জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারী :

Enlightened Despots 

জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার বলতে কি বুঝ? -( What is Enlightend Despotism ? )

জ্ঞান মানে আলো বা যুক্তি , আর দীপ্তমান প্রজ্বলিত বা উদ্ভাসিত । আবার স্বৈরাচারী হল এমন এক ধরনের শাসন ব্যবস্থা যেখানে রাজা সর্বাত্তক ক্ষমতার অধিকারী । তিনি কারো কাছে কোন কাজের জন্য দায়ী নয় । রাজার জন্য জনগণ , জনগণের জন্য রাজা নয় । রাজারা ঐশ্বরিক ক্ষমতার (Divine Right of Monarchism )   বিশ্বাসী । তাই জ্ঞান দীপ্ত স্বৈরাচারী হল এমন এক ধরনের শাসন ব্যবস্থা যেখানে রাজা বা  বাদশা বা শাসক যিনি নিজের স্বৈরাচারী হয়েও তিনি জ্ঞান বা যুক্তির আলোকে আলোকিত এবং সর্বদা প্রজা কল্যাণে নিবেদিত । 

আঠারো শতকে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তা-চেতনা, যুক্তি -দর্শন, শিল্প-সাহিত্যের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় , মানসিক উৎকর্ষ সাধিত হয় । এজন্য এর শতকে জ্ঞানদীপ্তর (Age of Enlightenment )   যুগ বলা হয় । জ্ঞানদীপ্তির বড় দিক হচ্ছে সব বিষয়ে যুক্তিবাদের প্রাধান্য মেনে নেওয়া । যুক্তিবাদ হল সবকিছু জেনে, শুনে, দেখে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে যা ভালো তা গ্রহণ করা । এসময় দার্শনিকেরা মত প্রকাশ করেন যে , সবকিছুর পেছনে নিয়ম বা যুক্তি কাজ করে । প্রকৃতি নিজেই নিয়ম বা লয়্ (Law )  মেনে চলে । তাই মানব সমাজ রাষ্ট্র বা রাজা প্রকৃতির অধীনে । সেজন্য এগুলো নিয়ম বা লয়  (Law ) মেনে চলতে বাধ্য । এসব দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন , ভলতেয়ার , মন্তেস্কু , রূশো, দিদেরো , এলেমবার্ট , জন লক প্রমুখ । তারা মত প্রকাশ করেন যে , রাষ্ট্র মানব সমাজের মঙ্গলের জন্য গঠিত হয়েছে । অতএব , রাষ্ট্রের শাসক বা রাজার যেমন অধিকার আছে , তেমনি তার কতগুলো কর্তব্য রয়েছে । কর্তব্য পালন না করে অধিকার ভোগ করা প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী । 

দার্শনিক এর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাজা তাঁদের প্রজাদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন , সংস্কার সাধন করেন । আবার তারা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ও বহাল রাখেন । অর্থাৎ তারা স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতা উৎপন্ন রেখে প্রজাদের মঙ্গলের সাধন করেন । এরূপ প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী ( Benevolent Despotism ) বা জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার( Enlightend Despotism )  নামে পরিচিত । এরূপ শাসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রূশিয়ার মহামতি ফ্রেডারিখ , অস্ট্রিয়ার মারিয়া থেরেসা , দ্বিতীয় জোসেফ , রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথারিন । এরা জ্ঞান দীপ্ত হলেও পররাজ্য গ্রাস করে নিজ নিজ বংশ ও রাজ্যের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সদা সচেষ্ট ছিলেন । 

জ্ঞানদীপ্তির বৈশিষ্ট্যসমূহ ( Characteristics of Enlightend Despotism )

আঠারো শতকে ইউরোপে জ্ঞানদীপ্তির যে ব্যাপক প্রসার সাধিত হয়েছিল চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য/ সূত্র /নীতির উপর ভিত্তি করে । যেমন: –

১) যুক্তিবাদ ( Rationalism ) : 

যুক্তিবাদ হচ্ছে কোনকিছু ভালোভাবে জেনে বুঝে এবং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সত্য উপনীত হওয়া যা ভাল তা গ্রহন করা । যুক্তিবাদের মূলকথা হলো কোনকিছুই যুক্তিতর্কের উদ্দে নয় । দার্শনিকদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে শাসকরা যুক্তিবাদ কে প্রাধান্য দিতে থাকে । এর ফলে শিক্ষাদীক্ষা, বিজ্ঞান, সমাজ ,রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটে । 

২) মানবতাবাদ ( Humanitarianism ) : 

মানুষ মানুষের জন্য।  মানুষের কল্যাণ করায় মানুষ, শাসক ও রাষ্ট্রের মহান দায়িত্ব । সর্বপ্রকার জ্ঞানলব্ধ বিষয়বস্তু মানব জাতির কল্যাণে প্রয়োগ করাই হল মানবতার সার্থকতা । ফলে মানব কল্যাণের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা লব্ধ ফলাফল প্রস্তুত হতে লাগলো । 

৩) প্রকৃতিবাদ ( Naturalism ) : 

প্রকৃতিবাদ হচ্ছে প্রাকৃতিক সবকিছুকেই অপ্রাকৃত বা অতিপ্রাকৃতের  উপরে স্থান দেওয়া । প্রাকৃতিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সাধন করা । প্রকৃতিবাদ প্রয়োগের ফলে সমাজে কুসংস্কার ,যাদুবিদ্যা, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি বা অতিপ্রাকৃত সবকিছুর স্থলে বিজ্ঞান তথা যুক্তিবাদের প্রাধান্য সূচনা হলো । ধর্মান্ধতা, বিশ্বাস লাঘব পেতে শুরু করে । যেমন চিকিৎসা শাস্ত্রে ঝাড়-ফুঁক ,  যাদুবিদ্যার অবসান ঘুরতে লাগলো । 

৪) আশাবাদ ( Optimism ) : 

জ্ঞানদীপ্তির অনুসারীগণের মধ্যে বিশ্বাস জমতে থাকে যে , মানবজাতি যুক্তিবাদের মাধ্যমে উন্নতির পথে অগ্রসর হয়ে শ্রেষ্ঠত্য অর্জন করতে সক্ষম হবে । উন্নতর ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনের আশা চিন্তাশীল ও শিক্ষিত মানুষকে ভবিষ্যৎ দিনের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে । 

উপযুক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য /সূত্র /নীতিকে কেন্দ্র করে জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরতন্ত্র বিকশিত হতে থাকে । 

মহামতি ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম ( ১৭৪০-১৭৮৬ )- ( Frederick William II ( 1740-1786 )  

জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার বা প্রজাহিতৈষী  স্বৈরাচার শাসকদের মধ্যে ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম বা মহামতি ফ্রেডারিখ ছিলেন অন্যতম । তাঁর পিতা ছিলেন স্পর্শিয়ার রাজা ফ্রেডারিখ  ১ম উইলিয়াম । ১৭৪০ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি প্রূশিয়ার সিংহাসনে আহরণ করেন ।তিনি যখন সিংহাসনে আহরণ করেন তখন জার্মানির ৩০০ এর বেশি রাজ্য বিভক্ত ছিল । এগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও প্রূশিয়া  ছিল সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী । তিনি চেয়েছিলেন জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য খর্ব করে প্রূশিয়ার  প্রাধান্য বিস্তার করতে । প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে তার খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে । নিম্নে তা আলোচনা করা হল : 

১) প্রজাহিতৈষী শাসক : 

মহামতি ফ্রেডারিখ বাল্যকালে শিল্প সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন । তিনি ভলতেয়ার, মন্টেস্কু ,লক ,তুর্গো , বেককারিয়া ,এডাম স্মিথ প্রভৃতি দার্শনিক, সাহিত্যিক ও  অর্থনীতিবীদ দ্বারা প্রভাবিত হন । ভলতেয়ারের  প্রতি তার ভক্তি ছিল অপরিসীম।  তার উদ্দেশ্য ছিল ২য় ভলতেয়ারে পরিণত হওয়া । কিন্তু পিতার কঠোর শাসনের তিনি শাসন কাজে মনোযোগ দিতে বাধ্য হন । ক্ষমতায় আহরণ করে তিনি নিজেকে First Servant of the Stste  (রাষ্ট্রের প্রধান সেবক) বলে ঘোষণা করেন । তিনি বলেন শাসকের জন্য জনগণ নয়,  জনগণের জন্য শাসক। ভলতেয়ারকে তিনি বলেন , আমার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এ দেশ থেকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করা  এবং জনগনকে যতটা সম্ভব সুখী করা । “ এ জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর পরিশ্রমী হতে নির্দেশ দিয়েছেন ” । তিনি বলতেন যে , আলস্যের ন্যায় আর কিছু এই মৃত্যুর সমকক্ষতা দাবি করতে পারে না । 

২) শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতি : 

শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির জন্য ফ্রেডারিখ  তার পূর্বপুরুষদের অনুষ্ঠিত বনিকবাদ নীতি (Mercantilism )   অবলম্বন করেন । তিন্নি বলেন , শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এমন নীতি অনুসরণ করতে হবে, যা দেশ থেকে স্থায়ীভাবে অর্থ বিদেশে চলে না যায় সে ব্যবস্থা করা । এজন্য আমদানিকৃত পণ্য দেশে উৎপাদনে ব্যবস্থা করা । তিনি আমদানিকৃত পণ্যের উপর অধিক হারে শুল্ক ধার্য করেন । নতুন শিল্প স্থাপনে সহায়তা করেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই নীতির ফলে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে তার পৃষ্ঠপোষকতায়, লেীহ,রেশম ও পশম শিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে।  

৩) কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন : 

মহামতি ফ্রেডারিখ কৃষি উন্নয়নের জন্য কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সময় যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তিনি তাদের মধ্যে বিনামূল্যে শস্য বীজ, গবাদিপশু বিতরণ তাদের ঘর-বাড়ি মেরামত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের কর লাঘব করেন । তিনি ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে লোকজনকে প্রূশিয়ায় এসে বসতি স্থাপনে আমন্ত্রণ জানান । তার আমন্ত্রণে প্রায় তিন লক্ষ বিদেশি সারা দেয় । ফলে আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । তিনি সামন্তপ্রভু ভূস্বামীদেরকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফসল ফলাতে উৎসাহিত করেন । তিনি নিয়ম করেন যে, যেসব চাষী সরকারি জমি চাষ করে তাদেরকে সপ্তাহে চার দিনের বেশি দিতে হবে না । তিনি কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন । 

৪) আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কার : 

ফ্রেডারিখ তদন্তকার্যে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বর্বরোচিত দৈহিক নির্যাতন ব্যবস্থা  উঠিয়ে দেন । অদক্ষ ও দুর্নীতি পরায়ন বিচারকদের বরখাস্ত করা হয় । সারাদেশে মামলার জন্য একই হারে ফি ধার্য করা হয় । দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গৃহীত হয় । জনগণের সুবিধার্থে দেশে প্রচলিত সকল আইনের সংকলন সহজ ভাষায় প্রকাশ করা হয় । মহামতি ফ্রেডারিখ বিচার বিভাগের সংস্কার করে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন । 

৫) ধর্মীয় ক্ষেত্রে সহনশীলতা : 

ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মহামতি ফ্রেডারিখ ভিলেন ইউরোপের সবচেয়ে সহনশীল শাসক । তিনি ঘোষণা করেন , “ আমার রাজ্য সকল ধর্মকে সহ্য করা হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ নিজ ধর্ম – কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে । “ দীর্ঘ ৪৬  বছরের রাজত্বকালে তিনি  এ নীতি থেকে কখনো বিচ্যুত হননি । রোমের পোপ জেসুইট সংঘের সদস্যের নির্মূল করার জন্য যে ঘোষণা দেন ফ্রেডারিখ সেই ঘোষণা প্রূশিয়ায় কার্যকর করতে অস্বীকার জানান। ফলে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন এর মত ক্যাথলিক রাষ্ট্র থেকে জেসুইটরা  প্রূশিয়ায় আশ্রয় নিতে পেরেছিল । তিনি আরো ঘোষণা করেন , “ তুর্কিরা যদি প্রূশিয়ায় বসতি স্থাপন করতে চায় আমি তাদেরকে মসজিদ তৈরি করে দেব ।” 

৬) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা : 

মহামতি ফ্রেডারিখের  শাসনামলে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল । তিনি বলেছিলেন সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয় । তবে ধর্মের সমালোচনা সংবাদপত্র যতটা স্বাধীনতা ভোগ করতে অন্যান্য ক্ষেত্রে ততটা করত না । জ্ঞানদীপ্তম্বের প্রভাবে ফ্রেডারিখ ধর্ম সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন । অতএব ধর্মের বিরূপ সমালোচনা তার আপত্তি ছিলনা । 

৭) শিক্ষা সংস্কার : 

শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে ফ্রেডারিখ সজাগ ছিলেন । তিনি বলেন “ যুব সমাজকে শিক্ষার গুরুত্ব সরকারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে । “ মানুষের বয়স যতই বৃদ্ধি পায় ততই সে উপলব্ধি করে শিক্ষার গুরুত্ব কে অবহেলা করলে কি ক্ষতি হয় । কিন্তু এরূপ উপলব্ধি থাকলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সংস্কার প্রবর্তন করতে পারেননি । প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কিছু বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন মাত্র । উচ্চ শিক্ষার বিকাশে জন্য তেমন কিছু করতে পারেননি । এর কারণ ছিল অর্থাভাব । বিএড সেনাবাহিনী ভরণপোষণের জন্য বিশাল অর্থের দরকার ছিল । ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তেমন কোনো বরাদ্দ দিতে পারেননি । 

৮) রাজ্য বিস্তার : 

শিল্প সাহিত্য, দর্শন ও সঙ্গীতের প্রতি দ্বিতীয় ফ্রেডারিখের উৎসাহ থাকার পাশাপাশি পররাজ্য গ্রাসের আগ্রহ ঘাটতি ছিল না । এইজন্য তিনি বিরাট সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং তিনটি যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন । নিম্ন তিনটি যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো । যেমন: –

ক) অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ ( ১৭৪০ -১৭৪৮ ) : 

প্রূশিয়ার হোহেনজোলার্ন বংশীয় শাসকবর্গ দীর্ঘদিন যাবৎ অস্ট্রিয়ার অধীনে সাইলেশিয়া দাবি করে আসছিল । ১৭৪০ সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাট ষষ্ঠ চার্লস মারা গেলে তার কন্যা মারিয়া থেরেসা সিংহাসনে আহরণ করেন । এই সুযোগে ফ্রেডারিখ যুদ্ধ ঘোষণা না করেই সাইলেশিয়া আক্রমণ করে তা দখল করে নেন । সাইলেশিয়া আয়তন ছিল চৌদ্দ হাজার বর্গমাইল এবং উর্বর অঞ্চল । ১৭৪৮ সালে লা-স্যাপেলের সন্ধির মাধ্যমে এর যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং সাইলেশিয়া উপর প্রূশিয়ার অধিকার স্বীকৃতি হয় । 

খ) সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩ ) : 

রানী মারিয়া থেরেসা কোনোমতেই অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজয় এবং সাইলেশিয়া হারানোর কথা ভুলতে পারছিলেন না । এমতাঅবস্থায় ফ্রেডারিখ স্যাক্সনি আক্রমণ করে দখল করে নেয় । তিনি বোহেমিয়া আক্রমণ করেন কিন্তু ব্যর্থ হন । শুরু হয় সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ । পরের বছর ১৭৫৭ সালে রাশিয়া, সুইডেন , অস্ট্রিয়া , ফ্রান্স চতুর্দিক থেকে প্রূশিয়াকে আক্রমণ করে । দেশের এই দুর্দিনে ফ্রেডারিখ  এমন সামরিক প্রতিভার পরিচয় দেন যার ফলে তিনি ‘ মহামতি ‘ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন । এ যুদ্ধ ইউরোপ ,আমেরিকা ও ভারত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে । ইংল্যান্ড অবশ্যই এই যুদ্ধে  স্প্রর্শিয়ার পক্ষে ছিল । ১৭৬৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে । চুক্তির শর্তানুযায়ী ফ্রেডারিখ স্যাক্সনি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় , কিন্তু সাইলেশিয়া তার দখলে থাকে । 

গ) পোল্যান্ডের ১ম বিভাজন : 

১৭৬৩ সালে পোল্যান্ডের রাজা তৃতীয় অগাস্টাসের মৃত্যু হলে পোল্যান্ডের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রূশিয়া, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়া পোল্যান্ডের কতক স্থান নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় । ফ্রেডারিখ নিজ রাজ্যকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে নিজ প্রয়োজনীয় স্থান প্রূশিয়ায় দখল করে নিলেন । সে সঙ্গে ঐ স্থানের ২৫ হাজার সৈন্য ও তার অধীনে এল । 

মূল্যায়ন : 

