স্বদেশী আন্দোলন

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে স্বদেশী আন্দোলন ছিল এক উল্লেখযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে এ আন্দোলনকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম সুদীপ্ত ঘোষণা বলে বর্ণনা করা যায় । লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের ফলে এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে । এই আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেন , “ It was in 1905 that the Indian revolution began.” মহাত্মা গান্ধী মন্তব্য করেছেন যে , “বঙ্গভঙ্গের পরেই ভারতে সত্তিকারের নবজাগরণ ঘটেছিল । 

ভারতবর্ষের লর্ড কার্জনের শাসনামল নানাবিধি হতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । তার শাসনামলের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ । প্রশাসনিক কারণে তিনি বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও এর পেছনে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রধান দুর্গ বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দুর্বল করা । ১৯০৫ সালের ১০ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষিত হলে বাংলায় এর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে ওঠে । এ ঘোষণা বাঙালি হিন্দুদের মনের তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন । কলকাতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় । সুরেন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘ বেঙ্গলি ‘ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গকে  “ এক গুরুতর জাতীয় বিপর্যয় “ বলে মন্তব্য করা হয় । ‘ সন্ধ্যা ‘ পত্রিকা সুস্পষ্টভাবে লেখা হয় যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই, অর্থাৎ বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার জন্যই এই চক্রান্ত করা হয়েছে । “হিতবাদী” পত্রিকায় লেখা হয় যে, গত ১৫০ বছরের মধ্যে বাঙালি জাতি এই রকম দুর্দিনের সম্মুখীন হন নি । এমনকি ইংরেজদের পরিচালিত The Englishman, The Statesman, The Times of India, Pioneer প্রভৃতি পত্রিকাতে বাংলা ব্যবচ্ছেদের প্রতিবাদ এবং নিন্দা করা হয় । অবশ্যই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ইংরেজি পত্রিকাগুলো আন্দোলনের বিরোধিতা শুরু করে । 

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন প্রথম পর্বে মৌখিক প্রতিবাদও ও নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয় । এ সময় বাংলার রাজনীতিতে নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ আশা করেছিলেন যে , ব্রিটিশের ন্যায়বোধ ও  ব্রিটিশ সরকারের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনাকে রোধ করতে পারবে । এ উদ্দেশ্যে  তারা অসংখ্য সভা-সমিতির আয়োজন করে । বিভিন্ন সভা সমিতির থেকে সরকারের কাছে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয় । কিন্তু সর্বপ্রকার ও মৌখিক প্রতিবাদে এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সত্বেও ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গবিভাগ কার্যকরী করা হয় । 

সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হলে আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয় । এ সময় আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন কংগ্রেস দলের চরমপন্থী গ্রুপ । এ আন্দোলনের মূল দুটি কর্মসূচি ছিল বয়কট ও স্বদেশী । প্রকৃতপক্ষে বয়কট ও স্বদেশী এ দুটি কর্মপন্থা ছিল একটি অন্যটির পরিপূরক । এটি ছিল একই ভাবধারায় দুটি প্রকাশ । একদিকে ‘ বয়কট ‘ ছিল নেতিবাচক ও অন্যদিকে ‘ স্বদেশী ‘ ছিল ইতিবাচক । বয়কট ও স্বদেশী এই দুই কর্মপন্থা অবলম্বন করে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাই সামগ্রিকভাবে “ স্বদেশী আন্দোলন “ নামে অভিহিত । 

১৯০৩ সালের ১৩ জুলাই সুকুমার মিত্র তার সাপ্তাহিক “ সঞ্জীবনী “ পত্রিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসকগণের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ দ্রব্য  বয়কটের ডাক দেন । ১৯০৫ সালের ১৭ জুলাই খুলনা জেলার বাগেরহাটে এক বিরাট জনসভার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে “ বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হয় । প্রস্তাবে বলা হয় যে , যতদিন পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ রদ না হবে ততদিন ব্রিটিশ পণ্য সামগ্রী বর্জন করা হবে । ১৯০৫ সালের ৭ আগষ্ট কলকাতায় টাউন হলে এক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বদেশী আন্দোলনের কথা ঘোষিত হয় ।ঐ সভায়  পাস হয় বিখ্যাত বয়কট প্রস্তাব । বয়কট আন্দোলন কেবলমাত্র বিলাতি পণ্য সামগ্রী বর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে নি ; মিউনিসিপ্যালিটি, জেলাবোর্প , গ্রাম পঞ্চায়েতে হতে ভারতীয়দের পদত্যাগ প্রভৃতি বয়কট আন্দোলনের অঙ্গীভূত হয় । এমনকি বিদেশি প্রশাসন আইন ও শিক্ষা বর্জনের প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে । 

