প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস

( ‍Sources of Ancient Indian History ) 

১) প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের উৎসগুলো আলোচনা করো । 

২) দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের উৎস গুলির নাম লেখ । 

৩) প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস গুলো কি কি ? 

৪) ইতিহাসের উৎস বলতে কি বুঝ ? প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস গুলো আলোচনা করো । 

৫) প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সাহিত্যিক উপাদান আলোচনা কর । 

ইতিহাস হল মানব জাতির অতীত কার্যাবলীর একটি নিখুঁত প্রতিবিম্ব ।  অতীত ঘটনাই  ইতিহাসের বিষয়বস্তু । তবে সব অতীতেই ইতিহাস নয় । অতীতের ঘটনা জানার জন্য ঐতিহাসিকরা যেসব তথ্যের উপর নির্ভর করেন সেই নির্ভরযোগ্য তথ্য গুলি হল ঐতিহাসিক উপাদান । আর এই উপাদান গুলো যা থেকে পাওয়া যায় তাকে ইতিহাসের উৎস বলে । 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সহজসাধ্য নয় । কারণ সে সময় ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক রচিত ভারতবর্ষের কোন ধারাবাহিক ইতিহাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না । ভারতের ইতিহাস “ পঞ্চম বেদ “ বলে অভিহিত হলেও ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয়গন তেমন কোন আগ্রহ দেখা নেই । ভারতের ইতিহাস গ্রন্থের এই শূন্যতার কারণ অনুসন্ধান করেছেন ঐতিহাসিক ড.এ.বি.কিথ ( A.B.Keith )। তিনি বলেন ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটেনি বলে তারা জাতীয় ইতিহাস লিখতে অনুপ্রাণিত হয়নি । তাছাড়া কিথের  মতে  “ সেসময় ভারতীয়রা ধর্ম ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় বেশি প্রভাবিত ছিল ” । সেই কারণে পার্থিব ঘটনাবলির প্রতি তারা গুরুত্ব দেননি । তবে প্রাচীনকালের ভারতীয়রা ইতিহাস রচনার জন্য কোন তথ্যই রেখে যাননি – এটা সত্য নয় । সেই সময় ও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । ইউয়েন  সাং এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে , সে সময় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজাগণ তাদের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা লিপিবদ্ধ করার জন্য কর্মচারী পোষণ করতেন । প্রাচীন যুগে শিলালিপি ও  তাম্রলিপি রাজাদের বংশতালিকা, বিজয়ের কৃতিত্ব , ধর্মীয় অনুশাসন, প্রশাসনিক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ের লিপিবদ্ধ আছে । হিন্দু রাজাগণের সভাকবিগণ ও রাজাদের কীর্তিকাহিনী মনোরম ভাষায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন । তাছাড়া বেদ , বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে ও প্রাচীন হিন্দুদের ইতিহাসবোধের পরিচয় পাওয়া যায় । তবে একথা সত্য যে , আধুনিককালের ন্যায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমালোচনামূলক ইতিহাস রচনা করার কৌশল প্রাচীন ভারতীয়দের জানা ছিল না । হেরোডোটাস , থুকিডিডিস ,লিভি ও ট্যাসিটাসের মতো কোনো ঐতিহাসিক তখন ভারতে জন্মগ্রহণ করেন নি । সুতরাং বিভিন্ন উৎস থেকে আধুনিক ঐতিহাসিকগনেরই  প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে । 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানকে প্রধানত দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে । ক) সাহিত্যিক উপাদান  ও খ)  প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান । 

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস রচনা করেছেন বটে তবে তাদের যুগের অনেক সাহিত্যধর্মী গ্রন্থ পাওয়া গেছে, যা অনেক ঐতিহাসিক তথ্য সম্বলিত। সেই তথ্যকে সাহিত্যিক উপাদান বলে। 

আর বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে যে সকল ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় সেগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বলে।  

সাহিত্যিক উপাদান : সাহিত্যিক উপাদান গুলোকে আবার দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায় যথা : ক) ভারতীয় সাহিত্য ও খ) বৈদেশিক সাহিত্য । 

ভারতীয় সাহিত্য : 

১) বেদ: 

গ্রীক বীর আলেকজান্ডার এর ভারত অভিযানের পূর্ববর্তী ইতিহাস জানতে হলে বৈদিক সাহিত্যের উপর নির্ভর করতে হয় । বৈদিক সাহিত্য বলতে বেদকে বুঝায় । বেদ প্রধানত চার প্রকার যথা : – ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব । এছাড়া ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, ধর্মসূত্র, সূত্র সাহিত্য ও উপনিষদ বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত । বেদ থেকে আর্যদের সমাজ, রাষ্ট্র ,ধর্ম , অর্থনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায় । বেদ পরিশিষ্ট হিসাবে লিখিত ব্রাহ্মণ , আরণ্যক ধর্মসূত্র সূত্র সাহিত্য ও উপনিষদ থেকে বৈদিক যুগের মানুষের আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা,  দর্শনচর্চা প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যায় । সুতরাং ইতিহাসের উৎস হিসেবে এগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না । 

২) বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ : 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ গুলো বিশেষভাবে সহায়ক । বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতক , দীপবংশ ও মহাবংশ । পালি ভাষায় রচিত গ্রন্থ থেকে গৌতম বুদ্ধের প্রাথমিক জীবনের পরিচয় পাওয়া যায় । জাতকের ৫৫০ টি শ্লোকে গৌতম বুদ্ধের জন্ম- জন্মান্তর সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় । রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে জাতকগুলো মূল্যহীন হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ । সিংহলে রচিত দীপবংশ ও মহাবংশ গ্রন্থ থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় এবং সম্রাট অশোক সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায় । এছাড়া বেীদ্ধগ্রন্থ ” দীঘনিকায় “ ও অঙ্গওরনিকা “ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা ও মগধের উত্থান সম্পর্কে জানা যায় ।  বেীদ্ধগ্রন্থ ” ললিত বিস্তার , ও বৈপুল্যসূএ ‘ গৌতম বুদ্ধের জীবনী গ্রন্থ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ । 

৩) জৈন ধর্মগ্রন্থ : বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থের ন্যায় জৈন  ধর্মগ্রন্থগুলো ইতিহাসের উৎস হিসাবে মূল্যবান ।  জৈনগ্রন্থ  “ ভগবতী সূত্ “ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে সাহায্য করে। ভগ্রবাহু রচিত “ জৈনকল্প  সূত্রে “ জৈন তীর্থস্করদের এবং মহাবীরের জীবন কাহিনী বর্ণিত আছে । হেমচন্দ্র রচিত “ পরিশিষ্টপর্বন “ গ্রন্থটি চন্দ্রগুপ্ত মেীর্যের  ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । 

৪) পুরান : প্রাচীনকালের কাহিনীকে পুরান বলা হয় । পুরাণের সংখ্যা ১৮ টি । এরমধ্যে মৎস্য, বায়ু , ভাগবৎএবং ভবিষ্য পুরাণ ইতিহাস রচনার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। পুরান সম্পর্কে ঐতিহাসিক উইন্টারনিজ  বলেন  “ রাজনৈতিক ইতিহাস ও প্রাচীন রাজবংশ গুলোর পরিচয় সম্পর্কে পুরান গুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না । “ বিষ্ণুপুরাণ ও মৎস্যপুরাণ মৌর্য ও  শৈগুনাথ বংশের ইতিহাস রচনায় অমূল্যর উৎস । বায়ু পুরাণ হতে গুপ্ত রাজাদের আদি বাসস্থান ও তাদের প্রারম্ভিক ইতিহাস পাওয়া যায় । প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক ইতিহাস রচনায় কাজেও পুরান গুলো সাহায্য করে । তবে ইতিহাসের উৎস হিসাবে পুরানের উপর বেশি নির্ভর করা সমীচীন নয় । কারণ পুরাণের কাহিনী খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বের । কিন্তু পুরান সংকলিত হয়েছে প্রধানত :গুপ্তযুগে । এই দীর্ঘ সময় কালের ব্যবধানে পুরান গুলোর মধ্যে নানা পরিবর্তন ঘটেছে । ফলে ইতিহাসের উৎস হিসেবে পুরানের গুরুত্ব কম। পুরান কেবলমাত্র অন্য উৎস থেকে সংগ্রহীত তত্ত্বকে সমর্থন করে মাত্র । 

৫) মহাকাব্য : 

ইতিহাসের উৎস হিসেবে দুইটি মহাকাব্য যথা : – রামায়ণ ও মহাভারত এর মূল্য কম নয় । মহাকাব্য দুইটি ভারতের জীবন ও আদর্শ বিষয়ে এক বিশাল ও অক্ষয় ভান্ডার – তৎকালীন রাষ্ট্রচিন্তা ,সমাজ চিন্তা , রীতিনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে এক বিশ্বকোষ বিশেষ । মহাকাব্য দুইটির সময়কাল নিয়ে মতবিরোধ আছে । সাধারণত মনে করা হয় , খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দি হতে খ্রিস্টীয়  তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে মহাকাব্য দুইটি রচিত হয়েছে । রামায়ণ-মহাভারতের পূর্ববর্তী ।  বাল্মিকী রচিত রামায়ণ সপ্তকাণ্ড ও চব্বিশ হাজার শ্লোক এবং ব্যাসদেব রচিত মহাভারত অষ্টাদশ পর্ব ও এক লক্ষ শ্লোক  সমন্বিত । রামায়ণ এর বিষয়বস্তু রাম ও রাবণের যুদ্ধ । ঐতিহাসিক দিক থেকে আর্যদের সঙ্গে অনার্যদের যুদ্ধের কাহিনী । মহাভারত রাজ্য নিয়ে কুরূ ও পান্ডবদের যুদ্ধ কাহিনী নিয়ে রচিত । তবে মহাকাব্য দুইটির মধ্যে মহাভারতকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় । মহাকাব্যের ঘটনাসমূহ কল্পনা -প্রসূত ও  অতিরঞ্জিত হলেও এই গ্রন্থ হতে প্রাচীন ভারতের সমাজ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের আভাস পাওয়া যায় । 

৬) রাজবৃত্ত : 

