সন্ত্রাসের রাজত্ব ( ১৭৯৩ -১৭৯৪ )

The Reign of Terror ( 1793 -1794 )  

সন্ত্রাসের রাজত্ব ( The Reign of Terror ) : 

সন্ত্রাসের রাজত্ব ফরাসি বিপ্লবের একটি বিতর্কিত ও কালো অধ্যায় । ১৭৯৩ সালের মাঝামাঝি হতে ১৭৯৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্ব জন নিরাপত্তার নামে প্রান্তে যে ভয়াবহ দমন-নির্যাতন ও রক্তপাতের শাসন চলছিল ইতিহাসে তা সন্ত্রাসের রাজত্ব নামে পরিচিত । এটা ছিল এক ধরনের জংলি বাতাসের শাসন । রোবসপিয়ার ছিলেন শাসনের প্রধান নায়ক । 

জ্যাকোবিন দলের উত্থান ( The Rise of the Jacobin Party  ) :

শুরুতে জ্যাকোবিন ছিলেন একটি সামাজিক সংগঠন ( নাম ছিল – ‍Society of the Friends of the Constitution )। পরবর্তীকালে এটি হয় জ্যাকোবিন ক্লাব এবং তা  থেকে হয় জ্যাকোবিন রাজনৈতিক দল । এ দলের অধিবেশন একটি পরিত্যক্ত জ্যাকোবিন গির্জায় অনুষ্ঠিত হতো । এজন্য এ দলের নাম হয় জ্যাকোবিন দল । এরা ছিল অতি বিপ্লবী । এদের নেতা ছিলেন মারাট , দান্তন , রোবসটিয়ার প্রমুখ । আর যারা বিপ্লবী , কিন্তু অতি বিপ্লবী নয় , নরমপন্থী বিপ্লবী তারা জিরোন্ডিস্ট  নামে পরিচিত । এ দলের অধিকাংশ নেতা জিরোন্ডির প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে এদের জিরোন্ডির ( Girondist )  বলা হত । এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিসো, ভার্জিনিয়াড, কনডোরসেট , দ্যামুরিয়ে প্রমুখ । ন্যাশনাল কনভেনশনে Planin নামে আরেকটি নিরপেক্ষ গুষ্টি ছিল । এরা একবার জিরোন্ডির,  আরেকবার জ্যাকোবিন দলের পক্ষে ভোট দিত । 

জ্যাকোবিন দলের ক্ষমতা লাভ : 

জিরোন্ডিস্টরা ছিল বুর্জোয়া শ্রেণীর সমার্থক। জ্যাকোবিনরা  ছিল ভাসমান জনতার সমর্থক । ফ্রান্সকে একটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর রাজা ষোড়শ লুই এর বিচারের প্রশ্নে এবং প্যারিসের জনতার অধিকারের প্রশ্নে দেশে বড় রাজনৈতিক দল জিরোন্ডিস্ট ও জ্যাকোবিনদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । জ্যাকোবিন রাজার বিচারের পক্ষে , জিরোন্ডিস্টরা বিপক্ষে । জ্যাকোবিনরা  দ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দাম বেঁধে দেয় , মজুরির নিম্নতম হার স্থির করা , ভাসমান জনতার কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা সহ এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবি জানান । অপরপক্ষে জিরোন্ডিস্টরা সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা অক্ষুন্ন রাখার এবং শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অবাধ নীতি অনুসরণে পক্ষে ছিল । তারা বিপ্লবকে আর এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ছিল না । এমতা অবস্থা ১৭৯২ সালের ২১ মে জ্যাকোবিন নেতারা ভাসমান জনতার সাহায্য জাতীয় কনভেনশন অবরোধ করে এবং জিরোন্ডিস্ট দলের ৩১ জন সদস্যকে বহিষ্কার করে । দেশদ্রোহীতার অভিযোগে তাদের অনেককে হত্যা করা হয় । এভাবে জিরোন্ডিস্ট দলের প্রাধান্য লুপ্ত হয় এবং জ্যাকোবিন দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় । 

