম ও সাম্রাজ্যের দৃঢ়করনের তিনি লুথারবাদ দমন করতে বদ্ধপরিকর হন ।কিন্তু তিনি বিফল হন।  তিনি লুথারবাদের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেননি । তাছাড়া ক্যাথলিক যাজক ও ধর্ম স্থানের, অনাচার-অবিচার দুর্নীতি, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ,চিন্তাশীল মানুষের মাঝে ঘৃণার উদ্বেগ জাগ্রত করেছিল । তাই লুথারের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ মানুষ ও বহুসংখ্যক জার্মান রাজন্যবর্গের সমর্থন ছিল । এটা চার্লস উপলব্ধি করতে পারেননি । তাছাড়া ধর্মের প্রেরণা কে রাজশক্তি দ্বারা ক্ষুন্ন করা যেতে পারে। কিন্তু সমূলে ধ্বংস করা সম্ভব নয় । চার্লস ও তা পারেননি । অবশেষে ১৯৫৫ সালে অগাসবার্গের সন্ধির দ্বারা লুথারবাদ কে আইনত স্বীকার  দেন । এতে রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ সমূলে বিফলে হয়েছিল । 

৫) ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় আদালত : 

চার্লসের সময়ে যেমন ধর্ম সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়।  তেমনই প্রতিসংস্কার আন্দোলন শুরু হয় । যারা ধর্মসংস্কার আন্দোলন করতো, তারা ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট । ক্যাথলিক ধর্ম অবিশ্বাসী ও দেরকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনি ইনকুইজিশন নামে এক ধরনের ধর্মীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করেন । এ আদালতের বিচার ছিল নির্মম ,নিষ্ঠুর, অমানবিক । আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনে কোন সুযোগ দেওয়া হতো না।  ফলে এ আদালতের নিষ্ঠুরতা মানুষকে বিদ্রোহী ও অসহিংস করে তোলে। তাই এটি স্পেনের জনপ্রিয়তা হারায়।  

ইতিবাচক দিক : 

সম্রাট পঞ্চম চার্লস তার বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে তার যেমন বিফলতা ছিল, তেমনই তার সফলতা কম ছিল নয় ।

১) ইতালি থেকে ফরাসি শক্তি বিতাড়ন : 

ফরাসি রাজ প্রথম ফ্রান্সি পবিত্র রোমান সম্রাট পদের দাবিদার ছিল । কিন্তু চার্লস সম্রাট পদের নির্বাচনে প্রথম ফ্রান্সিসকে পরাজিত করে নিজে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হন । প্রথম ফ্রান্সিস ইতালির উপর ফরাসি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল । এজন্য ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে কয়েকবার যুদ্ধ সংঘটিত হয় । প্রত্যেক যুদ্ধে চার্লস প্রথম ফ্রান্সিসকে পরাজিত করেন এবং জয়লাভ করেন । অবশেষে প্রথম ফ্রান্সিস ১৫২৯ সালের ক্যাম্পের শান্তিচুক্তি মানতে বাধ্য হন এবং ইতালির উপর অধিকার ত্যাগ করেন । 

২) মুর জলদস্যু দমন ও তিউনিস অধিকার : 

আফ্রিকার মুর নামক জলদস্যুদের আক্রমণে ইতালি ও স্পেনে উপকূল অঞ্চলে গভীর উদ্বেগ ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় । ইতালি ও স্পেনের ব্যবসায় বাণিজ্যে ও হুমকির মুখে সম্মুখীন হন । সম্রাট পঞ্চম চার্লস জলদস্যুদের দমন করতে বদ্ধপরিকর হন । তিনি জলদস্যুদের নেতা বারবারোসকে  পরাজিত করে আফ্রিকার উপকূলে তাদের বসতস্থান তিউনিস দখল করেন । এরপর উপকূল অঞ্চলে জলদস্যুদের উপদ্রব কিছুকালের জন্য বন্ধ হয় । 

৩) দানিয়ুব অঞ্চলে তুর্কি শক্তির বিস্তার প্রতিহত :  

পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে অটোম্যান তুর্কি শক্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য । ১৪৫৩ সালে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহম্মদের হাতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের এর পতন হয় । ১৪৫৯ সালে সার্বিয়া, ১৪৭০ সালে আলবেনিয়া, ১৪৮০ সালে ইতালির টরেন্টো তুর্কিদের দখলে চলে যায় । পোপ দ্বিতীয় পিয়াস তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে দুঃখে বলে উঠেছিলেন “আমি কোন আশার আলো দেখতে পারছিনা ” । ষোড়শ শতাব্দীতে সুলতান সুলেমান ( Sulaiman the Magnificent ) এর আমলে তুর্কি শক্তি ইউরোপের দানিয়ুব অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা শুরু করে । সোলেমান দানিয়ুব নদী অতিক্রম করে বেলগ্রেড দখল করেন । হাঙ্গেরির অর্ধাংশ নিজ সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন এবং ট্রানসিলভানিয়া ও মালদাভিয়া হতে বার্ষিক কর আদায় করেন । সোলেমান অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা  অবরোধ করলে পঞ্চম চার্লস এর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় । এ যুদ্ধে চার্লস জার্মানির রাজশক্তি গুলোর সহযোগিতা পেয়েছিলেন । যাই হোক যুদ্ধে সোলেমান পরাজিত হয়ে দানিয়ুব অঞ্চল ত্যাগ করেন । 

৪) উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার কঠোরতা হ্রাস: 

পঞ্চম চার্লস এর শাসনামলে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ভেনিজুয়েলা, পেরু-বলিভিয়া প্রভৃতি স্থানে স্পেনের উপনিবেশ সুদৃঢ় হয় । তিনি এসব উপনিবেশগুলো শাসন ব্যবস্থার কঠোরতা বহুল পরিমাণে হ্রাস করে অনেকটা সুসংবদ্ধ ও উদার শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন । 

৫) নেদারল্যান্ডের উন্নতি : 

তিনি নেদারল্যান্ডের শাসনকে অনেকটা কেন্দ্রীভূত করে সেখানে একটা রাজনৈতিক একতা আনায়ন করেন । বহু সংখ্যক নেদারল্যান্ড বাসীকে সামরিক বাহিনীতে চাকরি দেন । এছাড়া তাঁত শিল্প, মাখন ও পনির এর ব্যবসা করে নেদারল্যান্ডবাসিরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে ।সেজন্য তার রাজত্বকালে সেখানে কোন বিদ্রোহ দেখা দেয় নি ।

পরিশেষে বলা যায় যে সম্রাট পঞ্চম চার্লস রাজত্বকালে তার যেমন বিফলতা আছে তেমনি তার সফলতা ও কম ছিলনা । তার সম্রাজ্য বিশাল সমস্যা ও বিশাল । রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের দিক দিয়ে দেখতে গেলে তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেননি বলা যেতে পারে । কিন্তু তার কর্মজীবনকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে আমরা তার রাজত্ব কালকে বিফলতার যুগ বলে অভিহিত করতে পারি না । তার বিশাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন জটিল সমস্যার কথা বিবেচনা করলে তার যেটুকু বিপ্লব ঘটেছিল তাও মহান বিফলতা (Magnificent failure ) হিসেবে বিবেচিত হবে ।

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 × 1 =