প্রাচীন যুগে অনেক রাজা তাদের রাজত্বকালের গুরুত্বপুর্ণ ঘটনাসমূহ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন । কিন্তু ইতিহাস রচনাকল্পে এগুলোর যথাযথ ব্যবহার করা হয়নি । দ্বাদশ শতকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কলহন কাশ্মীরের সরকারি দলিলপত্রে সাহায্য এবং প্রচলিত উপাখ্যান গুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্কৃত ভাষায় কাশ্মীরের রাজতরঙ্গিনী রচনা করেন । এই  গ্রন্থকেই ভারতে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় । কাশ্মীরি ছাড়াও গুজরাটের ইতিহাস রচনার জন্য মেরুতুঙ্গের  প্রবন্ধ চিন্তামণি , সোমেশ্বরের রাসামালা, রাজশেখরের  প্রবন্ধ কোষ গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে । 

৭) জীবন চরিত্র : 

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে জীবন- চরিত্র মূলক  গ্রন্থগুলো বিশেষ মূল্যবান। গ্রন্থসমূহের মধ্যে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে । যেমন: হর্ষবর্ধনের সভাকবি বানভট্টের লেখা হর্ষচরিত , বিলহন রচিত “ বিক্রমাস্কদেবচরিত্র” জয়সিংগ এবং হেমচন্দ্রে “ কুমারপালচরিত্ “  , সন্ধ্যাকরনন্দী রচিত রামচরিত্র প্রকৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থগুলোতেশাসকবর্গের প্রতি মাত্রাতিরিক্তপক্ষপাতিত্ব আছে বিদায় ইতিহাস রচনা করার ঝুঁকিপূর্ণ । তথাপি এগুলোতে যে মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য সন্নিবিষ্ট আছে তাতে সন্দেহ নেই । 

মধ্যযুগে বেশকিছু সাহিত্যের পরিচয় পাওয়া যায় সেগুলো প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে খুবই মূল্যবান । এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কেীটিল্যের  “ অর্থশাস্ত্র “ , পনিনির “ অষ্টাধ্যায়ী “ ও পতঞ্জলী “ মহাভাষ্য “ । কুষাণ যুগে অশ্বঘোষ ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভাবান অধিকার । তার রচিত ” বুদ্ধচরিত্র “ , সেীন্দরনন্দ কাব্য ” সূত্রালঙ্কার “ ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মূল্যবান গ্রন্থ । সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেন রচিত এলাহাবাদ প্রশস্তি হতে সমুদ্রগুপ্তের কার্যকলাপ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায় । মহাকবি কালিদাসের কাব্য ও নাটক থেকে ও সমকালীন ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের চিত্র পাওয়া যায় । বরাহ মিহিরের “ বৃহৎসংহিতা “ এবং বাৎসায়নের “ কামসূত্র “ গ্রন্থে সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র বর্ণিত হয়েছে । 

বৈদেশিক সাহিত্য : 

১) মধ্য যুগে ভারতে আগত বিদেশী পর্যটকদের পরিচয় দাও । তাদের লিখিত বিবরণ ইতিহাসের উৎস হিসেবে কেন গুরুত্ব বহন করে ? 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস হিসেবে বৈদেশিক সাহিত্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ । প্রাচীন ভারতের গ্রীস , রুম, চীন , তিব্বত, আরব প্রভৃতি দেশ হতে অসংখ্য পর্যটক ও লেখক বিভিন্ন সময় ভারতে আসেন । এদের মধ্যে কেউ আসেন ভ্রমণ করতে , কেউ রাজদূত হয়ে , কেউ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য,  আবার কেউ ধর্ম প্রচার করতে । এদেশে এসে তারা ভারতের জনজীবন ,অর্থনীতি ,ধর্ম, সংস্কৃতি যা কিছু দেখেছেন তাই তুলে ধরেছেন তাদের লেখনীতে । ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাদের বিবরণ ইতিহাসের উপাদান হিসেবে খুবই মূল্যবান । 

গ্রিক লেখকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস এর নাম উল্লেখ করতে হয় । তিনি কখনো ভারতে আসেন নি । কিন্তু তার বিখ্যাত গ্রন্থ পার্সে ( Persae ) থেকে পারস্য উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ ও অধিকারের কথা জানা যায় । তার রচনা থেকে আরও জানা যায় যে , উত্তর পশ্চিম ভারত এক সময় পারস্য সম্রাট দারায়ুসের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পারস্যের বিশতম প্রদেশ ছিল । 

আলেকজান্ডারের উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ সম্পর্কে কোনো বিবরণ ভারতীয় সমসাময়িক যুগের কোন সাহিত্য পাওয়া যায় না । এক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় , কার্টিয়াস, এ্যারিয়ান, ডিওডোরাস , স্ট্রাবো, প্লুটার্ক প্রভুতি গ্রিক ও রোমান লেখকদের রচনা উপর । তাছাড়া এসব লেখকদের রচনা থেকে ভারতের রাজনৈতিক ,সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় । কিন্তু ভারত ইতিহাস রচনায় গ্রীক দূত মেগাস্থিনিসের বিবরণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ । মেগাস্থিনিরস সেলুকাসের দূত হিসেবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে কিছুদিন ছিলেন। তার লেখ “ ইন্ডিক “ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। কিন্তু তা থেকে প্রচুর উৎপত্তি গ্রিক লেখকদের রচনায় পাওয়া যায় , যা থেকে মেীর্য যুগের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় । 