সন্ত্রাসের রাজত্বের সূত্রপাত বা কারণ ( Beginning or Causes of the Reign of Terror  )

ফ্রান্সের জনগোষ্ঠীর সবাই বিপ্লব বা বিপ্লব পরবর্তী কার্যাবলীতে সন্তুষ্ট ছিল না । এদের মধ্যে ছিল প্রতিক্রিয়াশীল অংশ , বিপ্লবের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অভিজাতদের অধিকাংশ, রাজা, নবনির্বাচিত আইনসভার কিছু সদস্য এবং কৃষক সমাজের একাংশ। বিপ্লবের শুরুতে যাজক ও অভিজাতদের একটি অংশ এবং রাজার ভাই কঁত দ্য আর্তোয়ার ( Come De Artois ) । এরা পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে পালিয়ে যায়এবং বিপ্লব বিরোধী চক্রান্ত ও প্রচার অভিযানে লিপ্ত হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেন জাতীয় কনভেনশন থেকে বহিস্কৃত জিরোন্ডিস্ট দলের সদস্যরা । দেশের ভেতরে-বাইরে এদের অনেক সমর্থক ছিল । 

জাতীয় কনভেনশনে জ্যাকোবিনদের প্রাধান্য থাকায় তারা ১৭৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে ফ্রান্সকে একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে এবং জাতীয় কনভেনশনের রাজা ষোড়শ লুই এর বিচারের সিদ্ধান্ত নেন । বিচারে রাজাকে ৫৩ ভোটের ব্যবধানে প্রাণদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি তা কার্যকর হয় । জাতীয় কনভেনশন ঘোষণা করে যে , বিপ্লবী সরকার সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে বিপ্লবের আদর্শ ছড়িয়ে দেবে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সহযোগিতা দেবে । ফ্রান্সকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা , রাজার মৃত্যুদণ্ড , বিপ্লবের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া এসব কর্মকাণ্ডে বিপ্লবী সরকারের প্রতি অন্যান্য দেশের শত্রুতা আরো বেড়ে যায় । ফলে যুদ্ধরত অস্ট্রিয়া ও স্প্রর্শিয়ার সঙ্গে যোগ দেয় ইংল্যান্ড, স্পেন, হল্যান্ড,নেপলস , সার্ডিয়ানা , পূর্তগাল প্রভৃতি দেশ । তারা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রথম শক্তি সংঘ ( First Coalition )  গঠন করে বেলজিয়াম ও রাইন  নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দখল করে প্যারিসের দিকে ধাবিত হয় । এ সময় ফরাসি সেনাপতি দ্যামুরিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রু পক্ষের যোগদান , দেশের ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবীদের বিদ্রোহ , আইন অমান্য এবং কর দেওয়া বন্ধ করলে ফরাসি প্রজাতন্ত্র এবং বিপ্লবী সরকারের অস্তিত্ব বিপন্ন হয় । কিন্তু জ্যাকোবিন দল যে কোনো মূল্যে বিপ্লবকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর ছিল । তাই তারা দেশী ও বিদেশী শত্রুদের মোকাবেলা করতে এক অস্বাভাবিক ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠা করে , ইতিহাসে তা সন্ত্রাসের রাজত্ব ( The Reign of Terror ) নামে পরিচিত । 1793 সালের 9  মার্চ বিপ্লবী আদালত গঠন হতে  ১৭৯৪ সালের ২৮ জুলাই রোবসপিয়ার এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর পর্যন্ত সময়কে সন্ত্রাসের রাজত্ব বলা হয় । 

সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা ( Establishment of the Reign of Terror  )

সন্ত্রাসের রাজত্বকালের দেশের প্রশাসন কতগুলো কমিটি ও বিশেষ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হয় । জাতীয় কনভেনশন পরিস্থিতি মোকাবেলার জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্বে জন নিরাপত্তা কমিটি ( Committee of the Public Safty ) নামে এক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব অর্পণ করেন । প্রথমেই এই কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৯ পরে তা হয় ১২ । রোবসপিয়ার ছিলেন এ কমিটির প্রধান । এ কমিটির নেতৃত্বে দেশের সর্বত্র পায় ৫০ হাজার বিপ্লবী কমিটি ( Revolutionary Committee ) গঠিত হয়।  জাতীয় কনভেনশন তাতে বিনাদ্বিধায় অনুমোদন দিত । এ কমিটির প্রধান কাজ ছিল বিপ্লব বিরোধীদের যেকোনো মূল্যে নির্মূল করা । যাদের সাহায্যে এই  কমিটি কাজ করে তা হল : – 

