ফ্রান্সের বুরবোঁ বংশের প্রতিষ্ঠা এবং চতুর্থ হেনরি

বুরবোঁ রাজবংশ : 

ইউরোপের ইতিহাসে ফ্রান্সের বুরবোঁ রাজবংশের উথান এক যুগান্তকারী ঘটনা । ফ্রান্সের এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বুরবোঁ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হয় । এ রাজ বংশের প্রতিষ্ঠা মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে এক শক্তিশালী রাজতন্ত্রের সূচনা হয় এবং চতুদশ লুইয়ের আমলে তা পরিপূর্ণতা পায় । চতুর্থ হেনরি ছিলেন  এর প্রতিষ্ঠাতা । তার অধিষ্ঠিত এই  রাজবংশ ২০০ বছরের অধিক সময় ফ্রান্সের রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল । 

বুরবোঁ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস : 

ফ্রান্সের ইতিহাসে ৩ হেনরির যুদ্ধেরযুদ্ধের ফসল হচ্ছে বুরবোঁ রাজবংশ । তিন হেনরি হচ্ছে : 

১) রাজা তৃতীয় হেনরি, উদারপন্থি ক্যাথলিক । 

২) হেনরি ডিউক অব গাইজ , উগ্রপন্থী ক্যাথলিক এবং 

৩)হেনরি নাভারি,হুগেনো অর্থাৎ প্রোটেস্ট্যান্ট এবং বুরবোঁ বংশদুত । 

ফলে ইউরোপের খ্রিস্টান জগৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে যথা : 

ক) ক্যাথলিক – যারা গোঁড়া ক্যাথলিক । 

খ) প্রোটেস্ট্যান্ট- যারা  উদারপন্থী । 

ফ্রান্সে প্রোটেস্ট্যান্টরা  হুগেনা নামে পরিচিত । ফ্রান্সে ক্যালভিনপন্থি  প্রোটেস্ট্যান্টরা দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে । কিন্তু তাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হ। য় সমস্যার শুরু হতে থাকে দ্বিতীয় হেনরি মৃত্যুর পর থেকে । দ্বিতীয় হেনরির মৃত্যুর পর ফ্রান্সের রাজা হন তার নাবালক পুত্রদ্বিতীয় ফ্রান্সিস।  এ সময় ফ্রান্স স্কটল্যান্ড এর গাইজ পরিবারের অধীনে চলে যায় । দ্বিতীয় হেনরির ইস্ত্রি রাজমাতা ক্যাথারিন ডি- মেডিসি নাবালক রাজার প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। রানীর পিতা গাইজ নামে পরিচিত ছিলেন। রাজ প্রতিনিধিত্বের দাবিদার বুরবোঁ পরিবার ছিল । কেননা বুরবোঁ পরিবার ও গাইজ পরিবার রাজবংশের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে জড়িত ছিল । গাইজ পরিবার ছিল তীব্র হুগেনা বিদ্বেষী। গাইজ পরিবারে কঠোর শাসনে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে । এ সময় হুগেনোরা  বুরবোঁদের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের অধিকার সময় আদায় করতে ইচ্ছা পোষণ করেন ।১৫৬০ সালে অভিযাজাতরা  রাজাকে গাইজ পরিবারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে রাজাকে অপহরণের এক ষড়যন্ত্র করেন । ১৫৬০ সালে সালেই নাবালক রাজা দ্বিতীয় ফ্রান্সিস মারা যান । রাজা হন আরেক নাবালক তার ভাই নবম চার্লস। চার্লসের বয়স 10 হওয়াতেই রাজমাতা আবারো রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হন । ১৫৬২ সালে হুগেনোদের অধিকতর দাবির মুখে ক্যাথলিকদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তা দীর্ঘদিন চলতে থাকে । গৃহযুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্টরা   জয়লাভ করতে থাকলেও ১৫৭২ সালে ২৪শে আগস্ট বার্থলোমিউর দিন একটা নির্মম ঘটনা ঘটে যায় । ওই দিনে প্রায় দশ হাজার  হুগেনোকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । গৃহযুদ্ধ আবার শুরু হয় । তবে রাজকীয় বাহিনীর আক্রমণের মুখে হগেনোরা তাদের শহরের দুর্গা রক্ষা করে । হুগেনোদের প্রতিরোধে জেসুইট ও উগ্র ক্যাথলিকদের প্ররোচনা ১৫৭৬ সালের হেনরি গাইজের নেতৃত্বে “ ক্যাথলিক লীগ”  প্রতিষ্ঠা করে । 

