সিন্ধু সভ্যতা

( Indus Civilisation ) 

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকে সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় । পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর অধিকাংশই বড় বড় নদীর তীরে গড়ে উঠেছে । একইভাবে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছে সিন্ধু নদীর তীরে । এই সভ্যতার জন্ম আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে । কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে , বিংশ শতাব্দীর গোঁড়াতে ও এই সুমহান সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই ছিল না । ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ভারতের খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদাড়ো নামক স্থানে একটি বিরাট ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান ।একই   বছরে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অপর সদস্য পন্ডিত দয়াবাম সাহনি একই ধরনের ধ্বংসাবশেষ পাঞ্জাব প্রদেশের  মন্টগোমারি জেলায় হরপ্পায় আবিষ্কার করেন । এরপর ভারতের প্রত্নতত্ত্ব  বিভাগের তৎকালীন অধিকর্তা স্যার জন মার্শাল এর তত্ত্বাবধানে মহেঞ্জোদাড়ো ও  হরপ্পাতে খননকার্য শুরু হয় । এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে এক প্রাচীন সুমহান সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় । এই আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখিত হওয়ার যোগ্য । 

১) সিন্ধু সভ্যতার নিম্নলিখিত বিষয়গুলো আলোচনা করো : 

ক) সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি , খ ) সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল , গ) নগর পরিকল্পনা ,ঘ) রাজনৈতিক অবস্থা ,ঙ) অর্থনৈতিক অবস্থা ,চ) ধর্মীয় অবস্থা ছ) সিন্ধু সভ্যতা পতনের কারণ । 

সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি : 

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা । এ পর্যন্ত ৭০ টি বা ততোধিক সিন্ধু সভ্যতার এলাকা আবিষ্কৃত হয়েছে । এগুলোর মধ্যে মাত্র ৬ টি কে নগর বলে চিহ্নিত করা যায়। ধ্বংসাবশেষগুলোর মধ্যে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কৃত নগর দুটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য । অপর চারটি নগর আবিষ্কৃত হয়েছে মহেঞ্জোদাড়ো ১৩০ মাইল দক্ষিনে চারহুদারোয়,গুজরাটের লোথালে , রাজস্থানের কালীবানগানে এবং হরিয়ানায় বানাওয়ালিতে । সুতকাজেন্দর এবং সুরকোতাদারের মত উপকূলবর্তী শহর সিন্ধু সভ্যতার উন্নত নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । উত্তরপূর্ব পাঞ্জাবের রূপার এবং উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলায় হিন্ডন নদীর তীরে অবস্থিত আলমগীরপুরেও সিন্ধু সভ্যতার অনুরূপ নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে । অনেকে মনে করেন , ভারতের দক্ষিণাত্যে ও এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে । আমরি ও কোটদিজি অঞ্চলেও সিন্ধু সভ্যতার প্রস্তুতি পর্বের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । অর্থাৎ এই সভ্যতা পূর্ব-পশ্চিমে ১১০০ কিলোমিটারের বেশি এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৬০০ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চল জুড়ে প্রসার লাভ করে । এভাবে সিন্ধু সভ্যতার যে ভৌগলিক পরিধির পরিচয় পাওয়া যায় তা পূর্বে উত্তরপ্রদেশের আলমগীরপুর থেকে পশ্চিমে এবং উত্তরে আফগানিস্তান থেকে দক্ষিনে মহারাষ্ট্রের অন্তগত পর্যন্ত এক বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল । সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার এবং তার সঙ্গে পরবর্তী যুগের সম্পর্ক বিষয়ে পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে গবেষণা ও খননকার্য চলছে । এর ফলে হয়তো সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্ক আরো নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহীত হবে । 

১) সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল নির্ণয় করো । 

২) সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল নিয়ে আলোচনা করো 

সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় : 

সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও পন্ডিত মহলে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে । প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভিন্ন প্রত্নবস্তু বিশ্লেষণ এর ভিত্তিতে একটা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও এখনো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি ।  ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান স্যার জন মার্শাল অনুমানের ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় করেন ৩২৫০-২৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত । ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে জি.জে .গ্যাড মেসোপটেমিয়ার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার কাল খ্রিস্টপূর্ব ২৩৫০-১৭৭০ পর্যন্ত নির্ধারণ করেন । প্রত্নতত্ত্ববিদ স্টুয়ার্ট পিগট এবং স্যার মার্টিমার হুইলার মেসোপটেমিয়ার উর , তেল আসমার , উম্মা , লাগাশ , সুসা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রাপ্ত হরপ্পা ধরনের তারিখের ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার ব্যাপ্তিকাল নির্ধারণ করেন ২৫০০ থেকে১৫০০ অব্দের মধ্যে । 

অনেকে সিন্ধু অঞ্চলের লোহার ব্যবহারের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন । এ পর্যন্ত সিন্ধু অঞ্চলে একখন্ড লোহাও আবিষ্কৃত হয়নি । ঋগ্বেদ থেকে জানা যায় যে , খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দ থেকে ভারতবর্ষে লোহার ব্যবহার শুরু হয় । যেহেতু ভারতের লোহার ব্যবহার আর্যদের আগমনের পর থেকে শুরু হয় এবং ভারতে আর্যদের আগমনের কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ ধরা হয় সেহেতু সিন্ধু সভ্যতা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বের  আগেই বিকাশ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় । 

গত কয়েক বছর ধরে রেডিওকার্বন ( C-14 )  পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে হরপ্পা সভ্যতার কাল নির্ণয় এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।  এ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে । এ পদ্ধতিতে ১৯৫৬ সালে হিন্দু উপত্যকায় পাওয়া প্রত্নবস্তু পরীক্ষা করা হয় এবং এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে , সিন্ধু সভ্যতার ব্যাপ্তিকাল খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ অব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ডি.পি.আগরওয়াল বোম্বাইয়ের “ টাটা ইনস্টিউটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ” গবেষণাগারের রেডিওকার্বন -১৪ পদ্ধতিতে পরীক্ষা চালিয়ে হরপ্পা সভ্যতার ব্যাপ্তি কালকে ২৩০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন । বর্তমানে অধিকাংশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হরপ্পা সভ্যতার এই কাল সীমাকে স্বীকার করে থাকে । 

১) সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখ । 

২) সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করো । 

নগর পরিকল্পনা : 

সিন্ধু সভ্যতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নগর পরিকল্পনা । সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি নগরভিত্তিক সভ্যতা । সিন্ধু উপত্যকায় যেসব স্থান আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের মধ্যে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত শহর দুটি সর্ববৃহৎ গুরুত্বপূর্ণ । স্যার জন মার্শাল এর মতে, নগর দুটি সুনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনামাফিক নির্মিত হয়েছে । 