প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক বিবরণ ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের উৎস হিসেবে দুইটি গ্রীক গ্রন্থ ছিল মূল্যবান । একটি দি পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সি , ( The Periplus of the Erythrean Sea ) অর্থাৎ ভারত মহাসাগরে ভ্রমণ । খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কোন এক অজ্ঞাত গ্রিক নাবিক কর্তিক এই গ্রন্থটি রচিত হয় । অন্য গ্রন্থটি হল টলেমির জিওগ্রাফি ( Geography ) । রোমান লেখক প্লিনির “ ন্যাচারালিস  হিস্টোরিয়া ( Naturalis Historia ) গ্রন্থটি ভারত-  ইতালির বাণিজ্য সম্পর্কের উপর একটি নির্ভরযোগ্য দলিল । 

মৌর্য পরবর্তী যুগে ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে চৈনিক ঐতিহাসিক ও পর্যটকদের গ্রন্থাদীর  মূল্য অনস্বীকার্য । চৈনিক পর্যটকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফা- হিয়েন ( Fa-hsien ) এবং হিউয়েন সাং ( Hsuan Tsang ) । এরা দুজনেই ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী । বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলো দর্শন এবং বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অধ্যায়ন করতে এরা ভারতে আসেন । ফা- হিয়েন ভারতে আসেন গুপ্তরাজ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে এবং হিউয়েন সাং ( Hsuan Tsang ) হর্ষবর্ধনের শাসন আমলে ।  ফা- হিয়েন গুপ্ত যুগের সমাজ ও অর্থনীতির উপর যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন তা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার অমূল্য সম্পদ । হিউয়েন সাং( ৬২৯-৪৪ খ্রিষ্টাব্দ ) দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল পরিবহন করে যে জ্ঞান লাভ করেন তা পরে তিনি “ সি ইউ কি ( Si Yu Ki ) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে যান । তার বিবরণে হর্ষবর্ধনের রাজত্বকাল এর বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ আছে । সপ্তম শতকের শেষার্ধে ইং -সিং ( ৬৭১-৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে ) নামে অপর একজন চৈনিক পর্যটক ভারতে আসেন। তার বিবরণী থেকে গুপ্ত রাজাদের আদি বাসস্থান, বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দিক এবং ভারতীয় জনগণের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে জানা যায় । চৈনিক পর্যটকদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং পক্ষপাতিত্ব ইতিহাসের উপাদান রূপে তাদের মূল্যকে অনেকাংশই সংকুচিত করেছে সত্য , তথাপি বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস রচনায় চৈনিক অবদান অনস্বীকার্য । তিব্বতীয় ঐতিহাসিক তারানাথের গ্রন্থটিও বৌদ্ধ ধর্মের উপর একটি মূল্যবান গ্রন্থ । 

আবার ঐতিহাসিক ও পর্যটকদের বিবরণ ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে । অষ্টম শতক থেকেই ভারতবর্ষ আরবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । “ চাচনামা “ গ্রন্থ থেকে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের কাহিনী এবং তৎপূর্ববর্তী শতকের ইতিহাস জানা যায় । কিন্তু একাদশ শতকে ভারত সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন বিখ্যাত আরব পর্যটক আল-বিরুনী । তিনি নানা বিদ্যায় পারদর্শী ও প্রতিভাবান লেখক ছিলেন । তিনি গজনীর অধিপতি সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের সময় তার সঙ্গে ভারতে আসেন । ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ “ কিতাব উল হিন্দ “ বা ভারত তত্ত্ব রচনা করেন । এই গ্রন্থে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থার কোন উল্লেখ না থাকলেও তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু হিন্দুদের ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার চিত্র বিশদভাবে উল্লেখ আছে । তাছাড়া ভারতের গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা,জ্যোতির্বিদ্যা , দর্শন ও ভূগোল প্রভৃতি বিষয় তার গ্রন্থে স্থান পেয়েছে । তবে আল বিরুনীর এই গ্রন্থটি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল নয় । তিনি গ্রন্থটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর না করে সমসাময়িক সাহিত্যের উপর ভিত্তি করে রচনা করেন । আল বিরুনী ছাড়াও আরো কয়েকজন আরব পর্যটক ভারতবর্ষে এসেছিলেন এবং ভারত ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য বহুল গ্রন্থ রচনা করেছেন । এরা হচ্ছেন আল – মাসুদি , হাসান নিজাম,  সোলেমান প্রমুখ । 

প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস ও উপাদান : 

১) ইতিহাসের উৎস হিসেবে শিলালিপি ও মুদ্রার গুরুত্ব লেখ ? 

২) প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান গুলি আলোচনা করো । 

৩) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলতে কি বুঝ ? ইতিহাসের উৎস হিসেবে লিপি ও মুদ্রার বিবরণ দাও ? 

