আর্য সভ্যতা

(Aryan Civilisation ) 

অতি প্রাচীনকালে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অতিক্রম করে যেসব জাতি ভারতে প্রবেশ করে তাদের মধ্যে আর্যরা অন্যতম । আর্য বলতে সাধারণত একটি জাতির নাম বুঝায় । কিন্তু প্রকৃত অর্থে আর্য কোন জাতির নাম নয় , ইহা একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর নাম । গ্রিক , লাতিন , গথিন, জার্মান, কেলটিক, পারসিক , সংস্কৃত এই ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত । এদের যেকোনো একটি ভাষায় যারা কথা বলতো তারা সাধারণত আর্য নামে পরিচিত হয় । ১৮৪৭ সালে জার্মান পন্ডিত Max Muller আর্যদের বাসস্থান নামে এক প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে বলেন যে , আর্য কোন বিশাল নাম নয় , একান্তভাবে ভাষায় দ্যোতক । বর্তমানে Max Muller এর মতাবাদ অধিক ষংখ্যক পন্ডিত স্বীকার করেন । 

আর্যদের আদি বাসস্থান : 

আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল , সে সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।  ঐতিহাসিক ডি. এ.সি . দাশ , ডি. এস . ত্রিবেদী , এল.ডি . কল্প প্রমুখ মনে করেন , আর্যদের আদি বাসস্থান হল ভারতবর্ষ । অধ্যাপক Max Muller তার আর্যদের বাসস্থান প্রবন্ধে আর্যদের আদি নিবাস মধ্য এশিয়া বলে বর্ণনা করেছেন । অপরদিকে পাশ্চাত্যের প্রায় সব পন্ডিত আর্যদের বহিরাগত বলে মত প্রকাশ করেছেন । অবশ্যই অনেক ভারতীয় পন্ডিত এই মত সমর্থন করেছেন । 

ভারতে উৎপত্তিগত তত্ত্ব : 

যেসব ভারতীয় পণ্ডিত ঐতিহাসিক আর্যদের আদি বাসভূমি ভারতবর্ষ বলে মনে করেন তাদের যুক্তি গুলো নিচে দেওয়া হল : 

প্রথমত , আর্যদের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ ভারতবর্ষে রচিত হয় । বেদ গ্রন্থে যে ভৌগোলিক বিবরণ আছে তাতে দেখা যায় যে , পাঞ্জাব ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আর্যদের আদি বাসস্থান । 

দ্বিতীয়ত, আর্যরা ভারতীয় না হয়ে যদি বিদেশি হতো তাহলে বেদ গ্রন্থের ন্যায় অনুরূপ গ্রন্থ তারা যে অঞ্চলে বসবাস করত সে অঞ্চলে রেখে আসোতে । 

তৃতীয়ত, বৈদিক আর্যদের রচনায় ভারত ছাড়া অপর কোন দেশের নাম উল্লেখ নেই। বিদেশ থেকে আগমন ঘটলে বৈদিক সাহিত্য তার উল্লেখ থাকা স্বাভাবিক ছিল। আর্যরা সপ্ত-সিন্দুকে তাদের আদি বাসস্থান বলে গণ্য করত । 

চতুর্থত , ভাষাতত্ত্বের সাক্ষ্যপ্রমাণ হতেও আর্যদের বহিরাগত বলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না । কারণ মূল আর্য ভাষায় সর্বাধিক শব্দসংখ্যার সংস্কৃত ভাষা সন্নিবিষ্ট আছে । অপর কোন ভাষায় এরূপ পাওয়া যায় না । 

পঞ্চমত , বৈদিক সাহিত্য সিংহ ও হাতির উল্লেখ আছে । পাঞ্জাবের সিংহ ও হাতির প্রাচুর্য ছিল । এর থেকে ভারতীয় পণ্ডিতগণ অনুমান করেন যে , পাঞ্জাব ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান । 

আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে ভারত বিষয় তত্ত্বের স্বপক্ষে কিছু যুক্তি থাকলেও এর বিপক্ষে অনেক যুক্তি অবতারণা করা যায় : যেমন : –

প্রথমত , একথা সত্য যে , বেদ ভারতবর্ষের রচিত হয়েছে এবং তাদের অনুরূপ গ্রন্থ ভারতের বাইরে পাওয়া যায়নি । এর থেকে প্রমাণ হয় না যে , আর্যদের আদি নিবাস ছিল ভারতে । কারন এমনতো হতে পারে যে , আর্যরা ভারতে আগমনের পূর্বে তাদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রে মানসিক বিকাশ ঘটেনি । 

দ্বিতীয়ত, এটি এখন স্বীকৃত যে , ভারতে বৈদিক যুগ শুরু হওয়ার পূর্বে উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়দের প্রাধান্য ছিল । ইহা কোন ভাবেই মনে করা ঠিক হবে না যে , আর্য ও দ্রাবিড়রা পাশাপাশি বসবাস করত । ঋগ্বেদ থেকে আর্যদের বিজয়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । উপরন্তু , ঋকবেদের ভৌগলিক বিবরণে দেখা যায় , আর্যরা পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় । প্রথমে তারা পাঞ্জাব দখল করে এবং পরবর্তীতে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অগ্রসর হয় । কিন্তু বেদের কোন অংশে উল্লেখ নেই যে , আর্যরা পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয় । 

তৃতীয়ত , ভারত যদি আর্যদের আদি বাসস্থান হতো তাহলে নতুন দুঃসাহসিক অভিযানে বের হওয়ার আগে অবশ্যই আজও সংস্কৃতি সমগ্র ভারতে বিস্তার লাভ করত । কিন্তু উত্তরের কিয়দংশ এবং প্রায় সমগ্র দক্ষিণ আর্য সংস্কৃতির বাইরে ছিল । 

চতুর্থত , সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের ফলে ইহা প্রমাণিত হয় যে , আর্যদের ভারতে আগমনের পূর্বে সিন্ধু উপত্যকায় এক সুমহান অনার্য সভ্যতা গড়ে ওঠে । সিন্ধু সভ্যতা যে বহিরাগত আর্যদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়,  তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। 

এই যুক্তির ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, আর্যদের আদি বাসস্থান ভারতবর্ষের নয় । 

মধ্য এশিয়ার উৎপত্তিগত   তত্ত্ব : 

প্রখ্যাত জার্মান পন্ডিত Max Muller – এর মতে , মধ্য এশিয়া ছিল আর্যদের আদি আবাসভূমি । ভাষার সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে তিনি এরূপ মত প্রকাশ করেছেন । তার মতে , ভারতীয়, গ্রিক-রোমান জার্মান ,কেল্ট প্রভৃতি জাতিরা পূর্বপুরুষরা আদি পূর্বে প্রথম এশিয়াতে বসবাস করত । এরা একই বংশদুত এবং আর্য নামে পরিচিত । এদের এই একটি দল এশিয়া মাইনরের ভিতর দিয়ে ইউরোপে চলে যায় এবং অপর দল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আগমন করে । অধ্যাপক Max Muller আর্যদের আদি বাসস্থান মধ্য এশিয়ার উৎপত্তির স্বপক্ষে নিম্নলিখিত যুক্তির অবতারণা করেছেন : –

প্রথমত , পারস্যের ধর্মীয় গ্রন্থে জিন্দ আভেস্তায়  বর্ণিত আছে যে , মানুষের প্রথম সৃষ্টি হল অরন্যভোজে । অরন্যভোজের সঙ্গে সংযুক্ত সমস্ত এলাকা মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত । বিভিন্ন বাসা বিশ্লেষণে দেখা যায় , আর্যদের আদি বাসস্থান ছিল এমন এক অঞ্চলে যেখানে প্রচুর বার্চ ও পাইন গাছ জম্মাতো এবং অঞ্চলটি ছিল শীতপ্রধান , সেখানে প্রচুর বরফ পড়তো । 

দ্বিতীয়ত,  মধ্য এশিয়া অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার উন্মেষ ঘটে । উদাহরণস্বরূপ , মেসোপটেমিয়া সভ্যতার কথা উল্লেখ করা যায়। 

তৃতীয়ত , মধ্য এশিয়া হতেই এক বিশাল জনগোষ্ঠীর ভারতবর্ষে আগমন ঘটে । 

চতুর্থত , বৈদিক সাহিত্য সমুদ্রের কোন উল্লেখ নেই । সুতরাং আর্যদের আদি বাসস্থান সমুদ্র থেকে দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে ছিল এটাই স্বাভাবিক। ভারতে আর্যদের আগমন স্থলপথে ঘটে । 

Max Muller এর তথ্য প্রথমদিকে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও পরবর্তীকালে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ফলে তা পরিত্যক্ত হয় । 

ইউরোপীয় উৎপত্তিগত তত্ত্ব : 

আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে ইউরোপীয় উৎপত্তিগত মতবাদ এই এখন অধিকাংশ ঐতিহাসিক স্বীকার করে থাকেন । ভাষার উপর ভিত্তি করে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন রাশিয়ার নিকটবর্তী লিথুয়ানিয়া ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান । মূল আর্য ভাষার সঙ্গে লিথুয়ানিয়া ভাষার নিকটতম সম্পর্ক থেকে এই সিদ্ধান্ত সমর্থিত হয়ে থাকে । ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহ এর মধ্যে লিথুয়ানিয়ার ভাষায় সবচেয়ে প্রাচীন । 