একই পরিকল্পনা ও নকশায় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো শহর দুটি নির্মিত । মহেঞ্জোদাড়োর মোট আয়তন ছিল ৫৫,০০,০০০ বর্গফুট এবং হরপ্পায় ছিল ৪৬,৫১,৫০০ বর্গফুট । মহেঞ্জোদাড়ো শহরের লোকসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৪১,২৫০ এবং হরপ্পায় ২০,৫৪৪ । শহর দুইটি পূর্ব-পশ্চিম এই দুই অংশে বিভক্ত ছিল । পশ্চিম অংশ অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং পূর্ব অংশ নিচু । উচ্চ অংশে অবস্থিত ছিল দুর্গ এবং উচ্চশ্রেণীর অধিবাসীরা দুর্গ এলাকায় বসবাস করত । উভয় শহরেই নগরদুর্গের নিচে অংশে সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ বসবাস করে । শহরের বাড়িগুলো নির্মিত হতো গ্রিড পদ্ধতি অনুসারে । শহরের অধিকাংশ বাড়িঘর ছিল  পোড়া ইট দ্বারা নির্মিত । দালানগুলো ছিল কোনোটি একতলা, কোনোটিই বহুতলবিশিষ্ট। প্রতিটি বাড়িতে দরজা- জালানা,  সিঁড়ি, স্নানাগার এবং একটি চতুষ্কোণ চত্বর ছিল । প্রতিটি আবাসিক গৃহ প্রাচির দ্বারা বেষ্টিত ছিল । প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি এবং সাধারণত ব্যবহারের জন্য বাড়ির বাইরে কয়েকটি কূপ ছিল । প্রতিটি গৃহ হতে জল নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে । রাস্তাঘাট ছিল প্রশস্ত । ৯ ফুট থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তা আবিষ্কৃত হয়েছে। রাস্তাগুলো ছিল সোজা ও সমান্তরাল ।একটি রাস্তা অন্য রাস্তাকে ৯০ ডিগ্রী বা সমকোণী এর ভিত্তিতে অতিক্রম করে । রাস্তার দুই পাশে সমান দূরত্বে সারিবদ্ধভাবে বাড়িঘর নির্মিত হতো । রাস্তার তলদেশ দিয়ে নর্দমা নির্মাণ করা হয় । নর্দমার মুখ সংযুক্ত ছিল নদীর সঙ্গে । প্রত্নতত্ত্ববিদ এ,এল. ব্যাসাম বলেন , রোমান সভ্যতার পূর্বে অপর কোন প্রাচীন সভ্যতায় এত পরিণত পয়:প্রণালী ব্যবস্থা ছিল না । গৃহের আবর্জনা ফেলার জন্য রাজপথে বড় আবর্জনাকুন্ডু থাকতো । শহরের অধিবাসীদের সুবিধার জন্য রাস্তার পাশে সমান দূরত্বে সড়কবাতি স্থাপন করা হয় । 

মহেঞ্জোদাড়ো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি এর বিরাট স্নানাগার । স্নানাগারটি ছিল সুবৃহৎ ও সুগঠিত । ইহা উত্তর-দক্ষিণ ১৮০ ফুট দীর্ঘ ও পূর্ব পশ্চিমে ১৮০ ফুট প্রস্থ । শহরের কেন্দ্রে ছিল সাঁতার কাটার জন্য বিশাল চৌবাচ্চা । চৌবাচ্চাটির দৈর্ঘ্য ৩৯ ফুট , প্রস্থ ২৩ ফুট এবং গভীরতা ৮ ফুট ছিল । পার্শ্ববর্তী একটি কূপ থেকে স্নানাগারে জল আসেতো এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত জল নিকাশের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সাড়ে ছয় ফুট গভীর প্রণালী ছিল । স্নানাগারের দেওয়াল ছিল ইটের তৈরি । অনেকে মনে করেন , ধর্মীয় স্নানের সময় এই বিরাট স্নানাগারটি ব্যবহার হতো । বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে , পাঁচ হাজার বছর পরেও , স্নানাগারটি এখনো অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে । 

মহেঞ্জোদাড়ো দুর্গ এলাকায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ একটি ইরামত আবিষ্কৃত হয়েছে । সাধারণভাবে এটিকে একটি রাজপ্রাসাদ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়ে থাকে । উক্ত ইরামত ছাড়াও মহেঞ্জোদাড়োতে ৮০ ফুট X ৮০ ফুট একটি বিরাট হল ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে । হল ঘরের ভেতরে সারিসারি বেঞ্চ পাতা ছিল । বেঞ্চগুলোর সামনে উন্নত মঞ্চ । পুরাতাত্ত্বিক মনে করেন , এটি হয়তো সভাগৃহ হিসেবে ব্যবহার করা হতো । একটি ব্যারাক ও একটি কবরস্থান ও আবিষ্কৃত হয়েছে । 

হরপ্পাতেও বড় বড় ইমারত আবিষ্কৃত। এখানে ১৬৯ ফুট দীর্ঘ ও ১৩৫ ফুট প্রশস্ত একটি শস্যাগার পাওয়া গিয়েছে। শস্যাগারটি একটি মঞ্চের উপর নির্মিত ছিল । অনুমান করা হয় যে , বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য শস্য ভান্ডারটির ভিত উচুঁ করা হয় । এরূপ শস্যাগার  মহেঞ্জোদাড়োতে ও ছিল । মহেঞ্জোদাড়োর বৃহৎ স্নানাগারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত ছিল হরপ্পার সমআয়াতনের শস্যাগার  । বস্তুত হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োয় প্রাপ্ত শস্যাগার দুইটি হরপ্পা সভ্যতার নাগরিক বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব বহন করেছে । 

সুতরাং সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কৃত নিদর্শন হতে এটি প্রতীয়মান হয় যে , প্রাচীন সিন্ধু উপত্যকাবাসী অতি উন্নত ধরনের নাগরিক জীবন যাপন করত । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছে , “ These and smallar trial excavation at various other sites in Sindh and in Beluchistan have proved beyond doubt that some five thousands years ago a highly civilised community flourished in these regions” । হরপ্পায় খনন কাজ এখনো শেষ হয়নি । 

১) সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা আলোচনা করো । 

২) সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক অবস্থা আলোচনা করো । 

৩) সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক অবস্থা আলোচনা করো । 

৪) সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় অবস্থা আলোচনা করো । 

৫) সিন্ধু সভ্যতার শিল্পকলা সম্পর্কে আলোচনা করো । 

রাজনৈতিক অবস্থা : 

সিন্ধু উপত্যকায় জনগণের রাজনৈতিক জীবন ও শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না । তবে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর নগর বিন্যাস থেকে এটা অনুমিত হয় যে , সমস্ত এলাকা একই কেন্দ্রীভূত শাসনের অধীনে ছিল এবং এই প্রশাসন জনগণের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত । এ প্রসঙ্গে S.K.Saraswati  বলেন , “ The absolute uniformity implies the existence of a strong and centralised authority regulating the life and activities of the people over this extensive region. । 

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর শহর দুটির পশ্চিমদিকে সারিবদ্ধ দুর্গ ছিল । এই নগর দুর্গে শাসকশ্রেণী বসবাস করত । হরপ্পার নগর দুর্গের সীমায় এমন একটি বিশেষ ধরনের রাস্তা আবিষ্কৃত হয়েছে যা সৈন্য চলাচল , সৈন্যদের কুচকাওয়াজ বা ঐ ধরনের কোন বিশেষ কাজের জন্য নির্মিত হয় বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন । সুৎকাজেন্দর ও আলী মুরাদেও দুর্গ আবিষ্কৃত হয়েছে । এর থেকে শাসকশ্রেণীর সামরিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় । তাছাড়া সিন্ধু উপত্যকার জনগণকে শান্তিতে ছিলনা তার দুর্গগুলোর অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় । 