দীর্ঘ ৪৬  বছর রাজত্ব করে মহামতি ফ্রেডারিখ ১৭৮৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন । তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী শাসকের অন্যতম । তার আমলে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ,শিক্ষা সম্প্রসারিত হয় । বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় । ধর্ম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্বীকৃতি হয় । কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী শাসকের ন্যায় তিনিও ছিলেন পররাজ্য লোভী । তিনি পোল্যান্ডের ১ম বিভাজন , অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ , সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ অংশ নেন এবং প্রূশিয়ার রাজ্যসীমা সম্প্রসারিত করেন । তিনি যখন সিংহাসনে আহরণ করেন তখন প্রূশিয়ার লোক সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষ । তার মৃত্যুকালে প্রূশিয়ার লোক সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লক্ষ । এথেকেই বুঝা যায় তার রাজত্বকালে প্রূশিয়ার আয়তন কতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল । ধর্মীয় ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করলেও ইহুদীদের নিকট থেকে উঁচু হারে কর ধার্য করেন । ধর্মীয় ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পেয়েছিল , রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয় । সামগ্রিকভাবে জার্মানির স্বার্থের প্রশ্ন তার চিন্তা-চেতনায় প্রাধান্য পায়নি । তিনি কবি ছিলেন । কিন্তু জার্মান ভাষায় তিনি কবিতা লেখেন নি । এ বাসায় তিনি খুব একটা কথা বলতেন না । হার্ডার, কান্ট , গ্যেটে প্রমুখ জার্মান লেখকদের সম্পর্কে তার কোনো উঁচু ধারণা ছিল না । তিনি ছিলেন ফরাসি ভাষা ,সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দর্শনের ভক্ত । তবুও তিনি জার্মান জনগণ ও লেখকদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন । কেননা তিনি প্রূশিয়াকে ইউরোপের এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন । 

দ্বিতীয় ক্যাথারিন ( ১৭৬২-১৭৯৬) – ( Catherine II ( 1762-1796 ) 

দ্বিতীয় ক্যাথারিন : 

আঠারো শতকে ইউরোপে যে কয়েকজন স্বৈরশাসকেরা আর্বিভাব ঘটেছিল তাদের মধ্যে রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথারিন ছিলেন অন্যতম । ক্ষমতায় আহরণ করে তিনি মহামতি পিটারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাশিয়াকে ইউরোপের রাজনীতিতে অন্যতম পুরোধা হিসাবে গড়ে তুলতে অক্লান্ত চেষ্টা করেন । এজন্য তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । 

প্রাথমিক জীবন : 

দ্বিতীয় ক্যাথারিন উত্তর জার্মানির এক ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজকন্যা ছিলেন । তার জন্ম হয় ১৭২৯ সালে এক প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে । তার পিত্রদত্ত নাম ছিল সোফিয়া অগাস্টা ফ্রেডারিখ সংক্ষেপে সোফিয়া । স্প্রর্শিয়ার মহামতি ফ্রেডারিখ এর উদ্যোগে রাশিয়ার সম্যাঞ্জী এলিজাবেথের ভাগ্নে পিটারের সঙ্গে তার বিয়ে হয় । ফ্রেডারিখ রাশিয়ার অস্ট্রিয়ার প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে এ বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন । এলিজাবেথ নিঃসন্তান ছিলেন । এজন্য তিনি পিটারকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা দেন । জাতিতে জার্মান হলেও ক্যাথারিন রাশিয়া এসে রুশ ভাষা , পোশাক-পরিচ্ছদ , আচার ব্যবহার ইত্যাদি আয়ত্ত করেন , স্থানীয় ধর্ম ( Greek Orthodox Church )  গ্রহণ করেন , স্থানীয়দের কে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন । একজন বুদ্ধিমতী ও দেশ প্রেমিক মহিলা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন । নতুন ধর্ম গ্রহণ কালে তিনি ইক্যাতেরিন আলেক্সিয়েভনা নাম ধারণ করেন । রাশিয়ার জাতীয় জীবনের আদর্শ তিনি রুশদের অপেক্ষা অধিকতর নিষ্ঠা ও একাত্মতা অনুসরণ করে চলতে থাকেন । 

ক্ষমতালাভ : 

১৭৬১ সালে সম্রাঞ্জী এলিজাবেথ এর মৃত্যুর পর ক্যাথারিনের স্বামী তৃতীয় পিটার সিংহাসনে বসেন । কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই রাশিয়ার জনগণ শাসক হিসেবে তার অযোগ্যতার পরিচয় পায় । বিশেষত গির্জা ও সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় । সেনাবাহিনী যখন স্প্রর্শিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত সে অবস্থা পিটার ক্ষমতায় আসেন এবং স্প্রর্শিয়ার পক্ষ সমর্থন করেন । স্প্রর্শিয়ার রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলে স্প্রর্শিয়াকে ছেড়ে দেন এবং ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার পক্ষ ত্যাগ করেন । এমনকি তিনি রাশিয়াকে স্প্রর্শিয়ার একটি আশ্রিত রাজ্য হিসেবে ঘোষণাদেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এভাবে তৃতীয় পিটারের জনপ্রিয়তা যখন কমছিল  , তখন ক্যাথারিনে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল।  দুইজনের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে পিতার বিয়ে বিচ্ছেদের কথা ভাবতে থাকেন । এমত অবস্থায় ১৭৬২ সালের ২৮ শে জুন তারিখে ক্যাথারিন তার জনপ্রিয়তার সুযোগে সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা তার স্বামীকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেন।  ক্যাথারিন আলেক্সিয়েভনা দ্বিতীয় ক্যাথারিন নাম ধারণ করে রাশিয়ার সিংহাসন আহরণ করেন । 

দার্শনিক ভক্ত : 

ক্যাথারিন আঠারো শতকের দার্শনিকদের ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন । বিয়ের পর থেকেই তিনি ভলতেয়ার , মতেসকিয়াঁ , ডেনিস দিদেরোসহ বিশ্বকোষ রচনাকারীদের লেখাগুলো পড়তে থাকেন এবং তাদের চিন্তা চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। সম্রাঞ্জী  হওয়ার পর তিনি ফরাসি দার্শনিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন । তার পরিকল্পিত সংস্কার গুলি সম্পর্কে আলোচনা করেন । ভলতেয়ারের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে পত্রালাপ অব্যাহত রেখেছিলেন । ক্যাথারিন তাকে মস্কোতে  আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন । কিন্তু তিনি এই আমন্ত্রণে সাড়া দেননি । অবশ্যই দিদেরো তার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মস্কো এসেছিলেন । দিদেরুল যখন অর্থাভাব দেখা দেয় তখন তিনি তার সাহায্যের লক্ষে তার গ্রন্থাকার করেন । তবে শর্ত থাকে যে,  দিদেরো যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন এবং গ্রন্থাগারিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সম্মতিও পাবেন । বিশ্বকোষ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি এর অন্যতম রচিয়তা ডি. এলেমবার্টকে তার নাতি-নাতনিদের গৃহশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন আমন্ত্রণ জানান।  কিন্তু তিনি তার এই প্রস্তাবে সাড়া দেননি । তিনি একজন সাহিত্য সেবীকা  ছিলেন । তিনি তার একখানা জীবনস্মৃতি ও বহুবিধ দার্শনিক তথ্যপূর্ণ রচনা রেখে গিয়েছেন । এ থেকে তার মানসিক উৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায় । 

ক্যাথারিনের উদ্দেশ্য ও নীতি : 

১) নিজ ক্ষমতাকে সর্বাত্মক করা ,

২) পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি রুশ  জাতির মধ্যে বিস্তার ঘটানো ,

৩) রাশিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত করা এবং 

৪) রাশিয়াকে ইউরোপের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করানো । 

অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র বিষয়ে ক্যাথারিন মহামতি পিটারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অগ্রসর হতে থাকেন । 

অভ্যন্তরীণ সংস্কার ( Internal Reforms  )

দ্বিতীয় ক্যাথারিন স্বৈরশাসক ছিলেন সন্দেহ নেই । কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন জ্ঞানদীপ্ত বা প্রজাহিতৈষী ( Enlightened or Benevolent Despot ) শাসক হিসেবে পরিচয় হতে । এ লক্ষ্যে তিনি কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন : 

১) তিনি সমগ্র দেশকে ৪৪ প্রদেশে বিভক্ত করেন । এসকল প্রদেশকে আবার জেলায় ভাগ করেন । 

২) শাসন কার্য পরিচালনার জন্য তিনি অভিজাত শ্রেণীর সহযোগিতা গ্রহণ করেন । কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তার হাতেই রইল । 

৩) ১৭৬৭ সালে তিনি আইন, বিচার ও শাসন ব্যবস্থার সংস্কার প্রবর্তনের জন্য এবং কৃষক সম্প্রদায়ের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ৬৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করেন । কিন্তু কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তেমন কোনো সংস্কার প্রবর্তন করা হয়নি । দিদেরো এ বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি মন্তব্য করেন , “ দার্শনিকরা ভাগ্যবান । আপনারা লেখেন প্রাণহীন কাগজে , আর আমাদেরকে লিখতে হয় মানুষের স্পর্শকাতর চামড়ায়। অর্থাৎ তথ্যগতভাবে যা বলা যায়,  বাস্তবে তা করা যায় না । 

৪) তিনি চার্চের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসেন । ফলে রুশ ধর্মাধিষ্ঠান একটি সরকারি বিভাগে পরিণত হয় । 

কৃষকদের দুরবস্থা : 

