নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ( ১৭৬৯-১৮২১ )

Napoleon Bonaparte ( 1769-1821 ) 

নেপোলিয়নের সংস্কার ( Reforms of Napoleon  )

ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংস্কারক ।ফরাসি দেশের প্রাচীন ঘুণেধরা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার সার্বিক পরিবর্তন সাধন করে তিনি অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন । বিপ্লবজনিত অব্যবস্থা ও বিশৃংখলা , ভীতি ও সন্ত্রাসের পর বিপ্লবের সুফল গুলোকে স্থায়িত্ব দান করার মানসে তিনি এক গঠনমূলক কাজে হাত দেন । যার ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সে অচিরেই রাহাজানি ,ও লুন্ঠন বন্ধ হয়ে যায় এবং দৈনন্দিন জীবন যাত্রার শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরে আসে । 

নেপোলিয়নের সংস্কারের উদ্দেশ্য : 

ক) ফরাসি জাতির ক্ষত উপশম করা , 

খ) একটি মজবুত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা এবং 

গ) প্রশাসনিক ,সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা । 

এই উদ্দেশ্যগুলোকে সামনে রেখে তিনি যে সংস্কার কাজ সাধন করেছিলেন তা নিম্নে আলোচনা করা হল : 

১) প্রশাসনিক সংস্কার : 

নেপোলিয়নের ফ্রান্সকে একটি সুদৃঢ় ও কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে দেশ হতে রাজনৈতিক দলাদলির বিলোপ সাধন করে । সমগ্র দেশকে একই শাসনাধীনে আনার জন্য তিনি কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । 

ক) তিনি সমগ্র দেশকে পূর্বের তিনটি স্তর এর পরিবর্তে চারটি স্তরে বিভক্ত করেন । যেমন :- প্রদেশ বা Department , জেলা বা Arron disement , Conton এবং Commune ।  জেলাগুলোকে আবার Conton এবং Commune বিভক্ত করা হয় । Departments এর প্রশাসক Prefect , Arron disement – এর প্রশাসক Sub-Prefect এবং Contons ও Commune এরপর শাসক হলেন মেয়র । তিনি অবশ্যই বিপ্লবী সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত দেশের ৮৩ টি প্রদেশ এবং ৫৪৭ টি জেলা বহাল রাখেন । Perfect এবং Sub-Prefect গন জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হয়ে নেপোলিয়ন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন । 

খ) জনসাধারণ কর্তৃক সরকারি কর্মচারী গনের নির্বাচন প্রথা বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে সম্রাট কর্তৃক মনোনয়নপত্র হলো । 

গ) তিনি দেশের সকল পদ এসে এবং আইন-কানুন ও শাসন নীতি প্রবর্তন করেন । 

ঘ) বিচারপতিদেরকে সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করেন । বিচার ব্যবস্থার জন্য দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠা করেন । তার সময় জরিপ প্রথা প্রবর্তিত হয় । এভাবে নেপোলিয়ন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন । 

২) ধর্মীয় সংস্কার : 

ফরাসি বিপ্লবের পর চার্চ এবং সরকারের মধ্যে বিরোধ  তীব্র আকার ধারণ করে । আগের রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুগত ছিল প্রায় ৯০% লোক এবং সমগ্র দেশের এক-দশমাংশ ভূমি চার্চের  অধীনে ছিল । রাজা এবং চার্চ তাদের নিজেদের স্বার্থ ও প্রবুদ্ধ বজায় রাখতে একে অপরকে সাহায্য করত । কিন্তু বিপ্লবী সরকার চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং বিভিন্ন প্রকার সুযোগ- সুবিধা বিলুপ্ত করে দেন । চার্চের সাথে রাজার পূর্বেকার সম্পর্ক ছেদ ঘটে । ফলে বিপ্লবী সরকার এবং চার্চের মধ্যে বিরোধ শুরু হয় । জনগণ বিপ্লবী সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয় । নেপোলিয়ন জনগনের অসন্তোষ দূরীকরণ এবং তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য তিনি পোপের সঙ্গে ১৮০২  সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যা ( Concordat Treaty )  নামে পরিচিত । চুক্তির শর্তগুলো ধারাবাহিকভাবে নিচে দেয়া হল : – 

ক) রোমান ক্যাথলিক চার্চের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মনোনয়ন দেবেন নেপোলিয়ন এবং নিয়োগ দিবেন পোপ , 

খ) চার্চের কর্মচারীদের বেতন দেবে সরকার , তবে বিপ্লবী সরকার কর্তৃক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বহাল রইল , 

গ) যাজক গন প্রকাশ্য ধর্মীয় কাজকর্ম করতে পারবে , তবে রাষ্ট্রবিরোধী নয় এবং 

ঘ) Papal bull বা পোপের ঘোষণাপত্র সরকারের নিকট পাঠাতে হবে,  কিন্তু পূর্বে পাঠাতে হতো না।  

এভাবে পোপের সাথে বিরোধ মীমাংসা করে নেপোলিয়ন পরোক্ষভাবে নিজের ক্ষমতা অধিষ্ঠিত করেন। 

৩) আইন সংস্কার : 

ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন আইন প্রচলিত ছিল । কোন Uniform  আইন ছিল না । বিপ্লবী সরকার একটা আইন কমিশন গঠন করেছিল , কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি । অবশেষে নেপোলিয়ন অভিন্ন আইন প্রণয়নের জন্য একটি আইন কমিশন গঠন করল । এই কমিশনের সুপারিশে তিনি যে আইন প্রণয়ন করলেন তা হল : ক)The Civil Code  খ) The Code of Civil Procedure গ) The Criminal Code  ঘ) The Code of Criminal Procedure  ঙ) The Commercial Code . 

Civile Code of French Nation নামে যে দেওয়ানী আইন প্রণয়ন করেন তাকে সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয় Code of Nepoleon । অথচ এখন বুঝানো হয় তার সকল আইন । Civile Code – এর বিধান অনুযায়ী : – 

১) আইনের চোখে সকলকে সমান অধিকার দেওয়া হয় , 

২) কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিলোপ করে সামাজিক সাম্য স্থাপন করা হয় , 

৩) বংশমর্যাদাকে বাদ দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয় , 

৪) স্ত্রীর উপর স্বামীর কৃতিত্ব দেওয়া হয় এবং স্বামীর অনুমতি ব্যতীত সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয় , 

৫) বিবাহ বিচ্ছেদ স্বীকৃতি দেওয়া হয় , 

৬) দন্ডবিধি সুনিশ্চিত ও সুবিন্যস্ত করা হয় , 

৭) বিচারব্যবস্থা জুরি প্রথা প্রবর্তন হয় এবং 

৮) রাজনৈতিক অপরাধীদেরকে সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য না করে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওয়া হয় । 

নেপোলিয়নের সমস্ত কৃতিত্বের মধ্যে আইন সংস্কার হল সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব । এ সম্পর্কে নেপোলিয়ন নিজেই মন্তব্য করেছেন , “ আমি যে , চল্লিশটি যুদ্ধে জয়লাভ করছি তা আমার প্রকৃত গর্বের বস্তু নয় বরং যা কোনদিন নষ্ট হবে না তা হলো আমার রচিত চিরস্মরণীয় আইনগুলো । “ তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জন করেন তার পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় । কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে তিনি যা করেন তা তাকে স্মরণীয় করে রাখে । 