অধ্যাপক ম্যাকডোনাল ও অধ্যাপক গিল এর মতে , দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান । এই মতের সমর্থনে তারা বলেন যে , ঋগ্বেদ ও জিন্দ আভেস্তায় “ওক” বীচ ও গুল্ল জাতীয় গাছ এবং জীবজন্তুর মধ্যে ঘোড়া , গরু, ভেড়ার   উল্লেখযোগ্য আছে । তৎকালীন দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপে এসব গাছপালা ও জীবজন্তুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায় । এছাড়া ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহ সমুদ্র নামে কোন শব্দ ছিল না । সুতরাং আদিপর্বে আর্যরা সমুদ্রতীরে বসবাস করত না । দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ সমুদ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত ছিল । এজন্য গিল মনে করেন , আস্ত্রিয়া-হাঙ্গেরি এলাকা ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি । গিলের এ অভিমত ঐতিহাসিক এ.এল.ব্যাসামও স্বীকার করেন । তার মতে , খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দ নাগাদ পোল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত স্তেপি অঞ্চলে আর্যরা বসবাস করতো । 

তবে আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে ডেব্লিউ ব্রান্ডেনস্টাইনের মতবাদ আধুনিক অনেক ঐতিহাসিক সমর্থন করেছেন । ব্রান্ডেনস্টাইনের ইন্দো-ইরানীয় ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত এনেছেন যে, কোন পাহাড়ের নিকটবর্তী শুল্ক তৃণভূমি অঞ্চলে আর্যদের সর্বপ্রথম বাসস্থান ছিল । তার মতে , এই অঞ্চল ছিল উড়াল পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত কিরঘিজ স্তেপি । 

যাহোক , আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে শেষ কথা এখনো নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না । তবে উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে , ভারত বর্ষ আর্যদের আদি বাসস্থান ছিল না । তবে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক  কিরঘিজ স্তেপি অথবা ইউরেশিয়ার কোন অঞ্চলে আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল বলে মনে করা । 

আর্যদের ভারতে আগমন : 

আর্যরা তাদের আদি আবাসভূমি ত্যাগ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে । মূলত : জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভাব, স্থানাভাব  অথবা গৃহবিবাদ আর্যদের আদি বাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে । W.Durant -এর মতে , আর্যদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি ভূমি ও পশুচারণভূমি দখল করা । অধিকাংশ পন্ডিত মনে করেন যে , আদি বাসস্থান থেকে আর্যরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে অভিপ্রয়াণ চালায় । একটি অংশ এশিয়া মাইনর পার হয়ে ইউরোপের দেশগুলোর দিকে এবং অপর অংশ পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে প্রথম ইরানে হাজির হয় । ইরানে তারা কিছুকাল বসবাস করে । এরপর তারা আবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে । এর একটি অংশ আফগানিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং অপরটি ইরানের থেকে যায় । যারা আফগানিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে তারা ইন্দো-এরিয়ান( Indo-Aryan) এবং যারা ইরানের থেকে যারা ইন্দো-ইরানীয়(Indo-Iranian )  নামে পরিচিত হয় । পারসিক ধর্ম গ্রন্থ জিন্দ আভেস্তা ও সংস্কৃত ভাষার সাদৃশ্য লক্ষ্য করে অনুমান করা হয় যে , সম্ভবত : আর্য ও ইরানিগন ছিল এক জাতি গোষ্ঠীভুক্ত । 

ঋকবেদের বিভিন্ন স্তোত্রগুলো থেকে জানা যায় যে , ভারতে প্রবেশ করে আর্যরা প্রথমে সিন্ধু উপত্যকা বসতি স্থাপন করে । ঋকবেদে  “সপ্তসিন্ধু”  কথার উল্লেখ আছে । সপ্তসিন্ধু বলতে সাতটি নদী অর্থাৎ সিন্ধু , বিতস্তা , চন্দ্রভাগা, ইরাবতী , বিপাশা, শতদ্রূ, স্বরস্বতীকে বুঝায় । এই সাতটি নদী ছাড়াও ঋকবেদে আরো কয়েকটি ভারতীয় নদী যথা : গঙ্গা ,যমুনা, সরযুর নাম উল্লেখ আছে । আফগানিস্তানের কয়েকটি নদী যথা: কুভা ( কাবুল ) , গোমতি , কোরম এবং সোয়াটের কথা ঋকবেদে স্থান পেয়েছে । এর থেকে মনে হয় যে , প্রারম্ভিক পূর্বে আর্যরা আফগানিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাঞ্জাব ,কাশ্মীর, হিন্দু ও রাজপুত্রনার অংশবিশেষ এবং পূর্ব ভারতের সরযু নদী পর্যন্ত বসতি স্থাপন করে। 

পূর্ব ভারতে আর্যদের অধিকার বিস্তার করতে বহুকাল লেগে গেছে। এই দীর্ঘ সময়কালের মধ্যে তাদের একদিকে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে,  অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়। ঋকবেদে “ দাস “ বা দস্যুদের সঙ্গে আর্যদের অভিরাম যুদ্ধবিগ্রহের উল্লেখ আছে। এই যুদ্ধে আর্যরা ”দাস “ বা অনার্যদের পরাজিত করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। এর ফলে পাঞ্জাবের গুরুত্ব নষ্ট হয় পূর্ব ভারতের দেশসমূহের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ব্রাহ্মণ্য যুগে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৮০০ অব্দের মধ্যে আর্য সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র ছিল মধ্যদেশ অর্থাৎ সরস্বতী নদী হতে গঙ্গার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখন্ড । ক্রমে ক্রমে কুরূক্ষেত্রে , কোশল (অযোধ্যা ) , কাশি , বিদেহ ( উত্তর বিহার ) , মগধ ( দক্ষিণ বিহার ) , অঙ্গ ( পূর্ব বিহার ) ও বঙ্গ আর্যদের বসতি গড়ে তোলে । আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের মধ্যে উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিনে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত এবং পূর্বে বঙ্গোপসাগর থেকে পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত সমগ্র ভূখণ্ডে আর্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় । কাল ক্রমে আর্যরা দক্ষিণের দিকেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে । 

তবে আর্যদের ভারতে অনুপ্রবেশের প্রকৃতি ও অন্যান্য বৈদেশিক আক্রমণ থেকে স্বতন্ত্র ছিল । এ প্রসঙ্গে W.Durant বলেন , “ আর্যরা অধিবাসী হিসেবে ভারতে প্রবেশ করে,  আক্রমণকারী হিসেবে নয় । অবশ্যই পাঞ্জাবের দীর্ঘকাল স্থায়ী ভাবে বসবাস করার পর তারা আক্রমণাত্মক পদ্ধতি গ্রহণ করে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তার করে । এখানে উল্লেখ্য যে , উত্তর ভারতে আর্যীকরন ক্ষিপ্র গতিতে এবং বিজয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় , অপরদিকে দক্ষিনাত্যে  আর্যরা ধীরগতিতে ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে প্রভাব  বিস্তার করে । 

বৈদিক সাহিত্য : 

আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য হল বেদ । কিন্তু বেদের রচনাকাল সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে জানা যায় না। কোন কোন পন্ডিত এর মতে,  ঋগ্বেদ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১৪০০ অব্দের অন্তবর্তীকালীন রচিত  হয় । জার্মান পন্ডিত Max Muller ঋকবেদের রচনাকাল ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব এর শেষের দিকে নির্ধারণ করেছেন । পাশ্চাত্য পণ্ডিতে জ্যাকব এবং মহারাষ্ট্রের বালগঙ্গাধর তীলক বেদের রচনাকাল গ্রহ- নক্ষত্রের উপর নির্ভর করে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের আরোও পূর্বের বলে অভিমত করেছে । তবে জ্যাকব এবং তিলক এর অভিমত আধুনিক ঐতিহাসিকগণ স্বীকৃতি দেননি । আধুনিক ঐতিহাসিকগণ ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ঋকবেদের রচনাকাল ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এরমধ্যে নির্ধারণ করেছে । তাদের মতে , পারস্যের ধর্মগ্রন্থ জিন্দ আভেস্তার রচনাকাল ( ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব ) এর সঙ্গে ঋকবেদের রচনাকাল এর ব্যবধান খুব বেশি নয় । অধ্যাপক এ.এল.ব্যাসাম এর মতে , বৈদিক সভ্যতা যেহেতু হরপ্পা সভ্যতার পরবর্তী এবং হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংস আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দ ধরা হয় সেহেতু ঋকবেদ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত হয় । এশিয়া মাইনরের অন্তর্গত বোঘাজ-কোয় প্রাপ্ত ১৪০০ খ্রিস্টপূর্ব এর একটি শিলা লেখ এবং মধ্য মিশরের টেল-এল-আমরনায় প্রাপ্ত কিছু দলিল ব্যাসামের মতকে সমর্থন করে । যাহোক , বেশিরভাগ পণ্ডিত ঋগ্বেদ খ্রিষ্টপূর্ব  ১৫০০-১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত হয় বলে মনে করে থাকেন । 

বৈদিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য : 

