মহাবিদ্রোহ – ১৮৫৭

( The Great Revolt, 1857 ) 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । এই মহাবিদ্রোহ ভারতে ব্রিটিশ শাসন কে প্রায় ভাসিয়ে দিতে বসেছিল । এই বিদ্রোহ কোম্পানির ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে সূত্রপাত হলেও অল্পদিনের মধ্যে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিব্যপ্ত হয় । প্রায় এক বছর ধরে লক্ষ লক্ষ কৃষক , শ্রমিক এবং সিপাহীরা সাহসের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছিল । তাদের সাহসিকতা এবং আত্মবিসর্জন ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায় । 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ কেবলমাত্র সিপাহিদের অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত হয়নি । এই বিদ্রোহের মূল ছিল কোম্পানির শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনসাধারণের পুঞ্জিভূত অসন্তোষ এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ । প্রায় এক শতাব্দীকাল ধরে কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নিজেদের আধিপত্য ও কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করে । এর ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে । এই অসন্তোষেরই  বহিঃপ্রকাশ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ । 

মহাবিদ্রোহের কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণসমূহ আলোচনা করো । 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পেছনে যেসব কারণ দায়ী ছিল সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল : 

রাজনৈতিক কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ কি ছিল ? 

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ভারতীয় শাসকবর্গের তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব । ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এদেশে কোম্পানি একের পর এক ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।  এর ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয় । লর্ড ডালহেীসী কর্তৃক অনুসৃত স্বত্ব বিলোপ নীতির ফলে দেশীয়  রাজন্যবর্গেরমনে ভীতির ও ব্রিটিশদের প্রতি ঘৃণার উদ্বেগ হয় । এই নীতি প্রয়োগ করে ডালহেীসী সাতারা, ঝাঁন্সি, নাগপুর, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন । ১৮৫৭ সালে কর্ণাটের নবাব পদ বিলোপ করা হয় । পেশবা দ্বিতীয় বাজীরাও-এর দত্তকপুর নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয় । ১৮৫৬ সালে ডালহেীসী অপশাসনের অভিযোগে অযোধ্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন । বহু পূর্ব হতেই অযোধ্যার নবাবগন ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং কোনরুপ বিরুদ্ধাচরণ করেন নি । এ প্রসঙ্গে জন কে বলেন , “ False to the people-false to the manhood- they ( Nawabs ) were true to the British Government, “ 

কিন্তু ইহার সত্বেও ডালহেীসীর পররাজ্য গ্রাস-নীতির হাত থেকে অযোধ্যা রক্ষা পায়নি । শুধু রাজ্য গ্রাস করেই ডালহৌসি ক্লান্ত হয়নি । অযোধ্যার কোষাগার নিলর্জ্জভাবে লুণ্ঠন করা হয় । নবাবকে কলকাতার নির্বাসন দেওয়া হয় । হঠাৎ করে নবাবের রাজ্যচ্যুতির ফলে নবাবের বহু পরিবার একেবারে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে । এছাড়া অযোধ্যার কোম্পানি সরকার অত্যন্ত কঠোর এক ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন , যা সিপাহী তথা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিশেষভাবে ক্ষ্নন্ন করেছিল । 

এসব কারণে দেশীয় রাজ্য , দেশীয় সিপাহী  জনসাধারণ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ রাজত্ব সম্পর্কে তাদের মনে বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা বাড়তে থাকে । দেখা যায় , ক্ষমতাচ্যুত দেশীয় রাজন্যবর্গ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল । 

অর্থনৈতিক কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ কি ছিল । 

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইংরেজ সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ফলে জনসাধারণের অসন্তোষ ও ক্ষোভ । ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে এ দেশ ছিল কৃষি ও শিল্পে সমৃদ্ধ । কিন্তু ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এদেশের শুরু হয় লাগামহীন শোষণের পালা । এর ফলে ভারতীয়দের জীবনের চরম দারিদ্র্য নেমে আসে । কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতির ফলে এদেশের একদা সমৃদ্ধ কৃষককূল বণিক ও মহারাজাদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে সর্বক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ভূমিহীন কৃষকের পরিণত হয় । চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রসূত ভূমি বিক্রয় আইন তথা সূর্যাস্ত আইন অনুশীলনের অনেক বনেদি জমিদার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার হন । সমসাময়িক দার্শনিক ও বিদেশী লেখক কাল মার্কস ১৮১৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ সম্পর্কে নিম্নলিখিত কারণগুলোকে দায়ী করেছেন । 

প্রথমত , চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভারতীয় দরিদ্র কৃষকদের উপর জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারী শক্তির যুগ্ম শোষণ ; 

দ্বিতীয়তঃ , কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো ; আচ্ছা

তৃতীয়ত , আদায়কৃত রাজস্বের সামান্যতম অংশ ও কৃষির উন্নয়নে ব্যয় না হওয়ায় সেচ ব্যবস্থার ধ্বংস ; 

চতুর্থত , স্থানীয় শিল্পের ধ্বংস এবং ব্রিটিশ পণ্যের ভারতীয় বাজার দখল; 

পঞ্চমত , কৃষকদের উপরে বিবিধ অত্যাচারমূলক আইন । এসবের ফলে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ এর দানা বেঁধে উঠে এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসানকল্পে তারা বিধ্বংসী মহাবিদ্রোহের শামিল হয় । 

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ কুফল ছিল ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন । কোম্পানির কর্মচারীদের শুল্ক বিহীন অন্তঃবাণিজ্য এবং প্রতিটি দ্রব্যে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার মূলত : ভারতের চিরাচরিত বাণিজ্য প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করে। দেশীয় শিল্প পণ্যের রপ্তানি কমিয়ে এবং বৃটেনের শিল্পজাত পণ্যের আমদানি বাড়িয়ে সরকার ব্রিটিশ পণ্য বাজার ছেয়ে ফেলে । তাছাড়া ভারত থেকে রপ্তানিকৃত শিল্প পণ্যের উপর ব্রিটিশ সরকার চড়াহারে আমদানি শুল্ক বসায় । পাশাপাশি ভারতে কোম্পানি সরকার ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক প্রচুর ছাড় দেয় । এর ফলে ভারতীয় বণিকেরা এক অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয় এবং ভারতীয় বণিকদের তৈরি পণ্যের চাহিদা ক্রমশ : লোপ পায় । এই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশীয় বাণিজ্য ও শিল্প ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে । ফলে দরিদ্র পীড়িত বণিকেরা ও কারিগরেরা ইংরেজ বিরোধী এই মহাবিদ্রোহের অংশ নিতে কুণ্ঠিত হয়নি । 

সামাজিক কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের সামাজিক কারণ আলোচনা করো । 

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের জন্য সামাজিক কারণ ও কম ছিল না । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন , “ ভারতের সকল শ্রেণীর মানুষের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ।” বিজিত ভারতবাসীর প্রতি বিজয়ী শাসক শ্রেণীর ঘৃণার মনোভাব ভারতীয়দের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে । সামাজিক জীবনে এরা ভারতীয়দের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই নি । ইংরেজরা ভারতবাসীকে বর্বর বলে অভিহিত করতো  এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক গণ প্রকাশ্যভাবে হিন্দুদের মূর্তি পূজা ও সামাজিক সংস্কারে নিন্দা করতো । ১৭৭৮ সালে বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস স্বয়ং স্বীকার করেছেন , “ A few most of the English regarded the Indians almost as barbarians.” 

