বাংলায় বিপ্লবী ও সন্ত্রাসবাদের তৎপরতা

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কে কেন্দ্র করে বাংলা তথা ভারতবর্ষের যে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয় তা নানা কারণে ব্যর্থ হয় । কংগ্রেসের মডারেট নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ব্যর্থতার ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার প্রসার ঘটায় । তাছাড়া স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের বৈপ্লবিক আন্দোলন , রাশিয়ার নিহিলিস্টদের কার্যকলাপ ও ইউরোপীয় অন্যান্য গোপন দলগুলির সন্ত্রাসবাদি পদ্ধতি বিষয়ে পড়াশোনা করার ফলে কিছু লোকের মনে ভারতবর্ষে অনুরূপ সংগঠন গড়ে তোলার জন্য আগ্রহের সঞ্চার হয় । সরকারের দমন নীতির ফলে উদারপন্থীরাও সংগ্রামী বয়কট আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য হয় এবং তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয় । এসব কারণেই ভারতের বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠে গুপ্ত সমিতি । ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসানের লক্ষে এসব গুপ্ত সমিতি কর্তৃক পরিচালিত সশস্ত্র বিপ্লবী তৎপরতাক সাধারণভাবে ‘ সন্ত্রাসবাদি ‘ আন্দোলন নামে পরিচিত । ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করাই ছিল এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। এই আন্দোলনে বাংলা , পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রে বিশেষ প্রসার লাভ করেছিল । 

ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন মহারাষ্ট্রে প্রথম শুরু হলেও বাংলাতেও  ব্যাপক প্রসার লাভ করে । ১৮৬০ সাল বাংলা থেকেই বাংলায় গুপ্ত সমিতি গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয় । তবে বিশ শতকের প্রারম্ভেই বাংলায় গুপ্ত সমিতি গঠনের প্রকৃত সূচনা হয় । বাংলার প্রথম বিপ্লবী সংগঠন করেন প্রমথনাথ মিত্র । তিনি পেশায় ছিলেন একজন ব্যারিস্টার  । ১৯০১ সালের পূর্বে তিনি চারবার বিপ্লবী সমিতি গঠন করার চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন । ১৯০২ সালে কলকাতায়  ১২ নং মদন মিত্র লেনে সতিশচন্দ্র বসু ‘ অনুশীলন সমিতি ‘ প্রতিষ্ঠা করেন । বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ গ্রন্থটি থেকে  অনুশীলন নামটি দেওয়া হয় । সতীশচন্দ্র বসু এবং অন্যদের অনুরোধে প্রমথনাথ মিত্র অনুশীলন সমিতির সভাপতি ও সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত হন । সমিতির সহ-সভাপতি পদে অভিষিক্ত হন চিত্তরঞ্জন দাস ও অরবিন্দু ঘোষ । বাংলায় এই অনুশীলন সমিতিকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় । স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ অনুযায়ী অনুশীলন সমিতির সদস্যদের ব্যায়াম চর্চা, মুষ্টিযুদ্ধ ও লাঠি চালানোর শিক্ষা দেওয়া হত ।  তাছাড়া বক্তব্য ও আলোচনার মাধ্যমে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বদেশ প্রেম ও বলিষ্ঠ নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে সচেতন করা হতো । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  গুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ খ্যাতনামা মনীষীগণ অনুশীলন সমিতির বিভিন্ন আলোচনা সভায় অংশ নিতেন । ইতিমধ্যে অরবিন্দ ঘোষ বরোদা হতে যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক তরুণ বিপ্লবীকে বাংলায় প্রেরণ করেন । এই যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পরে বাঘা যতীন নামে পরিচিতি লাভ করেন । যতীন্দ্রনাথ অনুশীলন সমিতির যুবক সদস্যদের ও অন্যদের নিয়ে কলকাতায় সার্কুলার রোডে একটি ক্লাব স্থাপন করেন । ক্রমশঃ কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন স্থানে অনুশীলন সমিতির বহুশাখা গড়ে ওঠে । কলকাতায় সমিতির প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয় । 

