মর্লি-মিন্টো সংস্কার- ১৯০৯

ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ । এ আইনের মাধ্যমে ভারতীয়দের শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নয় , প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয় । এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভারত-সচিব লর্ড মর্লি এবং বড়লার্ট লর্ড মিন্টোর মুখ্য ভুমিকা ছিল, সেহেতু এই আইন “ মর্লি-মিন্টো আইন” নামে পরিচিতি । 

কারণসমূহ : 

#) মর্লি-মিন্টো সংস্কারের কারণগুলি আলোচনা করো । 

নানাবিধ কারণে ১৯০৯ সালে মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন প্রণীত হয় । 

১) ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের প্রতি অসন্তোষ : 

১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় । এ আইনের ফলে কেন্দ্রীয়ও প্রদেশের যে আইনসভা গঠিত হয় তা ছিল প্রকৃতপক্ষে এক ভুয়া আইন পরিষদ । সরকারের সিদ্ধান্তের উপর আইন পরিষদের প্রভাব ছিল খুবই কম । ১৮৯২ সালের আইনে তথাকথিক ‘ নির্বাচনের ধারণা ‘ ভারতীয়দের মোটেই সন্তুষ্ট করতে পারে নি । আইন পরিষদে বে সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি ছিল সরকারের একটি ছল । ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অধিক সংস্কারের জন্য আন্দোলন করলেও ব্রিটিশ সরকারের ছিল সম্পূর্ণ উদাসীন । 

সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের এই উদাসীনতা এবং ছলনাপূর্ন মনোভাব ভারতবাসীদের যারপর নাই ক্ষুব্ধ করে তোলে । ফলে দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে । 

২) জাতীয় দুর্যোগের প্রভাব : 

১৮৯৬-৯৭ সালে ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে । ঐতিহাসিক ফ্রেজার ১৮৯৬-৯৭ সালের দুর্ভিক্ষকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । এ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটে এবং সরকারকে প্রায় ৪০ লক্ষ লোকের জন্য ত্রানের ব্যবস্থা করতে হয় । দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি বোম্বে প্রেসিডেন্সিতে প্লেগ মহামারী আকারে দেখা দেয় । হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লক্ষ ৩ হাজার লোক এই মহামারিতে মারা যায় । ১৮৯৯ সালে ভারতে প্রচন্ড খরা  শুরু হয় । জনগণ তাদের দুঃখ কষ্টের জন্য সরকারের ভুল আর্থিক নীতিকে দায়ী করে । সরকার দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জনগণের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় । এসব ঘটনার ফলে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় । 

৩) লর্ড কার্জনের স্বৈরাচারী শাসন আমল ( ১৮৯৮-১৯০৫): 

লর্ড কার্জনের শাসনামলে ভারতের রাজনৈতিক অসন্তোষ তীব্রতর হয়ে ওঠে ।  এ প্রসঙ্গে K.V Punnia বলেন , “ The Vice-royalty of Lord Curzon ( 1898-1905) marked an important stage in the development of political unrest in our country.” 

১৮৯৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশন আইন এবং ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করে কার্জন এসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা খর্ব করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯০৪ সালের বাজেট ঘোষণায় তিনি বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চ পদগুলো ইংরেজিদের নিয়োগ করা হবে বলে ঘোষণা দেন। তারে ঘোষণা ভারতীয়দের দারুণভাবে ব্যথিত করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে, লর্ড কার্জনের অবিবেচনাপ্রসূত নীতির ফলে ভারতীয় জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

৪) রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপানের বিজয়ঃ 

১৮৯৬ সালে ইতালির বিরুদ্ধে আফ্রিকার দেশ আবিসিনিয়ার এবং ১৯০২ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপানের জয় যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং সমগ্র এশিয়ার জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করে । বিশেষ করে জাপানের সাফল্য ভারতীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয় এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তা বোধ জাগ্রত করে । 

৫) বিদেশে ভারতীয়দের অবমাননা : 

বিদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা,  ফিজি ও কানাডাতে ভারতীয়রা চরম বর্ণবৈষম্যের শিকার হয় । দক্ষিণ আফ্রিকার নাতালে ভারতীয় শ্রমিকদের উপর তিন পাউন্ড করে এবং ট্রান্সভালে ভারতীয়দের জমি ক্রয় নিষিদ্ধ আইন ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে । ১৮৮৮ সালে Orange River Colony হতে ভারতীয়দের বহিষ্কার , ট্রেন, বাস,  স্টিমার প্রভৃতি যানবাহনে ভারতীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহার ভারতীয়দের মনে ধারণার জন্ম দেয় যে , স্বদেশে তাদের অধঃপতন এই বিদেশে তাদের অবমাননার প্রধান কারণ । ভারতীয়দের অবমাননা চূড়ান্ত পর্যায়ে উপস্থিত হয় যখন ট্রান্সভাল সরকার ১৯০৭ সালে এশিয়া নিবন্ধীকরণ আইন ( Asiatic Registration Act ) পাশ করে ভারতীয়দের Finger print অর্থাৎ টিপ সহির সাহায্যে নিবন্ধীকরণের ব্যবস্থা করেন । এই অবমাননাকর আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ শুরু করেন । এসব ঘটনা ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে । 

৬) অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি : 

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম অবনতি দেখা দেয় । কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে দারুন মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয় । নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের মজুরি কমতে থাকে । চাকুরির সুযোগ না থাকায় শিক্ষিত যুবক শ্রেণীর চরম হতাশার সম্মুখীন হন । দ্রব্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থাও খারাপ হয় । ফলে সর্বক্ষেত্রে হতাশা দানা বেঁধে উঠে । জনগণের সমস্যার প্রতি সরকারের উদাসীনতা ও মেীনতা ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগ্রত করে । 

৭) সন্ত্রাস গ্রুপের আর্বিভাব : 

এ সময় কংগ্রেসের পতাকাতলে একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর আর্বিভাব ঘটে । সরকারের চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও নির্যাতনমূলক নীতির ফলে এ গোষ্ঠীর জমা হয় । এ গুষ্টির নেতৃত্ববিন্দু মনে করতেন যে , সংগ্রাম, আরও ত্যাগ ও সক্রিয় আন্দোলন ছাড়া স্বরাজ লাভ সম্ভব নয় । এসময় কট্টরপন্থী নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে বালগঙ্গাধরতিলক , বি.সি.পাল, অরবিন্দ , লালা লাজপত রায় , বি.কে.ঘোষ প্রমুখ তাদের লেখনী ও জ্বালাময়ী  বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগ্রত করে । উগ্রপন্থিদের এই আন্দোলনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার অতৎপর কিছু সংস্কার মূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।  

৮) সন্ত্রাসী কাজকর্মের বিস্তার : 

এ সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাংলায় সন্ত্রাসী কাজকর্মের বিস্তার ঘটে । চরমপন্থীরা সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে ইংরেজদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করে । ১৯০৭ সাল হতে বাংলায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী হামলা সংঘটিত হয় । ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের কাছে চরমপন্থীরা বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে কিন্তু ব্যর্থ হয় । ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দেয় । এসব ঘটনায় ইংরেজরা রীতিমতো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন । পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্রিটিশ সরকার শীঘ্রই ভারত বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের তৎপর হন । 

৯) কংগ্রেস  দলের প্রত্যাশা : 

১৯০৫ সালে কংগ্রেসের মধ্যপন্থী নেতা গোলাপকৃষ্ণ গোখলের সভাপতিত্বে বেনারসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়  । এ সভায় গোখলে কংগ্রেসের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন । তিনি বলেন, “ The goal ot the Congress is that India should be governed in the interests of the Indians themselves and that in course of time , a form of Govt. should be attained in this country similar to what exists in the self-governing colonies of the British Empire.” মিঃ গোখলে এ সময় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সংস্কারের জন্য জোরালো বক্তব্য রাখেন । তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইংল্যান্ডে ভারত সচিব মর্লির সাথে সাক্ষাত করেন এবং ভারতীয়দের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য ভারত সচিবকে অনুরোধ জানান । ভারত সচিব গোখলেকে ভারত সংক্রান্ত বিষয়ে ন্যায় সঙ্গত কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন । 

১০) মুসলিম নেতৃবৃন্দের  দাবি : 