সামাজিক ক্ষেত্রেই ইংরেজরা কিছু সংস্কার প্রবর্তন করেছিল সত্য , কিন্তু এদেশের ধর্ম ও আচরণ সম্পর্কে ইংরেজদের অবজ্ঞা একান্ত প্রকট ছিল বলেই সতীদাহ হিতকর ব্যবস্থাকে ভারতীয়রা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি । রেলপথ বিস্তার ,টেলিগ্রাফ প্রভৃতি ব্যবস্থা দেশের পক্ষে অবশ্যই প্রয়োজন ছিল কিন্তু এগুলো যে বাণিজ্যিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্যই করা হয়েছিল তা ভারতবাসীর বুঝতে দেরি হয়নি । সুতরাং বিজেতা ও বিজিতদের মধ্যে ব্যবহারে ও আচরণে বৈষম্য বিদ্রোহের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল । 

ধর্মীয় কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ আলোচনা করা । 

ব্রিটিশ শাসনের প্রতি জনসাধারণের অসন্তোষের পেছনে ধর্মীয়ও কারণ ছিল । ভারতে খ্রিস্টান মিশনারীদের তৎপরতার ফলে ভারতীয়দের মনে এই আশঙ্কার জন্ম দেয় যে , ইংরেজ শাসনের তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য । খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যভাবে ধর্ম প্রচার , হিন্দু,  মুসলমানদিগকে ধর্মান্তরিত করার প্রচেষ্টা , বিদ্যালয়, হাসপাতাল ,জেলখানায় ক্রিস্টান পাদরীদের অবাধ যাতায়াতের হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দারুন আশঙ্কার সৃষ্টি করে । মন্দির বা মসজিদ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ভূমি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান গুলোর উপর করাভার আরোপের নীতি ভারতীয় জনগণের ধর্মীয় চেতনার চরম আঘাত হানে । ১৮৯০ সালে ভারত সরকার এমন একটি আইনে বিধিবদ্ধ করে যার মর্ম ছিল এই যে , খ্রিস্টধর্ম অবলম্বনকারীকে তার পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না । এর ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয় এই নিজ নিজ ধর্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রমাদ শুনে । ১৮৫৭ সালে R.D.Mangales ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেন যে , “ খ্রিষ্টধর্মের বিজয় পতাকা ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সগেীরবে উড্ডীন রাখার জন্যই ভাগ্যবিধাতা হিন্দুস্থানের বিস্তৃত সাম্রাজ্যঃ ইংল্যান্ডের হাতে তুলে দিয়েছেন । সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার কাজে প্রত্যেককেই  আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । এই ভাষণটি পাঠ করার পর ভারতবাসীর মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় যে , ভারতীয়দের ধর্মান্তরিত হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠতে চলছে । এমত অবস্থায় ভারতীয়দের কাছে সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ আইন, এমনকি রেল ভ্রমণে জাতিভেদ মেনে চলার অসুবিধা প্রভৃতি ইংরেজ শাসক বর্গের ভারতীয়দের খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার এক অভিসন্ধি বলে মনে হয় । এসব কারণে ভারতীয় জনগণের ধূমায়িত অসন্তোষ স্বাধীনতাযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে । 

সামরিক কারণ : 

#)     ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ আলোচনা করো । 

বিভিন্ন কারণে ভারতের দেশীয় সিপাহীদের মধ্যে অসন্তোষ এর বীজ উপ্ত হয় এবং এর এই অনিবার্য পরিণতি ঘটে  ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ  । কিন্তু এই সিপাহিদের নির্ভেজাল আনুগত্যের বলেই কোম্পানি ভারতবর্ষ জয় করতে পেরেছিল । শ্বেতাঙ্গ সৈন্যদের তুলনায় তাদের বেতনের স্বল্পতা অসন্তোষের যে একটি প্রধান কারণ তাতে কোন সন্দেহ নেই । জানা যায় যে , ৩ লক্ষ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যদের জন্য কোম্পানি সরকারের বছরে ব্যয় হতো মোট ৯৮ লক্ষ পাউন্ড । অথচ ৫১ হাজার ৩১৬ জন ইউরোপীয় অফিসার ও সৈনিকদের পেছনে খরচ হত ৫৬ লক্ষ ৬০ হাজার পাউন্ড । সামরিক বাহিনীতে দেশীয় সিপাহীদের নিকৃষ্ট শ্রেণীর জীব বলে গণ্য করা হতো । তাদেরকে  ‘ নিগার ‘ , ‘ গুয়োর’ ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা হতো । ভারতীয় হওয়ার অপরাধে এভাবেই হীনতার বোঝা বহন করা সিপাহীদের পক্ষে দুঃসহ হয়ে উঠেছিল । 

কোম্পানি সরকারে বৈষম্যমূলক ব্যবহার দেশীয় সৈন্যদের মনকে যখন বিষাক্ত করে তুলে ঠিক সে সময়ে কয়েকটি সামরিক সংস্কার সিপাহিদের ধর্মানুভূতিতে প্রচন্ড আঘাত হানে । সিপাহীদের কপালে তিলক কাটা নিষিদ্ধকরণ , দাড়ি কামানো এবং পুরানো পাগড়ির বদলে প্রতীক বিশেষ চামড়ার পাগড়ী গ্রহন ইত্যাদির ব্যবস্থার প্রবর্তন ভারতীয় সিপাহীদের মনকে বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত করে তোলে । সে যুগের সমুদ্রযাত্রা ছিল হিন্দুদের ধর্মবিরুদ্ধ । ১৮৫৬ সালে বড়লাট লর্ড ক্যানিং এক আইনের বলে সিপাহিদেরকে প্রয়োজন হলে দূর দেশে যেতে হবে ঘোষণা দিলে সিপাহীরা তাদের জাতীয় ধর্মের উপর আঘাত বলে মনে করে । 

সিপাহীদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে যখন অসন্তোষ পুঞ্জিভূত তখন এনফিল্ড নামক এক প্রকার বন্দুকের ব্যবহার অশান্তির বারুদে আগুন ধরিয়ে দেয় । ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসের চারদিকে গুজব রটল যে , এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের মধ্যে গরুর ও শূকরের চর্বি মাখানো আছে । এই কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে বন্ধুকে পুরতে হতো । সিপাহীরা এই কার্তুজের প্রবর্তনকে পরিকল্পিতভাবে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ধর্ম  নষ্ট করার প্রয়াস মনে করে এবং এই কার্তুজের ব্যবহারে অসম্মতি জানান । সরকারের পক্ষ থেকে এই জনরব ভ্রান্ত বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা সত্ত্বেও দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত এক দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয় । মহাবিদ্রোহের ক্ষেত্রে বহু পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল , চর্বির ব্যবহারে এতে শুধু ইন্ধন যোগালো । ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুর সেনানিবাসের মঙ্গল পান্ডে নামক জৈনক সিপাহী প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহী হলে সমগ্র ভারতে মহাবিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো । 

মহাবিদ্রোহের বিস্তার : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিস্তার আলোচনা করো । 

ব্যারাকপুরের সিপাহী বিদ্রোহ মুহূর্তের মধ্যে গোটা ভারতের বিস্তার লাভ করে । এপ্রিল মাসের শেষের দিকে উত্তরপ্রদেশের মিরাটে নব্বইটি পদাতিক বাহিনীর মধ্যে ২৫ টি বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে । বিদ্রোহী সিপাহীরা ইংরেজ রাইফেল বাহিনীকে অগ্রাহ্য করে জেলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং কয়েদি সমেত সাজাপ্রাপ্ত সিপাহিদের মুক্ত করে দেয় । অতঃপর ১১ মে বিদ্রোহী সিপাহীগন  দিল্লিতে পৌঁছে এবং দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে দিল্লির সম্রাট বলে ঘোষণা করে । বিনা প্রতিরোধে সিপাহীরা দিল্লি দখল করে । মিরাট দিল্লি অবস্থানের বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ সামরিক অফিসার ও অপরাপর ইউরোপীয়দেরকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি । 