১৫৭৪ সালের নবম চার্লস  মৃত্যুবরণ করলে তার ভাই তৃতীয় হেনরি ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন । তিনি ছিলেন অসুস্থ । তারপরেও তিনি অভিজাত ও বুর্জোয়া শ্রেণীর তাগিদে ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্স গড়তে ১৫৮৫সালে প্রতিষ্ঠা করেন ”প্যারিস লিগ ” । ফলে হেনরি গাইজ দের সঙ্গে তার বিরোধ বেড়ে যায় । সে সঙ্গে তার সময়ে হুগেনো ও ক্যাথলিক বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে । শুরু হয় ফরাসিরা রাজ  তৃতীয় হেনরি , গাইজের ডিউক হেনরি এবং নাভারের প্রিন্স হেনরির মধ্যে গৃহযুদ্ধ ইতিহাসে তিন হেনরির যুদ্ধ নামে পরিচিত । এই গৃহযুদ্ধে গাইজের ডিউক হেনরি রাজার  দেহরক্ষীর হাতে নিহত হন । একজন উগ্রপন্থী ক্যাথলিক যাজকের হাতে নিহত হন রাজা তৃতীয় হেনরি । যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে  বুরবো বংশীয় নাভারের প্রিন্স হেনরি চতুর্থ হেনরি নাম ধারণ করে ফ্রান্সের সিংহাসন আহরণ করেন । উগ্র ক্যাথলিকদের দমন করে তিনি প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম ত্যাগ করে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করে ফরাসিরা সিংহাসন কে কন্টকমুক্ত করেন। যা ছিল তার সুচিন্তিত কাজ এবং দূরদর্শিতার পরিচয় এভাবে ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয় বুরবোঁ রাজবংশ । 

চতুর্থ হেনরি ( ১৫৮৯-১৬১০)- Henry IV( 1589-1610 ) 

ইউরোপের ইতিহাসে চতুর্থ হেনরি ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা । তিনি দীর্ঘ দিনের ফ্রান্সের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৫৮৯ সালে রাজা তৃতীয় হেনরির মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি ছিলেন যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি রাজনৈতিক ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা থেকে মানুষকে মুক্ত করে স্থিতিশীলতা আনয়ন করেন । তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ২০০ বছরের অধিককাল সময় রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল । 

তার সমস্যাসমূহ ( His Problems ) :

দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধে লিপ্ত থাকায় ফরাসি জাতি ছিল হতাশাগ্রস্ত এবং দিশেহারা ।দেশের আর্থিক অবস্থা ছিল দুর্দশাগ্রস্ত । চোর ডাকাত গ্রামীণ জীবনকে ভীতিকর অবস্থা করে তুলেছিল । শিল্প-কারখানা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । রাজকোষ ছিল শূন্য , সরকারি কর্মচারীগণ ছিল দুর্নীতি পরায়ন ধর্মীয় ব্যাপারে হুগেোদের মধ্যে ছিল তুমুল বিরোধ । নিজ দেশের ভেতরে স্পেনের সেনাবাহিনী । ফরাসি রাজ্যসীমা চতুর্দিকে স্পেন ও অস্ট্রিয়ার অধিকৃত স্থান দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল।  উক্ত সমস্যাগুলো সমাধান কল্পে তিনি অতিপদক্ষেপ গ্রহণ করেন । যেমন :- 

১) ধর্মীয় : 

