ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯

ফরাসি বিপ্লব ( The French Revolution  )

বিপ্লব বলতে বুঝায় রাতারাতি পরিবর্তন বা  ( Over night change ) আমূল পরিবর্তন ।সেদিক দিয়ে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ইউরোপ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা । সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ( Equality , Fraternity and Liberty )  আদর্শে অনুপ্রাণিত এই বিপ্লব ইউরোপের পুরাতন সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেয় এবং এক নতুন যুগের সূচনা করে । এ বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা , জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ , ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং আইনের চোখে সবাই সমান অধিকারের ধারণা । পরবর্তীকালে এ বিপ্লবের প্রভাব ইউরোপে এবং আরো পরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে । তাই স্বাভাবিকভাবেই এই বিপ্লবের কারণ ও  অর্জন আমাদের জানা একান্ত প্রয়োজন । বিপ্লবের কারণ গুলো নিহিত ছিল প্রাক-বিপ্লব অর্থাৎ বিপ্লব পূর্ববর্তী শাসনামলের ( Old Regime ) রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং বুদ্ধিজীবীদের লেখনীর মধ্যে । 

রাজনৈতিক কারণ ( Political Causes  )

১) স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র : 

স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র ছিল ফ্রান্সের বিপ্লব পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য । রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ । যথা: ক) নির্বাহী বিভাগ , খ) বিচার বিভাগ ও গ) আইন বিভাগ । রাজার এর তিন বিভাগের শুধু প্রদানেই নয় বরং সর্বময় কর্তা ছিলেন । রাজা একাধারে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের প্রধান এবং একমাত্র আইন প্রণেতা । নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি মন্ত্রী , দূত , প্রাদেশিক শাসনকর্তা উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দান করতেন । এসব কর্মকর্তারা চাকরি রাজার সন্তুষ্টির উপর নির্ভর করত । যুদ্ধ, চুক্তিসহ পররাষ্ট্রনীতির সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে ছিল । তিনি বিচার বিভাগের প্রধান হিসাবে বিচারকদের নিয়োগ , যেকোনো বিচার কার্য পরিচালনা করা বা বিচারকের রায় পরিবর্তন করতে পারতেন । অনুরূপভাবে তিনিই ছিলেন একমাত্র আইনপ্রণেতা । দেশে কার্যকর কোন পার্লামেন্ট ছিল না । তাই তিনি নিজের ইচ্ছামত রাজস্ব নির্ধারণ বা কর ধার্য  করতেন এবং ইচ্ছামতো তা খরচ করতেন । রাজতন্ত্রের সে যুগে রাজা মানে রাষ্ট্র । রাষ্ট্র মানে রাজা । অন্য কিছু নয় । ফ্রান্সের বুরবোঁ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা চতুর্দশ লুই ঘোষণা করেন ,” State? I am the State” অর্থাৎ রাষ্ট্র ? আমিই রাষ্ট্র ।অনুরূপভাবে রাজা ষোড়শ লুই ঘোষণা করেন ,” Law ? What I do is a law . “ অর্থাৎ , আইন ? আমি যা করি তাই আইন । ষোড়শ লুই তার আত্মজীবনীতে লেখেন ,” Kings are absolute masters and as such have a natural right to dispose of everything belonging to their subjects, “ অর্থাৎ , রাজা হচ্ছেন সর্বময় প্রভু যেন প্রজাদের সবকিছুর উপর কর্তৃত্ব করার প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে ।

2) জনগণের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অভাব : 

রাজা সর্বক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন । এজন্য রাজা কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন না । কেননা তিনি সৃষ্টিকর্তা থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতা  ( Divine Right of Monarchy ) বিশ্বাস করতেন । তখনকার রাজাদের দাবি ছিল , “ A king is accountable for his conduct only to God .” এই অবস্থা স্বাভাবিকভাবে জনগণের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে না । রাজার সমালোচনা করার বা রাজনৈতিক দল গঠনের কোন অধিকার ছিল না । কেউ রাজ শাসনের সমালোচনা করলে লেত্রি দ্য কেশে ( Letters da cachet ) নামক গুপ্ত পরোয়ানা জারি করে তাকে গ্রেফতার করা হতো এবং বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য তাকে সাধারণত  বাস্তিলের জেলখানায়(  যা এক সময় দুর্গ ছিল ) আটক রাখা হতো । এজন্য বাস্তিল জেলখানা বা দুর্গ কে দেশবাসীর স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বলে বিবেচনা করত । স্টেট জেনারেল ( States General ) নামে দেশে একটি প্রতিনিধি সভা ছিল । কিন্তু ১৬১৪ সালের পর এর কোন অধিবেশন ডাকা হয়নি । ঐতিহাসিক শেভিল যথার্থই মন্তব্য করেছেন  “ স্টেট জেনারেল অধিবেশন বন্ধ থাকার ফলে সাধারণ মানুষের অসুবিধা এবং অভিযোগের কথা রাজার নিকট যেত না  । রাজার পক্ষে ও দেশের সাধারণ প্রজার অবস্থার কথা জানা সম্ভব হতো না । এর ফলে বুরবোঁ রাজতন্ত্র বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুই প্রজাহিতৈষী স্বৈরতন্ত্র ( Benevolent Despotism ) বা জ্ঞান দীপ্ত স্বৈরতন্ত্র ( Enlightened Despotism )  মতবাদ গ্রহণ করেননি । 

রাজতন্ত্রের এরূপ সর্বাত্মক ক্ষমতায় সদ্ব্যবহার পঞ্চদশ লুই বা ষোড়শ লুই  কেউ করতে পারেনি । চতুর্দশ লুই স্বৈরাচারী ছিলেন বটে । কিন্তু তার বিরুদ্ধে জনগণের কোনো অভিযোগ ছিল না । তার একমাত্র উদ্দেশ্য জনকল্যাণ এবং দেশের গৌরব অর্জন করা । অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সাফল্য ফরাসি জাতি ছিল তার প্রতি কৃতজ্ঞ । কিন্তু চতুর্দশ লুই এর উত্তরাধিকারীগণ ছিলেন দুর্বল , আরামপ্রিয় , ভোগবিলাসী এবং অকর্মণ্য । ষোড়শ লুই তার পত্নী মেরি এ্যান্টোনেট / মারিয়া আঁতোয়ানেত ( Marie Antoinette ) এবং উপপত্নী ম্যাডাম প্যাম্পাডার ( Madame Pampadore ) এর হাতের ক্রিড়ানক  (Puppet ) ছিলেন । দেশ শাসনে তার পত্নী , উপপত্নী ও স্বার্থান্বেষী মহল অহরহ হস্তক্ষেপ করত ।  রাজা দেশের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন । রাজতন্ত্রের যেন একটা অত্যাচার ও উৎপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হয় । 

৪) বিশৃংখল শাসন ব্যবস্থা : 

কার্ডিনাল  রিশল্যুর আমল থেকে প্রদেশের শাসনভার ছিল ইনটেনডেন্ট নামক কর্মচারীদের হাতে । রাজার প্রতিনিধি হিসেবে তাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু বাস্তবের সর্বক্ষেত্রে তার ছিল না । কোন কোন ক্ষেত্রে প্রদেশের সামন্ত প্রভুরা কিছু ক্ষমতা ভোগ করত । আবার কোন কোন শহর এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো । দেশের সর্বত্র এক ধরনের মুদ্রা ব্যবস্থা , ওজন প্রণালী ও  কর ব্যবস্থা প্রচলন ছিল না । একেক প্রদেশে একেক রকম ছিল । কোন কোন ক্ষেত্রে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে পণ্য পরিবহনের শুল্ক প্রদান করতে হতো । 