মিরাট দিল্লি শহরে বিদ্রোহীদের সাফল্য এবং বাহাদুর শাহকে ভারত সম্রাট করার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ভারতে অদ্ভুত পূর্ব উত্তেজনা ও জাগরণের সৃষ্টি হয় । ১৩  মে পিরোজপুর এবং মোজাফফরনগরের সিপাহীগন বিদ্রোহ ঘোষণা করে । পাঞ্জাবে স্থানে স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয় । অযোধ্যা ও রোহিলাখন্ড বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে । অযোধ্যার বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন অযোধ্যার বেগম হযরত মহল ও মৌলভী আমহদউল্লাহ । ইংরেজ অধিনায়ককে হেনরি লরেন্স ও তার সামরিক বাহিনী বিদ্রোহী বিদ্রোহীদের আক্রমণে  পুর্যদস্ত হয়ে পড়ে । গুরুত্বর আঘাতে লরেন্সের মৃত্যু হয় । সিপাহীরা লক্ষ্মী শহর দখল করে এবং স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করে । বেরিলিতে খান বাহাদুর খাঁন নিজেকে দিল্লির সম্রাটের স্থানীয় প্রতিনিধি বলে ঘোষণা করে সেখানে নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা চালু করে। অনুরূপভাবে কানপুরে দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানাসাহেব বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন। বিদ্রোহীরা ইংরেজদের রাজকোষ লুণ্ঠন করে এবং ইংরেজদের অস্ত্রাগার দখল করে নেয় । নানা সাহেব কার অনুচর তাতিয়া তোপি ও আজিমুল্লাহ খানের উপর যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেন । তাতিয়া তোপি তার অসাধারণ রণকৌশল ও গোলন্দাজি দক্ষতার দ্বারা ইংরেজদের প্রভূত ক্ষতি সাধন করেন । ভারতীয় সিপাহিদের  প্রবল তৎপরতায় কানপুরে ইংরেজ সামরিক কৃতিত্ব একেবারে ভেঙ্গে পড়ে । নানাসাহেব নিজেকে পেশবা ঘোষণা করে সম্রাট বাহাদুর শাহের প্রতি তার আনুগত জানান । ১৮৫৭ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে ঝাঁন্সীর সিপাহীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । পরবর্তীকালে এই বাহিনীর নেতৃত্বে গ্রহণ করেন ঝাঁন্সীর বাণী লক্ষীবাঈ । ইংরেজ সেনাপতি হিউরোজের আক্রমণে তিনি ঝাঁন্সী ত্যাগ করে সিন্ধিয়ার গোয়ালিয়র দুর্গ দখল করেন । গোয়ালিয়রের সেনাদল তাকে স্বাগত জানায় । ইতিমধ্যে তাতিয়া তোপে রাণীর সঙ্গে যোগ দিলে ইংরেজদের অবস্থা খুব করুন হয় । কিন্তু সেনাপতি স্যার হিউরোজ শেষ পর্যন্ত লক্ষীবাঈকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। 

সিপাহী বিদ্রোহের ব্যাপকতা শুধুমাত্র উত্তর ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল না । বিদ্রোহীদের বহ্নি শিখা পূর্ব ভারতেও  বিস্তার লাভ করে । বিহারের জগদীশপুরের জমিদার কুনওয়ার সিং অসীম সাহস ও বীরত্বের সাথে নানা সাহেবের সাথে যুক্ত হয়ে বিহার, অযোধ্যা ও মধ্য ভারতের লড়াই করে । অতি দ্রুত বিদ্রোহের দাবানল দানাপুর, গয়া, ছোট নাগপুর , সম্বলপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । বাংলাদেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম যশোর ,সিলেট ,কুমিল্লা, পাবনা ,রংপুর-দিনাজপুর রাজশাহী বিদ্রোহের শামিল হয় । তবে দক্ষিণ ভারতে বিদ্রোহের কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি । 

বিদ্রোহ দমন : 

#) মহাবিদ্রোহ কিভাবে দমন করা হয় এ সম্পর্কে আলোচনা করো । 

বিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন অংশের দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে এবং ইহা এমন ভয়ানক আকার ধারণ করে যে , মনে হতো ভারত থেকে ইংরেজ শাসন শেষ হতে চলেছে । বিদ্রোহের প্রথম দিকে ব্রিটিশ পক্ষ বহু স্থানে পরাজিত হলেও জন ও হেনরী লরেন্স, হ্যাভলক, উট্টম, কলিন ক্যাম্পবেল প্রভৃতি ইংরেজ সেনা-নায়কদের সমর কৌশল ও উপস্থিত বুদ্ধি এবং পাঞ্জাবি , নেপালি,  শিখ সৈন্যদের সহযোগিতায় এবং একাধিক দেশীয় রাজন্যবর্গের সহযোগিতা শীঘ্রই বিদ্রোহ দমন করা হয় । ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ইংরেজ সামরিক বাহিনী তীব্র ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে দিল্লি শহর দখল করে । ব্রিটিশ বাহিনীর অত্যাচারে দিল্লিতে বহু নির্দোষ নর-নারী নিহত হয় । সম্রাট বাহাদুর শাহ হুমায়ূনের কবরে আত্মগোপন করে ও শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সেনাপতি হাডসনের হাতে ধরা পড়েন । সম্রাটের দুই পুত্র ও এক পেীত্রকে ইংরেজরা নৃশংসভাবে হত্যা করে । ১৮৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয় । সেখানে ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় । সম্রাটের মৃত্যুর সাথে সাথে মহান মুঘল বংশের গৌরব রবি চিরতরে বিলীন হয় । 

লক্ষ্নেীর বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয় । অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ মাস যুদ্ধ করে কলিন ক্যাম্বেলের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী লক্ষ্নেী দখল করে । ১৮৫৭ সালের ১৭ জুন তারিখে যুদ্ধরত অবস্থায় ঝাঁন্সীর রাণী নিহত হন । তাকে পরাজিত করেছিলেন জেনারেল স্যার হিউরোজ । তিনি রানী সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন , “ এখানে শায়িত রয়েছে এমন একজন রানী যিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ ।” তাতিয়া তোপি ইংরেজদের বহু বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে অবশেষে বন্দী হন এবং পরে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন । কানপুরের নানাসাহেব শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে নেপালের পলায়ন করেন । বিহারের কুনওয়ার ‍সিং বেরিলির খান বাহাদুর খাঁ, ফৈজবাদের মেীলভী আমহদউল্লাহ প্রভৃতি বিদ্রোহী নেতারা যুদ্ধরত অবস্থায় অথবা ফাঁসিতে পান দেন । এভাবে ভারতে নেতাগণ একে একে পরাজিত ও নিহত হলে বিদ্রোহের বহ্নি শিখা নির্বাপিত হয়ে যায় । ১৮৫৮ সালের জুলাই মাসের মধ্যে সর্বত্র শান্তি ফিরে আসে । 

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করো । 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক ও পন্ডিত মহলে বিতরকের শেষ নেই । এই বিদ্রোহ কি শুধুমাত্র সিপাহী বিদ্রোহ না ইহা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম । এ উভয়মতের পক্ষে ও বিপক্ষে অসংখ্য যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে । 

নিম্নে যেসব ইংরেজ ও ভারতীয় লেখক ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম হিসেবে দেখতে চেয়েছেন তাদের মতামত আলোচনা করা হলো : 