সিংহাসনে আহরণ করে চতুর্থ হেনরি সর্বপ্রথম ধর্মীয় সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হোন । দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা এবং বিদেশি প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখার জন্য তিনি প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম ত্যাগ করে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন । তিনি ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করলেও প্রোটেস্ট্যান্ট রক্ষার্থে  ১৫৯৮ সালে ১৩ এপ্রিল  “ এডিক্ট অব নান্টিস “( Edict of Nantes ) নামে এক রাজকীয় আদেশ জারি করেন।  এর মাধ্যমে হুগেনোরা  কতিপয় অধিকার লাভ করেন । যথা: 

ক) হুগেনোরাদের উপাসনা ও মতপ্রকাশের অধিকার দেওয়া হয় । 

খ) প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়।  এর ব্যয় মেটাতে আংশিক সরকারি অনুদান মঞ্জুর করা হয় । 

গ) কেলভিন-পন্থী বই পুস্তক প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয় । 

ঘ) হুগেনোদের সরকারি চাকরি লাভের সুযোগ দেওয়া হয় । 

ঙ) হুগেনোরাদের মামলা-মোকদ্দমা বিচারের জন্য বিচার মন্ডলীদের অত্যন্ত একজন প্রোটেস্ট্যান্ট থাকার কথা বলা হয় ।

চ) হুগেনোদের নিরাপত্তার জন্য তাদের দুর্গের সৈন্যদের ব্যয়ভার বহন করবে সরকার এবং 

ছ) হুগেনোদের রাজার অনুমতিক্রমে গির্জায় যাজকীয় বিচার সভা ও প্রাদেশিক রাজনৈতিক কাউন্সিল ডাকতে পারবে । 

এভাবে হেনরি  Edict of Nantes দ্বারা ফ্রান্সের ধর্মীয় সহিংসতা প্রতিষ্ঠা করেন ।

2) রাজনৈতিক : 

চতুর্থ হেনরি নিজ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । 

ক) আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণী : 

তিনি অভিজাত শ্রেণীর আনুগত্য লাভের জন্য তাদেরকে রাজকর্মচারী পদে নিযুক্ত করেন।  তাদেরকে নানা খেতাবও দেন।  এভাবে তিনি রাজার প্রতি অনুগত ও কর্মঠ এক আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণী গড়ে তোলেন ।উৎকোচ এর মাধ্যমে তিনি অনেক অভিজাতদেরকে নিজ দলভূক্ত  নিযুক্ত করেন । 

খ) ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : 

চতুর্থ হেনরিকেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা বা ( States General ) এর অধিবেশন আহ্বান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন । অভিজাত দের প্রিয় ক্রিড়া মল্লযুদ্ধ নিষিদ্ধ করেন । এসব পদক্ষেপের কারণে অভিজাদের অনেকে রাজার বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । এদের অনেকে স্পেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্রান্স বিভক্তির ষড়যন্ত্র করেন । হেনরি কঠোর হস্তে এদের দমন করেন । ১৬০৬ সালে ষড়যন্ত্রকারী ক্যাথলিক নেতা বাইরনকে ফাঁসি দেওয়া হয় । হুগেনো নেতা বাওলন ভয়ে জার্মানিতে পালিয়ে যান । 

গ) বিদেশি সৈন্য বিতরণ : 

চতুর্থ হেনরি যখন ফ্রান্সের সিংহাসনে আহরণ করেন তখন ফ্রান্সে স্পেনের সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল । তিনি স্পেনীয় সেনাবাহিনী বিতাড়িত করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেন । অবশ্যই তিনি ভারবিন চুক্তির মাধ্যমে স্পেনের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেন । 

ঘ) Edict of Nantes: 

ফরাসি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে Edict of Nantes দ্বারা হুগেনোদের  ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার দান করেন । লা রসেল নামক পদেশে হুগেনোদের  সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তিনি তাদেরকে স্বায়ত্তশাসন দেন । 

৩) অর্থনৈতিক : 

ফ্রান্সের অর্থনীতিকে ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য হেনরি অব সুলিকে তার অর্থমন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং তার কাছ থেকে সকল সাহায্য-সহযোগিতা ও বুদ্ধি-বিবেচনা গ্রহণ করেন । সুলি ছিলেন ন্যায়পরায়ন ,গম্ভীর, দৃঢ়চেতা ও কৃপন  স্বভাবের মানুষ । তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ফ্রান্সের অর্থনীতি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপিত হয় । 

