ব্রিটিশ সরকারের ভারত শাসন নীতি ( ১৮৫৮-১৯০৫) ক্যানিং থেকে কার্জন ।

লর্ড ক্যানিং ( ১৮৫৮-৬২): 

#) লর্ড ক্যানিং এর শাসনামল আলোচনা করো । 

লর্ড ক্যানিং এর শাসনামলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ । ১৮৫৭ সালে ভারতে কোম্পানি শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটলো ইংল্যান্ডের রানী ভারতের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করেন । লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় বা রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হন । Lord Canning was the last Governor-General of the English East India Company and the first Viceroy under the Crown”- V.D.Mahajan : India since 1526, P, 202 ) । লর্ড ক্যানিং ছিলেন একজন উদার প্রকৃতির শাসক । শাসনভার গ্রহণ করেই তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মনোনিবেশ করেন । স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী বিদ্রোহীদের প্রতি উদার ব্যবহার করায় তিনি স্বদেশবাসীর কাছে অপ্রিয় হলেও স্বীয় কর্তব্য হতে কখনোই বিচ্যুত হননি । 

তাঁর সংস্কারসমূহ : 

#) লর্ড ক্যানিং এর সংস্কার সমূহ আলোচনা করো । 

মহাবিদ্রোহের অবসানের পর লর্ড ক্যানিং  ভারতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কতগুলো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । নিম্নে তার সবগুলো আলোচনা করা হলো : – 

#) লর্ড ক্যানিং এর সামরিক সংস্কার আলোচনা করো । 

১) সামরিক সংস্কার :

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ভয়াবহতা ও সিপাহিদের তৎপরতা ব্রিটিশ শাসক শ্রেণীর ভীষণভাবে আতঙ্কিত করেছিল । তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে , মহাবিদ্রোহের অবসানের পরে সামরিক কোন গঠনের ক্ষেত্রে হাত না দিলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব যে কোন মুহূর্তে বিপন্ন হতে পারে । তারা আরো উপলব্ধি করেন যে , ভারতে কোম্পানির সামরিক সংগঠন মজবুত ও শক্তিশালী না থাকার কারণেই ভারতীয় সিপাইরা বিদ্রোহ করার সাহস পেয়েছিল । যাহোক , অনেক চিন্তা ভাবনার পর ইংরেজরা সামরিক পুনর্গঠন এর ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তিনটি যথা – ১) ভারতে ইউরোপীয় সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দেশীয় সেনা সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া , ২) দেশীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে জাতীয় ঐক্য না গড়ে ওঠে সে দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা । এবং ৩) গোলন্দাজ বাহিনীর থেকে দেশীয় আর সিপাহীদের যথাসম্ভব অপসারণ করা । এসব নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় সেনা সংখ্যা বাড়িয়ে ৬২,০০০ এবং ভারতীয় সেনা কমিয়ে ১,৩৫,০০০ করা হয় । উল্লেখ্য যে , ১৮৫৬ সালে কম্পানি সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় ও দেশীয় সৈন্যদের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪০,০০০ ও ২,১৫,০০০ জন । সেনাবাহিনীতে সমস্ত উচ্চপদ পূর্বের মতো কেবলমাত্র ইউরোপের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। বেঙ্গল আর্মিকে প্রায় ভেঙ্গে ফেলা হয়। কারণ এই বাহিনী এই মূলতঃ বিদ্রোহে জড়িয়ে ছিল। গোলন্দাজ ও কামান বাহিনীকে সাধারণ বাহিনী থেকে পৃথক করে ইউরোপীয়দের হাতেই কামান গুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয় । দেশীয় সিপাহিদের গোলন্দাজ বাহিনীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় । সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন জাত ও সম্প্রদায়ের সিপাহিদের এমন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয় যাতে তাদের মধ্যে কোন ঐক্যবদ্ধতা গড়ে না  উঠে । মহা বিদ্রোহ দমনে শিখ, গুর্খা ও পাঠানরা ইংরেজ সরকারকে সাহায্য করেছিল । এজন্য ভারতীয় সেনাদলের তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় । এভাবে ব্রিটিশ সরকার সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব নিরাপদ রাখেন । 

২) ব্যয় সংকোচন ও আয় বৃদ্ধি নীতি : 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ দমনে সরকার দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে । ফলে ভারত সরকারের ঋণের পরিমাণ ৪০ মিলিয়ন স্টার্লিং  এ পৌঁছে যায় । লর্ড ক্যানিং অর্থ সংকট দূর করার জন্য জেমস উইলসনের সুপারিশ অনুসারে বছরে ৫০০ টাকা আয়ের উপর সৎকারা ৫ টাকা হারে আয় কর ধার্য করেন । তিনি বিভিন্ন বণিক শিল্পপতিদের উপর লাইসেন্স কর এবং ভারতে উৎপাদিত তামাকের উপর শুল্ক ধার্য করেন । আমদানিকৃত দ্রব্যসামগ্রীর উপরেও শতকরা ১০ টাকা শুল্ক ধার্য করা হয় । বেসামরিক ও সামরিক খাতে ব্যয় সংকোচন করা হয় । অর্থ সচিবের স্যামুয়েল লিং – এর পরামর্শে ক্যানিং স্থানীয় জনহিতকর কাজ গুলোর জন্য স্থানীয় সরকারকে আলাদা কর  ধার্য করার নির্দেশ দেন । ক্যানিং – এর এসব পদক্ষেপের ফলে সরকারের অর্থ সংকট দূর হয় । তার শাসনামলে এই উপমহাদেশের কাগজের মুদ্রা প্রবর্তিত হয় । 

৩) ভূমি নীতি : 

লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার কৃষকদের জমিদারদের কৃপার ওপর নিক্ষেপ করেছিল । জমিদাররা ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতেন । ক্যানিং উপলব্ধি করেন যে , কৃষকরাই ছিল ভারতের সম্পদ উৎপাদনকারী । ভারতীয় কৃষকদের উন্নতি না হলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে না । এজন্য তিনি কৃষকদের সাহায্য করার জন্য ১৮৫৯ সালে বেঙ্গল টেনান্সি  এ্যাকট বা বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব আইন পাস করেন । এ আইনে বলা হয় যে , যে সকল রায়ত প্রজা একাদিক্রমে ১২ বছর জমি চাষাবাদ করবে তারা সে জমিতে চাষের বা বসবাসের দখলিস্বত্ব লাভ করিবে । রায়ত শ্রেণি জমির মালিকানা না পেলেও দখলি-স্বত্ব পাবে । জমিদার তাদের প্রদেয় খাজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে আদালতের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে । বলপূর্বক প্রজাকে কাছারীতে ডেকে এনে নির্যাতন করা যাবে না । বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের এখতিয়ার  বিহার ও উত্তরপ্রদেশের একাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় । ১৮৫৯ সালের এই আইনে প্রজাদের উপর জমিদারদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য নিঃসন্দেহে অনেকাংশে খর্বিত হয়েছিল । ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র দত্ত ১৮৫৯ সালের প্রজাস্বত্ব আইনকে “ Charter of Bengal Cultivators “ বলে অভিহিত করেছেন । জমিদার শ্রেণী এই আইনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন শুরু করে । তারা বিভিন্ন সভা সমিতি ও পত্রপত্রিকায় মাধ্যমে প্রতিবাদ করে বলেন যে , এ আইনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিপন্থী । কিন্তু সরকার জমিদারদের জানিয়ে দেয় যে , তাদের শোষণ থেকে প্রজাদের রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব । 

৪) হাইকোর্টে স্থাপন : 

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে লর্ড ক্যানিং ব্রিটিশ রাজ্যের ন্যায়  ভারতে বিচারমূলক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন । তিনি ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তিক প্রতিষ্ঠার সুপ্রিমকোর্ট এবং সদর আদালত সমূহের বিলোপ সাধন করেন । তাদের স্থলে তিনি ১৮৬১ সালে কলকাতা, মুম্বাই  ও মাদ্রাজ হাইকোর্ট ( সর্বোচ্চ ক্ষমতা বিশিষ্ট আদালত ) স্থাপন করেন । 

৫) ভারতীয় দণ্ডবিধি : 

লর্ড ইউলিয়াম বেন্টিং – এর শাসনামলে ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে সর্বপ্রথম ভারতে আইন কমিশন গঠিত হয় । এ কমিশনের সভাপতি ছিলেন বড়লাটের পরিষদের আইন সদস্য লর্ড মেকলে । এই কমিশনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল ছিল ভারতীয় দণ্ডবিধি রচনা । ১৮৫৮ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধি কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর আইনে পরিণত হয় । 

ভারতীয় পরিষদ আইন , ১৮৬১ : 

১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক ভারতের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে । ভারতে প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থা স্থাপন এর সূচনা এ সময় হতেই শুরু হয় । ইতিপূর্বে সরকারের প্রশাসনে ভারতীয়দের সংযুক্ত করার কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি । ১৮৬১ সালেই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ সরকার আইন প্রণয়ন কাজে ভারতীয়দের সংযুক্ত করার অভিপ্রায়ে বিখ্যাত ভারতীয় কাউন্সিল বা পরিষদ আইন পাস করেন । এ আইনে আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গভর্নর-জেনারেলদের আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় । গভর্নর – জেনারেলের পরিষদের সদস্য ছাড়াও আরো অন্তত ৬ জন সদস্য এবং অনধিক ১২ জন সদস্য নিয়ে গভর্নর-জেনারেলের আইন পরিষদ গঠিত হয় । বলা হয় , এদের মধ্যে ৬ জন সদস্য বেসরকারি হবেন । বেসরকারি সদস্যদের অধিকাংশই ভারতীয় ছিলেন । বেসরকারি সদস্যরা দু’বছরের জন্য গভর্নর-জেনারেল কর্তৃক মনোনীত হতেন । অর্থাৎ জনগণ তাদের নির্বাচন করতেন না । যাহোক , এই প্রথম ভারতীয়দের আইন প্রণয়নের কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় । Prof. Coupland যথার্থই বলেছেন , “ In admitting Indians to the Councils and restoring power to the provinces a dual process of ‘ Indianisation’ and decentralisation had been started which was to lead, stage by stage, to Indian self-government.” 

