বাংলায় মুসলিম জাগরণ

নবাব আব্দুল লতিফ ( ১৮২৮-১৮৯৩): 

উত্তর ভারতে মুসলমানদের জাগরণের ইতিহাসের সৈয়দ আহমেদের অবদান যেমন চির স্মরণীয় হয়ে আছে তেমনি বাংলায় মুসলমানদের জাগরণের ইতিহাসের নবাব আব্দুল লতিফের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে । ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর বাংলায় মুসলমানদের অবস্থা নানা দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তারা হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে পড়ে । অপরদিকে , বাংলার হিন্দু সমাজে ইংরেজ সরকারের সাথে সহযোগিতার নীতি ও ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে থাকে । মুসলমানদের এই সংকটের দিনে বাস্তবমুখী চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসেন বাংলার কৃতি সন্তান নবাব আব্দুল লতিফ । 

১৮২৮ সালের নবাব আব্দুল লতিফ ফরিদপুর জেলায় রাজাপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । আব্দুল লতিফ কলকাতা মাদ্রাসা উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন এবং ঐ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি ইংরেজি ও আরবি অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন । ১৮৪৯ সালের মার্চে মাসে তিনি ২৪ পরগনা জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হন । ১৮৬২ সালে তিনি প্রথম বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন । ১৮৮০ সালে সরকার তার কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নবাব বাহাদুর ’ উপাধিতে ভূষিত করেন । দীর্ঘকালের চাকুরী জীবনের দায়িত্বপূর্ণ উচ্চ পদে সমাসীন থেকে আব্দুল লতিফ ১৮৮৪ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন । ১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই তার মৃত্যু হয় । 

রাজনৈতিক চিন্তাধারা : 

নবাব আব্দুল লতিফের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিল না । এক্ষেত্রে তার নীতি ছিল অনেকটা আপস ও সহযোগিতামূলক । রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে তিনি নিজেকে যথাসম্ভব দূরে রাখতেন । কারণ ১৮৫৭ সালের বিপ্লব এবং মুসলমান সমাজের উপর তার ভয়াবহ প্রভাব ও ফলাফল তার স্মৃতিপটে ভাস্মর ছিল । তিনি উপলব্ধি করেন যে , মুসলমানদের উপর যতদিন ইংরেজিতে আক্রোশ অব্যাহত থাকবে ততদিন মুসলমানদের উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই । এজন্য তিনি মুসলমানদের সাথে সরকারের স্বার্থে  সরকারের সঙ্গে প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন । নবাব আব্দুল লতিফ নিজে খুব রাজভক্ত ছিলেন । তিনি কখনও ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ আন্দোলন বা ইংরেজ বিরোধী কার্যকলাপ সমর্থন করতেন না । জিহাদ আন্দোলনের প্রধান বক্তব্য ছিল , যতদিন দেশ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকবে ততদিন ইহা মুসলমানদের কাছে ‘ দার-উল-হরব’ বা বিধর্মীদের রাষ্ট্র বলে গণ্য হবে । আব্দুল লতিফ এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বলেন যে , জেহাদের প্রচারকদের ফতোয়া সঠিক নয় । কারণ তার মতে , ইংরেজ সরকারের শাসনাধীনে মুসলিম সমাজের আত্মবিকাশ কোনোভাবেই ব্যাহত হয় নি । নিজের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তিনি জৌনপুরের মাওলানা কেরামত আলী এ সম্পর্কে দেওয়া ফতুয়া তুলে ধরেন । এ প্রতিবাদে ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে  ‘ দার-উল-ইসলাম’ বলা হয়েছে । এভাবে আব্দুল লতিফ প্রচার করেন যে , মুসলমানদের স্বার্থেেই জেহাদ আন্দোলন পরিত্যাগ করা উচিত । আব্দুল লতিফ বাংলার কৃষকদের উপর নীলকরদের অত্যাচার দেখে খুবই ব্যথিত হন । যদিও তিনি ইংরেজ ভক্ত ছিলেন কিন্তু ইংরেজ সরকারের সহযোগী নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি কুণ্ঠিত হননি । ১৮৬০ সালে আব্দুল লতিফ এবং স্যার এশনি ইডেনের উদ্যোগেই ইন্ডিগো কমিশন গঠিত হয় । এ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নীলচাষ কৃষকদের ইচ্ছাধীন করা হয় । 

