মহামতি পিটার ( ১৬৮২-১৭২৫)

Peter , the Great ( 1682-1725 ) 

মহামতি পিটার ( Peter , the Great  )

রাশিয়ার ইতিহাসে পিটার দি গ্রেট ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি । মাইকেল রোমানভ বংশের উত্তরাধিকারী পিটার দি গ্রেট শক্তিশালী এবং রাশিয়া গঠনে খুবই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন । মহামতি পিটার এর আমলে রাশিয়ার কার্যত মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশ করে । ১৬৭২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৮২ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি এবং তাঁর ভাই অ্যালেক্সিস এর ২য় থিওডোর  যুক্তভাবে রাশিয়ার শাসক নিযুক্ত হন । তাদের বোন সোফিয়া ছিলেন রাজপ্রতিনিধি । ১৭ বছর বয়সে ১৬৮৯ সালে তিনি নিজ পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্যদের হত্যা ও বিতাড়িত করে রাশিয়ার একছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন । 

অভ্যন্তরীণ সংস্কারের উদ্দেশ্য ( Purposes of Internal Reforms  ) :

পিটার যখন রাশিয়ার সিংহাসনে আহরণ করেন তখন রাশিয়া ছিল ইউরোপের থেকে বিচ্ছিন্ন একটি পশ্চাদপদ দেশ । রেনেসাঁস ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে বাইরে ছিল রাশিয়া। সামাজিক ,সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ,ও অর্থনৈতিক কোন ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় জাতি সমূহের সঙ্গে রাশির তুলনা চলে না।  কিন্তু পিটার এই অবস্থা পরিবর্তনের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।  এজন্য তিনি পেয়েছিলেন : –

ক) ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে রাশিয়াকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক মর্যাদাশীল এবং শক্তিশালী দেশে পরিণত করা । 

খ) রাশিয়াকে দ্রুত পশ্চিমাকরন প্রক্রিয়া দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া । 

গ) যারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা । 

বিদেশ ভ্রমণ : 

পিটার উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে , আধুনিক রাশিয়া গড়তে হলে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান এর বিকল্প নেই । পাশ্চাত্য সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য ১৬৯৭  সালের মার্চ মাসে তিনি ছদ্মবেশে ২৫৫ জন সহচর নিয়ে ইউরোপ ভ্রমণে বের হন । তিনি ইউরোপের জার্মানি অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের সফর করে সেখানকার মিল-কারখানা, জাহাজনির্মাণ ,জাদুঘর হাসপাতাল ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তিনি জার্মানিতে গোলাবারুদ এর উপর একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স  সম্পন্ন করে ডিপ্লোমা অর্জন করেন । তিনি পোল্যান্ডের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জাহাজ নির্মাণ কৌশল আয়ত্ত করেন । ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি স্থাপত্য , প্রকৌশল, দূর্গ নির্মাণ, প্রাণিবিদ্যা ,উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন । তার ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা ছিল । কিন্তু স্ট্রেলসি  বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে ১৮ মাস ইউরোপ ভ্রমণ করে ১৬৯৮ সালের আগস্ট মাসে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরে আসেন এবং সংস্কার কাজে মনোনিবেশ করেন । 

পিটারের সংস্কারসমূহ ( Reforms of Peter ) : 

১) সেনাবাহিনী পুনঃগঠন : 

পিটারের সংস্কারে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সেনাবাহিনী গঠন করে রাশিয়ার রাজাশক্তি বৃদ্ধি করা। এজন্য তিনি স্থায়ী, নিয়মিত, অনুগত বেতনভোগী সেনাবাহিনী গঠন করতে সচেষ্ট হন।  পিটারের সৈন্যবাহিনীর সদস্যদের সমাজের সকল স্তরে থেকে সংগ্রহ করা হতো । প্রত্যেক প্রদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা হয় । সৈন্যবাহিনীর ভরণপোষণের ব্যয় রাজকোট থেকে দেওয়া হয় । প্রতি ২০ টি কৃষকের ঘর থেকে একজন সৈন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এছাড়া পিটার অভিজাত শ্রেণীর আলস্য করে সৈন্যবাহিনীতে নাম লিখতে বাধ্য হন । এর ফলে নতুন অভিজাত বা মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়।  যারা জমির মালিক সৈন্যবাহিনী ও জারের প্রতি অনুগত ছিল ।রাশিয়ার সৈন্য বাহিনীতে পশ্চিমা বাভধারা নিয়ে আসার লক্ষ্যে অশ্বারোহী , গোলন্দাজএবং পৃথক সরবরাহ বিভাগ গঠন করা হয়।  পোল্যান্ডের যুদ্ধের এ্যালেক্সিস সময় রাশিয়ার ১০ হাজার সৈন্য বাহিনী ছিল । পিটারের সংস্কারের ফলে ১৭০৯ সালে রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ালো দুই লক্ষে ।  