৭) পুলিশ বাহিনীর সংস্কার :  

#) লর্ড ক্যানিং এর পুলিশ বাহিনীর সংস্কার আলোচনা করো । 

১৮৫৮ সালের মহাবিদ্রোহ থানাদারী ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করে । ১৮৫৭ সালে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসন ক্ষমতা সরকারি ব্রিটিশ রাজ্যে হাতে অর্পিত হয় । বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ভারত সচিব নিযুক্ত হন । ১৮৬০ সালে চার্লস উড ভারত সরকারকে পুলিশ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশ পাঠান । ভারত সচিবের নির্দেশ মোতাবেক ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং একটি শক্তিশালী পুলিশ কমিশন গঠন করেন । কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৮৬১ সালের ৫মে প্রণীত হয় নতুন পুলিশ আইন । নতুন ব্যবস্থায় পুলিশকে পূর্বেকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনতা থেকে পৃথক করে একটি আলাদা কেন্দ্রীয় বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা হয় । পুলিশ বিভাগের প্রধানের পদবী হয় ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ । পুলিশ প্রধানের নিচে নিযুক্ত হন নয় জন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল । জেলা পর্যায়ে নিযুক্ত হন একজন সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ । জেলাস্থ পুলিশ সংক্রান্ত সকল বিষয়ের জন্য পুলিশ সুপার কেন্দ্রীয় কৃর্তপক্ষের কাছে দায়ী থাকবেন । বড় জেলা গুলোর জন্য একজন সহকারী পুলিশ সুপার নিযুক্ত হন । জেলাস সুপারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে ইন্সপেক্টর , সাব-ইন্সপেক্টর, ওভারসিয়ার, চেীকিদার । নিম্ন পর্যায়ের সার্জেন্ট ও কনস্টেবল দ্বারা পুলিশ বাহিনী গঠিত হয় । ১৮৬১ সালের আইনে পুলিশ নিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয় যে , পার্থীর ধর্ম-বর্ণ-জাতি বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে । পুলিশের বেতন মাসিক ৪ টাকা থেকে যোগ্যতাঅনুসারে ৫ টাকা থেকে ৮ টাকায় উন্নীত করা হয় । পুলিশের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় । মোটামুটি ১৮৬১ সালে পুলিশ প্রশাসনের যে সংস্কার করা হয় তা ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ পর্যন্ত বলবৎ থাকে । 

লর্ড এলগিন ( ১৮৬২-৬৩): 

লর্ড ক্যানিং এর পর লর্ড এলগিন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । ভারতের দায়িত্বপূর্ণ গ্রহণ পূর্বে তিনি কানাডা এবং জামাইকায় গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন । ভাইসরয় হিসেবে ভারতে তার শাসনকালে ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত । দায়িত্বগ্রহণের ১৮  মাস পর তিনি ধরমশালায়  প্রাণ ত্যাগ করেন । তিনি তার শাসনকালে নতুন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি । শাসন ক্ষেত্রে তিনি তার পূর্বসূরিদের নীতিগুলি অনুসরণ করেন । তিনি জনগণের উপর নতুন কোন কর আরোপ করেন নি । সামরিক ক্ষেত্রে তিনি যথাসম্ভব ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করেন । 

স্যার জন লরেন্স ( ১৮৬৪-৬৯) : 

স্যার জন লরেন্স ১৮৬৪ সারে ভারতের ভাইসরয় যুক্ত হন । ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ারের মতে, “ লরেন্সের শাসনকালকে ক্যানিং – এর শাসননীতির পরিপূরক বলা চলে।” তবে ক্যানিং-  এর নীতির অনুগামী হলেও তাতে লরেন্সের ব্যক্তিত্বের চাপ ছিল । লরেন্স ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেন । তার শাসনামলে ভারতে অসংখ্য রেলপথ, রাস্তাঘাট নির্মিত হয় । কৃষকদের স্বার্থের প্রতি লরেন্সের বিশেষ দৃষ্টি ছিল । লরেন্স পাঞ্জাব ও অযোধ্যায় কৃষকদের ভূমিস্বত্ব দানের জন্য ১৮৬৮ সালে পাঞ্জাব প্রজাস্বত্ব আইন এবং অযোধ্যা প্রজাস্বত্ব আইন পাশ করেন । এই আইনের বলে পাঞ্জাবি কৃষকেরা ১২ বছর বা ততোধিক কোন জমি একাদিক্রমে চাষাবাদ বা  ভোগ দখল করলে সেই জমিতে তাদের দখল স্বত্ব দান করা হয় । অযোধ্যাতে ও ০.৫ ভাগ রায়ত জমিতে দখলিস্বত্ব পায় । বিদেশ থেকে আমদানিকৃত দ্রব্যসামগ্রীর উপরে তিনি ১০% থেকে ৭/০.৫% হারে শুল্ক হ্রাস করেন । তামাকের উপর আমদানি শুল্ক ২০% থেকে ১০% করা হয় । লরেন্স বন ও বিকাশ সম্পর্কে রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন । জনসেচের জন্য তিনি খাল খননের ব্যবস্থা করেন । লরেন্সের শাসনকালে উড়িষ্যার ( ১৮৬৫-৬৬) এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় । এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের প্রাণহানি হয় । এরপর ১৮৬৮-৬৯ সালে রাজস্থান ও বুন্দেলখন্দেও দুর্ভিক্ষ হয় । লরেন্স দুর্ভিক্ষের স্থায়ী মোকাবেলার জন্য এক দুর্ভিক্ষ কমিশন নিয়োগ করেন । এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী দুর্ভিক্ষ ত্রাণনীতি গঠন করা হয়। স্যার জন লরেন্স একজন সুশাসক ছিলেন । 

লর্ড মেয়ো ( ১৮৬৯-৭২) : 

স্যার জন লরেন্স- এর পর লর্ড মেয়ো ১৮৬৯ সালে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । তিনি ছিলেন মনমুগ্ধকর ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং একজন সুশাসক । মেয়োর শাসনকাল অভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । 

লরেন্সের শাসনামলে দ্রব্যসামগ্রীর উপর কর হ্রাস এবং ভারতব্যাপী নানা জনকল্যাণকর কাজ গ্রহণের ফলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল । লর্ড মেয়ো সরকারের আর্থিক ঘাটতি মোকাবেলার জন্য লরেন্সের সময়কালকে জনহিতকর গঠনমূলক কাজগুলোকে ছাটাই করেন । তিনি ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেন এবং কর ব্যবস্থার পূর্ণ গঠন করেন। যেসব এলাকায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলিত ছিল সেসব এলাকায় সরকারের ভূমিকার বসানোর কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু মেয়ো ঐসব এলাকায় জনগণের উপর সেস বা উপকর বসান । মেয়োর এসব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সরকারের আর্থিক সংকট অনেকাংশে দূর হয়। ইউরোপীয় লেখকরা মেয়োর ব্যয় সংকোচন এবং ঋণের বোঝা হ্রাস করার প্রশংসা করেছেন। 

লর্ড মেয়ো অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। মেয়র মতে বিকেন্দ্রীকরণের ফলে প্রদেশিক সরকারগুলোর পক্ষে স্থানীয় প্রয়োজন মেটানো সম্ভবপর হবে । তাছাড়া বিকেন্দ্রীকরণ নীতির একিট রাজনৈতিক গুরুত্বও  ছিল । এর ফলে ভারতবাসীকে কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে । ১৮৭০ সালে মেয়ো তারপর তাব উপস্থাপন করেন এবং কার্যকর করার ব্যবস্থা নেন । প্রস্তাবে বলা হয় , শিক্ষা-স্বাস্থ্য , রাস্তাঘাট  নির্মাণ প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক কাজে দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থাগুলোর হাতে ন্যস্ত হবে । সংস্থাগুলোকে এজন্য কর আদায়ের অধিকার দেওয়া হয় । মেয়োর পূর্বে অর্থনৈতিক যাবতীয় বিষয় কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হত । কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি ছাড়া প্রাদেশিক সরকাগুলি কোন অর্থ ব্যয় করতে পারত না । কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রীয় তহবিল হতে প্রাদেশিক সরকারগুলোকে বার্ষিক যে বরাদ্দ দিতো তা অর্থবছরের মোট ব্যয় করা সম্ভব না হলে কেন্দ্রীয় তহবিলে ফেরত পাঠানো হতো । লর্ড মেয়োর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ১৮৭০ সালে বাংলার আইনসভায় ‘ চৌকিদার আইন ‘ ১৯৭০ নামে একটি আইন প্রণীত হয় । এর পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার গ্রামঅঞ্চলে কোন স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা গঠনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন নি । উক্ত আইনের ধারা অনুযায়ী গ্রাম এলাকায় গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয় । জেলা প্রশাসন পঞ্চায়েত সদস্যদের মনোনয়ন দান করতেন । পঞ্চায়েত গুলো ‘ চৌকিদার ‘ নামক পাহারাদারদের নিয়োগ করতো ও  তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত । এ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিমূল প্রতিষ্ঠিত হয় । 

ভারতীয়দের শিক্ষার প্রতি ও লর্ড মেয়োর দৃষ্টি ছিল । তিনি উচ্চ শিক্ষা অপেক্ষা প্রাথমিক শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব দেন । তিনি আজমীরে মেয়ো কলেজ এবং লাহোর , রাজকোট ও অন্যান্য স্থানে অনুরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন । ভারতে শিক্ষার প্রসার সাধনে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান তাকে প্রভূত সাহায্য করেন । মেয়ো সর্বপ্রথম বাংলাদেশের আদমশুমারি কার্য সম্পন্ন করেন । ১৮৭২ সালে আন্দামান পরিদর্শনকালে তিনি একজন গোঁড়া পাঠান কর্তৃক ছুরিকাঘাতে নিহত হন । 

লর্ড নর্থব্রূক ( ১৮৭২-৭৬ ) : 

লর্ড মেয়োর নিহত হওয়ার পর লর্ড নর্থব্রূক ভারতের ভাইসরয়  হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন । লর্ড নর্থব্রূক একজন উন্নত চরিত্রের এবং গভীর শাসনতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন । তার শাসনামলে অর্থাৎ ১৯৭৩-৭৪ সালে বিহার ও বাংলার কিছু অংশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । এই দুর্ভিক্ষে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন ।  দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষজন যাতে খাদ্যশস্য ক্রয় করতে পারে সে জন্য তিনি দুর্ভিক্ষগ্রস্থ অঞ্চলে মাটি কাটা , খাল খনন ও প্রভৃতি কাজ দিয়ে লোকদের মজুরি পাওয়ার ব্যবস্থা করেন । তারে ব্যবস্থা খুবই খুব ফলপ্রসূ হয় । নর্থব্রূক ছিলেন মেয়োর ন্যায় অবাধ বাণিজ্যনীতির প্রবক্তা । ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য তিনি এ আমদানি ও রপ্তানির ওপর শুল্ক হ্রাস করে ভারত থেকে বিদেশে রপ্তানি বৃদ্ধি করেন । তিনি রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য ব্যয় হ্রাস করেন। আফগান নীতি প্রসঙ্গেই ইংল্যান্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দিলে ১৮৭৬ সালে তিনি পদত্যাগ করেন । 

লর্ড লিটন ( ১৮৭৬-৮০) : 

#) লর্ড লিটনের শাসনামল আলোচনা করো । 

লর্ড নর্থব্রূকের পর লর্ড লিটন ভারতের  ভাইসরয় বা রাজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হন । লিটন তৎকালীন ইংল্যান্ডের রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী ডিজরেলীর খুব পছন্দের লোক ছিলেন । তিনি ছিলেন প্রতিভাবান , বুদ্ধিদীপ্ত , সুবক্তা এবং একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক । 

লর্ড লিটনের শাসনকাল ছিল ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্য । তার শাসনামলে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে Royal title Act  পাশ হয় । এই আইনে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইংল্যান্ডের রানীকে  ‘ভারত সম্রাজ্ঞী ‘ বা ‘ কাইজার- ই- হিন্দ ‘ খেতাব দান করেন । এই খেতাব উপলক্ষে লিটন বিপুল অর্থ ব্যয় দিল্লিতে এক দরবারের অনুষ্ঠান করেন এবং মহারানী ভিক্টোরিয়াকে ‘ ভারত সম্রাজ্ঞী ‘ হিসেবে ঘোষণা করেন। 

