ডাইরেক্টরি ( দিরেকতোয়ার ) শাসন ( ১৭৯৫- ১৭৯৯ )

The Directory ( 1795 – 1799 ) 

ডাইরেক্টরি কি ?  What is Directory ? 

ফ্রান্সের সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসানের পর ১৭৯৫ সালে নেশনাল কনভেনশন বিপ্লবের তৃতীয় সংবিধান প্রণয়ন করে।  নতুন সংবিধান মোতাবেক পাঁচজন ডাইরেক্টরি শাসনভার অর্পন করা হয় । এজন্য একে ডাইরেক্টরি শাসন বা পরিচালক সমিতির শাসন বা পরিচালকদের শাসন বলা হয় । এর ডাইরেক্টরি প্রথম পাঁচজন ডাইরেক্টরের নাম হল : যথা :- 

১) লা র‌্যভেলিয়ার ( La Revelliere ) , 

২) রিউবেল ( Reuble ) 

৩) বারস ( Barras ) 

৪) লাতুর্ন্যয়ের ( Letourneur ) 

৫) কারনো ( Carnot ) 

এরা সকলেই রাজা ষোড়শ লুই এর প্রাণদণ্ড এর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন । 

ডাইরেক্টরির গঠনতন্ত্র ( Formation of the Directory  )

এ পাঁচজন ডাইরেক্টরের আইনসভার দ্বারা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন । প্রতি বছর একজন করে ডাইরেক্টর পদত্যাগ করতেন এবং ওই শূন্য পদে আরেকজন নতুন ডাইরেক্টর নির্বাচিত হতেন । ডাইরেক্টররা কোন আইন প্রণয়ন করতে পারতেন না । তারা শুধু আইনসভা কর্তৃক পাশকৃত আইন যথাযথভাবে করতেন । নতুন সংবিধান অনুযায়ী দুই কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হয় । উচ্চ কক্ষ বা প্রবীনদের পরিষদ ( Conucil of the Ancient ) এবং নিম্ন কক্ষ বা পাঁচশত সদস্যের পরিষদ ( Council of the Five hundred ) । প্রবীণ পরিষদের সদস্যদের  বয়স হতে হতো কমপক্ষে ৪০ বছর এবং পাঁচশতের পরিষদে ৩০ বছর । দুই আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য জাতীয় কনভেনশনে সদস্যদের মধ্যে হতে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করা হয় । উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা ছিল ২০০ এবং নিম্নকক্ষের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫১১ জন । আইনসভার দুই কক্ষ থেকে প্রতিবছর এক তৃতীয়াংশ সদস্য পদত্যাগ করবে এবং নতুন সদস্য দ্বারা তা পূরণ করা হবে । নিম্ন কক্ষ আইন প্রণয়ন করে উচ্চ কক্ষে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হবে । উচ্চ কক্ষে অনুমোদন করলে তা আইনে পরিণত হবে । আর উচ্চকক্ষ যদি ওই আইন অনুমোদন না দেয় তাহলে ওই আইন আইনে পরিণত হবে না । নিম্ন কক্ষ ৫০ জন সদস্যের একটি তালিকা উচ্চকক্ষের পাঠাতো । উচ্চকক্ষ তার মধ্য থেকে ৫ জনকে ডাইরেক্টর হিসাবে  ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করত । গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান পাস করানো হতো । যদিও প্যারিসের ৩৩ সেকশন ভোটদানে বিরত থাকত । এর সংবিধান বুর্জোয়াদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে । সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার দেওয়ার প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত হয় । 

ডাইরেক্টরি শাসন : ডাইরেক্টরি শাসন কালকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । যথা : 

ক) অভ্যান্তরীণ শাসন নীতি ( Internal Policy ) এবং 

খ) বৈদেশিক নীতি ( Foreign Policy ) । 

অভ্যান্তরীণ শাসন নীতি ( Internal Policy  )

১) বাসকুল নীতি ( Bascule Policy ) : 