২) নৌ -বাহিনী গঠন : 

সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ১৭০৩ সালে পিটার একটি নৌবাহিনী গড়ে তোলেন । এতে ৬ টি ফ্রিগ্রেট , ৪৮ টি যুদ্ধজাহাজ, ৮০০ টি গ্যালিস বা  মাঝারি জাহাজ এবং ৩০ হাজার নাবিক ছিল ।

৩) সিনেট গঠন: 

জারের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য বোয়েরদের ”ডুমা” নামক যে অভিজাত সভা বা জেমসকি সবোর ( Zemoski Sebor ) নামক সাধারণ সভা ছিল তা বাতিল করা হয় । এগুলোর পরিবর্তে পিটার মনোনীত ৯ জন সদস্য নিয়ে সিনেট (Senate ) নামে এক রাজকীয় সভা গঠন করেন । পিটার এর সবার পরামর্শ শুনতেন । পিটারের অনুপস্থিতে এসবা শাসনকার্য পরিচালনা করার ক্ষমতা লাভ করে । 

৪) স্ট্রেলসি ও বোয়েরদের নিয়ন্ত্রণ : 

সিনেট গঠনের সাথে রাশিয়ার জনগণকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা তিনি নিয়ে আসেন । শক্তিশালী জারতন্ত্র গঠনের জন্য তিনি সর্বত্র ব্যবস্থা নিতে থাকেন। জারের উপর বোয়ারদের যে নিয়ন্ত্রণ ছিল তা তিনি অপসারণ করে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত জারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন ।স্ট্রেলসি  নামক জারের দেহরক্ষীরা ছিল অতি প্রভাবশালী। এরা প্রায় সময় পেলে বিদ্রোহ করত। পিটার কঠোর হস্তে দমন করবেন। তিনি স্ট্রেলসি  সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দেন। তার পরিবর্তে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত জারের উপর নিয়ন্ত্রক সেনাবাহিনী নিয়োগ করেন । 

৫) শাসন প্রণালী : 

পিতার বিশৃংখল প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা কে পুন:গঠন করেন । সমগ্র দেশকে ১২টি প্রদেশে এ এবং ৭২টি কাউন্টি বা  বিভাগে বিভক্ত করেন । প্রদেশগুলো একজন গভর্নর এবং ক্ষুদ্র সহায়ক সভা (ল্যান্ডব্যাথ )  দ্বারা পরিচালিত হয় ।সহায়ক সভার  সদস্যরা অভিজাত শ্রেণী কৃত্যক মনোনীত হতো । প্রত্যেকটি প্রদেশ কতগুলো কাউন্টিতে,  কাউন্টি আবার কতগুলো জেলায় বিভক্ত ছিল। শহর এলাকায় একটি করে পৌরসভায় স্থাপন করা হয় । রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একক ছিল মির । প্রত্যেকটি গ্রামকে মির এর আওতায় আনা হয় । কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তিনি তাঁর অধীনে দশটি মন্ত্রণালয় গঠন করা হয় যা যুদ্ধ অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা কৃষি ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকতো । এভাবে দেশে প্রতিটি স্তরে জারের শাসন সুসংগত করা হয় । 

৬) ধর্মীয় চার্চকে নিয়ন্ত্রণ : 