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান : 

মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তারে আব্দুল লতিফ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । তিনি উপলব্ধি করেন যে,  ইংরেজি শিক্ষার তারা মুসলমানদের অবস্থার উন্নতি হবে না । তিনি বিশ্বাস করতেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার যতই প্রসার ঘটবে ততই তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে উপকৃত হবে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বিনিময়ের পথ প্রশস্ততর হবে । ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন , যদি ভারতে কোন ভাষায় শিক্ষার্থীদের জীবনকে উন্নত করতে পারে , তবে তা হল ইংরেজি ভাষা । ১৮৫৩ সালে আব্দুল লতিফ নিখিল ভারত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আহ্বান করেন এবং সর্বোকৃষ্ট প্রবন্ধের জন্য একশত টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন । এর বিষয় ছিলঃ “ ইংরেজি শিক্ষায় মুসলিম ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা”   । এই রচনা প্রতিযোগিতা মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে দারুন উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল । 

আব্দুল লতিফ কলকাতা মাদ্রাসা ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য চেষ্টা করেন । তারপর চেষ্টার ফলে সরকার কলকাতা মাদ্রাসা ইংরেজি- ফার্সী বিভাগ খোলার অনুমতি দেন । আব্দুল লতিফ সরকারের কাছে বাঙালি মুসলমানদের জন্য উচ্চতর ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানান । তারপর চেষ্টার ফলে ১৮৫৩ সালে হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয় । প্রেসিডেন্সি কলেজে মুসলমান ছাত্রদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয় । ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহে কলকাতা মাদ্রাসা ছাত্ররা সংশ্লিষ্ট ছিল এই অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার কলকাতা মাদ্রাসা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করলে আব্দুল লতিফের হস্তক্ষেপ তা রক্ষা পায় । 

শিক্ষাক্ষেত্রে আব্দুল লতিফের অপর অবদান ছিল মহসিন ফান্ডের টাকা মুসলমান ছাত্রদের জন্য ব্যয় । মহাসিন পান্ডের টাকায় হুগলি কলেজ ও স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় । কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার জন্য ছাত্রদের বেতন দিতে হতো বলে গরীব মুসলমান ছাত্ররা সেখানে ভর্তি হতে পারত না । হুগলি কলেজ ও স্কুলে মোট ছাত্র সংখ্যার দুই শতাংশ ছিল মুসলিম । ফলে মহসিন পান্ডের টাকায় মুসলমানদের কোনো উপকার হতো না , উপকার হতো অন্য সম্প্রদায়ের ছাত্রদের । অপরদিকে এ সময় অর্থের অভাবে হুগলি মাদ্রাসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় । আব্দুল লতিফ অনুধাবন করেন যে , মহসিন ফান্ডের টাকা যদি হুগলি মাদ্রাসা ব্যয় করা হয় তাহলে মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতি হয় । এ ব্যাপারে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সরকার এ সমস্যা সমাধানের জন্য তাকে দায়িত্ব দেন । নবাব আব্দুল লতিফ মহাসিন ফান্ডের টাকা হুগলি মাদ্রাসা ব্যয় করার সুপারিশ করেন । তার সুপারিশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা না হলেও  ১৮৭৩ সালে সরকারের এক প্রস্তাববলে মহসিন ফান্ডের টাকা শুধুমাত্র মুসলমানদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় । তখন থেকে হুগলি কলেজ সরকারি কলেজে পরিণত হয় । এই টাকায় হুগলি ও কলকাতা মাদ্রাসা উন্নতি , ঢাকা , চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদ্রাসা স্থাপন ও মুসলমান ছাত্রদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয় । সরকার নয়টি ইস্কুলে আরবি ও ফারসি শিক্ষক নিয়োগের আদেশ দেন । এসব ব্যবস্থার ফলে মহসিন ফান্ড সম্পর্কে মুসলমানদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের অবসান হয় । 