১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর ভারতীয় মুসলিম লীগের মুখপাত্র হিসাবে মহামান্য আগাখানের নেতৃত্বে এক মুসলিম প্রতিনিধি দল সিমলায় বড়লাট মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন । সাক্ষাতে মুসলিম নেতৃবৃন্দ বড়লাটকে এই মর্মে অনুরোধ জানান যে , সরকার কোন শাসন সংস্কার প্রবর্তনের সময় ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র অধিকার যেন রক্ষা করেন । ১৯০৬ সালে ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯০৮ এবং ১৯০৯ সালে মুসলিম লীগ সরকারের কাছে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার জোরালো দাবি পেশ করে । 

১১) ইংল্যান্ডে উদারনৈতিক দলের মন্ত্রিসভা গঠন : 

১৯০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইংল্যান্ডে লিবারেল পার্টি মন্ত্রিসভা গঠন করে । লর্ড মর্লি  ভারত সচিব নিযুক্ত হন । উদারপন্থী লর্ড মর্লি এবং ভারতের রক্ষণশীল ভাইসরয় লর্ড মিন্টো ভারত  সম্পর্কে একই ধারণা পোষণ করেন । ১৯০৭ সালে লর্ড মিন্টো ভারত সম্পর্কে তাঁর সুপারিশ মর্লির কাছে পাঠান । লর্ড মর্লি ভারত সরকারের প্রস্তাব গ্রহণ করে । ১৯০৮ সালে ১৭ ডিসেম্বর ভারত সচিব লর্ড মর্লি ১৯০৯ সালে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের বিলটি অনুমোদিত হয় । 

আইনের ধারাসমূহ : 

#) মর্লি-মিন্টো আইনের ধারাসমূহ আলোচনা কর ।

১) ১৯০৯ সালের আইনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় । কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বৃদ্ধি করে ৬৯ করা হয় । এই ৬৯ সদস্যের মধ্যে  ৩৭ জন , ৩২ জন বেসরকারি সদস্য হবেন স্থির হয় ।  বাকী ২৮ জন সদস্য গভর্নর জেনারেল মনোনীত করবেন ২৭ জন নির্বাচিত হবেন । ২৭ জন নির্বাচিত বে সদস্যদের মধ্যে ১৩ জন বোম্বাই , মাদ্রাজ, বাংলা , উত্তর প্রদেশ প্রভৃতি প্রদেশের আইনসভার বে সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন । অবশিষ্ট ১৪ জনের ৬ জন জমিদার শ্রেণীর মধ্য হতে , ৬ জন মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র ভোটে এবং ২ জন বাংলা ও বোম্বাইয়ের বণিকসভার মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন । 

২) প্রাদেশিক আইন পরিষদগুলোও  এ আইনে সম্প্রসারিত হয় । বড় বড় দেশের আইনসভাগুলোতে সর্বাধিক ৫০ জন অতিরিক্ত সদস্য এবং ছোট দেশের আইন পরিষদগুলোতে সর্বোচ্চ ৩০ জন সদস্য থাকার বিধান করা হয় । প্রদেশের আইনসভা বে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া হয় । কিন্তু সেখানে ও গভর্নর আইন সভায় বে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া হয় । কিন্তু সেখানে ও গভর্নর কর্তৃক মনোনীত বে সদস্যগন মিলিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতেন । যেমন মাদ্রাজ আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন ২১ জন এবং বে সদস্য ছিলেন ২৬ জন । এই ২৬ জনের মধ্যে ৫ জন গভর্নর কর্তৃক মনোনীত হতেন । বাকী ২১ জন নির্বাচিত বে সদস্য ২১ জন এবং গভর্নর কর্তৃক মনোনীত ৫ জন মোট ২৬ জন সদস্যদের ভোটে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন । একমাত্র বাংলা প্রদেশেই নির্বাচিত বে সদস্যগণ পরিষ্কারভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভোগ করেন । 