১৯০৫ সালের পূর্বে অনুশীলন ও অন্যান্য সমিতিগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়নি । কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত হলে বাংলায় বৈপ্লবিক আন্দোলন নতুন রূপ পরিগ্রহ হয় । কলকাতা ছাড়াও ঢাকায় অনুশীলন সমিতির দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয় । এখানে অনুশীলন সমিতির প্রধান নেতা ছিলেন পুলিন বাহিনী দাশ । এই সমিতির প্রায়৫০০ টি কার্যালয় ছিল। পুলিন দাসের নেতৃত্বে ঢাকায় অনুশীলন সমিতির যে শাখা গড়ে ওঠে তা নিয়মানুবর্তিতা ও সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে খুবই শক্তিশালী ছিল । বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অরবিন্দু  ঘোষের ভাই বারীন্দ্রনাথ ঘোষ বিশেষভাবে সক্রিয় হন । তার উদ্যোগে ১৯০৫ সালে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের লেখা ‘ ভবানী মন্দির ‘  নামে একটি বিপ্লববাদী গ্রন্থ প্রকাশিত হয় । ধর্মের ভিত্তির উপর বিপ্লবী আন্দোলনের কথা এই গ্রন্থে প্রচার করা হয় । এরপর তার প্রচেষ্টায় ১৯০৬ সালে ‘ যুগান্তর ‘ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং এই পত্রিকার মাধ্যমে বারীন ঘোষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করেন । যুগান্তর পত্রিকায় সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য খোলাখুলি আহ্বান জানানো হয় । এই পত্রিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটিশদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয় । এই পত্রিকার নামানুসারে বারীন ঘোষ এর নেতৃত্বে যুগান্তরগোষ্ঠী বা সমিতি গড়ে ওঠে । এই সমিতির নানাবিধ বৈপ্লবিক কর্মসূচি গ্রহণ করে । কিন্তু বৈপ্লবিক কর্মসূচির রূপান্তরের জন্য তাদের অর্থের প্রয়োজন ছিল । প্রথমদিকে বন্ধু-বান্ধব ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে বিপ্লবীরা চাঁদা আদায় করত । কিন্তু বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেলে বিত্তশালীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হতো । অর্থ সংগ্রহের এই পদ্ধতি ‘ রাজনৈতিক’  ডাকাতি নামে পরিচিত । 

১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের বিপ্লবীরা প্রথম নিখিল বঙ্গ সম্মেলন আহবান করে । এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন প্রথমনাথ মিত্র । এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবীদের মধ্যে ঐক্য জোরদার করা । তবে সম্মেলনে আন্দোলনের কর্মপন্থা নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । সম্মেলনে অনুশীলন সমিতির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বিশেষ করে প্রমথনাথ মিত্র , চিত্তরঞ্জন দাস নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ এর মাধ্যমে প্রকাশ্যভাবে আন্দোলন পরিচালনার উপর জোর দেন । অপরপক্ষে , যুগান্তর গোষ্ঠী ইংরেজ কর্মচারীদের হত্যা করে শাসনতন্ত্র বিকল করার পক্ষে জোর দেন । যুগান্তরগোষ্ঠী মত প্রকাশ করে যে , ব্যাপকহারে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালাতে পারলে দেশের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে । এই দলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ , বারীন্দ্রনাথ ঘোষ , চারুচন্দ্র দত্ত , ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, অভিনাশ ভট্টাচার্য , দেবব্রত বসু , সবোধচন্দ্র মল্লিক প্রমুখ । 