ক্যাথারিনে শাসনামলে কৃষকদের অবস্থার অবনতি ঘটে । দেশের জনগোষ্ঠীর ৯৫% কৃষক এবং এদের অর্ধেক ছিলো ভূমিদাস । যেসব ক্ষেত্রে ভূমিদাস বেগার খাটুনির পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে সামন্ত প্রভুদের প্রতি তাদের দায় পরিশোধ করতে পারত । সে ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয় । বেকার খাটনি মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয় । মহামতি পিটার এর আমল থেকে ভূমিদাস প্রথা কৃষিতে  সীমাবদ্ধ ছিল না । তাদেরকে কৃষির পাশাপাশি শিল্প-কারখানার কাজও করতে হতো । ফলে কৃষক সমাজ বিদ্রোহ করতে শুরু করে । ১৭৭৩ সালের কৃষক বিদ্রোহ ছিল উল্লেখযোগ্য । ক্যাথারিন নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করেন । হাজার হাজার কৃষককে সাইবেরিয়াতে নির্বাসন দেওয়া হয় । ভবিষ্যতে যাতে কৃষক বিদ্রোহ দেখান না দেয় তার জন্য ক্যাথারিন সরকার ও ভূস্বামীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন । 

শিল্প ও বানিজ্য : 

রাশিয়ার অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক হলেও এ সময় শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে । এসব শিল্পকারখানায় সামরিক অস্ত্র ,সামরিক পোশাক, জুতা তৈরি করা হতো । এ সময় দেশে বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় । তিনি মার্কেনটাইল নীতি গ্রহণ করেন । বিদেশি শিল্পের উপর শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করেন । পণ্যদ্রব্যের অবাধ চলাচলের জন্য বহু রাস্তাঘাট নির্মাণ ও খাল খনন করেন । 

পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশ : 

ক্যাথারিন চেয়েছিলেন রাশিয়ার পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশ লাভ করুক। তবে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতা বলতে ফরাসি সভ্যতাকে বুঝিয়েছেন । তার উদ্যোগে রাশিয়ার উচ্চ মহলে ফরাসি ভাষা, সাহিত্য ,পোশাক ও আচার-ব্যবহার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায় । অনেক সামন্ত প্রভু তাদের ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষাদান এর জন্য ফরাসি দেশীয় শিক্ষক নিয়োগ করেন । অনেকের সন্তানের শিক্ষার জন্য ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠান । তিনি ১৭৬৪ সালে “ Society for the Training of the Daughters of the Nobility ‘ প্রতিষ্ঠা করেন । এছাড়া তিনি অস্ট্রিয়ার অনুকরণে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ নর্মাল স্কুল ( শিক্ষক প্রশিক্ষণ ) প্রতিষ্ঠা করেন । জনগণের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতাল স্থাপন করেন । 

পররাষ্ট্র নীতি ( Foreign Policy  ) :

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ক্যাথারিনের অর্জন অনেক বেশি । এক্ষেত্রে তিনি মহামতি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন । তার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত করা এবং রাশিয়াকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম করে তোলা । কৃষ্ণ সাগরের আধিপত্য বিস্তার করে পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন পথ উন্মুক্ত করা । অবশ্যই এসব ক্ষেত্রে তিনি বিরাট সাফল্য লাভ করেন । তার শাসনামলে রাশিয়া সীমান্ত কাস্পিয়ান , বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে ।

তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: 

ক্যাথারিন ক্ষমতায় এসে কৃষ্ণসাগরের সঙ্গে রাশিয়ার সংযোগ স্থাপনের জন্য উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ আজভ শহর দখলের পরিকল্পনা করেন। এমত অবস্থায় ১৭৬৮ সালে ফ্রান্সের প্ররোচনায় তুরস্ক রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।  এই যুদ্ধ ৬ বছর কাল স্থায়ী হয় । যুদ্ধে তুরস্ক পরাজিত হয় । রাশিয়া ক্রমে ক্রমে আজভ, মোলদাভিয়া , ওয়ালেচিয়া ও বুখারেস্ট  দখল করে নেয় । ১৭৭৪ সালে কুচুক কাইরজি  সন্ধির মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে । এ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি নামে পরিচিত তুরস্ক ওয়ালেচিয়া  ফেরত পায় । আর রাশিয়া পায় :- 

১) আজভ বন্দরটি লাভ করে , 

২) বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী দিয়ে রাশিয়ার বাণিজ্যতরী গুলো ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে পশ্চিমা দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে এবং 

৩) তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে সকল গ্রিক চার্চের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব রাশিয়া লাভ করে । 

এ দাবির ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে রাশিয়ার হস্তক্ষেপে সুযোগ পায় । জার ইভানভের পরে আর কোন শাসকের আমলে রাশিয়ার আদর্শ না এতটা বিস্তার লাভ করেনি । ক্যাথারিন ছিলেন পররাজ্য লোভী এবং লোভ চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে তিনি ন্যায় নীতির কোন তোয়াক্কা করেননি । 

পোল্যান্ড বিভাজন : 

পোল্যান্ডের দুর্বলতার সুযোগে পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্যাথারিন স্প্রর্শিয়ার রাজা ফ্রেডারিখের সাথে এক গোপন চুক্তি করেন । এ চুক্তির ভিত্তিতে পোল্যান্ডকে তিন-তিনবার বিভাজন করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয় । প্রথম বিভাজন ঘটে ১৭৭২ সালে রাশিয়া, স্পর্শিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে । এতে রাশিয়া পেল হে শ্বেত  রাশিয়া অর্থাৎ  ডুইনা ও নিপার  নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল এবং আরো কিছু অংশ । দ্বিতীয় বিভাজন ঘটে ১৭৯২ সালে ক্যাথারিন ও ফ্রেডারিখের মধ্যে। এর ফলে পোল্যান্ডকে ৩০ লক্ষ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিস্তৃত অঞ্চল ব্যেলোরাশিয়ান, লিথুনিয়ার অংশবিশেষ এবং ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় । এরপর পোল্যান্ডকে তৃতীয় ও শেষ বিভাজন ঘটে ১৭৯৫ সালে রাশিয়া স্প্রর্শিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে । পোল্যান্ডের রাজা স্টেনিসলস  পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশটির বাকি অংশ তিনটি রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় । এতে রাশিয়া কোরল্যান্ড ও লিথুনিয়ার অবশিষ্ট অংশ লাভ করে । এভাবে পোল্যান্ডের অস্তিত্ব পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় । 

ক্রিমিয়া দখল : 

আজভ বন্দর দখল করে ও ক্যাথারিন সন্তুষ্ট হতে পারেননি । তার ইচ্ছা ছিল কনস্টান্টিনোপল কে রাজধানী করে নতুন বাইজানটাইন সাম্রাজ্য স্থাপন করা । এ লক্ষ্যে তিনি ১৭৮১ সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাট ২য় যোসেফের সঙ্গে এক মিত্রতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন । অতঃপর তিনি ১৭৮৩ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নেন । এতে কনস্টান্টিনোপল নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হয় । 

জাসির সন্ধি : 

ক্যাথারিন ও যোসেফ তুর্কি সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করেন । এ যুদ্ধ পাঁচ বছর স্থায়ী হয় । ইতিমধ্যে  ২য় যোসেফ মৃত্যুবরণ করেন । অন্যদিকে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার স্বার্থন্বেষী যুদ্ধে ইংল্যান্ড,স্প্রর্শিয়া ও হল্যান্ড হস্তক্ষেপ করবে বলে হুমকি দেয় । এমন প্রেক্ষিতে  ১৭৯২ সালে জাসিরতে এক চুক্তির ধারা এ যুদ্ধের অবসান ঘটে । এর ফলে নিস্টার নামক নদী দ্বারা তুরস্ক ও রাশিয়ার সীমানা নির্ধারিত হয় । রাশিয়া ওচাকভ ( Ochakov ) বন্দরটি লাভ করে । 

ফরাসি বিপ্লবের বিরোধিতা : 

১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে প্রথম থেকে ক্যাথারিন প্লেনের ঘোরবিরোধী । তার ধারণা ছিল , এ বিপ্লব তার শাসনের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে । তাই তিনি যেসব ধ্যান-ধারণা বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছিল সেগুলো যাতে রাশিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য সচেষ্ট হন । যেসব নাগরিক বিপ্লবের পক্ষ সমর্থন করেছিল তাদেরকে তিনি দেশ থেকে বিতাড়িত করেন । ১৭৯৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন । 

মূল্যায়ন : 