বেদ কথাটির উৎপত্তি বিদ শব্দ থেকে । “ বিদ “ শব্দের অর্থ জ্ঞানের আধার । ঈশ্বরের নিকট থেকে আসা বলে বেদের আরেক নাম শ্রুতি । বেদ চার  খন্ডে বিভক্ত যথা : ঋগ্বেদ ,সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ । এই চারটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদ সবচেয়ে প্রাচীন ও  প্রদান । মোট ১০২৮ টি স্তোত্রের সমন্বয় ঋকবেদে রচিত । সামবেদের স্তোত্রগুলো যাগ-যজ্ঞের সময় সুর ও গীত  হয় । সামবেদ সংহিতায় ১৮১০ টি মন্ত্র আছে । যজুর্বেদ  আছে যাগযজ্ঞের মন্ত্রাদি । এতে মন্ত্রের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার । অথর্ববেদের সৃষ্টির রহস্য , চিকিৎসা ও নানারকম রহস্যজনক মন্ত্র সন্নিবিষ্ট আছে । অথর্ববেদ প্রায় ছয় হাজার মন্ত্র আছে । 

প্রত্যেকটি বেদ আবার চার খন্ডে বিভক্ত । যথা : -সংহিতা,ব্রাক্ষন, আরণ্যক ও উপনিষদ । সংহিতা পদ্যে লিখিত । বিভিন্ন দেবদেবীর স্থপতি গান নিয়ে সংহিতা রচিত । ব্রাহ্মণ্য যাগ-যজ্ঞ সম্পর্কে নানা আচার-অনুষ্ঠানের বর্ণনা রয়েছে । ইয়া প্রধানত গদ্যে  রচিত । আরণ্যক ও উপনিষদ ব্রাহ্মণের  অন্তর্ভুক্ত । এই দুইটি হল বেদের দার্শনিক বিভাগ । উপনিষদের পরম সত্য ও সত্ত্বা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে । উপনিষদের নানারকম যাগযজ্ঞের বিরোধিতা করা হয়েছে এবং সহজভাবে ধর্ম পালনের নির্দেশ আছে । এর সংখ্যা এক শতাধিক । উপনিষদগুলো  গদ্যে রচিত । বিশুদ্ধভাবে বেদ পাটের প্রয়োজন এবং যথাযথভাবে উপলব্ধি করার জন্য পরবর্তীকালে ছয়টি বেদাঙ্গ এবং ছয়টি দর্শন রচিত হয় । ছয়টি বেদাঙ্গের নাম হল – শিক্ষা ,চন্দ্র, গল্প, ব্যাকরণ, নিরক্ত ও জ্যোতিষ । শিক্ষা ও ব্যাকরণ এর রচিয়তা ছিলেন পনিনি, ছন্দের পিঙ্গলাচার্য় , নিরূক্তের যাস্ক , জ্যোতিষের গর্গ এবং কল্পের বিভিন্ন ঋষিগন । বেদাঙ্গের মধ্য “ কল্প “ সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য । কল্প আবার তিন অংশে বিভক্ত ছিল যথা : শ্রেীতসূত্র, গুহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র । এসব সূত্রে হিন্দুদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে । ষড়দর্শন গুলো সংখ্যা, যোগ , ন্যায় , বৈশেষিক, পূর্ব মীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা । এগুলো রচিয়তা ছিলেন যথাক্রমে কপিল, পতঞ্জলী , গৌতম , কনাদ , জৈমিনি এবং ব্যাস । বেদাঙ্গ ষড়দর্শনকে একত্রে সূত্র সাহিত্য বলে । বৈদিক সাহিত্য রচনায় আর্য ঋষিগণের প্রতিবার পরিচয় পাওয়া যায় । বৈদিক সাহিত্যের পর যেসকল সংস্কৃত সাহিত্য রচিত হয় তার মূল উৎস ছিল বৈদিক সাহিত্য । 

বৈদিক যুগ : 

খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৫০০ অব্দে আর্যদের ভারতবর্ষে আগমন এর পর থেকে বৈদিক যুগের সূচনা হয় । বেদ আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ । আর্যদের ধর্ম ,সমাজ ,দর্শন ,আচার-ব্যবহার রীতিনীতি প্রভৃতির উৎস ছিল বেদ । এই বেদকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের যে সভ্যতার সূচনা হয় তা বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত এবং এই সময়কে বৈদিক যুগ বলা হয় । বৈদিক যুগে দুই ভাগে ভাগ করা যায় যথা: ১) ঋক – বৈদিক যুগ ২) পরবর্তী বৈদিক যুগ । এ উপমহাদেশে আর্যদের আগমনের সূচনাকাল হতে ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালকে অর্থাৎ ঋকবেদের রচনাকালকে ঋক- বৈদিক যুগ এবং খ্রিস্টপূর্ব  ১০০০ অব্দ থেকে গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাবের পূর্ব পর্যন্ত সময়কাল পরবর্তী বৈদিক যুগের অন্তভুক্ত । নিম্নে তা আলোচনা করা হলো:  

ঋক – বৈদিক যুগ : 

রাজনৈতিক অবস্থা : 

ঋক- বৈদিক যুগে আর্যরা অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি উপজাতিগোষ্ঠী একজন রাজা-বাদশা দ্বারা শাসিত হতো । ঋগ্বেদ থেকে এসময় আর্যদের কয়েকটি উপজাতি গোষ্ঠীর নাম জানা যায় । যেমন : ভরত, যদু , সঞ্জয়, অনু , পুরূ , তুর্বস ইত্যাদি । এসকল উপজাতিগোষ্ঠী একদিকে যেমন ভারতের আদি অধিবাসী অনার্যদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতো অন্যদিকে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির লাভের জন্য নিজেদের মধ্যেও যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো । ইতিহাসে আর্যদের গুষ্টি সংঘর্ষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল “  দশ রাজার যুদ্ “ ( Battle of ten Kings ) । এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় ভরত গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী অপর নয়টি গোষ্ঠীর মধ্যে । ঋকবেদে এই যুদ্ধের কারন সম্পর্কে বলা হয়েছে , ভরত গুষ্টির রাজা সুদাস তার প্রধান পুরোহিত অপসারণ করে বশিষ্ঠ প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব নিযুক্ত করে । এতে বিশ্বমিত্রকে অপসারণ করে বলিষ্ঠকে প্রধান পুরোহিতদের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন । এতে বিশ্বমিত্র অপমানিত হয়ে অন্যান্য আর্য উপজাতির রাজাদের নিয়ে জোট গঠন করে সুদাসকে আক্রমণ করেন । জানা যায় , পারূশনি নদীর ধারে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এই যুদ্ধে সুদাস  জয়লাভ করে। এই জয়লাভের ফলে ভরত গোষ্ঠীর প্রভুত্ব  প্রতিষ্ঠিত হয় । অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে , ভরত উপজাতি গোষ্ঠীর নাম থেকেই পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের নামকরণ হয় । 

ঋক -বৈদিক যুগে আর্যদের শাসন ব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক । যুদ্ধবিগ্রহের সময় যারা সামরিক প্রতিভার পরিচয় দিতেন তারাই রাজপদে অধিষ্ঠিত হতেন ।রাজপদ  সাধারণত বংশানুক্রমিক ছিল । তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোষ্ঠীর সদস্যদের নির্বাচনে রাজা মনোনীত হতে প্রমাণ আছে । রাজার প্রধান দায়িত্বশীল উপজাতি ও তাদের সম্পত্তি রক্ষা করা , কর আদায়, বিচার ,যুদ্ধ পরিচালনা ও ধর্ম রক্ষা করা ইত্যাদি । প্রতিটি উপজাতি রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল পিতৃতান্ত্রিক পরিবার । কয়েকটি পরিবার নিয়ে গ্রাম,  কয়েকটি গ্রাম নিয়ে বিশ ও কয়েকটি বিশ নিয়ে জন গঠিত হতো । প্রতিটি উপজাতি রাষ্টের গ্রামে ছিল প্রধান প্রশাসনিক একক । গ্রামের শাসনকর্তা কে বলা হতো গ্রামনী । গ্রামের সকল সামরিক ও বেসামরিক দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত থাকতো । বিশেষ শাসনকর্তা ছিলেন বিশপতি । প্রশাসনিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । প্রশাসনিক সংগঠনের সর্বোচ্চ একক ছিল জন । জনের প্রধান কে বলা হত গোপ । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজা এই পথ গ্রহণ করতেন । রাজার কর্মচারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অন্যরাও ছিলেন সেনানী ও পুরহিত । সেনানী ভিলেন সৈন্য বাহিনীর প্রধান । 

পুরোহিতরা ধর্ম জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন । রাজনৈতিক বিষয়ে তারা রাজাকে পরামর্শ দিয়েছেন । ঋক-বৈদিক যুগের প্রশাসনিক” গুপ্তচর” ও দূত নামে দুইটি পদের অস্তিত্ব ছিল । শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে রাজাকে অজ্ঞাত করাই ছিল তাদের দায়িত্ব । 

ঋগ্বেদ থেকে জানা যায় , সে যুগে রাজার স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না । এ সময় “সভা” ও ”সমিতি ” নামে জনগণের দুইটি প্রতিনিধিমূলক প্রতিষ্ঠান রাজার ক্ষমতা কে নিয়ন্ত্রণ করত । বস্তুত সভা ও সমিতি ছিল তৎকালীন শাসন ব্যবস্থার অন্যতম অঙ্গ । সাধারণত অভিজাত শ্রেণীর মধ্য হতে সভা ও সমিতির সদস্য নির্বাচিত হত । রাজা এই দুইটি সংস্থার মতামত গ্রহণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন । মহিলারাও সভা ও সমিতির কাজকর্ম অংশগ্রহণ করতেন । তবে পরবর্তী বৈদিক যুগের এ  দুটি সংস্থায় মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হয় । 