৪) শিক্ষা সংস্কার : 

নেপোলিয়ন শিক্ষার মাধ্যমে দুইটি উদ্দেশ্য সফল করতে চেয়েছিলেন । 

ক) জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা , 

খ) দক্ষ জনশক্তি এবং আনুগত্য সম্পূর্ণ সুনাগরিক গড়ে তোলা । 

যথা : প্রাথমিক শিক্ষা ,মাধ্যমিক শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা ( বিশ্ববিদ্যালয়)  । প্রতি Commune এ Prefect বা  Sub- Prefect এর অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় , অতি শহরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় । মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণ হলে , বিশ্ব বিদ্যালয় স্তরে শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করা হয় । টেকনিকেল স্তরে জাতিগঠনমূলক শিক্ষা দেওয়া হত । এছাড়া প্রকৌশলী , কারিগরি ও চিকিৎসা বিদ্যার জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় । শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নর্মাল স্কুল নামে পরিচিত ছিল । ১৮০৮ সালে নেপোলিয়ন প্যারিসে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। তার শিক্ষাব্যবস্থা স্বাধীন চিন্তার স্থান ছিল না । বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রিত হতো সরকার দ্বারা ।আর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হতো বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা । বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কি হতো তা সরকার নির্ধারণ করে দিত । 

৫) অর্থনৈতিক সংস্কার : 

ষোড়শ লুই এর আমলে থেকে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে । নেপোলিয়ন সে ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে দক্ষতার সাথে পুনর্গঠন করেন। যেমন : – 

ক) নেপোলিয়ন অর্থদণ্ডকে রাজস্ব দপ্তর ও অডিট দপ্তরে বিভক্ত করেন । অডিট দপ্তরের কাজ ছিল সরকারি ব্যয়ের হিসাব নিকাশ পরীক্ষা করা । 

খ) নেপোলিয়ন করের পরিমাণ না বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করেন । তার আমলে তিনি নিয়মিত কর আদায়ের ব্যবস্থা করেন । কর আদায়ের ব্যাপারে তিনি কাউকে রেহাই দেননি । 

গ) তিনি ১৮০০ সালে Bank of France নামে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন । এই ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ী ,শিল্পপতি, ও কৃষকগণ ঋণ পেত । এই ব্যাংক নোট ছাপার অধিকার পায় । নেপোলিয়ন নিজ নামে স্বর্ণ মুদ্রা প্রবর্তন করেন । 

ঘ) স্টক এক্সচেঞ্জ ( Stock Exchange ) স্থাপন করে ফটকা ব্যবসায় কে নিয়ন্ত্রণ করেন । 

সুতরাং আমরা বলতে পারি নেপোলিয়নের অর্থনৈতিক সংস্কার ছিল আধুনিককালের একটি চমৎকার দিক নির্দেশক । নেপোলিয়ন তার অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য আমাদের মাঝে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে । 

৬) জনহিতকর কার্যাবলী : 

নেপোলিয়ন অসংখ্য বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন । তিনি বহু রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণ করেন । ২২৯ টি সামরিক রাস্তা ও ইতালির সাথে যোগাযোগের জন্য আল্পস্ পর্বতের গিরিপথ দিয়ে দুটি রাস্তা নির্মাণ করেন । প্রসাদ ও  উদ্যান নির্মাণ করেন । তিনি সেনা ও অন্যান্য কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা স্বরূপ The Legion of honour  খেতাব প্রদান করেন ।  Career Open to Talent বা যোগ্যতাকেই একমাত্র স্বীকৃতি দিয়ে তিনি সামাজিক সাম্য স্থাপন করেন । 

মূল্যায়ন / নেপোলিয়নের সংস্কার গুলো ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ , বলে তুমি মনে করো?  Evaluation / How much similarity was the reforms of Napoleon to the ideal of the french Revolution ? Do you think ? 

ফরাসি বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল সাম্য , মৈত্রী , গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা । কিন্তু নেপোলিয়ন তার শাসন ব্যবস্থা যে সংস্কার সাধন করেন তাতে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা লেশমাত্র ছিল না । আইনসভাকে সার্বভৌম ক্ষমতা হতে বঞ্চিত করা হয় । আইনসভার আইন রচনার সার্বভৌম অধিকার ছিল না । তিনি প্রাদেশিক আইনসভার ক্ষমতা লোপ করেন । নেপোলিয়ন সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন করার পরিবর্তে মনোনয়নপত্র প্রবর্তন করেন । মহাদেশের শাসনকর্তাদের নির্বাচনের দ্বারা নিযুক্তির বদলে নিয়োগ প্রথা চালু করেন । তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতা , মত প্রকাশের স্বাধীনতা লুপ্ত করেন । তিনি সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীয়করণ করার বদলে, সকল ক্ষমতা নিজ হাতে কেন্দ্রীভূত করেন । এ কারণে তাকে বিপ্লবের ধ্বংসকারী বলা হয় । তিনি ভূমিহীন কৃষকদের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি । তেমনি মজুরের মজুরি নির্ধারণ করে দেননি । তিনি Legion of honour দ্বারা বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেন । এ প্রসঙ্গে লেফেডার বলেন , “ আসলে নেপোলিয়ন জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরশাসকের আদর্শকে বেছে নেয় । পুরানো রাজতন্ত্র তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে স্থাপন করেন । 

আসলে তিনি তার সংস্কারে  Civil Constitution এবং সমাজতন্ত্র বিরোধী আইন গুলো বেছে নেন । এর সঙ্গে তিনি রাজতন্ত্রের যুগের একনায়কতন্ত্র কেন্দ্রীয়করণ , প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লোপ , রোমান আইন প্রভৃতি বেছে নেন । তিনি জ্যাকবিন যুগের গণভোট , প্রজাতন্ত্র, সমাজতন্ত্রকে ত্যাগ করেন । সুতরাং তার সংস্কার ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় । তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি ফরাসি বিপ্লবের আদর্শকে গ্রহণ করেছিল । তার সংস্কার কার্যকরী চালনা করে আমরা বলতে পারি যে , নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লবের সাম্যের আদর্শকে গ্রহণ করলেও গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার আদর্শকে পরিত্যাগ করেন । 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা ( Continental System  )  

ইংল্যান্ড ছিল ফ্রান্সের জাত শত্রু এবং নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের প্রধান বাধা । নেপোলিয়ন সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিযান করে সাফল্য অর্জন করেন । কিন্তু ইংল্যান্ডকে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করতে তিনি ব্যর্থ হন । কেননা ইংল্যান্ড ছিল নেী-শক্তিতে বিশ্বসেরা , শিল্পে উন্নত এবং বিশ্বজোড়া বাণিজ্য । নেপোলিয়ন নিজেও ইংরেজ জাতিকে দোকানদারের জাতি বলে মনে করতেন । তখন তিনি তার বিশ্বস্ত সেনাপতি মন্ট গেলার্ডের পরামর্শের সমগ্র ইউরোপকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ করে একটি অর্থনৈতিক অবরোধের পরিকল্পনা করেন । অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য বন্ধ করে অর্থনৈতিক ভাবে তাকে পঙ্গু করে নেপোলিয়ন ইংরেজ জাতিকে হাতে না মেরে ভাতে মারা সংকল্প গ্রহণ করেন । এ সংকল্পকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য নেপোলিয়ন যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাই মহাদেশীয় ব্যবস্থা নামে পরিচিত । 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন এর লক্ষ্য /উদ্দেশ্য /কারণ ( Purposes/ Causes of the Continental System ) :