দ্বিতীয় ক্যাথারিন( ১৭৬২-১৭৯৬)  দীর্ঘ ৩২ বছর রাশিয়া একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন । তিনি নিজেকে প্রজাহিতৈষী স্বৈরশাসক এবং এ ধরণের শাসকের অন্যতম প্রবক্তা দার্শনিক ভলতেয়ার সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ করেন । তার অভ্যন্তরীণ সংস্কার রুশ শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় এবং সুবিন্যস্ত করেছিল । শিল্প উন্নয়ন ,শিক্ষা সম্প্রসারণ ,ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়ন , পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশ ইত্যাদি সকল দিক দিয়েই তার শাসন ছিল প্রজাহিতৈষী । অবশ্যই তিনি কৃষকদের জন্য তেমন কিছুই করেননি । তার বড় অর্জন বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে । তার আমলে রাশিয়ার সীমান্ত ক্যাম্পিয়ান, বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে । পোল্যান্ডের তিনটি বিভাজনে অংশ নিয়ে পোল্যান্ডের বহু অঞ্চল যেমন : সে তো শ্বেত রাশিয়া , বেলারাশিয়া, লিথুনিয়া, ইউক্রেন,কোরল্যান্ড  রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেন।  পোল্যান্ডের বিলুপ্তি ঘটান । তুরস্কের বিরুদ্ধে সাফল্যজনকভাবে যুদ্ধ করেন । আজভ বন্দর , ক্রিমিয়া , ওচাকভ বন্দর লাভ করেন । এভাবে পশ্চিমের জালানা খুলে দিয়ে ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করেন । তবে তার তুরস্ক গ্রাস করার নীতি পূর্বাঞ্চলে জটিল সমস্যার সৃষ্টি করেছিল । তিনি ছিলেন পররাজ্য  লোভী । এ লোভ চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে তার কোন ন্যায়-নীতি ছিলনা । তার পোল্যান্ড বিভাজন এবং পোল্যান্ড বিলুপ্তি ছিল অমানবিক । তিনি নিজেকে যতটা জ্ঞান দীপ্ত   এবং প্রজাহিতৈষী বলে ভাবতেন বাস্তবে তা ছিলেন না । তিনি অনেক সংস্কারের পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়িত করেননি । শেষদিকে এসে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল নীতি অবলম্বন করেন । তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো রাশিয়াকে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা । অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মহামতি পিটার এর সুযোগ্য উত্তরসূরী । 

মারিয়া থেরেসা ( ১৭৪০ -১৭৮০) – Maria Theresa ( 1740 -1780) 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের ইতিহাসে জ্ঞানদীপ্ত বা প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী শাসকদের মধ্যে মারিয়া থেরেসা ছিলে অন্যতম । ১৭৪০ সালে সম্রাট ষষ্ঠ চার্লস মৃত্যুবরণ করলে তার একমাত্র কন্যা মারিয়া থেরেসা প্রাগম্যাটিক স্যাংকশন ( Pragmatic Sanction ) অনুযায়ী অস্ট্রিয়ার রানী হিসেবে সিংহাসনে আহরণ করেন । সিংহাসনে আহরণ করেই তিনি তার স্বামী লোরেন ফ্রান্সিসকে  তার যোগ্য শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন । 

তার পরিচয় ( Her Character ) : 

মারিয়া থেরেসা অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন । তার দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয় ,সাহসী লোক পুরুষোচিত , কর্মনিষ্ঠা ছিল এক নিষ্ঠুর ও অক্লান্ত, ব্যবহার ছিল অমায়িক । 

তার সমস্যা ( His problems ): 

সিংহাসনে আহরণ করেই মারিয়া থেরেসা অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিতে সম্মুখিত হন । যেমন : –

১) অস্ট্রিয়ার সামরিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা , 

২) বিশৃংখল ও শূন্য রাজকোষ ,

৩) অভিজাতদের দুর্নীতি ও স্বার্থপরতা,

৪) ইউরোপের একাধিক রাষ্ট্রের অধিপতিদের প্র্যাকম্যাটিক স্যাংকশন , মানতে অস্বীকৃতি এবং 

৫) সর্বোপরি অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ । 

পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহন করে তিনি উক্ত সমস্যা গুলি মোকাবেলা করে অস্ট্রিয়ার কে সামনের দিকে নিয়ে যান । 

মারিয়া থেরেসা অভ্যন্তরীণ সংস্কার ( Maria Theresa Internal Reforms  )

সিংহাসনে আরোহন করে তিনি অস্ট্রিয়ার শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন । এজন্য তিনি অভ্যন্তরীণ সংস্কার কাজে মনোনিবেশ করেন । 

১) সংস্কার কাজে মন্ত্রী : 

অস্ট্রিয়ার অভিজাতদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ছিল । তারা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বার্থ পরায়ণতা মগ্ন । সামরিক পদ্ধতি ছিল সনাতনপন্থী । বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন এবং পরস্পর বিরোধী । এসব সমস্যা দূর করার জন্য তিনি প্রিন্স জর্জ অব  হুহউইজ এবং রূডলফ টোটেফ নামে দুইজন মন্ত্রীর উপর অভ্যান্তরে দায়িত্ব অর্পণ করেন । তিনি নিজেও এ সংস্কার কাজে তাদের উৎসাহ দিতেন । 

২) নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল : 

রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে মারিয়া দশটি নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেন । এগুলোর প্রত্যেকটিতে একটি করে কমিশন ছিল । এসব কমিশনের সদস্যরা ভিয়েনার কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তিক  নির্বাচিত ও নিয়ন্ত্রিত হত । এরা ছিল ফরাসি ইনটেনডেন্ট অফিসারদের মত । 

৩) কাউন্সিল অব টেস্ট (  Council of Statre ) : 

অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর ও কেন্দ্রীভূত করার জন্য তিনি একটি কাউন্সিল অব টেস্ট  স্থাপন করেন । এ কাউন্সিল এর উপর তিনি চারটি বিভাগের কার্য পরিচালনা এবং পরিদর্শনের ভার অর্পণ করেন । এ চারটি বিভাগ হলো : 

১) কার্যনির্বাহক ( প্রশাসন ) 

২) রাজস্ব 

৩) সামরিক ও 

৪) বিচার বিভাগ । 

কার্যনির্বাহক ও রাজস্ব বিভাগের নির্দেশনা মোতাবেক পদেশ গভর্নরগন পরিচালিত হতো । 

৪) বিচার বিভাগ : 

বিচার বিভাগ শক্তিশালীকরণ ও ন্যায়- বিচার প্রতিষ্ঠা করতে তিনি কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । তিনি প্রত্যেক প্রদেশের প্রাদেশিক আপিল আদালত স্থাপন করেন । প্রত্যেক শহরের আদালত ও সামন্ত প্রভুদের আদালত থেকে প্রদেশের  আপিল আদালতে আপিল করার ব্যবস্থা রাখা হয় । প্রদেশের আপিল আদালত থেকে কেন্দ্রীয় হাইকোর্টে আপিল ও বিচার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় । এতে বিচারব্যবস্থার কর্মদক্ষতা পূর্বের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পায় । 

৫) সামরিক বিভাগ : 

অস্ট্রিয়ার সামরিক বাহিনী ছিল দুর্বল ও পশ্চাদপদ । সামরিক বাহিনীকে সুসংগঠিত ,সুশিক্ষিত ও শক্তিশালী করণার্থে তিনি একাধিক সামরিক স্কুল স্থাপন করেন । কয়েক বছরের মধ্যে অস্ট্রিয়ার শূন্য সংখ্যা এক লক্ষ থেকে দুই লক্ষ্যে পরিণত করা হয় । সেইসাথে সামরিক বাহিনীকে পেশাদারি ও আধুনিকীকরণের করা হয় । 

৬) চার্চকে  রাষ্ট্রের অধীন : 

মারিয়া থেরেসা নিজেকে ক্যাথলিক হয়েও ধর্মীয় ব্যাপারে তিনি গোঁড়া ছিলেন না । তিনি রাষ্ট্রকে চার্চের প্রভাব থেকে মুক্ত করেন । বরং চার্চের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার স্বীকৃতি হয় । চার্চকে রাতের আইন মানতে বাধ্য করা হয় । পূর্বে নিয়ম ছিল বিশপরা কর প্রধান থেকে অব্যাহত থাকত । কিন্তু তিনি তা বাতিল করে বিশপদের  কর প্রদানে বাধ্য করেন । এছাড়া পূর্বে পোপের হুকুমনামে নামে  যে নির্দেশ জারি করা হতো , তা বাতিল করা হয় । 

৭) আয় বৃদ্ধি : 

মারিয়া থেরেসা আর্থিক উন্নতি বিধানকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আয় বৃদ্ধি ব্যবস্থা করে নেন । তিনি আয় কর স্থাপন করেন । ক্রমবর্ধমান নীতিতে তিনি “ গোলট্যাংক “ নামে একটি মাথাপিছু কর ধার্য করেন । অভিজাত ও যাজক শ্রেণীকে কর প্রদানে বাধ্য করা হয় । নানা ভাবি তিনি রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি করেন । 

৮) ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করণ : 

তার আমলের রাজ্যের সর্বত্র কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য পূর্ণমাত্রায় স্থাপিত হয় । সকল জমিদারিতে অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস করা হয় । কৃষকদের অভিজাত শ্রেণীর অত্যাচার ও শোষণের হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হয় । 

৯) উন্নয়নমূলক কাজ : 

তার আমলে দেশের উন্নয়নের রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয় । বিভিন্ন খাল খনন করা হয় , জাহাজ নির্মাণ     শিল্পসহ নানা শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয় এবং সেগুলো নির্মাণের উৎসাহ দেওয়া হয় ।  এ সময় ডাক বিভাগের বিষেশ উন্নতি হয়েছিল ।