পিটারের সংস্কারে বড় শত্রু ছিল ধর্মান্ধতার চার্চ । তাই তিনি চার্চের ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দেন। রাশিয়ায় চার্চের প্রধান শাসক কে বলা হত প্যাট্রিয়ার্ক ( Patriarch ) । পিটার প্যাট্রিয়ার্ক পদ বিলুপ্ত করে । ১৭০০ সালে এ্যাড্রিয়ান মারা গেলে ২১ বছর তিনি কোন উত্তরাধিকার মনোনীত করেননি । ১৭২১ সালে প্যাট্রিয়ার্ক এর  ক্ষমতা একটি কমিশনের উপর ন্যাস্ত করেন যা পবিত্র সভা ( Holy Synod ) নামে পরিচিত ।  পবিত্র সভা জারের এর অধীনে ছিল । পবিত্র সবার অনুমোদন ব্যতীত ধর্মীয় সংক্রান্ত কোনো নিয়োগ হতো না । এমনকি এ সভার অনুমতি ছাড়া কোন বই প্রকাশ করা যেত না । এভাবে পিটার ধর্মীয় সংস্থাকে তাকে রাষ্ট্রীয় সংস্থা এবং যাজক সম্প্রদায় কে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের পরিণত করেন । 

৭) চাকরিভিত্তিক অভিজাত শ্রেণী ( Service nobiloty ) : 

পিটার অভিজাত সম্প্রদায়ের পুত্রদের বিদেশে পড়াশোনার নির্দেশ দেন। তাদেরকে তাদের পিতা দের মত আজীবন সেনাবাহিনী, সরকারি এবং শিল্পকারখানায় কাজ করার ব্যবস্থা করেন । এদের কাজ হলো জারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা । এভাবে তিনি চাকরি ভিত্তিক অভিজাত শ্রেণী গঠন করেন । পরবর্তীকালে এরাই মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নামে পরিচিত লাভ করে । অভিজাত শ্রেণী যারা সহকারী পদে আসীন ছিলেন তাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল না । এরা জারের অনুগত বৃত্তে পরিণত হন । কেননা সহকারী পদে যোগদানের পূর্বে তাদের জারের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়ার নিয়ম চালু করা হয় । 

৮) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে : 

পিটার সমসাময়িক ইউরোপের মার্কেন্টাইলবাদের বিশ্বাসী ছিলেন । অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে তিনি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনেন । অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে রাশিয়াকে তার নিজস্ব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে হবে । কাঁচামাল নয় বরং তৈরি পণ্য বিদেশে রফতানি করতে হবে এই নীতি প্রবর্তন করেন । তার উৎসাহে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে । এসব কারখানায় বস্ত্র, যুদ্ধের সরঞ্জামাদি তৈরি করা হয় । বিভিন্ন জায়গা অনাবিষ্কৃত খনিজ উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয় । তিনি জার্মানির মতো রাশিয়ার গিল্ড প্রথা চালু করেন । তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশি শিল্প রাশিয়া কল কারখানা  স্থাপনে আহ্বান জানান । 

এছাড়া পিটার কৃষি ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য অধিকতর উন্নত বীজ, সার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেন । ১৬৯৮  থেকে ১৭২৫ সালের মধ্যে তিনি নানাভাবে খাজনা উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন। গৃহস্থালি  এবং ব্যক্তিগত উভয় বিষয়ের উপর কর আরোপ করা হয়। এছাড়া সিগারেট ,তামাক, কবরস্থান সবকিছুর উপর কর আরোপ করা হয়।  এভাবে তিনি পূর্বে এক লক্ষ বিশ হাজার ফুলের পরিবর্তে 2 লক্ষ 50 হাজার রুবল খাজনা আদায় করেন । 

৯) শিক্ষা ক্ষেত্রে : 

পিতার শিক্ষার উপর জোর দেন । তার সময় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় । বিভিন্ন জায়গায় প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষার স্কুল খোলা হয় । পাশ্চাত্য ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, গণিত ,সামরিক বিদ্যা ইত্যাদি স্কুলের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয় । মস্কো ও সেন্টপিটার্সবার্গে তিনি যেসব স্কুল খোলেন  ছিল সামরিক বৃত্তি মূলক  ।এসব স্কুলে ইঞ্জিনিয়ারিং, নো- বিদ্যা,হিসাব বিদ্যার উপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় । এছাড়াও তিনি একটি বিজ্ঞান পরিষদ (Academy of Science )  গঠন করেন । তিনি রাশিয়ার প্রধান প্রধান শহরে হাসপাতাল মেডিসিন কলেজ স্থাপন করেন ।বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয় । ফলে রূশ ভাষায় মৌলিক গ্রন্থ রচিত হয় । তাঁর সময়ে বর্ণমালা সংস্কার করা হয় । পূর্বের আটটি বর্ণ প্রত্যাহার করা হয় এবং আরো কিছু বর্ণ সহজীকরণে ব্যবস্থা করা হয় এছাড়াও পিটার রাশিয়াতে যিশু খ্রিস্টের জন্ম সাল অনুসরণ করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন । নতুন পঞ্জিকা অনুসারে সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে নতুন বছর শুরু হয় জানুয়ারিতে । 