সিন্ধু উপত্যকায় ক্রমাগত অস্ত্র নির্মাণের অথবা বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই । সিন্ধু উপত্যকায় যে অস্ত্র গুলো পাওয়া গেছে সেগুলো ছিল খুবই তুচ্ছ ও দুর্বল । অস্ত্র গুলোর মধ্যে ছিল কুঠার, বর্শা , খড়গ , তীর , ধনুক প্রভৃতি । কোন তরবারী পাওয়া যায়নি । সুতরাং বলা যায় , সিন্ধু সভ্যতার অস্ত্রের কোন গুরুত্ব ছিল না । রাষ্ট্রশক্তি পেশী শক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং ধর্মের উপর নির্ভরশীল ছিল মনে করা হয় । অবশ্যই হিন্দু বাসীর উন্নত অস্ত্রসমূহ বিজয়ী আর্যদের হস্তগত হওয়া অসম্ভব নয় । 

অনেকে মনে করেন , সিন্ধু সভ্যতা ছিল ধর্মাশ্রয়ী । অধ্যাপক হুইলার ও পিগট উভয়ই মনে করেন , সিন্ধু উপত্যকার জনগণ পুরোহিত রাজা কীর্তক শাসিত হতো। তারা সিন্ধু উপত্যকার শাসনব্যবস্থার প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষণ করে বলেন, এখানে একদিকে যেমন ধর্মীয় আচরণে অঙ্গ হিসাবে বৃহৎ স্নানাগার, অন্যদিকে ছিল বৃহৎ শস্যাগার, সভাগৃহ ,সীমান্তবর্তী দুর্গ ইত্যাদি। এসবের মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মীয় শাসনের একটি মিলিত চিত্র ফুটে ওঠে, যে চিত্রটি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-২০০০ অব্দ  মিশরীয় ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সাধারণ সঙ্গে  বিশেষ সঙ্গতিপূর্ণ । 

সামাজিক অবস্থা : 

সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ হতে সিন্ধু উপত্যকার সমাজ জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায় । তবে হিন্দুর জনগণ যে সমাজবদ্ধভাবে বাস করত,  তাতে কোন সন্দেহ নেই। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন, সিন্ধু সমাজের শ্রেণী বৈষম্য ছিল না । তবে সিন্ধু উপত্যকায় আবিষ্কৃত বাড়ি-ঘর গুলোর শ্রেণীবিভাগ এবং কবরগুলোর তারতম্য শ্রেণীবৈষম্যের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় । সিন্ধু উপত্যকায় খনন কাজের ফলে যে তথ্যাদি পাওয়া যায় তা থেকে অনুমিত হয় যে , হিন্দু সমাজে পুরোহিত , যোদ্ধা ,ব্যবসায়ী ,শিল্পী ,কারিগর , ক্রীতদাস প্রভৃতির মানুষ বসবাস করত। তবে সমাজে পুরহিত শ্রেণি খুবই প্রভাবশালী ছিল। তখন সমাজে বর্ণবৈষম্য অবস্থা ছিল। ঐতিহাসিক এ.এল.ব্যাসাম সিন্ধু উপত্যকায় শ্রমিক ও কারিগর শ্রেনী বর্তমান কালের ন্যায় অনেক বেশি সুখ-স্বাচ্ছন্দ উপভোগ করত বলে মত প্রকাশ করেছেন। 

সিন্ধু সভ্যতার ধারকদের মধ্যে শিক্ষার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত বিভিন্ন সিলমোহরের উপর লিপিমালা থেকে তা বোঝা যায়। সিন্ধু সভ্যতার ধারকদের পাটিগণিত, দশমিক, গণনা ও জ্যামিতিক উপর বিশেষ জ্ঞান ছিল । দৈর্ঘ্য মাপার জন্য তারা দশমিক প্রথা ব্যবহার করত । তারা ঋজু ( Vertical ) ও অনুভূমিক ( horizontal ) রেখা দাগ দ্বারা সংখ্যা গণনা করত । পরবর্তীকালে খরোষ্ঠী ও ব্রাক্ষী  লিপি এরূপ দাগ দ্বারাই সংখ্যা বোঝানো হতো । সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রাপ্ত ইট সমূহের মাপের থেকে বুঝা যায় যে , ঐ সভ্যতার ধারকরাও গণিতবিদ্যার সঙ্গেও বিশেষভাবে পরিচিত ছিল । সমান্তরভাবে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও পারস্পারিক সংযোগের কোন সমূহ থেকে এবং মৃৎপাত্র ও অন্যান্য শিল্প সামগ্রীর উপর অঙ্কিত নকশা সমূহ থেকে বোঝা যায় যে,  সিন্ধু সভ্যতার ধারকদের  জ্যামিতিক জ্ঞান ছিল । সিন্ধু সভ্যতার বাহকরা ভাস্কর্য ও স্থাপত্য ও ধাতুবিদ্যা পারদর্শী ছিল । চিকিৎসা শাস্ত্রে ও তাদের জ্ঞান ছিল । 

সিন্ধু উপত্যকার জনগণের প্রধান খাদ্য ছিল গম ,বার্লি এবং সম্ভবত ভাত । যব তাদের অজানা ছিল না । মাছ ,মাংস, ডিম ,শাকসবজি, ফল-মূলে তাদের খাদ্য তালিকা অন্তর্ভুক্ত ছিল । তারা শুকুর,বেড়া, হাঁস ,মুরগি এবং কচ্ছপের মাংস ভক্ষণ করত । দুধ ও তাদের প্রধান খাদ্যের অন্যতম ছিল । 

গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছিল গরু, মহিষ, ভেড়া, উট ,হাতি, শুকুর, ছাগল । খেলায় কুকুরের মূর্তি দেখে মনে হয় , কুকুরও সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসীদের গৃহপালিত ছিল । অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে ছিল গর্দভ ও উট । সম্ভবত: এদের ভারবাহী প্রানী হিসেবে ব্যবহার করা হতো , ঘোড়ার অস্তিত্ব সম্বন্ধে একদা সন্দেহ থাকলেও পরবর্তীকালে খনন কাজের ফলে ঘোড়ার অস্তিত্ব এখন মোটামুটি স্বীকৃত । 

সিন্ধু উপত্যকায় কোন পোশাকে নিদর্শন পাওয়া যায়নি । তবে সিন্দুর জনগণ সাধারণত পশমী ও  সুতিবস্ত্র পরিধান করত । সিলমোহর এর উপর অঙ্কিত বিভিন্ন মূর্তির পোশাক দেখে মনে হয় , নারী এবং পুরুষ দুই অংশবিশিষ্ট পোশাক পরিধান করতো । এক অংশ দেহের উপরিভাগে এবং অপর অংশ দেহের নিম্নভাগে ব্যবহার করা হতো । পরিধানের বস্ত্র অনেকটা ধুতির মত ছিল । পুরুষরা বাম কাঁধের উপর বেষ্টন করে ডান হাতের নিচ দিয়ে শাল ব্যবহার করত । 

পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ দাড়ি-গোঁফ রাখত, আবার কেউ কেউ প্রাচীন আক্কাদ ( মেসোপটেমিয়া ) বাঁশির সেমীয় জাতির মত উপরের ঔষ্ঠ কামিয়ে ফেলতে । মাথার চুল লম্বা রাখার নিয়ম ছিল । হিন্দু বাসীদের কাছে গহনাপত্র বিশেষ আদরের সামগ্রী ছিল । সিন্ধু উপত্যকার ধ্বংসাবশেষ থেকে বিভিন্ন ধরনের অলংকার , বিশেষ করে গলার হার, আন্টি, বালা, বাজিবন্ধ ,কানের দুল ,পায়ের মল, কোমরবন্ধ প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে । অলংকারগুলো সাধারণত : সোনা, রুপা, হাতির দাঁত ,তামা ও মূল্যবান পাথরের তৈরি । আকারের বৈচিত্র এবং কারুকার্যের সভায় তখন অলংকার যে মনোহারী ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মহিলারা প্রসাধনী ব্যবহার করত। হরপ্পার একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পাওয়া গেছে, যা সত্যিই কৌতূহলের উদ্যোগ করে। 