৪) প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে লিপির গুরুত্ব আলোচনা । 

৫) প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে স্থাপত্য – ভাস্কর্যের গুরুত্ব আলোচনা করা । 

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বলতে ভারতের বিভিন্ন প্রত্নস্থল প্রাপ্ত লিপি বা লেখ , মুদ্রা, স্থাপত্য ,ভাস্কর্য প্রভৃতি নিদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে বুঝায় । নিম্নে ইতিহাসের উৎস হিসাবে এসকল নিদর্শনগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো : 

১) লিপি : 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে লিপি একটি উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে । প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে বিভিন্ন লিপি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রাচীন কালের ইতিহাস রচনায় লিপির গুরুত্ব এজন্য যে , যুগে যুগে সাহিত্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসলেও লিপি অপরিবর্তিত রয়ে যায় । বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য কতখানি সত্য তা লিপির সাহায্যে নিরূপণ করা যায় । 

প্রাচীনকালে বিভিন্ন লিপি সোনা ,রূপা, তামা ,লোহা ,ব্রোঞ্জ , পাথরের উপর খোদাই করা অবস্থা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে । লিপি গুলো সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত তামিল-তেলেগু প্রভৃতি ভারতীয় ভাষায় রচিত । লিপি সমূহের প্রাচীনকালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাঃ : – রাজ্যজয় ,ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, ধর্ম ,শাসন পরিচালনা প্রভৃতি বিভিন্ন দিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ । লিপি গুলোর মধ্যে সম্রাট অশোকের শিলালিপি গুলির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি । ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে জেমস প্রিন্সেপ অশোকের লিপি গুলোর পাঠোদ্ধার করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন । এই লেখাগুলোতে অশোকের ব্যক্তিত্ব, রাজ্য জয়, বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ,বিজয় নীতি প্রভৃতি বিষয় বিধৃত আছে । প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস হিসেবে অশোকের শিলালিপি গুলি এক মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল । 

অশোকের পরবর্তী যুগের লিপি গুলোকে সরকারি ও বেসরকারি এই দুই ভাগে ভাগ করা যায় ।। সরকারি লিপি গুলো আবার  প্রশস্তি ও ভূমিদানপত্র এই দুই ভাগে বিভক্ত । প্রশস্তিসমূহের মধ্যেই হরিষেন রচিত সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য । এতে সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় সম্পর্কিত বিবরণ এবং তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় । এছাড়া , সাতবাহন বংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতি গেীতমীপুত্র শ্রীসাতকর্নির নাসেক প্রশস্তি থেকে গৌতমী পুত্রের রাজ্য জয় এবং সমাজ সংস্কারক মূলক কাজের বিবরণ , শক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদমনের জুনাগড় লিপি থেকে তার রাজ্য জয় এবং জনকল্যাণমূলক কাজের বিবরণ এবং উমাপতিধর রচিত দেওপাড়া প্রশস্তি থেকে বাংলার সেন বংশের রাজা বিজয় সেনের কীর্তিকাহিনী জানা যায় । খালিমপুর তাম্রফলক থেকে বাংলার পাল সম্রাট ধর্মপাল সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায় । প্রশস্তি গুলোতে আড়ম্বর ও অতিরঞ্জিত থাকলেও ঐতিহাসিক ঘটনার অকাট্য সাক্ষ্য হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম । ভূমি ব্যবস্থা বা শাসন ব্যবস্থার সঠিক পরিচয় লাভের জন্য ভূমিদান সংক্রান্ত লিপি গুলোর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । বেসরকারি লেখাগুলো প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় নানাভাবে সাহায্য করে । সাধারণত দেবদেবীর মূর্তি বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গায়ে এই জাতীয় লেখ  খোদাই করা থাকতো । ধর্ম ও শিল্পকলার ইতিহাস বুঝতে গেলে এগুলো সাহায্য নেওয়া অবশ্যম্ভাবী । 

বিদেশে পাপ্ত শিলালিপিগুলোও  প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় কাজে বিশেষভাবে সহায়ক। পশ্চিম এশিয়ায় প্রাপ্ত বোঘজ-কোই লিপি ( খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৪০০  অব্দ ) থেকে ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন , তাদের দেবতাদের নাম জানা যায় । পারস্য সম্রাট প্রথম দাসায়ুস ( খ্রিস্টপূর্ব ৫২২-৪৪৬ অব্দ ) এর পার্সেপোলিস এবং নকস ই-রূস্তম লেখ থেকে জানা যায় , গান্ধার একসময় পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় উপনিবেশ বিস্তারের কাহিনী জানতে হলে প্রধানত : বিদেশে প্রাপ্ত লিপির উপর নির্ভর করতে হয় । 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় লিপিগুলো  নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ । 

প্রথমত , লিপি গুলো বিভিন্ন ধাতুর উপর খোদাই করা বলে এর কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা সম্ভব হয়না । ফলে লিপির সভ্যতা অক্ষুন্ন থাকে । 

দ্বিতীয়ত , লিপির প্রাপ্তিস্থান হতে কোন রাজা ও সম্রাটের রাজ্য বা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । 

তৃতীয়ত , অন্য কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য লিপি দ্বারা অনুমোদিত হয় । 

চতুর্থত , লিপির খোদাই কাজ দেখে সমসাময়িককালের শিল্পীদের শিল্পোৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায় , তেমনি সে সময় ধাতু শিল্পের উন্নতির স্তর সম্পর্কে জানা যায় । 

পঞ্চমত , বিদেশে প্রাপ্ত লিপির উল্লেখ থেকে ভারতের সঙ্গে যে সকল দেশের রাজনৈতিক , সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায় । এভাবে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে লিপি নানাভাবে সাহায্য করে । 