৫) বিশৃংখল আইন ও বিচার ব্যবস্থা : 

দেশের সর্বত্র এক ধরনের আইন প্রচলিত ছিল না । বিপ্লবের অব্যবহৃত আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ( ৪০ টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে ) 4 শতকেরও বেশি আইন প্রচলিত ছিল । এক অঞ্চলের যা আইনি কিন্তু অন্য অঞ্চলে তা বেআইনি ছিল । বিচারকার্যে অনুরূপ অবস্থা ছিল । রাজা ছিলেন বিচার বিভাগের প্রধান এবং দেশের সর্বত্র রাজকীয় আদালত সর্বসেরা হওয়ার কথা ছিল , কিন্তু বাস্তব অবস্থা ছিল ভিন্ন । দেশের কোথাও ছিল রাজকীয় আদালত, কোথায় ছিল সামন্ত আদালত, আবার কোথায় ছিল গিজার পরিচালিত আদালত । ফলে অনেক সময় এ গুলোর মধ্যে বিভেদ দেখা দিত । 

৬) দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ : 

রাজ শক্তির দুর্বলতার সুযোগে দেশের কর্মচারীরা এবং বিচারকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে । কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ দেশের সর্বত্র কার্যকর হতো না । অভিজাত শ্রেণী আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে । ইনটেনডেন্ট দের সাহায্য তারা প্রদেশের শাসনের নামে শোষণ করত । এরা প্রাদেশিক রাজস্ব আদায়কারী নেকড়ে বাঘের পরিণত হয়েছিল। এরা অনেক বাড়তি কর আদায় করত এবং আদায়কৃত করের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মসাৎ করত। এছাড়া অন্যান্য শ্রেণীর আমলারাও ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অযোগ্য। বিচারকার্যে ও ছিল চরম অরাজকতা। বিচার যেমন ছিল সাপেক্ষ, তেমনি ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত । ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন বিবেচনা না করে অনেক ক্ষেত্রে বিচারকগণ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলেন । অনেক ক্ষেত্রে বিচারকরা জরিমানা ধার্য করে নিজেদের আয়ের  পথ প্রশস্ত করতেন । প্রকৃতপক্ষে দেশ শাসনের নামে কুশাসন এবং বিচারের নামে অবিচার চলছিল । 

৭) রাজপ্রাসাদের বিলাস -ব্যসন : 

ভার্সাই রাজ প্রসাদ ছিল জাঁকজমকপূর্ণ এবং বিলাসব্যসন ভরপুর । ভার্সাই রাজ প্রসাদের কর্মচারীর সংখ্যা ছিল  ১৮,০০০। এরমধ্যে ১৬,০০০ কর্মচারী রাজা ও রানীর সেবায় নিয়োজিত ছিল । রানীর ব্যক্তিগত কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ৫০০ । রানী নিত্যনতুন সভা ও পোশাকের জন্য অগণিত অর্থ খরচ করত । সভাসদদের মাঝে বিভিন্ন উপলক্ষে কোটি কোটি টাকা বিতরণ করা হতো । রাজার একটি টেবিলের মূল্য ছিল ৭৫ লাখ টাকা বা (লিভর ) । 

৮) বিদেশ নীতিতে ব্যর্থতা : 

পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুই তাদের অদূরদর্শী বিদেশনীতি দ্বারা ফরাসি জাতির মর্যাদাহানি করেন । অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ এবং সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্স  লিপ্ত ছিল । এ দুটো যুদ্ধে ফ্রান্স শোচনীয়  ভাবে পরাজিত হয় । এতে ফ্রান্সয়ের প্রচুর অর্থ বল ও জনবলের অপচয় ঘটে । এ দুটো যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ভারত ও কানাডা থেকে ফরাসিরা নিজেদের আধিপত্য রক্ষা করতে সক্ষম হয় না  এবং সেখানে ব্রিটিশরা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয় । সমুদ্রপথে ও ফ্রান্স কার নিজেদের প্রাধান্য হারায় । আবার আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে ষোড়শ লুই ১০০ কোটি লিভর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফ্রান্সকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে দেয়।  বিদেশনীতিতে সরকারের ব্যর্থতা জনগণের নিকট বুরবোঁ  রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুন্ন হয় । 

অতএব বলা যায় যে , রাজার দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণে রাজ্যের কর্মকর্তা-কর্মচারী ,অভিজাত ,বিচারক , শাসনযন্ত্রের প্রায় সকলেই স্বৈরাচারী অত্যাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারীরাজতন্ত্রের সকল দোষ-ত্রুটি প্রকট হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে রাজতন্ত্র জাতিকে শাসন করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলে । 

আর্থসামাজিক পটভূমি (Social Causes ) : 

মানুষে মানুষে সামাজিক বিভাজন : 

বিপ্লব পূর্ববর্তী ফ্রান্সের সমাজ ব্যবস্থা দুইভাবে বিভক্ত ছিল । যথা : ক) সুবিধাভোগী শ্রেণী ( Privileged Class ) এবং খ)  সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি ( Unprivileged Class ) । সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর মধ্যে ছিল যাজক , অভিজাত সম্প্রদায় । যাজকরা প্রথম সম্প্রদায় , এবং অভিযাত্রা’ দ্বিতীয় সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত ছিল । বাদবাকি লোকজন ছিল তৃতীয় সম্প্রদায় । এদের মধ্যে ছিল বুর্জোয়া , বা শহরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর , নিম্নবিত্ত শ্রেণি , শ্রমিক ,শিল্পী, কারিগর, কৃষক, ক্ষেতমজুর, বর্গাদার ,শহরে ভাসমান জনতা বা সাঁকুলোৎ  ইত্যাদি । 

২) যাজকদের সুযোগ-সুবিধা : 

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যাজকদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার । দেশের মোট ভূসম্পত্তি শতকরা 20 ভাগের মালিকানা ছিল গির্জা বা যাদের হাতে । অথচ তারা কোন ভূমি কর বা তেই ( Taille )  দিত না । অন্যান্য কর থেকেও তারা সম্পূর্ণ বা আংশিক রেহাই পেত । অপরদিকে গির্জা বা যাজক শ্রেণি কৃষকদের কাছ থেকে তাদের উৎপন্ন ফসলের এক দশমাংশ টাইদ (Tithe )  বা ধর্ম কর হিসেবে আদায় করত । এছাড়া তারা কৃষকদের কাছ থেকে মৃত্যু কর ও নামকরণ কর  আদায়ের অধিকার পেয়েছিল । এভাবে যাজক সম্প্রদায় একটি বিত্তশালী গোষ্ঠীতে পরিণত হয় । ফরাসি অর্থমন্ত্রী নেকারের  হিসেব মতে ফ্রান্সের গির্জাগুলোর বার্ষিক আয় ছিল ১৩ কোটি লিভর । 

৩) যাজকদের শ্রেণিভেদ : 

যাজক গোষ্ঠী দু’ভাগে বিভক্ত ছিল । যথা : ক) উচ্চ যাজক( Upper Clergy )  এবং খ)  নিম্ন বা অধ:স্তন যাজক ( Lower Clergy ) । কার্ডিনাল , আর্চবিশপ , বিশপ , এবাট এবং পোপ এরা ছিল ঊর্ধ্বতন বা উচ্চশ্রেণীর যাজক । রাজা স্বয়ং অভিজাতদের মধ্য থেকে উচ্চশ্রেণীর যাজকদের নিযুক্ত করতেন এবং এরা বংশ পরস্পরায় এ সকল পদমর্যাদা ভোগ করতেন । কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন উদাসীন । ভার্সাই নগরীতে তাঁরা জাঁকজমক ও আমোদ-প্রমোদে মগ্ন থাকতেন । তারা বেবোত্তর সম্পত্তি ও গিজার অন্যান্য আয় থেকে মোটা অংকের বৃত্তি করতে নেই । গ্রামের পাদরিরা ছিল নিম্নস্তরের যাজক । এদের আর্থিক অবস্থা ছিল করুন । এরা ছিল দরিদ্র ও নিপীড়িত । এরা স্বার্থের সকল দায়িত্ব পালন করতেন । কিন্তু এদের বেতন ছিল যৎসামান্য । ফলে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়  এবং শেষ পর্যন্ত নিম্ন শ্রেণীর যাজকরা বিপ্লবের পক্ষে যোগদান করে । 