ক) রাজস্ব বিভাগের সংস্কার : 

সুলি কর আদায়ের পুরনো ব্যবস্থার ত্রুটি – বিচ্যুতি দূর করেন। টেইলি, গাবেল, এইড, দোয়েনস প্রভৃতি প্রচলিত কর যাতে আদায় হয় এবং আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব রাখা হয় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি দেন। সরকারি হিসেব এর ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা করেন। তিনি কেন্দ্রীয় গভর্নরের অনুমতি ব্যতীত প্রাদেশিক গভর্নরদর অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন । র্চাচ ও অভিজাত শ্রেণীর কর মুক্ত থাকলেও জরুরি অবস্থা তাদের নিকট থেকে কর আদায় নীতি গৃহীত হয় । তিনি দুর্নীতিবাজ অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । ফলে সরকারি অর্থের অনেক সাশ্রয়  হয় । সুলির সংস্কারের ফলে ১৬১০ সালে ফ্রান্সের জাতীয় সঞ্চয় ১০০০০( দশ হাজারে ) লিভরে বৃদ্ধি পায় । 

খ) কৃষির উন্নতি : 

হেনরি এবং সুলি দুই জনেই কৃষির উন্নতির জন্য কাজ করেন । কৃষির উন্নতির জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক কর বাতিল করা হয় । খাদ্য শস্য এক প্রদেশ থেকে অন্য দেশে মুক্তভাবে চলাচলে অনুমতি দেওয়া হয় । ১৫৯৫ সালে চতুর্থ হেনরি এক আদেশ জারি করে বলেন যে , ঋণদানের অক্ষম কৃষকদের গবাদিপশু ও কৃষি যন্ত্রপাতি আটক করা যাবে না । সুলি কৃষিকাজে কৃষকদের নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ , কৃষিজমি বৃদ্ধির লক্ষ্য জলাভূমি পরিষ্কার ,বনভূমি সংরক্ষণ ও পরিষ্কার পতিত জমি উদ্ধার এবং উন্নত জাতের গবাদিপশুর প্রজননেন উৎসাহিত করেন। এছাড়া কৃষির উন্নতির জন্য খাল-খনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় । এভাবে কৃষিতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় । ফলে নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাদ্যশস্য বিদেশে রপ্তানি করা হয় । 

গ) শিল্পের উন্নতি : 

কৃষির পাশাপাশি শিল্প ক্ষেত্রে ও চতুর্থ হেনরি মনোনিবেশ করেন । তার প্রচেষ্টায় ফ্রান্সে কার্পেট কাচ, ভেলভেট ,কাপড়, সিল্ক, পর্দা, মৃৎশিল্প ইত্যাদির কল কারখানা গড়ে ওঠে । তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্রব্যাদি প্রস্তুতকারকদের সর্বদাই উৎসাহ দিতেন । 

ঘ) পলেট ( Paulette ) : 

ফ্রান্সে রাজস্ব বিভাগ বা বিচার বিভাগের কোন পদ স্থায়ী ভাবে বিক্রি করা হতো । তুলির আইন অনুযায়ী এখন থেকে রাজস্ব বা বিচার বিভাগের কোন কর্মচারী তার পুত্রকে ওই পদে বসাবার পূর্বে সরকারকে পলেট  নামক করে দিয়ে বাধ্য করা হতো । 

ঙ) প্যারিস নগরী : 

চতুর্থ হেনরি প্যারিসকে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলেন । তিনি প্যারিসের নোংরা আবর্জনা দূরীভূত করে, রাস্তাঘাট সংস্কার করেন, সেতু কালভার্ট নির্মাণ করেন , আধুনিক ঘর-বাড়ী গড়ে তোলেন । প্যারিসকে আধুনিক শহরে পরিণত করার জন্য তিনি আবাসিক এলাকা এবং প্যারিসের সর্বত্র সুন্দর শহর পল্লী গড়ে তোলেন । ইটের ঘরের মধ্যে পাথর ও কাচ দিয়ে অপূর্ব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয় । এছাড়াও তিনি দেশের সর্বত্র যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে রাস্তাঘাট সেতু নির্মাণ ও খাল খনন করেন । 