২) মুদ্রা : 

মুদ্রা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস । ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য সোনা, রুপা ও তামার মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে । এসব মুদ্রা থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজা শাসন করতেন তাদের পরিচয় পাওয়া যায় । ব্যাকট্রিয় , গ্রীক,  শক , পলহব রাজা গনের রাজত্বকাল এর প্রধান ঐতিহাসিক উৎস হল মুদ্রা।
সাহিত্য ও লিপি থেকে যে তথ্যাদি পাওয়া যায় তার সত্যতা যাচাই করতে মুদ্রা যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। তারিক সম্মিলিত মুদ্রা বিভিন্ন রাজার সময়কাল নির্ণয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মুদ্রা হতে সমসাময়িক অর্থনৈতিক অবস্থা, মুদ্রানীতি, ধাতু শিল্পের উন্নতির সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।  মুদ্রায় অংকিত ছবি থেকে শিল্প নিপুণতা ও রাজা-মহারাজাদের আচার-আচরণ , সংগীতানুরাগী প্রভৃতি ধারণা জন্মে । মুদ্রার প্রাপ্তিস্থান হতে রাজ্যের বিস্তৃতি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায় । ভারতে বিলুপ সংখ্যক রোমান মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে । এর থেকে প্রমাণিত হয় যে , প্রাচীনকালে ভারত ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। মুদ্রা থেকে রাজাদের শাসন ও তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায়। কুষাণ রাজা দ্বিতীয় কদুফিসিসের মুদ্রায় ব্যবহৃত “ মহেশ্বর “ কথাটি থেকে মনে করা হয় যে , তিনি শৈব  ছিলেন । কনিষ্কের মুদ্রায় বুদ্ধদেবের নাম ও মূর্তি অঙ্কিত থাকায় কনিষ্ক বৌদ্ধ  ছিলেন – এ তথ্যটি প্রমাণিত হয় । গুপ্ত রাজাদের মুদ্রা  লক্ষী ও কার্তিকের চিহ্নি খোদিত  থাকায় গুপ্ত রাজাগনের হিন্দু ধর্মের প্রতি আসক্তি জানা যায় । মুদ্রা থেকে কোন রাজ্য প্রজাতান্ত্রিক এবং কোন রাজ্য রাজতান্ত্রিক সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । মালব, মৈত্রক ও সাতবাহন রাজ্যের ইতিহাস রচনায় ক্ষেত্রে ও মুদ্রার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম । 

৩) স্থাপত্য- ভাস্কর্য : 

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় স্থাপত্য- ভাস্কর্যের গুরুত্ব কম নয় । স্থাপত্য- ভাস্কর্যের নিদর্শন বলতে মাটির নিচে খনন কাজের ফলে প্রাপ্ত ঘরবাড়ি, মূর্তি ,মন্দির ,পোড়ামাটির কাজ এবং মৃৎপাত্রকে বুঝায় । রাজনৈতিক ইতিহাসে এগুলোর গুরুত্ব কম হলেও শিল্প-সংস্কৃতি এবং ধর্মের ইতিহাস রচনায় এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম । 

প্রত্নতত্ত্ববিদদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং খননকার্যের ফলে ভারতের প্রাচীন কালের ইতিহাস ঐতিহ্যের রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত হয়েছে । হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে খনন কাজের ফলে যে  নিদর্শন আবিষ্কৃত, তা ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের গৌরবের বিষয় । সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের ফলে পূর্বের ধারণা অর্থাৎ আর্যদের আগমনের কাল থেকে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস গুরু-  তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে । সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের ফলে ভারতীয় সভ্যতার কালপঞ্জি তিন হাজার খ্রিস্টপূর্ব পিছিয়ে গেছে । তক্ষশীলায় খনন কার্যের ফলে কুষাণদের সম্পর্কে বিশেষ করে গান্ধার শিল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে । প্রাচীন পাটলিপুত্রে খননকার্যের ফলে মৌর্য বংশের রাজধানীর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়েছে । সারনারেথ খনন কার্যের ফলে বৌদ্ধধর্ম এবং অশোক সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছে । উত্তর ভারতে নালন্দা , কেীশাস্মী , দক্ষিণ ভারতে নাগার্জুনিকোন্ড , অমরাবতী , পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড় এবং বাংলাদেশের মহাস্থানগড় প্রভৃতি অঞ্চলে খননকার্যের ফলে মূল্যবান অনেক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে । 

শুধু ভারতবর্ষে নয় , ভারতের বাইরে ও খনন কাজের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে ।জাভার বরবদুরে বৌদ্ধ মন্দির এবং কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দিরের আবিষ্কার প্রাচীন ভারতীয়দের উপনিবেশিক এবং সাংস্কৃতিক ক্রিয়া-কলাপ এর নিদর্শন বহন করেছে । এছাড়া তুর্কিস্তান ও বেলুচিস্তানে খনন কার্যের ফলে যেসব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে ধারণা করা যায় যে,  প্রাচীনকালে ওই সব অঞ্চলের সঙ্গে ভারতবর্ষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল । 

সুতরাং আমরা বলতে পারি যে , প্রত্নতত্ত্ববিদগণের কর্তৃক দেশে ও বিদেশে যত বেশি খননকার্য পরিচালিত হবে ততবেশি ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে । 

১) ইতিহাসের উৎস কাকে বলে ?