ডাইরেক্টরগন  দক্ষিণপন্থী অভিজাত এবং বামপন্থী জ্যাকোবিন এর মধ্যে শক্তিসাম্য বজায় রেখে চলতেন । এ দুই বিপরীত পন্থীদের মধ্যে শক্তিসাম্য বজায় রাখার নীতির নাম হলো বাসকুল নীতি । ডাইরেক্টর জানতেন যে , যদি বাম ও দক্ষিণে মধ্যে কোন একটা পক্ষ প্রবল হলে তারা ডাইরেক্টরি সংবিধান ভেঙ্গে ফেলবে । ডাইরেক্টররা ছিল বুর্জোয়া শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত । শেষ পর্যন্ত তাদের বাসকুল নীতি ব্যর্থ হয় । 

২) ব্যবিউফের বিদ্রোহ দমন : 

ডাইরেক্টরি শাসনের বিরুদ্ধে একাধিক অন্ত: বিপ্লবের উদ্ভব হয় । এগুলোর মধ্যে বামপন্থী নেতা ব্যবিয়ুফের ( Babeuf ) বিদ্রোহ ছিল অন্যতম । তিনি মনে করতেন যে , সমাজের উদ্দেশ্য হল জনগণের মঙ্গল সাধন । জনগণ মঙ্গল সাধনের জন্য দরকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা । এজন্য সম্পত্তিতে ব্যক্তি মালিকানা বিলুপ্ত করা দরকার । তিনি সর্বসাধারণের ভোটাধিকার দাবি করেন।  তিনি  জ্যাকোবিনদের সহযোগিতার ডাইরেক্টরকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন । ডাইরেক্টর গণ তার বিপ্লবী মতবাদ দমন করার লক্ষ্যে তাকে ১৭৯৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয় । তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রের সমার্থক । অনেকে বাবিউফকে কার্ল মার্কসের অগ্রদূত বলে অভিহিত করেন । 

৩) অন্যান্য বিদ্রোহ দমন এবং শান্তি স্থাপন : 

এছাড়া ডাইরেক্টরি আরো কয়েকটি দক্ষিণ পন্থী বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্র দমন করে । সোসাইটি অব দি কোম্পানি অব  জেহু ( Society of the Company of Jehu ) নামে এক ধর্ম উম্মাদ দল লুটপাট করে বিভীষিকা সৃষ্টি করে। রাজতন্ত্রী দল ক্লিশিয়ান ও ডাইরেক্টরিকে ধ্বংসের চেষ্টা করে।  ডাইরেক্টরি নির্দেশে সেনাপতি হোসি এদেরকে দৃঢ় হস্তে দমন করেন । এছাড়া সেনাপতি পিমেগরূ ( Pichegru ) এর নেতৃত্বে রাজতন্ত্রের বিদ্রোহ এবং দুজন ডাইরেক্টর কার্নোৎ ও বার্থেলমি রাজতন্ত্র সমর্থন করায় ফ্রুক্তিদারের ( Fructider ) সন্ত্রাস সংঘটিত হয় । তখন ১৭৯৭ সালে জনপ্রিয় সেনাপতি নেপোলিয়নের সহযোগিতা ও রাজতন্ত্রদের ডাইরেক্টরি থেকে এবং ১১৮ জন নবনির্বাচিত রাজতন্ত্রপন্থী সদস্যকে আইনসভা থেকে বহিষ্কার করা হয় । কেননা ১৭৯৭ সালের নির্বাচনে বহু রাজতন্ত্রপন্থী আইনসভা নির্বাচিত হয়েছিল । যাহোক ডাইরেক্টরি মধ্যপন্থা অনুসরণ করে ফ্রান্সের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন । কিন্তু তাঁরা সেনাবাহিনীর শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন । 

৪) আর্থিক সংকট : 