৪) অভিজাতদের শ্রেণীভেদ :

অভিজাতরা  ছিল সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ । আঠারো শতকের শেষ দিকে অভিজাতরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল । রাজার সভাসদ, সেনাপতি, বিচার বিভাগের উচ্চ পদের অধিকারী এবং ইনটেনডেন্ট এরা ছিল উচ্চস্তরের অভিজাত গোষ্ঠী । অভিজাতদের আরেকটি অংশ ছিল গ্রাম্য অভিজাত । এরা গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করত । এ দুইটি গুষ্টির অভিজাতরা   অসিধারী অভিজাত ( Nobility of the Sword ) নামে পরিচিত ছিল । এরা ছিল বনেদি বা নীল রক্তবান অভিজাত । এছাড়া কয়েকটি অভিজাত গোষ্ঠী ছিল যাদের রক্ত নীল ছিল না । এরা ছিল চাকরিজীবী অভিজাত বা পোশাকি অভিজাত ( Nobility of the Robe ) । এরা প্রশাসক আইনবিদ ও বিচারকের কাজ করতেন । 

৫) অভিজাতদের সুযোগ সুবিধা : 

সামন্তযুগে অভিজাতগন নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের বিনিময় বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন । কিন্তু শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েও,  তারা পূর্বের ন্যায় সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে থাকেন । এরা বংশ কেীলিণ্যের জোরে সকল সামরিক-বেসামরিক পদগুলোতে নিয়োগ পেতেন এবং মর্যাদা ভোগ করতেন । সাধারণ লোকের জন্য এ পদগুলো লাভের  কোন উপায় ছিলনা । অভিজাত দেশ সংখ্যা ছিল প্রায়  ৩ লক্ষ ৫০ হাজার । অথচ তারা দেশের কৃষি জমির শতকরা ২০ ভাগের মালিক ছিল। তারা ভূমি কর প্রদান করতে রাজি হতো না বা করত না। এছাড়া তারা আয় কর এবং বাণিজ্য কর আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে যেত । তারা রাজার সভাসদ হিসাবে ভাতা , পুরস্কার , পেনশন পেত । অষ্টাদশ শতকে অভিজাত্যের আর্থিক অবক্ষয় ঘটলে তারা কৃষকদের উপর নির্যাতন , অত্যাচার বাড়িয়ে দেয় । একটি মধ্যবিত্ত ও কৃষক সমাজ বিক্ষুব্ধ হতে থাকে এবং ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে । 

৬) সুবিধাবঞ্চিত তৃতীয় সম্প্রদায় : 

যাজক ও অভিজাত ব্যতীত ফ্রান্সের আর সবাই ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত। আঠারো শতকের শেষের দিকে ফ্রান্সের জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি । এদের শতকরা  ৯৮ ভাগ দিল তৃতীয় সম্প্রদায়ের অর্থাৎ সুবিধাবঞ্চিত ও অধিকার বিহীন । তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত । যথা : 

ক) বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেনী , 

খ) কৃষক শ্রেণী এবং 

গ) শ্রম শিল্পী বা শহরের শ্রমিক । 

ক) বুর্জোয়া শ্রেণি : 

তৃতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা উচ্চস্তরের তারাই ছিল বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর । অধ্যাপক শিক্ষক চিকিৎসক আইনজীবী বিচারক বণিক ব্যাংকার শিল্প উৎপাদন শিল্পে সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ।এরা অনেকেই ছিল যাজক ও অভিজাতদের তুলনায় অনেক বেশি জ্ঞান-গরিমা, শিক্ষা-দিক্ষা , ধন-সম্পদ দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে সমৃদ্ধ । এস শ্রেণি লক্ষ্য করে যে , দেশের সম্পদ সৃষ্টিতে যাজক ও অভিজাতদের   তেমন কোনো অবদান নেই । অথচ তারা বংশানুক্রমিকভাবে অর্থনৈতিক সুযোগ -সুবিধা রাজনৈতিক অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা ভোগ করছে । ফরাসি দার্শনিকদের গুরদ্বারা লেখনীর মধ্যবিত্ত শ্রেনীকে অনুপ্রাণিত করে । তারা বুঝতে পারে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা বৈষম্যপূর্ণ । সুতরাং এর সমাস ভাঙতে হবে । এমন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে , যেখানে বংশগত নয় যোগ্যতাই হবে মর্যাদা ও অধিকারের মাপকাঠি। এজন্য ফরাসি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয় এ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। ঐতিহাসিক রাইকার যথার্থই বলেছেন , “ The French Revolution was an out come of a struggle between classes of a movement for social equality by the bourgeoisie .” অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব বুর্জোয়া সম্প্রদায়ের সাম্য আদায়ের আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে । এমনকি সম্রাট নেপোলিয়ন বলতেন , “ What made the Revolution? Vanity , liberty was the only Excuse .” । 

খ) কৃষক সমাজ : 

কৃষকদের মধ্যে নানা ভাগ ছিল । যেমন :- স্বাধীন কৃষক ,প্রজা ,বর্গাদার ,ক্ষেতমজুর ,ভূমি দাস। স্বাধীন কৃষক মানে যারা নিজস্ব মালিকানাধীন জমি চাষ করত । এদের সংখ্যা ছিল খুবই কম । প্রজা হলো তারা , যারা খাজনা দিয়ে অন্যের জমি চাষ করত । ভূমি দাসদেরকে ও সপ্তাহের কয়েকদিন বিনা পারিশ্রমিকে   সামন্ত প্রভুদের জন্য কাজ করতে হতো  অর্থাৎ বেকার কাটানো হতো । সত্যিকার অর্থে কৃষকদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয় । তাদেরকে জমিদারদেরকে সামন্ত, চার্চকে  এক-দশমাংশ ধর্ম কর , রাজাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সর্বপ্রকার দিতে হতো। এসব কর প্রদানের ফলে কৃষকরা প্রায় অনাহারে দিন যাপন করত । এছাড়া কৃষকদের শ্রম কর দিতে হতো । কৃষকরা ফসল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জমিতে বেড়া দিতে পারত না । কারণ সামন্তপ্রভুর  শিকারিদের চলাচলের অসুবিধা হতে পারে এ কারণে । আবার কোন কৃষকদের উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা লাভ করতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি জমিদারকে দিতে হতো । জমি বিক্রি করলেও জমির মূল্যের একটি অংশ সামন্ত প্রভুকে দিতে হতো । মোটকথা , মানুষ হিসেবে তাদের কোন অধিকার ছিল না । ফলে কৃষক সমাজ বিপ্লব মুখী হয়ে ওঠে । 

গ) শহরের শ্রমজীবী মানুষ : 

