চতুর্দশ লুই ( ১৬৪৩-১৭১৫ )

Lousi XIV ( 1643-1715 ) 

চতুর্দশ লুই ( Lousi XIV )

১৬৩৮ সালে চতুর্দশ লুই জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ লুইয়ের পুত্র এবং বুববোঁ বংশের প্রতিষ্ঠাতা চতুর্থ হেনরির নাতি । ১৬৪৩  সালে তিনি পাঁচ বছর বয়সে ফ্রান্সের  সিংহাসনে আরোহন করেন । এ সময় প্রধানমন্ত্রী ম্যাজারিন রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন । ১৬৬১ সালে ম্যাজারিনের মৃত্যু হলে চতুর্দশ লুই ফ্রান্সের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নিজ হাতে গ্রহণ করেন । সাত বছর বয়সে ফিলিপ কটির নামক শিক্ষকের অধীনে তিনি ইতিহাস-ভূগোল, পৌরাণিকশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র, ল্যাটিন ভাষা ইত্যাদি শিক্ষা লাভ করেন । একটি বৃহৎ দেশের রাজা হিসেবে তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । ক্ষমতা, কর্মদক্ষতা, শৌর্য-বীর্য,নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা তাকে ইউরোপে সর্বশেষ্ঠ শাসকে পরিণত করে । এসময় ইউরোপীয় রাজনীতিতে তিনি একটি মডেল হিসেবে আর্বিভূত হন ।চতুর্দশ লুই এর শাসন নীতি কে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । যথা: 

১) অভ্যান্তরীণ শাসন নীতি ( Internal Policy )

২) বৈদেশিক শাসন নীতি ( Foreign Policy ) 

অভ্যন্তরীণ নীতি ( Internal Policy ) . 

চতুর্দশ লুই এর অভ্যন্তরীণ শাসন নীতির মূলমন্ত্র স্বৈরতন্ত্র G স্বৈরাচারী ক্ষমতা বাস্তবায়নে তিনি কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । যেমন: –

ক) একনায়কতন্ত্র সুলভ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা জন্য দরকার শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন করা । 

খ) ধর্মানুষ্ঠানের উপর থেকে পোপের প্রাধান্য খর্ব করে একে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা । 

গ) রাজকীয় মর্যাদা কার্যকরী করার উদ্দেশ্যে ভার্সাই নামক স্থানে রাজসভা গঠন করা । 

ঘ) জনসাধারণের মধ্যে রাজতন্ত্র সম্পর্কের শ্রদ্ধা ও অনুগত সৃষ্টি করে । 

এসব নীতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ শাসনকার্য পরিচালনা করেন । 

১) সর্বাত্মক রাজশক্তি : 

চতুর্দশ লুই ছিলেন নিঃসন্দেহে একজন স্বৈরাচারী শাসক । তার আমলে রাজতন্ত্র চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হয় । তিনি কারো সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি তে বিশ্বাসী ছিলেন না । তিনি নিজেই ছিলেন নিজের প্রধানমন্ত্রী । তিনি কেন্দ্র ও প্রদেশের স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমুহের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণ করেন এবং পার্লামেন্ট অব প্যারিস নামক বিচার সবার রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেন । তিনি বিশ্বাস করতেন যে,  তার কাজের জন্য তিনি ঈশ্বরের নিকট দায়ী ,অন্য কারো কাছে নয় । তিনি রাষ্ট্রকে নিয়ে সবার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন এবং বলেন “ State? I am the State .” 

2) রাজসভা: 

 চতুর্দশ লুই তার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে কার্যকারী করার জন্য কয়েকজন উপদেষ্টা নিয়ে রাজসভা গঠন করেন । রাজার মনোনীত ব্যক্তিরাই এ সভার  সদস্য হতেন । তাদের নিয়োগ ও স্থায়িত্ব রাজার ইচ্ছার উপর নির্ভর করত । তার আমলে মন্ত্রীদের প্রাধান্যের বিলুপ্তি ঘটে । মন্ত্রীরা ছিল তার অনুগত কর্মচারী । চতুর্দশ লুই চারটি বিভাগ দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন । সেগুলো হচ্ছে :-

ক) কাউন্সিল অব টেস্ট ( Council of state ) :

গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং পররাষ্ট্র বিভাগ পরিচালনা করা ছিল এর কাজ । এর সদস্য সংখ্যা ছিল 5 জন । রাজা ছিলেন এর সভাপতি । রাজার অনুপস্থিতে চ্যানেসলর এ সভার সভাপতিত্ব করতে পারতেন । 

খ) কাউন্সিল অব ডেসপ্যাচ ( Council of despatch ) : 

প্রাদেশিক শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্বে এ সভায় ছিল । প্রাদেশিক শাসনকর্তা কে নির্দেশ দেওয়া , ইনটেনডেন্ট নামক কর্মচারীদের সাহায্যে স্বদেশে শাসন ব্যবস্থা সাথে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা যোগাযোগ রক্ষা এবং সাধারণ আইন প্রণয়ন করা ছিল এ সভার কাজ । 

গ) কাউন্সেল অব ফিনান্স ( Council of finance ) : 

রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় আইন প্রণয়ন এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অর্থ বরাদ্দ করা ছিল এ সবার দায়িত্ব । 

ঘ) প্রিভি কাউন্সিল ( Privy Council ): 

এটি ছিল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বিচারালয় । এর কাজ ছিল বিচারকার্য পরিচালনা করা।  রাজার নির্দেশে এই বিভাগ সর্বোচ্চ বিচারকার্য পরিচালনা করত। 

৩) আমলা শ্রেণীর সৃষ্টি : 

স্বৈরাচারী ক্ষমতাকে কার্যকরী করতে গিয়ে রাজা আমলা শ্রেনীর  সৃষ্টি করেন ।সাধারণত মধ্যবিত্ত শ্রেণী হতে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হতো । এতে একদিকে এদের কাছ থেকে অবিচল আনুগত্য পাওয়া যেত , অন্যদিকে অভিযাত্রার শাসনব্যবস্থা প্রবেশ করে ক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ পেত না । আমলাদের নিয়োগ চাকরির  স্থায়িত্ব সবকিছু এই নির্ভর করে রাজার সন্তুষ্টির উপর । 

৪) শাসন বিভাগ : 

শাসন বিভাগ পরিচালিত হতো কয়েকটি ধাপে । যেমন:- 

ক)  কেন্দ্রীয় শাসন : 

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন রাজা ,চ্যান্সেলর, কন্ট্রোলার অব ফিন্যান্স ও বিভিন্ন বিভাগের মন্ত্রীগণ । মন্ত্রিগণ ছিলেন রাজার হাতের পুতুল । তারা স্বাধীনভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারত না । তারা ছিলেন রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন কেরানি পদে ভক্ত । 

খ) প্রাদেশিক শাসন: 

প্রদেশিক শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে বাস্তবায়ন হতো । কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রদেশিক সরকারের যোগাযোগ রক্ষা করতো ইনটেনডেন্টগন । রাজা অভিজাত্যের ক্ষমতা খর্ব করতে তাদেরকে ইনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেন । তারা রাজার আদেশ, নির্দেশ ও ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতো । ইনটেনডেন্টদেরকে ফরাসি সরকারের যন্ত্র বলা হত। 

গ) রাজস্ব বিভাগ : 

চতুর্দশ লুই এর আমলে রাজস্ব বিভাগের সংস্কার করা হয় । 

১) টেইলি: এটি একটি প্রত্যক্ষ কর, যা জনসাধারণের নিকট থেকে আদায় করা হতো । 

২) গাবেল : এটি একটি পরোক্ষ কর যা লবণের উপর ধার্য করা হতো । 

৩) কর্ভি: এটি একটি বাধ্যতামূলক বেগার শ্রম। সরকারি রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণ, খাল খনন করতে এ শ্রম আদায় করা হতো । তবে এর জন্যে কোন পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না । 

৪) পলেট : উত্তরাধিকার সূত্রে কোন পদ লাভ করলে এ কর দেওয়া হতো । 

এছাড়া ছিল রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তির খাজনা ,ধর্মাধিষ্ঠান  হতে দান , কর্মচারীর পদ বিক্রয় বাণিজ্য কর ইত্যাদি হতে রাজস্ব আয়ে হতো । 

ঘ) বিচার বিভাগ : 

লুইয়ের আমলে বিচার ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয় । প্রতিটি জেলা বা শহরে প্রভোস্ট  নামে একটি করে বিচারালয় ছিল । এসকল বিচারালয় হতে বেইলিফ বা প্রদেশিক পার্লামেন্টের নিকট আপীল করা যেত । বিচারকগণ নিজ নিজ পদ ক্রয় করে বংশানুক্রমিকভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করতেন । কর্মচারীর পদ বিক্রয়ের ফলে কোন কোন শহরে প্রেসিডেন্সিয়াল চেয়ার নামে এক ধরনের দেওয়ানী বিচারালয়ের সৃষ্টি হয় । পার্লামেন্ট অব প্যারিস ছিল সর্বোচ্চ বিচারালয় । সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে বিচারালয় পরিচালনা হতো । ফলে ফ্রান্সে অরাজকতা বিশৃংখলা অনেকাংশেই দূর হয়েছিল । 

৫) অভিজাতদের দমন : 

লুই অভিজাত্যের ক্ষমতা খর্ব করতে সচেষ্ট ছিলেন । অভিযাত্রা যাতে শাসনব্যবস্থার প্রবেশ করে ক্ষমতাশীল হতে না পারে সেজন্য তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতে আমলা সৃষ্টি করেন । অভিজাতদের ইনটেনডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে রাজার আজ্ঞাবহতে পরিণত করেন । রাজা অভিজাতদের ভূসম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদেরকে তার নির্মিত ভার্সাই প্রাসাদে বসবাস করতে আহ্বান জানান । এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের দুর্বল করা এবং তাদের গতিবিধির উপর নজর রাখা । 

৬) আইন প্রণয়ন : 

প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে পার্লামেন্ট  ছিল । প্যারিসে ও বিশেষ পার্লামেন্ট ছিল এবং ছিল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট স্টেট জেনারেল ( States General ) । পার্লামেন্টের ক্ষমতা ঠুটো জগনাথ করে রাখতে ১৬১৪ সালের পর থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকা হয়নি । ফলে আইন প্রণয়ন করত রাজসভা । রাজসভা আইন প্রণয়ন করে চ্যান্সেলরের নিকট পাঠাতো । চ্যান্সেলর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতেন এবং আইনটি তার অনুমোদন লাভ করলে তারপর সেটি স্বাক্ষরের জন্য রাজা নিকট পাঠানো হতো । রাজার স্বাক্ষরের পর তা পার্লামেন্ট অব প্যারিস এর নিকট লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য প্রেরণ করা হতো । 

৭) অর্থনৈতিক সংস্কার : 

শক্তিশালী রাজকোষ পেছনে না থাকলে স্বৈরতন্ত্র কার্যকর করা যাবে না।  এই উপলব্ধি থেকে লুই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন নীতি প্রবর্তন করেন । এক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন চেষ্টা অর্থনীতিবীদ র্কোলবার্টের  সহযোগিতা লাভ করেছিলেন ।র্কোলবার্টে  বিশৃংখল কর ব্যবস্থা কে সুশৃংখল পথে নিয়ে আসে । কর আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ কর্মচারীদের কে বরখাস্ত করে সৎ ও যোগ্য লোকদের নিযুক্ত করেন । অভিজাত শ্রেণীকে কর থেকে রেহাই  দেওয়ার যে নীতি ছিল তার বাতিল হয় । কৃষকদের উপর প্রত্যক্ষ কর কমিয়ে দেন  এবং অভিজাতদের  উপর পরোক্ষ কর ধার্য করেন । 