মহেঞ্জোদাড়ো এবং অন্যান্য স্থানের দৈনিন্দিন জীবনে ব্যবহারের জন্য নানা ধরনের দ্রব্যাদি পাওয়া গেছে । দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে আছে মাটির পাত্র , চিনা বাসন , ব্রোঞ্জ , ক্ষুর ইত্যাদি । ছোট ছেলেমেয়েদের খেলনার মধ্যে ঠেলাগাড়ি, গরুর গাড়ি, প্রভৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংস্করণ পাওয়া গেছে । এর থেকে অনুমিত হয় যে , তখন ঐসব বস্তু ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগত । খাট ,চেয়ার, টুল এবং আলো দিয়ে বৈঠকখানা সাজানো হতো । সিন্দুর জনগণ অবকাশ যাপন এবং চিত্তবিনোদনের অভ্যস্ত ছিল । পাশা খেলা, শিকার ,মাছ ধরা এবং ষাঁড়ের লড়াই ছিল তাদের অবসর বিনোদনের উপকরণ । 

পরিশেষে বলা যায় যে , সিন্ধু সভ্যতার মানুষের সমাজ জীবন ছিল খুবই উন্নত । শান্তিতে বসবাস করত তারা । তাদের যে এক উন্নত সামাজিক সংগঠন ছিল তা সিন্ধু অঞ্চলের নগর পরিকল্পনা, রাস্তাঘাট, প্রয়:প্রণালী ব্যবস্থা এবং ওজন ও মাপ প্রভৃতি থেকে বোঝা যায় । 

শিল্পকলা : 

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর জনগণ শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাথর ও ব্রোঞ্জের  তৈরি প্রচুর ভাস্কর্য সিন্ধু উপত্যকায় পাওয়া গেছে । হরপ্পাতে যে পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে তা স্থাপত্যের নিদর্শন হিসাবে খুবই মূল্যবান । ধাতুর মধ্যে ব্রোঞ্জের তৈরি একটি নর্তকী মূর্তি মহেঞ্জোদাড়োতে পাওয়া গেছে। মূর্তিটির দেহভঙ্গিমা স্বাভাবিকতা সৌন্দর্য সকলের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে । আগুনে পোড়া মাটির তৈরি অসংখ্য মূর্তি সিন্ধু উপত্যকা আবিষ্কৃত হয়েছে । সাধারণভাবে একেই বলে টেরাকোটা ( Terracota ) । এগুলো ও সিন্ধুবাসির শিল্প নিদর্শন এর পরিচয় দেয় । সিন্ধু উপত্যকায় এ পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ টি সীল আবিষ্কৃত হয়েছে । এগুলো তৈরি করা হয় পাথর দিয়ে । সিলমোহর গুলোর অধিকাংশের গাঁয়ে ছোট ছোট লিপি এবং মানুষ ও পশুর মধ্যে অঙ্কিত আছে , যা তাদের শিল্প রচিত পরিচয় দেয় । তবে অধিকাংশ লিপির পাঠোদ্ধার এখনো সম্ভব হয়নি । সম্প্রতি অধ্যাপক কক্সবিহার চক্রবর্তী ৫১১ টি সিলমোহরের পাঠোদ্ধার করেছেন । যদিও পণ্ডিত মহলে এখনো পর্যন্ত তার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত স্বীকৃতি পায়নি । হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োতে কুস্তকার কর্তৃক তৈয়রি অনেক মৃতপাত্র পাওয়া গেছে । অধিকাংশ মাটির পাত্র ছিল কাচের মত উজ্জল । পোড়া পাত্রের গায়ে  লাল এর উপর কালো রঙ্গের জ্যামিতিক চিত্র , যথা : অন্যোন্যচ্ছেদকে বৃত্ত ( intersecting circle ) , ত্রিভুজ ,চতুর্ভুজ ,চিরুনি ,লতা,পাতা আঁকা আছে ।  কাচবৎ মাটির উপর নিপুন রঞ্জন কৌশল আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে । 

অর্থনৈতিক অবস্থা : 

সিন্ধু উপত্যকা যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে সিন্ধু সভ্যতার জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করা যায় । তাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ যে শক্তিশালী ছিল তা তাদের পাকা দালান-কোটার ধ্বংসাবশেষ থেকে অনুমান করা যায় । সমসাময়িক কালের অন্যান্য সভ্যতার ন্যায় সিন্ধু সভ্যতার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ছিল কৃষি । সে সময় সিন্ধু উপত্যকায় গম , যব এবং সম্ভবত ধান প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো । জমি ছিল খুবই উর্বর । শস্য উৎপাদনের জন্য কোন প্রকার জল , সার বা দক্ষতার প্রয়োজন হতো না । নীলনদ যেমন মিশরীয়দের খাদ্য যোগান দিত তেমনি সিন্ধু নদ সিন্ধু বাসীকে খাদ্য যোগান দিত ।

পশুপালন সিন্ধু উপত্যকায় অধিবাসীদের অর্থনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল । সিন্ধু বাসিরা ব্যাপকভাবে পশু পালন করত । গরু, বেড়া , ছাগল , কুকুর, ও শুকুর ছিল গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে প্রধান । গাধা ও উটকে তারা বারি দ্রব্য সামগ্রী ব্যবহারের কাজে ব্যবহার করত । 

কৃষির পাশাপাশি সিন্ধু জনগণ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্মের নিয়োজিত ছিল । মৃৎপাত্র নির্মাণ , বস্ত্র শিল্প , ধাতু শিল্প ,অলংকার নির্মাণ, ভাস্কর্য এসময় উৎকর্ষ লাভ করে । ভারতীয় শিল্পসামগ্রী ভারতের বাইরে বহু দেশে যথেষ্ট চাহিদা ছিল । ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ও সিন্ধু বাসিরা যথেষ্ট পারদর্শী ছিল । সিন্ধু উপত্যকায় এ পর্যন্ত ২৫০০ সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে । অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে , অনেক সিলমোহর ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতো । সিন্ধু অঞ্চলে এ পর্যন্ত কোন মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়নি ।পণ্য ছিল তখন বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম । উৎপন্ন পণ্যের বিনিময়ে তারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করত । মহেঞ্জোদাড়োতে অনেক ওজন পরিমাপক সামগ্রী পাওয়া গেছে। এগুলো যে কেনা-বেচার কাজে ব্যবহার হতো তাতে কোন সন্দেহ নেই। পারস্য, মেসোপটেমিয়া ও মিশরের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সিন্ধু বাসিরা সামুদ্রিক বাণিজ্য এ অভ্যস্ত ছিল । মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে , অর্থনৈতিক দিক থেকে সিন্ধু সভ্যতার জনগণ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী এবং এটা সম্ভব হয় তাদের উন্নত কৃষি ব্যবস্থা এবং সুসংগঠিত বাণিজ্যের মাধ্যম । 

ধর্মীয় অবস্থা : 