মোহামেডান লিটার‌্যারি সোসাইট : 

নবাব আব্দুল লতিফের সবচেয়ে বড় কীর্তি হল ১৮৬৩ সালে কলকাতায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ  ( Muhammedan Literary Society ) প্রতিষ্ঠা করা । এই সমিতি ছিল ভারতের মুসলমানদের সর্বপ্রথম সমিতি । নবাব আব্দুল লতিফের এই সমিতি গঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলমান সমাজের সাহিত্যকর্ম ও সমাজ সেবায় উৎসাহিত করা । তাছাড়া ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে ঐক্য স্থাপন করাও সমিতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল । বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে এই সমিতি অগ্রণী ভূমিকা নেয় । মুসলমানদের শিক্ষা আইন ও অন্যান্য সদস্যবলির  প্রতি এই সমিতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সফলকাম হয় । সমিতির তৎপরতার ফলেই ব্যাপকহারে মুসলমান ছাত্ররা পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষা গ্রহণের জন্য এগিয়ে আসে এবং ক্রমশঃ পাশ্চাত্য শিক্ষার সুফল সম্পর্কে তারা উপলব্ধি করতে পারে । 

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুসলমানদের এক চরম দুর্দিনে নবাব আব্দুল লতিফ আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন । তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং সরকারের সাথে সহযোগিতা করা ছাড়া মুসলমানদের উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই । এজন্য তিনি বাঙালি মুসলমানদের শিক্ষার অগ্রগতির জন্য সর্বক্ষেত্রে একটি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন । তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে , মুসলমানদের সম্পর্কে সরকারের কিরূপ ধারণায় অবসান হয় । বস্তুতঃ তাঁর এবাগ্র প্রয়াসের ফলেই মুসলিম বাংলার পুনরুজ্জীবন ঘটে । বাংলার মুসলিম সমাজ তাই নবাব আব্দুল লতিফের কাছে গভীরভাবে ঋণী । 

সৈয়দ আমীর আলী ( ১৮৪৯-১৮২৮): 

ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজের ত্রাণকর্তারূপে নবাব আব্দুল লতিফের ন্যায় আরেকজন মুসলিম মনীষীর আর্বিভাব ঘটে । তিনি হলেন সৈয়দ আমীর আলী । ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক পুনঃজাগরণের ও সংস্কৃতির পুনর্জন্মের ক্ষেত্রে তিনি অবদান রেখে গেছেন । 

সৈয়দ আমীর আলী ১৮৪৯ সালের ৮ এপ্রিল হুগলি জেলার অন্তর্গত চুঁচড়া শহরে এক সম্ভ্রান্ত শিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । বাল্যকাল থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা শক্তির অধিকারী ছিলেন । ১৮৬৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি .এ . এবং ১৮৬৮ সালে এম. এ .ও বি. এল. ডিগ্রী লাভ করেন । ১৮৭৩ সালে তিনি ইংল্যান্ডের লিংকন্স কলেজ থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন । বিলাতে থাকাকালীন তিনি “ The Critical Examinations of the Life and Teaching of Muhammad” নামে গ্রন্থটি রচনা করেন। ১৮৭৩ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মুসলিম আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ সুবাদে শীঘ্রই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত লাভ করেন । ১৮৭৪ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদে এবং  ১৮৮৩ সালে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন । ১৮৯০ সালে তিনি আখরোট গ্রহণ করেন এবং বাকি জীবন ইংল্যান্ডে অতিবাহিত করেন । ১৯০৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডের  প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত হন । ১৯২৮ সালের ৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয় । 