র্কোলবার্টের ফ্রান্সে মার্কেন্টাইলবাদ তথ্য প্রয়োগ করে সফল হন । এ নীতি ছিল অর্থনৈতিককে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা , সোনা- রুপা, মজুদ করা, আমদানি নিরুৎসাহিত করে রপ্তানি বৃদ্ধি করা । এ নীতির ফলে ফ্রান্সে বৈদেশিক ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং,গ্লাস, সিল্ক, পর্দা,মদের  কলকারখানা গড়ে ওঠে । জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় । 

৮) উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা : 

একচেটিয়া ব্যবসা বাণিজ্যের ফলে দরকার ছিল উপনিবেশ স্থাপন । তিনি ইংল্যান্ডের মত ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ফরাসি ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি গঠন করেন । এগুলো ব্রিটিশ কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে । ফরাসি কোম্পানিগুলো পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ,লুইজিয়ানা, কানাডা আফ্রিকাতে প্রভাব বিস্তার করে । ভারত, সেনেগাল, মাদাগাস্কারে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে । 

৯) কৃষিতে উন্নতি : 

কৃষির উন্নতির জন্য লুই  ব্যাপক ব্যবস্থা নেন । কৃষকদেরকে করের বোঝা থেকে রক্ষা দেওয়ার জন্য কিছু প্রত্যক্ষ কর কমিয়ে দেন । কৃষকরা কর থেকে রেহাই পেয়ে কৃষি পণ্য উৎপাদনের ঝাঁপিয়ে পড়েন । তিনি গরু, ঘোড়া, ভেড়া ও অন্যান্য গবাদি পশুর উৎপাদন ও প্রজননের সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করেন । কৃষি পণ্য সরবরাহের জন্য তিনি রাস্তাঘাট কালবাট সেতু নির্মাণ খাল খনন করেন । তিনি পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি করেন । দেশের অভ্যন্তরে অবাধে পন্য চলাচলের জন্য আন্তঃবাণিজ্য শুল্ক  তুলে দেন । 

১০) সেনাবাহিনী : 

চতুর্দশ লুই সেনাবাহিনীর উন্নতির জন্য সর্বশক্তি ব্যয় করেন । তিনি ফ্রান্সের সেনাবাহিনীকে ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ বাহিনীতে রূপায়িত করতে চেয়েছিলে । তিনি সেনাবাহিনী পুন: গঠন  করে একটি জাতীয় সেনাবাহিনী গঠন করে । তিনি অভিন্ন আইন  তৈরি করে সেনাবাহিনীতে কঠোর আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন । তার স্থলবাহিনী ছিল ইউরোপের সর্বশেষ্ঠ বাহিনী । 

১১) ধর্মীয় নীতি : 

চতুদশ লুই নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করতেন । ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের সকল বিষয়ের উপর তার প্রাধান্য রয়েছে । তাই ধর্মাদিস্থানের উপর প্রাধান্য স্থাপন করা রাজার অপরিহার্য কর্তব্য । তার ধর্মনীতির উদ্দেশ্য ছিল : 

ক) ফরাসি চার্চ( গ্যালিক্যন ) এর উপর থেকে পোপের প্রাধান্য লুপ্ত করে একে সম্পূর্ণভাবে রাজশক্তির অধীনে নিয়ে আসবে । 

খ) ফ্রান্সের ধর্ম নৈতিক ঐক্য স্থাপন করা। 

ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি যেমন পোপের অধীনতা থেকে মুক্ত করে ইংল্যান্ডের চার্চকে জাতীয় চার্চে পরিণত করেছিলেন । তেমনি চতুর্দশ লুই ও ফরাসি চার্চকে পোপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে জাতীয় চার্চে পরিণত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন । অন্যদিকে প্রোটেস্ট্যান্টপন্থী হুগেনোদের এবং গোটা ক্যাথলিক পন্থীদের দমন করে ধর্মীয় ঐক্য স্থাপন করে তিনি এক রাজা ,এক জাতী,য় এক ধর্ম  স্থাপনে বদ্ধপরিকর হন। 

  ১২) ভার্সাই প্রাসাদ: 

রাজা চতুর্দশ লুই প্যারিস থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে এক রাজচিত ও প্রাচুর্যময়  প্রাসাদ নির্মাণ করেন । যার নাম হয় ভার্সাই প্রাসাদ । ১৭ শতকে এটি হয়ে ওঠে ফ্রান্সের শক্তিশালী রাজতন্ত্রের প্রতীক । বিখ্যাত স্থপতি ডি.মানসার্ট  এর নকশা অঙ্কন করেছিলেন । একটি ফরাসি জীবনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে ৩০ হাজার মানুষ ৬ হাজার ঘোড়া প্রতিদিন এখানে ব্যস্ত থাকত । এর ছাদ ও বড় নালাগুলো ছিল ৫,৪১৫ ফুট দীর্ঘ  এবং ১৪০ ফুট প্রশস্ত । ২৫ হাজার অভিজাত পরিবার, এক লক্ষ মধ্যবিত্ত পরিবার, এবং ১ হাজার পরিচারিকা এখানে বাস করত । এটি ছিল শিল্প-সাহিত্যের মূর্ত প্রতীক । এটির পার্ক, ঝর্না, দামি আসবারপত্র, দরবার হল ইউরোপের তথা পৃথিবীর আশ্চর্যজনক ও দর্শনীয় বস্তু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে । স্থাপত্য শিল্পে বার্সায় প্রাসাদ ছিল নান্দনিক স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন । 

১৩) সাংস্কৃতিক উন্নতি : 

চতুদশ লুই ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক । তিনি তাঁর সমসাময়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং উৎকর্ষ রাজতন্ত্রকে জড়িয়ে ফেলেন । তারা রাজসভা ইউরোপীয় সংস্কৃতির মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয় । সে যুগের প্রখ্যাত শিল্পী ,সাহিত্যিক ,দার্শনিক, জ্ঞানীগুণী ও পন্ডিত ব্যক্তিগণ তার রাজসভায় অলংকৃত করতেন । সে সময়ের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার রেসিন সোয়াইন, কর্নেইল , মলিয়ে , খ্যাতনামা সাহিত্যিক বুসে, মনটেইন, ফেনিলন, শ্রেষ্ঠ দার্শনিক দ্যাঁকট, শ্রেষ্ঠ স্থাপতি ডি. মানর্স্ট যিনি ভার্সাই প্রসাদের নকশা অঙ্কন করেন ,শ্রেষ্ঠ সংগীত শালী মোর্জেট তার রাজসভায় অলংকৃত করেন । তার আমলে ফ্রান্স ছিল শিক্ষা-দীক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতিতে পথপ্রদর্শক । তার সময় ফরাসি ভাষা ফ্যাশন ও কূটনৈতিক ভাষা হিসেবে পরিচিত লাভ করে । তার পৃষ্ঠপোষকতায় ভার্সাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে পরিণত হয় । সে সাথে ফ্যাশন ও উন্নত জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় । 

মূল্যায়ন : 

অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল চতুর্দশ লুই এর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য । তবে তার চরিত্রের প্রধান ত্রুটি হল অহমিকা । অহমিকার থেকে তার মনে অসাধ্য সাধনের স্পর্ধা জেগে উঠে । মানুষের ক্ষমতার যে একটা সীমা আছে তা তিনি ভুলে যান । লুই কর্মদক্ষ হলেও তার মধ্যে মৌলিক প্রতিভা ও সৃজনশীলশক্তির  অভাব ছিল । তথাপি তিনি ফরাসি জাতির অখন্ড ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন । তার চরিত্র সূর্যের সঙ্গে তুলনীয় । সূর্যের ন্যায় তার চরিত্রের উজ্জ্বল তার দোষ- ত্রুটি আড়াল হয়ে গিয়েছিল । ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কু চতুর্দশ লুিইয়ের  চরিত্রে আকৃষ্ট হয়ে তাকে মহান রাজা ( La Grand Monarch )  বলে অভিহিত করেন । রাজতন্ত্রকে তিনি এক শিল্পে পরিণত করেছিলেন । আর তিনি নিজেই ছিলেন এর প্রধান কারিগর । তার প্রভাবে রাজনীতি, ধর্ম ,অর্থনীতি, সংস্কৃতি সর্বোপরি জাতীয় জীবনের সবকিছুর তার ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় । কার রাজত্বকালে ইউরোপের ইতিহাস প্রধানত ফ্রান্সের ইতিহাসে পরিণত হয়। 

চতুদশ লুই এর বৈদেশিক নীতি ( Foreign Policy of Louis XIV  )

চতুর্দশ লুই একজন মহান রাজা ( Grand Monarch )  হিসাবে সমগ্র ইউরোপের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে আসেন । তার সুদীর্ঘ রাজত্ব ( 1643-1715 ) কালে তিনি ফরাসি রাষ্ট্র জাতির উপর কৃতিত্বই স্থাপন করেন এবং ইউরোপীয় শাসকের মডেল হিসেবে আর্বিভূত হন । তার সময়ে ফ্রান্সের ক্ষমতা, রাজ্যসীমা, শৌর্য-বীর্য ও গৌরব সবকিছুই বৃদ্ধি পায় । তার সময় ফ্রান্সের বিজয় সূচিত হয় বলে এ সময়েকে চতুর্দশ লুই এর যুগ বলা হয় । নিম্নে চতুদশ লুই এর বৈদেশিক নীতি আলোচনা করা হলো :-

উদ্দেশ্য : 

চতুর্দশ লুই এর উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা । হ্যাপসবার্গ  বংশধারা শাসিত স্পেন ও অস্ট্রিয়ার শক্তি কমিয়ে দেওয়া এবং ইউরোপের রাজনীতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা । এছাড়া তিনি ফরাসি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সুবিন্যাস্ত করতে এবং ক্যাথলিক ধর্মকে ইউরোপের সর্বময় করে তুলতে চেয়েছিলেন। এসব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি কতিপয় নীতি অবলম্বন করেন। যেমন:

প্রাকৃতিক সীমারেখা : 

চতুর্দশ লুই প্রাকৃতিক সীমারেখা তত্ত্বটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন । এ নীতি দ্বারা তিনি ফরাসি রাজ্য সীমাকে প্রাকৃতিক রাজ্যসীমা পৌঁছাতে পেয়েছিলেন এবং ফরাসি রাজ্য সীমাকে নদী, সাগর ,পর্বত প্রভৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত করা ছিল তার প্রধান কাজ । এতে ফরাসিরা আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক যুদ্ধে সুবিধা লাভ করতে পারবে । এজন্য তিনি রাইন নদীর পশ্চিম তীরস্থ ও সকল স্থান ( টূল , মেৎস , ভার্দুন , রাইন নদিকে ) ফ্রান্সের পূর্ব সীমায় পরিণত করা । উত্তর-পূর্ব দিকে নেদারল্যান্ড অধিকার করে শেল্ট নদীর মোহনা পর্যন্ত ফরাসি সীমাবদ্ধ করেন । প্রাকৃতিক সীমারেখা লাভের মধ্য দিয়ে লুই হ্যাপসবার্গ পরিবারের ক্ষমতা কমিয়ে এবং ইউরোপে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করতে সক্ষম হন। এভাবে তিনি আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করতে থাকেন। 

যৌতুক যুদ্ধ (  War of Devolution )১৬৬৭-৬৮ : 

পিরোনীজ সন্ধির শর্তানুসারে চতুর্দশ লুই এর সাথে স্পেন রাজকন্যার মেরিয়া থেরেসার  বিবাহ হয় । এই বিবাহে যে যৌতুক দেবার কথা ছিল তা শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি । এই অবস্থায় লুই তার স্ত্রীর মেরিয়া থেরেসার তার পক্ষে সমগ্র নেদারল্যান্ড দাবি করেন । স্পেন এ দাবি অগ্রাহ্য  করেন । লুই তখন বুদ্ধ কূটনীতি দ্বারা, টুরনে, লিলি, সার্লেরয়, আর্থবিঞ্জ , বার্নেস, ফার্নেস, দাওয়াই , কোর্টরাই , ওডেনার্ড  নেদারল্যান্ডের শহর অধিকার করেন । 

