ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধীর আর্বিভাব

 

ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধীর উত্থান আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা । বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী যে আন্দোলন শুরু হয় সেই আন্দোলনের তিনি নেতৃত্ব দেন । তার নেতৃত্ব গ্রহণের ফলে জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসের শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়ের , এক নতুন যুগের । 

মহাত্মা গান্ধীর প্রকৃত নাম ছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী । ১৮৬৯ সালে ২রা অক্টোবর গান্ধী গুজরাটে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী ছিলেন একজন দীউয়ান । গান্ধী আইনশাস্ত্র পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে গমন করেন এবং ১৮৯১ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেন । গান্ধী প্রথমে  বোম্বে হাইকোর্ট এ আইন ব্যবসা শুরু করেন । কিন্তু আইনজীবী হিসেবে তিনি কোনো সাফল্য লাভ করতে পারেননি । শেষ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে কর্মস্থল রূপে গ্রহণ করেন এবং  ১৮৯৩ সালে নাটালে আইন ব্যবসা শুরু করেন । দক্ষিণ আফ্রিকাতে গান্ধীজীর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বের সূচনা হয় । সেসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ওপর শ্বেতাঙ্গ শাসনের নির্মম উৎপীড়ন চলছিল।  গান্ধীজী নিজেও একাধিকবার শ্বেতাঙ্গদের হাতে লাঞ্ছিত হন । প্রবাসী ভারতবাসীর দুঃখ-দুর্দশা তাকে ভীষণ বিচলিত করে । তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণ বৈষম্য নীতি কবল থেকে ভারতীয়দের রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর হন । 

প্রথম জীবনে গান্ধীজী ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন না । বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি কখনোই উগ্র জাতীয়তাবাদ কে সমর্থন করেননি । কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার  ১৯০৬ সালে এসিয়াটিক সংশোধনী আইন প্রবর্তন করলে গান্ধীজী ভারতীয়দের সঙ্ঘবদ্ধ করে এক প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন । এই প্রতিরোধ আন্দোলন সত্যাগ্রহ আন্দোলন নামে পরিচিত । সত্যগ্রহ আইনের দুটি দিক লক্ষ্য করা যায় । প্রথমত , সত্যের প্রতি অনুরাগ ও বিশ্বাস এবং দ্বিতীয়তো, অহিংস উপায়ে সত্যের পথ অনুসরণ । গান্ধীজী এই নৈতিক আদর্শকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন এবং সফলকাম হন । গান্ধীজির আন্দোলনের ফলেই ১৯১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার ভারতীয়দের উপর থেকে অবমাননাকর আইন প্রত্যাহার করে নেন । এই আন্দোলনের ফলেই গান্ধীজী সর্বপ্রথম বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত এবং সমাদৃত হন 

দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচালিত গান্ধীজীর বর্ণ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন ছিল তার জীবনের নানাদিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । 

প্রথমতঃ এই আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধীজির নেতৃত্ব ও অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রমাণিত হয় যা পরবর্তীকালে তাকে ভারতীয় জাতীয় সংগ্রামের নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে ;

দ্বিতীয়তঃ গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতি বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকল প্রবাসী ভারতীয়দেরকে বর্ণবৈষম্য বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন । এর ফলে পরবর্তীকালে তিনি ভারতের সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ পান যা ইতিপূর্বে কোন ভারতীয় নেতা অর্জন করতে পারেননি । 

তৃতীয়তঃ গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকায় অহিংস পথে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সে একই পদ্ধতি তিনি ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন । 

১৯১৫ সালে জানুয়ারি মাসে গান্ধীজী ভারতে ফিরে আসেন এবং ভারতের শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় পর্ব । তবে ভারতে ফিরে তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে অবতীর্ণ হন নি । তার রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের নির্দেশে তিনি কিছুদিন ভারত ভ্রমণ করেন এবং ভারতীয় জীবনধারায় প্রণালী ও রাজনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন । এ সময় গান্ধীজি কিছুদিন বোলপুর শান্তিনিকেতনের ছিলেন । কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে সময় থাকে ‘মহাত্মা ’ বিশেষণে ভূষিত করেন । 

সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে যোগদানের পূর্বে ১৯১৭ সাল  থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত গান্ধীজীর তিনটে তাৎপর্যপূর্ণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন । একটি বিহারের চম্পারনে এবং অপর দুটি গুজরাটের আমেদাবাদ ও খেদায় । 

১) চম্পারণের সত্যাগ্রহ : 

চম্পারন ছিল বিহারের অন্তর্গত একটি জেলা । এই জেলায় নীলকর জমিদাররা কৃষকদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করত । গান্ধীজীর চম্পারন কৃষকরেদ ১৯১৭ সালের প্রথমদিকে চম্পারনে যান এবং কৃষকদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন । ফলে সরকারের সাথে তার বিরোধ শুরু হয় । সরকারের তরফ থেকে গান্ধীজিকে চম্পারন ত্যাগ করে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় । কিন্তু গান্ধীজী এ আদেশ অমান্য করলে তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয় । গান্ধীজিকে আদালতে হাজির করা হয় । গান্ধীজীর মুক্তির জন্য হাজার হাজার কৃষক আদালত প্রাঙ্গণে জমায়েত হয় । পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিহারের গভর্নরের আদেশে গান্ধীজীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় । এরপর গান্ধীজীর চম্পারন কৃষকদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের বিভিন্ন প্রমান সহ একটি বিবরণ গভর্নরের কাছে তুলে ধরেন । এই আবেদনের সত্যতা যাচাই করার জন্য গভর্নর একটি কমিটি নিয়োগ করেন । কমিটির রিপোর্টের পরিপেক্ষিতে সরকার আইন করে তিন কাঠিয়া প্রথা অর্থাৎ এই প্রথা অনুসারে কৃষকরা তাদের জমির কুড়ি ভাগ জমিতে নীলের চাষ করতে বাধ্য থাকতো তা রদ করেন । ভারতে গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এটি ছিল প্রথম সাফল্য । এই আন্দোলনের ফলে কৃষক সমাজের সাথে গান্ধীজীর যোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং তিনি ভারতীয় কৃষক সম্প্রদায়ের শোচনীয় দারিদ্রতা সম্পর্কে সচেতন হোন । 

২) আমেদাবাদ শ্রমিক ধর্মঘট : 

গান্ধীজীর রাজনৈতিক কার্যকলাপ এর দ্বিতীয় কেন্দ্র ছিল আমেদাবাদ । এ সময় আমেদাবাদের বস্ত্রকল শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করেছিল  । গান্ধীজীর শ্রমিকদের ধর্মঘটের  নির্দেশ দেন । গান্ধীজীর নির্দেশে শ্রমিকগণ শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মঘট শুরু করে । শ্রমিকদের দাবির সমর্থনে গান্ধীজী অনশন শুরু করেন । ২১  দিন ধর্মঘটের পর সমস্যার মীমাংসা হয় । মিলের মালিকরা শ্রমিকদের বেতন  ৩৫% বৃদ্ধি করে । এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গান্ধীজি শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও নিজ  প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন । মালিক শ্রমিক শ্রেণীর সহযোগিতার মাধ্যমে শিল্প বিরোধ সমাধান করা সম্ভব তা গান্ধীজী প্রমাণ করেন । 

৩) খেদা জেলায় সত্যাগ্রহ : 