ঋক-বৈদিক যুগের রাজনৈতিক জীবনে যুদ্ধবিগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । তবে এ যুগের রাজাদের স্থায়ী কোন সেনাবাহিনী ছিল না । যুদ্ধের সময় জাতি বা গোষ্ঠীর প্রধান রাজাকে সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতো । উপজাতীয় গুষ্টির লোকদের নিয়ে সেনাবাহিনী গঠিত হতো । এ যুগের সেনাবাহিনীর তিনটি অঙ্গ ছিল যেমন: পদাতিক রথি ও অশ্বারোহী । রাজা ও সেনাপতিরা রথে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন । এ যুগে যুদ্ধ অস্ত্র হিসেবে তীর ও ধনুক ছিল প্রধান । বর্শা ,  কুঠাল ও তলোয়ার যুদ্ধের সময় ব্যবহার হতো । 

ঋকবেদে রাজস্ব সংগ্রহের ব্যাপারে কোন কর্মচারীর নাম উল্লেখ নেই।  সাধারন:  জনগনের কাছ থেকে নিষ্ক্রিয় ভাবে  দান গ্রহণ করতেন । এই দানকে বলা হত বলি বা বালি যা পণ্যের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো । ঋকবেদে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য কোন কর্মচারী নাম উল্লেখ নেই । 

সুতরাং দেখা যায় , ঋক-বৈদিক যুগে প্রশাসনের চরিত্র ছিল উপজাতীয় এবং সামরিক বাহিনী এসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত । 

সামাজিক অবস্থা : 

ঋক বৈদিক যুগের সামাজিক কাঠামোর মূল কথা ছিল আত্মীয়তা । এ যুগে একজন ব্যক্তি বিশেষের পরিচয় নির্ধারিত হতো সে কোন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত তাই দিয়ে । যেহেতু রাজ্য বা রাষ্ট্র নামক ধারণাটি তখনও উদ্ভব হয়নি , সেহেতু মানুষ গোষ্ঠীর প্রতি বেশি আসক্ত ছিল । 

ঋক-বৈদিক সমাজের ভিত্তি ছিল পরিবার । রোমান সমাজের ন্যায় বৈদিক সমাজের পিত্র -তান্ত্রিক ।পিতা-মাতা-সন্তান, দাস-দাসী ছাড়াও আরো অনেককে নিয়ে পরিবার গঠিত হতো । পরিবার পিতৃতান্ত্রিক ছিল বিদায় পুত্রসন্তানের জন্ম সে যুগে অধিক কাম্য ছিল । পিতার মৃত্যুর পর জৈষ্ঠপুত্র পরিবারের দায়িত্ব লাভ করত । 

বৈদিক সমাজে পুত্রের কদর থাকলেও কন্যাসন্তান অবহেলিত ছিল না । পুত্রদের ন্যায় মেয়েদেরকেও উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলা হতো । বয়প্রাপ্ত হলে তাদের পাত্রস্থ করা হতো । স্বামী নির্বাচনে তাদের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল । সমাজে মেয়েদের যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হতো । মেয়েরা শাস্ত্র চর্চা অংশগ্রহণ করতে পারতো । সভা-সমিতিতে ও তাদের অংশগ্রহণ ছিল । ঋকবেদে শিক্ষিত কয়েকজন নারীর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা হচ্ছেন ঘোষা, বিশ্ববারা , অপালা , লোপামুদ্রা , গোধা প্রমুখ । জানা যায় , বৈদিক মন্ত্র রচনায় এসব নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো । সাহিত্যচর্চা ছাড়া ও নারীদেরকে অস্ত্র ব্যবহারে ও শিক্ষা দেওয়া হতো । মেয়েরা ইচ্ছা করলে একাধিক স্বামীর সঙ্গে ঘর করতে পারতো । এ যুগের যৌতুক প্রথার প্রচলন ছিল । তবে বর পনের পরিবর্তে কন্যাপণ দেওয়া হতো । ঋকবেদে বিধবা বিবাহের উল্লেখ আছে । স্বামীর মৃত্যু হলে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বিধবা স্ত্রী বিয়ে দেওয়া হতো । শিশু বিবাহের কোনো উল্লেখ ঋকবেদে নেই । 

ঋক-বৈদিক যুগে আর্যদের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল যথা : যোদ্ধা বা অভিজাত শ্রেণী , পুরোহিতো শ্রেণী ও সাধারণ মানুষ । এ যুগে আর্যদের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ থাকলেও জাতিভেদে প্রথার অস্তিত্ব ছিল না । তবে এ.এল. ব্যাসামের মতে , এ যুগে জাতিভেদ প্রথা না থাকলেও বর্ণভেদ প্রথা ছিল । বর্ণের ধারণা সাধারণত গাত্রবর্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল । আর্যরা ছিল গৌরবর্ণ এবং অনার্যরা ছিল কালো বা তামাটে বর্ণের । এই পার্থক্য বুঝার জন্যই বর্ণ শব্দটির প্রচলন হয় । প্রাথমিক পর্যায়ে আর্যদের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ ,আচার-অনুষ্ঠান, ও বৃত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না । পরবর্তীকালে আর্য ও অনার্যদের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধ ও বিরোধের ফলে জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব লক্ষ্য করা যায় । ক্রমেই সমাজ জীবন জটিল হয়ে উঠলে কোন কর্ম ও বৃত্তি অনুসারে আর্য সমাজতাত্ত্বিক চারটি  শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে যথা: ব্রাহ্মণ ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও  গুদ্র । 

তৎকালীন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ছিল । এর প্রমাণ সমাজের চোর দস্যুদের উপদ্রব । ঋকবেদে বহুবার চোরদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে । সুতরাং সমাজের চুরির আওয়াজ ছিল । ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য থাকায় ধনীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি খুব সাবধানে রাখতে হতো । পথে-ঘাটে ডাকাতের উপদ্রব ও ছিল । এসব থেকে অনুমান করা যায় যে , সে যুগের সমাজ ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ও অভাব ছিল । সমাজের দারিদ্রতা ছিল বলেই ঋকবেদের দারিদ্র নিবারণের জন্য ভক্তকে দেবতার কাছে প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে । 

ঋক-বৈদিক ভারতে শিক্ষার প্রচলন ছিল । তবে বর্তমান যুগের ন্যায় সে যুগে সরকারি নিয়ন্ত্রণে কোন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি । শিক্ষার্থীরা গুরুগৃহের জ্ঞান অর্জন করত । গুরুগৃহে ছাত্রদের বেদ ,সাহিত্য , ব্যাকরণ প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত । ছাত্ররা গুরুর নিকট হতে মুখিক ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করত । এ যুগে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রের চরিত্র গঠন । দীর্ঘকাল সংযম রক্ষা এবং নানা পদ্ধতিতে সত্যিকারে জ্ঞান অর্জনের পর একজন ছাত্রের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি করত । 

ঋক-বৈদিক যুগে আর্যদের খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, আরাম-আয়েশ প্রভৃতি বিষয়ে ঋকবেদে অনেক তথ্য পাওয়া যায় । পোশাক-পরিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এ যুগের নারী ও পুরুষের মধ্যে তেমন পার্থক্য ছিল না । সাধারণত পোশাকের দুইটি অংশ ছিল । নিম্নাঙ্গের পোশাককে বলা হত ”বাস” এবং উর্ধাঙ্গের পোশাকে বলা হত “অধিবাস” । সুতি ওপশমের বস্তুই মূলত : পরিধান হিসাবে ব্যবহার হতো । এ যুগে আর্যদের প্রধান খাদ্য ছিল যব ,গম ,মাংস, দুধ, ঘি ,মাখন ইত্যাদি । এছাড়া তরিতরকারি ফলমূল তাদের খাদ্য তালিকা অন্তর্ভুক্ত ছিল । গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল না । তবে বেড়াও ছাগলের মাংস তাদের প্রিয় ছিল । উৎসব অনুষ্ঠানে সোমরস নামে এক ধরনের মাদক ছিল সমাজের সাধারণ নীতি । নৃত্য-গীতি, মৃগয়া , রথ-চালনা , পাশা খেলা প্রভৃতি তাদের আমোদ-প্রমোদের অঙ্গ ছিল ।

 “চতুরাশ্রম” ছিল আর্য জীবনধারার এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য । ইহা সমাজের প্রথম তিন শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । মানব জীবনকে বয়স ও করণীর এর ভিত্তিতে চারটি আশ্রম এ ভাগ করা হয় । 

প্রথম আশ্রমকে বলা হয় ব্রহ্মচর্য ( ১-২৫ বছর ) । এ সময় প্রত্যেক পুরুষকে গুরুগৃহে থেকে বিদ্যাচর্চা করতে হতো । 

ব্রহ্মচর্য পর্যায়  শেষ হলে বিদ্যার্থীকে স্বগৃহে ফিরে এসে দ্বিতীয় আশ্রম “ গার্হস্থ্য “ ( ২৫-৫০ বছর ) আশ্রম এ প্রবেশ করতে হতো । অর্থাৎ এ সময় পুরুষদেরকে বিবাহ করে স্ত্রী ও সন্তানাদিসহ সংসার করতে হতো । 

তৃতীয় আশ্রমকে বলা হতো “বাণপ্রস্থ” ( ৫০-৭৫ বছর ) । এসময় সংসার ,সম্পত্তি ,আত্মীয়স্বজনদের মায়া ত্যাগ করে পরলোক চিন্তাও ও বনে কুঠির বেধেঁ নির্লিপ্ত জীবন যাপন ছিল কর্তব্য । 

