সিমলা ডেপুটেশন

#) সিমলা ডেপুটেশন কি ? 

ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক অগ্রগতির ইতিহাসে সিমলা ডেপুটেশনের গুরুত্ব অপরিসীম । এই ডেপুটেশন এর মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের স্বতন্ত্র অধিকার ও স্বার্থের কথা সরকারের কাছে তুলে ধরেন । 

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের ফর লর্ড মিন্টো ভারতের বড়লাট নিযুক্ত হন । এ সময় ইংল্যান্ডের নির্বাচনে উদারনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হন এবং জন মর্লি ভারত সচিব নিযুক্ত হন । উদারনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে আশান্বিত হন এ কারণে যে , ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করবে এবং বাংলঅ প্রদেশের সীমানা তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে । কিন্তু প্রশাসনিক কারণে সরকার তড়িঘড়ি বঙ্গভঙ্গ রদ করতে পারেন নি । এমতাবস্থায় ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসকে সন্তুষ্ট করবার জন্য ভারতীয় আইনসভার সম্প্রসারণ এর পরিকল্পনা করেন । ১৮৯০৬ সালে ভারত-সচিব জন মর্লি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক বক্তব্য ভারতে আসন্ন শাসন সংস্কারের ইঙ্গিত দেয় । সম্ভাব্য সংস্কারের ক্ষেত্রে ভারতে মুসলমানদের অবস্থা কি দাঁড়াবে একথা ভেবে আলিগড় মুসলিম নেতা মহসীন-উল-মূলক শঙ্কিত হয়ে পড়েন । কারন ১৮৯২ সালের ভারতীয় পরিষদ আইনের দ্বারা মুসলমানদের আকাঙ্কা পূরণ হয়নি । এই আইনের বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থায় মুসলমানদের যতগুলো আসন প্রাপ্য ছিল , প্রার্থী দেয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা তার অর্ধেক আসন লাভ করে । এই অবস্থা মহসিন-উল -মুলক শঙ্কাবোধ করেন যে , আইন সভায় নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্য নিযুক্ত হলে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে এবং মুসলমানরা ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে । সুতরাং মহসীন-উল-মুলক কাল বিলম্ব না করে বড়লাট লর্ড মিন্টো সাথে সাক্ষাতের জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেন এবং আলিগড় কলেজের অধ্যক্ষ আর্চ্চিবল্ড এর সহযোগিতায় একটি স্মারকলিপি রচনা করেন । মহামান্য তৃতীয় আগাখানকে প্রতিনিধি দলের নেতা নির্বাচন করা হয় । ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন প্রসিদ্ধ ব্যক্তির এক মুসলিম প্রতিনিধি দল বড়লাট মিন্টোর সাথে সিমলায় সাক্ষাৎ করেন । এটাই প্রসিদ্ধ সিমলা ডেপুটেশন । প্রতিনিধিবর্গ মিন্টোর হাতে যে স্মারকলিপি পেশ করেন তাতে বলা হয় যে , 

১) মুসলমানরা ভারতের সেই সময়ের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি অর্থাৎ ২৯ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ৬ কোটি ২০ লাখ । 

২) সাধারণভাবে যা মনে করা হয় তার চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি । নিম্নবর্ণের অধিবাসীদের হিন্দু হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় হিন্দুদের শতকরা হার বেশি দেখায় । 

৩) মুসলমানদের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার তাদের অবদানের জন্য সংখ্যার অনুপাতের চেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব মুসলমান দাবী করতে পারে । 

৪) পরবর্তী প্রতিনিধিত্ব পর্যাপ্ত ছিল না । প্রায়শই তাদের মনোনীত প্রতিনিধিবৃন্দ সর্বদা মুসলমানদের কাছে গ্রহন যোগ্য ছিল না । 

৫) যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থায় হিন্দুর প্রতি সহানুভূতিশীল মুসলমানরাই কেবল নির্বাচিত হবে । 

অতএব সিমলা ডেপুটেশনে সরকারের কাছে দাবি করা হয় যে : 

১) যদি নির্বাচনের মাধ্যমে আইন সভায় প্রতিনিধিত্ব সম্প্রসারণে ব্যবস্থা করা হয় , তবে মুসলমানদের জন্য অবশ্যই পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হবে । 

২) মুসলমানরা ভারতে একটি পৃথক সম্প্রদায় এবং তাদের স্বার্থ হিন্দুদের থেকে পৃথক । তাদের স্বার্থ যেন  সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় । 

৩) মুসলমানদের  ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের কথা ভেবে তাদের জনসংখ্যা শক্তি অপেক্ষা বেশি আসন সংরক্ষণ করতে হবে । 

৩) আইন সভায় মুসলিম প্রতিনিধিকে কেবলমাত্র মুসলিম ভোটেই নির্বাচিত হওয়ার অধিকার দিতে হবে । 

৫) আইনসভা, জেলাবোর্ডগুলোতে সম্প্রদায়গত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হবে । 

৬) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিনেট ও সিন্ডিকেটে  মুসলমানদের জন্য কয়েকটি আসন সংরক্ষণ করতে হবে । 

৭) মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সাহায্য দিতে হবে । 

পরিশেষে , মুসলিম প্রতিনিধিবর্গ তাদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ রাজ্যের  প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে । 

বড়লাট লর্ড মিন্টো মুসলিম নেতাদের দাবীর সারবত্তা মেনে নেন । তিনি মুসলিম নেতৃবৃন্দকে আশ্বাস দেন যে , ভারতের শাসন সংস্কার প্রবর্তিত হলে মুসলমান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা হবে । তিনি বলেন যে , ব্রিটিশ সরকার অতীতে ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যাপারে যে সুবিবেচনা করে এসেছেন তা ভবিষ্যতে বহাল থাকবে । 

গুরুত্ব : 

#) সিমলা ডেপুটেশনের গুরুত্ব আলোচনা করো । 

সিমলা ডেপুটেশন খুবই ফলপ্রসূ  হয় । এর ফলে ভারতে মুসলমান নেতাদের মনে বিশেষ উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় । এই প্রথম ব্রিটিশ সরকার ভারতে মুসলমানদের একটি পৃথক সম্প্রদায়ের স্বীকার করে নেয় । এই ডেপুটেশনের সাফল্য থেকেই মুসলমান স্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ ঘটেতে থাকে । মুসলমানরা নিজেদের জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে । ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্তা মেনে নিতে তাদের জন্য ১৯০৯ সালে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন করে । আর এভাবে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের নীতি স্বীকার করে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যবধান গড়ে তোলেন । ফলে ভারতের রাষ্ট্রীয় জীবন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

62 ÷ = 31