৩) ১৯০৯ সালের আইনে আইন পরিষদগুলোর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয় । এ আইনে পরিষদ সদস্যদের বাজেট সম্পর্কে আলোচনা , প্রস্তাব উপস্থাপন করার এবং জনস্বার্থ সংক্রান্ত প্রশ্ন আলোচনা করার অধিকার দেওয়া হয় । তবে কতিপয় বিষয় , যেমন -রাজস্ব সংক্রান্ত শুল্ক কর , ঋন, প্রতিরক্ষা , দেশীয় রাজ্য ও বিদেশনীতি , রেলপথ , রাজনৈতিক পেনশন , ধর্মীয় সংক্রান্ত প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা বা প্রস্তাব উপস্থাপনের কোন অধিকার আইন সভাগুলোকে দেওয়া হয়নি । বাজেট প্রস্তাব সদস্যরা ভোট দিয়ে পাশ করতে পারতেন না । তারা শুধুমাত্র প্রস্তাবের উপর কিছু সংশোধনী দিতে পারতেন । তবে সংশোধনী গ্রহণ করা বা না করা সরকারের ইচ্ছাধীন ছিল । প্রদেশিক আইন পরিষদগুলোর ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের অনুরূপ বিধিগুলো প্রয়োগ করা হয় । 

৪) এ আইনের দ্বারা বোম্বাই , মাদ্রাজ ও বাংলার শাসন পরিষদের সদস্য ৪ জন করা হয় । 

৫) এ আইনে সর্বপ্রথম নির্বাচকমণ্ডলীর ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের নীতি ভাবে স্বীকৃত হয় । কিন্তু ভোটাধিকার অত্যন্ত সীমিত রাখা হয় । প্রদেশগুলোতে সদস্য নির্বাচনের ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের , জমিদার জেলা বোর্ড , পৌরসভা এবং বণিক সমিতি কে দেওয়া হয় । মুসলমানদের জন্য পৃথক প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয় । পরিষদে মুসলিম সদস্যগণ মুসলমান ভোটদাতাদের ভোটে নির্বাচিত হবেন স্থির হয় । 

৬) এ আইনের সর্বপ্রথম বড়লাটের শাসন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয় । এস.পি. সিনহাকে বড়লাটের শাসন পরিষদে আইন সদস্য নিযুক্ত করা হয় । জি.পি.গুপ্ত এবং সৈয়দ হোসেন বিলগ্রামী নামক দু’জন ভারতীয়কে ভারত সচিবের কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত করা হয় । 

আইনের ত্রুটি সমূহ : 

#) মর্লি-মিন্টো আইনের ত্রুটি সমূহ আলোচনা করো । 

১৯০৯ সালে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের অনেক ত্রুটি ছিল । নিম্নে এই আইনের ত্রুটি সমূহ আলোচনা করা হলো :
১) ১৯০৯ সালের মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন ভারতীয়দের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় । ভারতীয় জনগণ এ সময় ভারতে একটি দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিল । কিন্তু এই আইনের মাধ্যমে ভারতে নিয়মতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পথে সৃষ্টি করা হয় । এ আইনের জনক ছিলেন ভারত সচিব লর্ড মর্লি । ভারতে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা তার কোনো আগ্রহ ছিল না । ফলে এ সংস্কার আইন জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি । এজন্যই বলা হয়েছে যে , ভারতীয় জনগণ ব্রিটিশ সরকারের কাছে ১০০০ পাউন্ডের চেক জমা দিলে তাদেরকে মাত্র ১ পাউন্ড দেওয়া হয় । এ সংস্কারের ফলে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থা প্রকারগত কোনো পরিবর্তন আসেনি , এসেছিল শুধু মাত্রাগত প্রভেদ । আইনসভার ক্ষমতা ও আয়তনের ক্ষেত্রেও এই আইন সামান্যই পরিবর্তন এনেছিল । ফলে ভারতীয় জনগণ সন্তুষ্ট হতে পারেনি । 

২) এ আইনের ফলে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় । এ আইনের ধারা আইন সভায় সংস্কার করা হলেও আইনসভার সদস্যদের কোন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি । ফলে আইন সভার সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে বিরামহীন সমালোচনায় মত্ত হয় । ভারতীয় নেতারা আইনসভা গুলোকে সরকার বিরোধী মঞ্চ রূপে ব্যবহার করতে থাকেন । 