১৯০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা গুপ্তহত্যার প্রথম অভিব্যক্তি ঘটে । এসময় পূর্ববাংলা ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টা করা হয় । ফুলার ছিলেন খুবই অত্যাচারী এবং তারা আদেশে  স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত বহুলোক নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছিল । কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় । এদিকে বারিন্দ্ররাথ ঘোষ কলকাতার মুরারীপুকুর ( মানিকতলা ) বাগান বাড়িতে বোমা তৈরীর কারখানা স্থাপন করেন । প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র উল্লাসকর দত্তের উপর বোমা তৈরির দায়িত্ব অর্পিত হয় । গুপ্ত সমিতি ইংরেজ কর্মচারীদের হত্যা করে শাসনযন্ত্র বিকল  করার পন্থা গ্রহণ করেন । এরপর সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয় কলকাতা প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড । কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনার কথা ব্রিটিশ সরকার গোয়েন্দাদের মাধ্যমে পূর্বে জানতে পেরেছিলেন । এ কারণে ব্রিটিশ সরকার তার প্রাণ রক্ষার জন্য মজঃফরপুরে  বদলি করেন । কিন্তু তাতেও বিপ্লবীদের কর্মসূচির কোন পরিবর্তন হয়নি । কিংসফোর্ডকেকে হত্যা করার দায়িত্ব অর্পিত হয় বাংলার দুই তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর উপর । ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী বোমা ও পিস্তল নিয়ে মজঃফরপুরে যান । কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ করে তারা বোমা নিক্ষেপ করেন । কিন্তু সে গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না । গাড়ির ভেতরে ছিলেন নিরপরাধ মিসেস কেনেডি নামে এক ইংরেজ মহিলা এবং তার কন্যা । তারা দুজনেই প্রাণ হারায় । পালিয়ে যাবার সময় মোকামা রেলওয়ে ইস্টিশনে প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়লে তিনি নিজে রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন । ক্ষুদিরামও ধরা পড়েন । বিচারে ১৯০৮ সালে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয় । এ সময় বিপ্লবী যুবকেরা এতদূর দুঃসাহসীক হয়ে উঠেছিল যে , ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ এক রাষ্ট্রীয় শোভাযাত্রায় হাতির পিঠে চড়ে যাওয়ার সময় তার উপর বোমা নিক্ষেপ করেন । বোমার আঘাতে তিনি আহত হন । এরপর পুলিশ মানিকতলায় মুরারীপুকুর ঘেরাও করে অরবিন্দ সহ ৩৪ জন বিপ্লবীকে গ্রেফতার করে এবং বোমা তৈরীর বহু বিস্ফোরক পদার্থ , বোমা , কার্তুজ , গুলি ইত্যাদি উদ্ধার করে । অরবিন্দর গ্রেফতারের সংবাদে সমগ্র বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে এক দারুণ বিক্ষোভের সৃষ্টি করে । আলিপুর বিচারালয় অরবিন্দুর বিচার শুরু হয় । প্রখ্যাত ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশের আইনি দক্ষতায় শেষ পর্যন্ত অরবিন্দ মুক্তি লাভ করেন । কিন্তু বারীন ঘোষ , উল্লাসকর দত্ত ও আরো অনেকে আন্দামানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর করা হয় । মুক্তির পর অরবিন্দু রাজনীতি ছেড়ে দেন । ১৯৫০ সালে পন্ডিচেরিতে তার মৃত্যু হয় । 

আলিপুর বোমা হামলার পর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে । বৈপ্লবিক সমিতিগুলোর প্রতি সরকারি দমননীতির কঠোর আকার ধারণ করে এবং ১৯০৯ সালে কলকাতায় যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতি নিষিদ্ধ হয় । এরপর ঢাকায় পুলিন দাসের নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতি বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনার মুখ্য ভূমিকা নেয় । এই সমিতি গোপনে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং কয়েকজন প্রতিক্রিয়াশীল কর্মচারীকে হত্যা করে । ১৯১৪ সালে কলকাতায় বন্দুক বিক্রেতা রড়া কোম্পানির ৫০ টি মাউজার পিস্তল ও ৪৬ হাজার গুলি বিপ্লবীরা দখল করে । এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলায় বিপ্লবী কার্যকলাপ চলে । 