বিদেশ নীতি : ( Foreign Policy)

চতুর্থ হেনরি পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন ।তার পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রাধান্য স্থাপন করা । এজন্য দরকার ছিল :-

ক) ফ্রান্সের রাজ্য সীমাকে প্রাকৃতিক সীমায় পৌঁছে দেওয়া । 

খ) স্পেন- অস্ট্রিয়া কে পরাজিত করা। কেননা অস্ট্রিয়ার পরিবারকে কৃতস্থান ফরাসিদের রাজ্যসীমা নিরাপত্তাকে বজায় রাখতে দেয়নি । সুতরাং তার পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে স্পেন ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ছিল অনিবার্য । 

ক) ভারভিণ সন্ধি ( Peace of Vervinus ) :

চতুর্থ হেনরির ফ্রান্সের সিংহাসনে আহরণের পূর্ব থেকে ফ্রান্সে স্পেনের সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল । ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে স্পেন রাজ দ্বিতীয় ফিলিপ এ সৈন্য মোতায়েন করেন । হেনরি ১৫৯৫ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । দীর্ঘ তিন বছর স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থেকে হেনরি উপলব্ধি করেন যে , শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ ভাবাপন্ন হয়ে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না । ফিলিপ দীর্ঘদিন নানা স্থানে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন । এমত অবস্থায় ১৫৯৮ সালে হেনরি স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধ পরিহার করে ভারভিন সন্ধি সম্পাদন করেন । এ সন্ধির দ্বারা ফিলিপ চতুর্থ হেনরি কে ফ্রান্সের রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন । ফ্রান্স থেকে স্পেনীয় সৈন্য ফিরিয়ে নেন এবং স্পেন অধিকৃত ফরাসি অঞ্চল ছেড়ে দেন । 

খ) গোপন কূটনীতি :

 স্পেন ও অস্ট্রিয়া কে মোকাবেলা করার উদ্দেশ্য হেনরি তুরস্ক , ইংল্যান্ড-পোল্যান্ড এর সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে আবদ্ধ হন । তিনি গোপনে তুরস্ককে হ্যাপসবার্গ  শাসিত অস্ট্রিয়াকে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেন । স্পেনের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডের বিদ্রোহীদের সমর্থন দেন ।1606 সালে জার্মানিতে যে প্রোটেস্ট্যান্ট ইউনিয়ন গড়ে ওঠে তার প্রতি ও তার সমর্থন ছিল। এভাবে তিনি অস্ট্রিয়া ও স্পেন কে সব সময় ব্যস্ত রাখতে সক্ষম হন। 

গ) ব্রেসি ও বাগে অধিকার : 

 চতুর্থ হেনরি ইতালির টাস্কেনি রাজ্যর ডিউকের ডিউকের কন্যা মেরি -ডি-মেডিসিকে বিয়ে করে ইতালিতে নিজ  প্রাধান্যন বিস্তার করেন । তিনি স্যাভয় আক্রমন করে ভসজেস নামক গিরিপেথের সম্মুথে ব্রেসি ও বাগে স্থান দুইটি অধিকার করেন ওই পথে ফ্রান্সের শত্রুর প্রবেশ করার পথ বন্ধ করে দেন । 

ঘ) হ্যাপসবার্গের  বিরুদ্ধে শক্তিজোট : 

১৬০৯ সালে জুলিক-ক্লিভস-বাগ এ তিনটি ক্ষুদ্র অংশের ডিউক অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় । এ  স্থান গুলো ছিল অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গের পরিবারের অর্থাৎ পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের বিপক্ষ শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ইংল্যান্ড, স্যাভয়, ভেনিস ও জার্মানির রাজন্যবর্গের কয়েকজনকে নিয়ে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে এক শক্তি সংঘ গঠন করেন । কিন্তু ১৬১০ সালে তিনি বেভায়লাক নামক এক উগ্র রোমান ক্যাথলিক এর হাতে নিহত হলে অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গের পরিবার এ শক্তি সংঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়  । পরবর্তীকালে রিশল্যু ও ম্যাজারিন তার  পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে অগ্রসর হন । 