লিটনের দুর্ভিক্ষ নীতিঃ 

#) লর্ড লিটনের দুর্ভিক্ষ নীতি আলোচনা করো । 

লর্ড লিটনের শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গ দক্ষিণ ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । ত্রান কাজে মাদ্রাস সরকারের অব্যবস্থাপনা ও  ত্রুটির কারণে প্রায় ৫০ লক্ষ লোক এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায় । লর্ড লিটন দুর্ভিক্ষ দমনে স্থায়ী নীতি গঠনের লক্ষ্যে জেনারেল রিচার্ড স্ট্রাচির নেতৃত্বে ১৮৭৮ সালে এক দুর্ভিক্ষ কমিশন নিয়োগ করেন । কমিশন দুর্ভিক্ষে ত্রাণকার্য পরিচালনার জন্য ১৮৮০ সালে কয়েকটি বিশেষ নীতি সুপারিশ করেন । সুপারিশে উল্লেখ করা হয়ঃ  

১) দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য সরকারকে প্রতি বছর দেড় কোটি টাকা রাজস্ব থেকে নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে ; 

২) প্রতি প্রদেশের দুর্ভিক্ষ তহবিল গঠন করতে হবে ; 

৩) দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত রেলপথ নির্মাণ ও খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে ; 

৪) ত্রাণকার্যে  উপযুক্ত ও সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়োগ দান করতে হবে ; 

৫) দুর্ভিক্ষ দের সময় লোকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে ; 

৬) দুর্ভিক্ষ এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে ; 

৭) দুর্ভিক্ষ ক্ষতিগ্রস্তের মানুষদের শস্যবীজ এবং গবাদিপশু ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ দিতে হবে । পরবর্তীকালে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় দুর্ভিক্ষ কমিশনের নীতিসমূহ ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছিল । 

আর্থিক নীতি : 

#) লর্ড লিটনের আর্থিক নীতি আলোচনা করো। 

লর্ড লিটন আর্থিক ক্ষেত্রে অবাধ বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করেন । তার পূর্বে বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন হারে লবণ কর আদায় করা হতো । লর্ড লিটন স্যার জন্য স্ট্রাচির সহায়তায় বিভিন্ন প্রদেশের লবণ কর – এ সমতা স্থাপন করেন । তিনি ১৮৭৮ সালে চিনীর উপর শুল্ক লোপ করেন এবং প্রায় ২৯ প্রকার আমদানি দ্রব্যের ওপর আমদানি শুল্ক তুলে দেন । তিনি ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত মোটা কাপড়ের উপর শতকরা ৫ ভাগ আমদানি শুল্ক হ্রাস করেন । লর্ড লিটনের কর ও শুল্ক হ্রাস করে তিনি ভারতের বাজারে ব্রিটিশ পণ্যের সরবরাহ ও বিক্রয় বৃদ্ধি করেন । মোটা বিলেতী কাপড়ের উপর শুল্ক কমিয়ে লিটন ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের প্রচন্ড ক্ষতি করেন । লিটনের মন্ত্রিসভায় এবং পশ্চিম ভারতের বস্ত্রকল মালিকগণ লিটনের কর ও শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেও লিটন তাতে কর্ণপাত করেন নি । লিটন প্রাদেশিক ব্যয় নির্বাহের জন্য ভূমি রাজস্ব ও আবগারি শুল্কের আয় প্রদেশিক সরকারের হাতে ছেড়ে দেন । তিনি প্রদেশগুলোতে কেন্দ্র তহবিল থেকে বার্ষিক আর্থিক বরাদ্দ দেয়ারও ব্যবস্থা করেন। 

তার সাম্রাজ্যবাদী শাসননীতিঃ 

#) লর্ড লিটনের সাম্রাজ্যবাদী শাসন নীতি আলোচনা করো । 

লর্ড লিটন তার সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় স্বার্থবিরোধী নীতির নানা পরিচয় দেন । ১৮৭৬ সালে লিটন এক আদেশবলে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের ঊর্ধ্বতন বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করেন । অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক তিনি যে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই । সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচণ্ড অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় । ভারত সভার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই নিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেন এবং পরীক্ষার্থীদের বয়স সীমা বৃদ্ধি করে ইংল্যান্ড ও ভারতের একই সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণের দাবি জানান । সুরেন্দ্রনাথ আদেশের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে কানপুর, দিল্লি , আগ্রা , এলাহাবাদ , লাহোর প্রভৃতি স্থানে পরিবহন করেন এবং বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন । কিন্তু লিটন সুরেন্দ্রনাথের প্রচারণায় কোনো কর্ণপাত করেন নি । তিনি বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে  স্ট্যাটুটারি সিভিল সার্ভিস গড়েন । ১৮৭৯ সালে লিটন একটি আইন পাশ করেন এবং আইনে বলা হয় যে , বছরে যে সংখ্যক ICS কর্মকর্তা নিযুক্ত হবেন তার এক ষষ্ঠাংশ স্থানীয় সরকার কর্তৃক ভারতীয়দের মধ্যে থেকে মনোনীত করা হবে । তবে চূড়ান্ত নিয়োগ এর আগে বড়লাট ও তার কাউন্সিলরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল । উচ্চবংশজাত ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী শিক্ষিত ও যোগ্য পাত্রী এসব পদে বিবেচিত হতেন । ভারতীয়রা অবশ্যই এ ধরনের মনোনয়ন নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন । প্রকৃতপক্ষে , মহারানীর গবেষণা অনুযায়ী , ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতে কর্মচারী নিয়োগের যে আশ্বাস দেওয়া হয় লর্ড লিটস তা কার্যকর করতে রাজি ছিলেন না । এজন্য তিনি স্ট্যাটুটারি সিভিল সার্ভিস দ্বারা ICS – এ ভারতীয়দের যোগদানের পথ রদ্ধ করেন । 

লর্ড লিটনের অপর দুই বহুল সমালোচিত কাজ ছিল ভারতীয় ভাষায় সংবাদপত্র দমন আইন ও অস্ত্র আইন । লর্ড লিটনের স্বৈরাচারী নীতি , মহারানী ভিক্টোরিয়াকে ‘ ভারত সম্রাজ্ঞী ‘ খেতাব প্রদান উপলক্ষে দিল্লি দরবারে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় ,  পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণে তার চরম ব্যর্থতা , জনগণের উপর কর আরোপ প্রভৃতি ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোতে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন । লর্ড লিটন আশঙ্কা করেন যে , দেশীয় ভাষায় লেখার সরকারের বিরুদ্ধে এসব সমালোচনার পরে ভারতবাসীর রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পাবে । তিনি এই সংবাদপত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৮৭৮ সালে Vernacular press Act পাশ করেন । এ আইনে সরকারের বিরুদ্ধে সব ধরনের সমালোচনা নিষিদ্ধ করা হয় । একই বছরে লিটন ভারতবাসীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অস্ত্র আইন পাস করেন । এ আইনে বলা হয়েছে যে, কোন ভারতীয় নিজের কাছে অস্ত্র রাখতে হলে অবশ্যই সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে । সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইন শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে । কারণ আইন দুটি ছিল ঘোর দুরভিসসন্ধিমূলক ও জাতি বৈষম্যমূলক । এখানে উল্লেখ্য যে , সংবাদপত্র আইন কেবলমাত্র দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র উপর প্রয়োগ করা হয় , ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্রগুলোকে এ আইনের আওতার থেকে বাদ দেওয়া হয় । ঠিক অনুরূপভাবে ইউরোপীয়দের অস্ত্র রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না । কেবলমাত্র ভারতীয়দের ক্ষেত্রেই লাইসেন্স ব্যবস্থা করা হয় । 

উপরোক্ত দুটি আইনের বিরুদ্ধে শিক্ষিত ভারতীয়রা তীব্র প্রতিবাদ জানাই । ভারতসভার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি আইনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন শহরে ঘুরে জনসভা করেন এবং প্রদেশের নেতাদের সংগঠিত করেন । কিন্তু লর্ড লিটন এই প্রতিবাদের কোনো কর্ণপাত করেন নি । বাংলায় শেষ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা অমৃতবাজার পত্রিকা এ আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলা সংস্করণ লোক করে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করতে বাধ্য হন । 

কৃতিত্বঃ 

#) লর্ড লিটনের কৃতিত্ব আলোচনা করো 

বিভিন্ন ঐতিহাসিক লর্ড লিটনের নীতিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন । ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ার লিটন সম্পর্কে বলেন “লর্ড লিটন সন্দেহের বাতাবরণে তার কার্যকাল শুরু করেন এবং সমালোচনার মেঘাজালে তার কার্যকাল শেষ হয় ।” ভারতীয় ঐতিহাসিকদের চোখে  লিটন ছিলেন একজন সাম্রাজ্যবাদী এবং স্বৈরাচারী শাসক । ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ব্যাপক জীবনহানির জন্য তাকে সাধারণত দায়ী করা হয় । দুর্ভিক্ষে যখন হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছিল তখন তিনি দিল্লীতে আড়ম্বরপূর্ণ দরবার অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ছিলেন । লিটন তার শুল্ক ও আমদানি নীতি দ্বারা ভারতের বাজারে বিলেতি মালের বিক্রয়যোগ্য মুক্ত করে দেন । ১৮৭৮ সালে ভারতীয় সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইন পাস করে তিনি ভারতীয়দের ক্ষুব্ধ করে তোলেন এবং ভারতীয় ও ব্রিটিশদের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করেন । তবে লর্ড লিটন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী এবং প্রতিক্রিয়াশীল শাসক হলেও তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল মানুষ । তার অনেক পরিকল্পনা কার্যকারী হতে পারেনি কারণ সেগুলো ছিল যুগের অগ্রবর্তী চিন্তা । তবে তার সংস্কার পরিকল্পনা পরবর্তীকালে লর্ড কার্জন কর্তৃক সম্পন্ন হয়েছিল । 

লর্ড রিপন ( ১৮৮০-৮৪) : 

#) লর্ড রিপন এর শাসনামল আলোচনা করো । 

লর্ড লিটনের পর লর্ড রিপন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । লর্ড রিপন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোনের উদারনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন । তার শাসনকালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । একজন শান্তিপ্রিয় ও উদারপন্থী শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী নীতির ঘোরবিরোধী । চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রশাসন সম্পর্কে ধ্যান-ধারণায় তিনি ছিলেন লর্ড লিটনের সম্পূর্ণ বিপরীত । ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন । তিনি ভারতীয় জনগণকে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের উৎসাহিত করেন এবং শিল্পে হস্তক্ষেপ না করার নীতি নেন । এভাবে রিপন তার শত চেষ্টা দ্বারা ভারতীয় জনগণের হৃদয় জয় করে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ শাসকের মর্যাদা লাভ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন । 

তার সংস্কারসমূহ : 

#) লর্ড রিপনের সংস্কার সমূহ আলোচনা করো ।

লর্ড রিপন এর শাসনকাল ভারতবর্ষের ইতিহাসে নানাবিধ সংস্কারের জন্য বিখ্যাত । নিম্নে তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য সংস্কারগুলি আলোচিত হলোঃ 