ডাইরেক্টরি প্রথম থেকেই নিদারুণ আর্থিক সংকটে পড়ে । মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় । মুদ্রার মূল্য অভাবনীয়ভাবে কমতে থাকে । কৃষকরা শস্য বিক্রয় করে মূল্য হিসেবে অ্যাসাইনেট নিতে অস্বীকার করে । ১০০ এ্যাসাইনেটের দাম ১৫ স্যুতে নেমে আসে । হাট-বাজারগুলো খাঁ খাঁ করতে থাকে । ভবঘুরে ও গুন্ডা-পান্ডা সর্বত্র ঘুরে বেড়ায় । ১৭৯৭ সালে ডাইরেক্টরি এ্যাসাইনেটের নোট বাতিল করে ম্যান্ডেট টেরিটারিয়ান নামে এক নতুন কাগজি মুদ্রা চালু করে । কিন্তু এ মুদ্রা অচল হয়ে পড়ে । ফলে ডাইরেক্টরি বাধ্য হয়ে ধাতব মুদ্রা চালু করে । কিন্তু ফ্রান্সে যথেষ্ট পরিমাণ সোনারুপা না থাকায় মুদ্রার সংখ্যা কমতে থাকে । ফলে মুদ্রা সংকট দেখা দেয় ।রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে।  জাতীয় ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ বাতিল করা হয়।   ডাইরেক্টরি তখন বিত্তশালী ব্যক্তিগণের নিকট হতে বাধ্যতামূলক ঋণ গ্রহণ করার নীতি গ্রহণ করে । ফরাসি সেনাপতিগন সে সময় ইউরোপের বিজিত দেশগুলো থেকে বলপূর্বক অর্থ আদায় করে উদ্বুদ্ধ অর্থ ফ্রান্সে প্রেরণ করলে  ডাইরেক্টর জনগণের ওপর নতুন কর আরোপ না করে আর্থিক সমস্যা সমাধানের সমর্থন হয় । একারণে ডাইরেক্টরি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হয় । 

৫) দুর্নীতি ও অপব্যয় : 

এ সরকার ছিল অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত । ডাইরেক্টর ও মন্ত্রীরা উৎকোচ গ্রহণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । অর্থনৈতিক সংকটের প্রথম দিকে বিশেষ করে ১৭৯৫ সালে ডাইরেক্টরি দৈনিক খরচ ছিল ৮০-৯০মিলিয়ন লিভর এবং দৈনিক আয় ছিল ৬-৮ মিলিয়ন লিভর । নব্য ধনিক শ্রেণী অপচয় অপসংস্কৃতি বড়াই করে প্রচার শুরু করে । মাদাম ফেসেফিন , মাদাম থেরেসা তালিয়েন প্রভৃতি রঙ্গীনি রমনীরা ডাইরেক্টরগনের পেরণাদাত্রীতে পরিণত হয় । মাদাম থেরেসা তালিয়েন ১২ হাজার লিভর ব্যয় করে তার একটি গ্রাউন্ড তৈরি করে তার বুর্জোয়া চরিত্রের পরিচয় দেন । তিনি ছিলেন ডাইরেক্টর বারাসের উপপত্নী । অনেকে তাদের যৌবনকে সাজিয়ে প্রদর্শন করত । এভাবে সম্পদের বড়াই করা ফ্যাশনে পরিণত হয় । পঞ্চ ডাইরেক্টরা যেন পঞ্চ রাজা পরিণত হয় । 

ডাইরেক্টরি শাসনের কুতিত্ব : 

ক) সরকারি ব্যয় সংকোচন , ঋণের উপর সুদের হার কমানো , প্রত্যক্ষ করের হার কমিয়ে পরোক্ষ কর বৃদ্ধি করার ফলে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক স্থিতি আস । 

খ) ম্যান্ডেট টেরিটোরিয়াল নামক কাগজি মুদ্রার সাহায্যে জাতীয় সম্পত্তি এবং বেলজিয়ামে বিজিত সম্পত্তি ক্রয় করার অধিকার দেওয়া হয় । নিলামের পরিবর্তে জমির মূল্য স্থির করা হয় । ফলে জমির ফটকাবাজি বন্ধ হয়ে যায় । ধাতব মুদ্রা প্রবর্তন করায় মুদ্রাস্ফীতির হয় । 

গ) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত মালের উপর উচ্চহারে শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে দেশীয় শিল্পকে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয় । এটা ছিল নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা পূর্বতন পদক্ষেপ । 

ঘ) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রসার ঘটিয়ে ফ্রান্সের শিল্প উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করা হয় । 

ঙ) ফরাসি সেনাপতিগন বিভিন্ন দেশ জয় করে বিজিতদের অর্থ ও ধন-সম্পদ ফ্রান্সে প্রেরণ করায় ডাইরেক্টরি নতুন করে আর্থিক সঙ্কট কাটাতে সক্ষম হয় । 