সৈয়দ আমীর আলী কেবল একজন শ্রেষ্ঠ আইনজীবী ছিলেন না , তিনি একাধারে শক্তিশালী লেখক , দূরদর্শী চিন্তানায়ক,  রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন । তার আর্বিভাব এমন এক সময়ে হয়েছিল যখন ভারতীয় মুসলমান কি শিক্ষায়, কি রাজনীতি কোন কিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারত না । স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এবং নবাব আব্দুল লতিফের ন্যায় তিনিও মনে করতেন একমাত্র ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমেই মুসলমানদের ভাগ্যের উন্নতি সম্ভব । কিন্তু স্যার সৈয়দ আহমেদ এবং আব্দুল লতিফের ন্যায় রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না । রাজনীতির ক্ষেত্রে সৈয়দ আমীর আলীর নিজ চিন্তা-ভাবনা এবং কর্মসূচি ছিল । তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষার পাশাপাশি মুসলমানদের রাজনৈতিক কোনো জাগরণের প্রয়োজন রয়েছে । পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের  প্রয়োজনীতা তীব্রভাবে অনুভব করেন । এ উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭৭ সালে কলকাতায় “  Central National Mohameddan Association” নামে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করেন । এ সম্পর্কে আমির আলী বলেন , “ আমি ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব লক্ষ করি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিপত্তি দেখতে পাই ।” মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার সৃষ্টি ও ঐক্য স্থাপন এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকারের কাছে ন্যায় সঙ্গত দাবি-দাওয়া পেশ করা ছিল এ সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য । প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সমিতি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয় । শীঘ্রই আমির আলী ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সারা ভারতে এ সমিতির প্রায় ৫৩ টি শাখায় স্থাপিত হয় । তবে এ প্রতিষ্ঠানটি ভারতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য গঠিত হলেও ও মুসলিম সংগঠন কিংবা অমুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষভাব ছিল না । অনেক হিন্দু ব্যক্তিত্ব এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ।  তবে আমির আলী  হিন্দু ও মুসলমানদের যৌথ নাগরিকত্বের ও রাজনৈতিক পক্ষের বিরোধী ছিলেন । তাঁর ভাষায়, “ Any attempt to drive the smaller into the bigger camp will only lead to discord and strife.” এজন্যই ১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লাহ নেতৃত্বে যখন ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তিনি একে বিলেত থেকে স্বাগত জানান  । 

১৮৮২ সালে সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন  ভাইসরয় লর্ড রিপনের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন । সৈয়দ আমীর আলীর এই স্মারকলিপির বিষয়বস্তু ‘ ভারতীয় মুসলমানদের অভিযোগ’ ( A cry from the Indian Muhammedans ) শীর্ষক একটি প্রবন্ধে প্রকাশ করেন । এই স্মারকলিপিতে মুসলমানদের শিক্ষা এবং চাকুরী ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিয়োগ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় । মুসলমানদের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্ত আইন প্রণয়নের প্রতি ঐ স্মারকলিপিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় । ১৮৮৭ সালে সমিতির এক প্রতিনিধিদল বড়লাট লর্ড ডাফরিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন । লর্ড ডাফরিন স্বীকার করেন যে , ঐতিহাসিক কারণে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছে এটি সত্য এবং সরকার তাদের সাহায্য অনুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন । 