৩) এই আইন ভারতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রচলন করে । কিন্তু সাধারণ লোকদের ভোটাধিকার হতে বঞ্চিত করা হয় । যারা সরকারকে কর দিত তারাই ভোটাধিকার লাভ করত । ফলে ভোট দাতাদের সংখ্যা ছিল খুবই সামান্য । কোন কোন ক্ষেত্রে একটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের সংখ্যা ৯/১০ জনের বেশি ছিল না । ভোটারদের সংখ্যা কম হওয়ায় সহজেই ভোট কেনা যেত । নারীদের কোন ভোটাধিকার ছিল না । 

৪) নির্বাচন পদ্ধতি ছিল পরোক্ষ । সদস্যরা প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হলে পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হতেন । এ জন্য নির্বাচিত সদস্যদের জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ ছিল না । তারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন না । 

৫) এ আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি ছিল কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে এক শক্তিশালী সরকার পক্ষ সদস্যদের উপস্থিতি । সদস্যরা ছিলেন সরকারের হাতের পুতুল । তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন না । সরকারের অনুমতি ছাড়া তারা কোনো প্রশ্ন উপস্থাপন বা কোনো প্রস্তাব পেশ করতে পারতেন না । তারা যেকোন বিষয়ে সরকারের পক্ষে এবং বে সদস্যদের বিপক্ষে ভোট দান করতেন । কে.পি. পুন্নিয়ার ভাষায় , বে. সদস্যরা যতই অনলবর্ষী ভাষণ দেন , তাদের যুক্তি যতই বলিষ্ঠ ও প্রখর হোক না কেন , ভোট দানের সময় আসলে নির্বাক সরকারি সদস্যরা বেসরকারি সদস্যদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে বিষয়টি সমাধান করে দিতেন । 

৬) এ আইনে প্ররদেশীক পরিষদে বেসামরিক সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া হয় । কিন্তু এটি ছিল মূলত : একটি প্রহসন । প্রদেশীক পরিষদে বে সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভোটাভুটির সময় গভর্নর কর্তৃক মনোনীত বে সদস্যরা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন । পরে নির্বাচিত সদস্যরা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন । আসলে প্রদেশিক আইনসভাগুলো  ছিল নিবন্ধীকরণ সংস্থা । শাসন বিভাগের আদের্শকে নিবন্ধীকরণ করাই ছিল পরিষদের একমাত্র কাজ । 

৭) এ আইনের গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয় । প্রদেশের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এ আইনের শিথিল করা হয়নি । প্রদেশিক আইন পরিষদে গৃহীত আইন গভর্নর স্বাক্ষর করার পরেও বড়লাট ইচ্ছা করলে তা নাচক করতে পারতেন । সরকারের অতি কেন্দ্রীয়করণ এর ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব কমে যায় । ফলে সরকারের বিরুদ্ধে প্রদেশে প্রদেশে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে । 

৮) এ আইনে রাজনৈতিকমনা শ্রেণীর শক্তি খর্ব করে জমিদার ও বেনিয়া শ্রেণীর মাত্রাতিরিক্ত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া হয়। এই কায়েমী স্বার্থবাদী শ্রেণি ছিল সরকারের হাতের ক্রীড়ানক এবং জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ বিরোধী । 

৯) কংগ্রেসের মতে , এ আইনের দ্বারা ভারতের জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের ক্ষতিসাধন করা হয় । আইন পরিষদে মুসলমান দিকে স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার দিয়ে ভারতে জাতীয় ঐক্যের’ মূলে কুঠারাঘাত করা হয় । 

১০) এ আইনের ফলে মসলমানরা স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার পেলেও আইন পরিষদ গুলোতে প্রাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে তারা সন্তুষ্ট ছিলেন না । উদাহরণস্বরূপ বাংলা প্রদেশে ( বিহার ও উড়িষ্যা বাদে ) মুসলমানরা ছিল মোট জনসংখ্যার  ৫২.৬ ভাগ । কিন্তু ১৯১৭ সালে প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচিত মোট সদস্য সংখ্যা ছিল মোট সদস্য সংখ্যা ২০.৮ শতাংশ । অথচ পরদেশী পরিষদে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ছিল মোট সদস্য সংখ্যার ৯.৫ শতাংশ । 

সুতরাং দেখা যায় যে , ভারতবাসী একটি দায়িত্বশীল ও নির্বাচিত স্ব শাসিত সরকারের প্রত্যাশা করেছিল যা ১৯০৯ সালের আইনে পূরণ হয়নি । 