হল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধ ( Dutch War ) ১৬৭২-১৬৭৮ : 

চতুর্দশ লুই এর রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি বাধা দেওয়ার জন্য হল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ও সুইডেন এর মধ্যে ত্রিশক্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । হল্যান্ড ছিল প্রজাতান্ত্রিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট যা ছিল লুইয়ের ঘৃণার বস্তু । ফ্রান্সের সংরক্ষণ নীতি দ্বারা হল্যান্ডের সামুদ্রিক বাণিজ্য সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল । ফলে হল্যান্ডের সঙ্গে লুইয়ের যুদ্ধ বাদে । কূটনীতি দ্বারা লুই ইংল্যান্ড ও সুইডেন কে বশীভূত করে হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডাম সীমান্তে উপনীত হন । ডাচ গন সামুদ্রিক বাঁধ কেটে আমস্টারডাম  শহর রক্ষা করে । তথাপি হল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সন্ধি হয় । সন্ধির ফলে ফ্রান্স হল্যান্ডের নিকট থেকে ব্রাবান্টি , ফ্ল্যান্ডার্স ও মেইস্ট্রিক্ট  তিনটি স্থান এবং উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভ করে । 

নাইমুইজেনের  সন্ধি : 

সমগ্র ইউরোপ লুইয়ের অপ্রতিহত অগ্রগতিতে ধারাবাহিকতা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে । অস্ট্রিয়া, স্পেন,ব্রান্ডেনবার্গ ,  লোরেন, ডেনমার্ক ও জার্মানির রাজগন অনেকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শক্তি সমবায় জোট গঠন করে । দীর্ঘকাল যুদ্ধ করে অবসন্নতা ও অর্থাভাব হেতু চতুদশ লুই শক্তি সমবায়ের  সঙ্গে নাইমুইজেনের সন্ধি করতে রাজি হন । এর সন্ধির দ্বারা ফ্রান্স ফ্রেঞ্জিকমিটি এবং কয়েকটি দ্বীপ স্পেনের নিকট থেকে পেল । মেইস্ট্রিক্ট হল্যান্ডকে ফিরিয়ে দিল । ফিলিপসবার্গে এর পরিবর্তে অস্ট্রিয়া নিকট থেকে ফ্রেইবার্গ লাভ করলো । 

Reunion Policy : 

চতুর্দশ লুই বিনাযুদ্ধে নিজ শক্তি ও রাজ্য বৃদ্ধি করার জন্য এক ফান্দিবাজি ও কূটকৌশলের আশ্রয় নেন । ওয়েস্টফেলিয়া, লা-সাপেলা ,নাইমুইজেনের সন্ধি দ্বারা ফ্রান্স  যে সকল স্থান লাভ করেছিল ,সামন্ত প্রথা অনুসারে ওই সকল স্থানের আনুগত্যতাধীনে আরও বহু শহর ও স্থান ছিল । লুই ওইগুলো দাবি করেন যা Reunion Policy নামে পরিচিত । এই নীতির দ্বারা তিনি ল্যাটার বার্গ, জার্মারশিম , সারব্রুকেন, জুইব্রুকেন, মন্টেব্লেয়ার্ড , ক্যাসেইল , স্ট্রাসবার্গ এরকম ২০ টি শহর লাভ করেন । 

অগসবার্গের শক্তি সমবায় এর সঙ্গে যুদ্ধ ( ১৬৮৮-৯৭) : 

চতুর্দশ লুইয়ের  Reunion Policy সমগ্র ইউরোপে এক দারুণ ঘৃণা ও বিদ্বেষের  সৃষ্টি হয় । ইউরোপীয় শক্তিগুলোর অগসবার্গের শক্তি সমবায় নামে এক শক্তিসংঘ স্থাপন করেন । হল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম ভিলেন এর উদ্যোক্তা। হল্যান্ড, স্পেন, অস্ট্রিয়া, সুইডেন-জার্মানি বেভারিয়া, ইংল্যান্ড এর শক্তি সমবায় যোগদান করে । চতুর্দশ লুই শক্তি সমবায় এর বিরুদ্ধে স্থল যুদ্ধে জয়ী হলেও নেী-যুদ্ধে পরাজিত হতে থাকেন । অবশেষে ১৬৯৭ সালে রাইসুইক এর সন্ধির মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে । একমাত্র স্ট্রাসবার্গ ব্যতীত Reunion Policy দ্বারা প্রাপ্ত সকল স্থানগুলির ত্যাগ করতে হলো । 

স্পেনীয় উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭০১-১৭১৩ ) -( Spanish War of Sucecssion ( 1701 – 1713 )  )

স্পেনীয় রাজ পরিবার ও ফ্রান্সের রাজপরিবারের মধ্যে পূর্ব হতেই বিবাহ সম্বন্ধে চলে আসছিল । অপরদিকে অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গ  পরিবারের সঙ্গেও স্পেনীয় রাজপরিবারে বিবাহ সম্বন্ধে ছিল । ১৭০০ সালে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লস  মারা গেলে উত্তরাধিকার নির্বাচন নিয়ে তিনটি পক্ষ দাবিদার হয় । এক পক্ষে চতুর্দশ লুই এর নাতি ফিলিপ অ্যাঞ্জো , দ্বিতীয় পক্ষ অস্ট্রিয়ার সম্রাট লিওপোল্ডের ২য় পুএ যোসেফ ফার্ডিনান্ড । স্পেন রাজ চতুর্থ ফিলিপের প্রথমা পক্ষের সন্তান মেরিয়া থেরেসার সঙ্গে চতুর্দশ লুইয়ের   বিয়ে হয় । দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান ছিল দ্বিতীয় চার্লস ও কন্যা মার্গারেট থেরেসা । মার্গারেট থেরেসাকে অস্ট্রিয়ার সম্রাট লিওপোল্ডের  সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় । মার্গারেট থেরেসার একমাত্র সন্তান মেরিয়া এন্টনিয়াকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে বেভারিয়ার ইলেক্টর ম্যাক্সিমিলিয়ানের সঙ্গে । এই উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে লুই তার নাতি এঞ্জোলকে স্পেনের সিংহাসনে বসান এবং তাকে ফ্রান্সের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন । ইংরেজ ও ডাচ বানিজ্য জাহাজকে স্পেনীয় উপনিবেশগুলোতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন । 

ইউট্রেক্ট সন্ধি : 

চতুর্দশ লুইয়ের এসব ঘোষণা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভীতি ও সন্দেহ সৃষ্টি করে । শক্তি সমবায় এই সময় লুই এর উত্তর এর জবাব দিতে প্রস্তুত হয় । এর ফলে ১৭০১-১৭১৩ সাল পর্যন্ত এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের যুদ্ধ চলে । এতে উভয় পক্ষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে ইউট্রেক্ট সন্ধি স্থাপিত হয় এবং স্পেনীয় উত্তরাধিকার যুদ্ধের অবসান ঘটে । সন্ধির শর্তানুসারে :- 

১) লুইয়ের নাতি ফিলিপ অ্যাঞ্জোকে স্পেনের রাজা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয় । তবে একই ব্যক্তি স্পেন ও ফ্রান্স উভয় দেশের সিংহাসনে বসতে পারবে না । 

২) স্পেনের নেদারল্যান্ডীয় এবং ইতালির ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব অস্ট্রিয়াকে দেওয়া হল । 

৩) ফ্রান্সকে স্ট্রাসবার্গ , এ্যালসেস এর অধিকার দেওয়া হয় । 

৪) এশিয়ার ইলেক্টরকে রাজা উপাধি দেওয়া হয় । 

৫) ইংল্যান্ডের সিংহাসনে হ্যানোভার অরেঞ্জ পরিবারের অধিকারের স্বীকৃতি হয় । 

এছাড়া স্পেনের কলোনিগুলোতে ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক সুবিধার স্বীকৃতি দেওয়া হয় । 

অতএব চতুর্দশ লুই এর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে , ফ্রান্স ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হলেও তা ছিল খুবই সাময়িক। তার পররাষ্ট্র নীতি পরবর্তীকালে ফ্রান্সের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তার উগ্র ক্যাথলিকনীতি প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোকে উত্তেজিত করেছিল । তার যুদ্ধনীতির ফলে দেশের অর্থ ও নেী- শক্তি ক্ষয়  হয়  । ইউট্রেক্ট চুক্তি ফরাসি রাজ্যর গ্রাস নীতির পরিসমাপ্তি ঘটায় । ইংল্যান্ড রাশিয়া এবং স্পর্শিয়া নতুন শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হওয়ার সুযোগ পায় । স্পেনের প্রভাব থেকে ইউরোপ মুক্ত পায় । ফ্রান্স ও পরবর্তী সময়ের জন্য হ্যাপসবার্গ পরিবারে বিপদ থেকে মুক্ত হয় । 

স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ এবং চতুর্দশ লুই ( Spanish War of Succession and Louis XIV )

চতুর্দশ লুই অর্ধশতাব্দীর অধিকার সময় ফ্রান্সের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন । তার এই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তিনি একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন । তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত এর দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ছিল স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ । এ যুদ্ধ চলে ১৭০১ সাল  থেকে ১৭১৩  সাল পর্যন্ত । 

১) স্পেনের উত্তরাধিকার সংকট : 

১৬৬৬ সালে স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপের মৃত্যুর পর স্পেনের রাজা হন তার একমাত্র পুত্র দ্বিতীয় চার্লস । জন্মকাল থেকেই চার্লস ছিলেন ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী । তার কোন সন্তানাদি বা ভাই ছিল না । তাই তার মৃত্যুর পর স্পেনের সিংহাসনে কে লাভ করবে, সে প্রশ্নের দ্বিতীয় চার্লসের মৃত্যুর পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক মহলে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায় । আর স্পেন শুধু একটি দেশেই ছিল না ,ছিল একটি সাম্রাজ্য। ক্যাস্টাইল, অরিগান, বেলজিয়াম , নেদারল্যান্ড , সিসিলি , নেপলস, টস্কেনি , ফিলিপাইন ও আমেরিকার বিশাল উপনিবেশ নিয়ে গঠিত ছিল স্পেন সাম্রাজ্য । দ্বিতীয় সার্লস এর মৃত্যুর পর স্পেনের উত্তরাধিকার নিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ১৭০১ থেকে ১৭১৩ সাল পর্যন্ত যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা ইউরোপের ইতিহাসে স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ নামে পরিচিত । 

২) চতুর্দশ লুই এর দাবি : 

চতুর্দশ লুই বিয়ে করেছিলেন স্পেনের রাজ চতুর্থ ফিলিপের প্রথম স্ত্রীর একমাত্র কন্যা মারিয়া থেরেসাকে । লুই এর সঙ্গে মারিয়ার বিয়ের সময় তাকেই স্পেনের উত্তরাধিকার দাবি ত্যাগ করতে হয়েছিল । বিনিময় মারিয়া থেরেসাকে উপযুক্ত যৌতুক দেওয়ার কথা ছিল । কিন্তু পরবর্তীকালে এ যৌতুক দেওয়া হয়নি । তাই চতুর্দশ লুই স্পেনের উত্তরাধিকার দাবি করেন এবং কিছু যুক্তি তুলে ধরেন ।যেমন:- 

ক) মারিয়া থেরেসাকে স্পেনের উত্তরাধিকার ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি যৌতুক দেওয়া হয়নি । 

খ) মারিয়া থেরেসা আইনত নিজ সন্তানের জন্মদানের পূর্বেই তাদের দাবী ত্যাগ করতে পারেন না এবং 

গ) এরূপ দাবী পরিত্যাগ করলে ও ফরাসি রাষ্ট্র বা পালামেন্টের অনুমোদন ব্যতীত সে পরিত্যাগ আইনত গ্রাহ্য নয় । 