আমেদাবাদের শ্রমিক ধর্মঘটের পরেই গান্ধীজী গুজরাটের খেদা জেলায় সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন । সে সময় খেদা জেলায় শস্য জন্মালো না । কৃষকরা সরকারের কাছে খাজা মওকুফের আবেদন করলে সরকার তা অগ্রাহ্য করেন । কৃষকদের এই দুর্দিনে গান্ধীজী এগিয়ে আসেন । তিনি সরকারের কাছে খাজনা মাফ করার অনুরোধ করেন । কিন্তু সরকার তার আবেদনপত্র প্রত্যাহার করলে গান্ধীজী বল্পভভাই প্যাটেলের সহযোগিতা সত্যাগ্রহ শুরু করেন । সত্যাগ্রহের সময় সরকার দমন নীতি গ্রহণ করেন অনেকের জমি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং অনেককে গ্রেফতার করা হয় । কৃষকদের খাজনা মাফ হয় । খেদা সত্যাগ্রহের ফলে রাজনীতিবিদ হিসেবে গান্ধীজীর দক্ষতা প্রমাণিত হয় । 

রাওলাট বিল : 

গান্ধীজীর সর্বভারতীয় রাজনীতির বৃহত্তম পরিধিতে প্রবেশ ঘটে ১৯১৯ সালে । এ সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতে বিপ্লববাদী তৎপরতা অবসানের লক্ষ্যে রাওলাট বিল প্রদান করেন । বড়লাটের পরিষদে আইনসচিব রাওলাট এর নামানুসারে এ বিল “রাওলাট বিল ” নামে পরিচিত । এই বিল সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচার করে অন্তরীণ বা বিনা বিচারে আটক রাখার ব্যবস্থা ছিল  । গান্ধীজী এই আইনের সমালোচনা করে বলেছিলেন  “ আপিল নেহী, দলিল নেহী, উকিল নেহী ।” রাওলাট বিল গান্ধীজীর জীবনে রূপান্তর ঘটায় । এতদিন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত নাগরিক । কিন্তু এই আইন তাকে চরম বিদ্রোহী করে তোলে । ঐতিহাসিক তারাচাঁদের মতে , “ গান্ধীজীর বিদ্রোহী মহাভারতে যে বিদ্রোহের সূচনা করে তার শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় ।” 

রাওলাট বিল আইনে পরিণত হলে গান্ধীজী এই আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করেন । গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতের বিভিন্ন অংশে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে । কোন কোন স্থানে ধর্মঘট কারীদের সাথে কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষ শুরু হয় । দিল্লি ও পাঞ্জাবে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে । দিল্লির নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য গান্ধীজিকে দিল্লিতে আসার আমন্ত্রণ জানায় । কিন্তু গান্ধীজীর আদেশ অমান্য করে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করেন । পথে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বোম্বে নিয়ে মুক্তি দেওয়া হয় । গান্ধীজীর গ্রেপ্তারের সংবাদে দেশব্যাপী এক তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং স্থানে স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটে । বোম্বাই ও গুজরাটে রাওলাট বিল বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে । গান্ধীজীর ব্যক্তিগত পরিচালনা বোম্বাই এ আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয় । অনেক মুসলমান এ আন্দোলনে শামিল হন । এ আন্দোলনের ফলে গান্ধীজি সর্বভারতীয় নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হন । রাওলাট বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করতে যেয়ে গান্ধীজি এটাই প্রমাণ করে যে , সর্বভারতীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করার প্রকৃত যোগ্যতা ও কর্মপন্থা তার আছে এবং তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি , বর্ণ ও ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ঐক্যবদ্ধ করে একটি সুসংহত আন্দোলন সংগঠিত করতে সক্ষম । 

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ( ১৯১৯ ) : 

রাওলাট আইনের প্রতিবাদে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তার চরম পরিণতি ঘটে  ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডে । ঐদিন অমৃতসরের সামরিক কর্তৃপক্ষ জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের পূর্ব দিকে জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে প্রায় দশ হাজার  নিরস্ত্র জনতার উপর পুলিশ গুলি বর্ষণ করে । ফলে শত শত লোক নিহত হন । এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য কংগ্রেস একটি কমিটি গঠন করে । মহাত্মা গান্ধী এই কমিটির একজন সদস্য হন । ইতিমধ্যে পাঞ্জাব , গুজরাট ও বাংলায় হিংসাত্মক কার্যকলাপের গান্ধীজী মর্মাহত হন  এবং ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন । 