ক) সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি ( Committee of general Safty ) : 

এই কমিটির কাজ ছিল পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব পালন করা অর্থাৎ কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা । 

খ) সন্দেহের আইন ( Law of Suspects )  : 

রাজতন্ত্র পন্থী বা প্রজাতন্ত্র বিরুদ্ধে বিপ্লবের শত্রু হিসাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে এ আইনের বলে গ্রেপ্তার করা হতো এবং তাদেরকে বিচারের জন্য বিপ্লবী আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো । সন্দেহ ভাজনদের গ্রেফতারের জন্য ৫০ হাজার  বিপ্লবী কমিটি কাজ করতো। 

গ) বিপ্লবী আদালত ( Revolutionary tribunal ) : 

এ আদালতের আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিলনা । সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই এই আদালত দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে মৃত্যুদণ্ড দিত । এর রায় ছিল চূড়ান্ত । সাধারণত জ্যাকোবিন বিরোধীদের এই আদালতে বিচার হতো । 

ঘ) বিপ্লবের বধ্যভূমি ( Square of the revolution ) : 

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি কে প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হতো এবং গিলেটিন ( Guilotine ) যন্ত্রের আঘাতে শিরশ্ছেদ করা হতো । দণ্ডপ্রাপ্ত মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতো । এভাবে আত্মরক্ষার লক্ষ্য  জ্যাকোবিন দল দেশের দলীয় স্বৈরতন্ত্র ( Party Dictatorship ) কায়েম করে । 

সন্ত্রাসের ভয়াবহতা ( Dreadfulness of Terror  ) :

সন্ত্রাসের একবছরের রাজত্বকালে ৫ লক্ষাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বন্দী করা হয় । জেলখানায় এত বন্দির সংকুলান না হওয়ায় অনেককে গির্জায় ,স্কুল এবং গুদাম ঘরে রাখা হয় । বিপ্লবী আদালতে অনেকক্ষেত্রে বিচারের নামে প্রহসন করা হয় । হাজার হাজার বন্দীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় । প্যারিসের বিপ্লবী আদালতেই ২৬৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় । কারো কারো মতে প্রায় ৪০ হাজার , আবার কারো কারো মতে ১৭,১০০ বন্দির মৃত্যুদণ্ড হয় । এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রানী মারিয়া  আঁতোয়ানেত, ডিউক অব  অরলিয়ন্স, মাদাম রোঁলা গিলোটিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন “ হায় স্বাধীনতা “ ! তোমার নামে কতই না অপরাধ সংঘটিত হয় “ ( Oh Liberty ! What crimes are committed in the name .) । অন্য উপায়ও অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় । যেমন :- জৈনক জ্যাকোবিন নেতার নির্দেশে লিও শহরের বিদ্রোহীদের লয়ার নদীর পানিতে ডুবিয়ে পাইকারি হারে হত্যা করা হতো । উগ্রপন্থী হেবার্ট বলেন, “ নিরাপত্তার জন্য সকলকে হত্যা করতে হবে । “ দুঃখের বিষয় এই যে , মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে  ৭০% ছিল কৃষক ও শ্রমিক । লায়নস , নানটি ও লাভেন্ডির বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করা হয় । 

বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ( Revolutionary Steps  ):