উদারনৈতিক আইনসমূহঃ 

 লর্ড রিপন লর্ড হিসেবে কলকাতায় আসার পর মন্তব্য করেন যে , “ Judge me by my acts and not by my word.” অর্থাৎ আমার কাজের দ্বারা আমাকে বিচার করুন , আমার কথার দাঁড়া আমাকে বিচার করবেন না । ভারতের লর্ড লিটনের সাম্রাজ্যবাদী ও দমনমূলক নীতির ফলে সর্বত্র এক ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তিনি লক্ষ করেন । লর্ড রিপন সর্বপ্রথম লর্ড লিটনের আপত্তিকর আইনগুলোকে সংশোধন দ্বারা জনমতকে শান্ত করার চেষ্টা করেন । এজন্য তিনি প্রথমেই ১৮৮২ সালের ৩নং আইন দ্বারা ( Act III, 1882) লর্ড লিটনের সংবাদপত্র দমন আইন লোপ করেন । তিনি পুনরায় দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার দেন । রিপনের এই সদিচ্ছামূলক আইন ভারতীয় জনগণকে শান্ত করতে বিশেষভাবে সহায়তা করে । 

প্রথম কারখানা আইনঃ 

১৮৮১ সালে লর্ড রিপন এর উদ্যোগে ভারতে প্রথম কারখানা আইন গৃহীত হয় । এই আইনের মাধ্যমে সাত বছর বয়সের শিশুদের কারখানায় শ্রমিকের কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয় ।সাত  থেকে বারো  বছর বয়সী শিশুদের দিনে মোট নয় ঘণ্টা কারখানায় কাজ করার নিয়ম চালু করা হয় । বিপদজনক যন্ত্রপাতি বেড়া দ্বারা ঘিরে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয় । এই আইন যথাযথ কার্যকরী হচ্ছে কিনা তা তদারক করার জন্য ফ্যাক্টরি পরিদর্শক নিযুক্ত করা হয় । যদিও এই ফ্যাক্টরি আইন দ্বারা শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি দাওয়া পুরন হয়নি তথাপি রিপন কারখানায় শ্রমিকদের সমস্যার দিকে সর্বপ্রথম নজর  দিয়েছিলেন একথা বলা যায় । 

শুল্ক ও রাজস্ব সংক্রান্ত সংস্কার : 

লর্ড রিপন যখন ভারতের ভাইসরয় হিসেবে আসেন তখন ভারত সরকারের আর্থিক অবস্থা খুবই সচ্ছল ছিল । এই আর্থিক সচ্ছলতার কারণে তিনি এই লিটন কর্তিক অনুসৃত অবাধ বাণিজ্যনীতির সম্পূর্ণতা সাধন করেন । প্রজা সাধারণের উপকারার্থে তিনি লবণ ও অন্যান্য বাণিজ্য দ্রব্যের উপর শুল্ক উঠিয়ে দেন এবং আয়কর রহিত করেন । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিবর্তন সাধন তিনি চেষ্টা করেন । তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে , জমিদারদের সঙ্গে বন্দোবস্ত স্থায়ী হলেও জমির উৎপাদিকা শক্তির হ্রাস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বের পরিমাণও পরিবর্তিত করার ব্যবস্থা হোক । কিন্তু রিপনের এই প্রস্তাব ভারত সচিবের বিরোধিতার কারণে বাতিল হয়ে যায় । তার এই প্রস্তাব গৃহীত হলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি প্রধান ত্রুটি দূর হতো সন্দেহ নেই । 

শিক্ষা সংস্কার : 

লটারি কোন ভারতীয় জনগণকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কল্পে ১৮৮২ সালে স্যার উইলিয়ম হান্টার এর নেতৃত্বে এক কমিশন নিয়োগ করেন । কমিশনের রিপোর্টে ১) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপনের দায়িত্ব স্থানীয় লোকাল বোর্ড , মিউনিসিপ্যালিটি ও কর্পোরেশনের হাতে ন্যাস্ত করার সুপারিশ করা হয় । ২) প্রদেশিক সরকারের রাজস্বের একাংশ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যয় করার সুপারিশ করা হয় ; ৩) মাধ্যমিক শিক্ষার অগ্রগতি ও গ্রান্ট-ইন-এইড প্রথার কার্যকারিতার সন্তোষ প্রকাশ করা হয় ; ৪) বৃত্তি শিক্ষা যথা বাণিজ্য , কারিগরি শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয় । ৫) উচ্চ শিক্ষার উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয় ; ৬) বাংলাদেশি বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষাদান , স্ত্রীশিক্ষা ও মুসলিম শিক্ষার উন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয় । হান্টার কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ সরকার গ্রহণ করেন । 

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন : 

বড়লটি লর্ড রিপনই ছিলেন এদেশের স্বায়ত্তশাসন এর প্রধান স্বপ্নদ্রষ্টা । তিনি এই সর্বপ্রথম এ দেশে সত্যিকার অর্থে সাহিত্য শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণকে অধিকতর রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন । তিনি বলেছিলেন , “ অধ্যবসায় সবচেয়ে বড় শিক্ষক” । তাই জনগণকে ক্ষমতা ও সুযোগ প্রদান করলে তারা নিশ্চয়ই ভালোভাবে তাদের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবে । তিনি মত প্রকাশ করেন যে, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সংস্থাগুলোর হাতে অধিকতর ক্ষমতা দান করে এ সংস্থাগুলোর কাজকর্মে আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপ রদ করা দরকার । এটি সম্ভব না হলে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের ভারতবাসী শিক্ষা লাভ করতে পারবে না । এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ১৮৮২ সালে রিপন স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব ( Ripon’s Resolution, 1882) পাশ করেন । তিনি আমলাতন্ত্রকে এ ধারণা ত্যাগ করতে বলেন যে , ভারতবাসী স্বায়ত্তশাসনের যোগ্য নয় । লর্ড রিপনের প্রস্তাবে বলা হয়ঃ ১) প্রতিটি জেলায় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে ; ২) জেলা সংস্থাগুলোর নাম হবে লোকাল বোর্ড ; ৩) লোকাল বোর্ডের সীমানা যত ছোট হয় ততই ভালো হবে; ৪) লোকাল বোর্ড গুলোতে কর্মচারীদের আসন সংখ্যা বেশী হবে না । বোর্ডগুলোর সভাপতি হবেন বেসরকারি ব্যক্তি ; ৫) বেসরকারি সদস্যগণ জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হবেন ; ৬) বোর্ডগুলোকে সরকার পরামর্শ বা নির্দেশ দিতে পারবেন ; ৭) বোর্ডগুলোর কাজকর্মে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না । তবে জনগণের উপর কর আরোপ ও আদায়ের ক্ষেত্রে বোর্ডগুলোর এর উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে । ; ৮) যদি কোন লোকাল বোর্ডের তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে সে ক্ষেত্রে প্রদেশ সরকার বোর্ডের বে-আইনি কাজকর্ম রদ করতে পারবেন । তবে ভোট বাতিল করতে হলে ভারত সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হবে ; ৯) বোর্ডগুলোকে তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হবে ; ১০) বোর্ডগুলোর উপর শিক্ষা-স্বাস্থ্য , রাস্তাঘাট , আলো প্রভৃতি যাবতীয় জনহিতকর কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকবে । ১১) গ্রাম এলাকার জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ইউনিয়ন কমিটি গঠন করতে হবে । 

লর্ড রিপনের আমলে পৌরসভা সংগঠন এর ক্ষেত্রেও বিরাট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় । তার পূর্বে কলকাতা, মুম্বাই ,মাদ্রাজ ও বড় বড় শহরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । তবে পৌরসভার সদস্যগণ সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন । ১৮৮৪ সালে রিপন এর উদ্যোগে বঙ্গীয় পৌরসভা আইন প্রণীত হয় । এ আইনে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের পদ নির্বাচন ভিত্তিক করেন । মূলতঃ এ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পৌরসভার ভিত্তি সুদৃঢ় হয় । 

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় লর্ড রিপনের প্রস্তাবের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না । তবে রিপনের প্রস্তাবের গুরুত্ব যাই হোক না কেন , এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে , ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ এবং প্রদেশিক সরকারকেও তার প্রস্তাবিত নীতিকে কার্যকর করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি । ১৯১৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় নি , এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিল লর্ড কার্জনের মত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিবর্গ । তাছাড়া ব্রিটিশ আমলারাও স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন । ফলে লর্ড রিপনের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয় নি । 

বিচার সংস্কার : 

#) লর্ড রিপন এর বিচার সংস্কার আলোচনা করো । 

লর্ড রিপনের উদারনৈতিক বিভিন্ন সংস্থারগুলোর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয় হলো “ইলবার্ট বিল “ নামে এক আইনের পরিকল্পনা । এই বিলের উদ্দেশ্য ছিল বিচার ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে যে সকল বৈষম্য ছিল তা দূর করা । ১৮৭৩ সালের ফৌজদারি আইনবিধি ( Code of Criminal Procedure ) অনুযায়ী প্রেসিডেন্সি শহরের তারা অন্য কোথাও কোন ভারতীয় বিচারক ব্রিটিশ অথবা ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না। একমাত্র জন্মগতভাবে ইউরোপীয়গন এ বিচারকার্য পরিচালনা করার অধিকারী ছিলেন । বলা বাহুল্য , এ প্রথা ছিল  ভয়ানক বৈষম্যমূলক এবং জাতি বিরোধী । লর্ড রিপন এর শাসনামলে অনেক অভিজ্ঞ ভারতীয় কভেন্যান্টেড সার্ভিস এর ফলে বিচার বিভাগের উচ্চপদে উন্নত হয়েছিলেন । কিন্তু ফৌজদারি আইন বিধি অনুসারে কোন ভারতীয় বিচারকের ইউরোপীয় প্রজাদের বিচার করার ক্ষমতা ছিল না । এই বৈষম্যমূলক আইন এর প্রতিকার চেয়ে কলকাতা  প্রেসিডেহ্নীর একজন ম্যাজিস্ট্রেট বিহারীলাল গুপ্ত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । তাছাড়া সরকারি মহলেও এ বৈষম্যমূলক আইনের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছিল । লর্ড রিপন বিচার বিভাগের এই জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণের জন্য তার আইন সচিব স্যার কোটনী  ইলবার্টকে একটি বিল প্রণয়নের দায়িত্ব দেন । স্যার ইলবার্টের নামানুসারে এই বিলটি “ ইলবার্ট বিল” নামে পরিচিত । ১৮৮৩ সালে ইলবার্ট বিলটি পাশ হয় । এই বিলে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয় । 

ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে ভারতে ইউরোপীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় । এ বিলের বিরুদ্ধে তারা কলকাতা টাউন হলে এক জঙ্গি সমাবেশ করে এবং সমাবেশে তারা তীব্র ভাষা লর্ড রিপন এর বিরুদ্ধে কটুক্তি করে । কলকাতায় ব্যারিস্টার ব্রানসন, মিলার এক প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারের কাছে রিপনের প্রত্যাহারের দাবি জানায় । এমন কি কিছু উগ্র ইংরেজ রিপনকে বন্দি করে জাহাজে উঠিয়ে দেশে ফেরৎ পাঠানোর ষড়যন্ত্র করে । ইলবার্ট আইনের বিরুদ্ধে ইংরেজরা প্রতিরক্ষা সভা ( Defense Association ) নামে এক সংস্থা গঠন করেন । দেশের সর্বত্র এর শাখায় স্থাপিত হয় । 

ইউরোপীয়দের ও আন্দোলনের পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বে ভারত সভার নেতৃবন্দ শহরে শহরে ঘুরে শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে ইলবার্ট বিল নাকচ করার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন । কলকাতা হাইকোর্টের উকিল কবি হেমন্তচন্দ্র শ্বেতাঙ্গ আন্দোলনের প্রকৃত রূপ বর্ণনা করে  “নেভার নেভার”- নামে এক ব্যঙ্গ কবিতা লেখেন , 

                                   “ গেল রাজ্য;  গেল মান!