ইংরেজ লেখক জে, নর্টন তার Topics for India Statesman গ্রন্থে প্রথম লেখেন – ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ একটি সামান্য সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না । এই অভ্যুত্থান একটি গণ-বিদ্রোহের রূপ নিয়েছিল । জে.বি. নর্টনের বক্তব্যের সাথে  ডাফ, কায়ে, বল, ম্যলেসন প্রভৃতি ইংরেজ লেখক ও একমত পোষণ করেন এবং তারা এই বিদ্রোহে ইংরেজদের ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার একটি সংগঠিত প্রয়াসদেখতে পেয়েছিলেন । ভারতের জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের অনেকেই এই বিদ্রোহকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছেন । রজনীকান্ত গুপ্ত তার “সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস” গ্রন্থের স্বীকার করেছেন যে , সিপাহীরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই ইংরেজ শাসনের অবসান চেয়েছিলেন । বীর সাভারকারও ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানকে একটি জাতীয় যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী তার “Civil Rebellion in the Indian Mutinies” গ্রন্থ ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানকে একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ বলেই ক্লান্ত হন নি । তিনি এটিকে একটি গণবিদ্রোহ বলেও আখ্যায়িত করেছেন । এই মহাবিদ্রোহের প্রায় সমসাময়িক কালের কাল মার্কস New York Daily Tribune পত্রিকায় ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ সম্পর্কিত প্রবন্ধ এটিকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন । এই যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি তার প্রবন্ধ লেখেনঃ “এর আগেও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ হয়েছে । কিন্তু বর্তমান বিদ্রোহ কতকগুলো বৈশিষ্টসূচক ও মারাত্মক লক্ষণে চিহ্নিত । এই প্রথম সিপাহী বাহিনী হত্যা করল তাদের ইউরোপীয় অফিসারদের ; মুসলমান ও হিন্দুরা পারস্পারিক বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে মিলিত হয়েছে সাধারণ মনিবের বিরুদ্ধে । এই বিদ্রোহ শুধু কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে নি । বরং এটি বিস্তির্ন অঞ্চলে পরিব্যপ্ত হয়েছিল । 

অপরপক্ষে , Charles Raikes নামক একজন ইংরেজ বিচারপতি তার Notes on the Revolt in Northem Western Province of India তে লিখেছেন – “১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি সিপাহী বিদ্রোহ । ব্রিটিশ কৃতিত্ব শিথিল হবার ফলে ভারতের কোন কোন অঞ্চলে অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ছিল । ১৮৫৮ সালে ভারতীয় লেখকের কিশোরীচাঁদ মিত্র লেখেন, “ এই বিদ্রোহ ছিল অবশ্যই কেবলমাত্র সিপাহিদের অভ্যুত্থান  । এক লক্ষ সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল । এই অভ্যুত্থানে গণবিদ্রোহের ছিটেফোঁটাও ছিল না । L.E.R Reese এই বিদ্রোহকে ধর্মান্ধ হিন্দু ও মুসলমানদের খ্রিস্টধর্ম বিরুদ্ধে জেহাদ হিসেবে দেখেছেন । সমসাময়িক ভারতীয় যেমন স্যার আহমেদ খান , জণৈক সামরিক কর্মচারী দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতির মতেও ইহা ছিল সিপাহী বিদ্রোহ । 

অধুনা প্রকাশিত ড. আর.সি. মজুমদারের The Sepoy Mutiny and The revolt of 1857  এবং ড. সুরেন্দ্র নাথ সেনের Eighteen Fifty Seven- এই দুইখানি গ্রন্থের নতুন গবেষণালব্ধ তথ্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র বিষয়টিকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করা হয়েছে । ড. মজুমদার ও ড. সেন মোটামুটি একই কথা বলেছেন । ডঃমজুমদার ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের উপর ইংরেজি লেখক চার্লস রাইকসের মন্তব্য সমর্থন করে বলেন , “ এ বিদ্রোহ প্রথম সিপাহী বিদ্রোহ হিসাবেই শুরু হয় । কিন্তু পরে কোন কোন অঞ্চলে ইহা ব্যাপক প্রসার লাভ করে জাতীয় আন্দোলনে রূপ লাভ করে । বর্তমান উত্তর প্রদেশের অধিকাংশ , মধ্যপ্রদেশের কিছু ও বিহারে পশ্চিমাংশে জাতীয় বিদ্রোহের আকার ধারণ করেছিল । অন্যত্র ইহা শুধু সিপাহী বিদ্রোহ ভিন্ন কিছু ছিল না । তিনি আরো বলেন , “ জাতীয় সংগ্রামের পেছনের সব সময় দেশপ্রেম , সুপরিকল্পনা, সংগঠন ও শৃঙ্খলাবোধ থাকে সেটি বিদ্রোহের সময় দেখা যায়নি ।” ড. সেন অনুরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে বলেছেন যে , “ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীদের মধ্যে আরম্ভ হলেও সকল স্থানে ইহা কেবল সিপাহীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না । ইহা অযোধ্যা ও সাহাবাদ ভিন্ন অন্যত্র বিদ্রোহীদের প্রতি জনসাধারণের সমর্থন এমন কিছু ছিল না যা দ্বারা একে জাতীয় সংগ্রামের পর্যায়ে উন্নতী করা যেতে পারে ।” ড.সেন ও ড. মজুমদার এর মধ্যে তথ্য গত বিশ্লেষণের কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় । তারা উভয়েই এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম জাতীয় সংগ্রাম বলতে অস্বীকার করেছিলেন । 

একথা সত্য যে , ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ভারতব্যাপী বিস্তৃত ছিল না । ভারতের বহু শাসক এবং জমিদার শ্রেণী এই  বিদ্রোহকে সমর্থন জানায় । সিপাহীদের মধ্যে বেঙ্গল আর্মি ছাড়া বাইরের অন্যান্য রেজিমেন্টে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে দেখা যায়নি । শিখ ও গুর্খা সেনারা কোম্পানির প্রতি পূর্ণ আনুগত্য জানায় এবং দিল্লি ও আনুগত্য জানায় এবং দিল্লী ও লক্ষ্নেী- এর বিদ্রোহ দমনে তারা মুখ্য ভূমিকা নেয় । ইংরেজি শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীরও এই  বিদ্রোহকে সমর্থন করেননি । 

তথাপি, ১৮৫৭ সালের সংঘটিত বিপ্লবকে স্থানীয় সিপাহী বিপ্লব বলে তুচ্ছ জ্ঞান করা সমীচীন নয় । ১৮৫৭ সালের বিপ্লব প্রথমে সিপাহিদের দ্বারা শুরু হলেও পরবর্তী পর্যায়ে ইহা একটি জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ লাভ করে তা অনেক ভারতীয় ও ইউরোপীয় ঐতিহাসিক স্বীকার করেছেন । ঐতিহাসিক  V.A Smith এ প্রসঙ্গে বলেন , “ Discontents and unrest were widely prevalent among the civil population and in several places the population rose before the sepoy at those stations mutined .” পশ্চিম বিহার থেকে পাঞ্জাবের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডে এই বিদ্রোহ ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছিল ।  স্বয়ং বড়লাট লর্ড ক্যানিং বিবৃতিতে বলেছিলেন যে অযোধ্যা প্রদেশের প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহ এক জাতীয় অভ্যুত্থানের আকার নিয়েছে । আগ্রার  গুপ্তচর বিভাগের প্রধান ইউলিয়াম মুর ১৮৫৭ সালের ২৫ আগষ্ট এক চিঠিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উইলসনকে জানান “শুধু বিদ্রোহী সিপাহীরা নয় , জনসাধারণ ও আমাদের বিরোধী হয়ে উঠেছে : এই বিক্ষুব্ধ মানুষেরা দিনের পর দিন আমাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হচ্ছে এবং এটি অভ্যুত্থানের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । “ বুলন্দশহর জেলার ততানীন্তন মেজেস্টেট রবার্টসন তার এক প্রতিবেদনের আক্ষেপ করে বলেছিলেন – “সিপাহীরা বিদ্রোহ করতে পারে কিন্তু শান্তি প্রিয় গ্রামবাসীদের মানসিকতার এত দ্রুত পরিবর্তন কি করে এলো, তা আমি বুঝতে পারছি না । সুতরাং সিপাহিদের অসন্তোষের পাশাপাশি ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষের মনে যে ইংরেজ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিল তা বলা যায় । 