অভ্যান্তরীণ শত্রুদের মোকাবেলায় পাশাপাশি জ্যাকোবিন দল কতগুলো সমাজতান্ত্রিক সংস্কার প্রবর্তন করেন । যেমন :- দেশত্যাগী অভিজাতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা দরিদ্র কৃষকদের নিকট সস্তা দামে কিস্তিতে বিক্রি করা হয় । অভিজাত দের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয় । নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেওয়া হয় । মজুরি নিম্নতম হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয় । শিশু ,বৃদ্ধ ও অসহায় বিধবাদের সরকারি সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং যৌন শিক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় । ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রাকৃতিক ঋতুর পরিবর্তন অনুযায়ী বছরে বিভক্ত করে একটি বৈপ্লবিক পঞ্জিকায়(Revolutioary Calendar )  প্রবর্তন করা হয় । ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে জাতীয় কনভেনশনের কয়েকজন সদস্য গির্জাকে মুক্তি পূজারউপাসনাগার বলে ঘোষণা দেয় । রোবসপিয়ারের এটি পছন্দ না হওয়ায় তিনি এর পরিবর্তে পরমসত্তার উপাসনায় নীতি প্রবর্তন করেন । 

যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা : 

অভ্যন্তরীণ শান্তি স্থাপন করে জননিরাপত্তা কমিটি ইউরোপীয় শক্তির সংঘের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।  ১৭৯৪ সালে বিপ্লবী সরকার বাধ্যতামূলক সরকারকে দক্ষ কর্মী তৈরি করে যোগদান আইন ( Conscription )  জারি করা হয় । অর্থাৎ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়স্ক সকল অবিবাহিত পুরুষ সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে বাধ্য করা । বিখ্যাত সমরনায়ক লাজার কারনোর ( Lazare Carnot ) নেতৃত্বে সাড়ে সাত লক্ষ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী গড়ে তোলা হয় । সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভালো প্রশিক্ষণ ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, খাদ্য ,পোশাক, জুতা ইত্যাদি সরবরাহ করা হয় । হন্ডসুটের যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর ফরাসি বাহিনীর নিকট পরাজিত হয়ে ডানকার্ক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় । অস্টিয়া বাহিনীকে রাইন নদীর অপর তীরে বিতাড়িত করা হয় । ভার্মির যুদ্ধে ইতিপূর্বেই স্প্রর্শিয়া পরাজিত হয় । ফরাসি বাহিনী হল্যান্ড ও বেলজিয়াম দখল করে । স্পেন ও স্প্রর্শিয়া ফ্রান্সের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে । এভাবে ইউরোপের প্রথম শক্তি সংঘ ভেঙে যায় । 

বিপ্লবীদের পরাজয় ( Defeat of the Revolutionists )  

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার পর ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে জ্যাকোবিনদের  মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । এ মতবিরোধের বলি হতে থাকেন একের পর এক বিপ্লবী নেতা ও তাদের অনুসারীগণ । যেমন :- 

ক) হেবার্টিস্টদের পতন : 

প্যারিস কমিউন এর উপর উগ্রপন্থী হেবার্টিস্টগনের প্রভাব ছিল খুব বেশি । তারা ক্যাথলিক মতবাদ উচ্ছেদ করে নিজেকে মুক্তির উপাসনাগার বা মুক্তির মন্দির পরিণত করে । প্রায় দুই হাজারের বেশি গির্জা বন্ধ করে দেওয়া হয়  অথবা যুক্তি পুজোর মন্দিরে পরিণত করা হয় । প্যারিসের নটরডেম গির্জা থেকে মাতা মেরি ও যীশুর মূর্তি অপসারণ করে তথায় একজন পরমাসুন্দরী জীবন্ত মহিলাকে মুক্তির দেবীরূপে স্থাপন করে । এতে রোবসপিয়ার ক্ষুব্ধ হয় এবং দান্তের এর সহযোগিতায় তাদের পতন ঘটান । জননিরাপত্তা কমিটির নির্দেশে হেবার্ট ও তার অনুচরদের গিলোটিনে হত্যা করা হয় । 

গ) রোবসপিয়ারের পতন : 