সর্বশেষ,  চতুর্থ আশ্রমকে বলা হতো ”সন্ন্যাস” ( ৭৫ – মৃত্যু পর্যন্ত ) । এ সময় সংসারত্যাগীকে সন্ন্যাসীর ন্যায় জীবনযাপন করতে হতো । 

সর্বশেষ ঋক -বৈদিক যুগের আর্য সমাজের প্রকৃতি বিশ্লেষণ এই কথা বলা যায় , চরিত্রগতভাবে আর্য সমাজ ছিল উপজাতীয় । এ যুগে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চেয়ে সমষ্টিগত জীবনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো । সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ ছিল বৈদিক সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য । 

অর্থনৈতিক অবস্থা : 

আর্যরা যখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করে তখন তারা ছিল অর্ধ- যাযাবর পশুচারক । প্রথম দিকে পশুচারকেই  ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা । তখন গরু ,ভেড়া, ছাগল ছিল তাদের প্রধান গৃহপালিত পশু । তবে ঋক-বৈদিক আর্যদের জীবনচর্চায় এ সকল পরশুর মধ্যে “গরু” একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে । কারণ গরূকে তারা গো -ধন  অর্থাৎ সম্পদ হিসেবে মনে করত । প্রাথমিক পর্যায়ে আর্যদের অর্থনৈতিক জীবনে গাভীর মূল্য এত বেশি ছিল যে তাদের মধ্যে গাভী অপহরণের প্রবণতা ছিল প্রবল এবং গবাদি পশুর জন্য তাদের মধ্যে মাঝেমাঝে যুদ্ধ হতো । সে সময় কোনো ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ নির্ধারিত হতো গো-সম্পদের ভিত্তিতে । অনেক সময় মূল্যের একক এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গরু ব্যবহার হতো । গরুর পর ঘোড়াই ‍ছিল মূল্যবান পশু । কারণ যুদ্ধের সময় এবং রথ টানার  কাজে ঘোড়া ব্যবহার হতো । 

আর্যরা ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে তাদের পেশার পরিবর্তন ঘটে । কমে কমে তারা পশুচারণ হতে কৃষিজীবীতে পরিণত হয় । লঙ্ঘনের সাহায্যে তারা জমি চাষাবাদ করত । যেহেতু ঋক-বৈদিক যুগের লোহার ব্যবহার শুরু হয়নি সেহেতু লঙ্ঘনের ফলায় তারা কাঠ ব্যবহার করত । এ যুগে উৎপন্ন ফসলের মধ্যে যব ও ধান এ ছিল প্রধান । ধান চাষ সম্ভবত : ঋক-বৈদিক যুগের শেষের দিকে শুরু হয় । 

ঋক-বৈদিক যুগে আর্যরা গ্রামে বসবাস করত । ফলে আর্যদের অর্থনৈতিক জীবনে গ্রাম প্রধান অঙ্গ রূপে স্থান লাভ করে । ঋকবেদে নগরের কোন উল্লেখ নেই । এ যুগের জমির মালিকানা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয় । ঐতিহাসিক কোশাম্বী মনে করেন , ঋক-বৈদিক যুগের জমি বন্টনের অথবা জমির ব্যক্তি মালিকানার কোন প্রশ্নই ছিল না । কিন্তু ঐতিহাসিক এইচ . ‍সি . রায়চৌধুরী কোশাম্বীর মতকে সমর্থন করেননি । তিনি বলেন ,চাষ যোগ্য জমির উপর ব্যক্তিমালিকানায় স্বীকৃতি ছিল । আবার কোন কোন পন্ডিত মনে করেন , ঋক-বৈদিক যুগের প্রথম দিকে জমির মালিক ছিল সমগ্র গ্রাম । ফসল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে । কিন্তু পরে , উপজাতি সংস্থাগুলো ক্রমেই জীর্ন হওয়ার ফলে গ্রামের পরিবারগুলোর মধ্যে জমি বন্টন করা হয় । এভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে । 

ঋক-বৈদিক যুগের নগরে অবস্থিত না থাকায় উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি সত্য , তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে যুগ একেবারে পিছিয়ে ছিল তা নয় । প্রথমদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য অনার্যদের হাতে ছিল । কিন্তু ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।  কালক্রমে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার সৃষ্টি হওয়ায় জমির মালিকরা কৃষিতে অন্য লোক নিয়োগ করে কৃষিক্ষেত্রে প্রাপ্ত মূলধন তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে । ঋক-বৈদিক যুগে স্থল ও জল উভয় পথেই ব্যবসা-বাণিজ্য চলত । কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না । তবে অনেকে অনুমান করেন যে , পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে আর্যদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে । ঋকবেদে বাণিজ্যপথ ও সামুদ্রিক যাত্রার উল্লেখ আছে । এ থেকে অনুমান করা যায় যে , সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে আর্যরা পরিচিত ছিল।  

ঋক-বৈদিক যুগের ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য মুদ্রা ব্যবস্থা তখনও সংগত হয়নি । প্রধানত : দ্রব্যের মাধ্যমে বিনিময় ব্যাবস্থা ছিল । গরু ছিল বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম । ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিস্ক নামক এক ধরনের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন ছিল বলে অনেকে মনে করেন। তবে ইহা কতটা নির্ভরযোগ্য তা বলা কঠিন। ঋকবেদে সূত্রধর,ধাতুশিল্প ,চর্মকার ,অন্তরায় ও কুস্তকারের উল্লেখ আছে । এ যুগের সমাজে কাঠমিস্ত্রির কাজ বিশেষ সম্মানজনক মনে করা হতো । কারণ যুদ্ধরত ও লাঙ্গল সূত্রধরেই তৈরি করত । ধাতুর মধ্যে স্বর্ণ ,তাম্র ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার অধিক ছিল । সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক নানা শিল্প কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো । 

ঋক-বৈদিক যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব উন্নত ছিল না । গরুর গাড়ি ও রথই ছিল স্থলপথ এর যোগাযোগের প্রধানতম বাহক । রথ টানার কাজে ঘোড়া ব্যবহার করা হতো । জলপথের প্রধান বাহক ছিল নৌকা । 

ধর্মীয় অবস্থা : 

ভারতবর্ষে আগমনের পূর্বে আর্যদের নিজস্ব কোন ধর্মবিশ্বাস ছিল না । ভারতবর্ষে আগমন এবং এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস গড়ে উঠে । ভারত বর্ষ ছিল প্রকৃতির লীলাভূমি । কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ অর্থাৎ নদ নদীর উৎপত্তি আকাশের চন্দ্র-সূর্যের উপস্থিতি প্রকৃতিতে নদী-নালা ও সমুদ্রের অবস্থানের ব্যাখ্যা দেওয়া তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব । এজন্য প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে আর্যরা দেবদেবী কল্পনা করে পূজা করতে শুরু কর । কারণ তাদের মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে, প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনা বা পরিবর্তন দৈবশক্তির অস্তিত্ব ছাড়া সম্ভব নয় । 

ঋক-বৈদিক আর্যদের ধর্মীয় চিন্তায় একেশ্বরবাদের কোন স্থান ছিল না । আর্যরা বহু দেবদেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত । তবে আর্যদের ধর্মে পুরুষ দেবতার প্রাধান্য ছিল । তাদের ধর্মীয় দেবদেবীর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনতম ছিলেন দেী এবং পৃথিবী । দেী ছিলেন আকাশের দেবতা বা পিতা এবং পৃথিবী ছিলেন মাতা । খাদ্য ও জল প্রকৃতির দ্বারা তারা মানবের বরণ পোষণ করতেন । কিন্তু পরবর্তীকালে আর্যদের মধ্যে অন্যান্য দেবতাদের প্রতি আস্থা ও আসক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেী ও পৃথিবীর প্রতি বিশ্বাস কমে যায় । 

ঋক-বৈদিক যুগে আর্যদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দেবতা ছিলেন” ইন্দ্র” । তিনি ছিলেন যুদ্ধের দেবতা । তিনি দস্যু অর্থাৎ অনার্যদের সঙ্গে যুদ্ধে আর্যদের নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধে জয়লাভের সাহায্য করেন । “পুরন্দর” হিসাবেও তিনি ঋকবেদে পরিচিত ছিলেন । কারণ তিনি দস্যুদের “ পুর” বা দুর্গ ধ্বংস করেন । ঋকবেদে অন্তত : ২৫০ টি  স্তোত্র তার উদ্দেশ্যে নিবেদিত । কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে , ইন্দ্র আসলে কোন দেবতা ছিলেন না । তিনি ছিলেন আর্যদের কোন বিজয়ী গোষ্ঠীপতি বা পুরোহিত রাজা । ক্রমে ক্রমে তার উপর দেবত্ব আরোপ করা হয় । ইন্দ্রের পর আর্যদের গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন বরুণ ও অগ্নি । বরুণ ছিলেন স্বর্গের দেবতা । তিনিই ছিলেন জাগতিক সমস্ত ঘটনার নিয়ন্ত্রক । আর্যদের ধারণা ছিল মানুষের মৃত্যুর পর তিনি এই পাপীদের বিচার করবেন এবং শাস্তি প্রদান করবেন । অগ্নি ছিলেন মানুষ ও দেবতাদের মধ্যে সংযোগকারী দেবতা । মানুষের দেওয়া যঞ্জাহুতি অগ্নি গ্রহণ করতেন এবং তাদের তাদের কাছে পৌঁছে দিতেন । আর্যদের দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রত্যেক গৃহে অগ্নি দেবতার বিশেষ গুরুত্ব ছিল । তখন অগ্নিদেবতাকে সাক্ষী রেখে আর্যরা  বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হত । আজো হিন্দুসমাজের এ রেওয়াজ প্রচলিত আছে । ”যম” ছিলেন মৃত্যুর দেবতা। ঋক বৈদিক যুগে “ যম” দেবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। এভাবে ঋকবেদে আমরা অসংখ্য দেবতার উল্লেখ পাই , যারা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিনিধি স্বরূপ ছিলেন । ঋকবেদে নারী দেবতার উল্লেখ আছে । নারী দেবতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পৃথিবী, অদিতি, ঊষা, নদী, সরস্বতী প্রভৃতি । উষা ছিলেন ভোরের দেবী ও সরস্বতী ছিলেন জলের দেবী । পরবর্তীকালে সরস্বতী শিক্ষার দেবী রূপে স্বীকৃতি হন । তবে ঋক বৈদিক যুগের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীদের গুরুত্ব তেমন ছিল না । 