উত্তর : অতীতের ঘটনা জানার জন্য ঐতিহাসিকরা যেসব তথ্যের উপর নির্ভর করে সেই নির্ভরযোগ্য তথ্য গুলোকেই ইতিহাসের উপাদান । আর এই উপাদান গুলো যা থেকে পাওয়া যায় তাকে ইতিহাসের উৎস বলে । 

২) ইতিহাসের জনক কে ? 

উত্তর : হেরোডোটাস । 

৩) প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান কে কয়টি ভাগে ভাগ করা যায় এবং কি কি ? 

উত্তর : প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান কে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় । ক) সাহিত্যিক উপাদান ও খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান 

ক) সাহিত্যিক উপাদান : প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস রচনা করেছেন বটে তবে তাদের যুগের অনেক সাহিত্যকর্মী গ্রন্থ পাওয়া গেছে , যা অনেক ঐতিহাসিক তথ্য সম্বলিত । সেই তথ্যকে সাহিত্যিক উপাদান বলে । 

খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান : বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে যে সকল ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় সেগুলো কে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বলে । যেমন : লিপি , মুদ্রা , ভাস্কর্য ও স্থাপত্য । 

৪) সাহিত্যিক উপাদান কে কয় ভাগে ভাগ করা যায় ? 

উত্তর : সাহিত্যিক উপাদান কে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । যেমন : ক) ভারতীয় সাহিত্য ও খ) বৈদেশিক সাহিত্য । 

৫) বেদ কি ? 

উত্তর : আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য হল বেদ । 

৬) বৈদিক সাহিত্য বলতে কাকে বোঝায় ? 

উত্তর : বেদকে বুঝায় । 

৭) বেদ প্রধানত কয় প্রকার ? 

উত্তর : বেদ প্রধানত চার প্রকার । যেমন : ঋক,সাম, যজু ও অথর্ব । 

৮) জাতক,  দীপবংশ ও মহাবংশ এগুলো কি ? 

উত্তর : বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ । 

৯) বেদ থেকে কী জানা যায় ? 

উত্তর : বেদ থেকে আর্যদের সমাজ , রাষ্ট্র ,ধর্ম ,অর্থনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায় । 

১০) উপনিষদ কি ? 

উত্তর : উপনিষদ বেদের দার্শনিক বিভাগ । 

১১) উপনিষদ থেকে কী জানা যায় ? 

উত্তর : উপনিষদ থেকে বৈদিক যুগের মানুষের আধ্যাত্নিক জিজ্ঞাসা , দর্শন চর্চা প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায় । 

১২) বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম কি ? 

উত্তর : ত্রিপিটক । 

১৯) জাতক গ্রন্থ থেকে কী জানা যায় ? 

উত্তর : জাতক গ্রন্থ থেকে গৌতম বুদ্ধের প্রাথমিক জীবনের পরিচয় জানা যায় । জাতক – এর ৫৫০ টি শ্লোকে গৌতম বুদ্ধের জন্ম জন্মান্তর সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে । 

২০) দীপ বংশ মহাবংশ কার রচিত ? 

উত্তর : সিংহলে রচিত । 

২১) ” ললিত বিস্তা “ ও  “  বৈপল্যসূত্র ” কার জীবনী গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত ? 

উত্তর : গৌতম বুদ্ধের । 

২২) জৈন ধর্ম গ্রন্থের নাম গুলো লেখ ? 

উত্তর : ভারতীসূত্র , জৈনকল্পসূত্র , দ্বাদশ অঙ্গ প্রভৃতি । 

২৩) পুরান বলতে কি বুঝায় ? 

উত্তর : প্রাচীনকালের কাহিনীকে পুরান বলা হয় । 

২৪) পুরাণের সংখ্যা কত ? 

উত্তর : ১৮ টি । 

২৫) দুইটি পুরাণের নাম লেখ ? 

উত্তর : বিষ্ণুপুরাণ ও মৎসপুরান । 

২৬) পুরান সংকলিত হয়েছে কোন যুগ ? 

উত্তর : গুপ্ত যুগে । 

২৭) প্রাচীন ভারতের দুটি মহাকাব্যের নাম লেখ ? 

উত্তর : রামায়ণ ও মহাভারত । 

২৮) রামায়ণ এর বিষয়বস্তু কি ? 

উত্তর : রাম ও রাবণের যুদ্ধ । 

২৯) মহাকাব্য দুইটি কখন রচিত হয়েছে ? 

উত্তর : খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে হতে  তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে । 

৩০) রামায়ণ কে রচনা করেন ? 

উত্তর : বাল্মিকী । 

৩১) রামায়ণের শ্লোকের সংখ্যা কত ? 

উত্তর : চব্বিশ হাজার। 

৩২) মহাভারত রচিয়তা কে? 

উত্তর: ব্যাসদেব । 

৩২) মহাভারতের শ্লোকের  সংখ্যা কত ? 

উত্তর : এক লক্ষ । 

৩৩) মহাভারত কি নিয়ে রচিত ? 