বিপ্লবী নেতাদের একে একে প্রাণদণ্ড হওয়া রোবসপিয়ারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হন। কুখ্যাত প্রেরিয়াল আইন (The Law of Prairial ) জারি করে অসংখ্য নিরীহ জনসাধারণকে   রাষ্ট্রদোহিতা অভিযোগে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । শীঘ্রই তার অত্যাচারে শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সন্ত্রাসের শাসন কে নমনীয় করার পক্ষের দল ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং তাদের প্রচেষ্টায় ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই জাতীয় কনভেনশন রোবসপিয়ার এবং তার অনুসারী গিলোটিনে পাঠানোর আদেশ দেয় । পরের দিন ২৮  জুলাই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয় । রোবসপিয়ারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে এবং নরমপন্থী গন ফ্রান্সের শাসনভার গ্রহণ করে । 

মূল্যায়ন ( Evalution  )

একদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিপ্লব বিরোধী তথা ও প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবীদের বিদ্রোহ , অন্যদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ । এমন অবস্থায় ফ্রান্সের জাতীয় নিরাপত্তা ও সংহতির যখন বিপন্ন তখন সন্ত্রাসবাদি শাসনের কোনো বিকল্প ছিল না । তবে এতে অনেক বাড়াবাড়ি হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই । যে ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয় , সন্ত্রাসের রাজত্বে তা গলাটিপে হত্যা করা হয় । স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন , তারা প্রায় সকলেই গিলোটিনে প্রাণ দেন । বন্দী বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত  ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই দেশদ্রোহীতার কাজে জড়িয়ে ছিল , এটা যেমন সত্য , তেমনি বহু নির্দোষ ব্যক্তি নিছক সন্দেহের বশে গিলোটিন এর শিকার হয় , এটাও সত্য  । তাছাড়া বিপ্লবের নামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ দেশের ভেতরে ও বাইরে বিপ্লব সম্পর্কে ঘৃণা ও আশঙ্কার সৃষ্টি করে । 

তবে সে সময় দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার খাতিরে এরূপ জরুরিকালীন স্বেচ্ছাতন্ত্র ( Emergency Despotism ) এবং ক্লেশ স্বেচ্ছাতন্ত্র ( Dictatorship of Distress ) এর প্রয়োজন ছিল । নইলে ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বৈদেশিক আক্রমণ খন্ড-বিখন্ড হয়ে যেত । সন্ত্রাসের রাজত্বের ফলে ফরাসি বিপ্লব রক্ষা পেয়েছিল । অন্য কোন উপায়ে সম্ভবত এ কাজ সম্ভব হতো না । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক হায়েস বলেন , “ সন্ত্রাসের ফলে এই ফ্রান্সে বিপ্লব রক্ষা পায় এবং ইউরোপে ফ্রান্স রক্ষা পায় । “ ( The French Revolution was preserved in France and France was Victorious in Europ by the terror “ ) । ঐতিহাসিক রাইকার বলেন ,” সন্ত্রাসের রাজত্ব বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক জ্ঞানের একটি বিস্ময়কর ফসল এবং এটা বিপ্লবকে রক্ষা করে। “ (  The Reign of terror was marvelous product of practical statesmanship and it saved the Revolution .)। 

রোবসপিয়ের ( ১৭৯৩-১৭৯৪ ) – Robesprerre ( 1793 -1794  

ম্যাক্সিমিলিয়েন বড় স্পিয়ের রোবসপিয়ের ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের বিপ্লবী পুরুষ । ফ্রান্সের এ্যারাস প্রদেশের এক  সাধারণ ঘরে ১৭৫৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা ছিলেন একজন আইনজীবী । বাল্যকালে তিনি তার পিতা-মাতাকে হারিয়ে এক  বিশপের নিকট মানুষ হন । তারপর তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় আইন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন । অতএব তিনি ফৌজদারি বিচারক নিযুক্ত হন । কিন্তু কঠোর শাস্তি প্রদানে দ্বিধা করতেন বিদায় তিনি উক্ত পদ থেকে পদত্যাগ করেন । অথচ পরবর্তীকালে এ রোবসপিয়ের শত শত মানুষকে কঠোর শাস্তি ও গিলোটিনে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হননি ।  তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিন্তাবিদ, দেশ প্রেমিক, এবং দার্শনিক রুশোর ভাবশিষ্য। ১৭৮৯ সালে তিনি জাতীয় সভার প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং ইতিহাসের পাদ প্রদীপের সামনে চলে আসে । তিনি ছিলেন ফ্রান্সের সন্ত্রাসের রাজত্বের নায়ক । 

ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে জ্যাকোবিনদের ও এর নেতা রোবসপিয়ের ভূমিকা ছিল খুবই বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ । জাতীয় সভা আহ্বানের পর বিভিন্ন মতবাদ এর সদস্যরা বিভিন্ন ক্লাব বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী গঠন করেন । এ সময় ব্রিটানি স্বদেশের সদস্যরা সংবিধান সমর্থক সমিতির নামে এক সমিতি স্থাপন করেন । এ দলের অধিবেশন একটি পরিত্যক্ত জ্যাকোবিন গির্জায় অনুষ্ঠিত হতো । এজন্য এ দলের নাম হল জ্যাকোবিন দল । এ দলের সদস্য হওয়া ছিল খুবই সহজ । কেননা এ দলের চাঁদা ছিল খুবই কম । ফলে প্যারিসের দরিদ্র বিভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা দলের সদস্য হওয়ার সুযোগ পায় । সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর এ  ক্লাবের আদর্শকে সমর্থন জানায় । প্যারিসের ভাসমান জনতা বা সাঁকুলোৎ শ্রেণি ছিল এ  দলের প্রধান শক্তি । ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম উপাদান হলো জ্যাকোবিন ক্লাব ও গুপ্ত সমিতি । প্যারিস কে কেন্দ্র করে সারাদেশে ক্লাবের প্রায় ১ হাজার শাখা স্থাপন হয় । রোবসপিয়ের এ সকল ক্লাব ও গুপ্ত সমিতিতে যোগ দিয়ে বিপ্লবী আবহাওয়া সৃষ্টি করেন । কালক্রমে রোবসপিয়ের নেতৃত্বে জ্যাকোবিন ক্লাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে । জ্যাকোবিন ক্লাব থেকে গঠিত হয় জ্যাকোবিন রাজনৈতিক দল । 

জ্যাকোবিন দলের সদস্যরা ছিল প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর । তবে এরা ছিল বাম ও উগ্রপন্থী । এরা পাতি বুর্জোয়া , কারিগর , ক্ষুদ্র দোকানদার ও সাধারণ কৃষকদের কথা ভাবত । জাতীয় সভায় জ্যাকোবিন দল ছিল সংখ্যালঘু । কিন্তু তারা সাধারণত জনতার সাহায্য ভীতি প্রদর্শন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যপন্থি ও জিরোন্ডিস্টদের দমিয়ে ফেলে । প্যারিসের ভাসমান জনতার সাহায্যে জাতীয় সবার থেকে কট্টরপন্থী জিরোন্ডিস্টদের বরিষ্কার করা হয় । জাতীয় সবাই জ্যাকোবিন এর কৃতিত্ব স্থাপিত । আর এতে যার অবদান বা নেতৃত্ব ছিল তিনি হলেন রোবসপিয়ের । 

রোবসপিয়ের ছিলেন ঘোর আদর্শবাদী । রাজনীতিতে তিনি ন্যায়নীতিকে সর্বোচ্চ স্থান দিতে। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন বিধাতার ন্যায় নিষ্ঠুর , নিয়মিত ন্যায় অমোঘ । আপোস বা নমনীয়তাকে তিনি পাপ বলে মনে করতেন । তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠা । কোন কলঙ্ক ও অন্যায় তার জীবনের স্পর্শ করতে পারেনি । তিনি ছাইতেন পৃথিবীর সকলেই সৎ হইতে বাধ্য । যদি কেউ তা না হয় , তাহলে তার যত গুন থাকুক না কেন তাকে ধ্বংস করতে হবে । তার দুর্বলতা হলো এই যে , তিনি নিজেকে ফ্রান্সের বিবেক মনে করতেন । তিনি নিজে  মতকে সর্বদা শ্রেষ্ঠ মনে করতেন । 