এসব যুক্তি বিবেচনা করলে চতুর্দশ লুই এর পুত্র ডোঁফা বা ডফিন  স্পেনের উত্তরাধিকার শ্রেষ্ঠ দাবিদার । কিন্তু ডোঁফা  নিজ পুত্র ফিলিপ অব আঞ্জোর  অনুকূলে তারা দাবি ত্যাগ করেন । 

৩) লিওপোল্ডের দাবি: 

অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম লিওপোল্ড ও স্পেন রাজ ৪ র্খ ফিলিপের দ্বিতীয় পক্ষের কন্যা মার্গারেট থেরেসাকে বিয়ে করেন । বিয়ের সূত্র ধরে তিনি ও  আর্ক ডিউক অব  চালর্সের জন্য স্পেনের অধিকার দাবি করেন । তিনি নিজে আরো দাবি করেন যে , তার মাতা মারিয়া তার উত্তরাধিকার ত্যাগ করেননি । সুতরাং তিনিও মাতার উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন । কিন্তু নিম্নপর্যায়ের দাবিদার কেউ থাকলে লিওপোল্ডের মাতার দাবি আইনত গ্রহণযোগ্য নয় । আর্ক ডিউক অব  চার্লসের দাবি থাকলে , তা লিওপোল্ডের স্ত্রী মার্গারেট থেরেসার মাধ্যমে এ দাবি যুক্তিগত প্রমাণ করতে হবে । 

৪) মারিয়া এন্টনিয়ার  দাবি :

মারিয়া এন্টনিয়া ভিলেন মার্গারেট থেরেসার একমাত্র কন্যা । তাকে বেভারিয়ার ইলেক্টর ম্যাক্সিমিলিয়ানের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল । এ বিয়ের সময় লিওপোল্ড তার কন্যা এন্টোনিয়াকে তার পক্ষে স্পেনের সর্বপ্রকার দাবি ত্যাগ করতে বাধ্য করেন । কিন্তু আইনত এ দাবী গ্রহণযোগ্য ছিল না । কারণ বিয়ের সময় এন্টনিয়া নাবালিকা ছিলেন । যাহোক মারিয়া এন্টনিয়া তার দাবি তার নিজ পুত্র বেভারিয়ার যুবরাজ জোসেফ ফার্দিনান্দকে দান করেন । 

৫) সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীগণ : 

স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে স্পেনের সিংহাসনে সম্ভাব্য তিনজন দাবীদারকে দেখা যায় । যেমন: – 

ক) চতুর্দশ লুই এর নাতি ফিলিপ অব আঞ্জো 

খ) লিওপোল্ডের  পুত্র আর্ক  ডিউক অব চার্লস 

গ) মারিয়া এন্টনিয়ার পুত্র জোসেফ ফার্দিনান্দ । 

এরা সবাই ছিলেন স্পেনের রাজপরিবারের দৌহিত্র কুলের সন্তান সন্তানাদি। স্পেনের রাজা ফিলিপ এর কন্যা এবং নাতনিকে বিয়ে করার সুবাদে ফ্রান্স ,অস্ট্রিয়া ,ও বেভারিয়া স্পেনের সিংহাসনে দাবিদার হয়ে উঠে । 

৬) প্রথম বন্টন চুক্তি : 

স্পেনের ন্যায় বিশাল দেশ এককভাবে শুধু ফ্রান্স বা অন্য কোন দেশের হস্তগত হলে ইউরোপের শক্তি ভারসাম্য নষ্ট হবে । লুই উপলব্ধি করতে পারেন যে , সামুদ্রিক উপনিবেশিক দেশগুলো স্পেনের উত্তরাধিকার ফ্রান্সের অধীনে আসতে দেবে না । একারণে লুই স্পেনের উত্তরাধিকার সাম্রাজ্য  শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের সঙ্গে পরামর্শ করে ১৬৯৮ সালে স্পেন সাম্রাজ্যের প্রথম বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন । এ চুক্তি অনুসারে বেভারিয়ার যুবরাজ যোসেফ ফার্দিনান্দকে স্পেন,স্পেনীয়  নেদারল্যান্ড এবং স্পেনীয় আমেরিকাতে উপনিবেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় । আর্ক ডিউক অব চার্লস পারেন লুক্সেমবার্গ ও মিলান্ এবং ফিলিপ অব আঞ্জো পারেন নেপলস, সিসিলি, টস্কেনি বন্দর , ফিনেলই ইত্যাদি স্থান । 

৭) দ্বিতীয় চার্লস এর প্রথম উইল : 

স্পেন রাজ দ্বিতীয় চার্লস জীবিত থাকা অবস্থায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গের স্পেন বন্টন তৎপরতায় তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন । তিনি নিজেই স্পেনের উত্তরাধিকার সমস্যার সমাধান করতে মনস্থ করেন । তিনি একটি উইল এর দ্বারা স্পেনের যাবতীয় উত্তরাধিকার বেভারিয়ার যুবরাজ ফার্দিনান্দ দান করে দেন এবং তাকে স্পেনে আনার জন্য লোক পাঠান কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্পেনের রওনা হওয়ার পূর্বে তার মৃত্যু হয় । 

৮) দ্বিতীয় বন্টন চুক্তি : 

যোসেফ ফার্দিনান্দ মারা যাওয়ায় দ্বিতীয় চার্লসের উইল কার্যকর হলো না । তখন দ্বিতীয় বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এ চুক্তি অনুসারে ডিউক অব চার্লস  পাবেন স্পেন ,স্পেনীয় নেদারল্যান্ড এবং স্পেনের আমেরিকা উপনিবেশ । অর্থাৎ প্রথম বন্টন চুক্তির ফলে যোসেফ ফার্দিনান্দ এর যা প্রাপ্যতা ছিল তা । বাদবাকি সকল স্থান লাভ করবে লুইয়ের নাতি ফিলিপ আঞ্জো । শুধু লোরেন এর পরিবর্তে মিলানিজ স্থানটি ত্যাগ করতে হবে । 

৯) চার্লসের দ্বিতীয় উইল: 

এবারও চার্লস ইউরোপীয় শক্তিবর্গের আচরণে ক্ষুব্ধ হন এবং দ্বিতীয় উইল করেন । এ দ্বিতীয় উইল দ্বারা চার্লস স্পেন সমগ্র সম্রাজ্য চতুর্দশ লুই ফিলিপ অব আঞ্জো কে দান করেন । এতে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে , দুর্ভাগ্যবশত ফিলিপের মৃত্যু হলে সমগ্র সম্পত্তির ফিলিপের  ভাই( ডোঁফার দ্বিতীয় পুত্র , লুইয়ের আরেক নাতী )  লাভ করবে । এদের উভয়ের সম্পত্তি গ্রহণে অক্ষম হলে সমস্ত সম্পত্তি আর্ক ডিউক অব চার্লস পাবেন। চার্লসের  ইচ্ছা ছিল স্পেনের অখণ্ডতা বজায় রাখা । 

১০) দ্বিতীয় উইল এবং চতুর্দশ লুই : 

চার্লসের দ্বিতীয় উইল  নিয়ে লুই মহা চিন্তা করে যান । তিনি যদি এ উইল গ্রহণ না করেন তাহলে আইনত স্পেনীয় সম্পত্তি র্আক ডিউক চার্লসের হাতে ন্যস্ত হবে । আবার যদি র্আক ডিউক চার্লস দ্বিতীয় বন্টন চুক্তি অগ্রাহ্য করেন,  তাহলে লুইকে যুদ্ধ করে তা আদায় করতে হবে । অপরদিকে দ্বিতীয় উইল  গ্রহণ করলে তাকে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে । লুই উভয় সংকটে পড়ে যান । অবশেষে তিনি দ্বিতীয় উইল গ্রহণ করেন । কারণ তিনি মনে করেন যে, যুদ্ধ যখন করতেই হবে তখন উইল গ্রহণ করে যুদ্ধ করা শ্রেয় । চার্লসের দ্বিতীয় উইল মোতাবেক চতুর্দশ লুইয়ের নাতি ফিলিপ অব আঞ্জো পঞ্চম ফিলিপ নাম ধারণ করে ১৭ ০০ সালের এপ্রিল মাসে স্পেনের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে আসেন । তাকে স্পেনের রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন । এ সময় লুই কতিপয় স্বৈরাচারী নীতি গ্রহণ করেন যা সমগ্র ইউরোপীয় ক্ষোভের সৃষ্টি করে । যেমন: 

ক) বাটোয়ারা চুক্তি অস্বীকার করেন চতুর্দশ লুই তদীয় পেীত্র  ফিলিপের পক্ষ হতে সমগ্র স্পেনীয় সাম্রাজ্য গ্রহণ করেন।  তার পেীত্র ফিলিপকে স্পেন ও ফ্রান্সের উভয় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন । 

খ) লুই হল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চলে নেদারল্যান্ডের দুর্গ সমূহতে ওলন্দাজ বাহিনী বিতাড়িত করে ফরাসি বাহিনী মোতায়েন করেন । 

গ) ইংরেজ ও ওলন্দাজ বাণিজ্য জাহাজ স্পেনীয় আমেরিকা উপনিবেশে প্রবেশ করতে পারবে না । 

ঘ) রাইন উইকের সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে উইলিয়াম অফ অরেঞ্জকে ইংল্যান্ডের রাজা বলে স্বীকার না করে স্টুয়াট রাজ পলাতক দ্বিতীয় জেমসের পুত্র তৃতীয় জেমসকে  ইংল্যান্ডের বৈধ রাজা বলে ঘোষণা করেন । 

১১) শক্তি সমবায় জোট : 

চতুর্দশ লুইয়ের এসব খামখেয়ালী একগুয়েমির নীতির  কারণে সমগ্র ইউরোপে তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয় । কূটনীতিতে পারদর্শী উইলিয়াম এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন । তিনি ইংল্যান্ড, প্রূশিয়া,অস্ট্রিয়া , হল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রে সমন্বয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এক বিরাট রাষ্টজোট বা শক্তি সমবায়  গড়ে তুলেন । পূর্তগাল ও স্যাভয় পরে উক্ত জোটে যোগদান করেন । এই রাষ্টজোটের উদ্দেশ্য ছিল লুই এর বিরুদ্ধে জবাব দেওয়া , ফ্রান্স ও স্পেনের একত্রীকরণ এ বাধা দেওয়া এবং স্পেনের সিংহাসনের উপর র্আক ডিউক চার্লসের দাবি সমর্থন করা । ফলে ১৭০২ সালে ইউরোপ ,এশিয়া ও আমেরিকার তিনটি মহাদেশের যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৭১৩  সাল পর্যন্ত চলে ।দীর্ঘ ১৩ বছর যুদ্ধ চালিয়ে দুই পক্ষই ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । এর সময় দুটো ঘটনা যুদ্ধবিরতিতে কার্যকারী ভূমিকা রাখে । 

ক) ইংল্যান্ডে উইক মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং টোরিয়া ক্ষমতায় আসে । টোরিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক ছিল না । এর সময় ইংল্যান্ড ফ্রান্স এর সঙ্গে এক গোপন চুক্তি করে যুদ্ধ ত্যাগ করে । এতে লুই খুশি হন । কেননা যুদ্ধে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন । 

খ) 1711 সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাট যোসেফ ( আর্ক ডিউক চার্লসের ভাই ) মারা গেলে আর্ক ডিউক চার্লস ষষ্ঠ চার্লস নাম ধারণ করে অস্ট্রিয়ার সিংহাসনে বসেন । চার্লসের ক্ষমতা আহরণের পর স্পেনের উত্তরাধিকার নিয়ে আগ্রহ আর রইল না । 

অবশেষে দুই পক্ষের মধ্যে ১৭১৩ সালে ইউট্রেক্ট সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় এবং স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধের অবসান ঘটে । 

ইউটেক্টের  সন্ধি ( The Treaty of Utrect )