এভাবে বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে মারিয়া থেরেসা অস্ট্রিয়ার শাসন ক্ষমতাকে শক্তিমালী করেন । তিনি শাসন ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করে এক ধরনের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন । কিন্তু তাঁর সে স্বৈরতন্ত্র ছিল জনকল্যানকর , যা বিভিন্ন ধরনের সমাজ সংস্কারের নীতিকে অনুসরন করে এগিয়ে যায় ।

বিদেশ নীতি ( Foreign Policy )

১) প্রাগম্যাটি স্যাংকশনজনিত জটিলতা :

সম্রাট ষষ্ঠ চালর্সের কোন পুত্র সন্তান ছিল না । ছিল একমাত্র কন্যা মারিয়া থেরেসা । কিন্তু স্যালিক আইন অনুসারে অস্ট্রিয়ার সিংহাসনে কোন স্ত্রীলোকের আরোহন করার অধিকার ছিল না ।  চালর্স এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রাগম্যাটিক স্যাংকশন ( Pragmatic Sanction ) একটি স্বীকৃতিপত্র ইউরোপীয় রাজাগন কর্তৃক স্বাক্ষর করিয়ে নেন। তবে ইউরোপের প্রত্যেকটি জাতীয় রাষ্ট্র যেমন: – রাশিয়া, ব্রিটেন, হল্যান্ড, ফ্রান্স , স্পেন , প্রূশিয়া, স্যাভয় এর রাজারা প্রাহম্যাটিক স্যাংকমনে এ শর্তে স্বাক্ষর করেছিলেন যে, মারিয়া থেরেসা পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যর সম্রাঞ্জী হতে পাররে না , বরং অস্ট্রিয়ার রানি হিসাবে অস্ট্রিয়ার সিংহাসন লাভ করবেন ।  ১৭৪০ সালে সম্রাট ষষ্ঠ চালর্সের মৃত্যুর পর অস্ট্রিয়ার সামরিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগে ইউরোপের একাধিক রাষ্ট্রের অধিপতিরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মারিয়া তেরেসার দাবির বিরোধিতা করেন । এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্প্রর্শিয়ার ফ্রেডারিখ দ্যা গ্রেট । মারিয়া থেরেসা সহজে দমবার পাত্রী ছিলেন না । তিনিও পররাজ্য গ্রাসীদের শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে থাকে ।

২) প্রথম সাইলেশিয়া যুদ্ধ : 

ফ্রেডারিখ প্রাগম্যাটিক স্যাংকশন অস্বীকার করে মারিয়ার কাছে সাইলেশিয়া দাবি করে । মারিয়া সে দাবি প্রত্যাখান করেন । এরপর ফ্রেডারিখ কোন যুদ্ধ ছাড়াই সাইলেশিয়া অভিমুখে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন ১৭৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে কোন প্রতিরোধ ব্যতীত তিনি সাইলেশিয়া দখল করেন।  

৩) শর্ত প্রত্যাখ্যান : 

ফ্রেডারিখ  সাইলেশিয়া দখল করে মারিয়া তেরেসাকে কতিপয় শর্ত জুড়ে দেন । যেমন :- 

ক) সাইলেশিয়া বিনিময়ে তিনি তার স্বামীর পক্ষে সম্রাট হবার ক্ষেত্রে রাজকীয় নির্বাচনে সমর্থন দেওয়া হবে । 

খ) মারিয়াকে তার সকল শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্য দেওয়া হবে । 

গ) তাকে তিনি মিলিয়ন থেলারস অথবা গোল্ডেন মুদ্রা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে । 

মারিয়া থেরেসা ফ্রেডারিখ এসব প্রস্তাব ঘৃণা ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তিনি কোন কিছুর বিনিময় সাইলেশিয়া হারাতে চাননি । কেননা সাইলেশিয়া ছিল উত্তর ওডার অঞ্চলের একটি উর্বর জার্মান এলাকা ।এটি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। এতে গড়ে উঠেছিল প্রচুর শিল্প-কারখানা। মারিয়া ইউরোপের শাসকদের কাছে এই আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে এবং সাইলেশিয়া থেকে ফ্রেডারিখকে বের করে দিতে সাহায্য চান।  

৪) অস্ট্রিয়া বিরোধী জোট : 

ইউরোপের শক্তিবর্গ মারিয়াকে সাহায্য না করে ফ্রেডারিখেরপক্ষে যোগ দেন এবং অস্ট্রিয়া বিরোধী জোট গঠন করেন । এ জোটের সদস্যরা হল ফ্রান্স, স্পেন, স্প্রর্শিয়া, সাক্সনি, বেভারিয়া ,সার্দিনিয়া,  এবং স্যাভয় । তাদের উদ্দেশ্য ছিল হ্যাপসবার্গ  সাম্রাজ্য ধ্বংস করা এবং অস্ট্রিয়াকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া । 

৫) গোপন চুক্তি : 

১৭৪১ সালে ব্রিগ নামক স্থানের নিকট মলউইজের যুদ্ধে ফ্রেডারিখের বাহিনী মারিয়া থেরেসার বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেন । এ সময় অন্যান্য শক্তি ও অস্ট্রিয়া কে আক্রমণ করতে প্রস্তুত । চতুর্দিক থেকে অস্ট্রিয়া আক্রান্ত হওয়ায় ১৭৪১ সালেম আরিয়া  ফ্রেডারিখের সঙ্গে গোপনে এক চুক্তি করেন । যার নাম ক্লিনশ্লিলেনডরফ চুক্তি । চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গঠিত জোট ভেঙে দিয়ে অস্ট্রিয়া তাইলে সাইলেশিয়ার বৃহৎ অংশ স্প্রর্শিয়াকে ছেড়ে দেবে । ফ্রেডারিখ মৈত্রী জোট ত্যাগ করে মোরেভিয়া দখল করে নেয় । 

৬) হাঙ্গেরির সাহায্য : 

মারিয়া থেরেসা ছিলেন অসীম সাহসী । ইউরোপের রাষ্ট্র সমূহের দ্বারা শত্রু পরিবেষ্টিত হলেও তিনি ধৈর্য হারাননি । তিনি এ সময় হাঙ্গেরিতে পালিয়ে যান । সেখানে তিনি প্রজাদের নিকট সাহায্যের আবেদন করলে ব্যাপক সাড়া পায় । তারা এক লক্ষসৈন্য দিয়ে সাহায্য করে । প্রতিদানে মারিয়া অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিতে দ্বৈত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন । 

৭) ব্রেসল এর সন্ধি : 

গোপন চুক্তি অনুযায়ী স্প্রর্শিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করল । কিন্তু অপরাপর শক্তির সঙ্গে অস্ট্রিয়ার যুদ্ধ চলতে থাকে । অস্ট্রিয়ার যুদ্ধে জয়লাভ করতে থাকলে ফ্রেডারিখ ভীত হয়ে পড়েন । তিনি আশঙ্কা করতে থাকেন হয়তো অস্ট্রিয়া আবার সাইলেশিয়া পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হবে । সে কারণে ফ্রেডারিখ পুনরায় ব্রেসল নামক স্থানে ১৭৪২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং জয়ী হন । ১৭৪২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে  ব্রেসল এর সন্ধি হয় । এ সন্ধির দ্বারা গ্লাভস ও সাইলিশিয়া উপর স্প্রর্শিয়ার অধিকার স্বীকৃতি হয় । 

৮) ওয়ার্মসের চুক্তি : 

   ব্রেসল এর সন্ধি দ্বারা ফ্রেডারিখ  যুদ্ধ ত্যাগ করলে অস্ট্রিয়া অন্যান্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সক্ষম হয় এবং যুদ্ধের গতি অস্ট্রিয়ার অনুকূলে থেকে যায়। মারিয়া থেরেসা সাইলেশিয়া হারানোর বিনিময় বেভারিয়া পেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন । এজন্য তিনি ১৭৪৩ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ওয়ার্মসের চুক্তি দ্বারা মৈত্রী জোটের বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া,ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের জোট গঠন করেন । 

৯) ফ্রান্সিসকে সম্রাট ঘোষণা : 

ওয়ার্মসের চুক্তি পর অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীর সাফল্যের সঙ্গে বোহেমিয়া থেকে ফ্রান্সের সৈন্যকে তাড়িয়ে দেয় এবং বেভারিয়া জয় করে ।বেভারিয়ার রাজা সপ্তম চার্লস  মারা গেলে মারিয়া থেরেসা স্বামী প্রথম ফ্রান্সিসকে অস্ট্রিয়ার সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় । থেরেসার সৈন্যবাহিনী ইতালিতে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এবং স্পেনের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করে । তবে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় স্পেন ও ফ্রান্সের বাহিনীর নিকট পরাজিত হতে থাকে । 

১০) ড্রেসডেনের সন্ধি : 