এভাবেই চতুর্থ হেনরি এক বিশৃংখলার মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের ক্ষমতায় আসেন এবং ফ্রান্সের সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে । অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে তোলেন ,বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি ছিলেন বুরবোঁ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা । বুরবোঁ  রাজবংশের যে বীজ বপন করেছিলেন চতুর্দশ লুইয়ের এর সময় তা বিকশিত হয় । তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ২০০ বছরের অধিক সময় ফ্রান্সের রাজা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল । 

সুলির অর্থনৈতিক সংস্কার : ( Economic Reforms of Sully )

১৫৮৯ সালের চতুর্থ হেনরি যখন ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহন করেন তখন ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় । দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে ফ্রান্সে ব্যবসা-বাণিজ্য ,কৃষি-শিল্প, প্রভৃতির ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল । জাতির আর্থিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে পড়েছিল । এমন সময়ে ১৫৯৮ সালে চতুর্থ হেনরি তার বাল্যবন্ধু Maxemilear-de-Bethubn বা  Duke of sully কে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন । সুলি দিলেন গম্ভীর,দৃঢ়চেতা ,ন্যায়পরায়ণ ও কৃপন স্বভাবের মানুষ। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নিম্নে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো : 

১) রাজস্ব সংস্কার : 

সুলি অবৈধ কর আত্মসাৎকারী ,সরকারি দুর্নীতিবাজ অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । তিনি অবৈধ চাকরির নিয়োগগুলো  বাতিল করে দেন । ফলে সরকারের অনেক অর্থের সাশ্রয় হয় । তিনি কর আদায়ের পুরনো ব্যবস্থাকে বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । তিনি কেন্দ্রীয় গভর্নরের অনুমতি ছাড়া প্রাদেশিক গভর্নরদের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন । আয়-ব্যয়ের হিসেব এর ব্যাপারে কঠোর নিরীক্ষণ এর ব্যবস্থা করেন । যাজক ও অভিজাত শ্রেণীর কর মুক্ত থাকলেও জরুরি অবস্থা তাদের কাছ থেকে কর আদায় নীতি স্বীকৃতি হয় । তিনি টেইলি, গ্যাবেল, এইড, দোয়েনস প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের কর যাতে নিয়মিত ভাবে আদায় হয় সেই ব্যবস্থা করেন । এভাবে সুলির নেতৃত্বে পরিচালিত সংস্কারের ফলে ১৬১০ সালে ফ্রান্সের জাতীয় ঋণ শুধু কমেনি বরং জাতীয় সঞ্চয় দশ হাজার  ১০০০০ লিভরে বৃদ্ধি পায় । 

২) কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কার : 

তিনি কৃষির উন্নতির জন্য যথেষ্ট সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করেন । তিনি কৃষির উন্নতির জন্য খাল-খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন । নিম্ন জলাভূমি থেকে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে , জলাভূমি পরিষ্কার ও উন্নয়ন করে, সেচের ব্যবস্থা করে, পতিত জমি আবাদের ব্যবস্থা প্রভৃতি কাজ করে কৃষিকে সমগ্র ফ্রান্সে ছড়িয়ে দেয় । তিনি বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । পশুপাখি প্রজননে উৎসাহিত করেন । তিনি কৃষিজাত দ্রব্যের উপর বিভিন্ন আঞ্চলিক কর এবং রপ্তানি শুল্ক তুলে দিয়ে ফ্রান্সের কৃষি ও কৃষকের উন্নতির কত করে দেন এর ফলে পাঞ্চ খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে খাদ্যশস্য বিদেশে রফতানি করে প্রচুর অর্থ অর্জন করতে পারতো । 

৩) শিল্পক্ষেত্রে : 