১) অর্থনৈতিকভাবে ইংল্যান্ডকে দুর্বল করা : 

ইংল্যান্ডের শক্তি ও সমৃদ্ধির উৎস ছিল তার উন্নত শিল্প এবং বিশ্বজোড়া বাণিজ্য । ইংল্যান্ড তার উপনিবেশগুলো থেকে সস্তা দরে কাঁচামাল ক্রয় করে তা দিয়ে শিল্পদ্রব্য তৈরি করে তা আবার ওইসব উপনিবেশ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করত । ইংল্যান্ড যাতে তার পণ্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে না পারে সেজন্য নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেন । 

২) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য : 

ইংল্যান্ডে এর সময় রাজনৈতিক কলহ এবং সামাজিক বৈষম্যের ফলে ভূস্বামী ও কৃষক শ্রেণীর মধ্যে চরম তিক্ততা বিদ্যমান ছিল । অপরদিকে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা অন্ত ছিল না । সুতরাং , নেপোলিয়ন মনে করে যে , এরূপ নাজুক অবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে ইংল্যান্ড ফ্রান্সের কাছে নতিস্বীকার করে চুক্তি সম্পাদন করতে বাধ্য হবে । 

৩) সামরিক উদ্দেশ্য : 

ট্রাফালগারের যুদ্ধে ফ্রান্সের বিপর্যয় এর প্রতিশোধ নিতে নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় ব্যবস্থা আরোপ করেন । এ সময় ইংল্যান্ডের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি পাউন্ড । একদিকে বাণিজ্য বন্ধ , অন্যদিকে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে সরকার দেওয়ালি হবেই । এতে ইংল্যান্ডের সামরিক ব্যয় কমতে থাকবে । 

৪) ফ্রান্সের অর্থনৈতিক উন্নয়ন : 

ইংল্যান্ডের মাল আমদানি নিষিদ্ধ হলে ইউরোপের বাজারে ফরাসি মালে চাহিদা বাড়বে । ফ্রান্সের উৎপাদিত পণ্য ইউরোপের বাজারে একচেটিয়া বিক্রি হলে ফ্রান্স সম্পদশালী হবে । সুতরাং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ছিল নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য । এটা ছিল একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ । 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন : 

নেপোলিয়ন তার এ অভিনব ব্যবস্থা কয়েকটি ঘোষণা জারি দ্বারা শুরু করেন : যেমন : – 

ক) বার্লিন ঘোষণা ( Berlin decree ) : 

১৮০৬ সালে নেপোলিয়ন বার্লিন ডিক্রি জারি করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেন । এ ঘোষণা দ্বারা বলা হয় যে , 

১) সমগ্র ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জকে অবরোধ করা হলো । 

২) ফরাসি বন্দরগুলোতে কোন ব্রিটিশ জাহাজ বা ব্রিটিশ উপনিবেশ হতে আগত কোন জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না । 

৩) যদি ইংল্যান্ডের কোন মাল অন্য দেশের জাহাজ মারফত নামানো হয় তা বাজেয়াপ্ত করা হবে । নিরপেক্ষ দেশগুলো এ আদেশ মানতে বাধ্য থাকবে । 

খ) অর্ডারস  ইন কাউন্সিল ( Orders in Council ) : 

১৮০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ইংল্যান্ড বার্লিন ঘোষণার পাল্টা হিসেবে অর্ডারস ইন কাউন্সিল ঘোষণা করে । এতে বলা হয় যে , 

১) ব্রিটিশ নৌ-বহর ফ্রান্স ও তার মিত্রশক্তির বন্দরগুলো পাল্টা অবরোধ করল । 

২) এসব দেশের বন্দরে কোন দেশের এমনকি নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ কবে করতে পারবে না । করলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে । 

৩) যদি কোনো নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ ফ্রান্স ও তার মিত্রশক্তির বন্দরে যেতে চায় তবে ওই জাহাজ ইংল্যান্ডকে সেলামি দিয়ে এবং অনুমতি পত্র নিয়ে যেতে পারবে । 

গ) মিলান ডিক্রি ( Milan Decree ) : 

অর্ডারস ইন কাউন্সিলর জবাবে নেপোলিয়ন1807  সালের ডিসেম্বর মাসে মিলন ডিক্রি জারি করেন । এতে বলা হয় যে , অর্ডারস ইন কাউন্সিল অনুযায়ী যে সকল জাহাজ মিত্র বা নিরপেক্ষ যে দেশেরই হোক না কেন , ইংল্যান্ডের কাছ থেকে লাইসেন্স বা অনুমতি পত্র নিলে তা ব্রিটিশ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং ফ্রান্স তা বাজেয়াপ্ত করবে । বৃটেনের বিরুদ্ধে পূর্ন  অবরোধ আরোপ করা হলো । 

ঘ) ওয়ারসো ও ফনটেইনব্লু ডিক্রি ( Warsaw and Fontainebleau Decree ) : 

এরপর নেপোলিয়ন ১৮০৯ সালে ওয়ারসো ডিক্রি এবং ১৮১০ সালে ফনটেইনব্লু ডিক্রি জারি করে পুনরায় বলেন যে , তার আদেশ ভঙ্গ করার অপরাধ যেসব কয় বিক্রিকরা হবে  তা প্রকাশ্য পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং তারা আদেশ ভঙ্গ কারি ব্রিটিশ বণিকদের বিচার করার জন্য বিশেষ আদালতে স্থাপন করা হবে । তাই বার্লিন ডিক্রি , মিলান ডিক্রি এবং ওয়ারসো ও ফনটেইনব্লু ডিক্রি নীতিগুলোকে একযোগে মহাদেশীয় ব্যবস্থা বা Continertal System বলা হয় । 

বাস্তবায়নের প্রয়াস : 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্যে নেপোলিয়ন ১৮০৬ সালে স্প্রর্শিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিক উইলিয়াম , ১৮০৭ সালে রুশ জার প্রথম আলেকজান্ডার এবং ১৮০৯ সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসকে  মহাদেশীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করেন । হল্যান্ডের রাজা লুই বোনাপার্ট এটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে  ১৮১০ সালে তিনি হল্যান্ড দখলের জন্য একদল সেনাপতি প্রেরণ করেন । সে বছর গেলিগোল্যান্ডে বৃটেনের চোরাকারবার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানির সমগ্র উত্তর পশ্চিম উপকূল সরাসরি দখল করেন ।    পোপ ও সুইডেন এর নিকট থেকে এ মর্মে বলপূর্বক প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয় । স্পেন ও পর্তুগাল অধিকার করা হয় । এতকিছুর পরেও নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা ফলাফল / এ ব্যবস্থা নেপোলিয়নের পতনের জন্য কতটুকু দায়ী ছিল বলে তুমি মনে করো ?