১০) সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে : 

পিটার ছিলেন পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসারী । তিনি রাশিয়া জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্য আচার ,ব্যবহার ,সভ্যতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ,পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি প্রবর্তন করেন । লম্বা দাড়ি, টিলার -ঢালা পোশাক, ছিল রাশিয়ার পুরনো ধর্মীয় ঐতিহ্য । কিন্তু পিটার ওইসব নিষিদ্ধ করেন । এমনকি দাড়ি রাখার উপর কর ধার্য করেন । উচ্চ শ্রেণীর মেয়েদের পর্দা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন । স্বামী স্ত্রী একত্রে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় । সাধারণ চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার রীতি চালু হয় । ধূমপানের অনুমতি দেওয়া হয় । প্রাচ্য প্রথা অনুযায়ী সম্রাটের সম্মুখে মাথা ঢুকিয়ে কুর্নিশ করার রীতি বাতিল করা হয় । 

১১) রাজধানী স্থানান্তর : 

প্রাচীন মস্কো নগরী পুরাতন ভাবধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে 

১৭০৩ সালে পিটার সেন্ট পিটার্সবার্গে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন । নেভা নদীর এক পাশে দ্বীপ , অন্যদিকে জলাভূমি বেষ্টিত সেন্ট পিটার্সবার্গ গড়ে ওঠে । একে অপূর্ব সুন্দর নির্মাণ শৈলীতে সাজানো হয় । এর মধ্যে ছিল শীতকালীন প্রসাদ, বারূক শিল্পরীতিভিত্তিক রাজকীয় ও সুনিপুণ কারুকার্যময় প্রসাদ বাগান ইত্যাদি । ভার্সাই যেমন চতুদশ লুই এর শাসন কে চিহ্নিত করে, সেন্ট পিটার্সবার্গ তেমনই মহামতি পিটারের কীর্তিময় শাসন সংস্কার চিহ্নিত করে  । 

মূল্যায়ন : 

তবে এসব সংস্কারসমূহ করতে গিয়ে পিটারকে অভিজাত যাজক ও রক্ষণশীলদের বিরোধিতা বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয় । তিনি কঠোর হস্তে তাদেরকে দমন করেন । এমনকি তার পুত্র ক্ষমতায় এসে পাশ্চাত্য সংস্কারের অবসান ঘটানোর ইচ্ছা পোষণ করলে, পিটার ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার নির্দেশ দেন । একথা ঠিক যে, দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজত্বকালে পিঠার অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা স্থাপন ,অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা কমিয়ে, চার্চের ক্ষমতা কমিয়ে,ডুমার প্রাধান্য লোপ ,আধুনিক সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী আমলা গঠন , ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার ,নতুন রাজধানী স্থাপ,ন জনসাধারণকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধকরণ করে রাশিয়ার জাতীয় জীবনকে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেন । পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় রাশিয়ার  জাগরন পরে  শুরু হয় বিদায় রাশিয়াকে ইউরোপীয় সভ্যতা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান বলা হয় । 

পিটারের পররাষ্ট্রনীতি ( Foreign Policy of Peter ):

যেহেতু পিটারের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে ইউরোপীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসা । সেহেতু তার পররাষ্ট্র নীতি ছিল:

ক) বাল্টিক অথবা কৃষ্ণসাগরের সম্ভব হলে  উভয় সাগরেই রাশিয়ার প্রবেশপথ নিশ্চিত করা । ( বাল্টিক ও কৃষ্ণ সাগরের পানি বারো মাস তরল থাকে অর্থাৎ বরফ পানির অঞ্চল থেকে উষ্ণ পানিতে প্রবেশ করার এই যে বৈদেশিক নীতি তা উষ্ণজল নীতি নামে পরিচিত । একমাত্র শ্বেত সাগর ভিন্ন অন্য কোন জলপথ রাশিয়ার নিকট উন্মুক্ত ছিল না । শ্বেত সাগর ৯ মাস বরফে ঢাকা থাকতো । তাই তিনি উত্তর বাল্টিক সাগর থেকে দক্ষিনে কৃষ্ণসাগরের মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগরের ঢোকার চেষ্টা করেন । 