সিন্ধু উপত্যকার জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস কেমন ছিল সে সম্পর্কে কিছু জানা যায় না । কারণ হরপ্পায় বা মহেঞ্জোদাড়োর ও অন্যান্য শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে কোন মন্দির বা দেবস্থান পাওয়া যায়নি । এমতাবস্থায় বিভিন্ন শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন সিলমোহর , মূর্তি, বৃহৎ স্নানাগার বাড়ি থেকে এটা অনুমান করা যায় যে , সিন্ধু সভ্যতার জনগণ নানা ধরনের দেব দেবীর পূজা করত । 

হরপ্পায় আগুনে পোড়া মাটির তৈরি অসংখ্য নারী -মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে । তারমধ্যে একটি স্ত্রী -মূর্তির-উদর থেকে একটি বৃক্ষ বেরিয়ে আসার চিত্র অঙ্কিত আছে । মনে হয় , এই মূর্তিটি ছিল পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবীর । এর থেকে বোঝা যায় যে , সেখানকার মানুষ মাতৃ-মূর্তি পূজা করতো । মাতৃদেবীর পাশাপাশি পুরুষ দেবতার অস্তিত্বের সাক্ষ্য পাওয়া গেছে ।একটি সীলে দেখা যায়, একটি মূর্তির তিনটি মুখ , যোগাসনে বসে আছেন এবং চারদিকে বাঘ, হাতি ,গন্ডার ও মহিষ দ্বারা পরিবেষ্টিত । অনেকে মনে করেন , উনি হলেন পশুপতি মহাদেব । এ যুগের শিবলিঙ্গের আকারে বহু প্রস্তর খণ্ড আবিষ্কৃত হয়েছে, যা থেকে মনে করা হয় যে , লিঙ্গ পূজা সিন্ধু উপত্যকার বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে । তাছাড়া অসংখ্য পাথরের বৃত্তাকার বস্তু সে সময় যোনিপূজার ইঙ্গিত দেয়। শিব লিঙ্গ পূজা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজের এক পূজা হিসেবে গৃহীত হয়েছে । 

সিলমোহর এ অঙ্কিত বিভিন্ন জন্তুর প্রতিমূর্তি এবং গাছপালার ছবি দেখে মনে হয় , সিন্ধু বাসিরা জীবজন্তু ও গাছপালার পূজা করত । পিপ্পলী বৃক্ষকে সে সময় পবিত্র মনে করা হতো । প্রাণীদের মধ্যে কুজওয়ালি ষাঁড়ই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । অনেকে মনে করেন , সিন্ধু বাসীদের মধ্যে সাপের পূজার প্রচলন ছিল । নদী পূজার কোন সঠিক প্রমাণ না থাকলেও আনুষ্ঠানিক স্নান যে তাদের পবিত্র আচরণের অন্যতম প্রধান অঙ্গ ছিল বৃহৎ স্নানাগার নির্ভুল প্রমাণ । 

সিন্ধু উপত্যকায় মৃতদেহ সৎকার সম্বন্ধে এখনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি । তবে সিন্ধু উপত্যকায় মৃতদেহ সৎকার তিন প্রকার প্রণালী বিদ্যমান ছিল বলে মনে করা হয় , ক) পূর্ন সমাধি খ) আংশিক সমাধি ও গ) দাহান্তর সমাধি । প্রথম প্রণালী অনুসারে মৃতদেহ কে অবিচ্ছিন্নরূপে  সোজা করে সমাধিস্থ করা হতো । সমাধির মধ্যেই মৃত ব্যক্তির ব্যবহার করা জিনিসপত্রও অলংকার রাখা হতো । দ্বিতীয় প্রণালী অনুসারে মাটির বড় বড় হাঁড়িতে মস্তক এবং অস্থি রক্ষা করে ভূপাতিত করা হতো । তৃতীয় প্রথা অনুসারে মৃতদেহ দাহ করা হত ।দাহ শেষে  মৃৎপাত্রের রক্ষিত হত । হরপ্পাতে ভূগর্ভে রক্ষিত মৃৎপাত্রের এই অবস্থা পাওয়া গিয়েছে। এতে মনে করা হয়, হিন্দু বাসিরা ভৌতিক ও দুষ্ট শক্তিকে বিশ্বাস করত এবং সেজন্য তারা কবচ ধারণ করতে । 

১) সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা । এর স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দেখাও । 

২) সিন্ধু সভ্যতা কি আর্যদের দ্বারা সৃষ্টি । তুমি কি মনে করো ? যদি আর্যদের দ্বারা সৃষ্টি না হয় এর বিপক্ষে কিছু যুক্তি দেখাও ? 

সিন্ধু সভ্যতার স্রাষ্টা : 

আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে সিন্ধু উপত্যকায় এক উন্নত ধরনের সভ্যতা গড়ে ওঠে । কিন্তু এই সভ্যতার স্রাষ্টা করা সেই বিষয়ে আজও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি । কারণ সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসীদের জাতিত্ব নিরূপণ করবার মতো উপযুক্ত তথ্যাদি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি । সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত বিভিন্ন সিলমোহরের খোদিত লিপির পাঠোদ্ধার হলে হয়তো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার সম্ভব হবে । এ কারণেই “ The Vedic Age “ গ্রন্থে এ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে ,” It is impossible at the present state of our knowledge to come to any definite conclusion “ । 

সিন্ধু সভ্যতার স্রাষ্টা কারা , সে সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত আছে । অধ্যাপক মার্টিমার হুইলার ও গর্ডন চাইল্ডের মতে , সিন্ধু সভ্যতার সুমেরীয় জাতির দ্বারা গড়ে ওঠে । অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এ সভ্যতার  জনক দ্রাবিড় জাতি । আসলে কেউ কেউ আবার সিন্ধু সভ্যতা আর্য জাতির দ্বারা সৃষ্টি বলে মত প্রকাশ করেছেন । 

যাহোক , নিম্নে এসব মতবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে যে যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে তার ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হল : 

যেসব প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক সুমেরীয়দের সিন্ধু সভ্যতার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করতে চান তাদের যুক্তি গুলো হচ্ছে : 

প্রথমত , সিন্ধু ও সুমেরীয় সভ্যতা উভই  ছিল নগর ভিত্তিক সভ্যতা । 

দ্বিতীয়ত , উভয় সভ্যতা গড়ে উঠে নদীর তীরে । 

তৃতীয়ত , উভয় সভ্যতার জনসাধারণের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য । 

চতুর্থত , ধর্মীয় ক্ষেত্রে উভয় সভ্যতার জনগণের মধ্যে যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায় । সিন্ধু বাসিরা যেমন মাতৃ পূজা করত তেমনি সুমেরীয়দের মধ্যে মাতৃ পূজার বহুল প্রচলন ছিল । সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সুমেরীয় দেবতা গিলাগামের ও এনকিডুর প্রতিচ্ছবি গুপ্ত সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে । এর থেকে অনুমিত হয় যে , সিন্ধু সভ্যতা সুমেরীয়দের দ্বারা সৃষ্টি । 

কিন্তু সিন্ধু ও সুমেরীয় সভ্যতার মধ্যে যেসব সাদৃশ্য আছে তেমনি বৈসাদৃশ্য কম ছিলনা । তা নিচে আলোচনা করা হলো : – 

প্রথমত , উভয় সভ্যতা নগর পরিকল্পনার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে । 

দ্বিতীয়ত, হরপ্পা ও  মহেঞ্জোদাড়োর  ন্যায় সুমেরীয় নগরগুলোতে উন্নত মানের জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল না । 