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ যে স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল তার স্বপক্ষে কতিপয় যুক্তি দেখানো যায় : 

প্রথমত , পৃথিবীর যে সমস্ত স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত হয় তা প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত জনগণ ও পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে । স্বাধীনতা আন্দোলনে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে সমর্থন করতে হবে এমন আশা করা যায় না । আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে বহু আমরিকান যোগ দেয়নি । ইতালি স্বাধীনতাযুদ্ধে বহু ইতালি ও অষ্ট্রিয়ার সমর্থন ছিল । স্পেনে ও রাশিয়ার ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বহুলোক নেপোলিয়নের প্রতি আনুগত্য জানায়। জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে ও দক্ষিণ জার্মানির অনেকেই ফ্রান্সের অনুগত ছিল । আসলে একটি সক্রিয় , দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গুষ্টি সর্বদাই যে কোন জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম মুখ্য ভূমিকা নেয় , অন্যরা নিষ্ক্রিয় ও নৈতিক সমর্থন জানায় । ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের তাই ঘটেছিল । 

দ্বিতীয়ত, ইহার সত্যিই ভ্রান্তিকর যে, স্বাধীনতা আন্দোলনে কোন নেতা ছিল না । মোগল সাম্রাজ্যের গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতের  হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিতভাবে মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে নেতা নির্বাচিত করেছিলেন । তিনি ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা ও জাতীয়তার প্রতীক । 

আধুনিক জাতীয়তাবোধের মানদণ্ডে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা স্বরূপ বিচার করা ঠিক নয় । ‘জাতীয় স্বাধীনতা ’ কথাটি বলতে আমরা বর্তমানে যা বুঝি  ১৮৫৭ সালের লোকেরা তা বুঝতো না।  ঊনিশ শতকের মধ্য ভাগে ভারতবাসীর জাতীয়তাবোধ মাত্র অঙ্কুরে করেছিল । যেসব লোক এই সংগ্রামে শুকরিয়া অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের নানা উদ্দেশ্য ও মতলব থাকা সত্ত্বেও তারা যে সকলে এদেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়নের ব্যাপারে একমত ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই । এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগ্রামকে অবশ্যই জাতীয় সংগ্রাম বলা যায় । 

নানাবিধ কারণে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলেও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম । ভারতের জাতীয় ইতিহাসে এই মহাবিদ্রোহ ছিল এক গৌরবময় অধ্যায় । এই মহা বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর এক প্রলয়ঙ্কারী প্রতিবাদ । এর দুর্বলতা আর যা-ই থাকুক না কেন , ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গ্রাস থেকে ভারতকে উদ্ধার করার জন্য ভারতীয় জনগণের এটাই হয়ে উঠেছিল প্রথম মুক্তি সংগ্রামে । উপমহাদেশে স্বাধীনতালাভের এই প্রচেষ্টার নব্বই বছর পরে বাস্তবে রূপ লাভ করে । 

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ সমূহ আলোচনা করো । 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ সমগ্র ভারতবর্ষের গন-সংগ্রামের ইতিহাসে সর্বপ্রধান ঘটনা । মাত্র দু’বছরের মধ্যে ভারতের কোটি কোটি  মানুষের মিলিত এ অবস্থার নানা কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । নিমে ব্যর্থতার কারণ সমূহ আলোচনা করা হলোঃ 

১) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ভারতের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপ্ত হলেও গোটা ভারতে তা ছড়িয়ে পড়েনি । ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজা  বা জমিদার গণে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেননি । বিদ্রোহে যোগদান করা দূরের কথা , এদের মধ্যে গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকার, হায়দ্রাবাদের নিজাম , রাজপুতনার নৃপতিগণ, ভূপালের নবাব, কাশ্মীরের রাজা , নেপালের রানী এমনকী আরো অনেক শাসক বিদ্রোহ দমনে প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ রাজাকে সাহায্য করেছিলেন । আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতগণও এই বিদ্রোহ সমর্থন করেননি। জমিদার ও বণিক শ্রেণী ও বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ছিল । ফলে বিদ্রোহের উদ্দেশ্য শীঘ্রই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । 

২) বিদ্রোহের মধ্যে সংহতি ও আদর্শের অভাব তাদের বিফলতার অন্যতম কারণ ছিল । বিদ্রোহীদের মধ্যে কোন সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সংগঠন ছিল না । এই বিদ্রোহ কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত হয় নি । ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বিদ্বেষই নেতৃবৃন্দকে এক সঙ্গে মিলিত করেছিল  । কোন একটি বিশেষ অঞ্চলের ইংরেজদের বিতারিত করার পর সেই শূন্যস্থানে কি ধরনের শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত হবে সে সম্বন্ধে পূর্বনির্ধারিত কোনো পরিকল্পনা ছিল না । একযোগে কাজ করার কোন নীতি বিদ্রোহীরা অবলম্বন করতে ব্যর্থ হয় । বিদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দ একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতেন । নেতৃবৃন্দের মধ্যে দ্বন্দ্বও ছিল । অযোধ্যার বেগম মৌলভী আহমদউল্লাহ সঙ্গে এবং মোগল শাহাজাদাগণও সিপাই নেতৃত্তের সঙ্গে কলহে  লিপ্ত হয়েছিলেন । সম্রাট বাহাদুর শাহ মারাঠা নেতা নানাসাহেব এবং ঝাঁন্সীর রাণী নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । এভাবে বিদ্রোহের নেতৃত্ব স্বার্থপরতা , গুষ্টি তান্ত্রিক মনোবৃত্তি বিদ্রোহের প্রান শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল । 

৩) বিদ্রোহীদের মধ্যে উপযুক্ত কোন নেতা বা সেনানায়ক ছিলেন না । বাহাদুর শাহ ছিলেন দুর্বল ও অকর্মণ্য । ঝাঁন্সীর রানী , নানাসাহেব , তাতিয়া তোপী, কুনওয়ার সিংহ প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ স্বস্ব এলাকায় সুযোগ্য নেতৃত্বে এর পরিচয় দান করলেও ব্যাপক বিদ্রোহ পরিচালনা করার ক্ষমতা তাদের ছিল না । উপযুক্ত নেতৃত্তের অভাবেই যে বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ তা অনস্বীকার্য । ইংরেজ সেনানায়ক জন লরেন্স এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন  “ সিপাহীদের মধ্যে যদি একজন ও প্রতিভাবান সেনানায়ক থাকতো , তবে আমাদের সর্বনাশ হত ।” 

৪) এ সময় পৃথিবীর মধ্যে ইংরেজ সেনাবাহিনী সবচেয়ে শক্তিশালী  ছিল । বিদ্রোহ শুরু হলে ভারতের বাইরের বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে হাজার হাজার সৈন্য ভারতে আনা হয় । ফলে ভারতে সুশিক্ষিত ও উন্নত অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজি সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় । অন্যদিকে , প্রায় নিরস্ত্র ও শৃঙ্খলাহীন ভারতীয় সিপাহীদের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে । 