শ্রমজীবী বলতে কারখানায় শ্রমিক,কসাই ,বাবুর্চি ,ধোপা , নাপি,ত কামার-কুমার ,স্বর্ণকার, রাজ মেস্তরি ,দোকানদার,তালি ,কুলি-মজুর, মুচি ,ইত্যাদিকে বুঝায় । এরা সাঁকুলাৎ বা সাঁকুলোৎ নামে পরিচিত ছিল । এরা অনেক সময় বিনা পারিশ্রমিকে এ কাজ করতে বাধ্য হতো । আবার অনেক সময় বেকার খাটানো হতো । ১৮ শতকের শেষার্ধে যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কিন্তু মজুরির হার বৃদ্ধি পায়নি । তখন শ্রমজীবি মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । ১৭৮৮ সালে  শস্য হানি ঘটলে খাদ্যদ্রব্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায় । গ্রামের নিরন্ন মানুষ খাদ্য ও কাজের আশা শহরে চলে আসে । ফলে স্যাঁকুলোতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । এ সাঁকুলোৎ বা ভাসমান মানুষের অভাব অভিযোগ এই ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ । এরাই প্রকৃত পক্ষে বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায় । 

২) অর্থনৈতিক কারণ ( Economic Causes ): 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য , অনাচার ,দুর্নীতি , অমিতব্যয়িতা , ঋণগ্রস্তরাই  ছিল ফরাসি বিপ্লবের মূল কারণ । 

ক) বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা : 

বিপ্লব পূর্ববর্তী যুগে ফ্রান্স ছিল একটি কৃষি প্রধান দেশ । আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান তখনো গড়ে উঠেনি । ফলে দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী ছিল কৃষিজীবী । আর কৃষকদের নিকট থেকে আদায় করা হতো ধার্যকৃত প্রায় সকল কর । কর ব্যবস্থাও ছিল বৈষম্যমূলক । এ সময় ফ্রান্সের তিন ধরনের প্রত্যক্ষ কর আদায় করা হতো । যথা : ক) তেই ( Taille )বা ভূমি কর , খ) কাঁপিতাশিঁয়( Capitaion )  গ) উৎপাদন কর এবং ভ্যাঁতিয়াঁমি ( Vingtiemes )  বা স্থাবর , অস্থাবর সম্পত্তির কর । যাজক ও অভিজাত শ্রেণীকে এসব প্রত্যক্ষ কর থেকে রেহাই দেওয়া হতো , কর দিলেও দিতে যৎসামান্য । ধার্যকৃত এসব কর কৃষকদের পরিশোধ করতে হতো । তখন ফ্রান্সে একটি প্রবাদ প্রচলিত হয়ে যায়  “ The nobles fight, the clergy pray and the people pay . “ অর্থাৎ অভিজাত শ্রেণী যুদ্ধ করে , পুরহিত শ্রেণীর ধর্ম কর করে,  আর জনগণ কর প্রদান করে । নিম্নে বিভিন্ন শ্রেনীর শ্রেণীর বার্ষিক প্রদেয় করের একটি হিসাব দেওয়া হল : 

যাজক সম্প্রদায় – ৭,৬২৮ লিভর ( ফরাসি ফাউন্ড ) 

অভিজাত সম্প্রদায় – ৩৯৬ লিভর 

রাজকর্মচারীবৃন্দ – ২৩৮ লিভর 

তৃতীয় সম্প্রদায় – ১,৮৯,৬১৫ লিভর 

অর্থাৎ মোট করে শতকরা ৯৬ ভাগ প্রধান করে তৃতীয় সম্প্রদায় তথা কৃষক সম্প্রদায় । প্রত্যক্ষ করের পাশাপাশি পরোক্ষ কর আদায় করা হতো । যেমন : গাবেল ( Gabelle ) বা লবণ কর । এদ ( Aide ) বা ভোগ্য পণ্যের উপর কর , কর্ভি বা শ্রম কর উল্লেখযোগ্য । সরকার নিজে লবণ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত এবং মাথাপিছু বার্ষিক ৭  পাউন্ড লবন ক্রয়  করতে বাধ্য করতো । এছাড়া কৃষকদের তাদের আয়ের বা উৎপাদন ফসলের এক-দশমাংশ ধর্ম কর  হিসেবে গির্জাকে প্রদান করতে হতো । এভাবেকর ভারের  জর্জরিত কৃষকরা ছিল দিশেহারা । কৃষকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে , কারলাইল বলেন , ফ্রান্সের কৃষকদের এক-তৃতীয়াংশ বছরের এক তৃতীয়াংশ সময় আলু খেয়ে  কোনমতে বেঁচে থাকতো । 

খ) করের ভুল আদায় : 

একদিকে ছিল কর ধার্য্য  বৈষম্য। অন্যদিকে কর আদায়ের পদ্ধতি ও ছিল ত্রুটিপূর্ণ । এককালীন করের অর্থ পাবার জন্য সরকার ভূমি অধ্যক্ষদের ( Farmer General ) কাছে কর আদায়ের ক্ষমতা বা দায়িত্ব বিক্রি করতো । ভূমি অধ্যক্ষগণ প্রাদেশিক  সংগ্রাহকদের কাছে কর আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করত । কর আদায়ের কোন সুষ্ঠ পদ্ধতি ছিল না । ফলে আদায় কারীগণ সরকার কর্তৃক ধার্যকৃত অর্থের অতিরক্ত অর্থ প্রজাবর্গের নিকট থেকে আদায় করত ।বণিকদের উপর অত্যাচার করত । সরকারের পাওনা তছরুপ করত । এজন্য এডাম স্মিথ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনিয়ম লক্ষ করে ফ্রান্সকে অর্থনৈতিক ভুলের জাদুঘর (A Museum of economic errors )   বলে মন্তব্য করেছেন । 

গ) শুন্য রাজকোষ : 

পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ , সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ , এবং আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাঞ্চ দেউলিয়া হয়ে পড়ে । ফরাসিদের জাতশত্রু ব্রিটিশদের দুর্বল করতে  ফ্রান্স ১০০ কোটি লিভার ঋণ ধার  করে । এর উপর ছিল সরকারি অপব্যয় এবং রাজপরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ বিলাসিতা । এসবের ফলে ফ্রান্সের রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়নি বরং ঋণগ্রস্ত ও দেউলিয়া হয়ে পড়ে । এমত অবস্থায় রাজা ষোড়শ লুই দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে তৎকালীন তিনজন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ প্রথমে টুরগো , পরে নেকার এবং তারপরে ক্যালোনকে রাজস্ব মন্ত্রী নিয়োগ করেন । তারা রাজস্ব সংস্কারের প্রস্তাব করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করলে রানী , অভিজাত বর্গ এবং অন্যান্য সুবিধাভোগীদের বিরোধিতার কারণে তাদের কর্মসূচি ব্যর্থ হয় । এমনকি তাদেরকে পদত্যাগ করতে হয় । এ সময় ফ্রান্সের মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় , দ্রব্যমূল্যের দাম দিন দিন হু হু করে বাড়তে থাকে । ১৭৮৮ সালে ব্যাপক শস্যহানি ঘটে । অগণিত মানুষ গ্রাম ছেড়ে খাদ্যের সন্ধানে শহরে এসে ভিড় জমায় । শহরে এসে রুটির জন্য দাঙ্গা শুরু হয় । রাজা তখন অর্থাভাব দূর করতে স্টেটস জেনারেলের ( State General )  অধিবেশন আহ্বান করতে বাধ্য হন । আর এ অধিবেশনেই 1789 সালের বিপ্লবের পথ মুক্ত করে দেয় । এজন্য অনেকে বলে থাকেন  “ The Fiscal causes lay at the root of the Revolituon .” অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লবের মূলে ছিল আর্থিক কারণ । 

ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল / গুরুত্ব / তাৎপর্য ( Result / Significance of the French Revolution .  )

 ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা । এর গভীরতা ও ব্যাপকতা এত বেশি যে আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে এই বিপ্লব এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । এই বিপ্লব বহু পুরাতন জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে প্লাবনের ন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে ,তদস্থলে এক নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিস্থাপন করে যেমন:- 

১) রাজতন্ত্রের অবসান: 

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের আদর্শের ভিত্তি  চিরতরে বিনষ্ট হয় । এতদিন রাজারা স্বর্গীয় অধিকার বলে রাজত্ব করতেন , সেসব ধ্যান-ধারণার চির অবসান ঘটে । প্রজাতন্ত্রের আদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয় ।রাজনীতি করার অধিকার ,ভোটাধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ,সংগঠন ও সভা-সমিতির অধিকার স্বীকৃতি লাভ করে । ফরাসি জনমনে মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ স্থায়ীভাবে লাভ করে। 

২) সামাজিক বৈষম্যের অবসান: 

অভিজাত ও যাজক শ্রেণীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিলুপ্ত হয় । দাসত্ব প্রথার অবসান ঘটে ।হলে সামাজিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বংশ কেীলিন্যের অবসান ঘটে । যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি লাভের অধিকার স্বীকৃতি হয় । চাকরির ক্ষেত্রে  Career open to talent এ নীতি গৃহীত হয় । আইনের চোখে সবাই সমান ফরাসি জনগণের অধিকার লাভ করে । 

৩) স্বাধীন কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ : 

সামন্তপ্রথা চিরতরে দূর হয় । বিপ্লবের সময় রাজা অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায়ের জমিদারির অংশ বঞ্চিত ও সর্বহারা মানুষের মধ্যে যেভাবে বন্টন করা হয় , তার ফলে একটি স্বাধীন ও সমৃদ্ধশালী মধ্যবিত্ত এবং কৃষক সমাজের সৃষ্টি হয় । পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকাশের পথ তৈরি হয় । খেয়ে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । 

৪) ধর্মীয় সহিংসতা : 

ফরাসি বিপ্লবের ফলে পোপ  এবং চার্চের আধিপত্য নষ্ট হয় । ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় করন করা হয় । এতে ধর্মীয় সহিংসতা প্রতিষ্ঠিত হয় । মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার পায় । এর ধর্মীয় সহিংসতা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ( Secularism )  সৃষ্টি হয় । 

5) জাতীয়তাবোধ : 

ফরাসি বিপ্লবের ফলে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞার নব রুপায়ন ঘটে । এক রাজা ,এক রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদের এ আদেশের পরিবর্তে এক ভাষা, কৃষ্টি , ঐতিহ্য ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভিত্তির উপর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় । একটি ইউরোপের সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা লাভ করে । জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম কিছুদিনের জন্য ফ্রান্সকে ইউরোপে অপরাজেয় করে তুলে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলো ফ্রান্সের আদর্শবাদী হাতিয়ারের সাহায্য করে । স্পেন, রাশিয়া, পর্তুগাল, জার্মানি ,ইতালি, হল্যান্ড ,বেলজিয়াম ও বলকান অঞ্চল সহ ইউরোপের সর্বত্র জাতীয়তাবাদী আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে । 

৬) জনগণের সার্বভৌমত্ব : 

ফরাসি বিপ্লবের ফলে জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার উৎস এ মতবাদের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে । নির্বাহী বিভাগ অপেক্ষা আইনসভার গুরুত্ব , ১৭৯১সালের ফরাসি সংবিধানের প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৮৯ সালের মানুষ ও নাগরিক অধিকার ঘোষণার দ্বারা নাগরিকরা কতগুলো মৌলিক অধিকার ভোগ করার অধিকার লাভ করে। যেমন: বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, আইনের চোখে সবাই সমান , কাউকে বিনা বিচারে বন্দি না রাখা  এবং জনগণই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ইত্যাদি । আর এগুলো গড়ে উঠেছিল ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার উপর ভিত্তি করে । 

৭) প্রগতিশীল চিন্তার প্রসার: 

ফরাসি বিপ্লবের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তাভাবনা মানুষের মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে । এর ফলে মানুষ রাজনৈতিক ,অর্থনৈতিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল হয়ে ওঠে । মানুষ মানবতাবাদী ও উপযোগবাদী সৎকার প্রবর্তনের দিকে ধাবিত হয় । বিপ্লবের অভিজ্ঞতা মানুষকে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয় । 

পরিশেষে একথা বলা যায় যে , ফরাসি বিপ্লব সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও  ধর্মীয় ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিল । সামাজিক সাম্য ভূমিহীন ও সর্বহারাদের মধ্যে ভূমি বন্টন, আইনের চোখে সবাই সমান, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার, ধর্মীয় সহিংসতা প্রভৃতিতে ছিল  ফরাসি বিপ্লবের অবদান ।  ফরাসি বিপ্লব ছিল পুরাতনের বিদায় এবং নতুন বিজয়ের চেতনা । 

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের অবদান ( Contribution of the Intellectuals  )

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি দেশে এমন কয়েকজন দার্শনিক, লেখক ,বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়কের আর্বিভাব ঘটে, যার ফলে  ফ্রান্সের এক নবজাগরণের সূচনা হয় । দীর্ঘকাল ধরে ফ্রান্সের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে অসাম্য অনাচার ও দুর্নীতি চলে এসেছিল , তার বিরুদ্ধে এসব চিন্তাবিদগণ লেখনী ধারণ করে এক নতুন ভাবতরঙ্গ প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।যার ফলশ্রুতিতে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব সাধিত হয়। লক্ষ লক্ষ নরনারী কণ্ঠে ধ্বনিত হলো  Equality , Fraterniy and Liberty G নিম্নে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন দার্শনিকের অবদান আলোচনা করা হলো : 

১) মন্টেস্কু ( Montesquieu 1689 -1755 ) : 

মন্টেস্কুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী । রাজনীতিতে তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে । দীর্ঘ ২০ বছর কঠোর সাধনা করে “ আইনের মর্ম “ ( The Spirit of Laws ) নামে একখানা মূল্যবান গ্রন্থ লেখেন ।এ গ্রন্থখানা এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে, মাত্র ১৮ মাসে এর ২২ টি সংরক্ষণ বের হয় । এই গ্রন্থে তিনি প্রশাসন বিভাগ থেকে আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ দাবি করেন । এছাড়া এ গ্রন্থে তিনি শিক্ষা ,আইন , স্বাধীনতা, সমাজে নারীর স্থান, বাণিজ্য ,অর্থনীতি, ধর্ম, জলবায়ুর প্রভাব, রোমান সামন্ত আইন ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন । The Persian Letters নামক অপর গ্রন্থে তিনি প্রচলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার বিদ্রূপ করেন । তিনি লিখেছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র বিশ্বাসী কিন্তু দায়িত্বহীন স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির কঠোর সমালোচক । 

২) ভলতেয়ার ( Voltaire 1694-1778 ): 

তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, শিল্পী, ঐতিহাসিক, দার্শনিক । তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল । এজন্য তাকে মানব জাতির বিবেক আখ্যা দেওয়া হয় । তিনি প্রজাহিতৈষী রাজতন্ত্রের বিশ্বাসী ছিলেন । তিনি বলেন “ সহস্র ইঁদুর দ্বারা শাসিত না হয়, একটা সিংহের শাসন অধিক কাম্য  “ ( He would prefer to be ruled by a lion than by hundred rats ) । তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন । তার বিখ্যাত উক্তি  “ আপনি যা বলেন ,আমি তার সাথে একমত না হতে পারি , কিন্তু আপনার স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে আমি আমরা সংগ্রাম করে যাব । তিনি বলেন ,” আমি অপেক্ষার ছেয়ে অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন ,” ( The pen is mighter than the sword.) । তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে ফ্রান্সের শাসন-শোষণ, দুর্নীতি ,ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামির তীব্র নিন্দা করেন । জনগণকে বিদ্রোহী করে তুলতে তার ন্যায় অন্য কেউ এতটা সফলকাম করেনি । তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে  “ Candide, Dictionary of Philosophy. G 