অস্ট্রিয়া , স্যাক্সনি পোল্যান্ড এবং রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে স্প্রর্শিয়াকে দুই দিক থেকে আক্রমণ করে । অস্ট্রিয়ার সৈন্যবাহিনী সাইলেশিয়া পূনদখলের জন্য অগ্রসর হলে ফ্রোডারিখ তাদেরকে হোহেন ফ্রিড বার্গের যুদ্ধে এবং সোহর যুদ্ধে পুনরায় পরাজিত করেন । সন্ধির দ্বারা সাইলেশিয়া এবং গ্লাৎসো স্প্রর্শিয়ার কাছে সমর্পন করা হয়। বিনিময় ফ্রোডারিখ মারিয়ার স্বামী ফ্রান্সিসকে রোমান সম্রাট পদে ইতিপূর্বে যে নির্বাচিত হয়েছিলেন তা মেনে নেন । 

১১) আই – লা -স্যাপেলের সন্ধি : 

 ড্রেসডেনের সন্ধি পর ও যুদ্ধ চলতে থাকে । তবে ১৭৪৮ সালের মধ্যে দুই পক্ষই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শান্তির প্রত্যাশা করে । অবশেষে ১৭৪৮ সালে আই – লা -স্যাপেলের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় । এ সন্ধি ৮ বছরের দ্বন্দ্ব সংঘাত বন্ধ করে ইউরোপে শান্তির পরিবেশ নিয়ে। 

১২) কূটনৈতিক বিপ্লব : 

১৭৫৬ সালে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে । ১৭৪৮ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন শক্তি তাদের নিরাপত্তা ও উন্নতির কথা চিন্তা করে নতুন নতুন মিত্র খুঁজতে থাকে । এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ১৭৫৬ সালে ইউরোপের নতুন নতুন মৈত্রী জোট গড়ে ওঠে । মারিয়া থেরেসা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেীনিজের পরামর্শে ফ্রান্সের সঙ্গে দুই শতাব্দী দ্বন্দ্ব মিটিয়ে মৈত্রী  চুক্তিতে আবদ্ধ হন । অপরদিকে ,স্প্রর্শিয়া এবং হল্যান্ড মৈত্রী জোটে আবদ্ধ হয়  ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে । এই বিপরীতমুখী জোটেই ”কূটনৈতিক বিপ্লব”  নামে পরিচিত । 

১৩) প্যারিস সন্ধি : 

সাইলেশিয়া পুনরুদ্ধার করতে মারিয়া থেরেসা ১৭৫৬ সালে সংঘটিত সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন । এ যুদ্ধে একদিকে ছিল ফ্রান্স ,অস্ট্রিয়া ,সুইডেন ও কয়েকটি জার্মান রাজ ।অন্যদিকে ছিল ইংল্যান্ড ও স্প্রর্শিয়া । এ যুদ্ধে ইংল্যান্ড ও স্প্রর্শিয়া জয়লাভ করলে মারিয়া থেরেসার সাইলেশিয়া পুনরুদ্ধার ব্যর্থ হয় । ১৭৬৩ সালে প্যারিস সন্ধির দ্বারা পুনরায় তাকে সাইলেশিয়া অধিকার ত্যাগ করতে হয় । 

১৪) পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদে অংশগ্রহণ : 

মারিয়া থেরেসা ১৭৭২ সালে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুত্র যোসেফ  এবং মন্ত্রী কেীনিজের পরামর্শে পোল্যান্ডের প্রথম ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেন । এর ফলে তিনি রেড রাশিয়ার অধিকাংশ এলাকায় তথা গ্যালিসিয়া, পোডেলিয়ার একাংশ  , স্যাডোমির ও ক্রাকো অধিকার করেন সাইলেশিয়া হারালেও এখানে তিনি নতুন ভূমি লাভ করতে সক্ষম হন । 

পরিশেষে একথা বলা যায় যে , আঠারো শতকে মারিয়া থেরেসা নেতৃত্বে অস্ট্রিয়ার জন্য  ইউরোপের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি অবিস্মরণীয় সাফল্য অর্জন করেন । তার পিতা ষষ্ঠ চালর্সের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ তাকে অস্ট্রিয়ার রানী হিসেবে মানতে অস্বীকার করলে তিনি একটি শক্তিশালী বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হন । সাইলেশিয়া হারালেও প্রূশিয়ার আধিপত্য তিনি একচ্ছত্র হতে দেননি তার বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক যোগ্যতার কারণে । অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রেও তিনি শক্তিশালী রাজতন্ত্রের পথপ্রদর্শক ছিলেন । সমসাময়িক ইউরোপের প্রজাহিতৈষী বা   জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারী শাসকদের মধ্যে মারিয়া থেরেসা ছিলেন অন্যতম । 

দ্বিতীয় যোসেফ ( ১৭৬৫-১৭৯০ )- Joseph – II ( 1765 -1790 )  

দ্বিতীয় যোসেফ ছিলেন অষ্টাদশ শতকের মহান জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারী শাসকদের অন্যতম । চিন্তা ও ভাবনার দিক থেকে তিনি ছিলেন তার যুগের চিন্তা নায়কদের বহু উর্ধ্বে । ১৭৬৫ সালে পিতা অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস মৃত্যুবরণ করলে তিনি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট নিযুক্ত হন । একই সঙ্গে তিনি তার মাতা মারিয়া থেরেসা সঙ্গে অস্ট্রিয়ার যেীথ শাসক  হিসাবে নিযুক্ত হন । কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা থেকে যায় মাতা মারিয়া থেরেসা হাতে । ১৭৮০ সালে মাতা  মারিয়া  থেরেসার মৃত্যুর পর সকল ক্ষমতা তার হাতে আসে । অতএব তিনি সংস্কার কাজে হাত দেন । তিনি ঘোষণা করেন যে , দর্শন হবে তার রাজ্যের প্রকৃত আইন কর্মকর্তা । ১০ বছরে তিনি ১১ হাজার নতুন আইন জারি করেন । 

দ্বিতীয় যোসেফেরঅভ্যন্তরীণ সংস্কার ( Internal Reforms of Joseph- II )

সংস্কারের উদ্দেশ্য : 

১) শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত করা , 

২) অসংঘবদ্ধ রাজ্যগুলোর সর্বত্র একই ধরনের শাসন ব্যবস্থা চালু করা , 

৩) অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন জাতিকে একই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা , 

৪) সমাজের বিভিন্ন স্তরে পার্থক্য দূর করা , 

৫) স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সাম্য  স্থাপন করা এবং 

৬) অস্ট্রিয়া – জার্মানির উপর হ্যাজসবার্গ পরিবারের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা । 

নিচে তার সংস্কার কার্য সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো : –

ক) প্রশাসনিক সংস্কার : 

১) শাসন ব্যবস্থা কে কেন্দ্রীভূত করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় যোসেফ ,হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ড ও লোম্বাডির্ন স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দেন । সমগ্র রাজ্যকে ১৩ টি প্রদেশে বিভক্ত করেন । প্রত্যেক প্রদেশকে জেলা বা কাউন্টিতে এবং প্রত্যেক জেলাকে আবার টাউনশিপে  বিভক্ত করা হয় । 

২) সাম্রাজ্যের সব জায়গায় একই ধরনের আইন প্রবর্তন করা হয় । কোন সম্প্রদায় যাতে কর ফাঁকি দিতে না পারে সে ব্যবস্থা করা হয় । তিনি স্প্রর্শিয়ার অনুকরণে সামরিক বিভাগের সংস্কার সাধন  করেন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন । 

৩) তিনি রাজধানী ভিয়েনাতে একটি সুপ্রিমকোর্ট এবং এর অধীনে আরো ছয়টি আপিল আদালত স্থাপন করেন । নিম্ন আদালতে এসব আপিল আদালতে আপিল করা যেত । চূড়ান্ত আপিল শুনানি হতে সুপ্রিম কোর্টে । দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনের সংস্কার করা হয় । 

৪) আইনের দৃষ্টিতে সকলকে সমান অধিকার দিয়ে তিনি দেশের সব জায়গায় একই আইন প্রবর্তন করেন । 

৫) জার্মান ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয় । 

৬) প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় । শিক্ষার প্রসারের জন্য বহু স্কুল স্থাপন করা হয় । 

খ) ধর্মীয় সংস্কার : 