আমীর আলী শাসন সংস্কারের দাবি উত্থাপন করেন । ভারতবাসীদের অধিক সংখ্যায় দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ , শাসন পরিষদের সম্প্রসারণ , ব্যাপক ভোটাধিকার ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট মত ব্যক্ত করেন । তিনি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গুলোতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের দাবি করেন । তিনি অনুধাবন করেন যে , মুসলমান সম্প্রদায়কে স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার দেওয়া না হলে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্টের জোরে আইনসভার সমুদয় আইন দখল করে নেবে । এছাড়াও তৎকালীন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি  “ মুসলমানদের অনগ্রসরতার কারণ ও তার প্রতিকার ” সম্বলিত বহু সারগর্ভ প্রভন্ধ লেখেন । সরকারের কাছে তার বিরামহীন প্রচেষ্টা অনেকটা সফল হয় । ১৮৮৮ সালের ৬ নভেম্বর লর্ড ডাফরিন ভারতের ব্যবস্থাপক পরিষদের সম্প্রসারণ এর ব্যাপারে ভারত সচিবের কাছে যে সুপারিশ করেন তাতে মন্তব্য করেন যে , ভারতীয়রা বিভিন্ন ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বহু জাতিতে বিভক্ত এবং বৈষয়িক স্বার্থের  বিরুদ্ধতায়  একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন । ১৮৯২ সালের ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদ বিলের বিতর্কে কেম্বারলী একই ধরনের মন্তব্য করেন এবং বলেন, “ ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক পার্লামেন্টারি পদ্ধতি প্রবর্তন যুক্তিযুক্ত হবে না।” 

১৯০৪ সালে সৈয়দ আমীর আলী ভারত ত্যাগ করে বিলেতে বসতি স্থাপন করেন । তার ভারত ত্যাগের ফলে সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে । কিন্তু তার মনে সর্বদা মুসলমানদের জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের তাগিদ থেকে যায় । ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে স্বভাবতই এ প্রতিষ্ঠানের সৈয়দ আমীর আলীর সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করে । ১৯০৮ সালের ৬ মে তার উদ্যোগে লন্ডনের সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের লন্ডন শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় । লন্ডন মুসলিম লীগ ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । লন্ডন মুসলিম লীগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টোর সংস্কার আইনে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা স্বীকৃতি লাভ করে । 

সৈয়দ আমীর আলী ভারতীয় মুসলমানদের রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরনের জন্য সারাজীবন সাধনা করেছেন । মুসলমানদের গৌরবময় অতীতের ইতিহাস , কৃষ্টি ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করে তিনি মুসলমানদের মহা উপকার করেছেন । এজন্য মুসলমান সমাজ তার কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ । পাশ্চাত্য জগতের কাছে ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞান সম্মত বিশ্লেষণ ও মূলনীতি প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি কয়েকখানা পাণ্ডিত্যপূর্ন  গ্রন্থ রচনা করেন । তার রচনা সমূহের মধ্যে Critical Examination of the Life and Teaching of Muhammad ( 1873), The Spirit of Islam ( 1889) , Ethics of Islam ( 1906) , A Short History of Saracens ( 1889) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।  তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থাবলী দুনিয়ার সর্বত্র এবং সকল মতের মুসলমানদের প্রশংসা অর্জন করে । 

সৈয়দ আমীর আলী ভারতে মুসলমানদের ইতিহাসের এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন । মুসলমানদের এক চরম দুঃসময়ে তার আর্বিভাব ঘটেছিল । তিনিই সর্বপ্রথম ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি রাজনৈতিক সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন । ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করে । তিনিই প্রথম মুসলমানদেরকে এক জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন । মুসলমানদের গৌরবময় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন । তার রচনা সম্ভার মুসলমান সমাজের কাছে এক অমূল্য সম্পদ । তাকে ইসলামী রেনেসাঁর অন্যতম অগ্রদূত বলা হয় । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) নবাব আব্দুল লতিফ কে ছিলেন ? 

#) শিক্ষাক্ষেত্রে আব্দুল লতিফের অবদান কি ছিল ? 

#) সৈয়দ আমীর আলী কে ছিলেন ? 

#) শিক্ষা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আলোচনা করো । 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

#) বাংলার মুসলমানদের পুনঃজাগরণের নবাব আব্দুল লতিফের ভূমিকা বর্ণনা করো ? 

#) ভারতীয় মুসলমানদের পুনর্জাগরণে সৈয়দ আমীর আলীর অবদান পর্যালোচনা করো । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

98 ÷ = 14