৫) ইংরেজ বাহিনী উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল ।  এনফিল্ড রাইফেল ছিল তখন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাইফেল  এবং ইহা দ্বারা ইংরেজ সৈন্যরা সুসজ্জিত ছিল । অপরপক্ষে , বিদ্রোহী সেনাদের গাদা-বন্দুক , শড়কি এবং তলোয়ারের মতো সেকেলে অস্ত্র সম্ভার নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়েছিল । বিদ্রোহী সেনাবাহিনীতে গোলন্দাজ সৈন্যের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং গোলন্দাজ বাহিনীর সেনাপতিগণ প্রায় সকলেই ছিলেন অপদার্থ । তাছাড়া অধিকাংশ গোলন্দাজ সেনাপতি ছিলেন বিশ্বাসঘাতক । ফলে বিদ্রোহীরা ব্যর্থ হয় । অপরপক্ষে , ব্রিটিশ বাহিনীর বিশৃঙ্খলা , সামরিক দূরদর্শিতা ও উন্নত ধরনের সেনাপতিদের কারণে ব্রিটিশ বাহিনী জয় লাভ করে । 

৬) উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও এ সময় আর একটি শক্তিশালী অস্ত্র ইংরেজ শাসকদের  করায়ত ছিল । এই অস্ত্রটি ছিল ভারতের নবপ্রতিষ্ঠিত টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা । এই টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইংরেজদের পক্ষে উত্তর ভারতের বিক্ষিপ্ত ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে সংযোগ রক্ষা এবং দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়েছিল । যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম । কিন্তু বিদ্রোহীপক্ষ সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থা হতে বঞ্চিত ছিল । 

মহাবিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব : 

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ফলাফল আলোচনা করো । 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নানা কারণে ব্যর্থ হলেও এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদুরপ্রসারী । 

প্রথমত , ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই বিদ্রোহ ছিল এক গৌরবময় অধ্যায় । এই বিদ্রোহের দুর্বলতা যাই থাকুক না কেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গ্রাস থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় জনগণের এটাই ছিল প্রথম মুক্তি সংগ্রাম । এই বিদ্রোহ আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল । এই বিদ্রোহের আদর্শ ও পরিকল্পনা পরবর্তীকালে মুক্তিসংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল । 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আমাদের এই বিদ্রোহের ফলে ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ সরকার অনুধাবন করেন যে , ভারতের মতো বিশাল দেশের শাসনভার একটি বণিক কোম্পানির হাতে রাখা নিরাপদ নয় । এ কারণে ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটান এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি নিজ হাতে গ্রহণ করেন । রবি ভারত শাসন ব্যাপারে মহারানীকে সাহায্য করার জন্য বৃটিশ মন্ত্রীসভার একজন সদস্যকে ভারত সচিব নিযুক্ত করা হয় । স্যার চার্লস উড প্রথম ভারত সচিবের পদ অলংকিত করেন । তাকে সাহায্য করার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কাউন্সিল গঠন করা হয় । ভারতের বড়লাট  ভাইসরয় বা রাজ প্রতিনিধি হিসেবে অভিহিত হন । 

তৃতীয়ত , ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের রানী এক ঘোষণাপত্র জারি করেন । ওই ঘোষণাপত্রে – 

ক) স্বত্ব বিলোপনীতি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় । 

খ) দেশীয় রাজন্যবর্গের দত্তকপুত্র গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং তাদের সঙ্গে কোম্পানির স্বাক্ষরিত সকল চুক্তি রক্ষা করা হবে এ নিশ্চয়তা দেওয়া হয় । 

গ) ব্রিটিশ সরকার রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যাগ করবেন । 

ঘ) যোগ্যতা অনুযায়ী সকল ভারতীয়কে চাকরিতে নিয়োগ করা হবে । 

ঙ) ভারতীয়দের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে । 

ঘ) ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ভারতীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করা হয় । 

চতুর্থত , ভারতের শাসন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের অধিকতর সংযুক্ত করার লক্ষ্যে ৮৬১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় পরিষদ আইন পাশ করা হয় । এই আইনের বলে প্রথমবারের মতো ভারতীয় আইন পরিষদে ভারতীয় সভ্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় । 

পঞ্চমত , ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে গভর্নর জেনারেল ও পরিষদের হাতে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছিল । কিন্তু ১৮৬১ সালের পরিষদ আইনে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সি আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয় । 

ষষ্ঠত , মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করা হয় । অযোধ্যায় অবস্থিত ‘ বেঙ্গল আর্মির ’ পরিবর্তে ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠী থেকে সিপাহি নিয়োগ নীতি গ্রহণ করা হয় । ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় এবং গোলন্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয় । ইংরেজ সেনাবাহিনীর হাতে উন্নত সামরিক মারণাস্ত্র তুলে দেওয়া হয় । অপরদিকে ভারতীয় সিপাহীদের নিম্নমানের সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করতে দেওয়া হয় । 

সপ্তমত , ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোকে দখল করে গোটা ভারতে একচ্ছত্র ব্রিটিশ শাসিত সৃষ্টি করাই ছিল ইংরেজ নীতির লক্ষ্য । কিন্তু মহাবিদ্রোহের পর এই নীতির পরিবর্তন ঘটে । তখন থেকে দেশীয় রাজ্য গুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনে ব্রিটিশ সরকার ও অধিকতর গুরুত্ব দেয় । কারণ আর সাম্রাজ্যিক শাসন ও ঔপনিবেশিক শোষণ অব্যাহত রাখতে হলে দেশীয় সামন্ত শক্তিগুলোর সক্রিয় সহায়তা একান্ত প্রয়োজন ছিল । 

অষ্টমত , ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ ফল ছিল ভারতে মুঘল  সাম্রাজ্যের অবসান । দিল্লি অধিকার করে ইংরেজ সরকার বাহাদুর শাহকে বন্দী করেন । মোগলা বাদশাহদের  নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় । বাহাদুর শাহকে বিচার করে বেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয় । ১৮৬২ সালে রেঙ্গনে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতে মুঘল বংশের গৌরব রবি চিরতরে লুপ্ত হয় । 

নবমত , মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে । ইতিপূর্বে ইংরেজ সরকার ভারতের সামাজিক ও শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানাবিধ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করেন । কিন্তু ১৮৫৭ সালের পর এই বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট সর্তকতা অবলম্বন করেন । বস্তুতঃ বিদ্রোহের পর থেকে সরকার প্রতিক্রিয়াশীল নীতিরই আশ্রয় গ্রহণ করেন । 

পরিশেষে , এ বিদ্রোহের পর ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ করা যায় । হিন্দুরা পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং সরকারের সঙ্গে সহযোগীতা মূলক নীতি গ্রহণ করে উন্নতির দিকে এগিয়ে যায় । অপরপক্ষে , ভারতীয় মুসলমানরা সরকারের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা বর্জন করে ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে থাকে । 

১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন :

#) ১৮৫৭ সালের ভারত শাসন আইন কি?  

পটভূমি : 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা । উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় এই বিদ্রোহের গুরুত্ব অপরিসীম । এ বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকার দমন করতে সক্ষম হলেও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ডের জনগণ ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয় । তারা ভারতে বিদ্রোহীদের এজন্য কোম্পানির শাসন কে দায়ী করেন এবং মত প্রকাশ করেন যে , ভারতীয় জনগণের সাথে কোম্পানির যে কোনো যোগাযোগ নেই , এ বিদ্রোহ থেকেই তা প্রমাণিত হয় । এ প্রসঙ্গে Bright  বলেন, “ The Conscience of the nation had been touched on the question and it came by a leap-as it were by an irrepressible instinct-to the conclusion that the East India Company must be abolished.” 