Result of the Continental System / How much responsible was for down fall of Napoleon ? Do you think ? 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে নেপোলিয়ন নানা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন G শেষ পর্যন্ত এটি তার পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  যেমন : 

১) বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিরোধ : 

ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করার জন্য নেপোলিয়ন তার আশ্রিত ও অধিকৃত রাষ্ট্রসমূহকে এটি মেনে চলতে আদেশ দেন । তারা কেউ সন্তুষ্টচিত্তে এটি মেনে নিতে পারেননি । কেননা ইউরোপের সর্বোচ্চ ইংল্যান্ডের পণ্যদ্রব্যের বিলোপ চাহিদা ছিল । ইংল্যান্ড ছিল শিল্পোন্নত দেশ । ইংল্যান্ডের পণ্য ছিল গুণে-মানে অনেক উন্নত । ফলে এ সমস্ত দেশ মহাদেশীয় ব্যবস্থা মেনে নিতে চায়নি । আর এতে এ সমস্ত দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের বিভেদ সৃষ্টি হতে থাকে । 

২) নিরপেক্ষ দেশগুলোর ক্ষোভ : 

পোপের রাজ্য ছিল নিরপেক্ষ দেশ । পোপ কোন পক্ষে যোগদান করতে চাইনি । তাই পোপ  নেপোলিয়নের অযুক্তিক আদেশ মেনে মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে চায়নি । এতে নেপোলিয়নকে পোপকে বন্দি করে বলপূর্বক সম্মতি আদায় করলে নিরপেক্ষ দেশগুলোতে ভাল দৃষ্টিভঙ্গির দেখায় নি । পোপের ক্ষোভ ইউরোপের ক্ষোভের পরিণত হয় । 

৩) নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি : 

মহাদেশীয় রাষ্ট্রসমূহ ব্রিটিশ শিল্পজাত দ্রব্য হতে বঞ্চিত হলে নিত্যপণ্যের মূল্য স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় । ইংল্যান্ড উল ও তুলা দ্বারা প্রস্তুত বস্ত্র , চা , কফি , ও চিনির একচেটিয়া ব্যবসা করতো । ইউরোপীয় জনসাধারণ এসব নিত্যপণ্যের অভাবে মহাদেশীয় ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে এবং এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে । 

৪) ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা : 

নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা ফলে ইংল্যান্ড আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল , এতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু ইংল্যান্ড  ইন কাউন্সিল জারি করে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছিল । বৃটেনের এ আদেশের ফলে বৃটেনের বন্দরগুলোতে বহু পণ্য সামগ্রী আটক করেছিল । চোরাচালান ও অবৈধভাবে ইংল্যান্ডের সঙ্গে প্রায় সব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকে । দুর্বল ফরাসি নৌবাহিনীর পক্ষে ব্রিটিশ বাণিজ্য গতিবিধি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না । কেননা ব্রিটিশ নৌশক্তি ছিল বিশ্বসেরা । ফলে মহাদেশীয় ব্যবস্থা ব্রিটেনকে আর্থিকভাবে তেমন ক্ষতি করতে পারেনি । 

৫) ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট : 

ফ্রান্সের ভেতরে একশ্রেণীর বণিক ও শিল্পপতি মহাদেশীয় ব্যবস্থার বিরোধিতা শুরু করেন । নেপোলিয়ন তার যুদ্ধবিগ্রহ ও মহাদেশীয় অবরোধ কে কার্যকরী করতে তাদের উপর চড়া হারে কর আরোপ করেন । ইংল্যান্ড তারনো নেী-শক্তির বলে অর্ডারস ইন কাউন্সিল কার্যকর করার ফলে ফ্রান্সের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতি হয় । ফ্রান্সের বন্দরগুলো কাজকর্মের অভাবে মুখ থুবরে পড়ে । প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন শিল্প উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটে । এমনকি পর্তুগালের শাসক লুই বোনাপার্ট মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করেন । নেপোলিয়ন নিজেও লাইসেন্স প্রথা চালু করে নীতিগতভাবে এ ব্যবস্থার ভাঙ্গন দরান। তিনি গোপনে ফরাসি সেনাবাহিনীর জন্য ব্রিটিশ জুতা ও পোশাক ক্রয়  করে এ ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ করেন । 

৬) স্পেন পর্তুগাল ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ : 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে নেপোলিয়ন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন । স্পেন ,পর্তুগাল ও রাশিয়া মহাদেশীয় ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেনি ।ফলে নেপোলিয়ন এ সকল দেশের সঙ্গে ব্যয়বহুল ও শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন । শত চেষ্টা করেও তিনি স্পেনকে দমাতে পারেনি । পরবর্তীকালে তিনি দিশেহারা হয়ে আক্ষেপ করে বলেন , “ স্পেনের ক্ষত এই আমার সর্বনাশের মূল “ ( It was the spanish ulcer that ruined me . ) । পর্তুগালের শাসক তার আপন ভাই লুই বোনাপার্ট এ ব্যবস্থা মেনে নেয়নি । রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন । ৪ লক্ষ ২০ হাজার মতান্তরে ৬ লক্ষ্য সৈন্য ও বিলুপ্ত ও গোলাবারুদ নিয়ে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । এ যুদ্ধে নেপোলিয়নের গ্র্যান্ড আর্মি ( Grand Army )  ধ্বংস হয়ে যায় । তিনি মাত্র 50 হাজার সৈন্য নিয়ে কোনমতে ফ্রান্সে ফিরতে সক্ষম হন ।  এভাবে মহাদেশীয় ব্যবস্থা চালু করতে গিয়ে নেপোলিয়ন সর্বত্র সংকট জালে জড়িয়ে পড়েন। এটা ছিল তার মহা ভুল । আর এ  মহা ভুলেই তার পতনের পথ উন্মুক্ত করে দেয় । 

মূল্যায়ন : 

নেপোলিয়নের এই পরিকল্পনা ছিল বাস্তবতাবর্জিত । ঐতিহাসিক লজ বলেন  “ মহাদেশীয় ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নেপোলিয়ন এর ব্যর্থতার পরিচায়ক । মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য জনশক্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রয়োজন ফ্রান্সের তা ছিল না । এ ব্যবস্থাকে জোরপূর্বক বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি সর্বত্র ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন । এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন । এতে ফ্রান্সের জনবলও অর্থবল ক্ষয় হতে থাকে । নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তি সমবায় গড়ে তোলে । সে জোটের নিকট ১৮১৫ সালে তার শোচনীয় পরাজয় ঘটে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিনি যে মারণাস্ত্র প্রয়োগ করেন তা বুমেরাং হয়ে তার উপরেই তা পতিত হয় , যা ছিল তার মহাভুল ( Great blunder of Nepoleon )। 

মহাদেশীয় ব্যবস্থা ব্যর্থতার কারণ ( Causes of the Failure of the Continental System . )

অথবা , মহাদেশীয় ব্যবস্থা কেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় ?  Or, Why was the continental system failure ? 