                                   হাকিল ইংলিশ ম্যান ।।

                            ডাক ছাড়ে ব্রানসন, কেসুরিক, মিলার 

                                 নেটিভের কাছে খাড়া 

                                     নেভার-নেভার ।” 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতবাসীর সকল প্রতিবাদ বিফল হয় । ইংল্যান্ডের সরকার ও ইংরেজ জনমতের চাপে লর্ড রিপন বিলটি সংশোধন করতে বাধ্য হন । সংশোধনীতে বলা হয় , ইউরোপীয় ও ভারতীয় জেলা ও দায়রা জজের অধিকারগত কোন পার্থক্য থাকবে না । তবে কোনো শ্বেতাঙ্গ অপরাধী আদালতে হাজির হলে ইউরোপীয় জুরির মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকগণ বিচার কার্য সম্পন্ন করবেন । ইলবার্ট বিল বিরোধী আন্দোলনে ইংরেজদের সাফল্য ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায় অপমানিত বোধ করেন । ক্রমেই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে তাদের মোহ কাটতে থাকে এবং ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের অধিকার রক্ষার্থে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন । ভারতের রাজনৈতিক অগ্রগতির পথে ইলবার্ট বিল সংক্রান্ত আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । 

মূল্যায়নঃ 

ইলবার্ট বিল সম্পর্কে বিতর্ক লর্ড রিপনের মনোবল ভেঙ্গে দেয় । কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন । বিদায় কালে তিনি ভারতীয় জনগণের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা লাভ করেন । কলকাতা থেকে মুম্বাই পর্যন্ত রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে ভারতপ্রেমী রিপনকে বিদায় জানান । রিপনের প্রতি ভারতবাসীর এই ভালোবাসা সম্পর্কে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন , “ ভারতবাসীর সম্পর্কে তার খাঁটি আন্তরিকতা , ন্যায় পরায়ণ নীতি এবং জাতি বৈষম্যের প্রতি ঘৃণা রিপনকে ভারতবাসী ভালোবাসার পাত্রে পরিণত করেছে” । রিপরের সমালোচকরা অবশ্যই রিপনের নীতিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন । অনেক পাশ্চাত্য  ঐতিহাসিক ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিনষ্ট করার জন্য রিপনের নীতিকে দায়ী করেছেন । প্রকৃতপক্ষে রিপন ভারতে এমন কিছু যুগান্তকারী সংস্কার প্রবর্তন করেন নি । রিপনের জীবনীকার W.W.Blunt এ প্রসঙ্গে বলেন , “ ভারতীয়দের কয়েকটি রাস্তা নির্মাণ ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের অধিকার দান এবং স্থানীয় ব্রিটিশ কমিশনারের সম্মতিক্রমে করতে দেওয়া এ ধরণের কয়েকটি তুচ্ছ সংস্কার ছাড়া রিপন আর কোন উপকার করেন নি । কিন্তু রিপনকে যথার্থভাবে বিচার করতে হলে তিনি তার কাজে কতটা সফল হয়েছিলেন তা অপেক্ষা তিনি সত্যিকার অর্থে ভারতবাসীর জন্য কি করতে চেয়েছিলেন তা বিচার করা দরকার । ব্রিটিশ বড়লাটদের মধ্যে রিপন এই প্রথম উপলব্ধি করেন যে , ক্রমবর্ধমান  মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীকে উপেক্ষা করে ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে মজবুত করা যাবে না । ভারতবাসীর হাতেই ভারত শাসনের দায়িত্ব ক্রমে ক্রমে  দিতে হবে । তার জন্য তিনি সোপান রচনার চেষ্টা করেন । কিন্তু ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র এবং ভারতে অবস্থিত ইংরেজদের বিরোধিতার কারণে তাঁর অধিকাংশ সংস্কারগুলো কার্যকর হয় নি। তিনি প্রথম পিতৃতান্ত্রিক শাসনকে অংশীদারিত্বমূলক শাসনের পরিবর্তনের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । তিনিই প্রথম ভারত শাসনের অধিকারকে একটি  ‘পবিত্র দায়িত্ব ’ রূপে দেখেছিলেন । লিটনের মতো তিনি ভারতবাসীকে সাম্রাজ্যের পদানত ক্রীতদাস ভাবেন নি । রিপন ঘুণাক্ষরেও ভারতের স্বাধীনতার কথা কল্পনা করেন নি । মহীশূর রাজ্য সর্ম্পকিত ব্যবস্থা ইংরেজি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ সম্পর্কে তার চেতনা যে অধিক ছিল , তার পরিচয় মেলে । যাহোক , রিপনকে তার বিফলতার দ্বারা  বিচার করা উচিত নয় । রিপনের কয়েক বছর পর ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হয়ে আসেন লর্ড কার্জন । সাম্রাজ্যবাদী কার্জনের সঙ্গে রিপন এর তুলনায় রিপন যে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন , তা বলা যায় । 

লর্ড ডাফরিন ( ১৮৮৪-৮৮)

লর্ড রিপরের পর লর্ড ডাফরিন ১৮৮৪ সালে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । তার শাসনামলে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন (১৮৮৫) যার ভিত্তি লর্ড রিপন কর্তৃক রচিত হয়েছিল তা পাশ হয় । এই আইন দ্বারা বাংলা-বিহার-উরিষ্যা এবং যুক্ত প্রদেশের প্রজাগণের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় । তার শাসনামলেই ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয় । তার শাসনামলে তিনি ভারতে নানাবিধ সংকটের মোকাবেলা করেন । দুর্ভিক্ষ মহামারী এবং মহারাষ্ট্রের নেতা বালগঙ্গাধর তিলোকের বিদ্রোহ তার শাসনামলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা । 

লর্ড ল্যান্সডন(১৮৮৮-৯৪)

১৮৮৮ সালে লর্ড ল্যান্সডন ভারতের লর্ড ডাফরিনের স্থলাভিষিক্ত হন । তার শাসনকালে রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক সংস্কার সাধিত হয় । লর্ড ল্যান্সডন রিপনের ১৮৮১ সালের ফ্যাক্টরি আইন সংশোধন করে নতুন ফ্যাক্টরি আইন প্রণয়ন করেন । নতুন এই আইনে শিল্প-কারখানায় মেয়েদের দিনে ১১ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম চালু করা হয় । ৯ বছরের কম বয়সের শিশুদের ৯ বছর থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের দিনে মোট  ৭ ঘন্টা কাজ করার নিয়ম চালু করা হয় । ‘ শ্রমিকদের জন্য সাপ্তাহিক ছুটির প্রচলন করা হয় । 

লর্ড ল্যান্সডন শাসনামলে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিখ্যাত ইন্ডিয়া কাউন্সিল আইন পাস হয় । এই আইনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভায় বে সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় । আইন সভায় বিশ্ববিদ্যালয় , জেলা বোর্ড,  পৌরসভা , বণিক পরিষদ সদস্য প্রেরণের অধিকার দেওয়া হয় । আইনে বে সদস্যদের আইনসভায় প্রশ্ন উত্থাপন ও বাজেট নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া হয় । 

লর্ড  এলগিন ( ১৮৯৪-৯৯ ) 

লর্ড ল্যান্সডনের পর লর্ড এলগিণ ১৮৯৪ সালে ভারতের ভাইসরয় হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন । লর্ড এগলিন ভারতের দ্বিতীয় ভাইসরয়  প্রথম এলগিনের পুত্র ছিলেন । তার শাসন আমল ভারতের ইতিহাসে এক কঠিন সময় ছিল । দায়িত্বভার গ্রহণ করে তাকে নানাবিধ সমস্যার মোকাবেলা করতে হয় । দেশে আর্থিক সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে । এজন্য এলগিনকে তাঁর পূর্বসূরীদের মুক্ত বাণিজ্য নীতির পরিত্যাগ করতে হয় । তিনি নতুন করে আমদানিকৃত সকল দ্রব্যসামগ্রীর উপর শতকরা ৩/০.৫ হারে শুল্ক ধার্য করেন । তিনি ভারতে তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর উপরে ও শুল্ক ধার্য করেন । এর ফলে বিদেশি দ্রব্য সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্প ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ১৮৯৬ সালে তার শাসনামলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মারাক্তক দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ প্লেগ শুরু হয় । এতে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে । 

লর্ড এলগিনের শাসন আমলে ভারতে সামরিক বাহিনীর সংস্কার সাধিত হয় । পূর্বে বাংলা , মুম্বাই ও মাদ্রাজ  এই তিন প্রেসিডেন্সিতে ৩জন সেনাধ্যক্ষের নেতৃত্বের সেনাবাহিনী পরিচালিত হতো । নতুন ব্যবস্থায় সমগ্র সেনাবাহিনী একজন প্রধান সেনাপতির অধীনে ন্যস্ত করা হয় । প্রধান সেনাপতির অধীনে বাংলা, মুম্বাই,  মাদ্রাজ ও পাঞ্জাবে চারজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়োগ করা হয় । তার শাসনামলে ১৮৯৭ সালে ভারতে মহারানী ভিক্টোরিয়ার হীরক জয়ন্তী উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ যাপিত হয় । 

লর্ড কার্জন ( ১৮৯৯-১৯০৫)

#) লর্ড কার্জনের শাসনামলে আলোচনা করো । 

লর্ড এলগিনের পর ১৮৯৯ সালে লর্ড কার্জন ৪০ বছর বয়সে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । ভারতের রাজপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে তিনি ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী । ভারতের ভাইসরয় হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি হাউজ অব কমন্সয়ের সদস্য ছিলেন । তিনি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে এবং প্রাচ্য  সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন । ভারতে তিনি কয়েকবার পরিভ্রমণ করে ভারতের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হন । লেখক হিসেবেও কার্জন সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন । শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি এশিয়া বিষয়ক ৩ টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন । তার বিদ্যাবুদ্ধি , কূটনৈতিক জ্ঞান এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা,  অপরাপর গভর্নর জেনারেল এবং রাজপ্রতিনিধি অপেক্ষা যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার ছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । P.E Roberts . তার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বলেন , “ For Good ar ill no Governor-General since Dalhousie so deeplu impressed his personal mark upon the whole framework of Indian administration.” ( ভালো বা মন্দ যাই হোক লর্ড ডালহেীসীর পর কোনো গভর্নর-জেনারেল তাঁর ন্যায় ভারতীয় শাসন ব্যবস্থায় এতদূর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন নি ) । বঙ্গভঙ্গ ( Partition of Bengal ) তার শাসনকালে অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা G 

অভ্যান্তরীণ শাসন ব্যবস্থা : 