চ) ডাইরেক্টরি গ্রামের কমিউন এবং শহরের পৌরসভা গুলোতে কর্মচারী নিয়োগ করে । এতে ফ্রান্সের সর্বত্র কেন্দ্রীয় সরকারের কৃতিত্ব স্থাপিত হয় ।  

উপযুক্ত কারণে ডাইরেক্টরি শাসন ব্যবস্থা প্রশংসা বা কৃতিত্বের দাবি রাখে । 

ডাইরেক্টরি শাসনের কুফল/ পতনের কারণ : 

ক) নিদারুণ অর্থ সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির দারুন ডাইরেক্টরি বহু পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় । এতে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায় । 

খ) ডাইরেক্টরগন ছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর লোক । ফ্রান্সের সাঁকুলেৎ শ্রেণীর প্রতি তারা  সদয় ছিলেন না । ফলে তারা ফ্রান্সের দরিদ্র শ্রেণীর সমর্থন হারায় । 

গ) এ আমলে সর্বসাধারণের ভোটাধিকার ছিল না । সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছিল । ফলে এতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চরিত্র ছিল না । 

ঘ) ডাইরেক্টরদের ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল কলঙ্কজনক । জনসাধারণের শ্রদ্ধা আকর্ষণের ক্ষমতা তাদের ছিল না । 

ঙ) ডাইরেক্টরি বিদ্রোহ দমনের জন্য সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে এর অস্তিত্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনাপতিদের হাতে চলে যায় । 

অতএব অবশেষে একথা বলা যায় যে , স্বদেশী ও বিদ্রোহ , প্রতিবিপ্লব এবং বিদেশি আক্রমণ হতে দেশকে রক্ষার জন্য সামরিক বৃত্তি বাধ্যতামূলক করা হয় । দেশবাসীর নিকট থেকে বলপূর্বক ঋণ আদায় করা হয় । এসব নানা কারণে জনগণ ডাইরেক্টরি শাসনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে । এ সুযোগে জনপ্রিয় সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অপদার্থ ডাইরেক্টর বিতাড়িত করে কনস্যুলেট স্থাপন করে ফ্রান্সের শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে  তুলে নেয় । আর এভাবেই ডাইরেক্টরি শাসনের ( ১৭৯৫ -১৭৯৯ )  অবসান ঘটে । 

ডাইরেক্টরির বিদেশনীতি ( Foreign Policy of Directory  )

১) শান্তি কামনা : 

ডাইরেক্টর গণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে শান্তি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেন । বিপ্লবী আদর্শ প্রচার না করার নীতি গ্রহণ করেন । ইউরোপের অপর কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথা ঘোষণা করেন এবং ইউরোপীয় সঙ্ঘের যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্পেনের মধ্যস্থতা ষোড়শ লুইয়ের  পুত্র-কন্যাদের মুক্ত করার ব্যাপারে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন।  এর মূলে ছিল ডাইরেক্টরি শান্তি কামনা এবং ফ্রান্সের শান্তি প্রতিষ্ঠা করা । 

২) ব্যর্থ শান্তি কামনা : 

ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের শান্তি নীতির প্রতি আস্থাশীল ছিল না । ফলে ফ্রান্স এই দুই দেশের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধনীতি ঘোষণা করে । ফ্রান্স নিজের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্পেন ও স্প্রর্শিয়ার সাহায্য কামনা করে । স্প্রর্শিয়ার মন্ত্রীরা রাজি হলেও রাজা ফ্রেডারিক দ্বিতীয় উইলিয়াম দক্ষিণ জার্মানিতে ফ্রান্সের আধিপত্য সুনজরে দেখেননি । সুতরাং স্প্রর্শিয়ার সাথে মৈত্রী প্রচেষ্টা বিফল হয় । 

৩) কতিপয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব স্থাপন : 

ইউরোপের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো ফরাসি প্রজাতন্ত্রকে স্বাগত জানায় । ইতালির রাজন্যবর্গের মধ্যে টাস্কানির ডিউক অস্ট্রিয়ার ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয় ১৭৯৫ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে মৈত্রীও চুক্তিতে আবদ্ধ হয় । ডাইরেক্টরি উত্তর ইউরোপের দেশ সুইডেন ও ডেনমার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে । রাশিয়ার সম্রাঞ্জী দ্বিতীয় ক্যাথারিন ফ্রান্সের যুদ্ধনীতকে সমর্থন করেন । সুইজারল্যান্ড অবশ্যই নিরপেক্ষতা নীতি অবলম্বন করে । 