ইংল্যান্ডের শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকায় যুদ্ধের মাধ্যমে ইংল্যান্ড কে পরাজিত করা যাবে না মনে করে, নেপোলিয়ন মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার পরিকল্পনা করেন । প্রথমদিকে এটি কিছুটা সাফল্য লাভ করলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । এ ব্যর্থতার পশ্চাতে কয়েকটি কারণ ছিল । যেমন : – 

১) ফ্রান্সের দুর্বল নেী-শক্তি: 

ইউরোপের সুদীর্ঘ উপকূলের ওপর নজরদারি করার মত নেী-শক্তি ফ্রান্সের ছিলনা । ফলে ইংল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা ফ্রান্সের পক্ষে সম্ভব হয়নি । অবরোধ ও রোধ  হয়নি । 

২) ব্রিটিশ নেী-শক্তির প্রাধান্য: 

ব্রিটিশ নেী-শক্তি ছিল বিশ্বসেরা । ব্রিটিশ শক্তির প্রাধান্য এতই প্রবল ছিল যে , ইউরোপের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ রেখে ফ্রান্স ও এর নিয়ন্ত্রাধীন দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য বিনষ্ট করা ইংল্যান্ডের পক্ষে কষ্টসাধ্য ছিল না । মহাদেশীয় ব্যবস্থা ফলে ইংল্যান্ডের সামরিক ক্ষতি হলেও সে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় । কিন্তু পান তার আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি । শক্তিশালী নৌবহর এর সাহায্যে ইংল্যান্ড Orders in Council কার্যকর করতে পেরেছিল । 

3) নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : 

মহাদেশীয় রাষ্ট্রসমূহ ব্রিটিশ শিল্পজাত দ্রব্য হতে বঞ্চিত হলে নিত্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় । ইংল্যান্ড উল ও তুলা দ্বারা বস্ত্র , চা ,কফি ও চিনির একচেটিয়া ব্যবসা করত । ইউরোপীয় জনসাধারণ এসব নিত্যপণ্যের অভাবে মহাদেশীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারান এবং এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে । 

৪) বিকল্প উৎপাদন না হওয়ায় : 

শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্প উন্নয়ন দেশে পরিণত হয় । ইউরোপের বাজারে ব্রিটিশ পণ্যের প্রচুর চাহিদা ছিল । কিন্তু ফ্রান্সের ন্যায়  শিল্পে অনুন্নত দেশের পক্ষে তা পূরণ করা সম্ভব ছিল না । নেপোলিয়ন ফ্রান্সে শিল্প গঠনের যে উদ্যোগ নেন , তার গতি ছিল অত্যন্ত মন্তর । তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য কমতে থাকায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় । এজন্যই ইউরোপে জনগণ নেপোলিয়নকে দায়ী করে । 

৫) চোরাকারবারি ও দুর্নীতি : 

ইউরোপে ব্রিটিশ পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় চোরাকারবারির মাধ্যমে ইউরোপে ব্রিটিশ পণ্য প্রবেশ করতে থাকে । এছাড়াও নেপোলিয়নের কর্মচারীদের দুর্নীতির ফলে ব্রিটিশ ফোনের আমদানি অব্যাহত থাকবে । ফনটেনব্লুর  আদেশনামা অনুযায়ী ইংল্যান্ডের বাজেয়াপ্ত পণ্য পোড়ানোর  আদেশ লোক দেখানোর ভান করে অপ্রয়োজনে জিনিসপত্র পড়ানো হয় । 

৬) লাইসেন্স প্রদান : 

ব্রিটিশ পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় ভেবে নেপোলিয়ন আমদানিকারকদের অর্থের বিনিময় লাইসেন্স দিতে শুরু করেন । লাইসেন্স প্রথা চালু করে তিনি নিজের নীতিগতভাবে তার অবরোধ ভাঙ্গন মেনে নেন । 

৭) ইংল্যান্ডের নতুন বাজার : 

ইংল্যান্ড তার বাড়তি দ্রব্য-সামগ্রী রপ্তানীর জন্য ল্যাটিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও এশিয়ার , তুরস্কে নতুন বাজার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় । ইংল্যান্ড তার Orders in Council শিথিল করে নিরপেক্ষ দেশের জাহাজগুলোকে উদার লাইসেন্স দিতে শুরু করেন । এতে মহাদেশীয় ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে । 

৮) অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা : 

নেপোলিয়ন তার যুদ্ধবিগ্রহ ও ইউরোপ অবরোধকে কার্যকরী করার জন্য বিশাল ব্যয় নির্বাহের জন্য বণিক ও শিল্পপতিদের উপর বাড়তি হারে কর ধার্য করেন । এতে বণিক ও শিল্পপতিরা এর বিরোধিতা শুরু করে । ইংল্যান্ডের Orders in Council দ্বারা ফ্রান্স তীব্রভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় । ফ্রান্স ও তার অধিকৃত বন্দরগুলো কাজের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা যায় । 

৯) ইংল্যান্ডে গম রপ্তানি : 

অবরোধ চলাকালীন সময়ে অনাবৃষ্টির কারণে ইংল্যান্ডে খাদ্যসঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । এসময় নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডে ফ্রান্স থেকে গম রপ্তানি নির্দেশ দেন । এতে তিনি ইংল্যান্ড কে ভাতে মারার সুযোগ হাত ছাড়া করলেন । তিনি আমদানি না করে রপ্তানি করে ইংল্যান্ডের অর্থ শুষে নিতে চেয়েছিল । 

১০) নেপোলিয়ন কর্তৃক অবরোধ ভঙ্গ : 

ইংল্যান্ডের শিল্পজাত পণ্যের বিকল্প তৈরি না হওয়ায় ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা ফ্রান্সে ছিল ব্যাপক । তাই নেপোলিয়ন বিশেষ ব্যবস্থায় ফরাসি সেনাদের জন্য ব্রিটিশ জুতা ও পোশাক ক্রয় করেন । তিনি তার বাই লুই বোনাপার্ট কে ইংল্যান্ড থেকে ডাচ-জিন বা মোটা কাপড় খরীদের সুযোগ ইংরেজ বণিকদের দেন । এতে নেপোলিয়ন নিজের অবরোধ ভাঙতে শুরু করেন । 

১১) বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরোধিতা : 

নেপোলিয়ন তারা আশ্রিত বা অধিকৃত রাষ্ট্রসমূহকে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেও , তার কেউ সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতে পারেনি । পোপ নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও নেপোলিয়ন তাকে বন্দী করে মহাদেশীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করেন । এতে তিনি নিরপেক্ষ দেশের সমর্থন হারান । 

১২) স্পেন, পর্তুগাল ও রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ : 

নেপোলিয়ন তার মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন । স্পেন ,পর্তুগাল ও রাশিয়া মহাদেশীয় ব্যবস্থা মেনে নিতে অস্বীকার করলে তিনি এসব দেশের সঙ্গে ব্যায় সাধ্য ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন । শত চেষ্টা করেও তিনি স্পেনকে দমাতে পারেনি । শেষে নিজের নিজেকে আক্ষেপ করে বলেন  “ স্পেনের হাতেই আমার সর্বনাশের কারণ (It was the Spanish ulcer that ruined me )। রাশিয়ায় অভিযান করতে গিয়ে নেপোলিয়ন সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসেন । তার গ্র্যান্ড আর্মি ধ্বংস হয় । ৪ লক্ষ  ২০ হাজার মতান্তর ৬ লক্ষ  সৈন্যর মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে কোনমতে ফ্রান্সে ফিরতে সক্ষম হন। এমত অবস্থায় অস্ট্রিয়া ও অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসে। 