৩) রুশো ( Rousseau 1712-1778 ) : 

ফরাসি বিপ্লবের আরেকজন কিংবদন্তী ছিলেন জ্যাঁ জ্যাক  রুশো । গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও গণ-আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা হিসেবে রুশো ছিলেন এক উত্তম পুরুষ । যার নাম বিশ্বের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা আছে । সাম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র ছিল তার আদর্শ । তার মতে ,রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে জনগণের হাতে । রাজা জনগণের মতানুযায়ী রাষ্ট্রপরিচালনার না করলে তাকে পদচ্যুত করার অধিকার জনগণের রয়েছে । তিনি ঘোষণা করেন , “ Man was born free, but he was everywhere in chains.” মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মলাভ করেও সর্বত্র শৃঙ্খলিত । তার মতে, মানুষের কর্তব্য হল শেষ শৃংখল ছিন্ন করে মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা অর্জন করা । রুশো মোহময় সমাজব্যবস্থাকে ঘৃণা করতেন । কারণ তার মতে , সমস্ত অত্যাচার , অনাচার ও অবিচারের মূলে ছিল এই সমাজ ব্যবস্থা । তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন , “ সমাজের মিথ্যা খোলস মুছে ফেলো , ভেঙ্গে ফেলো সভ্যতা ,নামধারী বিলাসব্যসন এবং ঐশ্বর্য ,সমাজ ব্যবস্থার নাম ধারী অত্যাচার এবং অনাচার ,জ্ঞানের নামধারী মিথ্যা ও ভুল সিদ্ধান্ত । ভেদাভেদ  ধ্বংস করো , প্রাচীনপন্থী বিদ্যা বর্জন করো , ঘৃন্য কার্যকলাপ বন্ধ করো , বন্ধন ভেঙ্গে ফেলো । The Social Contract এবং Discourse on the Origin of Inequality : গ্রন্থ দুটিতে তিনি গণতান্ত্রিক মতবাদ ,জনগণের সার্বভৌমত্ব ,রাজনৈতিক ও শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার উল্লেখ করেন । তার আরো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল  “ Helois “ Emile “ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ( Confession ) । 

৪) বিশ্বকোষ সংকলকগন

 এ দলে ছিলেন গণিতবিদ , জ্যোতিবিদ ,পদার্থবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক । এরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষণ সাম্প্রতিক কালের চিন্তা-চেতনা সন্নিবেশ করার জন্য একটি বিশ্বকোষ রচনা কাজে হাত দেন এবং ১৭৫১-১৭৬৫ এরমধ্যে ২৮ খন্ড সংকলন করেন । এ কাজের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন দেনিশ দিদেরো , দ্যালেমবার , দোলবাস ও এলভেতিয়াঁস ।এ গন্থে প্রচলিত ধর্ম ব্যবস্থা , দাস প্রথা , ঘৃন্য বিচার ব্যবস্থা, আর্থিক অপচয় ইত্যাদির তীব্র সমালোচনা করা হয়। মানুষের জন্মগত অধিকার মানবধর্ম, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ের তথ্যপূর্ণ আলোচনায় এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়। এটা ফ্রান্সের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে উজ্জীবিত করে। প্রচলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক ত্রুটি বিচ্যুতি গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা হয় । 

৫) ফিজিওক্র্যাটস: 

ফিজিওক্র্যাটস নামে এক দল অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সের তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন । এ দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কেসনে, মিরাবো ,স্মিথ, তুর্গো এবং নেমুর । তারা অবাধ উৎপাদন , উদ্ভাবন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্বাসী ছিলেন । তাদের মতে , সকল সম্পদের উৎস হলো জমি । সুতরাং সমস্ত কর একমাত্র জমিতে পরিণত করা হোক । তারা নতুন প্রদেশ গঠন , যাজক পুরোহিতের তান্ত্রিক শাসন-শোষণের অবসান এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রকৃতি দাবি ও পেশ করেন । এডাম স্মিথ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ” The Wealth of Nations “ এ রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ট্যাগ এবং অবাধ বাণিজ্যের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন । 

৬) সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদগণ : 

বিপ্লব পূর্ববর্তী ফরাসি সমাজের ভুল বিচ্যুতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিছু লেখক ও চিন্তাবিদ সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানাকে দায়ী করেন । এ সমস্যা সমাধানে তারা সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন । এ মতবাদের অগ্রনায়ক ছিলেন জ্যা মেসলিয়ে নামক এক জন যাজক । তিনি বলেন , “ অসমতা প্রাকৃতিক বিধানের পরিপন্থী । প্রকৃতি সবাইকে সমান ভাবে সৃষ্টি করেছে । সবার বাঁচার সমান অধিকার রয়েছে । অধিকার রয়েছে সমানভাবে স্বাধীনতা উপভোগ করার । এ দলে অন্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মরেলি, আরব মবেলি ও মিমোঁ ল্যাংগে । 

অবশেষে একথা বলা যায় যে , ফ্রান্সের তৎকালীন প্রচলিত শাসন পদ্ধতি , অসাম্য ,গোঁড়ামি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ । যদিও এ নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে । মরিস স্টিফেনের মতে  “ ফরাসি বিপ্লবের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক , দার্শনিক বা সামাজিক নয় । তবে একথা ঠিক যে , ফরাসি দার্শনিকেরা স্বৈরাচারী সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার যাবতীয় অবাঞ্চিত বাধা-নিষেধ অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার নীতিগত অধিকার জনগণের আছে তা বুঝিয়ে দেন । তারা ক্ষুরধার ও জ্বালাময়ী লেখনী ধারণ করে সমগ্র জাতির মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ও বৈপ্লবিক চেতনা জাগিয়ে তোলেন । তাই বলা যায় যে , ফরাসি বিপ্লবের মহান দার্শনিকদের প্রভাব/ ভূমিকা /অবদান /ছিল অপরিসীম ও অনস্বীকার্য । 

টেনিস কোর্টের শপথ ( Tennis Court Oath )

ফরাসি জাতির ইতিহাসের টেনিস কোর্টের শপথ একটি যুগান্তকারী ঘটনা । ফরাসি বিপ্লবের বিজ নিহিত ছিল এসব ওদের মধ্যে। এ শপথের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে । 

ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্সের আর্থিক অবস্থার চরম সঙ্কটের মধ্যে পড়ে যায় । সে আত্মিক সংকট দূর করার লক্ষ্যে সুদীর্ঘ ১৭৫ বছর পর ১৭৮৯ সালের ৫ মে রাজা ষোড়শ লুই ভার্সায় প্রসাদে স্টেটস জেনারেল ( States General ) নামক জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করেন । অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্য দুই শ্রেণীর যাজক ও অভিজাতদের  ন্যায় সমান সুযোগ -সুবিধা দাবি করে এবং ভোটের পদ্ধতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয় । কেননা জাতীয় সভায় মাথাপিছু ভোটাধিকার ছিল না । ভোটাধিকার ছিল সম্প্রদায় ভিত্তিক । অর্থাৎ আলোচনার পর ভোটের সময় এলে তখন সম্প্রদায় হিসেবে যাজক সম্প্রদায় ১টি ভোট এবং অভিজাত সম্প্রদায় একটি , ও মধ্যবিত্ত সাধারণ জনতার একটি ভোট গণ্য হতো । আবার তিন সম্প্রদায় একসঙ্গে বসতে পারতো না । এরা বসতো আলাদা আলাদা অধিবেশন । অথচ জাতীয় সভার মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ১২১৪ । এর মধ্যে যাজকদের সংখ্যা ৩০৮, অভিজাতদের সংখ্যা ২৮৫ এবং তৃতীয় শ্রেণি ৬২১ । তৃতীয় শ্রেণীর সদস্যসংখ্যা অপর দুই শ্রেণীর সে বেশি হলেও তাদের ভোট ছিল একটি । ফলে যাজক ও অভিজাদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত না । বরং যাজক ও অভিজাত শ্রেণীর আশা ছিল যে , জাতীয় সভার অধিবেশনের তাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার অব্যাহত রেখে বাড়তি করের বোঝা তৃতীয় শ্রেণীর উপর চাপিয়ে দিতে পারবেন । এজন্য স্বার্থের প্রয়োজনে প্রথম ও দ্বিতীয় ( যাজক ও অভিজাত ) সম্প্রদায় সর্বদা এক পক্ষে থাকতো । 

তবে একথা ঠিক যে , বিবেকের তাড়নায় যাজক ও অভিজাত্যের কয়েকজন স্বেচ্ছায় তৃতীয় শ্রেণীর থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন । দ্বিতীয় শ্রেণীর থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ এ সময় ন্যাশনাল পার্টি ( National Party ) নামে একটি দল গঠন করেন । এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন এ্যাবে সিয়েস, মুনীয়ে এবং মিরাবো । প্রথম থেকেই এ দল দাবি করে যে . তিন সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে একইসঙ্গে অধিবেশনে বসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মাথাপিছু  ১টি করে ভোটের ( Vote by head ) ভিত্তিতে প্রতিনিধি সভার কার্য পরিচালনা করতে হবে । যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় এ দাবির বিরোধিতা করে এবং রাজা তাদের পক্ষ সমর্থন করেন । 

এভাবে ভোটদান পদ্ধতি এবং একসঙ্গে অধিবেশনে বসার প্রশ্নে বিরোধ দেখা দেয় । এই অবস্থায় সিয়েসের পরামর্শক্রমে ১৭৮৯ সালের ১৭ জুন শেষবারের মতো যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদেরকে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিলিত ভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয় । কিন্তু তারা এ আহ্বানের সাড়া দিল না। ফলে ১৭ জুন তারিখে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ এ মর্মে ঘোষণা দেয় যে, তারা নিজেদের নিয়ে ফ্রান্সের জাতীয় সভা ( National Assembly ) গঠন করেছে এবং কর ধার্যের অধিকার একমাত্র জাতীয় সবার হাতেই রয়েছে । যাজক ও অভিজাতদের চাপে রাজা তাদের ঘোষণা নাচক করে দেন এবং অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে তৃতীয় সম্প্রদায়ের সভা কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন । কিন্তু রাজার এ পদক্ষেপ তৃতীয় সম্প্রদায়ের জানা ছিল না । ফলে ২০ শে জুন তারিখে অধিবেশনের সময় তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ এসে দেখেন রে , সভা কক্ষ বন্ধ রয়েছে এবং প্রবেশ পথে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে । এখন তারা বাধ্য হয়ে নিকটস্থ টেনিস কোর্টে ( টেনিস খেলার মাঠে ) সমবেত হন এবং দৃঢ়তার সাথে শপথ নেন যে , যতদিন পর্যন্ত ফরাসি জাতির জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনার কাজ শেষ না হবে ততদিন পর্যন্ত এ জাতীয় সভার অধিবেশন অব্যাহত থাকবে । ইতিহাসে এ শপথ টেনিস কোর্টের শপথ ( Tennis Court Oath )  নামে পরিচিত । 

শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে রাজা ষোড়শ লুই তৃতীয় সম্প্রদায়ের দাবি মেনে নেয় এবং সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদেরকে একসঙ্গে সভায় মিলিত হওয়ার আদেশ জারি করেন । এভাবে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতে চলে যায় এবং তারাই বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে । আর এসবের পচাতে টেনিস কোর্টের শপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । 

বাস্তিল দুর্গের পতন ( Downfall of the Bastil Fort  )

ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে বাস্তিল দুর্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে । স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অত্যাচারের প্রতীক ছিল বাস্তিল দুর্গ । রাজবন্দিদেরকে বাস্তিল দুর্গ আটক রাখা হতো । এটি এক সময় দুর্গ ছিল । পরবর্তীতে এটি হয়ে যায় জেলখানা । 

জাতীয় সভায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী যখন তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত তখন প্যারিস নগরীর অধিবাসীদের মধ্যে এক বিপ্লবী চেতনা জেগে উঠে । রাজা তৃতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধিদের দাবি মেনে নিলে জনসাধারণের প্রথম সাফল্য অর্জিত হয় । প্যারিস নগরী বিপ্লবের মঞ্চে পরিণত হয় । 1788 সালে কৃষক অজন্মায় ফলে ব্যাপক শস্য হানি ঘটে । খাদ্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় । একদিকে খাদ্যঘাটতি অন্যদিকে প্রচন্ড শীত । হাজার হাজার মানুষ ও খাদ্যের সন্ধানে গ্রাম থেকে রাজধানী প্যারিসে চলে আসে । শহরের কুলি, মজুর, শ্রমিক, কারিগর এবং গ্রাম থেকে আসা বুভুক্ষু মানুষ যারা বাসোমান জনতা বা সাঁকুলোৎ নামে পরিচিত ছিল । এরা খাদ্যের জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে । শহরের সশস্ত্র ডাকাত দলের আর্বিভাব ঘটে । তারা বিভিন্ন স্থানের লুটতরাজ শুরু করে । শহরের আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে । এমন সময় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে , রাজা জাতীয় সভাকে ভেঙ্গে দেবার জন্য প্যারিসের উপকণ্ঠে সৈন্য মোতায়েন করেছেন এবং রানীর প্ররোচনায় জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত করেছেন । এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে প্যারিসের হাজার হাজার জনতা রাস্তায় নেমে আসে । জনতা  দা , কুড়াল ,পাথর, পিস্তল নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় । দোকান থেকে অগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ লুণ্ঠন করে, রুটির দোকান ও কারখানা বিধ্বস্ত করে, শহরের আশেপাশে চল্লিশটি শুল্ক গাটি জ্বালিয়ে দেয়। জনতা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই তারিখে সশস্ত্র জনতা অত্যাচারী রাজতন্ত্রের বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে উড়িয়ে দেয়। উম্মক্ত জনতা বন্দিকে মুক্ত করে এবং কারাগারের অধিকর্তা দ্যা লোনে  ( De Launey ) কে  হত্যা করে । এভাবে বিপ্লব বিদ্রোহে রূপান্তরিত হয় । বাস্তিল দুর্গ পতনের পর রাজা জাতীয় সবাই যান এবং সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন । 

বাস্তিল দুর্গের পতনের সঙ্গে সঙ্গে প্যারিসের শাসনভার বিপ্লবীরা নিজেদের হাতে তুলে নেন । তারা নিজেদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করে প্যারিস কমিউন নামে অস্থায়ী পৌর পরিষদ গঠন করেন । প্যারিস নগরীর  শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিপ্লবীরা ন্যাশনাল গার্ড নামে এক জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করেন । । প্যারিসের ন্যায় ফ্রান্সের অন্যান্য অঞ্চলে ও এ ধরনের কমিউন গঠিত হয় । 

জনগণের দৃষ্টিতে বাস্তিল দুর্গ ছিল ঘৃন্য , জঘন্য ও স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক । এখানে বিনা বিচারে হাজার হাজার মানুষকে আটক রাখা হতো । এজন্য মানুষের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল । আর বাস্তিল দুর্গ পতনের সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের সমাধি রচিত হয়। এ কারণে ঘটনাটি ইতিহাসে খুবই গুরুত্ব । এ গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয় । 

ফ্রান্সে কেন বিপ্লব হয়েছিল ?  Why did the Revolution begin in France ?