অচিরেই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে । দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রসমাজ সভা সমিতির মাধ্যমে এই আন্দোলন জনপ্রিয় করে তোলে । ছাত্রসমাজ দোকানে বাজারে প্রভৃতি স্থানে পিকেটিং শুরু করে এবং ক্রেতাগণকে বিলাতি দ্রব্য ক্রয় না করার জন্য অনুরোধ করে । ছাত্ররা বিলাতিন কোন বিশেষত্ব : বস্ত্র, লবণ-চিনি , সিগারেট ক্রয় করে পোড়াতে থাকে । ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজিদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজ বয়কট করে । শ্রমিকরাও কলকারখানায় ধর্মঘট আরম্ভ করে কাজ বয়কট করে । বিদেশী পণ্য বর্জনের পাশাপাশি স্বদেশী আন্দোলনের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান এক নতুন জোয়ার আনে । স্বদেশী তাঁত,বস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ,কাগজ , চামড়াজাত দ্রব্য উৎপাদনের নিমিত্তে বাংলার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য শিল্প-কলকারখানায় স্থাপিত হয় । এক্ষেত্রে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত  ‘ বেঙ্গল কেমিক্যাল ‘ নামক আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন ছিল এক উল্লেখযোগ্য স্বদেশী প্রয়াস । স্বদেশী যুগেই লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে আর এক যুগান্তকারী প্রয়াস হল ১৯১০ সালে বিহারের জামশেদপুরে বিখ্যাত টাটা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা । বাংলার বিভিন্ন স্থানে স্বদেশী অনেক দোকান গড়ে ওঠে । দেশলাই ও সিগারেটের  ক্ষেত্রেও দেশীয় কারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে । এভাবে স্বদেশী আন্দোলন একদিকে যেমন ব্রিটিশ স্বার্থে আঘাত হানে , অন্যদিকে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পথ উম্মক্ত হয় । 

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা বাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে । এদিন সারা বাংলায় শোক দিবস পালন করা হয় । সমগ্র দেশে হরতাল ও ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয় ।রবীন্দ্রনাথ সেদিন রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন । দুই বাংলার লোকেরা ঐক্যের প্রতীক হিসাবে হিন্দু-মুসলিম খ্রিস্টান নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি বাঁধেন । বিকারে আহুত হয় বিশাল জনসভা । দুটি পৃথক জনসভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় , আনন্দমোহন বসু জ্বালাময়ী ভাষায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বক্তব্য রাখেন । এসব জনসভায় ৫০ থেকে ৭৫ হাজার লোকের সমাবেশ ঘটে । জাতীয়তাবাদীদের উদ্যোগে এত বড় জনসভা সম্ভবত এর আগে কখনো হয় নি । 

স্বদেশী আন্দোলনের কেবলমাত্র বাংলাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি । অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন একটি সর্বভারতীয় রূপ গ্রহণ করে । কংগ্রেস নেতা বালগঙ্গাধরতিলক বোম্বাই প্রদেশে তাঁর “কেশরী” পত্রিকার মাধ্যমে বয়কট , স্বদেশী ও স্বরাজের বাণী চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেন । অজিৎ সিংহ ও লালা লাজপত রায় স্বদেশের বার্তা নিয়ে যান পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন অংশে । দিল্লিতে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সৈয়দ হায়দার রাজা এবং মাদ্রাজে এই আন্দোলনে জড়িয়ে দেন চিদাম্বরণ পিল্লাই । এভাবে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রসারিত হয় । 