১৭১৩ সালের ইউটেক্টের সন্ধি ইউরোপের ইতিহাসে এক  যুগান্তকারী ঘটনা । এর সন্ধির মাধ্যমে স্পেনীয় উত্তরাধিকার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে । তিনটি চুক্তির সমন্বয়ে এ ইউটেক্টের সন্ধি  সম্পাদিত হয় । ১৭১১ সালের ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি চুক্তি , এ  তিনটি চুক্তির শর্তাদি একত্রে ইউটেক্টের  সন্ধি নামে পরিচিত । এটা ছিল ওয়েস্টফেলিয়ার সন্ধির একটি উন্নত সংস্কারক মাত্র । ইউরোপের ইতিহাসে এ সন্ধি সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় । 

ইউটেক্টের  সন্ধি শর্তাবলী : 

১) চতুর্দশ লুইয়ের পেীত্র ফিলিপ অব আঞ্জোকে স্পেনের রাজা বলে স্বীকার করে নেওয়া হয় । তবে একই ব্যক্তি স্পেন ও ফ্রান্স উভয় দেশের  সিংহাসন কোন মতেই দাবি করতে পারবে না । 

২) অস্টিয়াকে সার্ডিনিয়া, নেপলস, মিলান স্পেনীয় নেদারল্যান্ড দেওয়া হয় । 

৩) ফ্রান্সের আক্রমণ হতে রক্ষার জন্য হল্যান্ডকে নেদারল্যান্ডের কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করার অনুমতি দেওয়া হয় । 

৪)ফ্রান্সকে আলসেস ও স্ট্রাসবার্গ অধিকার ফেরত দেওয়া হয়।  তবে রাইন নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ফ্রান্সের দখলকৃত কেহল,ব্রিসসও ফ্রিবার্গ  দুর্গাসমূহ অস্ট্রিয়াকে ফেরত দিতে হবে । 

৫) প্রূর্শিয়ার ইলেক্টর কে রাজা উপাধি দেওয়া হয়।  এছাড়া গিল্ডারল্যান্ডের একাংশ প্রূর্শিয়ারকে দেওয়া হয় । 

৬) স্যাভয়ের ডিউককে নিজ দেশ স্যাভয় এবং নিস ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং সিসিলি ও মিলনের একাংশ তাকে দেওয়া হয় । 

৭) বেভারিয়া  ও কেহলের ইলেকট্রনগন নিজ নিজ রাজ্য ফিরে পান । 

৮) ইংল্যান্ড জিব্রাল্টার,মিনরকা দ্বীপ ,নিউফাউন্ডল্যান্ড, হাডসন ,আর্কেডিয়া ইত্যাদি স্থান লাভ করে কয়েকটি  শর্তাধীনে ইংল্যান্ড স্পেনীয় আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে । তাছাড়া ইংল্যান্ডে হ্যানোভাস অরেঞ্জ পরিবারের অধিকার স্বীকৃত হয় । 

৯) তৃতীয় জেমসকে ফ্রান্স থেকে নির্বাসন দেওয়া হয় এবং ডানকার্ক দুর্গো ধ্বংস করতে সকলে একমত হয় । 

ইউটেক্টের  সন্ধি ফলাফল ও গুরুত্ব : 

১) স্পেন : 

ইউটেক্টের  সন্ধির স্পেনের উত্তরাধিকার সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সাধিত হয় । আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় শক্তির ম্পেনের  প্রভাব মুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় । ইংল্যান্ড, রাশিয়া ,এবং প্রূশিয়াকে  নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে সুযোগ করে দেয় । 

২) ইংল্যান্ড : 

এর সন্ধির ফলে ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক ও উপনিবেশিক প্রাধান্য স্বীকৃতি হয়  । এসময় হতে ইংল্যান্ড উপনিবেশ বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ফ্রান্সের ছেয়ে এগিয়ে যায় । এমনকি অনেক ফরাসি উপনিবেশ ইংল্যান্ড গ্রাস করে নেয় । স্পেনীয় উপনিবেশ আমেরিকায় বাড়তি বাণিজ্যিক সুবিধা পায় । অন্যদিকে ইংল্যান্ড নতুন যেসব ভূখণ্ড লাভ করে তাতে সবমিলিয়ে ইংল্যান্ড বিশ্বশক্তি তে পরিণত হয় । 

৩) ফ্রান্স : 

ফ্রান্সের অর্থ বল নৌবহর যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতি হয় । সপ্তদশ শতকে আরোপের ইতিহাসে ফরাসি রাজ্য গ্রাস পরিসমাপ্তি ঘটে । তবে এর সন্ধির ফলে লুইয়ের এক নাতি হয় , স্পেনের রাজা নাম পঞ্চম ফিলিপ । তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে আরেক নাতি হয় ফ্রান্সের রাজা নাম পঞ্চদশ লুই । ফ্রান্স পরবর্তী সময়ের জন্য হ্যাপসবার্গ এর বিপদ থেকে মুক্ত হয় । এ সন্ধি  ফ্রান্সকে ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি বলে স্বীকার করে নেয় । তখনকার ফরাসিরা রাজশক্তি , সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ , জাতির অধ্যবসায় ,কর্মদক্ষতা ফ্রান্সকে ইউরোপের যে প্রাধান্য দান করেছিল তা স্বীকার না করে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করা রাজনীতিক নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হত । এদিক ইউট্রেক্ট সন্ধিতে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় । তবে লুই এর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে , ফ্রান্স ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হলেও তা ছিল খুবই সাময়িক । 

৫) প্রূশিয়া : 

প্রূশিয়র ইলেক্ট্রো কে রাজা উপাধি দিয়ে প্রূশিয়ার রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় । প্রূশিয়াকে রাইন অঞ্চলে জার্মানিকে ফ্রান্সের আক্রমণ হতে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় । পরবর্তীকালে স্পর্শিয়ার নেতৃত্বে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়। 

৫) অস্ট্রিয়া / হোলি রোমান সাম্রাজ্য : 

ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধির ফলে অস্ট্রিয়া তথা হলি রোমান সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় এবং ইউটেক্টের  সন্ধি মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায় । আলসাসের উপর ফরাসি প্রাধান্য স্বীকার করে অস্ট্রিয়ার প্রতি অবিচার করা হয় । জার্মানির অসংখ্য স্বাধীন রাজ্য গুলোর উপর অস্ট্রিয়ার যে সামান্য আধিপত্য ছিল তাও বিলুপ্ত হয় । জার্মানিকে ফরাসি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব অস্ট্রিয়ার পরিবর্তে প্রূশিয়াকে  দেওয়া হয় । এতে একদিকে অস্ট্রিয়ার অবক্ষয় ঘটে এবং স্পর্শিয়ার সফলতা লাভ করে । 

৬) শক্তি সাম্য স্থাপন : 

এ সন্ধি ইউরোপের রাজনীতিতে শক্তি সাম্য স্থাপন করে । ফ্রান্সের শক্তি বৃদ্ধিতে ইউরোপীয় রাজনীতিতে যে ভীতি সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল তা এ  সন্ধির মাধ্যমে দূর হয় । ফ্রান্সের আক্রমণ প্রতিহত করতে হল্যান্ডকে নেদারল্যান্ডে দুর্গ নির্মাণ করার অধিকার দিয়ে, ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক ও উপনিবেশী প্রাধান্য স্বীকার করে, প্রূশিয়াকে ও স্যাভয়কে শক্তিশালী করে এবং ফরাসি আক্রমণ প্রতিহত করে রাইন তথা জার্মানিকে রক্ষার দায়িত্ব প্রূশিয়াকে দিয়ে ফ্রান্সের চতুর্দিকের রাষ্ট্রগুলোকে শক্তিশালী করে একটা শক্তিসাম্য স্থাপন করা হয় । 

৭) স্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত : 

পরের সম্পত্তি নিজেদের ইচ্ছামত বন্টন করে ইউরোপীয় রাজনীতিবিদগণ চরম স্বার্থপরতার পরিচয় দেন । এ সন্ধির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে পরবর্তীতে পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদ , তুর্কি সাম্রাজ্য বিভাজন , সাইলেসিয়া আক্রমণ ইত্যাদি ঘটনা ঘটে । ইংল্যান্ড- ফ্রান্স এর সাথে গোপন চুক্তি করে হীন-মনোবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে । এমনকি ইংল্যান্ডের পরোচনায় স্যাভয় ও ক্যাটালন এর উপজাতিরা স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । ইংল্যান্ড তাদেরকে রক্ষার ব্যবস্থা না করে স্পেন রাজ পঞ্চম ফিলিপের হাতে তাদের ভাগ্য ছেড়ে দিয়ে কেটে পড়ে । এটা একটা চরম সুবিধাবাদী নীতি । 

৮) নতুন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি : 

সতের শতকের বৈশিষ্ট্য ছিল বুরবোঁ – হ্যাপসবার্গ  দ্বন্দ্ব । রাইন নদীর অববাহিকা ও নেদারল্যান্ড ছিল সে দ্বন্দ্বের প্রধান ক্ষেত্র । ইউট্রেক্ট সন্ধি সে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সেখানে প্রূশিয়া-অস্ট্রিয়া ,রাশিয়া- সুইডেন ,রাশিয়া-তুরস্ক, ইংল্যান্ড- ফ্রান্স, প্রূশিয়া-ফ্রান্স  এসব দেশের মধ্যে নতুন নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয় । রাইন ও নেদারল্যান্ডের স্থলে বাল্টিক কৃষ্ণসাগর দানিয়ুব প্রভৃতি অঞ্চলে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় । 

উপযুক্ত পর্যালোচনা থেকে কথা বলা যায় যে , ইউট্রেক্ট সন্ধি উত্তরাধিকার যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটা শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয় । অন্যদিকে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে নতুন নতুন দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটায় । চতুর্দশ লুইয়ের পররাষ্ট্রনীতির সন্ধির মাধ্যমে সাময়িকভাবে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেও পরবর্তীকালে তার এই নীতি ফ্রান্সের পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে । 

চতুর্দশ লুইয়ের  ধর্মনীতি ( Policy for Religion of Louis XIV )

রাজা চতুর্দশ লুই Divine Right of Monerchy তে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিন নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করতেন । শাসক হিসেবে ধর্ম সহ সকল ক্ষেত্রে তার পূর্ন কৃতিত্ব রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন । তাই তার ধর্মানুষ্ঠানের উপর প্রাধান্য স্থাপন করা রাজার অপরিহার্য কর্তব্য । 

তাঁর ধর্মনীতির উদ্দেশ্য : 

১) পোপের প্রাধান্য হতে ফরাসি চার্চকে ( গ্যালিকান )মুক্ত করে তা ফরাসি রাজশক্তির অধীনে স্থাপন করা এবং 

২) ধর্মনৈতিক ঐক্য স্থাপন করা এবং হুগেনোদের ক্যাথলিক ধর্মের দীক্ষিত করা এবং জেনেসিস্ট নামক গোঁড়া ক্যাথলিকপন্থিদের দমন করা। এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা নিচে দেওয়া হল : 

ক) পোপকে অপমান : 

ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির মত লুই ও ফরাসি চার্চকে জাতীয় চার্জে পরিণত করতে চেষ্টা করেন । এ সময় রোমের ফরাসি দূত ক্রেকির ব্যবহারে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে । এ কারণে ১৬৬২ সালে ক্রেকির স্ত্রী ও অনুচররা আক্রান্ত হয় । তদন্তের জন্য পোপ ৭ ম আলেকজান্ডারের ক্রাতা  দায়ী হয় । এতে লুই ফ্রান্সের নিকটবর্তী পোপের অধীনস্থ এডিগনন  নামক স্থানটি দখল করতে এবং দায়ী সৈন্যদের পদত্যাগ করতে বাধ্য হন । এভাবে অপমান করতে তিনি পিছু পায় হয়নি । 

খ) রিগেল দাবি : 