বৈদিক যুগের প্রথম দিকে আর্যরা বহু দেবদেবীর উপাসনা করলেও মূর্তি তৈরি করে উপাসনা করা তাদের মধ্যে প্রচলন ছিল না । আর্য সাহিত্যে কোন মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায় না । এ যুগে আর্যদের উপাসনা পদ্ধতি ছিল সরল ও অনাড়াম্বর  অনাড়ম্বন । ঘরের এক কোণে অগ্নিকুণ্ড করে দেব দেবীর উদ্দেশ্যে দুধ ও মধু ইত্যাদি আহুতি দিয়ে এবং ও স্তোত্র পাঠ করে আর্যরা উপাসনা করত । আগুনে ঘি আহুতির মাধ্যমে পুরোহিতরা এই  অনুষ্ঠান শুরু করতেন । যাগযজ্ঞের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধে জয়লাভ ,পুত্র সন্তান লাভ , দীর্ঘজীবন , পশুখাদ্য প্রভৃতি লাভ । এ যুদ্ধে যাগ-যজ্ঞ ও বলিদান এর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম-কানুন তৈরি হয়নি । ধর্মীয় ক্ষেত্রে পুরহিত শ্রেণীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি । 

পরবর্তী বৈদিক যুগ : 

ঋকবেদের পরে যেসব বৈদিক গ্রন্থ রচিত হয় সেগুলোর পরবর্তী বৈদিক যুগের ইতিহাস রচনার প্রধান উৎস। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে ও পরবর্তী বৈদিক যুগের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যদের রাজনৈতিক, সামাজিক ,অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় । নিম্নে তা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হল : 

রাজনৈতিক অবস্থা : 

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে , ঋক বৈদিক যুগে আর্যদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয় সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে । কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যরা উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় এবং গাঙ্গেয় উপত্যকায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে । বস্তুত উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে আর্য সংস্কৃতির অধীনে আনাই ছিল তাদের এই সম্প্রসারনের লক্ষ্য। তাছাড়া আর্য শাসকদের সামরিক উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ও পূর্ব ভারতের রাজ্য বিস্তার ভূমিকা রাখে । এর ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজনীতির গুরুত্ব কমতে থাকে এবং গাঙ্গে উপত্যকায় আর্যদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে । উত্তর-পূর্ব ভারতে আর্যদের সম্প্রসারণ এর সঙ্গে সঙ্গে বৈদিক যুগের ভরত ও তুর্ভস গুষ্টির গুরুত্ব কমে যায় এবং নতুন গুষ্টির প্রাধান্য এর সূচনা হয় । গাঙ্গেয় উপত্যকায় গড়ে উঠে নতুন নতুন রাজ্য । এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কাশী ,কোশল, বৎস ও ‍বেদেহ  । মগধ রাষ্ট্র এ সময় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গুরুত্ব লাভ করে । তবে এযুগেও বঙ্গদেশ ও আসাম বৈদিক সভ্যতার বাইরে ছিল । 

পরবর্তী বৈদিক যুগের রাজার ক্ষমতা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায় । ঋক বৈদিক যুগে আর্যদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যেসব দ্বন্দ্ব চলত তেমনি এযুগেও শক্তিশালী রাজন্যবর্গের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত।  যুদ্ধে বিজয়ী রাজা পরাজিত রাজার রাজত্ব দখল করে বৃহৎ রাজ্য গঠনে সচেষ্ট হয় । বিজয়ীরা যারা যুদ্ধে জয়লাভের পর “ অশ্বমেধ “ বাজপেয় , রাজসুয় প্রভৃতি যজ্ঞ করত । ঋক বৈদিক যুগের রাজার ন্যায় এ যুগেও রাজা ছিলেন রাজ্যের রক্ষক এবং প্রজাহিতকর। এ যুগের রাজা স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না । কারণ রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান পুরহিত সম্পাদিত হতো এবং রাজাকে ব্রাহ্মণদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন করতে হতো । তাছাড়া , এ যুগের সভা ও সমিতির পরামর্শ রাজাকে গ্রহণ করতে হতো । অবশ্যই রাজকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই যুগে জনসংগঠনগুলোর গুরুত্ব অনেকটা কমে আসে । 

রাজকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেইস ঙ্গে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটে । ঋক-বৈদিক যুগের তুলনায় এ যুগে কর্মচারীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্যময়তা বৃদ্ধি পায় । ঋক বৈদিক যুগের পুরোহিতো, সেনানী ও গ্রামীণ রাজ কর্মচারীগণ এ যুগেও গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী হিসেবে গণ্য হতেন । তবে এই যুগের নতুন কয়েক ধরনের কর্মচারীর অবস্থিত লক্ষ করা যায় । যেমন : – সংগ্রাহীত্ব ( কোষাধক্ষ্য ) , ভাগদুখ ( রাজস্ব সংগ্রহ কারী ) , সূত ( রাজকীয় ঘোষক ) , ক্ষত্রী ( রাজ অন্তঃপুরের প্রধান ) , পালাগল ( রাজার সংবাদবাহক ) , গো-বিকর্তন ( রাজার শিকারি সঙ্গী ) , সচিব ( রাজার প্রধান আমত্য ) , এবং অক্ষ্যবাপ ( জুয়া খেলার প্রধান ) । 

এ যুগের প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থার সূচনা ঘটে । প্রাদেশিক কর্মচারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন স্থপতি ও শতপতি । সীমান্ত অঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন স্থপতি এবং  ১০০ গ্রামের ভারপ্রাপ্ত হতেন শতপতি । গ্রামীণ পর্যায়ে অধিকর্তা নামে এক কর্মচারীর নাম জানা যায় । রাজা অধিকর্তকে নিযুক্ত করতেন । 

ঋক বৈদিক যুগের ন্যায় এ যুগেও রাজার কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল না । যুদ্ধের সময় উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো রাজাকে সৈন্যসহ করত । এ যুগে রাজা নিয়মিতভাবে প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন । রাজা ছিলেন বিচার বিভাগের প্রধান । তিনি নিজে বিচারক নিয়োগ করতেন । বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো । 

সামাজিক অবস্থা : 

ঋক বৈদিক যুগের ন্যায় এ যুগের সমাজের ভিত্তি ছিল পরিবার । পিতা ছিলেন পরিবারের সর্বময় কর্তা । সমাজ পুরুষশাসিত হওয়ায় পুত্রসন্তানের কদর এ  যুগে পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায় । কন্যাসন্তানের যুগে কাম্য ছিলনা।  এ যুগে অতিথিয়তাকে বিশেষ মূল্য দেওয়া হতো । 

ঋক-বৈদিক যুগে সমাজে নারীর বিশেষ মূল্য ছিল । কিন্তু এই যুগে নারী মর্যাদাহীন হয়ে পড়ে । অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর কোনো স্বাধীনতা ছিল না । সম্পত্তির অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়।  সভা-সমিতিতে ও নারীর অংশগ্রহণের অধিকার নিষিদ্ধ হয়।  মোটের উপর এ যুগের নারীদের পণ্য ও ভোগ্য বস্তু বলে মনে করা হতো । অবশ্যই শিক্ষার দ্বার তাদের জন্য মুক্ত ছিল । এ যুগের সমাজ ব্যবস্থা বিশেষভাবে সুদৃঢ় হয় । গুহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্রে আর্য সমাজের নিয়ম কানুন সুনির্দিষ্ট করা হয় । 

ঋক বৈদিক যুগের সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণভেদ প্রথার তেমন কঠোরতা ছিল না । কিন্তু এযুগে বর্ণভেদ প্রথার কঠোরতা বৃদ্ধি পায় । সমাজ চতুর্বর্ণের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে । যারা পূজা-পার্বণ , যাগ-যজ্ঞ ও শাস্ত্র পাঠে নিয়োজিত হন তারা ব্রাহ্মণ্য নামে পরিচিত লাভ করে । দেশ শাসন ও সামরিক দায়িত্ব ছিল ক্ষত্রিয়দের উপর । কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে যারা লিপ্ত হয় তারা বৈশ্য নামে পরিচিত হয় । চতুবর্ণ ছাড়াও এ যুগে ব্রাত্য ও নিষাদ নামে দুইটি যাযাবর জাতির উল্লেখ পাওয়া যায় । তবে এই দুই জাতি বৈদিক ধর্মের রীতিনীতি পালন করত না । এযুগের সমাজে গুদ্রর কোন মর্যাদা ছিল না ।ঐতরেয় ব্রাহ্মণ্য বলা হয়েছে , গুদ্র অন্যের দাস , গুদ্রকে ইচ্ছেমাফিক হত্যা করা যায় । তবে এ যুগের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার ফলে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা দারুণভাবে বৃদ্ধি পায় । শতপথ , ঐতরেয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ্যকে রাজা চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে । ব্রাহ্মণ্যকে  কোনো কর দিতে হতো না । এ যুগে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ ও পানাহার নিষিদ্ধ ছিল । 