খ) এই দুই সাগরের পথ ধরে পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ স্থাপন করার প্রচেষ্টা করেন । 

পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নের সমস্যা : 

মহামতি পিটার যখন রাশিয়ার সিংহাসনে আরোহন করেন তখন রাশিয়া ছিল ভৌগলিক, সামাজিক ,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি পশ্চাদপদ দেশ । আর্টিক থেকে কাম্পিয়ান সাগর এবং জাপান । উপসাগর থেকে কিয়েভ পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে রুশ সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল । শ্বেত সাগরের তীরে অবস্থিত আঁচেঞ্জল বন্দর  বছরে নয় মাস বরফে আচ্ছাদিত থাকতো । পোলিশ ও সুইডিশরা কৃষ্ণসাগরের রাশিয়ার প্রবেশ বন্ধ করে দেয় । অপর কোন পথে রাশিয়ার সমুদ্র অভিমুখে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না । এভাবে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে রাশিয়ার ইউরোপের পাশ্চাত্য সভ্যতা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ে । রেনেসাঁস ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ রাশিয়ায় লাগেনি । রাশিয়া ছিল প্রাচ্য দেশীয় সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত । পিটার ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে রাশিয়াকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক মর্যাদাশীল ও শক্তিশালী দেশ পরিণত করতে চান এবং রাশিয়াকে দ্রুত পশ্চিমাকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান অর্থাৎ পশ্চিমের জানালা খুলতে চান । পিটারের এই পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতিকূল পরিবেশ ও ভূগোলিক অবস্থার  প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । তারপরও রাষ্ট্রনীতি সফল করতে হলে সুইডেন ও তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার সংঘাত ছিল অনিবার্য । কারণ এইসময় বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী স্থানসমূহ ( ফিনল্যান্ড ,এস্তোনিয়া ,ইনগ্রিয়া , পশ্চিম পোমারনিয়া )   সুইডেন উত্তরের শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয় । আবার কৃষ্ণসাগর ছিল তুর্কি সাম্রাজ্যভুক্ত। তাই এই দুই সাগরের প্রবেশ করতে গেলে সুইডেন ও তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে । 

অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংঘাত : 

১৯৯৬ সালে পিটার রাশিয়ার জাত শত্রু অটোম্যান সাম্রাজ্যের ( তুর্কিদের ) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং এ্যাজয় বন্দর দখল করেন । কিন্তু বসফোরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীদ্বয়ের  উপর কোন অধিকার না থাকায় কেবলমাত্র এ্যাজভ বন্দর দখল করেন । কিন্তু বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীরুপোর কোন অধিকারে না থাকায় কেবলমাত্র অজয় বন্দর দখল করে এই পথে ভূমধ্যসাগরের পৌঁছানো রূশদের পক্ষে সম্ভব ছিল না । তবে এ সময় তিনি তুর্কিতে বিরুদ্ধে ইউরোপে মিত্র খোঁজার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন । 

সুইডেনের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করার প্রচেষ্টা : 

ডেনমার্ক, পোল্যান্ড , ব্রানডেনবার্গে সুইডেনের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল । পিটার সুইডেনের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করে এর পোতাশ্রয় গুলো দখল করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন । এ সময়ে এক সুবর্ণ সুযোগ ও চলে আসে । তাহলো সুইডেনের সিংহাসনে ক্ষমতাসীন হন পঞ্চদশ অনভিজ্ঞ রাজা দ্বাদশ চার্লস । রাশিয়া এবং আশেপাশের রাজারা মনে করেছিলেন যে , তরুণ রাজার অপরিপক্কতা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুইডেনকে তারা ভাগ করতে সক্ষম হবেন । ১৬৯৯ সালে গঠিত রাষ্ট্রদূতের খবর পাওয়া মাত্র তাদের একত্রিত হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে দ্বাদশ অতর্কিতে ডেনমার্ক আক্রমণ করেন । ডেনমার্কের রাজা চতুর্থ ফ্রেডারিখকে চার্লস অত্যন্ত অপমানজনক চুক্তি সম্পাদনে বাধ্য করেন (১৭০০ সালে ) । 