১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব কি অবশ্যম্ভাবী ছিল ?  Was the French Revolution in 1789 inevitable ? 

ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেমন রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা ছিল , ফ্রান্সে ও তেমন একই ব্যবস্থা ছিল । কিন্তু ইউরোপের অন্য কোন দেশে বিপ্লব না হয়ে ফ্রান্সে প্রথম বিপ্লব সংঘটিত হয় । এর পিছনে কতগুলো বিশেষ কারণ ছিল কারণগুলো নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হল : – 

১) রাজতন্ত্রের দুর্বলতা : 

ফরাসি রাজতন্ত্র ইউরোপের অন্যান্য দেশে রাজতন্ত্রের মত শক্তিশালী ছিল না । রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন দুর্বলচিত্তের এবং স্ত্রী মারিয়া আঁতোয়ানেত এর প্রভাবাধীন । রাজা লুই তার স্ত্রী ও স্বার্থন্বেষী মহলের চাপে দেশের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন । 

২) সামন্তপ্রথার নিষ্ক্রিয়তা : 

ফ্রান্সের মত ইউরোপের অন্যান্য দেশে ও সামন্ত প্রথা প্রচলিত ছিল ।এ প্রথার স্বত্ব অনুসারে সামন্ত প্রভুগণ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা লাভের বিনিময় কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতেন । কিন্তু ফ্রান্সের রাজশক্তি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ায় সামন্ত শ্রেণীর শাসন ব্যবস্থা হতে দূরে সরে পড়ে ।অথচ তারা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিল। কিন্তু দেশের প্রতি তাদের কোন দায়িত্ব ছিল না। এর ফলে সামন্ত প্রভু ও কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। 

৩) কৃষক সম্প্রদায়ের সচেতনতা: 

ফ্রান্সের কৃষক সম্প্রদায় ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় নিজ অধিকার সম্পর্কে অধিক সচেতন ছিলেন। তারা ছিল স্বাধীন চেতা । ফলে সামন্ত শ্রেণীর ও যাজাক শ্রেণীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা তাদের মনে অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল । 

৪) দেশে প্রকৃত ঐক্যের অভাব : 

ফ্রান্সের সর্বত্র এক ধরনের আইন ,মুদ্রাব্যবস্থা ওজন প্রণালী এবং কর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না । কোন কোন ক্ষেত্রে এক প্রদেশ থেকে অন্যপ্রদেশে পণ্য পরিবহন করতে হলে শুল্ক প্রদান করতে হতো । ৪০০ এর বেশি আইন প্রচলিত ছিল । ফলে দেশের এক কোন চলে যাচ্ছিল আইনি বা বৈধ অন্য অঞ্চলে তা ছিল বেআইনি  বা অবৈধ । ফলে দেশে কোনো ঐক্য গড়ে ওঠেনি । 

৫) দার্শনিকদের প্রভাব : 

অষ্টাদশ শতকে ফরাসি দেশের একদল অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এবং বৈপ্লবিক ভাবাদর্শসম্পূর্ণ দার্শনিকের আর্বিভাব ঘটে । এদের মধ্যে  মন্টেস্কু , ভলতেয়ার ও রূশো দিলেন অন্যতম । এরা ফরাসি সমাজ , ধর্ম ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অসাম্য , অনাচার-অবিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুরধার জ্বালাময়ী লেখনী ধারণ করে সমগ্র জাতির মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ও বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তোলেন । বিশেষ করে রুশোর “ The Social Contract “ দিল তাদের কাছে বাইবেলসরূপ । শিক্ষা ও আর্থিক দিক দিয়ে তারা অভিজাত দের তুলনায় উন্নত ছিল । অথচ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত ছিল । ফলে সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চরম ক্ষোভ ও আক্রোশ ছিল । এ কারণে মধ্যবিত্তরাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয় । ইউরোপের অন্যান্য দেশের জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করলেও তাদের মনে বিপ্লবের প্রেরণা সৃষ্টি বা নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছিল না । 

৭) আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ : 

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রান্স আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । এ যুদ্ধে ফরাসি সৈনিক ছাড়াও অনেক বেসামরিক ও অভিজাত ব্যক্তি পরোক্ষভাবে যোগদান করে । এ যুদ্ধে যোগদানের প্রেরণা এবং সফলতা তাদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে । লাফায়েতসহ অনেক নেতৃবৃন্দ দেশে ফিরে এসে তাদের যে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ফরাসিদের সচেতন করে তোলেন এবং তারাই বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন । 

৮) আর্থিক সংকট : 

১৭৮৮ সালে কৃষির অজম্মার ফলে ফ্রান্সে খাদ্য সংকট দেখা দেয় । খাদ্যদ্রব্যের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে থাকে । কাজ ও খাদ্যের সন্ধানে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে রাজধানী প্যারিসে আসতে থাকে । প্রকৃতপক্ষে এ ভাসমান বা স্যাঁকুলোৎ শ্রেণিই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল । অন্যদিকে রাজ প্রসাদের অমিত ব্যয় ও অপব্যয় রাজকোষকে শূন্য করে ফেলে। এ সময়ে ফরাসি সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪,৪৬৭,৪৭৮,০০০ ফ্রাংকে । আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে ফ্রান্স ১০০ কোটি ফ্রাংক ঋণ গ্রহণ করে । এ সময় ফ্রান্সের যে তীব্র আর্থিক সংকট দেখা দেয় , ইউরোপের অন্য কোন দেশে এরূপ লক্ষ্য করা যায়নি । 

৯) জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান : 

দেশের আর্থিক সঙ্কট কাটাতে ১৭৫ বছর পর ১৭৮৯ সালের ৫ মে স্টেট জেনারেল ( State General ) নামক জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করা হয় । এ অধিবেশন কে কেন্দ্র করে যাজক ও অভিজাত দের সঙ্গে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর  তুমুল বিরোধ সৃষ্টি হয় । যা ১৭৮৯ সালের বিখ্যাত ও মহান ফরাসি বিপ্লবের পথ উন্মুক্ত করে দেয় । 

উপযুক্ত কারণে  ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয় , যাচিলো অবশ্যম্ভাবী ও অপরিহার্য । প্রকৃতপক্ষে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হবার পূর্বেই ফ্রান্সে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেটেলবির  মন্তব্য উল্লেখ করার মত । তিনি বলেন  “ দুর্বল স্বৈরতন্ত্র এবং দুর্বল রাজতন্ত্র ,দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত সংখ্যা বৃদ্ধি রাজকোষের দেউলিয়াত্ব , অসন্তুষ্ট  বুর্জোয়া , উৎপীড়িতক কৃষক শ্রেণী, আর্থিক ,প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিশৃংখলা বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ প্রভৃতির কারণে ফ্রান্সকে  বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেয় । 

[ “ A monarchy at once despotic and weak, a corrupt and worldly church, a nobility growing increasingly parasitical, a bankrupt exchequer , an irritated bourgeois , an oppressed peasantry, financial , administrative and economic anarchy – which lethed country to revolution .” – Ketelby ]

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

25 − = 17