৪) অস্ট্রিয়ার নিকট পরাজয় : 

ডাইরেক্টরি অস্ট্রিয়াকে কাবু করার জন্য দুদিক থেকে আক্রমণ করে । একদিকে জুরদাঁ ( Jurdan ) এর নেতৃত্বে ফরাসি বাহিনী অববাহিকা ধরে জার্মানির কাল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সরকারি ভিয়েনা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয় । অন্যদিকে মরিয়ু ( Moreau ) এর অধীনে আরেকটি বাহিনী অগ্রসর হয় । যুদ্ধে জুরাদাঁ অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক আর্চ ডিউক চার্লসের নিকট পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরন করতে বাধ্য হন । এ সময় অন্যান্য রণাঙ্গনে ফরাসিদের সাফল্য আসে । 

৫) ইতালিতে নেপোলিয়ন : 

নেপোলিয়ন ইতালিতে একের পর এক যুদ্ধ করার পরিকল্পনা করেন । তার উদ্দেশ্য ছিল সার্ডিনিয়ার মৈত্রী হয়ে অস্ট্রিয়া কে বিচ্ছিন্ন করে উভয় শক্তিকে ধ্বংস করা । তিনি মন্ডোভির যুদ্ধে ( Battle of Mondovi ) সার্ডিনিয়ারকে পরাজিত করে স্যাভয় ও নিস দখল করে। সার্ডিনিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করে। অতঃপর তিনি লোম্বার্ডিতে প্রবেশ করে । ১৭৯৬ সালে তিনি মিলানে প্রবেশ করে । মোডেনা ও পারমার ডিউকগন আত্মসমর্পণ করেন । ১৭৯৬ সালের জুন মাসে নেপলসের ডিউক ফার্ডিনান্ড নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে । অস্টিয়া বাহিনী মিলন হতে পিছু হটতে মান্টুয়া দুর্গে আচরণে । নেপোলিয়ন মন্টুয়া দুর্গ অবরোধ করেন । অস্ট্রিয়া বাহিনী বহু চেষ্টা করেও মন্টুয়া দুর্গে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন । নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়া বাহিনীকে আরকোলা , লোদি ও রিভোলির যুদ্ধে পরাজিত করে মন্টুয়া অধিকার করেন । ফরাসি বাহিনী পরাজিত অস্ট্রিয়া বাহিনীকে অনুসরণ করে  রাজধানী ভিয়েনা দখল করেন । 

৬) মোডেনা বৈঠক : 

১৭৯৬ সালে মডেনা বৈঠকে ডাইরেক্টরি নির্দেশ উপেক্ষা করে নেপোলিয়ন মডেনা ও পোপ শাসিত রাজ্য গুলো নিয়ে একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন । এ বৈঠকে ইতালির ভবিষ্যৎ একত্রিতকরণ ও স্বাধীনতার বীজ রোপিত করে । 

৭) টলেনটিনোর সন্ধি ( Treaty of tolentino ) : 

১৭৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পোপ ষষ্ঠ পায়াস নেপোলিয়নের সঙ্গে টলেনটিনোর সন্ধি স্বাক্ষরিত বাধ্য হন । সন্ধির শর্তানুসারে পোপ বিলুপ ক্ষতিপূরণ এবং কিছু রাজাংশ ফ্রান্সকে দিতে বাধ্য হন । নেপোলিয়ন ডাইরেক্টরি আদেশ অমান্য করে পোপকে কিছু সুবিধাজনক শর্ত মঞ্জুর করেন । 

৮) ক্যাম্পো – ফোর্মিও সন্ধি ( Treaty of Campo-Formio ) : 

বারবার আঘাত সহ্য করতে না পেরে অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিস নেপোলিয়নের সঙ্গে ক্যাম্পো – ফোর্মিও সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন । সন্ধির শর্তানুসারে, 