তার ধর্মীয় সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রোমান ক্যাথলিক গির্জাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা । এজন্য তিনি গির্জার ওপর পোপের  প্রাধান্য বিলুপ্ত করতে বদ্ধপরিকর হন । তিনি এক ডিক্রি জারি করেন যে , রাজার অনুমোদন ব্যতীত পোপের  কোন হুকুমনামা বা বিধান অস্ট্রিয়া কার্যকর করা যাবে না । রাজা,  বিশপ নিযুক্ত করবেনএবং প্রয়োজনবোধে রাজা বিশপের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন।  সকল বিশপ নিজ নিজ পদে যোগদানের সময় রাজার প্রতি অনুগত থাকবেন এ মর্মে শপথ নিতে হবে । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর গির্জার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না । তিনি আশ্রম ও সন্ন্যাসী সংখ্যা কমিয়ে দেন । বিলুপ্ত আশ্রম এর জমি থেকে প্রাপ্ত  আয় বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করেন । ১৭৮১ সালে তিনি Toleration Edict বা ধর্ম সহিংসতার আইন পাস করেন। এটাকে অস্ট্রিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতার “ ম্যাগনাকার্টা “ বলা হয়।  এ আইনের বলে ক্যাথলিক ধর্মযাজক কর্তৃক ধর্মান্তরকরণ নিষিদ্ধ করা হয় । প্রোটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স গির্জা অনুসারীদের এবং ইহুদীদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয় । তিনি তাদের গির্জা , সিনাগগ এবং বিদ্যালয় নির্মাণ করার অনুমতি দেন । 

গ) আর্থসামাজিক সংস্কার: 

সমান অধিকারের নিশ্চয়তা এবং সুখ-শান্তি বিধানের লক্ষ্যে তিনি নতুন ফৌজদারি আইন জারি করেন ।এর ফলে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হয় । তদন্তকার্যে দৈহিক নির্যাতনের অবসান করা হয় । তিনি সকল অপরাধীকে ( কৃষক বা সামন্ত প্রভু ) একই আইনের সমান অধিকার এবং একই শাস্তির বিধান করেন । খ্রিস্টান ও অখ্রিস্টানদের মধ্যে বিয়ে , ডাকিনী বিদ্যা ও স্বধর্ম ত্যাগ অপরাধ বলে গণ্য হবে না বলে তিনি ঘোষণা দেন । তিনি ইহুদিদের ওপর থেকে সকল বিধিনিষেধ তুলে নেন । তাদের উপর ইতিপূর্বে ধার্য করা করে অবস্থান করা হয়।  তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য করার ও কলকারখানা স্থাপনের অধিকার এবং সন্তানদেরকে যে কোন স্কুলে ভর্তি করানোর সুযোগ দেওয়া হয় । 

আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যোসেফের  বড় অবদান ছিল ভূমিদাস প্রথার অবসান । ১৭৮২ সালে তিনি ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ করে তাদেরকে ভূমির মালিক হওয়ার , ইচ্ছামত বিয়ে করার এবং বসতি স্থাপনের অধিকার দেন । তাদেরকে সামন্ত প্রভুদের সকল নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি দেওয়া হয় । এছাড়া তিনি রাস্তাঘাট নির্মাণ ও খাল খনন করেন । উচ্চহারে আমদানি শুল্ক স্থাপন করে আমদানি কমিয়ে ও রপ্তানি বৃদ্ধি করেন । বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে অস্ট্রিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতির চেষ্টা করেন । 

দ্বিতীয় যোসেফ এর পররাষ্ট্র নীতি ( Foreign Policy of Joseph-II  )

যোসেফের পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল :- 

১) অস্ট্রিয়ার বিক্ষিপ্ত রাজ্য গুলোকে একত্রীকরণ করা , 

২) পোল্যান্ড , দানিয়ুব নদী ও বলকান অঞ্চল পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার সীমা বিস্তৃত করা এবং 

৩) জার্মানিতে হ্যাজসবার্গ পরিবারের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা । 

এই উদ্দেশ্য সাধন করতে তিনি যা করেন :- 

ক) পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদে অংশগ্রহণ : 

১৭৭২ সালে প্রথম পোল্যান্ড  ব্যবচ্ছেদে মারিয়া থেরেসা অংশ নিতে আগ্রহী ছিলেন না । কিন্তু যোসেফ বুঝতে পেরেছিলেন যে ,অস্ট্রিয়া যোগদান না করলেও স্প্রর্শিয়া ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে পোল্যান্ড ভাগ করে নেবে । সুতরাং তিনি তার মাতাকেjপোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদে অংশ নিতে সাইলেশিয়া হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরামর্শ দেন । 

খ) বেভারিয়া দখলের চেষ্টা : 

১৭৭৭ সালে বেভারিয়ার ইলেক্টর ম্যাক্সিমিলিয়ানের মৃত্যুর পর যোসেফ বেভারিয়া দখল করতে চাইলে ফ্রাডারিখ তাকে বাধা দেন । এ সময় ফ্রান্সের কাছ থেকে কোনরকম সাহায্য না পেয়ে এক ক্ষুদ্র অংশ লাভ করতে তিনি সমর্থ হন । 

গ) ফ্রান্সর মিত্রতা ত্যাগ : 

যোসেফ ১৭৭৭ সালে বেভারিয়া আক্রমণ কালে ফ্রান্সের সাহায্য না পেয়ে তিনি ফরাসি মিত্রতা ত্যাগ করেন । যদিও তার মাতা ফরাসি মিত্রতা বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন । কেননা তিনিই মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন । 

ঘ) রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা : 

ফরাসি মিত্রতা ত্যাগ করে যোসেফ ১৭৮১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে এক মিত্রতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন । এই চুক্তি অনুযায়ী যোসেফ তুর্কি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রাশিয়ার অগ্রগতিতে বাধা দেবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন । এই চুক্তির সুযোগ নিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই রাশিয়ার ক্যাথারিন ক্রিমিয়া দখল করেন । যোসেফের উদ্দেশ্য ছিল বেভারিয়া দখলের ব্যাপারে রাশিয়ার সহযোগিতা লাভ করা । কিন্তু এ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় । 

ঙ) মেইস্ট্রিক্ট দখল : 

১৭৮১ সালে হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে সে সুযোগে রাইসউইক ও ইউট্রেক্ট এর সন্ধির শর্ত ভাঙ্গার চেষ্টা করেন । ১৭৮৪ সালে তিনি মেইস্ট্রিক্ট দখল করেন এবং শেল্টার নদীতে অস্ট্রিয়ার জাহাজ চলাচলের দাবি করেন ।। কিন্তু ১৭৮৫ সালে আরেকটি সন্ধি দ্বারা তাকে মেইস্ট্রিক্ট  এর ওপর আধিপত্য ত্যাগ করতে হয়।  

মূল্যায়ন : 

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে , দ্বিতীয় যোসেফ এর সকল সংস্কার পরিকল্পনা ব্যর্থতার পর্যবসিত হয় । শুধু ভূমিদাস উচ্ছেদ  প্রথা কার্যকরী হয় । তিনি ছিলেন আদর্শবাদী । বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না । তার সংস্কারগুলো বাস্তবতার চেয়ে দার্শনিক ভাবনা বেশি ছিল । তিনি ছিলেন তার যুগের তুলনা অতি অগ্রগামী । তিনি দেশের ও জনগণের কল্যাণের জন্য সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করতেন । তিনি মাত্র ১০ বছরে ১১ হাজার আইন সংস্কার করেন । কিন্তু তার এ সংস্কারগুলো বহুজাতিক প্রজাগণ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি । গির্জার সংস্কার দ্বারা তিনি ধর্মভীরু মানুষদের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন । বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ও সামরিক শিক্ষার দ্বারা তিনি কৃষকদের বিরাগভাজন হন । কারণ তারা মনে করে যে , তাদের পুত্রদেরকে স্কুল এবার সামরিক কাজে পাঠালে কৃষি কাজের ক্ষতি হবে । সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আইনের চোখে সবাই সমান ও একই শাস্তি লাভের অধিকারী এটা অভিজাত সম্প্রদায় সহজভাবে গ্রহণ করেনি । পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে তিনি ফ্রোডারিখের কুটকৌশল ও সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি । সর্বক্ষেত্রে বিরোধিতার কারণে তিনি মৃত্যুশয্যায় তার সংস্কারগুলো বাতিলের আদেশ দেন । তার সমাধিতে তিনি লিখে রাখতে আদেশ দেন যে , এখানে শায়িত আছে এমন এক ব্যক্তি যার কোন প্রচেষ্টাই জীবনে সফল হয়নি । ( Here lies the man who never succeeded in life in anything he attempted ) । ১৭৯০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন । 

অতএব , প্রকৃত বিচারে দ্বিতীয় যোসেফ ছিলেন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানদীপ্ত শাসক । তিনি জনকল্যাণের সর্বশক্তি নিয়োগ করেন । ১০ বছরের শাসনামলে জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রবর্তন করেন ।তার সংস্কার ব্যর্থ হলেও তার আন্তরিকতার অভাব ছিল না। পরিস্থিতি বিরূপ হওয়ায় তার কর্মসূচি ব্যর্থ হয় । তবুও তার অনেক সংস্কার যেমন :- ধর্মীয় ক্ষেত্রে স্বাধীনতা , ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ, এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন স্থায়িত্ব লাভ করে , যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে । তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ও চিরশত্রু  ফ্রেডারিকের মন্তব্য এ যোসেফের প্রকৃত পরিচয় ফুটে উঠে । তিনি বলেন “ Joseph is a good man but he always takes a second step before he takes the first . “ 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × = 5