রাজার অধীনস্থ কোন চার্চের বিশপ পদ সাময়িকভাবে শূন্য হলে  ঐ সময় কার আয় রাজার প্রাপ্য হতো । এ প্রাপ্তিকে রিগেল বলা হত । তবে লুই দাবি করেন যে, রিগেল এর ক্ষমতা শুধু রাজার অধীনস্থ অঞ্চলসমূহের নয় বরং ফ্রান্সের সকল চার্চের উপর রিগেল বর্তাবেেএবং বিশপারি পদ সমূহ রাজা কীর্তক মনোনীত হবে । এনিয়ে ১৬৭৩ সালের লুই ও পোপএর মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয় । চতুর্দশ লুই ১৬৮২ সালে সেন্ট জার্মেন  নামক স্থানে সকল ফরাসি বিশপদের এক সম্মেলন আহ্বান করেন । এতে চারটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।  যেমন :- 

১) পার্থিব কোন ব্যাপারেই রাজার উপর  পোপের প্রাধান্য নেই । 

২) ধর্ম সম্পর্কে যাজকদের সাধারণ সভায় গৃহীত প্রস্তাব পোপের আদেশ অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী । 

৩) পোপ ফরাসি চার্চের  প্রচলিত নীতি বা ক্যাথলিক ধর্মনীতি বিরোধী কোনো আদেশ জারি করতে পারবে না ।

৪) পোপের কোনো আদেশ সর্বজনস্বীকৃত হতে হলে পাশ্চাত্যের সমগ্র ক্যাথলিক চার্চের সমর্থন থাকা প্রয়োজন নতুবা তা পরিবর্তন করা যেতে পারে । 

গ) দ্বন্দ্বের মীমাংসা : 

দীর্ঘদিন বিরোধ চলার পর ১৬৯৩ সালে ম্যাডাম-ডি  মেন্টিনন নামক জৈনৈক ধর্মপরায়ণ মহিলার প্রভাবে এসে চতুর্দশ লুই পোপের  সঙ্গে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলেন । লুই পোপের প্রাধান্য স্বীকার করেন এবং পোপ লুইয়ের  বিগত দশ বছরের যাবতীয় কার্যকলাপের অনুমোদন করেন । এভাবে ফরাসি চার্চের স্বাধীনতার প্রশ্ন মীমাংসিত হয় । 

ঘ) ধর্মনৈতিক ঐক্য সাধনের চেষ্টা : 

চতুর্দশ লুই রাজত্বের শেষ দিকে এসে ফরাসি জাতির মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য  সাধনের জন্য বদ্ধপরিকর হন । তিনি উপলব্ধি করেন যে ,ধর্মনৈতিক ঐক্য  সাধনা করতে না পারলে “ এক রাজা, এক জাতি ও এক ধর্ম এ উদ্দেশ্য সফল হবে না । এজন্য তিনি হুগেনো ও জেনসেনিস্টদের  দমনে অগ্রসর হন । যেমন: –

১) হুগেনোদের ধর্মান্তকরণের চেষ্টা : 

প্রথমে লুই অর্থ, চাকরি ইত্যাদি নানা প্রলোভনের দ্বারা হুগেনোদের  ক্যাথলিক ধর্মের দীক্ষিত করতে উদ্যোগী হন । “কনভার্সন ব্যুরো ( Conversion Bureau )  নামে ধর্মান্তর করার সংস্থাপন করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি । তখন তিনি হুগেনোদের চার্চ এবং স্কুল গুলো বন্ধ করে দেন । তাদের করবার দ্বিগুণ করেন এবং সহকারী পদে নিয়োগ বন্ধ করেন । আর যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করে তাদের পরিবারের সৈন্য মোতায়েন করা হয় । এসব সৈন্যরা হুগেনোদের  পরিবারের স্ত্রী- পুরুষদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করে । কিন্তু এ পথে ও লুই সফলতা পেলেন না । 

২) এডিক্ট অব নান্টিস বাতিল : 

চতুর্থ হেনরি ১৫৯৮ সালের ১৩ এপ্রিল ” এডিক্ট অব নান্টিস( Edict of Nantes “ ) নামক এক আইন জারি করে হুগেনোদের ( ফরাসি প্রটেস্টান্ট ) ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এমনকি কতক পরিমান রাজনৈতিক স্বাধীনতা দান করেন । কিন্তু তার নাতি চতুর্দশ লুই  ১৬৮৫ সালে এডিক্ট অব নান্টিস বাতিল করেন। এতে হুগেনোদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা লুপ্ত হয় । ধর্ম নিয়ে ক্যাথলিক জনতা অসহায় হুগেনোদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে । হাজার হাজার হুগেনোদের  হত্যা করা হয় । তাদেরকে আমেরিকা ও হল্যান্ড থেকে বিতাড়িত করা হয় । তাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবার জন্য হুগেনোদের  দলে দলে দেশত্যাগ করতে থাকে । এদের অনেকে ছিল দক্ষ শ্রমিক, কারিগর । এরা মূল্যবান সম্পদ ও অর্থকরী নিয়ে চলে যায় । এতে ফ্রান্স অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয় । 

৩) জেনসেনিস্টদের দমন : 

কর্ণলিয়াস জেনসেন নামক একজন ধর্মপ্রাণ , পন্ডিত ব্যক্তি সেন্ট অগাস্টিনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সৎ কর্মের দ্বারা পাপ খন্ডন এবং ঘোর বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন । তিনি ফ্রান্সে এক ধর্ম সমাজ স্থাপন করেন এবং তার নাম অনুসারে এর নাম হয় জেনসেনিস্ট ধর্ম সমাজ । জেনসেনিস্টগন সততা সত্যবাদিতা এবং কৃচ্ছসাধনের অত্যাধিক পক্ষপাতি ছিলেন । একারণে তাদেরকে ফরাসি ক্যাথলিক সমাজে পিউরিটান বলা হয় । শীঘ্রই জেনসেনিস্টদের সঙ্গে জেসুইটদের বিরোধ শুরু হয় । কারণ জেসুইটরা  নিজেদের ক্যাথলিক সমাজের সর্বাপেক্ষা পবিত্র ও সৎ বলে মনে করত । জেসুইটরা মনে করতে লাগল যে ,জেনসেনিস্টরা  তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে । দুই দলের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলে চতুর্দশ লুই জেসুইটদের পক্ষ সমর্থন করেন এবং ১৭১০ সালে তিনি জেনসেনিস্টদের ধর্ম কেন্দ্র রয়্যাল ভেঙ্গে দেন । ৩০ হাজারের বেশি জেনসেনিস্টদের  কারাবন্দি করা হয় । তিনি পোপ ক্লিমেন্টের নিকট থেকে তার কাজের সমর্থনে জেনসেনিস্টদের  নিন্দাসূচক প্রচারপত্র আদায় করেন । এভাবে তিনি ফ্রান্সে ধর্মনৈতিক ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করেন । 

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে , চতুর্দশ লুই রাষ্ট্রব্যবস্থার ন্যায় ধর্মবিষয়ক একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু তিনি তা করতে ব্যর্থ হন । এমনকি ধর্মীয় ঐক্য স্থাপন করতে সক্ষম হননি । বরংচ তিনি ) এডিক্ট অব নান্টিস বাতিল করে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেন যা ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে সর্বনাশ ডেকে আনে । 

ম্যাজারিন(১৬৪২-১৬৬১ ) – ( Mazarin ( 1642-1661 )  

1642 সালে কার্ডিনাল রিশল্যু মৃত্যুবরণ করলে তারই এক সুযোগ্য শিষ্য ম্যাজারিন তার  শূন্যস্থান পূরণ করেন । ম্যাজারিনছিলেন ইতালি ও যাজক । ১৬৩৯ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে চলে এসে সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। ১৬৪১ সালে তিনি কার্ডিনাল পদে উন্নতি হন । তার অপূর্ব কর্মদক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে রিশল্যু তার মৃত্যুশয্যায় ম্যাজারিনকে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক মনোনীত করে যান । ১৬৪৩ সালে  ত্রয়োদশ লুই মৃত্যুবরণ করলে রাজা হন তার নাবালক শিশুপুত্র চতুর্দশ লুই । রাণীমাতা এ্যান অব অস্ট্রিয়া তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন । আর ম্যাজারিন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার দায়িত্ব পান । 

তার উদ্দেশ্য ( His Purposes )  

১) অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের শক্তিকে আরও সুদৃঢ় ও সর্বাত্মক করে তোলা এবং 

২) পররাষ্ট্র বিষয়ে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ৩০ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ সুদক্ষ ভাবে পরিচালনা করা , স্পেন ও অস্ট্রিয়ার হ্যাপর্সবাগ পরিবারের স্বার্থ ক্ষুন্ন করা ফ্রান্সের সীমারেখা প্রাকৃতিক সীমারেখায় পৌঁছানো । অর্থাৎ পেরোনি’জ,  আল্পস, রাইন ও শেল্ট পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজ্য সীমা বিস্তার করা । 

অভ্যন্তরীণ নীতি/ কার্যাবলী /শাসন ব্যবস্থা ( Internal Policy / Works / Governance )

১) দমননীতি ও করধার্য : 

অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ম্যাজারিন তেমন দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি । ফ্রান্সের রাজশক্তিকে সর্বাত্মক করতে তিনি যে কঠোর দমননীতির গ্রহণ করেন, তাতে দেশের অভিজাত শ্রেণী ও জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে । দীর্ঘকালব্যাপী ফ্রান্স বৈদেশিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় দেশের আর্থিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে যায় । তিনি দেশের আর্থিক কাঠামো পুনঃগঠনের কোন চেষ্টাই করেনি ।বরং তার আর্থিক উপদেষ্টা ইমারি কর আদায়ের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করলে জনসাধারণের অসন্তোষ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে যায় । এছাড়া তিনি ইতালিয়ান হওয়াতেই অনেকে তাকে পছন্দ করতেন না । ফলে প্রদেশসমূহে  বিক্ষোভ বিদ্রোহ দেখা দেয় । 

২) প্রথম ফ্রন্ডি আন্দোলন : 

১৬৪৭ সালে প্যারিসে  বিক্রয়ার্থ পণ্যদ্রব্যের উপর  অক্টোবর বা নগর শুল্ক ধার্য করা হলে “  পার্লামেন্ট অব  প্যারিস এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং রাজধানীতে প্রবল অসন্তোষের সৃষ্টি হয় । এ সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট শক্তির বিরুদ্ধে যে সাফল্য অর্জন করে,  তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে প্যারিসের পার্লামেন্ট নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য বদ্ধপরিকর হয় । দেশের অভিজাত শ্রেণী ও গণমানুষের পূর্ণ সমর্থন লাভ করে ১৬৪৮ সালে পার্লামেন্ট দাবি করে যে , 

ক) কর ধার্য করার ক্ষমতা কেবলমাত্র পার্লামেন্টের হাতে থাকবে । 

খ) বেআইনিভাবে শুধুমাত্র সরকারি নির্দেশে কাউকে আটক বা কারাবন্দি করা যাবে না । আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতের সম্মুখে হাজির করতে হবে । 

গ) ইনটেনডেন্টদেরকে প্রত্যাহার করে দিতে হবে । 

ঘ) পণ্য দ্রব্যের উপর ধার্যকৃত করের ( টেইলি )  পরিমাণ কমাতে হবে এবং 

ঙ) কর ধার্য ও কর আদায়ের পদ্ধতি আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে । 

রাজ শক্তির বিরুদ্ধে ফরাসি জনগণের এ আন্দোলন ” প্রথম ফ্রন্ডি “আন্দোলন নামে পরিচিত । দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এটা প্রথমে ছিল একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন । ম্যাাজারিন সাময়িকভাবে পার্লামেন্টের দাবি মেনে নিলেও পরে তিনি এ আন্দোলনের দুজন বিশিষ্ট নেতাকে কারারুদ্ধ  করে আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে চান । ফলে প্যারিসের জনসাধারণ ধর্মযাজক গোন্ডির ( Gondy ) নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । বিখ্যাত ফরাসি সেনাপতি কন্ডি (Conde) তাকে সমর্থন দেন । কূটকৌশলী ম্যাগাজিন কন্ডির সঙ্গে গোপন যোগসূত্র স্থাপন করে তাকে স্বপক্ষে আনয়ন করেন । তিন মাস ধরে খন্ডযুদ্ধ চলার পর বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে । তবে ১৬৪৯ সালে রুয়েলের সন্ধি অনুযায়ী ম্যাগাজিন পালামেন্টের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করে নেয় । এভাবে প্রথম ফ্রন্ডি আন্দোলনের অবসান ঘটে । 