লর্ড কার্জন এর শাসনকাল ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নানা সংস্কারের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক P.E Roberts . বলেন , “ Internally Lord Curzon’s period of office was made specially notable for drastic overhauling of the whole machinery of administration “ কার্জন পরবর্তী শাসনামলের বিদ্যমান দোষ ত্রুটি এবং অনিয়ম পর্যালোচনা করে তার দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করেন । 

কৃষি সংস্কার : 

#) লর্ড কার্জনের কৃষি সংস্কার আলোচনা করো । 

ভারতীয় জনগণের কৃষকরাই ছিল দেশের মেরুদন্ড । এজন্য কার্জন কৃষকদের অবস্থার উন্নতির জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা অবলম্বন করেন । তিনি সর্বপ্রথম “সমবায় ঋণদান সমিতি” স্থাপন করে অল্প সুদে কৃষকদের ঋণ দানের ব্যবস্থা করেন । ১৯০০ সালে তিনি মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করার মহান উদ্দেশ্যে “পাঞ্জাব ভূমি হস্তান্তর আইন ” বিধিবদ্ধ করেন । এর ফলে কৃষকদের ভূমি ক্রয় বা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে মহাজনদের সংযত করা হয় । এছাড়া তিনি কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে তার পরিচালনার দায়িত্ব ইন্সপেক্টর জেনারেল এর উপর ন্যস্ত করেন । তিনি কৃষির উন্নতির জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগের উদ্যোগ নেন । এ প্রসঙ্গে লর্ড কার্জন বলেন , “ Our real reform has been to endeavour for the first time to apply science on a large scale to the study and practice of Indian Agriculture,” । কৃষির উন্নয়নের জন্য তিনি বাংলা কৃষি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন । কৃষিক্ষেত্রে গবেষণার উদ্দেশ্যে ভারত সরকার বার্ষিক প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার পাউন্ড মঞ্জুর করেন । লর্ড কার্জন জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ১৯০১ সালে একটি কমিশন গঠন করেন । কমিশন জলসেচের জন্য ২০ বছরে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের সুপারিশ করে । কার্জন কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ করেন।  এর ফলে পাঞ্জাব খালের উন্নয়ন ঘটে । ঝিলাম এবং দোয়ার খালের নির্মাণ কাজও শুরু হয় । 

অর্থনৈতিক সংস্কার :

শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য উন্নতির জন্য লর্ড কার্জন একটি সরকারি শিল্প ও বানিজ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর পরিচালনার দায়িত্ব ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাহি কাউন্সিলের উপর ন্যস্ত করেন । তিনি দরিদ্র জনসাধারণের সুবিধার জন্য লবণ কর এবং মধ্যবিত্ত লোকদের উপকারের জন্য আয় হ্রাস  করেন । তিনি রৌপ্য মুদ্রা ও বিলেতি স্বর্ণমুদ্রা গিনির বিনিময় হার নির্দিষ্ট করে দেন । 

শিক্ষা সংস্কার : 

শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাসে লর্ড কার্জনের অবদান ভারতের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে । তিনি ঘুনে ধরা ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । ১৯০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি এই উদ্দেশ্যে সিমলায় এক  শিক্ষা সম্মেলন আহ্বান করেন । প্রত্যেক প্রদেশের শিক্ষকর্তা এবং কয়েকজন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ এই সম্মেলনে যোগদান করেন । ১৯০২ সালে কার্জন উচ্চ শিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে স্যার টমাস  র‌্যালের নেতৃত্বে Indian University Commission গঠন করেন । সিমলা কমিশন ও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন এর আলাপ আলোচনার উপর ভিত্তি করে শিক্ষানীতি ঘোষিত হয় এবং ১৯০৪ সালে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিধিবদ্ধ হয় । 

১৯০৪ সালের ঘোঘিত শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয় । পৌরসভা ও জেলা বোর্ড যাতে তাদের বরাদ্দকৃত অর্থ উচ্চ শিক্ষায় ব্যয় না করে কেবলমাত্র প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় করে তার সুপারিশ করা হয় । মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নতির জন্যও কিছু প্রস্তাব করা হয় । বিদ্যালয়গুলোর আর্থিক নিরাপত্তা , পরিচালনার সভাগুলির যথাযথ সংগঠন এবং শিক্ষা ও শিক্ষকের মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় । 

১৯০৪ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিছক পরীক্ষা গ্রহণের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে পঠন পাঠন ও গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয় । এই উদ্দেশ্যে অধ্যাপক নিয়োগ , পাঠাগার স্থাপন , বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারের নির্মাণ ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় । বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিনেটের সদস্য সংখ্যা কমিয়ে নিম্নতম ৫০ ও উর্ধ্বতম ১০০ করা হয় । সিনেটের সদস্যরা ৫ বছরের জন্য ক্ষমতাসীন থাকতেন । উপাচার্য, শিক্ষা অধিকর্তা ও সিনেট কর্তিক নির্বাচিত ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্ষমতা ন্যাস্ত করা হয় । কলেজ গুলোর উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব স্থাপন করা হয় এবং কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শনের আওতায় আনা হয় । সিনেটে গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হতে হতো । সরকার ইচ্ছা করলেই সিনেটের সিদ্ধান্ত রদবদল বা সংশোধন করতে পারত । পূর্বে সরকারের এ ধরনের কোনো ক্ষমতা ছিল না । 

ভারতের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে লর্ড কার্জনের এসব সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ । বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠন পাঠন ও গবেষণাটা পীঠস্থান করে কার্জন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন । শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য তাঁর গৃহীত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য ।  উচ্চ শিক্ষার উন্নতি কল্পে সরকার বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকা অনুদান দিতে রাজি হয় । একথা ঠিক , শিক্ষা জগতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিক্ষিত ভারতবাসী সমালোচনা করেছেন । নিয়ন্ত্রণ এর ফলে উচ্চ শিক্ষার বিস্তার যথেষ্ট সংকুচিত হয়েছিল । এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা বিপন্ন হয় । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আগুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় আইন এর তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতা করেছিলেন । তবু এই আইনের সাহায্য নিয়েই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং স্নাতকোত্তর বিভাগের সম্প্রসারণ ঘটান । এ আইনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছিল । কার্জনের শাসনামলেই কৃষিবিদ্যা , চিকিৎসাবিদ্যা , কারিগরিবিদ্যা ও নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ও নানাবিধ সংস্কার ঘটে । তার সময়ে ভারতে সর্বপ্রথম প্রজাতান্ত্রিক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় । কলকাতায় বিখ্যাত “ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি “ প্রতিষ্ঠা তার শাসনামলের অপর একটি বিখ্যাত ও স্মরণীয় কীর্তি । 

রেলওয়ে সংস্কার : 

লর্ড কার্জনের শাসনামলে ভারতের রেলপথের যথেষ্ট সম্প্রসারণ ঘটে । এ সময় রেল ব্যবস্থাপনাও  সংস্কার সাধিত হয় । কার্জনের পূর্বে ভারতের দু’’ধরনের রেল ব্যবস্থাপনা বিদ্যমান ছিল । কিছু রেলপথের সরকার কর্তৃক এবং কিছু রেলপথ কোম্পানী কর্তৃক পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হত । এতে রেল পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অসুবিধা হতো । কার্জন এই সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯০১ সালে মিঃ টমাস রবার্টসনের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন । মিঃ রবার্টসনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯০৫ সালে ৩ জন সদস্য নিয়ে একটি রেলওয়ে বোর্ড গঠিত হয় ।এই বোর্ডের উপর রেলওয়ে পরিচালনা ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব অর্পিত হয় । কার্জনের শাসনামলে প্রায় ২৯ হাজার মাইল নতুন রেলপথ নির্মিত হয় এবং প্রায় ৩ হাজার মাইল রেলপথ নির্মাণাধীন থাকে । 

পুলিশ সংস্কার : 

১৮৬১ সালের পুলিশ সংস্কার আইন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি । ফলে পুলিশ বাহিনীর উপর জনগণের অসন্তোষ ছিল । লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে দেশে পুলিশ প্রশাসনের কার্যক্রমের তদন্ত করবার জন্য: ফ্রেজার কমিশন” গঠন করেন । কমিশন পুলিশ বিভাগের কার্যক্রম এর বিভিন্ন দিক সঠিকভাবে তদন্ত করে তার রিপোর্ট প্রকাশ করে । কমিশন কঠোর ভাষায় পুলিশ বিভাগের কার্যক্রমের সমালোচনা করে । কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় , “ The Police force is far from satisfactory; it is defective in training, and organisation’ it is inadequately supervised; it is generally regarded as corrupt and oppressive and it has utterly failed to secure the confidence and cordial co-operation of the people.”  নিম্মে কমিশন সরকারের কাছে পুলিশ সংস্কার সংক্রান্ত যে সুপারিশ পেশ করে তা উল্লেখ করা হলোঃ ১) পুলিশ বাহিনীতে নিম্ন থেকে উচ্চ পদে পদোন্নতি পরিবর্তে সহকারী নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ ; ২) সাধারণ সিপাহীদের সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে জীবন নির্বাহের জন্য উপযুক্ত বেতন নির্ধারণ ; ৩) তাদের মাসিক বেতন কোন অবস্থাতেই ৮ টাকার কম হবে না । ৪) সিপাহীদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে ; ৫) প্রদেশিক পুলিশ বাহিনীতে সিপাহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি; ৬) পুলিশ কর্মকর্তা ও সাধারন সিপাহিদের প্রশিক্ষণের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠিত ; ৭) উপযুক্ত প্রমান ছাড়া কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা বে-আইনি ঘোষণা করা হয় ; ৮) কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রতি প্রদেশে গোয়েন্দা বিভাগ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয় । লর্ড কার্জন কমিশনের সুপারিশ সমূহ গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে বেতন কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি পরিলক্ষিত হয় নি । 

সামরিক সংস্কার : 

লর্ড কার্জন সামরিক বিভাগেও সংস্কার সাধন করেন । ১৯০১ সালে তিনি ইম্পেরিয়াল ক্যাডেট কোর গঠন করেন এবং দেশীয় নৃপতি ও অভিজাত শ্রেনীর সন্তানদের সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন । তিনি জরুরী প্রয়োজনে দেশীয় নৃপতিদের নিজ নিজ রাজ্যে নিজস্ব ব্যয়ে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে বাধ্য করেন । তিনি সামরিক বাহিনীর পরিবহন ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন এবং সেনাবাহিনীকে নতুন গোলাবারুদ ও বন্দুক দিয়ে সুসজ্জিত করেন । তিনি ভারতীয় সেনাদের বিদেশে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এবং বিদ্রোহ দমনে নিয়োগ করেন । 

কার্জনের সামরিক নীতি নিয়ে তৎকালীন প্রধান সেনাপতি  লর্ড কিচেনারের তার মতবিরোধ শুরুহয় । ১৮৬১ সাল থেকে বড়লাটের নির্বাহী পরিষদের একজন সামরিক কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে ছিলেন । এই সামরিক সদস্যদের মাধ্যমে সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়োগ ও তদারকি করতেন । অপরদিকে বড়লাটের নির্বাহী পরিষদে সেনাবাহিনী প্রধানও অতিরিক্ত সদস্য ছিলেন । ফলে সামরিক বিভাগে দ্বৈত