১৯১৯-৩০ সালের মধ্যে বাংলায় অসংখ্য সন্ত্রাসবাদি ঘটনা ঘটে । এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল মাস্টার দা সূর্যসেন কর্তিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন । ১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসে সূর্যসেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা করেন । সূর্যসেনের সহযোগী ছিলেন অম্বিকা চক্রবর্তী , গণেশ ঘোষ , লোকনাথ বল, অনন্ত সিংহ ও অন্যান্য বহু বিপ্লবী । সূর্যসেন ভারতীয় প্রজাতন্ত্র সেনার চট্টগ্রাম শাখার পক্ষে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । ঐদিন রাতে কয়েক জন সশস্ত্র বিপ্লবী চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারে প্রবেশ করে অস্ত্রশস্ত্র লুণ্ঠন করেন । চট্টগ্রামে সূর্যসেনের সভাপতিত্বে এক বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয় । এরপর বিপ্লবী পুলিশের আক্রমনে পিছু হটে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেয় । জালালাবাদ পাহাড়ে ২২ রিল বিপ্লবীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয় । সংঘর্ষে ১২ জন বিপ্লবীর মৃত্যু হয় । সূর্যসেন আত্মগোপন করেন । দীর্ঘদিন আত্মগোপন করার পর অবশেষে ১৯৩৩ সালের মে মাসে সূর্যসেন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন । ১৯৩৪ সালে তার ফাঁসি হয় । 

চট্টগ্রামের আদর্শেই বিপ্লবীরা উৎসাহিত হন । ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে বিপ্লবী বিনয়কৃষ্ণ বসু ঢাকায় পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে গুলি করে হত্যা করেন । এবং ঢাকায় পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট হডসনকে গুলি করেন । ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলার তিন বিপ্লবী বিনয় , বাদল , দীনেশ কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করেন এবং কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসন ও অপর এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী ক্রেগকে গুলি করে হত্যা করেন । এরপর পুলিশের সঙ্গে তাদের সংগ্রাম শুরু হয় । পুলিশের গুলিতে তিন  বিপ্লবী নিহত হন । শিক্ষিত মহিলারাও বিপ্লবী দলে যোগ দেন । ১৯৩২ সালে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন এবং দেশের জন্য নিজ জীবন উৎসর্গ করেন । একই বছরে বীনা দাশ বাংলার গভর্নরকে হত্যার চেষ্টা করেন । কিন্তু ব্যর্থ হন । তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় । এভাবে ত্রিশের দশক পর্যন্ত বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন চলে । 

ব্যর্থতার কারণসমূহ : 

#) বাংলায় সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণসমূহ আলোচনা কর ।

ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন অবসানের লক্ষ্যে যে সন্ত্রাসবাদে আন্দোলন ভারতের অভ্যন্তরে ও বাহিরে শুরু হয় তা ক্রমে ক্রমে নিস্প্রভ ও অবশেষে স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় । সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হল : – 

১) সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল সরকারের দমননীতি  । এই আন্দোলনে ইংরেজদের ভীষণভাবে আতঙ্কিত করেছিল । ফলে সরকার শুরু থেকে এ আন্দোলন দমন করার জন্য কঠোর দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করেন । বিভিন্ন দমনমূলক আইন প্রণয়ন করে সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করা হয় । সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয় । ১৯১৯ সালে মার্চ মাসে কুখ্যাত রাউলাট আইন পাশ করা হয় এবং এই আইনে বিনা বিচারে কোন ব্যক্তিকে আটক করে রাখার অধিকার সরকারকে দেওয়া হয় । বহু ব্যক্তিকে  ফাঁসি দেওয়া হয় এবং অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন । সরকারের এসব ব্যবস্থার ফলে সন্ত্রাসবাদি তৎপরতা ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ে । 

২) ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র,  পুলিশ ও সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত সংগঠিত শক্তিশালী এবং সরকারের প্রতি অনুগত । সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ ছিল অত্যন্ত তৎপর । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ সন্ত্রাসবাদীদের ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস জেনে ফেলে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয় । 