উপযুক্ত কারণ সমূহ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একথা বলতে পারি যে, নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় ব্যবস্থা আরোপ করতে গিয়ে নানা জটিল সমস্যা সম্মুখীন হন। একদিকে স্বদেশের মধ্যবিত্তের সমর্থন হারায় এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় জনমত ও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় । যে অস্ত্র তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেন , তাতার সর্বনাশ হয়ে । অবশেষে মহাদেশীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতা দেখে নেপোলিয়ন ১৮১৩ সালে এ অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলেও এ ব্যবস্থা তাকে পতনের দিকে ত্বরান্বিত করে । 

নেপোলিয়নের পতন ( Downfall of Nepoleon  )

বিশ্ববরেণ্য বীর নেপোলিয়ন ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভাবান শাসক ও সমর বিজেতা। সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণ করে নিজ প্রচেষ্টায় তিনি সম্মান ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পোছেন । ফরাসি বিপ্লবের সন্তান রূপে রাজনৈতিক অঙ্গনে আর্বিভাব হয়ে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে অধিষ্ঠিত হন । জীবনের ৪০ টি রণক্ষেত্রে বিজয়ের গৌরব অর্জন , রাজ্য বিস্তার ও শাসন সংস্কার ইত্যাদির ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের পরিচয় দেন । উথান এর পর পতন নিয়তির পরিহাস থেকে তিনি রক্ষা পায়নি । তার অভ্যুত্থান যেমন বিষ্ময়কর তারপর পতন ও বড়ই করুন । 

নিম্মে নেপোলিয়নের পতনের কারণ গুলো আলোচনা করা হলো : – 

১) সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা : 

সীমাহীন উচ্চাভিলাষ ও অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস নেপোলিয়নের পতনের অন্যতম কারণ । কেবলমাত্র ফ্রান্সের সম্রাট হয়ে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি । তার ইচ্ছা ছিল সমগ্র ইউরোপ জয় করা । একের পর এক রাজ্য জয় করার ফলে তার সাম্রাজ্যবাদে আকাঙ্ক্ষা সীমা অতিক্রম করেছে । মানুষের ক্ষমতার যে একটা সীমা আছে তা তিনি ভুলে যান । তার উক্তি ছিল , “ অসম্ভব শব্দটি বোকাদের সংবিধানে থাকে । “ ( The word “ Impossible is found in the dictionary of the fool ) । এই উচ্চবিলাসী তার পতনের মূল কারণ । 

২) সাম্রাজ্যে দুর্বল ভিত্তি : 

নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি । ইউরোপের জনগণকে স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি নিজেই বিজিত রাজ্যসমূহের স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে । তিনি হল্যান্ড, নেপলস ,ওয়েস্টফেলিয়া ও স্পেনের সিংহাসনে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছিল । যা ছিল তার স্ববিরোধী এবং বিপ্লবী আদর্শের পরিপন্থী । ফলে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রতি জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না । সামরিক শক্তি দিয়ে জনগণকে বশীভূত করতে গিয়ে তিনি তাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ পরিণত হয়  অধিকন্তু তিনি বিজিত রাজ্যগুলোতে জোরপূর্বক সৈন্য ঘাঁটি স্থাপন , বলপূর্বক কর আদায় এবং কারু – কার্যখচিত শিল্পসামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি কাজে জনগণের ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে । 

৩) সাম্রাজ্যের বিশালতা : 

সামরিক শক্তির সাহায্যে নেপোলিয়ন ইউরোপে এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন বটে , কিন্তু তা স্থায়ী করার মতো কোনো সংগঠন দাঁড় করাতে পারেনি । তিনি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন বটে , কিন্তু ক্রমে কমে তার শিথিল হয়ে পড়ে ।

৪) একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা: 

নেপোলিয়ন নিজেকে বিপ্লবের সন্তান ( Child of the Revolution)  বলে দাবি করতেন।  অথচ বিপ্লবের মূলমন্ত্র অন্যতম স্বাধীনতাকে তিনি মেনে নেননি।  ফ্রান্স ও ইউরোপের জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হরণ করে তিনি একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন । এটা ছিল বিপ্লব বিরোধী । এজন্য তাকে বিপ্লবের বিনাশক ( Distroyer of the Revolution )  বলা হয় । নিজ দেশের মানুষের বিরোধিতার জন্য তিনি জনগণের শ্রদ্ধা হারান । 

৫) শূনীকরন : 

অব্যাহত যুদ্ধ-বিগ্রহে ফ্রান্সের বিশাল অর্থ ব্যয় করে তিনি রাজকোষ শুন্য করে ফেলেন । সেজন্য নতুন কর ধার্য করলে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয় । অন্যদিকে রণক্ষেত্রে অগণিত জনবল ফলে তার বিশাল ও নিপুণ সেনাবাহিনী ক্রমশ দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে পড়ে । এজন্য ঐতিহাসিক স্লোয়েন একে “ শূনীকরন “ ( Exhaustion )বলে অভিহিত করেছিলেন , যা ছিল তার পতনের অন্যতম কারণ । ( The causes of his decline may be summed be summed up in a single word Exhaustion – Sloyan ) । 

৬)মহাদেশীয় ব্যবস্থা : 

ইংল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করে তাকে প্রধানত করার জন্য নেপোলিয়ন মহাদেশীয় ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন । কিন্তু এরূপ অবাস্তব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকারী করার মত শক্তিশালী নৌবহর তার ছিল না । এতে করে হু হু করে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় । ব্যবসাড বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় । অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় । ফলে এ নীতি ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঘৃণা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে      । গুণে ও মানে ব্রিটিশ পণ্য ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ । এর কোনো বিকল্প ছিল না । ইউরোপে ব্রিটিশ বস্ত্র , জুতা, চা , কফি ও চিনি ইত্যাদির ব্যাপক চাহিদা ছিল । ফলে গোপনে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান হতে থাকে । নেপোলিয়ন বলপূর্বক তা বন্ধ করতে গেলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে । এতে ফ্রান্সের অপূরণীয় ক্ষতি হয় এবং নেপোলিয়ন পতনের পর ত্বরান্বিত হয় । 

৭) ভুল স্পেনীয় নীতি : 

বিশ্বাসঘাতকের ন্যায় স্পেন দখল করে এবং স্পেনের সিংহাসনে নিজ জোসেফ বোনাপার্ট কে অধিষ্ঠিত করে নেপোলিয়ন এক মহা ভুল করেন । এতে করেই স্পেনবাসীর সঙ্গে উপদ্বীপের যুদ্ধে ( peninsular war )  লিপ্ত হতে হয় । স্পেন বাসীর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উপর চরম আঘাত হেনে তিনি রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেন । সমগ্র স্পেনে ফ্রান্স বিরোধী জাতীয় আন্দোলন শুরু হয় । প্রদেশগুলো একের পর এক বিদ্রোহ ঘোষণা করে । এটা দমন করতে তিনি বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় এবং অগণিত লোক হারান । এ যুদ্ধের তার প্রায়  ৫ লক্ষ সৈন্য নিহত হয় । শত চেষ্টা করেও তিনি স্পেনের বিদ্রোহ দমন করতে পারেননি । অবশেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেন  “ স্পেনের ক্ষত এই আমার ধ্বংসসাধন করেছে “ ( The spanish ulcer ruined me ) । 