 ১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামানস্টেন দ্বৈত শাসনের অবসানের লক্ষ্যে পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করেন । দ্বৈতশাসনের ত্রুটি সম্পর্কে তিনি পার্লামেন্টে এক স্মরণীয় ভাষণে বলেন , “ The principle of our political system is that all administrative functions should be accompanied by ministerial responsibility -responsibility to the parliament, responsibility to public opinion, responsibility to the crown, but in this case , the chief functions in the Government of India are committed to a body not responsible to parliament, not appointed by the Crown but elected by persons who have no more connection with India that consists in the simple possession of so much stock .” তিনি দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার জটিলতা ও অনুপোযোগী তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । তিনি তার ভাষণে আরো বলেন  “ Before a despatch upon the most important matter can go out to India, It has to oscillate between the cannon Row and the Indian House”  লর্ড পামারস্টোন কোম্পানির বোর্ড-অফ-ডাইরেক্টরস এবং মালিক সভার বিলোপ সাধন করে তদস্থলে একজন সভাপতির অধীনে একটি কাউন্সিল গঠনের পক্ষে মত প্রকাশ করেন । 

অপরপক্ষে , ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোম্পানির তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করে এবং বৃটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত রদ করার জন্য তৎপর হয় । কোম্পানির সভাপতি ও সহ-সভাপতি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন এর মাধ্যমে এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে , “ ভারতে মহাবিদ্রোহের জন্য কোম্পানিকে এককভাবে দায়ী করা অনুচিত । তারা প্রশ্ন রাখেন , কোম্পানি সরকারের ব্যর্থতার জন্য যদি ভারতীয় সাম্রাজ্যঃ বিদ্রোহ দেখা দেয় তাহলে আমেরিকার উপনিবেশগুলো ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থেকেও সেখানে কেন বিদ্রোহ দেখা দিলো এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ফেলল ? কোম্পানির পক্ষে আরও যুক্তি দেখানো হয় যে , ১৮৩৩ সালের সনদ আইন এর পর হতে ভারতীয় সাম্রাজ্যের শাসনের পরোক্ষ দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করেছিল । সুতরাং ভারতীয় সাম্রাজ্যের শাসন এর ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য এককভাবে কোম্পানিকে দায়ী করা সমীচীন নয় । যাহোক , কোম্পানির প্রতিবাদ সত্ত্বেও  ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারত শাসন আইন পাস হয় । নিম্নে এই আইনের প্রধান প্রধান ধারা সমূহ আলোচনা করা হলো : – 

ইংল্যান্ডস্থিত সরকার সম্পর্কিত ধারা সমূহ : 

১) এ আইনে ভারত শাসনের ক্ষমতা কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ রাজের হাতে অর্পিত হয় । এখন থেকে ভারত মহামান্য রানীর নামে শাসিত হবে । এই আইন বলে ইংল্যান্ডের রাজা বা রানী কোম্পানির স্থল ও নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন । 

২) এ আইনে বোর্ড-অফ-কন্ট্রোল এবং ডিরেক্টরস সভার বিলোপ সাধন করা হয় এবং এদের দায়িত্বসমূহ ভারত সচিব ও তার ভারত পরিষদ এর হাতে অর্পণ করা হয় । ভারতের সচিব ইংল্যান্ডের রাজা বা রানীর নামে ভারতের শাসনকার্য পরিচালনা করবেন স্থির করেন । 

৩) ভারতের সচিবকে সাহায্য করার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়  । এই ১৫ জনের মধ্যে ৮ জন ব্রিটিশ রাজ কর্তৃত্ব নিযুক্ত এবং  ৭ জন ডাইরেক্টর সভা কর্তিক নির্বাচিত হবেন । আইনে উল্লেখ করা হয় যে কাউন্সিলের অন্ততঃ ৯ জন সদস্য ভারত সম্পর্কে অভিজ্ঞ হবেন । 

৪) ভারত সচিবের কাউন্সিলের ডিরেক্টরদের মনোনীত কোন সদস্যপদ্য শূন্য হলে রাজা বা রানী কর্তিক তা পূরণ হবে । কাউন্সিলর এর সদস্য গণ সদাচরণ কাল পর্যন্ত নিজ নিজ পদ অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন । পালামেন্টের উভয় পরিষদের সুপারিশক্রমে রাজা বা রানী কর্তৃক তাঁরা  অপসারিত হবেন । 

৫) কাউন্সিলের প্রত্যেক সদস্যকে ভারতীয় রাজস্ব থেকে বার্ষিক ১২০০ পাউন্ড বেতন দেওয়া হবে  । কাউন্সেল প্রত্যেক সপ্তাহে একবার বৈঠকে মিলিত হবেন । ৫ জন সদস্যের উপস্থিতিতে বৈঠকের কোরাম হত । 

৬) ভারত সচিব কাউন্সিলের সব অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন । কোন বিষয়ে কাউন্সিল  সমান দু’ভাগে বিভক্ত হলে সে ক্ষেত্রে ভারত সচিব অতিরিক্ত ভোটদানের অধিকার ছিলেন । তার অনুপস্থিতিতে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার হলে তার লিখিত অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল । তিনি কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে অগ্রাহ্য করতে পারতেন । তবে কিছু কিছু বিষয় যেমন , রাজস্ব ও সম্পত্তি বরাদ্দ , সম্পত্তির ক্রয় বিক্রয় , অর্থের সিকিউরিটি প্রদান , বেতনের পরিবর্তন , ছুটি প্রদান , সিভিল সার্ভিস এবং ঋণ আদায়ে প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করতেন । 

৭) ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারত সরকারের কাছে প্রেরিত সকল চিঠিপত্র ভারত-সচিবের স্বাক্ষর পাঠানো হতো । অনুরূপভাবে ভারত সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রেরিত সকল চিঠিপত্র ভারত সচিবের নামে প্রেরিত হত । 

৮) ভারত-সচিবকে তার অনুপস্থিতিতে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য কাউন্সিল এর সদস্যদের মধ্য হতে একজন সহ-সভাপতি নিয়োগের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় । 

৯) ভারত সচিবকে পার্লামেন্টে ভারতের রাজস্ব ব্যয় সম্পর্কে বার্ষিক বিবরণী এবং ভারতীয়দের নৈতিক ও বৈষয়িক অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান করতে হতো । 

১০) এ আইনে ভারতের সিভিল সংক্রান্তঃ নিয়মকানুন বিধি-বিধান তৈরির দায়িত্ব ভারত-সচিব এর উপর অর্পণ করা হয় । 

১১) কোম্পানির সমস্ত চুক্তি আদান-প্রদান দায়-দায়িত্ব কোম্পানির উত্তরাধিকার হিসেবে ভারত সচিবের উপর অর্পিত হয় । 

ভারত সরকার সম্পর্কিত ধারা সমূহ : 

১) ভারতের গভর্নর-জেনারেল  ভাইসরয় হিসাবে পরিগনিত হবেন । 

২) গভর্নর-জেনারেল এবং প্রেসিডেন্সিসমূহের গভর্নররা রাজা কতৃৃক এবং তাদের পরিষদের সদস্যগন  স্ব-পরিষদ ভারত-সচিব কর্তৃক নিযুক্ত হবেন । রানীর অনুমোদনক্রমে  ভাইসরয় লেফটেন্যান্ট – গভর্নরদের নিয়োগ করবেন । 

৩) ভারত সচিব ও কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী ভারত সরকার পরিচালিত হবেন । 

আইনের গুরুত্ব : 

১) ১৮৫৮ ভারত শাসন আইন ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ভারতের শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ আইন একটি উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত । এ আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ভারত ইতিহাসে একটি যুগের অবসান এবং সূচনা হয় একটি নতুন যুগের । এ আইনের মাধ্যমে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান হয় এবং তদস্থলে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষ শাসন প্রবর্তিত হয় । এ প্রসঙ্গে Marshman  মন্তব্য করেন , “ It transferred to the crown on relinquishing its functions an empire more magnificent than that of Rome,” তবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে , যদিও এই আইনের মাধ্যমে ভারতের সরকার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে কিন্তু ক্ষমতার গুণগত ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি । 