৩) কেবলমাত্র সরকারের দমননীতি ও পুলিশি তৎপরতার ফলেই সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের ব্যর্থ হয়নি । সন্ত্রাসবাদি দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ত্রুটি আন্দোলন ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল না । বিদেশী শক্তির সাহায্য নিয়ে সন্ত্রাসবাদি নেতারা ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালনার পরিকল্পনা করেছিলেন । পৃথিবীর সব দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে । ইতালির ঐক্য আন্দোলনকে ক্যাভুর অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সাহায্য কামনা করেছিলেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতীয় নেতাদের এ ধরনের সুযোগ এনে দিয়েছিল । কিন্তু এই সুযোগ গ্রহণ করতে হলে যে ধরনের শক্তিশালী সংগঠন সঠিক নেতৃত্ব এবং নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় তার বড় অভাব ছিল । জার্মানি ও তুরস্ক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের স্বাধীনতা সংগ্রামে যথেষ্ট সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল । কিন্তু সে সাহায্য শেষ পর্যন্ত কোন কাজে লাগে নি । স্বদেশী ও প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার বড় অভাব ছিল । দলীয় অনৈক্যের কারণে বিপ্লবীদের সংগঠনগুলি শক্তিশালী ছিল না । বৈপ্লবিক কার্যকলাপের সাফল্যের একটি প্রধান শর্ত হল সংগঠনের মধ্যে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা , ঐক্যবোধ ও গোপনীয়তা । কিন্তু বিপ্লবী সংগঠন গুলোর এসবের বড় অভাব ছিল । বিপ্লবীদের মধ্যে অনেক বিশ্বাসঘাতক ছিলেন যারা বিপ্লবীদের নানা পরিকল্পনা পুলিশের কাছে ফাঁস করে দিত । বিপ্লবীদের পরিকল্পনাতেও অনেক ভুল ছিল । প্রফুল্ল চাকী , ক্ষুদিরাম এবং আরো অনেক বিপ্লবী প্রকৃত ব্যক্তির বদলে ভুল লোককে হত্যা করে । এতে তাদের পরিকল্পনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় । তাছাড়া ভারতের বৈপ্লবিক সংগঠনগুলোর মধ্যে লক্ষ্য ও পথ নিয়ে ছিল তীব্র মতান্তর । অনুশীলন  সমিতি যেখানে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রকাশ্যভাবে আন্দোলন পরিচালনার পক্ষপাতী ছিল , সেখানে যুগান্তর গোষ্ঠী ইংরেজ কর্মচারীদের হত্যা করে শাসনতন্ত্র বিকল  করার পক্ষপাতী ছিল । প্রকৃতপক্ষে প্রধান এই দুই দলের মধ্যে বিরোধ সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়েছিল । 

৪) সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের সম্ভবতঃ সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এর শক্তিশালী কোন গনভিত্তি  ছিলো না । এ আন্দোলন সীমিত ছিল কেবলমাত্র ছাত্র সমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে । উচ্চবর্ণের লোকেরাও এ আন্দোলনের অংশ নেয় । বিপ্লবীদের শতকরা আয় ৯০ ভাগই ছিলেন উচ্চবংশ সম্ভ্রান্ত-ব্রাক্ষন, বৈদ্য ও কায়স্থ । তবে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না । ফলে বিপ্লবীদের শিকড় তেমন গভীরে ছিল না । জনগণের সম্পর্ক রহিতে যে কোন আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে । 

৫) সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের অপর একটি দুর্বলতা ছিল বিপ্লবী নেতাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি । ফরাসি বিপ্লব বা ইতালির ঐক্য আন্দোলন তাদের অনুপ্রাণিত করলেও তাদের মানসিক প্রেরণার উৎস ছিল  গীতা , বঙ্কিমচন্দ্র , বিবেকানন্দ , বালগঙ্গাধরতিলক ও অরবিন্দের চিন্তাধারা । সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের হিন্দু ধর্মের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট । বিপ্লবী নেতারা বিপ্লবীদের উৎসাহিত করার জন্য ধর্ম গ্রন্থ গীতা স্পর্শ  করে শপথ নেওয়ার নিয়ম চালু করেন । বালগঙ্গাধরতিলক ’ শিবাজী উৎসব ‘ পালন ও ‘ গণেশ ‘ পূজার নিয়ম প্রবর্তন করেন । তিনি গোরক্ষণী সভা প্রতিষ্ঠা করেন । ফলে ধর্মের প্রতি এই  ঝোঁক মুসলিম সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদে আন্দোলন থেকে দূরে রেখেছিল । 