৮) জাতীয়তাবাদী আন্দোলন : 

স্পেনের যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় । তার ঢেউ স্প্রর্শিয়া, রাশিয়া এবং ইতালিতে আছর করে । রাশিয়ার জার আলেকজান্ডার প্রবল জনমতের চাপে এবং নানা কারণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে টিলসিটের সন্ধি থাকা সত্ত্বেও নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন । ১৮১২ সালে রাশিয়া ব্রিটেন ও সুইডেনের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে মহাদেশীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটান । নেপোলিয়নের শৃংখল থেকে জার্মানিকে মুক্ত করার জন্য স্প্রর্শিয়া ও রাশিয়ার সম্মিলিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু। প্রকৃতপক্ষে ইউরোপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মেষ নেপোলিয়নের পতনের অন্যতম কারণ। 

৯) ব্রিটিশ নেী-শক্তির প্রাধান্য : 

স্থল যুদ্ধে নেপোলিয়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বটে কিন্তু তার নেী-শক্তি ছিল খুবই দুর্বল । সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ প্রাধান্য থাকায় নেপোলিয়নের সকল পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। নীলনদের যুদ্ধে, ট্রাফালগারের যুদ্ধে ফরাসি নেী- শক্তি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় । পর্তুগালকে সাহায্য প্রদান , স্পেনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ , মহাদেশীয় ব্যবস্থা কে বানচাল করা ইত্যাদি কাজে ব্রিটিশ নেী-বহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । যে ইংলিশ চ্যানেলকে নেপোলিয়ন একটা ভিজা খাল বলে বিদ্রুপ করতেন, তা ব্রিটিশ শক্তির কারণে অতিক্রম করতে সাহস করেননি । 

১০) ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতা : 

পোপের সঙ্গে বিবাদ এবং ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ করে তিনি সকল ক্যাথলিক জনতাকে ক্ষেপিয়ে তোলেন । নেপোলিয়ন পোপকে মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে বললে এই বিষয়ে তার নিরপেক্ষ থাকার কথা জানান । এতে তিনি পোপের রাজ্য দখল করে তাকে বন্দী করা হয় । এতে দেশ বিদেশের ক্যাথলিক সম্প্রদায় তার বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে । উপরন্তু তার প্রথম স্ত্রী যোসেফাইনকে তালাক দিয়ে অস্ট্রীয় রাজকন্যা মেরি লুইকে বিয়ে করে তিনি ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন । যাইহোক রমান ক্যাথলিক রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন পেয়ে হয়তো তার পতন এত শীঘ্রই হতো না । 

১১) মস্কো অভিযানের ব্যর্থতা : 

১৮০৭ সালের টিলসিটের সন্দ্বীপে রাশিয়ার জার আলেকজান্ডারের নেপোলিয়নকে মহাদেশীয় ব্যবস্থা সফল করার প্রতিশ্রুতি দেন । কিন্তু রুশ জনগণের চাপে এবং রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হওয়ার কারণে জার মহাদেশীয় ব্যবস্থা সফল করতে অস্বীকার জানায় । ফলে রাশিয়া কে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য নেপোলিয়ন ১৮১২ সালে ৬ লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে রাশিয়া অভিযান করেন ।ন কিন্তু রাশিয়ার তীব্র তুষারঝড় , শীত , খাদ্যভাব , রূশদের গেরিলা আক্রমণের তার গ্রান্ড আর্মি ধ্বংস হয়ে যায় । নেপোলিয়ন মাত্র ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে কোনমতে ফ্রান্সে ফিরে আসতে সক্ষম হন । মস্কো অভিযানের ছিল নেপোলিয়নের ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক এবং এই অভিযানে তার ভাগ্য  লক্ষ্মীর সমাধি হয় । নেপোলিয়ন নিজেই স্বীকার করেন , “ সম্ভবত মস্কো  গিয়ে আমি মারাত্মক ভুল করেছি । আমার বেশি দিন সেখানে অবস্থান করা ঠিক হয়নি । 

১২) ইউরোপীয় রাষ্ট্র জোট : 

মস্কো অভিযানের ব্যর্থতা ইউরোপের অপরাপর রাষ্ট্রসমূহকে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে শক্তি সংঘ গঠন করতে উৎসাহিত করে। ব্রিটেন, রাশিয়া ,স্প্রর্শিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেনসহ প্রায় সকল বৃহৎ শক্তি অস্ত্র ধারণ করে তার সামরিক পরিকল্পনা বানচাল করে । ১৮১৩ সালে লিপজিগের যুদ্ধে তিনি মিত্রশক্তির নিকট পরাজিত হলে ইউরোপের সর্বত্র তার বিরুদ্ধে জাতীয় জাগরণের উদ্ভব হয় । নেপোলিয়নের পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ হয় । ১৮১৪ সালে প্যারিস নগরীর পতন হলে তাকে এলবা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয় । সেখান থেকে ফিরে এসে ১৮১৫ সালে ওয়াটারলু  রণক্ষেত্রে মিত্রশক্তি তাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠায় । ওয়াটারলুর  যুদ্ধে পরাজিত হলে তার ভাগ্য রবি চিরতরে অস্তমিত হয় । 

এছাড়া শেষ দিকে তার মানসিক ভারসাম্য কমতে থাকে । এজন্য সাংগঠনিক ক্ষমতা ,রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ,কূটনৈতিক জ্ঞান, সামরিক কৌশল নির্ধারণের তিনি ক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেননি । শেষদিকে বিভিন্ন জাতির লোক নিয়ে সেনাবাহিনী গঠনের ফলে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ গড়ে উঠেনি । আবার দীর্ঘকাল যুদ্ধ করতে করতে পলাশী জাতির শাস্তির জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে । 

উপরে উল্লেখিত কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মহামতি নেপোলিয়নের পতন ঘটে । ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি সাফল্যের উচ্চ শিখরে আহরণ করেন । আবার নিয়তির নির্মম পরিহাসে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ইউরোপের রাজনীতি থেকে বিদায় গ্রহণ করেন । আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত জীবন কাটান । সেখানে  ৬ বৎসর অতিবাহিত করে তিনি ১৮২১ সালের ৫ মে রোজ শনিবার বিকাল ৫টা ৪৯ মিনিটে ৪৮ সেকেন্ডে মৃত্যুবরণ করেন । তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে , নেপোলিয়ন শুধু বিশ্ববিজেতা হিসেবে নয় , বরং শাসন সংস্কার ও শাসন কাজের জন্য সর্বকালের সকল মানুষের নিকট স্মরণীয় হয়ে থাকবেন । 

বিপ্লবের সন্তান ও বিপ্লবের ধ্বংসকারী ( Child of the Revolution and Destroyer of the Revolution )