২) এ আইনের ফলে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটে । ইংল্যান্ডের অনেকেই এই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন । ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে এ  ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জোর দেয়া হয় । ১৮৫৮ সালের আইনের মাধ্যমে দ্বৈত শাসনের অবসান হলে তা ইংল্যান্ডের সকল সচেতন মহলের প্রশংসা অর্জন করে । 

৩) ১৮৫৮ সালের আইনের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে ভারত কাউন্সিল গঠিত হয় । শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । ইতিপূর্বে কোম্পানির ডাইরেক্টর সভা ভারতবর্ষে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছিলেন । কারণ ডাইরেক্টর দের মধ্যে অনেকেই ভারত সম্পর্কে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিলনা । অপরপক্ষে , কাউন্সিলের সকল সদস্য ভারতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানা ছিল । কারণ কাউন্সিলর এর সদস্য হতে তাকে অন্ততঃ ১০ বছর ভারতে বসবাস অথবা চাকুরী করার বিধান ছিল । কাজেই কাউন্সিলরদের সদস্যগণ ভারত শাসনের ব্যাপারে ডাইরেক্টর সভার তুলনায় অধিকতর মনোযোগী হবেন তা বলাই বাহুল্য । 

৪) এ আইনের ফলে ভারত শাসনের সার্বিক দায়িত্ব অর্পিত হয় ভারত-সচিবের উপর  । ভারত সচিবের পদটি  ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ । ইতিপূর্বে মাঝারি গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে হতে বোর্ড-অফ কন্ট্রোলের সভাপতি নিযুক্ত হতেন । কিন্তু ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ব্যক্তিরা ভারত – সচিবের আসন অলংকৃত করতেন । ব্রিটিশ মন্ত্রী সভায় এবং পার্লামেন্টে ভারত সচিবের প্রভাব ছিল অপরিসীম । ইংরেজদের ভারতে ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত এ পদটি অক্ষুন্ন ছিল । 

৫) এ আইনের ফলে দেশীয় নৃপতিদের সাথে ইংরেজ শাসকদের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় । রানীর ঘোষণার যুদ্ধ ও রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যক্ত হওয়ার ফলে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হয় । 

৬) এ আইনে ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । ধর্মীয় ক্ষেত্রে সহিংসতা নীতি অনুসরণ করা হয় । চাকুরীর ক্ষেত্রে জাতি বা  ধর্মীয়গত যে বিভেদ ছিল তার অবসান হয় । 

আইনের সমালোচনা : 

১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হলেও এ আইনের কিছু ত্রুটি ছিল । 

১) এ আইনে ভারতীয়দের কোন অধিকার প্রদান করা হয়নি । তাছাড়া দেশের প্রশাসনেও ভারতীয়দের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ দেওয়া হয় নি । 

২) এ আইনের উচ্চ ঘোষণার দ্বারা ভারতের সম্ভ্রান্ত কিছু ব্যক্তি খুশি হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু অধিকাংশ ভারতীয় অসন্তুষ্ট ছিলেন । ফলে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটে ।চমৎকার ভাষায় লিখিত রাজকীয় ঘোষণার মাধ্যমে ক্ষমতার পট পরিবর্তন ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় । ক্রমেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে । 

৩) এ আইনের মাধ্যমে ভারত সচিবের বেতন এবং তার প্রতিষ্ঠান যাবতীয় খরচআদি ভারতীয় রাজস্ব হতে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয় । সরকারের এ পদক্ষেপ ভারতীয়রা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে । 

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন সম্পর্কে  Ramsay Muir এর মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় । তিনি বলেন , “ রাজশক্তির হাতে ভারতের শাসনভার হস্তান্তরের ফলে পরিবর্তন যতটা প্রথমে মনে হয়েছিল তার থেকে কম হইছে । কারণ ভারতের উপরে ভূখন্ডগত সার্বভৌমত্ব লাভের শুরু থেকেই কোম্পানির কার্যক্রমের উপর রাজশক্তির নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই বেড়ে ওঠে । কোম্পানির উদ্যোগে সাম্রাজ্যঃ বিকাশ লাভ করেছিল সত্য তবে বহুকাল আগেই তা কম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ।” 

মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজকীয় ঘোষণা , ১৮৫৮ :

#) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ কি জাতীয়  “ অভ্যুত্থান “ বলা যায় ? মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজকীয় ঘোষণা কি ছিল ? 

১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া এক রাজকীয় ঘোষণার মাধ্যমে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা কোম্পানির কাছ থেকে নিজ হাতে গ্রহণ করেন । ঘোষণাপত্রটি ছিল অত্যন্ত গুরু গম্ভীর , চমৎকার ভাষায় লিখিত এবং ভারতীয়দের প্রতি বন্ধুত্ব, উদারতা ও ন্যায়বিচারের বাণীতে পরিপূর্ণ । অনেকে ঘোষণাপত্রটকে ভারতবাসীর জন্য ম্যাগনাকার্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন । 

রানীর ঘোষণাপত্রে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা নিম্নরূপ : –

১) এ ঘোষণা ভারতীয় রাজন্যবর্গকে এই মর্মে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে , কোম্পানির সাথে ইতিপূর্বে তাদের চুক্তি ছিল , মহারানীর সরকার তা পালন করবেন । 

২) এ ঘোষণার স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যক্ত হয় । সামন্ত প্রধানদের দত্তকপুত্র গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয় । 

৩) এ ঘোষণায় যেমন দেশীয় রাজ্যগুলির অস্তিত্ব বজায় রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় ।  তেমনি তাদের অধিকার সংকুচিত করা হয় । ঘোষণায় বলা হয়- একমাত্র ইংরেজ ছাড়া অপর কোন ইউরোপীয় শক্তির সাথে তাদের সম্পর্ক থাকবে না । দেশীয় রাজ্যগুলির সামরিক শক্তি ও বহুলাংশে খর্ব করা হয় । 

৪) ঘোষণায় বলা হয় , জাতি, বর্ণ ও ধর্মের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার কোনো অবস্থাতেই ভারতীয়দের উপর খ্রিস্টধর্ম চাপানোর চেষ্টা করা হবে না । 

৫) আইন প্রণয়ন ও কার্যকরী করার ক্ষেত্রে ভারতীয় প্রথা, রীত-নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে । 

৬) ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ভারতীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল , তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করা হয় । 

৮) উপসংহারে , রানীর ঘোষণায় ভারতীয় জনগণের নৈতিক ও বস্তুগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । বলা হয় ভারতীয় জনগণের উন্নতির অর্থই আমাদের শক্তি , তাদের আনন্দেই আমাদের নিরাপত্তা এবং তাদের কৃতজ্ঞতায় আমাদের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

১) ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ হয়েছিল কেন ? 

২) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ কি ছিল । 

৩) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ আলোচনা করো । 

৪) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সামাজিক কারণ আলোচনা করো । 

৫) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ আলোচনা করো । 

৬) ১৮৫৭  মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ আলোচনা করো । 

৭) ১৮৫৭ মহাবিদ্রোহ  বিস্তার সম্পর্কে আলোচনা করো । 

৮) ১৮৫৭ মহাবিদ্রোহ কেন হয়েছিল । এবং এই বিদ্রোহ কিভাবে দমন করা হয় । 

৯) ১৮৫৭ মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করো । 

১০) সংক্ষিপ্ত আকারে এই মহাবিদ্রোহের ফলাফল আলোচনা করো । 

১১)সংক্ষিপ্ত আকারে এই মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল কেন । 

রচনামূলক প্রশ্ন :

১) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণ সমূহ আলোচনা করো । 

২) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো । 

৩) ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিস্তার এবং প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করো । 

৪) ১৮৫৭ মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল কেন ? ভারতের ইতিহাসে এই বিদ্রোহকে ম্যাগনাকার্টা বলা হয় কেন ? 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

56 − 48 =