ক) অস্ট্রিয়া রাইন নদীকে ফ্রান্সের পূর্ব সীমানা হিসেবে মেনে নেয় , 

খ) ফ্রান্স বেলজিয়াম , অ্যামোনিয়াম দ্বীপপুঞ্জ লাভ করে , 

গ) অস্ট্রিয়া সিসালপাইন প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা মেনে নেয় , 

ঘ) অস্ট্রিয়া ইতালির পুনঃগঠন মেনে নেয় , 

ঙ) মোডেলার ডিউক ক্ষতিপূরণ হিসেবে জার্মানির কিছু রাজ্য লাভ করেন , 

চ) যে সকল জার্মান রাজা রাজ্য হারায় , অস্ট্রিয়া অবশিষ্ট রাজ্য হতে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকার করে এবং 

ছ) গোপন শর্তাঅনুসারে অস্টিয়াম মেইনের দূর্গাদি ত্যাগ করতে এবং ফ্রান্স বেভারিয়ার উপর অস্ট্রিয়ার দাবি সমর্থন করতে সম্মত হয় । 

৯) তাঁবেদার রাষ্ট্র : 

নেপোলিয়ন ইতালির মুক্ত অঞ্চল নিয়ে কয়েকটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন । এ প্রজাতন্ত্রগুলো ফ্রান্সের তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয় । নেপোলিয়নের পরোচনায় জেনোয়ার অভিজাততন্ত্র বিনষ্ট হয় এবং লিগুরীয় প্রজাতন্ত্র ( Ligurian Republic ) স্থাপিত হয় । এর উপরে ও ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । তবেই ডাইরেক্টরি ঘোর আপত্তির মুখে নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়াকে ভেনিস প্রদান করে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করেন । 

১০) প্রথম শক্তি জোটের পতন  : 

ইংল্যান্ড ছাড়া ইউরোপের প্রায় সমস্ত শক্তি ফ্রান্সের নিকট পরাস্ত হয় । এর ফলে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিজোট বা রাষ্ট্র জোট গঠিত হয়েছিল তা ভেঙে পড়ে । একমাত্র ইংল্যান্ড নির্ভীকভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায় । 

১১) নেপোলিয়নকে সংবর্ধনা : 

অস্ট্রিয়া রাজকীয় পরাজয় ইউরোপে জনগণকে নেপোলিয়নকে অভিনন্দন জানায় । তাকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুক্তিদাতা রূপে বিবেচনা করে । ক্যাম্পোফোর্মিও সন্ধির ফলে ফ্রান্সের জনগণ নেপোলিয়নকে জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে তুলনা করতে থাকে । নেপোলিয়ন প্রচুর ধন-সম্পদ ও সেন্টমার্ক গিজার ঢালাই করার সোনার সিংহ মূর্তি ফ্রান্সে নিয়ে আসেন । এতে ফ্রান্সের জনগণ তাকে অভূতপূর্ব ও  বীরোচিত সংবর্ধনা দেয় । তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ডাইরেক্টররা ভয় পেয়ে যায় । তারা ইতালিতে নেপোলিয়নের এত সফলতা আশা করেননি । 

১২) ডাইরেক্টরি পরিকল্পনা : 

স্থল যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী জয়লাভ করলেও নেী- যুদ্ধে বৃটেনের নিকট পরাজিত হতে থাকে । কারণ ব্রিটেনের ছিল নেী-শক্তিতে বিশ্বসেরা । ভারত ছিল ইংরেজদের অন্যতম উপনিবেশ । ভারত এবং বৃটেনের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল মিশন । এজন্য স্থলপথে মিশর আক্রমণ করে তার দখল করা এবং ভারতের সঙ্গে ইংল্যান্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা দরকার । এজন্য নেপোলিয়নকে মিশর অভিযানে পাঠানো হবে । এতে হয় নেপোলিয়নের পতন হবে , নতুবা ইংল্যান্ডের পরাজয় হবে । তাই তাদের দুই শত্রুদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যাবে । 

১৩) মিশর অভিযান : 