তৃতীয়ত , ভাস্কর্য ও পোড়ামাটির কাজে দুই সভ্যতার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল । 

চতুর্থত , ভাষা ও লিখন পদ্ধতিতেও দুই সভ্যতার মধ্যে কোন মিল ছিল না । 

পঞ্চমত , কৃষি জমিতে জল সেচের ক্ষেত্রে সিন্দুর ও সুমেরীয় অধিবাসীরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। 

সুতরাং উপরের উল্লেখিত বিষয়গুলো দ্বারা আমরা বলতে পারি যে, সিন্ধু সভ্যতা সুমেরীয় দ্বারা সৃষ্টি নয় । 

অনেকে মনে করেন , প্রাক -বৈদিক যুগের দ্রাবিড় জাতির দ্বারা সিন্ধু সভ্যতা সৃষ্টি। এ সম্পর্কে তাদের যুক্তি হলো: 

প্রথমত, আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনের পূর্বে দ্রাবিড়রা এ অঞ্চলে এক উন্নত নগরভিত্তিক সভ্যতা গড়ে উঠে যা সিন্ধু সভ্যতার অনুরূপ । 

দ্বিতীয়ত, হিন্দু উপত্যকার জনসাধারণের মত দ্রাবিড়রা ও ছিল কৃষিতে উন্নত , ব্যবসা-বাণিজ্যে পারদর্শী । 

তৃতীয়ত , ধর্মীয় ক্ষেত্রেও দুই সভ্যতা জনগণের মধ্যে যথেষ্ট মিল পরিলক্ষিত হয় । দুই সভ্যতার মানুষ শৈব ও শাক্ত ধর্মে অনুরাগী ছিল । লিঙ্গ পূজা ও উভয়  সংস্কৃতির ধর্মের লক্ষণ ছিল । 

চতুর্থত , সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা ভাষার সঙ্গে দ্রাবিড় ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বেলুচিস্তানে পাহাড়ে ব্রাহুই জাতি আজও দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে  । 

পঞ্চমত , দ্রাবিড়দের দেহগত নৃতাত্ত্বিকদের সঙ্গে সিন্ধু বাসীদের মিল খুঁজে পাওয়া যায় । 

ষষ্ঠত , সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় এর দিক দিয়ে এবং আর্যদের দ্বারা যদি সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তাহলে সিন্ধু সভ্যতা যে দ্রাবিড়দের দ্বারা সৃষ্টি তা বিশেষভাবে বলা যায় । 

উপযুক্ত বিভিন্ন যুক্তি সত্ত্বেও সিন্ধু সভ্যতার জনক রূপে দ্রাবিড়দের আজও চিহ্নিত করা সম্ভব হয় নি । কারণ উভয় সভ্যতার মধ্যে সাদৃশ্য যেমন রয়েছে তেমনি বৈসাদৃশ্য রয়েছে : – 

প্রথমত , দ্রাবিড়দের আদি নিবাস বলতে যা বুঝায় সেই দক্ষিনাত্যে প্রাচীন যুগের যেসব ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে তার সাথে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন এর কোন মিল নেই । 

দ্বিতীয়ত, উভয় সংস্কৃতির শব-সৎকার ব্যবস্থায় এক ছিল না । 

সুতরাং এই দিক থেকে আমরা বলতে পারি যে,  সিন্ধু সভ্যতা দ্রাবিড় দ্বারা সৃষ্টি নয় । 

অনেকে মনে করেন যে , সিন্ধু সভ্যতা আর্যদের দ্বারা সৃষ্টি । কিন্তু এর স্বপক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তি নেই । কিন্তু সিন্ধু সভ্যতা যে আর্যদের দ্বারা সৃষ্টি নয় তার বিপক্ষে অনেকগুলো যুক্তি আছে । 

প্রথমত , সিন্ধু সভ্যতা ছিল নগর ভিত্তিক । কিন্তু আর্য সভ্যতা ছিল গ্রামভিত্তিক । 

দ্বিতীয়ত, সিন্ধু সভ্যতা ছিল কৃষিভিত্তিক সভ্যতা । কিন্তু আজ ওরা ছিল যাযাবর । পশুপালন এই ছিল তাদের প্রধান পেশা । 

তৃতীয়ত , সিন্ধু সভ্যতায় লেখন পদ্ধতির প্রচলন ছিল । কিন্তু আজ ওদের মধ্যে লেখন পদ্ধতির প্রচলন ছিলনা । আর্যদের ভাষা ও সিন্ধু পাশের ভাষায় এক ছিল না । 

চতুর্থত , সিন্ধু সভ্যতার মানুষ লোহার ব্যবহার জানতো না । কিন্তু আর্য সভ্যতার লোকেরা লোহার ব্যবহার জানতো । 

পঞ্চমত , বৈদিক আর্যরা প্রকৃতি পূজার অভ্যস্ত ছিল । কিন্তু হরপ্পা সংস্কৃতিতে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি পূজার বিশেষ প্রচলন ছিল । 

ষষ্ঠত , ধর্মীয় ক্ষেত্রে সিন্ধু বাসিরা ষাঁড়ের পূজা করত । অপরপক্ষে আর্যদের মধ্যে গাভীর পূজার প্রচলন ছিল । 

সপ্তমত , আর্যদের কাছে ঘোড়াই ছিল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জন্তু । কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার বাহকদের কাছে বলিবর্দ বা ষাঁড় প্রধান জন্তু ছিল । 

অষ্টমত , আর্যরা মৃত ব্যক্তিকে দাহ করে । 

নবমত, আর্য সভ্যতা যেসব জিনিসপত্রগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো রঙ ছিল ধূসর । কিন্তু সিন্ধু সভ্যতা ছিল কালো ও লাল । 

দশমত, সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা হাতির সঙ্গে সুপরিচিত ছিল। কিন্তু আর্যদের কাছে হাতি ছিল নতুন জীব -বিশেষ । 

একাদশতম, হিন্দু সভ্যতার বাহক যে আর্য নয় , তার বড় প্রমাণ সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রসমূহ-এ কোন আর্যভাষা বার্ষিক নরডিক জনগোষ্ঠীর কোন কঙ্কাল পাওয়া যায় । সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র সমূহ থেকে যেসব নরগোষ্ঠীর কঙ্কাল পাওয়া গেছে তারা হচ্ছে : – ক) মেডেটেরিনিয়ান ২) প্রোটো-অক্ট্রালয়েড, ৩) মংগোলয়েড ও ৪) আলপিয়ান । 

দ্বাদশতম, কাল নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ও দুই সভ্যতার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় । এবং আর্যদের ভারতে আগমন ঘটে থেকে দেড় থেকে দুই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ মধ্যে । কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে ।

 সুতরাং আমরা বলতে পারি যে , সিন্ধু সভ্যতা কোন মতেই আর্যদের দ্বারা সৃষ্টি । 

১) সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণগুলি আলোচনা করো । 

২) সিন্ধু সভ্যতা আর্যদের দ্বারা ধ্বংস । তোমার মতামত সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখ । 

৩) সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণগুলি উল্লেখ করো । 

৪) কেন সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংস হয়েছে বলে তুমি মনে করো ? 

সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণ : 

দীর্ঘ ছয়শত বছর উজ্জল অস্তিত্বের পর আনুমানিক ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বে সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় । কিন্তু কীভাবে এই সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য এখনো জানা যায়নি । এবিষয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত আছে । সিন্ধু উপত্যকায় আবিষ্কৃত সিলমোহর এর উপর অঙ্কিত লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হলে এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে । তবে বিভিন্ন গবেষকদের বিশ্লেষণ থেকে এটা মনে হয় যে , সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পিছনে কতগুলো কারণ আছে । সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণ গুলো নিম্নে আলোচনা করা হল : – 

প্রথমত , জলবায়ুর পরিবর্তনে সিন্ধু সভ্যতার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে মনে করে । মর্টিমার হুইলারের মতে , সিন্ধু উপত্যকায় প্রথমদিকে ছিল জরাজীর্ণ । এই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো । কিন্তু বড় বড় ইমারত ,নগর, ঘর -বাড়ী , স্নানাগার তৈরির ফলে হরপ্পার অধিবাসীরা তাদের বনসম্পদকে ধ্বংস করে ফেলে । এর ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় । বৃষ্টির স্বল্পতার ফলে উর্বর কৃষি অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হয় । 

দ্বিতীয়ত, অনেককে সিন্ধু সভ্যতার পতনের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কে দায়ী করেছেন । এম আর শাহানী , রাইকেস প্রমুখ ঐতিহাসিক মনে করেন , বারবার বন্যায় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো ভেসে যায় । ঐতিহাসিক ম্যাকে চানহুদরো ধ্বংসের পেছনে বন্যা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বলে মত প্রকাশ করেন । আবার অনেকে মনে করে , সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ভূমিকম্প । কারণ গবেষণায় দেখা গেছে , দূর অতীতে মহেঞ্জোদাড়ো এলাকাটির ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল এবং ভূমিকম্পের কারণই মহেঞ্জোদাড়ো নগরী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় । এর সমর্থনে বলা যায় যে,  মহেঞ্জোদাড়ো খননকালে এখানকার মাটিতে এমন কতগুলো স্তর দেখা গেছে যা  এলাকা বার বার নির্মাণ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার চিহ্ন বহন করে । 

তৃতীয়ত , অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন , সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তন মহেঞ্জোদাড়ো নগরীর ধ্বংসের প্রধান কারণ ছিল । তাদের মতে , সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বন্দর হিসাবে মহেঞ্জোদাড়ো নগরীর আর কোন অস্তিত্ব ছিলনা । তাছাড়া জলাভাব ও শুষ্কতা বৃদ্ধির ফলে এলাকার কৃষি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষের দারিদ্রতা বৃদ্ধি পায় । এর ফলে বিদেশীরা সহজেই এই নগর অধিকার করতে সক্ষম হয় । 

উপযুক্ত কারণগুলো সিন্ধু সভ্যতার পতনের জন্য দায়ী ছিল , সন্দেহ নেই । কিন্তু এসব কারণগুলোর জন্য যদি সিন্ধু সভ্যতার পতন ঘটে তাহলে নিঃসন্দেহে তা ছিল এই সভ্যতার একেবারে শেষ পর্যায়ে । সিন্ধু সভ্যতার অবক্ষয় অনেক পূর্ব থেকে শুরু হয় । হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো উপরের স্তর পরীক্ষা করে দেখা গেছে , নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সামগ্রিক জীবনযাত্রায় সর্বস্তরে ভগ্নদশা ছিল অত্যন্ত সুপরিস্ফুট । সভ্যতার প্রথম দিকে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োতে বড় বড় যে দালানকোঠা ও প্রশস্ত রাস্তাঘাট তৈরি হয় শেষ পর্যন্ত তা পরিলক্ষিত হয়নি । কৃষি ক্ষেত্রে তেমন কোন উন্নয়ন ঘটেনি । সেচ ব্যবস্থার শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে । ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতি হয় । বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতার নগর গুলোর পূর্বে যে গৌরব ছিল তা পরবর্তীকালে ধরে রাখতে পারেনি । আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে । এই সংকট পরিস্থিতিতে সিন্ধু বাসীদের বিদেশি আক্রমণকে মোকাবেলা করতে হয় । 

সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের  সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিমত এই যে , উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ক্রমাগত বিদেশি শত্রুর আক্রমণের ফলে সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ ঘটে । অধ্যাপক পিগোট ও  হুইলার এর মতে, আর্য জাতির দ্বারাই এই সভ্যতার ধ্বংস হয় । এই মতবাদের সমর্থনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো এই যে , মহেঞ্জোদাড়ো রাস্তার উপর কবরহীন  বহু কঙ্কাল স্তপীকৃত অবস্থা পাওয়া গেছে । ঋগ্বেদ থেকে আর্য দেবতা  ইন্দ্র কর্তৃক দুর্গ বা পুর ধ্বংসের কথা জানা যা ।  এ ধরনের দুর্গ সিন্ধু উপত্যকায় দেখা যায় । ঋগ্বেদ থেকে আরও জানা যায় যে , আর্যরা অনার্যদেরকে পরাজিত করে সপ্তসিন্ধু জয় করে সেখানে বসতি স্থাপন করে । ঐতিহাসিকরা হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো এলাকায় প্রবাহিত সাতটি নদীকে সপ্তসিন্ধু বলে মনে করে । তাছাড়া কালানুক্রমে দিক থেকে বিচার করলে ও আর্য আক্রমণ ও সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ – এ দুইটির মধ্যে স্বাভাবিক যোগসূত্র পরিলক্ষিত হয় । 

সুতরাং দেখা যায় যে ,  নানাবিধ কারণে সিন্ধু সভ্যতার পতন হয় । তবে এখানে উল্লেখ্য যে , এই বিশাল সভ্যতার সমস্ত এলাকায় একই সাথে বিলুপ্ত হয়নি । বহুকাল ধরে ক্রমিক অবক্ষয় হতে হতে শেষ পর্যন্ত তা একেবারে বিলীন হয়ে যায় । 

১) সিন্ধু  উপত্যকায় মৃতের সৎকার কিভাবে করা হত ? 

উত্তর : মৃতদেহ সমাধিস্থ এবং দাহ করা হতো । 

২) আর্য কারা? 

উত্তর: আর্য একটি ইন্দো -ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর নাম। এই বাসায় যারা কথা বলতো তারাই সাধারণত আর্য নামে পরিচিত। 

৩) সপ্তসিন্ধু বলতে কি বুঝ? 

উত্তর:  সপ্তসিন্ধু  বলতে সাতটি নদী অর্থাৎ সিন্ধু , বিতস্তা , চন্দ্রভাগা, ইরাবতি , বিপাশা , শতদ্র্ন , সরস্বতীকে বুযায় । 

৪) সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছে কোন নদীর তীরে ? 

উত্তর : সিন্ধু নদীর তীরে । 

৫) সিন্ধু সভ্যতার জন্ম আজ থেকে প্রায় কত হাজার বছর পূর্বে ? 

উত্তর : প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে । 

৬) এ পর্যন্ত কয়টি সিন্ধু সভ্যতার এলাকা আবিষ্কৃত হয়েছে ? 

উত্তর : ৭০ টি । 

৭) স্যার জন মার্শালের মতে সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় করেন ? 

উত্তর : ৩২৫০-২৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত । 

৮) জি.জে.গ্যাড সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় করেন ? 

উত্তর ২৩৫০-১৭৭০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত । 

৯) স্টুয়ার্ট পিগট এবং স্যার মার্টিমার হুইলার সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় করেন ? 

উত্তর : ২৫০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে । 

 ১০) মহেঞ্জোদাড়োর  মোট আয়তন কত ? 