সুলি কৃষির উন্নতির পাশাপাশি শিল্পের প্রসারের চেষ্টা করেন । তবে তিনি ওই সময়কার মার্কেনটাইল নীতি নামক ভুল নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বলে শিল্পজাত দ্রব্যের উপর শুল্ক বসিয়ে শিল্পের উন্নতির পথ কিছুটা বন্ধ করেছিলেন । তার পরেও তার সময়ে ফ্রান্সে কার্পেট, কাট,ভেলভেট, বস্ত্র, সিল্ক, পর্দা, মৃৎশিল্পের উন্নতি হয় । দেশের সমৃদ্ধি আনায়নে তিনি সর্বাধিক চেষ্টা করেন । 

৪) বাণিজ্য ক্ষেত্রে : 

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য সুলি অসংখ্য রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ এবং খাল খনন করেন । মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে আন্ত বাণিজ্য শুল্ক তুলে দেন । ইংল্যান্ড, হল্যান্ড ও তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হন । এসময় ভারতে ফরাসি বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয় এবং আমেরিকায় উপনিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয় । 

৫) পলেট ( Paulette ) : 

রাজকীয় আয় বৃদ্ধির জন্য সুলি আরেকটি পন্থা বের করেন । আগে প্রশাসনিক ও বিচারকের পদ বিক্রয় করা হতো এবং যারা পদ কয় করত তারা বংশানুক্রমিকভাবে তা ভোগ করত । সুলি নিয়োগ করলেন যে,  বিচার ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের উত্তরাধিকাররা ওই সব পদ ভোগ করতে হলে সরকারকে পলেট নামক এক ধরনের করে দিতে বাধ্য থাকিবে । 

৬) সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে : 

সুলি  “ General Master Lartillerie “ (1599-1610) পদে নিযুক্ত হলে সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব পান । তিনি সেনাবাহিনীর জন্য মাসিক ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন । প্রতি জেলায় একজন করে লেফটেন্যান্ট নিযুক্ত করেন । সেনাবাহিনীর টেকনিকেল ব্রাঞ্চ এর উন্নতির জন্য প্রকৌশলী প্রকৌশলী সংস্থা গড়ে তোলেন।  সেনা নিয়োগের ক্ষেত্রে কতিপয় শর্ত আরোপ করেন যেমন :-

ক) রাজার কৃতিত্ব মানতে হবে ,

খ) প্রত্যেককে একই পোশাক পরিধান করতে হবে এবং 

ঘ) প্রত্যেক সদস্যকে তাত্ত্বিক জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে । 

সুলির এসব পদক্ষেপের ফলে একটি সুশৃঙ্খল উন্নত মানের সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। এর পাশাপাশি তিনি নৌবহর ও নৌ বাহিনী গড়ে তোলেন । এর ফলে জল ও স্থল ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার হয় । নৌবহরের কারণে নিরাপদে বৈদেশিক ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম চলতে থাকে । 

৭) প্যারিস নগরী : 

রাজধানী প্যারিস কে তিনি আধুনিক শহরে পরিণত করেন । এতে প্রশাসনিক ও আবাসিক এলাকায় বিভক্ত হয় । প্যারিসের সর্বত্র সুন্দর শহর পল্লী গড়ে তোলেন । ইটের ঘরের মধ্যে পাথরের কারুকার্য দিয়ে অপূর্ব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয় । 

পরিশেষে একথা বলা যায় যে , সুলি তার অর্থনৈতিক সংস্কার দ্বারা ফ্রান্সের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন । রাজা চতুর্থ হেনরির অর্থ উপদেষ্টা বা অর্থমন্ত্রীর নিযুক্ত হলে, তিনি নিজ যোগ্যতায় ,মেধা, অক্লান্ত প্রচেষ্টা দ্বারা, কৃষি-শিল্প, কর ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে ফ্রান্সের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আনয়ন করেন । তার বড় কৃতিত্ব হল তিনি ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সঙ্কট দূর করে অর্থনৈতিকভাবে ফ্রান্স কে শক্তিশালী করতে সক্ষম হন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

64 ÷ = 8