৬) সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা । সন্ত্রাসবাদি কার্যকলাপ প্রধানত বাংলা,  মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । সন্ত্রাসবাদের প্রভাব সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে নি । এই পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের সাফল্য আশা করা যায় না । 

৭) সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের ব্যর্থতার অপর গুরুত্বপূর্ণ কারণ ১৯৩০ সালের পর গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা । ১৯২০ এর দশকের পর থেকেই গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত হয় । গান্ধীজীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কখনো অহিংস আন্দোলন সমর্থন করে নি । স্বাভাবিক কারণেই সন্ত্রাসবাদীদের মনবল ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ে । 

গুরুত্ব : 

সন্ত্রাসবাদে আন্দোলন সফল হয় নি। নানাবিধ কারণেই এই আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এ আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না ।

 প্রথমত , সন্ত্রাসবাদি কার্যকলাপ শাসকশ্রেণীকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব সম্পর্কে উদবিগ্ন করে তুলেছিল । তারা বুঝতে পেরেছিল ভারতের পরিসমাপ্তি অগ্নিগর্ভ । তাছাড়া সন্ত্রাসীদের গুপ্তহত্যা ব্রিটিশ কর্মচারীদের মনে ভয়ের  সঞ্চার করেছিল । 

দ্বিতীয়ত , বিপ্লবীরা তাদের নিষ্ঠা , ত্যাগ ও আদর্শবান সত্ত্বেও ভারতকে স্বাধীন করতে পারেনি সত্য , কিন্তু তারা আত্মোৎসর্গের যে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন , তা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছিল , তাদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিল । 

তৃতীয়ত, একথা ঠিক যে , সন্ত্রাসবাদে আন্দোলনের কোনো গণভিত্তি ছিল না । কিন্তু তারা পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বৈপ্লবিক আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই তার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন । অনেক সচেতন ভারতবাসী তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সমর্থন করে নি সত্য , কিন্তু তাদের অতুলনীয় সাহস প্রদর্শনের জন্য স্বদেশপ্রেমিক মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল । 

চতুর্থত , বিপ্লবীরা তাদের কাজের দ্বারা প্রমাণ করেছিলেন যে , ভারতবর্ষের দুর্বল নয় । ইংরেজরা সবসময় বাঙ্গালীদের  ভীরু ও দুর্বলচেতা  বলে উপহাস করত । কিন্তু সন্ত্রাসবাদে আন্দোলন তাদের এই ধারণা মিথ্যা বলে প্রমাণ করেছে । এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য । তার ভাষায়- “ They ( the terrorist ) giave us back the pride of our manhood , “ অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদীরা তাদের পুরুষত্বের গর্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন । অধ্যাপক সুমিত সরকার বিপ্লবীদের ব্যর্থতাকে ‘ বিরোচিত “ বলে মত প্রকাশ করেছেন । তার ভাষায় – “ Taken as whole , it is difficult to avoid the conclusion the revolutionary terrorism was heroic failure .” 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) বাংলায় বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন সম্পর্কে কি জানো ? 

#) এই আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ সমূহ লেখ । 

#) বাংলায় বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদি আন্দোলনের প্রকৃতি কি ছিল ? 

#) এই আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করো । 

#) “অনুশীলন সমিতি ” সম্পর্কে যা জানো লেখ । 

#) মাস্টারদা সূর্যসেন কর্তিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে কি জানো । 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

#) বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের উদ্ভব ও অগ্রগতি বর্ণনা করো । ইহা কেন ব্যর্থ হয়েছিল ? 

#) বাংলায় বৈপ্লবিক  সন্ত্রাসবাদীদের কার্যক্রম আলোচনা করো । স্বাধীকার আন্দোলনে বিপ্লবীদের অবদান কি ছিল । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 ÷ 6 =