উত্তর : “ রাজ্য নিয়ে কুরূ ও পান্ডবদের যুদ্ধ কাহিনী নিয়ে রচিত । 

৩৪) রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থের রচিয়তা কে ? 

উত্তর : পন্ডিত কলহন । 

৩৫) প্রাচীন ভারতের কোন গ্রন্থকে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় ? 

উত্তর : রাজতরঙ্গিনী । 

৩৬) রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থটি কোন ভাষায় রচিত ? 

উত্তর : সংস্কৃত ভাষায় । 

৩৭) রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থে কোন রাজ্যের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে ? 

উত্তর : কাশ্মীরের ইতিহাস । 

৩৮) হর্ষচরিত্র গ্রন্থের লেখক কে ? 

উত্তর : হর্ষবর্ধনের সভাকবি বানভট্ট । 

৩৯) রামচরিত্র গ্রন্থের লেখক কে ? 

উত্তর: সন্ধ্যাকরনন্দী । 

৪০) অশ্বঘোষ কে ? 

উত্তর : অশ্বঘোষ ছিলেন কুষাণ যুগে একজন শ্রেষ্ঠ পন্ডিত । 

৪১) অশ্বঘোষ  রচিত গ্রন্থগুলোর  নাম লেখ ? 

উত্তর : বুদ্ধচরিত , সেীন্দরনন্দ কাব্য , সূত্রালঙ্কার । 

৪২) কৌটিল্য কে ? 

উত্তর : চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী । 

৪৩) কৌটিল্য রচিত গ্রন্থের নাম কি ? 

উত্তর : অর্থশাস্ত্র । 

৪৪) এলাহাবাদ প্রশস্তি কে রচনা করেন ? 

উত্তর : সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিসেন । 

৪৫) ইতিহাসের জনক কে ? 

উত্তর : হেরোডোটাস । 

৪৬) হেরোডোটাস কোন দেশে জন্মগ্রহণ করেন । 

উত্তর : গ্রীক দেশ । 

৪৭) হেরোডোটাস রচিত গ্রন্থের নাম কী? 

উত্তর : ইতিবৃত্ত ( The Histories ) । 

৪৮) মেগাস্থিনিস কে ছিলেন ? 

উত্তর : চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ সভার গ্রিক দূত । 

৪৯) মেগাস্থিনিস রচিত গ্রন্থের নাম কি ? 

উত্তর : ইন্ডিকা । 

৫০) ফা-হিয়েন কে ছিলেন ? 

উত্তর : চৈনিক পরিব্রাজক । 

৫১) ) ফা-হিয়েন কোন রাজার রাজত্বকালে ভারতে এসেছিলেন ? 

উত্তর : দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত । 

৫২) ইউয়েন  সাং কে ছিলেন ? 

উত্তর : চৈনিক পরিব্রাজক । 

৫৩)  ইউয়েন  সাং কোন রাজার রাজত্বকালে ভারতে এসেছিলেন ? 

উত্তর : হর্ষবর্ধন । 

৫৪) বেদ কোন ধরনের গ্রন্থ ? 

উত্তর : ধর্মীয় গ্রন্থ । 

৫৫) বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থের নাম কি ? 

উত্তর : বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থের নাম বেদ । 

৫৬) আর্য শব্দের অর্থ কি ? 

উত্তর : আর্য শব্দের অর্থ জাতি বা ভাষা । 

৫৭) ইন্ডিকা গ্রন্থের রচিয়তা কে ? 

উত্তর : ইন্ডিকা গ্রন্থের রচিয়তা মেগাস্থিনিস । 

৫৮) ইউয়েন  সাং কোন দেশের পর্যটক ছিলেন ? 

উত্তর : ইউয়েন  সাং চীন  দেশের পর্যটক ছিলেন । 

৫৯) আর্যদের মূল পেশা কি ছিল ? 

উত্তর : কৃষি । 

৬০) রামায়ণের সংকলক কে ? 

উত্তর : কুত্তিবাস ওঝা । 

৬১) ইউয়েন  সাং কখন ভারতে এসেছিলেন ? 

উত্তর : ইউয়েন  সাং সপ্তম শতকে ভারতে এসেছিলেন । 

৬২) কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক কে ? 

উত্তর : কনিস্ক । 

৬৩) কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের রাজধানী কোথায় ছিল ? 

উত্তর : পুরূষপুর বা পেশোয়ারে । 

৬৪) ফা-হিয়েন ভারতে আসেন ? 

উত্তর : গুপ্তরাজ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে । 

৬৫) ইউয়েন  সাং ভারতে আসেন ? 

উত্তর : হর্ষবর্ধনের শাসন আমলে । 

৬৬) ইউয়েন  সাং ভারতে এসে যে জ্ঞান অর্জন করেন তা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন কোন গ্রন্থে ? 

উত্তর : সি ইউ কি ( Si Yu Ki ) । 

৬৭) অশোকের শিলালিপিগুলি আবিস্কার করে কে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ? 

উত্তর : জেমস প্রিন্সেপ । 

৬৮) কনিষ্কের মুদ্রায় কার নাম ও মূর্তি অঙ্কিত আছে ? 

উত্তর : বুদ্ধদেবের নাম । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

÷ 2 = 1