বিশ্ববরেণ্য বীর ও  ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর কার্যাবলী গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে , তিনি একদিকে যেমন বিপ্লবের সন্তান , অন্যদিকে আবার বিপ্লবের ধ্বংসকারী । তার বিপরীতমুখী কর্মকান্ডের সাক্ষ্য তিনি নিজেই দিয়েছেন । তিনি নিজেই বলেন  “ I am the Revolution and I destroyed the Revolution । ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্র সাম্য, মৈত্রী , মোতাবেক তিনি যে সংস্কার কার্যকরী পরিচালনা করে দেশবরেণ্য হয়েছেন তাতে তাকে বিপ্লবের সন্তান বলে মনে করা হয় । আবার তিনি রাজকীয় সাম্রাজ্যের স্থাপন করে যে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তাতে ফরাসি বিপ্লবের অপর আদর্শ স্বাধীনতা হরণকারী হিসাবে তাকে বিপ্লবী বিরোধী বলে মনে করা হয় । নিম্নে সংক্ষেপে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হল : – 

বিপ্লবের সন্তান হিসাবে : 

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শ ছিল তিনটি যথা : সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতা । নেপোলিয়ন স্বাধীনতার আদর্শ বিসর্জন দিয়ে অপর দুটি আদর্শ গ্রহণ করেন । তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে , স্বাধীনতার পরিবর্তে সাম্যই ছিল ফরাসি জনগণের একমাত্র লক্ষ্য ।তিনি সাম্য মৈত্রী ও আদর্শের উপর ভিত্তি করে অনেকগুলো সংস্কার সাধন করেন। যেমন: – 

১) তিনি বিপ্লবী সরকারের সামন্ত প্রথা বিলোপ, ভূমি ব্যবস্থা, অভিজাত ও যাজক শ্রেণীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিলোপ , সকলের উপর করের বোঝা সমানভাবে আরোপ করে তা বহাল রাখেন । 

২) Code Nepoleon দ্বারা আইনের চোখে সবাই সমান এবং সকল সুযোগ সুবিধা লাভের সমান অধিকার স্থাপন করা হয় । 

৩) বংশগত নয় , যোগ্যতার ভিত্তিতে ( Career open to talents )  সরকারি চাকরি পাবার অধিকার দেওয়া হয় । 

4) Concordat দ্বারা তিনি গির্জার সম্পত্তির জাতীয়করণে স্বীকৃতি দেয় । 

5) The civil code দ্বারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক এর মর্যাদা লাভ করে তিনি ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শ গুলো সংরক্ষিত করেন । The Code Nepoleon এর মাধ্যমে তিনি নাগরিক সাম্য , ধর্মীয় সহিংসতা , বন্ধন মুক্ত ভূমি , প্রকাশ্য বিচার , জুরি প্রথা সংরক্ষণ করে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ব্যবহার উপযোগী ও বিধিবদ্ধ আইন কানুন প্রণয়ন করে দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান আখ্যা ভূষিত হন । 

৬) তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ফ্রান্সের সাম্রাজ্যভুক্ত করে ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা প্রচার ও প্রসার করেন । তিনি বিজিত অঞ্চলের সর্বত্র সামন্তপ্রথা ও ভূমিদাস প্রথা বিলুপ্ত ঘটান এবং সমাজ জীবনের সাম্যনীতি প্রয়োগ করেন । এক্ষেত্রে ইতালি ও জার্মানির তার নিকট চির ঋণী । 

তাই নেপোলিয়ন রাজকীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে তার কোন মৌলিক বিরোধ ছিল না। তিনি বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার শাসনকার্য পরিচালনা করছেন। এ সকল দিক চিন্তা করলে তাকে বিপ্লবের সন্তান Child of the Revolution  বলা সমর্থন করা যায়।  

বিপ্লব বিরোধী / বিপ্লব ধ্বংসকারী : 

বিপ্লব বিরোধী কর্মকাণ্ড : 

নেপোলিয়ন ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ বিরোধী কতগুলো কাজকর্ম করেন , যার জন্য তিনি বিপ্লবী  বিরোধী আখ্যা পান । যেমন : – 

১) ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অবসান : 

নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লব প্রসূত প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রবর্তন করেন । জনগণ ভোটাধিকার এর মাধ্যমে স্বাধীন রাজনৈতিক জীবন কামনা করেছিল । কিন্তু তিনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা শঙ্কিত দিয়ে স্বেচ্ছাচারী একনায়কতন্ত্র পুন: প্রতিষ্ঠা করেন , যা ছিল বিপ্লব বিরোধী । 

২) রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিরোধী : 

ফরাসি বিপ্লবের তিন  আদর্শের ( সাম্য , মৈত্রী ও স্বাধীনতা ) এর মধ্যে অন্যতম ছিল স্বাধীনতা । কিন্তু নেপোলিয়ন ছিলেন স্বাধীনতার বিরোধী । তিনি বলেন , “ What the nation wants is not liberty but equality . । তাই তিনি জনগণের বাকস্বাধীনতা ও ছাপাখানার স্বাধীনতা খর্ব করেন। অথচফরাসি জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ,বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা । 

৩) দমন-পীড়ন : 

বিপ্লব প্রসূত দ্রুত পরিবর্তনের ফলে জনগণের মধ্যে যে বিশৃংখলা ও অরাজকতার উদ্ভব হয়েছিল তা দমন করার উদ্দেশ্যে তিনি স্বেচ্ছাচারী নীতি গ্রহণ করে প্যারিসের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন । সন্ত্রাসের রাজত্বকালে প্যারিসের জনতা যে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছে তা তাকে আতঙ্কিত করে তোলে । এজন্য সে জনগণ বিপ্লবকে চরম সীমায় পৌঁছে দেয় , সে  জনগণের প্রতি তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়েও উঠেন । 

৪) শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা : 

নেপোলিয়ন প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন এর সকল ক্ষমতা বিলোপ করে কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালী করেন । এভাবে নেপোলিয়নের শাসনামলে ফ্রান্স  যেন ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে অবস্থা ফিরে যায় । এসব দিক বিবেচনা করলে তাকে বিপ্লবের ধ্বংসকারী ( Destroyer of the Revolution )  বলা হয় । 

উপযুক্ত পর্যালোচনা পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে , নেপোলিয়নকে বিপ্লব বিরোধী বা বিপ্লব ধ্বংসকারী বলাটা কঠিন । তিনি বিপ্লবের আদর্শকে ফ্রান্সে এবং ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমুন্নত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি রাজকীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে তার কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না। তার এই প্রভাবে ইউরোপের আর্থসামাজিক ও আইনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়। জনগণ নতুন পথের সন্ধান পায়। অবশ্যই নেপোলিয়ন নিঃস্বার্থ ও প্রতিপত্তি কে কোন অবস্থাতেই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই ঐতিহাসিক পি . গোডেলারের সঙ্গে একমত হয়ে বলা যায় যে, নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য বিপ্লবীরা আদর্শের প্রতিবন্ধক ছিল না বরং প্রতিমূর্তিই  ছিল ( The Empire of Nepoleon was not an interruption but an extension ot the Revolution ) । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 6 =