তিনি ছিলেন দার্শনিক রুশোর মানসপুত্র । রুশোর আদর্শকে বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি যে নির্মমতা দেখান  , তা রুশোকে হয়তো কম্পিত করতো । তিনি মনে করতেন , জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস এবং মালিক । জাতির সমষ্টিগত ইচ্ছে হলো সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে । জনসাধারণের দারিদ্র্য হলো সামাজিক অসাম্য এর ফল । তিনি সম্পত্তিকে ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাসী হলেও সম্পত্তির উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন । প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সক্রিয় আন্দোলন করেন । জনতা যখন অত্যাচারিত হয় , তখন জনতাকে তার প্রতিকার করতে হয় । যখন স্বৈরতন্ত্র চলে তখন এই জনতার উচিত বিদ্রোহ করা । যদি কোন আইন সভায় জনতার স্বার্থ বিরোধী কাজ করে , তবে জনতা সেই আইনসভাকে ভেঙ্গে দিতে হবে । প্যারিসের জনতার চাপে জাতীয় সভায় ফ্রান্সকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে । বিপ্লবী সরকার বা ন্যাশনাল কনভেনশনে ফ্রান্সের ভেতরে প্রতিবিপ্লব ও অরাজকতা দমন এবং বাইরে থেকে রাজতন্ত্রের সমর্থক বিদেশি শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে সন্ত্রাসের রাজত্ব বা জরুরি অবস্থা কালীন শাসন চালু করে । এ পর্যায়ে রোবসপিয়ের কনভেনশন নিযুক্ত জননিরাপত্তা কমিটির একজন সদস্য পরিণত হয় । তিনি ১৭৯৩ সালের এপ্রিল থেকে ১৭৯৪ সালের ২৮ জুলাই মৃত্যু পর্যন্ত যে শাসন বা সন্ত্রাস পরিচালনা করেন তাকে রোবসপিয়ারের সন্ত্রাস বা জ্যাকোবিন সন্ত্রাস বলা হয় । তিনি বলেন  “ আমাদের যখন প্রয়োজন হলো সরকারকে একটিমাত্র নীতি ও একটিমাত্র লক্ষণ নিয়ে পরিচালনা করা “ ( We need at this hour is a government of single will ) । সকল বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি তার একার ব্যক্তিগত মতামতের কাছে মাথা নিচু করতে বাধ্য করেন । জননিরাপত্তা কমিটি , সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি , বিপ্লবী আদালত , সন্দেহের আইন , প্যারিস কমিউন , ব্রাম্মমান কমিশনসহ সন্ত্রাসের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপ্লবের লক্ষ্যে প্রচার কাজে তিনি নির্বিচারে ব্যবহার করেন । তিনি সংশয়বাদী ও প্রতিবিপ্লবীদের নির্মমভাবে গিলোটিনের মাধ্যমে বলি দেন । যে নেশনাল কনভেনশন এর সদস্যরা জননিরাপত্তা সমিতির সদস্যদের নিয়োগ করত , তিনি সে সভার  প্রতিবাদী সদস্যদের সন্ত্রাসের দ্বারা বিনাশ করতে দ্বিধা করেননি । জননিরাপত্তা ও সামরিক প্রধান হিসেবে তিনি চরমপন্থী হেবার্টিস্টদের  চিহ্নিত করে দেন । হেবার্টিস্টদের ফিরল সমাজতন্ত্রের সমর্থক এবং খ্রিস্টধর্ম বিরোধী । এদের নেতা হেবার্টকে গিলোটিনে হত্যা করা হয় । তিনি মধ্যপন্থি দান্তন , তার সমর্থক ও বিপ্লবী বিরোধীদেরকে গিলোটিনে পঠিয়ে  হত্যা করেন । 