 Dr. Zacharia  এ আইন সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন ,” – The essence of these Morley-Minto Reforms lay in conceding what at once was evacuated of all meaning . Thus the elective principle of democracy was adopted; yet at the same time anti-democratic communal representation was added. The official majority was done away with; but the elected members remained in a minority . The membership was considerably enlarged; but an emphatic disclaimer was issued simultaneously that the new Council in on way meant the introduction of a parliamentary System . The Council of India and even the Viceroy’s Executive Council were opened to some few select Indians; but the liberal aspect of admitting Indians to the area of government could in no way disguise the fact that real power remained safely in British hands.” 

আইনের শাসনতান্ত্রিক গুরুত্ব : 

#) মর্লি-মিন্টো আইনের শাসনতান্ত্রিক গুরুত্ব আলোচনা করো । 

১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন এর অনেক টুপি ছিল সন্দেহ নেই । কিন্তু এই আইনের শাসনতান্ত্রিক গুরুত্ব কম ছিল না । 

১) ১৯০৯ সালের আইনে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পার্সিভ্যাল স্পিয়ার এ আইনকে প্রশংসা করে বলেছেন যে , ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভের পথে এই আইন ছিল একটি প্রধান দিক চিহ্ন ।’ Morris Jones বলেন – “ The atmosphere may not have been wholly parliamentary but the changes as compared with the pre-1909 period was marked enough.” যদিও লর্ড মর্লি ভারতের দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা অস্বীকার করেছিলেন , তথাপি ভারতে ভবিষ্যৎ দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ আইন ছিল এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ । এ আইন প্রবর্তনের এক দর্শক পরেই অর্থাৎ ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইনের সীমাবদ্ধ আকারে হলেও প্রদেশিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তন করা হয় । 

২) এ আইনে পরিষদের সদস্যদের ক্ষমতা অধিকার বৃদ্ধি করা হয় । আইন পরিষদে ভারতীয় সদস্যগণ বাজেটে ও অন্যান্য আর্থিক দিক সম্পর্কে আলোচনা এবং শাসন বিভাগের সমালোচনা করার সুযোগ পান । ফলে শাসনকার্যের জটিলতা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায় । পরিষদে তাদের আলোচনায় ও বক্তব্যতা দানের মান বাড়াতে থাকে । এক দশক ধরে আইন পরিষদে তাদের ভূমিকা ও কার্যকলাপ ইংরেজ শাসকদের এক কথা পরিষ্কারভাবে স্মরণ করে দেয় যে , যদি তাদের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তারা ভারতীয় প্রশাসনিক ও প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম । 

৩) বড়লাটের শাসন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগ এই আইনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক । কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসন বিভাগের তাদের নিয়োগ কেবলমাত্র প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়নি , বরং প্রশাসনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও তারা জানবার সুযোগ লাভ করেন । 

৪) এ আইনের মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনী নীতি সূত্র মেনে নেন । এই প্রথমবারের মতো সরকার অনুধাবন করেন যে , নির্বাচনী ব্যবস্থা ছাড়া কোন সংস্কাররেই ভারতীয়দের সন্তুষ্ট করবে না । সরকারের এ ব্যবস্থা মেনে নেওয়ার ফলে , স্বায়ত্তশাসন   প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কংগ্রেসের সরকার বিরোধী আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে । 

সুতরাং দেখা যায় যে , কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সম্প্রসারণ , নির্বাচনী নীতিকে স্বীকৃতি দান , প্রাদেশিক আইন পরিষদে বেসরকারি সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দান , আইন পরিষদের সদস্যদের বাজেট আলোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাব দানের ক্ষমতা , শাসন বিভাগের ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তিকরণ ইত্যাদি  ১৯০৯ সালের আইনের প্রধান অবদান ছিল  । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন প্রণয়নের পটভূমি আলোচনা করো । 

#) ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এই আইনের গুরুত্ব নিরূপণ করো । 

#) মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা উল্লেখ করো । 

#) এই আইনের ত্রুটি সমূহ কি ছিল ? 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

#) ব্রিটিশ ভারতে ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন পাসের পটভূমি আলোচনা করো । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

× 3 = 12