কর্তৃত্ব সৃষ্টি হয় ।লর্ড কিচেনার সামরিক প্রশাসনের দ্বৈত কৃতিত্বের অবসান ঘটিয়ে সেনাধ্যক্ষকে সামরিক ক্ষেত্রে সরকারের একমাত্র উপদেষ্টা নিয়োগ এবং সমগ্র সেনাবাহিনীকে প্রধান সেনাপতির উপর ন্যস্ত করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করেন । লর্ড কার্জন কিচেনারের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন । কারণ তিনি আশঙ্কা করেন যে , কিচেনারের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে সামরিক বিভাগের উপর সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস পাবে । কার্জন কিচেনারের পস্তাবে সংবিধান বিরোধী বলেও মত প্রকাশ করেন । যাহোক , ভারত-সচিব কিচেনারের প্রস্তাব গ্রহণ করলে কার্জন ১৯০৫ সালে পদত্যাগ করেন । 

বঙ্গভঙ্গ ( ১৯০৫): 

#) বঙ্গভঙ্গ কি?  বঙ্গ ভঙ্গের কারণসমূহ আলোচনা করো । 

ভারতে ব্রিটিশ শাসকগনের ইতিহাসে বড়লাট লর্ড কার্জনের শাসনামলে ( ১৮৯৮-১৯০৫ খ্রিঃ) নানা দিক থেকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ । তার শাসনআমলের বিভিন্ন সংস্কারের মধ্যে ১৯০৫ সালের বাংলা বিভাগ ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা । এই ঘটনার ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয় ভারতের রাজনৈতিক জীবনে তা এক বিরাট ও সুদূরপ্রসারী আলোড়নের সৃষ্টি করে । বঙ্গভঙ্গ শুধু বাংলার রাজনৈতিক জীবনকেই  স্পর্শ করেনি , বাংলার সাহিত্য ,সংবাদপত্র ,সাময়িক পত্র পত্রিকা , শিক্ষা,বিজ্ঞান, সংগীত, শিল্প এককথায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনুভূত হয়েছিল । বঙ্গভঙ্গ বাঙালির জীবনে এক প্রাণ চাঞ্চল্য , এক নতুন জোয়ার এনেছিল । সুতরাং বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের বঙ্গভঙ্গের গুরুত্ব অনস্বীকার্য । 

বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ: 

#) বঙ্গ ভঙ্গের কারণসমূহ আলোচনা করো ।

নানাবিধ কারণে বঙ্গভঙ্গ করা হয় । নিম্মে বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ আলোচনা করা হলোঃ 

প্রশাসনিক কারণ : 

প্রশাসনিক কারণে বঙ্গভঙ্গ করা হয় । লর্ড কার্জনের সময় বাংলা-বিহার-উরিষ্যা মধ্যপ্রদেশ ও আসাম এর কিছু অংশ নিয়ে বাংলা প্রেসিডেন্সি গঠিত ছিল । এর আয়তন ছিল ১৭৯০০০ বর্গমাইল এবং লোক সংখ্যা ছিল  ৭৯,০০০,০০০ । এই বিশাল প্রদেশের শাসন ভার ন্যস্ত ছিল একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোটলাটের উপর ।  প্রায় ৮ কোটি অধ্যুষিত এই বিশাল প্রদেশকে একটা কেন্দ্র হতে  অর্থাৎ কলকাতা থেকে উত্তমরুপে শাসন করা ছিল রীতিমতো কষ্টসাধ্য । তাই প্রশাসনিক কারণেই গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন বাংলা প্রদেশকে ভাগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । কিন্তু লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করলেও এই পরিকল্পনার তার মাথা থেকে প্রথমে বের হয় নি । ১৮৫১ সালে স্যার চার্লস গ্রান্ট ( ‍Sir Charles Grant ) এবং ১৮৫৪ সালে বড়লাট লর্ড ডালহেীসী বাংলা প্রদেশে ভাগ করার সুপারিশ করেছিলেন । ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় তার জন্য প্রদেশের বিশালতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় । এর পরিপ্রেক্ষিতে  তদানীন্তন ভারত সচিব লর্ড নর্থকোর্ট এই বিশাল প্রদেশের আয়তন সংকুচিত করার জন্য এক প্রস্তাব দিয়েছিলেন । এ সময় বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম গ্রে শুধু বাংলাকে নিয়ে একটা স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করেন । কিন্তু এ বিষয়ে কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি । প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৮৭৪ সালে আসামকে বাংলা প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একজন কমিশনার এর অধীনে স্বতন্ত্র এক প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করা হয় । ১৮৯৬ সালে ঠিক হয় চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাকে  আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় । কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাব বাতিল করা হয় । ১৯০১ সালে মধ্য প্রদেশের চিফ কমিশনার স্যার এ্যান্ড্র ফ্রেফার উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন । কিছুদিনের মধ্যেই লর্ড কার্জন লেফটেন্যান্ট গভরর্ণের পদে নিযুক্ত করেন । বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে তিনি ছিলেন কার্জনের প্রধান সমর্থক ও উপদেষ্টা । বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসনভার গ্রহণ এর অল্পকাল পরেই ফ্রেজার বাংলা বিভাগের এক পরিকল্পনা কার্জনের কাছে পেশ করেন । কার্জন এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । 

সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ : 

নতুন প্রদেশ গঠনের পেছনে লর্ড কার্জনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে যথেষ্ট ছিল । সেসময় কলকাতা ছিল ইংরেজ শাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র । বঙ্গের সমস্ত শিল্প , ব্যবসা-বাণিজ্য , অফিস-আদালত,  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল । ফলে পূর্ববাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয় নি । পূর্ববঙ্গ শুধু কাঁচামাল সরবরাহ করতো । কলকাতা ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার ফলে পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ: খারাপ হতে থাকে । মুসলমান যুবকদের বেকারত্ব বাড়তে থাকে । এ সময় পূর্ব বাংলার অনুন্নয়ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই চুরি-ডাকাতি ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় । মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না । এমত অবস্থায় লর্ড কার্জন আশা করেছিলেন যে , পূর্ববাংলা ও আসাম নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠিত হলে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের শিক্ষা ,স্বাস্থ্য ,কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির পথ সুগম হবে । 

শুধুমাত্র আসাম ও পূর্ববাংলার অধিবাসীদের আর্থসামাজিক উন্নতির জন্যই নয়, বঙ্গভঙ্গের পেছনে সরকারেরও কিছু অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল । ১৮৭০ সাল থেকে পূর্ব বাংলার প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পাট ও চালের  বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলছিল । তাছাড়া আসাম ও সিলেটের চা রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সহজতর ছিল । কলকাতা বন্দরের নাব্যতা  নিয়ে সরকারের যথেষ্ট সংশয় ছিল । এই পরিপেক্ষিতে , ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দরকে সামনে রেখে পূর্ব বাংলার ভূ প্রকৃতি,  প্রবাহমান নদী ও উর্বর মাটি প্রসূত অঢেল কাঁচামালের সাহায্যে পূর্ববাংলায় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা সক্রিয়ভাবে  চিন্তাভাবনা করেছিলেন । বঙ্গভঙ্গের পর পরেই ১৯০৮ সালে তাই পূর্ব বাংলা ও আসামের  শিল্পায়ন নিয়ে প্রথমবারের মতো রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । 

অনেকেই মনে করেন,  বঙ্গভঙ্গের পেছনে সরকারের পূর্ব বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা বাতিলের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ছিল । ১৭৯৩ সালে যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয় তা গোড়ায় কোম্পানির কাছে লাভজনক হলেও দীর্ঘ মেয়াদে হিতে বিপরীত হয় । কারণেই বন্দোবস্তের ফলে নব্য জমিদারেরা বন-জঙ্গল ও চরাঞ্চল আবাদ করে প্রচুর মুনাফা পেলেও কোম্পানি ও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার এই অংশের কিছুই পায় নি । সুতরাং ব্রিটিশ সরকার তার অর্থনৈতিক অবস্থাকে মজবুত করার লক্ষ্যে পূর্ব বাংলা থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত উঠিয়ে দিয়ে উপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহকে নিস্কন্টক-করতে চেয়েছিলেন । 

রাজনৈতিক কারণ: 

শাসনকার্যে সুবিধার জন্য লর্ড কার্জন বাংলা বিভাগের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তার এই অজুহাতে যুক্তিযুক্ত ছিল না। যদি বিশাল প্রদেশ হিসেবে শাসন পরিচালনা অসুবিধা হতো তাহলেও বাঙালি অধ্যুষিত বিহার ও উড়িষ্যকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করলে চলত । আসলে বঙ্গভঙ্গের পেছনে কার্জনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক । তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলেন কলকাতা ছিল ভারতীয় গণজাগরণের ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র । এসময় চরমপন্থী নেতাদের প্রভাবে বাংলার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে । ভারতীয়দের মধ্যে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে মোটেই নিরাপদ নয় । এটি কার্জন ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন । তাই বাংলাকে বিভক্ত করে বাঙালির তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উপর চরম আঘাত হানতে তিনি তৎপর হন। অনেকে মনে করেন , বাংলা বিভাগ ছিল লর্ড কার্জনের সুপরিকল্পিত বিভক্তিকরণ নীতির বহিঃপ্রকাশ । পূর্ববাংলার মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিকে তারা যেমন ব্রিটিশদের অনুগত শ্রেণীতে পরিণত হবে অন্যদিকে ভারতের জাতীয় আন্দোলন দুর্বল হবে । সুতরাং দেখা যায় যে , বঙ্গভঙ্গের মূলে কার্জনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক শাসনতান্ত্রিক সুবিধা ছিল একটি অছিলামাত্র । লর্ড কার্জনের পরবর্তী  ভাইসরয় লর্ড মিন্টোও স্বীকার করেছিলেন যে , রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়েছিল । ১৯০৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ভারত-সচিব লর্ড মর্লিকে এক চিঠিতে সুস্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন – “ From a political point of view alone, putting aside the administrative difficulties of the old province , I believe partition to have been very necessary.” 

বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা : 

প্রকৃতপক্ষে , ১৯০৩ সালে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা গৃহীত হয় । ১৯০৪ সালে ভারত-সচিব ব্রডারিক এটি অনুমোদন করেন । বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ১৯০৫ সালের ১০ জুলাই প্রকাশিত হয়  । এতে বলা হয় যে , আসাম , ঢাকা-চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগগুলো নিয়ে দার্জিলিং বাদ দিয়ে, কিন্তু জলপাইগুড়ি পার্বত্য ত্রিপুরা এবং মালদহ একত্রিত করে ‘ পূর্ববাংলা ও আসাম ‘ নামে এক নতুন প্রদেশ গঠিত হবে । নতুন প্রদেশের শাসনভার একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোট লাটের উপর ন্যস্ত থাকবে । ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী এবং চট্টগ্রাম বিকল্প রাজধানী নির্ধারিত হয় । তবে নতুন প্রদেশের বিচারবিভাগ কলকাতা হাইকোর্টের অধীনে রাখা হয় । নতুন প্রদেশের আয়তন ১ লক্ষ ৬ হাজার বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা হয় ৩ কোটি ১০ লক্ষ । অধিবাসীদের মধ্যে ১ কোটি পশ্চিমবঙ্গ , বিহার ও উড়িষ্যা একত্র করে বাংলাদেশ নামে অপর একটি প্রদেশ গঠিত হয় । ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের দিন সরকারিভাবে কার্যকরী হয় । 

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া: 

#) বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করো । 

পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে বাংলা বিভাগ ছিল আশীর্বাদস্বরূপ বাংলার অধিকাংশ মুসলমান নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাংলা বিভাগের স্বাগত জানায় । মুসলিম পত্রপত্রিকাগুলোও নতুন প্রদেশ গঠনে আনন্দ প্রকাশ করে । কারণ বাংলা বিভাগের ফলে ঢাকা পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশিক কেন্দ্রে পরিণত হয় । বঙ্গভঙ্গের অব্যাহতির পর এই নতুন রাজধানী ঢাকাতে সচিবালয় ,হাই কোর্ট, আইন-পরিষদ ভবন , নতুন নতুন সুরম্য অট্টালিকা এবং রাস্তাঘাট নির্মিত হতে থাকে । ঢাকা আবার তার পুরানো গেীরব ফিরে পায় । চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে । পূর্বে মুসলমান ছেলেমেয়েরা ডিগ্রী পাশ করেও উপযুক্ত চাকরি পেতো না । কিন্তু নতুন প্রদেশের তারা নতুন নতুন চাকরির সুযোগ লাভ করে । বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার কৃষকরা উপকৃত হয়েছিল । কারণ বঙ্গভঙ্গের পর পাটের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায় । এর ফলে কৃষকদের হাতে বাড়তি পয়সা আসে । ফলে কৃষক শ্রেণী খুশি হয় । সুতরাং দেখা যায় যে , বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নতুন এ দেশে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা , প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দেয় । 

কিন্তু বঙ্গবিভাগ বাংলার হিন্দুদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় । হিন্দু জমিদার , সাংবাদিক , বণিক সমিতি , রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেন । কারণ বঙ্গভঙ্গ তাদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল । যেসব জমিদারের বাংলায় জমিজমা ছিল প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গ তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় । কারণ দুই বাংলায় জমিদারি পরিচালনার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি ছিল অনিবার্য । কলকাতার আইনজীবী সম্প্রদায় এ আশঙ্কা করেন যে , বঙ্গভঙ্গের ফলে তারা পূর্ববঙ্গের মক্কেলদের হারাবেন এবং এর ফলে তারা আর্থিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন । কারন তারা আইন সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে । বণিক শ্রেণি আশঙ্কা করেন যে , নতুন প্রদেশ গঠিত হলে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে মন্দাভাব দেখা দেবে । এসব কারণে অনেক ঐতিহাসিক বলতে চেয়েছেন যে , বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পেছনে কোন মহৎ আদর্শ বা প্রেরণা ছিল না । সমাজের উপর তলার মানুষের স্বার্থে আঘাত লেগেছিল বলেই এ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল । তবে উভয় বঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায় নিজেদের স্বার্থেই হোক বা জাতীয় ঐক্যের’ মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই হোক তাদের মধ্যে যে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী গভীর ঐক্যবোধ জেগে উঠেছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । জাতীয় ঐক্যবোধের কারণে হিন্দু নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে “ বাঙালি বিরোধী “, জাতীয়তাবাদী বিরোধী  , এবং ‘ বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ ‘ হিসাবে আখ্যায়িত করে । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ বঙ্গভঙ্গকে জাতীয় দুর্যোগ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংকটময় মুহুর্ত বলে বর্ণনা করেছেন । সন্ধ্যা পত্রিকা বলা হয় যে , রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থাৎ বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার জন্যই এ আন্দোলনের পরিণতি লাভ করে । সর্বত্র বিলাতি দ্রব্য বয়কট শুরু হয় এবং বিলাতি দ্রব্য প্রকাশ্যে আগুন লাগানো হয় । ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করে । স্বদেশী আন্দোলনের পাশাপাশি চরমপন্থী নেতাদের প্রচারণায় সমগ্রদেশের সন্ত্রাসবাদি কাজও শুরু হয় । ঢাকা ও কলকাতায় নানা গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে । এদের মধ্যে যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতি ছিল বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ । বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য হত্যাকান্ড সংঘটিত হতে থাকে । বিপ্লবীরা বাংলার গভর্নর ফ্রেজার এবং পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের গভর্নর ফুলারকে হত্যা করার ব্যর্থ প্রয়াস চালায় । এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয় । সমগ্র দেশে তিনি শহীদ বলে চিহ্নিত হন । 

বঙ্গভঙ্গ রদ , ১৯১১: 

দেশে স্বদেশী এবং সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের ব্রিটিশ সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন । কিন্তু ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ বণিক শ্রেণী  ভারতে তাদের বাজার রক্ষার্থে ব্রিটিশ সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে । কংগ্রেস নেতারা ও ব্রিটিশ সরকারের কাছে বঙ্গভঙ্গ বাতিলের জোর দাবি জানায় । শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে নতি স্বীকার করতে হয় । ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বড়লাট হার্ডিঞ্জের শাসনামলে দিল্লির রাজদরবারে সম্রাট রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষিত হয় । দুই বাংলা আবার এক হয় । 

বঙ্গভঙ্গ রদের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া : 

#) বঙ্গভঙ্গ রদের ফলাফল ও প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করো । 

বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার হওয়ার স্বাভাবিকভাবে হিন্দুরা খুশি হয়েছিল । কংগ্রেস নেতারা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল । তারা এজন্য ব্রিটিশ শাসকদের বিচারবোধ ও শুভ বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন । তারা মনে করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ রদ ছিল তাদের নীতির জয়ের প্রতীক । বঙ্গভঙ্গ রদের পর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয় । এজন্য কংগ্রেসের নেতৃবিন্দু দুঃখিত হন নি , কারণ অতীতে দিল্লিই ছিল  ভারতের রাজধানী । তবে রাজধানী পরিবর্তনের ফল বাংলার জন্য শুভ হয়নি । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক  Leonard Garden বলেন , “ The shift of the capital did mark a turning point in the history of bengali role in Indian history,” বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলায় ছিল ব্রিটিশ শাসকগণের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু রাজধানী পরিবর্তনের ফলে বাংলা তার মর্যাদা হারায় । 

কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় । এ ঘোষণা তাদের জন্য ছিল বিরাট আঘাত স্বরূপ । বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম সম্প্রদায় যথেষ্ট উপকৃত হয়েছিল । এর ফলে তারা আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল । বঙ্গভঙ্গ তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রে প্রস্তুত করেছিল । মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা প্রসারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল । এক কথায় , বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার মুসলমানদের জীবনধারায় যে উন্নতির সূচনা হয়েছিল তা বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে আবার রুদ্ধ হয় । এতে মুসলমানরা নিরাশ হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে । নবাব ভিকার উল মুলক , মাওলানা মোহাম্মদ আলী  প্রভৃতি মুসলিম নেতা বঙ্গভঙ্গ রদকে ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার এক জঘন্য উদাহরণ হিসেবে মন্তব্য করেছেন । ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে এক জনসভায় গভীর দুঃখ হতাশা প্রকাশ করে এক প্রস্তাব গ্রহণ করেন । সরকারের প্রতি অনুগত থাকা সত্ত্বেও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের এই অবিচার তিনি মেনে নিতে পারেন নি । বঙ্গভঙ্গের ব্যর্থতাও অবাঙালি মুসলমানরাও সহজ মনে গ্রহণ করতে পারে নি । বলা যায় , বঙ্গভঙ্গ রদ সমস্ত মুসলমানকেই হতাশ করেছিল । 

কোন গ্যাস বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় । এর ফলে কংগ্রেসের প্রতি মুসলমানদের আস্থা নষ্ট হয় । ক্রমেই ভারতীয় মুসলমানদের মনেই এই বিশ্বাস জন্মে যে , কংগ্রেসের হাতে মুসলমানদের স্বার্থ নিরাপদ নয় । এই বিশ্বাস থেকেই মুসলমানদের মনে স্বতন্ত্র সাম্প্রদায়িক চিন্তার উন্মেষ ঘটে । অতএব বলা যায় , বঙ্গভঙ্গ ঘটনার মধ্য দিয়েই ভারতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত হয় । 

এ অবস্থায় পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করার জন্য বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ঢাকা আগমন করেন । এ সময় নবাব সলিমুল্লাহর পূর্ববঙ্গের জনগণের উন্নত শিক্ষার জন্য বড়লাটের কাছে ঢাকা একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করেন । বড়লাট তাঁর দাবি মেনে নেন এবং এ লক্ষ্যে পরিকল্পনার জন্য একটি সংস্থা গঠন করেন । 

বঙ্গভঙ্গের পর হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটে । তাদের মধ্যে পারস্পারিক তিক্ততা ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় । শ্রী নীরদচন্দ্র চেীধুরী “ The Autobiography of an unknown Indian” গ্রনথি এই তিক্ততা ও অবিশ্বাসের বিবরণ দিয়েছেন । তিনি লক্ষ করেন যে , বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহারের ফলে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক চিরকালের জন্য এক ফাটল ধরে । ১৯০৬ সাল থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হয় । ১৯০৬ সাল থেকে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ আগ্রহ ও উদ্যোগে গঠিত হয় মুসলিম লীগ । ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় কংগ্রেসের অনেক মুসলিম সদস্য কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) লর্ড ক্যানিং এর সামরিক সংস্কার আলোচনা করো । 

#) লর্ড ক্যানিং এর ভূমি নীতি কি ছিল ? 

#) লর্ড লিটনের শিক্ষা নীতি আলোচনা করো । 

#) লর্ড রিপনের শিক্ষা নীতি আলোচনা করো । 

#)  ‘ ইলবাট বিল’ সম্পর্কে কি জানো । 

#) ভারতে স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে লর্ড রিপন এর ভূমিকা কি ছিল ? 

#) লর্ড কার্জনের শিক্ষা সংস্কার আলোচনা করো । 

#) পুলিশ বিভাগের সংস্কারে লর্ড কার্জন কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন ? 

#) বঙ্গভঙ্গের ( ১৯০৫ ) প্রশাসনিক কারণ কি ছিল ? 

#) বঙ্গভঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করো । 

#) বঙ্গভঙ্গের ফলাফল আলোচনা করো । 

#) বঙ্গভঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া আলোচনা করো । 

#) বঙ্গভঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কি ছিল ।

#) বঙ্গভঙ্গ রদ হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া আলোচনা করো । 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

১) লর্ড ক্যানিং এর সংস্কার সমূহ আলোচনা করো । 

২) লর্ড লিটনের শাসনকাল আলোচনা করো । 

৩) লর্ড রিপনের সংস্কার সমূহ আলোচনা করো । 

৪) বঙ্গভঙ্গের ( ১৯০৫ ) কারণ ব্যাখ্যা করো । ইহা কেন রদ করা হয়েছিল ? 

৫) বঙ্গভঙ্গের ( ১৯০৫ ) পটভূমি লেখ । এই ঘটনা সম্পর্কে হিন্দু-মুসলিম প্রতিক্রিয়া কি ছিল ? 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 ÷ = 4