৩) দ্বিতীয় বা নব  ফ্রন্ডি আন্দোলন : 

প্রথম ফ্রন্ডি আন্দোলন সমাপ্ত হওয়ার পর ক্ষমতালোভী কন্ডি রাজার পক্ষ ত্যাগ করে পুনরায় অভিজাত শ্রেণীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্র মূলক কার্য়ে লিপ্ত হয়।  ম্যাজারিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে পন্ডিত কতিপয় অভিজাতকে কারারুদ্ধ করে । তার এর দমন নীতির বিরুদ্ধে দেশে পুনরায় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়,  যা  দ্বিতীয় বা নব  ফ্রন্ডি আন্দোলন নামে অভিহিত । এ আন্দোলন এত তীব্র আকার ধারণ করে যে , ম্যাজারিন শেষ পর্যন্ত ফ্রন্ডি এবং তার অনুচরকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । এসময় তিনি নিজে রাজ পরিবার সহ ফ্রান্স থেকে পালায়ন করে আত্মরক্ষা করে । কিন্তু উপযুক্ত নেতা ও অভ্যন্তরীণ শক্তির অভাবে বিরোধীদল ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে । ধূর্ত ম্যাজারিন এ  সুযোগ গ্রহণ করে বিখ্যাত সেনাপতি টুরেনকে স্বপক্ষে নিয়ে আসেন । ১৬৫২ সালে প্যারিসের অনতিদূরে টুরেন ও ম্যাগাজিনের সম্মিলিত বাহিনী কন্ডিকে পরাজিত করেন । সেনাপতি কন্ডি  সহ ফ্রন্ডি বিদ্রোহীদের অনেককেই ফাঁসি দেওয়া হয় । আবার অনেককে নির্বাসনেও পাঠানো হয় । এভাবে নব ফন্ডি আন্দোলনের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে । 

৪) সর্বাত্মক রাজশক্তি : 

প্রথম ফন্ডি আন্দোলন এবং নব ফন্ডি আন্দোলন ব্যর্থ হবার ফলে ফ্রান্সের রাজশক্তির সর্বময় কৃতিত্বের অধিকারী হয় । পার্লামেন্ট অভিজাত শ্রেণী , হুগেনো সম্প্রদায় ও সকল জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্ষমতা ও মর্যাদা লুপ্ত হয় । প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলন ব্যর্থ হবার পর যে অপ্রতিদ্বন্দ্বি ও সর্বাত্মক শক্তি গড়ে ওঠে তা ফরাসি বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকে । 

পররাষ্ট্র নীতি ( Foreign Policy  ) :

অভ্যন্তরীণ নীতির চেয়ে বৈদেশিক নীতিতে মেজারিনের সফলতার পাল্লা ভারী । বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির জন্য মেজারিন ফ্রান্সের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন । বিশল্যু তার অনুসূত নীতির পূর্ন সফলতা বা বাস্তবায়ন নিজের জীবন দশা দেখে যেতে পারেননি । কিন্তু তার সুযোগ্য উত্তরসূরি মেজারিন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে তার বিদেশি নীতি অনুসরণ করে অনেক জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সের একাআধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন । 

১) ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধ : 

ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধে মেজারিন  তার গুরু রিশল্যুর মতই জার্মানির প্রোটেস্ট্যান্টদেরকে সমর্থন দেন । নিজেরা ফ্রান্সে ক্যাথলিক সমর্থক হলেও জার্মানিতে তারা প্রোটেস্ট্যান্ট সমর্থক । কারণ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হল হ্যাপসবার্গ পরিবার অর্থাৎ অস্ট্রিয়া ও স্পেন । হ্যাপসবার্গ  পরিবার যেহেতু ক্যাথলিক সমর্থক সেহেতু ফ্রান্স প্রোটেস্ট্যান্ট সমর্থক । ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধ মেজারিন  অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে হ্যাপসবার্গ  পরিবারকে পর্যদুস্ত করে দেন । ১৬৪৩ সালে  ফ্রান্স রকরয় (Rocrori ) এবংলেনসের (Lens )   যুদ্ধে স্পেনকে পরাজিত করেন । এ বিজয় ফ্রান্সের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা । 

2) ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি :

১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধি হলো মেজারিন হ্যাপসবার্গ পরিবারকে তাতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন । এ সন্ধির ফলে ফ্রান্স মেৎস, টুল , ভার্দুন , আলসাস ও পিনোরাল  লাভ করেন । ফলে ফ্রান্সের পূর্ব সীমানা রাইন নদীর পর্যন্ত পৌঁছে যায় । 

৩) স্পেনকে এক ঘরে করা : 

আলসার ফ্রান্সের হাতে চলে যাওয়ায় স্পেন ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধির শর্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে । কিন্তু মেজারিন তার কূটনৈতিক জালে স্পেনকে বন্দী করে ফেলেন । এতে স্পেন আন্তর্জাতিকভাবে বন্ধুহীন হয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে । ওয়েস্টফেলিয়া সন্ধির ফলে জার্মানি প্রতিটি রাজ্য স্বাধীন হয়ে যায় । তখন পবিত্র রোমান সম্রাট নামমাত্র টিকে থাকে । পবিত্র রোমান সম্রাট শুধু অস্ট্রিয়ার সম্রাট হয়ে যান । তারপরেও অস্ট্রিয়ার সম্রাট লিওপোল্ড যাতে স্পেনের পক্ষ সমর্থন না করেন , সেজন্য তিনি সম্রাটের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সমর্থন ও সাহায্য করার ভীতি প্রদর্শন করেন । এরপর ম্যাজারিন ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রনায়ক ক্রমওয়েল কে ডানকার্ক প্রদানের শর্তে ইংল্যান্ডের সঙ্গে আক্রমণাত্মক চুক্তিতে আবদ্ধ করেন । 

৪) পিরোনিজের  সন্ধি : 

আন্তর্জাতিকভাবে স্পেনকে বিচ্ছিন্ন করে মেজারিন ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে ডুনসের যুদ্ধে ( Battle of Dunes ) স্পেনকে আক্রমণ করেন । ঐ যুদ্ধে ফরাসি ও ব্রিটিরশর যৌথ বাহিনীর নিকট পরাজিত হয় এবং ১৬৫৯ সালে পিরোনিজের  সন্ধি  স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় । সন্ধির ফলে ফ্রান্স উত্তরে আতের্অয়া এবং দক্ষিণে পিরেনিজ পর্বতমালা সীমান্তে অবস্থিত রূসিলন ও সার্দেন লাভ করে । দক্ষিণের ফ্রান্সের সীমারেখা পিরেনিজ পর্যন্ত পৌঁছে । 

৫) স্পেনের সঙ্গে আত্মীয়তা : 

স্পেনের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনৈতিক জটিলতা দূর করে মৈত্রীবন্ধন দীর্ঘস্থায়ী করতে মেজারিন স্পেনের চতুর্থ ফিলিপের কন্যা মেরিয়া থেরেসার সঙ্গে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর বিয়ে দেন । সে সঙ্গে স্পেনের সিংহাসন ফ্রান্সের অধীনে আসার পথ পরিষ্কার করে রাখেন । 

মূল্যায়ন : 

মেজারিন ছিলেন শান্ত প্রকৃতির, মিষ্টভাষী, ধূর্ত। বাকচাতুরি ,  ভদ্রতা বিনয় ও কূটকৌশলের সাহায্যে তিনি শত্রুদের জয় করতে পারতেন । তিনি ছিলেন রিশল্যুর ভক্ত ও অনুসারী । তবে তার মত মৌলিক প্রতিভার অধিকারী নয় । তিনি ফরাসি সাহিত্য,  শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের দিকে মনোযোগ দেননি । দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির কোনো চেষ্টা করেননি । ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফরাসি রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে । নানা প্রকারের খেতাব বিক্রি ও নতুন নতুন কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করে তা বিক্রি এবং সর্বোপরি নতুন নতুন কর ধার্য করে সরকারি খরচ চালানো হতো । আর এ অদূরদর্শী নীতির কারণে ফ্রন্ডি বিদ্রোহ সংঘটিত হয় । তবে তিনি কুটকৌশল,  উৎকোচ দ্বারা প্রতিপক্ষকে নিজের আয়ত্তে নিতেন । এটি তার কম কৃতিত্ব নয় । ফ্রন্ডি বিদ্রোহ দমন করতে না পারলে বুরবোঁ রাজবংশের ইতি হতো  একানেই। ম্যাগাজিনের বড় কৃতিত্ব তার পররাষ্ট্রনীতিতে । তার সুদক্ষ পরিচালনায় ওয়েস্টফেলিয়া এবং পিরোনিজের সন্ধিতে  একাধিপত্য লাভ করতে সক্ষম হয় । ফ্রান্স  সন্ধিদ্বয়ের শর্তাদি নির্ধারণ করে তা হ্যাপসবার্গ পরিবারকে মানতে বাধ্য করেন । ফলে ফ্রান্সের সীমারেখা প্রাকৃতিক সীমারেখায় পৌঁছায় , যা ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল । অতএব ফরাসি রাজতন্ত্র কে রক্ষা করা তাকে সুদীর্ঘ করা এবং ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রাধান্য স্থাপন করার কৃতিত্ব ম্যাগাজিনের প্রাপ্য এতে কোন সন্দেহ নেই । 

জ্যাঁ বাপাতিস্বে কোলবেয়ার ( কোলবার্ট )- ১৬৬১-১৬৭১ ( Jean Baptist Colbert ( 1661-1671 )  

কোলবার্ট ছিলেন একজন অসাধারণ অর্থনৈতিক সংস্কার ও পরিচালক । তার কর্তব্য নিষ্ঠা সততা , দক্ষতা এবং প্রবুর  প্রতি আনুগত্য ছিল অটল এবং অটুট । তিনি একদিকে ছিলেন অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন , অন্যদিকে ছিলেন বিচক্ষণ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । তার প্রতিভা , তার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতি সহানুভূতি এবং সর্বোপরি তাঁর দেশপ্রেম তাকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে । তিনি  অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সরকারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন করেন । তিনি ক্রমে ক্রমে পূর্ত বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট , রাজস্ব বিভাগের কম্পট্রোলার জেনারেল এবং নৌমন্ত্রী ইত্যাদি পদ  প্রাপ্ত হন । তবে তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন । 

কোলবার্টের পূর্বে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা : 

কোলবার্ট  যখন ফ্রান্সের রাজস্ব বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল চরম নাজুক । সরকারের অর্থাভাব দিন দিন বেড়ে চলছিল । চড়া সুদের টাকা ধার করে রাস্তায় ব্যয় নির্বাহ করা হতো । সরকারের বার্ষিক আয় অপেক্ষা 32 মিলিয়ন বেশি ব্যয় করা হতো । এ অর্থাভাব পূরণ করার জন্য নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করা হত এবং তা সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রয় করা হতো । নতুন নতুন খেতাব বিক্রি করে অর্থসংস্থানের চেষ্টা করা হতো । কিন্তু এত কিছু করেও অর্থের সংকোচন থেকে যেত । সরকারি কর্মচারীরা ছিল দুর্নীতিবাজ । তারা আদায়কৃত অর্থের যৎসামান্য রাজকোষে জমা দিতে । প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন তম কর্মচারী পর্যন্ত সবাই ছিল দুর্নীতি পরায়ন এবং রাজস্ব অপহরণে ব্যস্ত । কোলবার্টের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্ব বিভাগের সর্বোচ্চ কর্মচারী নিকোলাস ফকুরের অর্থ আত্মসাৎ করে বিচার চলাকালীন সময়ে সরকারি কর্মচারীদের নানাপ্রকার দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পায় । 