স্বদেশী বয়কট আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল বাংলার ছাত্র সমাজ । বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ছাত্র-যুব সমাজের বিপুল সংখ্যায় যোগদান এই আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে পরিণত করে । ইতিপূর্বে বাংলার ছাত্র সমাজ কোন দিন জাতীয় আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েনি । ব্রিটিশ সরকার ছাত্র আন্দোলনের শংকিত হয়ে এই আন্দোলন দমন করার জন্য ১৯০৫ সালের অক্টোবর মাসে কার্লাইল সার্কুলার নামে এক গোপন আদেশ জারি করেন । কার্লাইল ছিলেন শিক্ষা সচিব । এক গোপন আদেশে স্কুল ও কলেজ ‍কৃর্তপক্ষকে ছাত্রদের স্বদেশী আন্দোলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় । আদেশ পালনে ব্যর্থ হলেই স্কুল-কলেজের অনুদান এবং অনুমোদন বন্ধ করে দেওয়া হবে বলা হয় । এই আদেশের বিরুদ্ধে সর্বত্র দারুন বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় । সরকারের ছাত্র নির্যাতন নীতির বিরোধিতার জন্য গঠিত হয় সার্কুলার বিরোধী সমিতি । এই সমিতি মফঃস্বলে বিতাড়িত ছাত্রদের জন্য স্বদেশী স্কুল স্থাপন করে । ১৯০৫ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ( National Education Council ) গঠিত হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় নিয়ন্ত্রণে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম ধাপে ১৯০৬ সালে জাতীয় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় । জাতীয় শিক্ষায় মাতৃভাষা প্রাধান্য পায় । 

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে । একদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ স্বদেশী আন্দোলনকে ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয় অপরদিকে কংগ্রেসের মডারেট নেতৃবৃন্দর সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের প্রসারে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন । এই দুই পরস্পর বিরোধী মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৫ সালে বারাণসীতে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসে । এই অধিবেশনের সভাপতি মডারেট গোপাল কৃষ্ণ গোখলে কঠোর ভাষায় নীতির সমালোচনা করেন । এই অধিবেশনে বয়কট ও স্বদেশী আন্দোলনকে সমর্থন করা হয় । ১৯০৬ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের  পরবর্তী অধিবেশন বসে । এই অধিবেশনে কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী সদস্যদের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের প্রশ্নে তীব্রতর হয়। নরমপন্থী সদস্যগণ বয়কট এর সমর্থনে প্রস্তাব গ্রহণ করতে অসমর্থ হন । অপরপক্ষে , চরমপন্থীরা বয়কট আন্দোলনকে ন্যায় সঙ্গত বলে ঘোষণা করে । ১৯০৭ সালে সুরাটে অনুষ্ঠিত হয় কংগ্রেসের পরবর্তী অধিবেশন । এই অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নরমপন্থী ও চরমপন্থী গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে । এ অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতি হিসেবে মডারেট  রাসবিহারী ঘোষের নাম সমর্থন করতে উঠলে প্রচন্ড গন্ডগোল হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় । কংগ্রেস অধিবেশন একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয় । এই ঘটনার পর চরমপন্থীরা কংগ্রেস  সংগঠন ত্যাগ করে । ফলে কংগ্রেসে নরমপন্থী নেতৃত্ব অক্ষুন্ন থাকে । এভাবে সুরাটের তেইশতম কংগ্রেস অধিবেশনে কংগ্রেস বিভক্ত হয় । দমন নীতির ফলে স্বদেশী আন্দোলন ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ে । শীর্ষস্থানীয় অনেক কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় । স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ্যে গণ-আন্দোলনে ভাটা পড়ে এবং গুপ্ত সন্ত্রাসবাদি আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে । 

স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ সমূহ : 

#) স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ সমূহ আলোচনা করো । 

যে আগ্রহ, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও চাঞ্চল্যের সঙ্গে বয়কট ও স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ১৯০৮ সালের মধ্যে একেবারেই স্তিমিত হয়ে পড়ে । এর পিছনে অনেকগুলো কারণ ছিল : 

১) এ আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ নিপীড়ন ও দমননীতি । সরকার এই আন্দোলনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা বুঝতে পেরে প্রচন্ড দমননীতির আশ্রয় নেয় । জনসভা , শোভাযাত্রা ও সংবাদপত্রের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় । স্কুল কলেজের ছাত্রদের শায়েস্তা করতে কার্লাইল সার্কুলার জারি করা হয় । চাকুররি  দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় । এভাবে নানাভাবে দমন নীতির ফলে আন্দোলন ক্রমেই স্তিমিত হয়ে পড়ে । 

২) কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ভাঙ্গন এই আন্দোলনকে বিশেষভাবে দুর্বল করেছিল । ১৯০৭ সালে কুখ্যাত সুরাট অধিবেশনের কংগ্রেসের ভাঙ্গনের পর অসংখ্য নেতাকে গ্রেফতার করা হয় । অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাকে দ্বীপান্তরে পাঠানো হয় । চরমপন্থী কংগ্রেস সদস্য বালগঙ্গাধর তিলককে ছয়  বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় । অজিৎ সিং ও লাজপত রায়কেও দ্বীপান্তরের পাঠানো হয় । দমন নীতির কারণেই বাংলার রিপনচন্দ্র পাল ও অরবিন্দু ঘোষ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন । প্রায় এক আঘাতে সমগ্র আন্দোলনকে নেতৃত্বহীন করে দেওয়া হয় । 

৩) স্বদেশী আন্দোলন পরিচালনার জন্য কোনো শক্তিশালী সংগঠন ছিল না । এই আন্দোলন কর্মসূচির দিক থেকে পরোক্ষ প্রতিরোধ , অহিংসা  , বয়কট , প্রতিরোধ ,  অসহযোগিতা,  গ্রাম পূর্ণগঠন , সামাজিক সংস্কার,  গঠনমূলক বিভিন্ন কাজ প্রভৃতি গান্ধীবাদী কৌশলের প্রায় সবটাই কাজে লাগিয়েছিল । কিন্তু সুসংগঠিত পথে সেগুলো পরিচালিত হয় নি । যোগ্য নেতার অভাব না থাকলেও নেতাদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব ছিল । সবচেয়ে বড় কথা সে সময় ভারতের একমাত্র শক্তিশালী রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস এই আন্দোলনকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করে নি । 

৪) এ আন্দোলন ব্যর্থতার অপর কারণ ছিল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি । আন্দোলনের প্রথম দিকে কিছু সংখ্যক মুসলমান সামিল হলেও অধিকাংশ মুসলমান স্বদেশী আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন । ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে বাংলার মুসলমানরা স্বাগত জানায় । কারণ বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানরা তাদের সার্বিক উন্নতি ও ঢাকার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পায় । মুসলমানদের সমর্থন না থাকায় গণভিত্তিক আন্দোলনের পরিধি সীমিত হয়ে যায় । 

৫) স্বদেশী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এই আন্দোলনের তৃণমূলে পৌঁছাতে পারেনি । সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর কোনো যোগ ছিল না । শ্রমিকরা ধর্মঘট করে এই আন্দোলনের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হয়েছিল সত্য কিন্তু বাংলা জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকরা এই আন্দোলনে সামিল হন নি । মূলতঃ এই আন্দোলন ছিল সমাজের উচ্চবর্ণের শিক্ষিত মানুষের আন্দোলন । 

সুতরাং দেখা যায় , দমননীতি,  সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে স্বদেশী আন্দোলনকে আশানুরূপ সাফল্য লাভ করতে পারেনি । সকল শ্রেণীর মানুষকে এ আন্দোলনে শামিল হয়নি । তাছাড়া বাংলার বাইরে মহারাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোথাও এ আন্দোলন আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা হয়নি । এসব কারণে স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হয় । 

গুরুত্ব : 

#) স্বদেশী আন্দোলনের গুরুত্ব কী ছিল ? 

স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ভারতীয় জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে এ আন্দোলনের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না : 

১) ভারতীয় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে এ আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম । এ আন্দোলনের ফলে ভারতীয় জনগণের কাছে ধারণা বদ্ধমূল হয় যে , ইংরেজ ও ভারতবর্ষের স্বার্থ কখনই এক নয় । ইংরেজ সরকার দ্বারা ভারতবর্ষের প্রকৃত মঙ্গল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই বরং ভারতবাসীর নিজের উন্নতির চেষ্টা করতে হবে । 

২) দমনীতির কারণে স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হলেও বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেয় । ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষশত: বাংলা , পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদি তৎপরতা শুরু হয় । বাংলায় বহু গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে । এই সমিতি গুলোর মধ্যে অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর গুষ্টির নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।  

৩) স্বদেশী আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ ব্যবসা-বাণিজ্যের যথেষ্ট ক্ষতি হয় । ভারতে ব্রিটিশ পণ্যদ্রব্য বিশেষ করে সুতাবস্ত্র, তামাক ও সিগারেট  আমদানির পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছিল । তবে এ আন্দোলনের ফলে ভারতীয় শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি ঘটে । ভারতীয় সুতি বস্ত্রের চাহিদা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় । তাঁত শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটে । বিদেশি পণ্যসামগ্রীর উপরে চাহিদা ক্রমশ কমতে থাকে এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটে । 