উত্তর : ৫৫,০০,০০০ বর্গফুট । 

১১) হরপ্পার আয়তন কত ? 

উত্তর : ২০,৫৪৪ বর্গফুট । 

১২) সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হয় কত সালে ? 

উত্তর : ১৯২১-১৯২২ সালে । 

১৩) ভারতের প্রাচীন সভ্যতা কোনটি ? 

উত্তর : সিন্ধু সভ্যতা । 

১৪) মহেঞ্জোদাড়োর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি কোনটি ? 

উত্তর : মহেঞ্জোদাড়োর উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি হলো বৃহৎ স্নানাগার । 

১৫) হরপ্পা কোন জেলায় অবস্থিত ? 

উত্তর : হরপ্পা পাঞ্জাবের  মন্টগোমারী জেলায় অবস্থিত । 

১৬) নগর দুর্গের উঁচু অংশে কারা বসবাস করত ? 

উত্তর : উচ্চশ্রেণীর অধিবাসীরা । 

১৭) নগর দুর্গের নিচে অংশে কারা বসবাস করত ? 

উত্তর : সাধারণত দরিদ্র লোকের । 

১৮) সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা একটি রাস্তার একটি রাস্তা কে কিভাবে অতিক্রম করত ? 

উত্তর : ৯০ ডিগ্রী বা সমকোণে । 

১৯) অধ্যাপক পিগোট ও হুইলার এর মতে , সিন্ধু সভ্যতা কাদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ? 

উত্তর : আর্য জাতির দ্বারা । 

২০) সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় আনুমানিক-  

উত্তর : ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বে । 

২১) সিন্ধু সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছে কবে ? 

উত্তর : আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে । 

২২) সিন্ধু সভ্যতা মৃতদেহ সৎকারের কয় ধরনের প্রণালী  ব্যবহার করা হতো ? 

উত্তর : তিন ধরনের । যেমন: ক) পূর্ন সমাধি খ) আংশিক সমাধি ও গ) দাহান্তর সামাধি । 

২৩) পশুপতি মহাদেব থেকে বুঝা যায় যে ? 

উত্তর : সিন্ধু বাসিরা শিবলিঙ্গের পূজা করত । 

২৪) নীলনদ কাদের খাদ্য যোগান দিত ? 

উত্তর : মিশরীয়দের । 

২৫) সিন্ধু উপত্যকায় এপর্যন্ত কয়টি সীল আবিষ্কৃত হয়েছে ? 

উত্তর : ২,৫০০ টি । 

২৬) অধ্যাপক বষ্কবিহারী চক্রবর্তী কয়টি সিলমোহর পাঠোদ্ধার করেছেন ? 

উত্তর : ৫১১ টি । 

২৭) হিন্দুর অধিবাসীরা দৈর্ঘ্য মাপার জন্য কোন প্রথা ব্যবহার করত ? 

উত্তর : দশমিক প্রথা । 

২৮) সিন্ধু সভ্যতা একটি – 

ক) নিওলিথিক সভ্যতা ,খ) মেসোলিথিক সভ্যতা , গ) চালকোলোথিক সভ্যতা , ঘ) প্যালিওলিথিক সভ্যতা । উত্তর : গ) চালকোলোথিক সভ্যতা । 

২৯) সিন্ধু সভ্যতার বন্দর শহর টির নাম – 

ক) রোপার খ) লোথাল গ) কালিবাস্থান ঘ) পাকিস্তান । 

উত্তর:  খ) লোথাল 

৩০) সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র গুলোর মধ্যে প্রথম আবিষ্কৃত হয় ? 

ক) লোথাল খ) মহেঞ্জোদাড়ো গ) হরপ্পা ঘ) শৌচাগার । 

উত্তর : গ) হরপ্পা 

৩১) নিচের কোনটি ব্যবহার হিন্দুর অধিবাসীরা জানতেন না ? 

ক) লোহা খ) ঘোড়া গ) তরবারি ঘ) সবগুলো । 

উত্তর : ঘ) সবগুলো । 

৩২) সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা কোন শস্যের চাষ প্রথমে শিখেছে ? 

ক) গম ও বার্লি , খ) ধান , গ) যব , ঘ)আখ 

উত্তর : ক) গম ও বার্লি । 

৩৩ ) নিচের কোনটি সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের জন্য একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয় ? 

ক) আর্যদের আক্রমণ খ) ভূমিকম্প  গ) বন্যা  ঘ) অগ্নিকাণ্ড 

উত্তর : ঘ) অগ্নিকাণ্ড । 

৩৪) মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কারক – রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । 

৩৫) সিন্ধু সভ্যতার বৃহৎ স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়েছে – হরপ্পায় । 

৩৬) কত সালে মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কৃত হয় ? 

উত্তর : ১৯২২ সালে । 

৩৭) মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা ভারতকে কি নামে ছিনে : –

উত্তর : মেলুহা । 

৩৮কোন বন্দরের মাধ্যমে সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা বাণিজ্য করত : – লোথাল। 

৩৯) উত্তর ভারতের মোট কয়জন রাজা সমুদ্র গুপ্তের কাছে পরাজিত হন? 

উত্তর: ৯ জন । 

৪০)সিন্ধু সভ্যতার যে বিশাল স্নানাগার টি পাওয়া গেছে সেটি কোথায় অবস্থিত ? 

উত্তর : মহেঞ্জোদাড়ো  । 

৪১) হরপ্পায় কে প্রথম খননকার্য চালান ? 

উত্তর : দয়ারাম সাহানি । 

৪২) মহেঞ্জোদাড়ো শব্দের অর্থ কি ?

উত্তর : মৃতের স্তুপ । 

৪৩) হরপ্পা সভ্যতা একমাত্র কোন স্থানে কোন দুর্গ পাওয়া যায়নি ? 

উত্তর : চানহুদাড়ো । 

৪৪) হরপ্পা কোন নদীর তীরে অবস্থিত ? 

উত্তর : রাভী । 

৪৫) মহেঞ্জোদাড়ো কোন নদীর তীরে অবস্থিত ? 

উত্তর : ইন্ডাস । 

৪৬) সিন্ধু সভ্যতা কোন যুগের সভ্যতা ? 

উত্তর : তাম্র যুগ । 

৪৭) হরপ্পা শহরের আকৃতি কেমন ছিল ? 

উত্তর : আয়তাকার । 

৪৮) সিন্ধু সভ্যতার বাড়ি গুলো কি দ্বারা তৈরি ? 

উত্তর : পোড়া ইটের তৈরি । 

৪৯) সিন্ধু সভ্যতা কোন সভ্যতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আছে বলে মনে করা হয় ? 

উত্তর : মেসোপটেমিয়া সভ্যতা । 

৫০) সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা কি ? 

উত্তর : কৃষিকাজ । 

৫১) সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের কাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল ? 

উত্তর : মেসোপটেমিয়ার । 

৫২) সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বেদ কোনটি ? 

উত্তর : ঋকবেদ । 

৫৩) বেদের অপর নাম কি ? 

উত্তর : শ্রুতি । 

৫৪) কোন যুগের সঙ্গে হরপ্পার লোকেরা যুক্ত ছিল ? 

উত্তর : ব্রোঞ্জ । 

৫৫) সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এর মূল উৎস কি ? 

উত্তর : প্রত্নতাত্ত্বিক খনন । 

৫৬) কালিবঙ্গান কোথায় অবস্থিত ? 

উত্তর : রাজস্থানে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 1 =