অমৃতসর অধিবেশন ( ১৯১৯ ) : 

১৯১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পাঞ্জাবের অমৃতসরে কংগ্রেসের অধিবেশন বসে । এ অধিবেশনে মতিলাল নেহেরু সভাপতিত্ব করেন । এ অধিবেশনে কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ যেমন মদনমোহন মালব্য , শ্রীনিবাস শাস্ত্রী তারাও জাতীয়তাবাদী বালগঙ্গাধর তিলক , আলী ভাভৃদ্বয়, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন । তবে গান্ধীজী ছিলেন এ অধিবেশনের মধ্য মনি । তার ইচ্ছা অনুসারে কংগ্রেসর  অধিবেশনের একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন ।  এই প্রস্তাবে পাঞ্জাব ও গুজরাটের নিপীড়িত ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করা হয়  । গান্ধীজীর পরামর্শক্রমেই অধিবেশনে কংগ্রেসের সাংগঠনিক পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং গণ-সংযোগের উপযোগী হাতিয়ার হিসেবে কংগ্রেসের নতুন সংবিধান রচিত হয় । এই অধিবেশনে কংগ্রেস ওয়াকিং কমিটি নামে একটি নতুন পরিষদ গঠন করা হয় । প্রাদেশিক কমিটিগুলোকে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হয় । ঐতিহাসিক তাঁরা চাদের মতে 

, কংগ্রেসে অম্রিতসর অধিবেশনের সময় হতে ভারতের রাজনীতিতে গান্ধীজীর যুগ শুরু হয় । 

গান্ধীজীর জনপ্রিয়তার কারণ সমূহ : 

ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধীজীর পদাপর্ন হয় অনেকটা আকস্মিক ভাবে । অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ভারতীয় রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রণ হয়ে উঠেন । তিনি আপামর জনগণের নেতায় পরিণত হন । তার জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ সমূহ আলোচনা করা হলো : 

১) গান্ধীজীর ব্যক্তিত্ব : 

গান্ধীজী একজন বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন । তার বাস্তব বুদ্ধি,  আইনের ক্ষুরধার জ্ঞান ছিল প্রখর । কূট বুদ্ধিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত । অপরদিকে তিনি ছিলেন গভীরভাবে মানবতাবাদি । গান্ধীজী ছিলেন ভারতে ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতীক । তার চরিত্রের ছিল গভীর সততা ও শক্তি , মানুষের মঙ্গলে গভীর বিশ্বাস । এজন্য তিনি ভারত ও বিশ্ববাসীর কাছে ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ । জনগণের মধ্যে তার ভালোবাসার টানে এতটাই ছিল যে , অন্যায়ের প্রতিবাদে তার অনশন গোটা জাতিকে তার মূল পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিত । তিনি সকল সম্প্রদায়ের সকল শ্রেণীর মানুষকে সহজে আপন করে নিতে পারতেন । তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এক জাদু ছিল । তার ব্যক্তিত্বের জাদুতে বিশ্বের অনেক শ্রেষ্ঠ নেতারা মোহিত হন । গান্ধীজীর এই  Charisma তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল । 

২) দক্ষিণ আফ্রিকা তার সত্যাগ্রহ নীতির সফলতা : 