খাদ্য পোশাক-পরিচ্ছদ অবসর বিনোদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুগে কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে । গম ও যব এ যুগের অন্যতম শস্য হিসেবে পরিগণিত হয় । এ যুগে এই প্রথম ধান উৎপাদনে সূচনা হয় । পশুর মাংস ভক্ষণ এক্ষেত্রে সাধারণত অনীহা থাকলেও অতিথির সম্মানে কিংবা উৎসব অনুষ্ঠানে ভেড়া,ছাগল ও গোমাংস পরিবেশন করা হতো । পোশাকের ক্ষেত্রে পশমি বস্ত্র ব্যবহার হলেও এ যুগে তাঁর সঙ্গে রেশমি বস্তু যুক্ত হয় । এ যুগে রঙ্গিন এবং রং বিহীন উভয় ধরনের পোশাক পরিধান করা হতো । স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই এযুগে মাথায় পাগড়ী পড়তো । এ যুগেও অবসর-বিনোদনের  অন্যতম উপকরণ ছিল যন্ত্র ও কণ্ঠসঙ্গীত । 

এযুগের শিক্ষাপদ্ধতি ঋক বৈদিক যুগের অনুরূপ ছিল । ছাত্ররা গুরুগৃহে শিক্ষা লাভ করত । বেদ ও উপনিষদ ছাড়াও ছাত্রদের ব্যাকরণ , ন্যায় , আইন ,শিক্ষা দেওয়া হত । চিকিৎসা বিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যা এই যুগে যথেষ্ট উন্নত ছিল । চন্দ্র-সূর্য ছাড়াও বিভিন্ন গ্রহ ও বিশাল নক্ষত্ররাজির সঙ্গে বৈদিক আর্যরা পরিচিত ছিল । এযুগের পেশাদার চিকিৎসক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে । 

অর্থনৈতিক অবস্থা : 

পরবর্তী বৈদিক যুগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয় । ঋক বৈদিক যুগে আর্যরা মূলত : ছিল কৃষিজীবী এবং তারা গ্রামে বাস করত। নাগরিক জীবন সম্পর্কে তাদের কোন ধারনাই ছিল না । কিন্তু এই যুগে আর্যদের নাগরিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে । হস্তিনাপুর , কোশাম্বী , কাশী , প্রভৃতি নগর এ  যুগে গড়ে উঠতে শুরু করে । ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি এযুগের নগরভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে । 

ঋক বৈদিক যুগের তুলনা এই যুগে কৃষিখাতে যথেষ্ট উন্নত হয় । উর্বর গাঙ্গে উপত্যকায় আর্যদের বসতি স্থাপন এবং দক্ষ দ্রাবিড় কৃষক শ্রেণী সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কৃষির উন্নতির পক্ষে সহায়ক হিসেবে কাজ করে । এ যুগের লোহার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় । ফলে বন জঙ্গল পরিষ্কার হয় এবং সেই সঙ্গে বসতিও কৃষি সম্প্রসারণ ঘটে । জলসেচ ব্যবস্থা এবং জমিতে সারের প্রয়োগের ফলে কৃষি উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় । ঋক বৈদিক যুগের উৎপাদিত শস্যের পাশাপাশি নতুন শস্য এবং ফলমূল যেমন : গম, বার্লি , মটরশুঁটির, তিল  প্রভৃতি উৎপন্ন হয় । এ যুগে লঙ্ঘনের মাধ্যমে জমি কর্ষন করে চাষাবাদ করা হতো । অথর্ববেদ থেকে জানা যায় যে , এ যুগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ,খরা, শিলাবৃষ্টি এবং বন্যার কারণে অনেক সময় শস্যের  ক্ষতি হতো । 

এ যুগে কৃষি জমির মালিকানা ছিল ব্যক্তির হাতে । পরিবারের নিয়ন্ত্রণে জমিগুলো থাকতো । মহিলাদের জমির উপর কোন অধিকার ছিল না । রাজা শুধুমাত্র জমি সংক্রান্ত চুক্তি তত্ত্বাবধায়ন করত । সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই যুগে জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে । এই শ্রেণীর জমির মালিকানা ভোগ করত । তবে এ যুগের জমির মালিকানা হস্তান্তরের নিয়ম-কানুন কঠোর হয়। 

এ যুগের ব্যবসা-বাণিজ্য যথেষ্ট সম্প্রসারণ ঘটে । ব্যবসা-বাণিজ্য সাধারণত বৈশ্যদের হাতে ছিল । এ যুগের সাহিত্যে ধনীবণিক হিসাবে শ্রেষ্ঠীনদের  উল্লেখ পাওয়া যায় । সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী ব্যবসা বাণিজ্য চলত । এ যুগের মানুষের কাছে সমুদ্র অপরিচিত ছিল না । সাহিত্য প্রায়ই সমুদ্র শব্দটি ব্যবহার হয়েছে । এতে মনে হয় যে , এ সময় আর্যরা সমুদ্র বাণিজ্য যুক্ত ছিল । এ কারণে অনেকে মনে করেন , মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে আর্যদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঐ সময় গড়ে ওঠে । 

ধনী ব্যবসায়ী দা এ যুগে মিলিতভাবে নেগম বা সঙ্গ স্থাপন কর । মুদ্রা ব্যবস্থা বলতে বর্তমানকালের যা বুঝায় তার প্রচলন সে যুগে ছিল না । তবে অনেকে মনে করেন “ কৃষ্গল ‍ও ” শতমান “ নামে দুইটি পৃথক মুদ্রা প্রচলিত ছিল । এছাড়া পূর্ববর্তী যুগের মূল্যের একক হিসাবে “ নিষ্ক – এর প্রচলন এ যুগে ছিল । 

ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই যুগের শিল্পের ব্যাপক প্রসার লক্ষ্য করা যায় । ধাতু শিল্পের অনেক উন্নতি হয় । পূর্বের সোনা, রূপা, তামা ও ব্রোঞ্জোর সঙ্গে লোহা, সীসা, ও টিনের ব্যবহার যুক্ত হয় । চর্মশিল্প ,বস্ত্রশিল্প ,মৃৎশিল্প এবং সূত্রধরের শিল্পেও যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। এসকল শিল্প থেকে উৎপন্ন সামগ্রী বাণিজ্য পণ্য হিসেবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বাইরে ফেরিত হত । 

সুতরাং আমরা বলতে পারি যে , এ যুগের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ছিল যথেষ্ট উন্নত । এই যুগে আর্যদের পশুপালন জীবনের অবসান হয়ে কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে ওঠে । মানুষের জীবনে আসে স্থায়িত্ব । কৃষিকাজ,শিল্প কাজ ইত্যাদিতে সমৃদ্ধি এ যুগের মানুষ গাঙ্গেয় সমভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে । 

ধর্মীয় অবস্থা : 

পূর্বে উল্লেখিত রয়েছে যে , আর্যরা প্রাকৃতিক বিভিন্ন শক্তির উপাসনা করতো । প্রাকৃতিক দৃশ্য বা শক্তি আর্যদের মনোবৃত্তি বিষয়েও শ্রদ্ধার উদ্বেগ করতো তাদের উপর দেবত্ব আরোপ করে আর্যরা পূজা করত । যেমন:  দেী, বরুণ, ইন্দ্র, অগ্নি ইত্যাদি । ঋক বৈদিক যুগে আর্যদের পূজা-পার্বণ ও যাগযজ্ঞ ছিল অতি সাধারন ।  কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যদের ধর্মীয় চিন্তাধারা এবং অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় । ঋক বৈদিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ইন্দ্র ও অগ্নি এযুগে গুরুত্ব হারা । তাদের স্থলে এ যুগে আর্যদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে প্রজাপতি । সমস্ত জীবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনি বিবেচিত হন । প্রজাপতির বিস্তৃত প্রাধান্য এই যুগে একেশ্বরবাদের ধারণাটি স্পষ্ট করে তোলে । ঋক বৈদিক যুগের কম গুরুত্বপূর্ণ দেবতা রুদ্র ও বিষ্ণুর এ  যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে । দিরে দিরে রুদ্র এ যুগে মহত্ত্ব দেবতা মহাদেব বা পশুপতি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন । বিষ্ণু দিলেন সাধারণ মানুষের রক্ষা কর্তা । খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে দেবতা বিষ্ণুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন এক ধর্ম । 

ঋক বৈদিক যুগের ন্যায় এ যুগের মানুষের জাগতিক লাভের জন্য উপাসনা করত । অবশ্যই পূজার উপকরণ এই যুগে যথেষ্ট পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় । বলিদান প্রথা এ যুগে যথেষ্ট গুরুত্ব অর্জন করে। বলিদান এর সময় অনেকগুলো আচার বিধি মানতে হতো। ব্রাহ্মণ বা  পুরহিতশ্রেণি নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে এই যুগে অসংখ্য আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম দেয় । এ যুগের ধর্মীয় ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য বা পুরোহিত ফেনীর একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পূজা-পার্বণ ও যাগ-যজ্ঞ জটিল আকার ধারণ করে । 

এ যুগে ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বৈদিক সাহিত্য দার্শনিক তথ্যবহুল প্রসার ঘটে । এই দার্শনিক ধর্মীয় চিন্তাধারা “কর্মফল” ও ”জন্মান্তরবাদ” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে । উপনিষদের প্রথম পুনপ্রজন্ম বা জন্মান্তরবাদের তত্ত্ব প্রচারিত হয়েছে । এ যুগের মানুষের বিশ্বাস করতো যে , মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির দেহ লোকান্তরিত হলেও আত্মার মৃত্যু হয় না । নতুন দেহ নিয়ে আত্মা আবার জন্ম গ্রহন করে । একেই জন্মান্তরবাদ বলা হয় । কর্মফল বলতে জীবনে যে যেমন কর্ম করবে সে সেইরূপ ফল ভোগ করবে এবং পরবর্তী জীবনে উন্নত জীবন অথবা নিচুস্তরের জীবন লাভ করবে । এ ধারণার ফলে,. মানুষ পরজন্মে ভালো থাকার আশায় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান মান্য করে । পরবর্তী বৈদিক যুগে সৃষ্টি কর্মফলের ধারণা ভারতীয় চিন্তাধারা যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হচ্ছে । 

১) রেডিও কার্বন ( C-14 ) কি ? 