এসবের পরেও তার সন্ত্রাসের রাজত্বের কিছু উজ্জ্বল দিক ও ছিল । যেমন , তিনি ফটকাবাজি ও মুদ্রাস্ফীতি রোধ করেন। কার আমলে খাদ্যসংকট লোপ পায়। কেননা তিনি খাদ্যদ্রব্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেন। প্রতিবিপ্লবী ও দেশ থেকে অভিজাত্যের জমি বাজেয়াপ্ত করেতার দরিদ্র জনগণের মধ্যে ১০ বছরের কিস্তিতে কৃষকদের নিকট সস্তা দরে বিক্রি করে দেন । প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আইনের খসড়া সোনা করেন । ধনী ব্যক্তিদের উপর করবার বাড়িয়ে দরিদ্রদের উপর তা কমানো হয় । পিতার সম্পত্তিতে সকল সন্তানের সমান অধিকার দিয়ে আইন করা হয় । ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ চালু করা হয় । সমগ্র দেশের জন্য একই আইন চালু করা হয় । শিশু ,বৃদ্ধ ও অসহায় বিধবাদের সরকারি সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । তার সন্ত্রাসের রাজত্বের কারণে দেশ অভ্যান্তরীণ বিদ্রোহ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।  এজন্য তার সন্ত্রাসী রাজত্বের আমলে ফরাসি বিপ্লবের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে । তিনি অনুভব করেন খ্রিষ্টধর্মের অবনমনের ফলে সমাজের নীতিবোধ নষ্ট হচ্ছে । নীতিবোধ নষ্ট হলে সভ্যতা থাকবে না । এজন্য তিনি পরম পুরুষের উপাসনা চালু করেন । 

যাহোক , এক দলের নিকট রোবসপিয়ার ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি । আরেক দলের নিকট ছিলেন ঘৃন্যত ব্যক্তি । কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে , তিনি ছিলেন ফর্ম ও মানবতাবাদী ও সামাজিক ন্যায়বিচার এর প্রবক্তা । অপর দলের মধ্যে তিনি ছিলেন ঘোর স্বার্থপর , উচ্চ বিলাসী, ফাপা  আদর্শবাদী ও ষড়যন্ত্রকারী । ঐতিহাসিক ওলার্ড তাকে অহংকারী ও ফাপা আদর্শবাদী বলে অভিহিত করেছে । কিন্তু ঐতিহাসিক মারিয়ের  মতে ,  “ রোবসপিয়ার ছিলেন মহান বিপ্লবীদের অন্যতম এবং তার মধ্যে ফরাসি বিপ্লব প্রকৃতপক্ষে উপলব্ধি হয়েছিল । আবার লর্ড এ্যাকটন রোবসপিয়ারকে ম্যাকিয়াভেলির দুষ্ট নীতির জঘন্যতম দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেন। গ্রান্ট ও টেমপারের মতে, “ প্যারিসে রোবসপিয়ার এরজনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্ন উদ্দে এবং তার দুর্ভাগ্য যে  , এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতিতে তাকে প্রান্তের পুনঃগঠনের কাজে যোগ দিতে হয় । 

তবে একথা ঠিক যে , তার ক্ষমতার অপব্যবহার , সন্ত্রাসের বাড়াবাড়ি ও একনায়ক তত্ত্ব তার জনপ্রিয়তা নষ্ট করে । এদিকে হেবার্টিস্টদের দমন করা  সাকুলোৎ শ্রেণী তার নিকট থেকে দূরে সরে যায় । এ সুযোগে তার বিরোধীরা তার পতন ঘটায় । ১৭৯৪ সালের ২৮ জুলাই তাকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয় । 

পরিশেষে একথা বলা যায় যে , ভুল বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও রোবসপিয়ার এর কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না । ফরাসি বিপ্লবের মহান আদর্শ গুলো তার মধ্যে বিকাশিত হতে দেখা যায় । তিনি জনগণের সার্বভৌমত্বের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান । সে সঙ্গে নীতিবোধের ভিত্তির উপর সামাজিক পুর্ণগঠনে প্রবৃত্ত হন । তার সংস্কারগুলো অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সামাজিক সাম্যের বৃত্তি মজবুত করেছিল । বৈদেশিক ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব ফ্রান্সকে রক্ষা করেছিল । তার কঠোর শাসনের কারণে ফরাসি বিপ্লব রক্ষা পেয়েছিল । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + = 13