কোলবার্টের সংস্কার নীতি : 

১) কোলবার্ট উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে,  রাষ্টের আর্থিক সচ্ছলতার নির্ভর করে জনসাধারণের আর্থিক সচ্ছলতার উপর । অনায়াসে কর আদায় করতে পারলে দেশের উন্নতি হবে না । জনসাধারণ অনায়াসে কর দিতে পারলেই দেশের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে বোঝা যাবে । তিনি আরো উপলব্ধি করেছিলেন যে,  দেশের গৌরব সামরিক অভিযোগের সাফল্যের দ্বারা বৃদ্ধি পায় না । জাতির আর্থিক সমৃদ্ধির উপরেই দেশের শক্তি ও গৌরব নির্ভর করে । ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি করে জনসাধারণের আর্থিক উন্নতি বিধান করা সম্ভব । এজন্য সরকারের পক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য,  উপনিবেশ স্থাপন ইত্যাদি জাতীয় উৎপাদনের যত রয়েছে সেগুলোর উন্নতির জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করা প্রয়োজন । 

২) রাজস্ব আয় হতেই ব্যয় সংকোচন করতে হবে । ঋণ সহজলভ্য হলেও ঋণের উপর নির্ভরশীল হওয়া সর্বনাশ  । 

৩) রাজস্বের অপচয় বন্ধ করা , রাজকর্মচারীদের রাজস্ব অপহরণ এবং দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন । 

৪) মিতব্যয়িতা ও আয় ব্যয় হিসাব নিরীক্ষা করা সরকারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একান্ত অত্যাবশ্যকীয় । 

৫) ফরাসি নৌবহরের উন্নতিবিধান করা । 

৬) শিক্ষা, বিজ্ঞান, কৃষি ইত্যাদি সব দিক দিয়েই দেশকে সমৃদ্ধশালী করে তোলা ছিল তার সংস্কার নীতির মূল উদ্দেশ্য । 

কোলবার্টের অর্থনৈতিক  সংস্কার / সংস্কার সমূহ – ( Economic Reforms of Colbert  )

১) অবৈধ ঋণ বাতিল : 

কোলবার্ট রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েই প্রথমে যে কাজটি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন তাহলো রাজস্ব বিভাগের অব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন করা । তিনি অর্থের জন্য খেতাব বা পদ  বিক্রি বন্ধ করেন । উচ্চ হারে সুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে যেসব ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল তিনি তা পরীক্ষা করে দেখলেন এবং সেখানেই কোনো প্রকার সন্দেহ বা দুর্নীতির প্রমাণ পেলেন ঋণ বাতিল করে দিলেন । 

২) রাজকর্মচারীদের সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ :

হিসাব-নিকাশ নিরীক্ষার ওপর অধিকতর জোর দেওয়া হল । যেসকল রাজকর্মচারী অবৈধভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন তাদেরকে সেই অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করা হলো । 

৩) নতুন টেইলি  কর ধার্য : 

তিনি দেখেন যে , টেইলি  নামে এক ধরনের কর বহুবছর ধরে অনআদায়কৃত রয়েছে । তিনি জনসাধারণের সামর্থ্য অনুযায়ী কর ধার্য  করাই একদিকে তিনি যেমন জনসাধারণের নিকট প্রিয় পাত্র হন , অন্যদিকে প্রজা সাধারণের কর প্রদানের হার  ও বৃদ্ধি পায় ।

৪) পরোক্ষ কর বৃদ্ধি:  

তিনি দেখলেন যে মানুষ প্রত্যক্ষ কর দিতে অনিচ্ছুক এবং তা আদায় করা কঠিন । এজন্য প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ হ্রাস করে,  পরোক্ষ করের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন । 

৫) কৃষকদের সরকারি সাহায্য দান : 

কোলবার্টের  উদ্দেশ্য ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা । এজন্য তিনি খাদ্য দ্রব্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেন । এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি তাদেরকে সরকারি সাহায্য দান করেন । 

৬) শিল্প সংরক্ষণ নীতি : 

বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করার জন্য তিনি উচ্চহারে আমদানি শুল্ক আরোপ করেন । অন্যদিকে রপ্তানি শুল্ক কমিয়ে দেন । এ সংস্কার নীতির কারণে ফরাসি শিল্প সমাজেই গড়ে উঠতে লাগলো । দেশের সর্বত্র শিল্প-কারখানা, শিল্প-বাণিজ্য এক নব উদ্যমে সৃষ্টি হল। তার সময়ে কাচ, রেশম, লেস , ব্রোকেড ইত্যাদি পৃথিবীর সর্বত্র চাহিদা ছিল।  

৭) আন্ত:শুল্ক বিলোপ : 

ফরাসি দেশে তখন এক প্রদেশের উৎপন্ন পণ্য অন্য প্রদেশে চালান দিতে হলে শুল্ক দিতে হতো ।তিনি সকল আন্ত: প্রদেশিক শুল্ক উঠিয়ে দেন । এতে অভ্যান্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য উৎসাহিত হল । 

৮) পরিবহন ব্যবস্থা : 

ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতির জন্য উন্নত ধরনের পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন । এটা উপলব্ধি করে কোলবার্ট বহু রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন  এবং খাল খনন করেন । তিনি ল্যান্ডওয়েডক ক্যানাল নামে একটি বিখ্যাত খাল খনন করেন , যা ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে । ফরাসি দেশের সমৃদ্ধি বর্ধনে এ খাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে । 

৯) বনবিভাগ ও অশ্ব : 

তিনি বন সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বন সংরক্ষণ ও বন বিভাগ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন।  অশ্বের  উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি বড় বড় প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলেন । 

১০) উপনিবেশ ও যৌথ কারবার : 

 কোলবার্ট নতুন শিল্পজাত পণ্য বিক্রয় জন্য নতুন বাজার খুঁজতে থাকেন । এজন্য তিনি নতুন নতুন উপনিবেশ স্থাপনে ফরাসি জাতিকে উৎসাহ প্রদান করেন । এতে ফরাসিরা একদিকে যেমন নতুন উপনিবেশ স্থাপন করতে থাকে তেমনই নতুন বাজার সৃষ্টি করতে থাকে। তিনি যৌথ কারবার লগ্নি করারও আহ্বান জানান যাতে ফরাসিরা নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে পারে । 

১১) মার্কেনটাইলবাদ : 

তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হল্যান্ডকে পশ্চাতে ফেলতে কতিপয় পন্থা গ্রহণ করেন । যেমন :-

ক) ফ্রান্সের পুরাতন শিল্পকে পুনরুজ্জীবন করার । 

খ) নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা করা ।

গ) বাণিজ্যের পথ তৈরি করা ।

ঘ) খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন বাড়িয়ে জীবনযাত্রা সহজলভ্য করা । 

এজন্য তার নৈতিক পরিকল্পনা মার্কেন্টাইলবাদ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল । তার অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে মাত্র ছয় বছরে রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ২০ লক্ষ লিবি ঘাটতি পূরণ ৩ কোটি  লিবি রাজকোষে জমা হয় । 

সমালোচনা ( Criticism  ) :

কোলবার্ট  সংস্কারের যেমন তুলনা নেই , তেমনি সমালোচনার অন্ত নেই । নিম্নে তা আলোচনা করা হল । 

১) কোলবার্ট  নিজে ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক । এজন্য তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্নতির জন্য সবকিছু করেন । তিনি কৃষকদের উন্নতির ব্যাপারে মনোযোগ দেননি । তিনি খাদ্য দ্রব্য রপ্তানি বন্ধ করে কৃষকদের ক্ষতি সাধন করেন । 

২) কৃষিজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ও যে জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে পাওয়া যেত , তা তিনি উপলব্ধি করেন নি । 

৩) তিনি সংরক্ষন নীতি গ্রহণ করলেও অবাধ বাণিজ্যনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করতেন । ১৬৬৯  সালে তিনি ইংল্যান্ডের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি করতে চেয়েছিলেন ।যদিও তার সাফল্য লাভ করেনি । তবে এদিক দিয়ে তিনি তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তির অপেক্ষা অনেক বেশি পরিমাণে আধুনিক ছিলেন । 

৪) হল্যান্ডকে প্রতিহত করার জন্য ফ্রান্স ও হল্যান্ডর মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয় তার ফলস্বরূপ হল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এজন্য ফ্রান্সের সংরক্ষণ নীতি আংশিক দায়ী ছিল । 

৫) বেশি পরিমাণে রাষ্ট্রীয় সাহায্য পাওয়ার ফলে , ফ্রান্সের উৎপাদনকারীরা সরকারের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে ,স্বাধীন  ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলে কিছু ছিল না । পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার কমালে  এসকল শিল্পের অবনতি হয় । 

৬) কোলবার্টের উপনিবেশিক ও বাণিজ্যনীতি উচ্চবিলাসী ছিল বটে , কিন্তু তা ছিল সংকীর্ণ ও অসম্পূর্ণ।  বাণিজ্যিক বা উপনিবেশিক সাফল্য যে জাতির সাহায্য-সমর্থন উপর নির্ভরশীল তা তিনি উপলব্ধি করেন নি । ইংল্যান্ডের বাণিজ্য বা উপনিবেশ ইংরেজ জাতির শ্রেষ্ঠ গড়ে উঠেছিল । কেবল সরকারি চেষ্টা নয় । এছাড়া তিনি ফরাসি দেশের অবাঞ্চিত ব্যক্তিদের দ্বারা উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন।  ফলে কোনোকালেই ফরাসি উপনিবেশ আত্মনির্ভরশীল হতে পারেনি । ব্রিটিশ উপনিবেশের ন্যায় ফরাসি উপনিবেশ ফরাসি দেশের শক্তি বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করতে পারেনি । 

৭) কোলবার্টের সংস্কারের ফলে ফ্রান্সের যেআর্থিক সাফল্য দেখা দিয়েছিল তাতে চতুর্দশ লুইয়ের মনে রাজ্য বিস্তার নীতির  প্রেরণা পায় । কোলবার্টের  সংস্কার ব্যতীত লুই  ইউরোপে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারতেন না । 

৮) কোলবার্টের আর্থিক নীতি জাতীয়তাবোধের উদ্ভূত ছিল না । ফরাসি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন তার উদ্দেশ্য ছিল না । তার উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি রাজতন্ত্র কে সুসংগত এবং মজবুত করা । এদিক দিয়ে বিচার করলে তাকে জাতীয় অর্থ  (National Financier )  বলা যায় না । 

উপযুক্ত পর্যালোচনা সত্তেও , সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসি দেশের প্রাধান্য ও ফরাসি আর্থিক স্বচ্ছলতার পিছনে কোলবার্টের অবদান সামান্য নয় , বরং অপরিসীম ।  রিশল্যু বা ম্যাগাজিন এর আমলে ফ্রান্সে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসেনি । কিন্তু মেহজাবিনের আমলের দুর্নীতি ও দীর্ঘ ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সের রাজকোষ শূন্য হয়ে  গিয়েছিল । সরকার তখন ছিল ঋণে জর্জরিত । কোলবার্টের চেষ্টায় ও আত্মিক অব্যবস্থা ও অস্থিরতা দূর হয়েছিল । তিনি রাজকর্মচারীদের অসৎ উপায়ে অর্থ আত্মসাৎ করা , হিসাব-নিকাশের কঠোর নিয়ম প্রবর্তন করে সরকারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন করেন । সবকিছু মিলিয়ে সংস্কারক হিসেবে ফরাসি ইতিহাসে কোলবার্টের  অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

÷ 2 = 5