উত্তর : রেডিও কার্বন হলো এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ , যা দিয়ে প্রত্নতাত্তিক বস্তুর সময় ও নির্মাণকাল নির্ধারণ করা হয় । 

২) “ আর্ “  কারা ? 

উত্তর : আর্য একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর নাম । এই ভাষায় যারা কথা বলতো তারাই সাধারণত আর্য নামে পরিচিত । 

৩) ”সপ্তসিন্ধু” বলতে কি বুঝ ? 

উত্তর : সপ্তসিন্ধু বলতে সাতটি নদী অর্থাৎ সিন্ধু , বিতস্তা , চন্দ্রভাগা, ইরাবতি, বিপাশা, শতদ্রূ, সরস্বতীকে বুঝায়। 

৪) “আর্য ” কী? 

উত্তর : আর্য হল একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর নাম । 

৫) ঐতিহাসিক ড.এ.সি. দাশ , ডি.এস.ত্রিবেদী , এল.ডি.কল্প প্রমুখ মনে করেন আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ? 

উত্তর : ভারতবর্ষ । 

৬) আর্যদের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থের নাম কি ? 

উত্তর : বেদ । 

৭) আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য কি ? 

উত্তর : বেদ । 

৮) ”বেদ” কথাটির উৎপত্তি কোন শব্দ থেকে ? 

উত্তর : বিদ  শব্দ থেকে । 

৯) বিদ শব্দের অর্থ কি ? 

উত্তর : জ্ঞানের আধার । 

১০) বেদের অপর নাম কি ? 

উত্তর : শ্রূতি । 

১১) বেদ কত প্রকার ? ও কি কি ? 

উত্তর : বেদ চার প্রকার । যথা : ঋকবেদ,সামবেদ, যজুর্বেদ ও  অথর্ববেদ । 

১২) বেদ কত প্রকার এবং সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধার বেদ কোনটি? 

উত্তর: বেদ চার প্রকার । সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান বেদ হল ঋকবেদে । 

১৩) সামবেদে সহিংসতা কয়টি মন্ত্র আছে ? 

উত্তর : ১৮১০ টি । 

১৪) যজুবেদ এ কোন ধরনের মন্ত্রাদি আছে ? 

উত্তর : যাগ- যজ্ঞের । এতে মন্ত্রের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার । 

১৫) অথর্ববেদে কয়টি মন্ত্র আছে ? 

উত্তর : প্রায় ছয় হাজার । 

১৬) প্রত্যেকটি বেদকে আবার কয় ভাগে ভাগ করা যায়? 

উত্তর: প্রত্যেকটি বেদকে চার ভাগে ভাগ করা যায় । যথা: সংহিতা ,ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ । 

১৭) ব্রাহ্মণ্য কি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে ? 

উত্তর : যাগ-যজ্ঞের । 

১৮ ) বেদের দার্শনিক বিভাগ কোনটি ? 

উত্তর : আরণ্যক ও উপনিষদ ।  

১৯) বেদাঙ্গ কয় প্রকার ? 

উত্তর : বেদাঙ্গ ছয় প্রকার । যথা : শিক্ষা, ছন্দ্র , কল্প , ব্যাকরণ,  নিরুক্তর  ও  জ্যোতিষ। 

২০) কল্প কয় অংশে বিভক্ত? 

উত্তর: কল্প তিন অংশে বিভক্ত ছিল। যথা: শ্রেীতসূত্র, গুহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র । 

২১) সূত্র-সাহিত্য কাকে বলে ? 

উত্তর : বেদাঙ্গ ও ষড়দর্শনকে একত্রে ”সূত্র সাহিত্য”  বলে । 

২২) বৈদিক যুগের সূচনা কবে থেকে ? 

উত্তর : খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৫০০ অব্দে আর্যদের ভারতবর্ষে আগমন এর পর থেকে বৈদিক যুগের সূচনা হয় । 

২৩) আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কোনটি ? 

উত্তর : বেদ আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ । 

২৪) বৈদিক সভ্যতা কাকে বলে ? 

উত্তর : আর্যদের ধর্ম ,সমাজ, দর্শন ,আচার-ব্যবহার রীতিনীতি প্রভৃতির উৎস বেদ । এই বেদকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে যে সভ্যতার সূচনা হয় তা বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত এবং এই সময়কে বৈদিক যুগ বলা হয় । 

২৫) বৈদিক যুগ কে কয় ভাগে ভাগ করা যায় ? 

উত্তর : বৈদিক যুগেকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । যথা : ক) ঋক বৈদিক যুগ ও খ) পরবর্তী বৈদিক যুগ । 

২৬) ঋক বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগ কাকে বলে । 

উত্তর : উপমহাদেশে আর্যদের আগমনের সূচনাকাল হতে ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালকে অর্থাৎ ঋকবেদের রচনাকালকে ঋক-বৈদিক যুগ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দ হতে গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাবের পূর্ব পর্যন্ত সময়কাল পরবর্তী বৈদিক যুগের অন্তভুক্ত । 

২৭) ঋক বৈদিক যুগে আর্যদের শাসন ব্যবস্থা ছিল? 

উত্তর : রাজতান্ত্রিক । 

২৮) ঋক-বৈদিক যুগে আর্যরা কয়টি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল ? 

উত্তর : ঋক-বৈদিক যুগে আর্যরা  তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল যথা : যোদ্ধা বা অভিজাত শ্রেণী , পুরোহিত শ্রেণি ও সাধারণ মানুষ । 

২৯) আর্য ও অনার্যরা কোন বর্ণের ছিল? 

উত্তর: আর্যরা ছিল গৌড়বর্ণ এবং অনার্যরা ছিল তামাটে বা কালো  বর্ণের । 

৩০) আর্য সমাজ কয়টি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে ? 

উত্তর : আর্য সমাজ চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে যথা: ব্রাহ্মণ্য , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও গুদ্র । 

৩১) আর্যদের জীবনযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কি ছিল ? 

উত্তর : চতুরাশ্রম । 

৩২)প্রথম আশ্রমকে কি বলা হয় ? 

উত্তর : প্রথম আশ্রমকে বলা হয় ব্রহ্মচর্য ( ১-২৫ বছর ) । এ সময় প্রত্যেক পুরুষকে গুরুগৃহে থেকে বিদ্যা চর্চা করতে হতো । 

৩৩) দ্বিতীয় আশ্রমকে কি বলা হয় ? 

উত্তর : দ্বিতীয় আশ্রমকে বলা হয় “ গার্হস্থ্য “( ২৫-৫০ বছর ) । ব্রহ্মচর্য পর্যায় শেষ হলে বিদ্যার্থীকে স্বগৃহে ফিরে এসে দ্বিতীয় আশ্রম এ প্রবেশ করতে হতো ।এ  সময় পুরুষকে বিবাহ করে স্ত্রী ও সন্তানসহ সংসার করতে হতো । 

৩৪) তৃতীয় আশ্রমকে কি বলা হয় ? 

উত্তর : তৃতীয় আশ্রমকে বলা হয় ” বানপ্রস্থ “ ( ৫০-৭৫ বছর ) । এ সময় সংসার সম্প্রতি আত্মীয়-স্বজনদের মায়া ত্যাগ করে পরলোক চিন্তা ও বনে কুটির বেঁধে নির্লিপ্ত  জীবন যাপন ছিল কর্তব্য । 

৩৫) চতুর্থ আশ্রমকে কি বলা হয় ? 

উত্তর : চতুর্থ আশ্রম কে বলা হয় সন্ন্যাস ( ৭৫- মৃত্যু পর্যন্ত ) । এ সময় সংসার ত্যাগীকে সন্ন্যাসীর ন্যায় জীবন যাপন ছিল কর্তব্য । 

৩৬) জন্মান্তরবাদ বলতে কি বুঝ ? 

উত্তর :এ যুগের মানুষ বিশ্বাস করত যে , মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির দেহ লোকান্তরিত হলেও আত্মার মৃত্যু হয় না । নতুন দেহ নিয়ে আত্মা আবার জন্ম গ্রহন করে । একেই জন্মান্তরবাদ বলা হয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × = 1