সুইডেনের সঙ্গে রাশিয়া ও পোল্যান্ডের যুদ্ধ : 

ডেনিসদের  পরাজিত করে চার্লস রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন । ১৭ সালের নভেম্বর মাসে নাভা নদীতে উভয়পক্ষ মিলিত হয় । চার্লস মাত্র ৮ হাজার সৈন্য নিয়ে রাশিয়ার ৪০ হাজার সৈন্যবাহিনী কে পরাজিত করেন । তবে চার্লস রাশিয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে তিনি তার তৃতীয় শত্রু পোল্যান্ড আক্রমণ করেন । দীর্ঘ সাত আট বছরের যুদ্ধ চালিয়ে তিনি ১৭০৬ সালে  রাজধানী ওয়ারসো  লাভ করেন এবং পোল্যান্ডের রাজা অগাস্টসকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার মনোনীত ব্যক্তি স্টেনিগলস জেলেস্কিকে রাজা বানান । 

রাশিয়ার চূড়ান্ত বিজয় : 

১৭০৮ সালে দ্বাদশ সার্লস ৩৩ হাজার সৈন্য নিয়ে রাশিয়া আক্রমন করে মস্কোর দিকে অগ্রসর হন। মস্কো দখলে ছিল তার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য । কিন্তু মস্কো থেকে তারা তখন ও  অনেক দূরে । এ যুদ্ধে রাশিয়া রক্ষণাত্মক ভূমিকা পালন করে । রাশিয়ায় তখন পড়ল স্মরণকালের তীব্র শীত । খাদ্য ও অন্যান্য সরবরাহ ফুরিয়ে আসছে থাকে । ফলে বিভিন্ন রোগে অনেক সৈন্য মারা যায় । এদিকে রাশিয়ার বাহিনী ক্রমা অগ্রসরতার কারণে সুইডিশ বাহিনী দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং সেখানে কসেক উপজাতির সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয় ।১৭০৯  সালে উভয় বাহিনী পোলটোভার মুখোমুখি হয় । এই যুদ্ধে পিটার চার্লসকে  প্রধানত করতে সক্ষম হন এবং বহু  সুইডিশ সৈন্য বন্দী হন । চার্লস তুর্কি সাম্রাজ্য আশ্রয় নেন । পোলটোভায়ে  রাশিয়ার বিজয় ইতিহাসে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী  হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে । 

রাশিয়ার আধিপত্য : 

১৭২১ সালে সুইডেন ও রাশিয়ার মধ্যে ন্যসডেট চুক্তি সম্পাদিত হয় । এ চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া লিভোনিয়া, এস্তোনিয়া,  ইনগ্রিয়া পায় । এভাবে সুইডেন বাল্টিক উপকূলে তার একচেটিয়া অধিকার হারায় । রাশিয়া ফিনল্যান্ড বা পশ্চিম  দিকের জালানা খুলে দিতে সক্ষম হয় । পিটার তার এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে সেন্ট পিটার্সবার্গে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন বাল্টিকের জালানা হিসাবে । ন্যাসডেট চুক্তি বাল্টিক তথা উত্তর ইউরোপের সুইডিশ আধিপত্য ভেঙ্গে যায় এবং তার জায়গা রাশিয়া দখল করে নেয় । 

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , পিটার তার বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির দাঁড়া পশ্চাদপদ রাশিয়াকে ইউরোপের অন্যতম মর্যাদাশীল ও শ্রেষ্ঠ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন । তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগরের প্রবেশ করা এবং পশ্চিমের জানালা খুলে দেওয়া । তার স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি সুইডেনের সঙ্গে বিরামহীনভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তৎকালীন সুইডেনের স্থলে রাশিয়াকে উত্তরের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন । যদিও তিনি কৃষ্ণ সাগরের দিকে তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারেননি । তবে তিনি রাশিয়াকে একত্রিত করেন । রাশিয়ার সীমানা বৃদ্ধি করেন । এভাবে ইউরোপীয় রাজনীতিতে রাশিয়া কমিশনার গুরুত্বপূর্ণ হতে শুরু করে । ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে পিটার মৃত্যুর মুখে পতিত হন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + = 14