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্বর শ্বেতাঙ্গ বর্ণ বৈষম্য নীতি বিরুদ্ধে ভারতবাসীদের পক্ষ নিয়ে গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন তা তাকে বিরল মর্যাদা এনে দেয় । দক্ষিণ আফ্রিকার সকল ভারতীয়দের নিয়ে তিনি সত্যাগ্রহ শুরু করেন । এই ভারতীয়দের মধ্যে সকল ধর্মের লোক ছিল । বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করার ফলে গান্ধীজীর সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন । এই ক্ষমতা অপর কোনো নেতার মধ্যে দেখা যায়নি । দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ভারতে আসার পর তার সেই অভিজ্ঞতা দারুণ কার্যকর হয়।  

৩) চম্পারন ,খেদা ও আমেদাবাদের তার সফলতাঃ 

গান্ধীজীর জনপ্রিয়তার অফার কারণ হলো ভারতে আসার পর চম্পারন , খেদা ও আমেদাবাদ সত্যাগ্রহের তার সফল পরীক্ষা । এই তিনটি আন্দোলনের সাফল্য গান্ধীজিকে অসাধারণ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা এনে দেয় । 

৪) গান্ধীজীর স্বারাজের আদর্শ : 

গান্ধীজী তারে হিন্দ স্বরাজ গ্রন্থে স্বরাজের যে আদর্শ তুলে ধরেন তা বুদ্ধিজীবী ও শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পছন্দ না হলেও ভারতের সাধারণ গ্রামবাসীর অন্তরে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল । তিনি ছিলেন ভারতের নিপীড়িত মানবতার প্রতীক । পন্ডিত জহরলাল নেহেরু গান্ধীজী সম্পর্কে বলেন  “ গান্ধীজী যেন ভারতের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় থেকে টাটকা একঝলক বাতাসের মতো বেরিয়ে এলেন । তিনি তাদের ভাষাতেই কথা বলতেন । গান্ধীজীর মূল বাণী সত্য, অহিংসা, কর্মের মর্যাদা ও জনকল্যাণ । এগুলো এই ছিল গান্ধীজীর কাছে প্রকৃত স্বরাজ । গান্ধীজী বলেন , “ ভারতকে প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে ব্রিটিশদের সবকিছু পরিত্যাগ করে সর্বক্ষেত্রে ভারতীয় হতে হবে । স্বরাজ সম্পর্কে গান্ধীজীর এই আদর্শ ভারতবাসীর কাছে তাকে এক মহান নেতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন । 

৫) কংগ্রেস নেতৃত্বের শূন্যতা : 

গান্ধীজীর যখন ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন ভারতে সুযোগ্য নেতৃত্বে অভাব ছিল । গোপালকৃষ্ণ গোখলে তখন লোকান্তরিত হয়েছিল  এবং বালগঙ্গাধর তিলক তখন মৃত্যুর পথযাত্রী । চিত্তরঞ্জন দাস এবং মতিলাল নেহেরু ছিলেন তখন কংগ্রেসের একমাত্র আশা ভরসা । কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তখন নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের দ্বন্দ্ব চলছিল । এই অবস্থায় গান্ধীজীর সহজেই আপন ব্যক্তিত্ব দ্বারা নেতৃত্তের শূন্যতা পূরণ করেন । 

সুতরাং দেখা যায় যে , বিশ শতকের প্রথম ভাগে গান্ধীজী তার সুমহান ব্যক্তিত্ব , আদর্শ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভারতের রাজনীতির শীর্ষে চলে আসেন । ১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভারতেই মানে ছিল গান্ধী এবং গান্ধী মানে ভারতবর্ষ । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) গান্ধীজীর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে কি জানো ? 

#) গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন সম্পর্কে যা জানো লেখ । 

#) রাওলাট বিল বিরোধী আন্দোলনে গান্ধীজীর ভূমিকা কি ছিল ? 

#) জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কি জানো ? 

#) গান্ধীজীর জনপ্রিয়তার কারণ কি ছিল ? 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

# ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে কিভাবে মহাত্মা গান্ধীর আর্বিভাব ঘটেছিল ? 

#) গান্ধীজীর জনপ্রিয়তার কারণ সমূহ আলোচনা করো । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 3 =