৪) স্বদেশী আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং দুই বাংলা আবার একত্রিত হয় । বঙ্গভঙ্গ রদের পর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয় । 

৫) স্বদেশী আন্দোলন কেবলমাত্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নয় , সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এক নতুন উদ্দীপনাও প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল । বস্তুত: এর আগে ও পরে অন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেনি । ১৯০৫ সালকে বাংলার সুবর্ণযুগের প্রভাত  বলা হয় । এ যুগে বাংলায় অসংখ্য সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্র প্রকাশিত হয়েছিল যা এর আগে কোনও দিন প্রকাশিত হয় নি । বাংলার সাহিত্যিক ইতিহাসের এই  যুগ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য উজ্জল । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য স্বদেশী গানগুলি এ যুগে রচিত হয় । রবীন্দ্রনাথ ছাড়া রজনীকান্ত সেন , অতুল প্রসাদ সেন,  কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ , সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত , সৈয়দ আবু মহম্মদ , ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রভৃতি কবি-সাহিত্যিকরা সৃষ্টিশীল কাব্য ও সাহিত্য রচনা করে দেশপ্রেমের অমর কীর্তি দেখে গেছেন । এ সময় মুকুন্দ দাসের যাত্রাগান সমস্ত বাংলায় শিহরণ সঞ্চার করেছিল । তার জনপ্রিয়তা সরকারের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করে । এ সময় অসংখ্য কবি জেলায় জেলায় কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ করে এবং গান লিখে স্বদেশী আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছিল । 

৬) সাহিত্য,  কাব্য ও  সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে স্বদেশী যুগ বিজ্ঞান ও শিল্পের ক্ষেত্রে ও স্থায়ী কীর্তি রেখে গেছে । স্বদেশের আদর্শ বাঙালিকে বিজ্ঞান চর্চা উদ্বুদ্ধ করেছিল । এ সময় বাংলার বিজ্ঞান চর্চার জগৎজুড়ে ছিলেন দুই দিকপাল বিজ্ঞানী – জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায় । ‘ plant response ‘ ছিল জগদীশচন্দ্র বসুর শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার । প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের লেখা “ History of Hindu Chemistry” স্বদেশী চিন্তা ও গবেষণার ফলশ্রুতি । বিজ্ঞান সাধনায় এ দুজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানের অবদান বাঙালি জাতিকে গর্বিত করেছিল । এ সময় আরো কয়েকজন মেধাবী তরুণ বিজ্ঞানীর আর্বিভাব ঘটে ছিল । এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন  রশিকলাল দত্ত, নীলরতন ধর, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু , জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ । পরবর্তী যুগে এদের অনেকেই বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছিল । এ যুগের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীর ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তিনি ওকাকুরা , নিবেদিতা ও হ্যাবেলের প্রাচ্য আদর্শ ও চিন্তাধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতীয় চিত্রশিল্পী এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেন । মুঘল, রাজপুত ও অজান্তার গুহাচিত্রকে তিনি পুনরুজ্জীবিত করেন । তাঁর আঁকা ‘ ভারতমাতা’ ছবিটি বিশেষ খ্যাতি পায় । 

সুতরাং বলা যায় , বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্বেও স্বদেশী আন্দোলন রাষ্ট্রচিন্তা ,সংস্কৃতি ,সাহিত্য, বিজ্ঞান শিল্পকলা প্রভৃতি মানববিদ্যা সর্বক্ষেত্রে এক সৃজনশীল ভূমিকা গ্রহণ করেছিল । স্বদেশী আন্দোলন ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা করেছিল । স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভারতকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল । এই আন্দোলনে দেখিয়ে দিয়েছিল যে , “ What Bengal  thinks today , the rest of India think tomorrow” ( আজ বাংলা যা চিন্তা করে, ভারত আগামীকাল তা করবে ) । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) স্বদেশী আন্দোলন কি ? 

#) এই আন্দোলন ব্যর্থ হয় কেন ? 

#) স্বদেশী আন্দোলনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করো । 

#) এই আন্দোলনের গুরুত্ব কী ছিল ? 

#) স্বদেশী আন্দোলন হয়েছিল কেন ? 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

#) স্বদেশী আন্দোলনের উপর একটি রচনা লেখ ? 

#) স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করো । এই আন্দোলনের গুরুত্ব নিরূপণ করো । 

#) স্বদেশী আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা করো । এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল কেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 7 =