মিশর অভিযানের দায়িত্ব পেয়ে নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত করতে লাগলো । শক্তিশালী নৌবহর ব্যতীত ইংল্যান্ডকে আক্রমণ করা সম্ভব নয় । তাই ইংল্যান্ডকে দুর্বল করার জন্য তিনি নতুন এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যা পাচ্য পরিকল্পনা নামে পরিচিত।। প্রাচ্যের উপর ইংল্যান্ডের শক্তির নির্ভর করত  । প্রাচ্যের সঙ্গে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য ধ্বংস হবে এবং শক্তি কমিয়ে দেওয়া হবে । এ উদ্দেশ্যে ১৭৯৮ সালের মে মাসে নেপোলিয়ন মিশর অভিযানে বের হন । মিশর যাত্রার পূর্বে তার অভিযানের লক্ষ্যস্থল গোপন রাখা হয় । ভূমধ্যসাগরে ইংরেজ সেনাপতি নেলসনের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি তুলো বন্দর হতে ৪০ হাজার সৈন্য এবং ৪০০ টি  যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে মিশর অভিযানে বের হন । জুন মাসে পথিমধ্যে তিনি মাল্টা দ্বীপ দখল করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করে তার দখল করেন । ১৭৯৮ সালের জুলাই মাসে পিরামিডের যুদ্ধে তিনি মামলুক বাহিনীকে পরাজিত করে কায়রো দখল করেন । কিছুদিন পর আগস্টে ইংরেজ সেনাপতি নেলসন এর কাছে আবুকী উপসাগরের নীলনদের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী পরাজিত হয় । ফরাসি নৌবহর ধ্বংস হয় । মাত্র দুইটি জাহাজ ও একটি ফ্রিগেট পালিয়ে রক্ষা পায় । নেপোলিয়ন তার সেনাবাহিনীসহ মিশরে ফ্রান্স হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । 

তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । মিশর ছিল তখন তুরস্কের এক সামন্ত রাজ্য । নেপোলিয়ন কায়রো হতে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে গাজা ও জাফা দুর্গ দুইটি দখল করে । এরপর তিনি আগ্রা দুর্গ আক্রমণ করলে ইংরেজ নৌবাহিনী দ্বারা  বাধাপ্রাপ্ত হয় । ইংরেজ বাহিনী ক্রমাগত আক্রমণে তিনি কায়রোতে ফিরে আসেন । মামলুকদের পুনরায় আবুকীর যুদ্ধে পরাজিত করে ১০ হাজার তুর্কি সেনাকে হত্যা কর । মিশরে তার আধিপত্য বজায় থাকলেও তিনি মিশর অভিযানে ব্যর্থতা উপলব্ধি করতে পারেন । এসময় তিনি সংবাদ পাই যে , ব্রিটেন ,অস্ট্রিয়া, পুর্তগা,ল রাশিয়া ,ও নেপলসকে নিয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে । এ মত অবস্থা নেপোলিয়ন ফরাসি বাহিনীর দায়িত্ব সেনাপতি ক্লেবারের নিকট হস্তান্তর করে ভূমধ্যসাগরে ইংরেজ নৌ বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে ফ্রান্সে এসে উপস্থিত হন । নেপোলিয়ন কার্যত ফরাসি বাহিনী কে তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে আসেন । পরে ফরাসি বাহিনী ইংরেজ বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় । অথচ উপকূল হতে প্যারিস পর্যন্ত পথের দু’ধারে সমবেত জনতা তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা জানায় । 

পরবর্তী ঘটনা : 

মিশর হতে ফ্রান্সে ফিরে এসে নেপোলিয়নের দুর্দশাগ্রস্ত ফ্রান্স দেখতে পান । জনগণ ডাইরেক্টরি বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল । দ্বিতীয় রাষ্ট্রজোট ফ্রান্স আক্রমণ প্রস্তুত । তখন তিনি সিয়েস ও বারাস নামক দুই ডাইরেক্টর এর সহযোগিতা ডাইরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে কনসুলেটের শাসন( Government of Consulate )  প্রবর্তন করেন ( ১৭৯৯)  । তিনি ছিলেন তিনজন কনস্যুলেটের অন্যতম এবং এক নাম্বার কনস্যুলেট । কনস্যুলেটের আমলে ফ্রান্সের ক্ষমতা কার্যত নেপোলিয়নের হাতে চলে যায় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

× 5 = 5