রাওলাট আইন, ১৯১৯

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতে সন্ত্রাসবাদি আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে । বঙ্গভঙ্গ রদ করার আন্দোলন মোকাবেলায় সরকার যেসব নির্যাতন দমন-মূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন তার ফলশ্রুতিতে উদ্ভব ঘটেছিল এ আন্দোলনের । প্রথম মহাযুদ্ধের বছরগুলোতে সন্ত্রাসবাদে আন্দোলন চরমে পৌঁছে । এ আন্দোলন দমন করার লক্ষ্যে সরকার জরুরি আইন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন চালু করেন । এগুলোর মধ্যে যুদ্ধকালীন ভারতে রক্ষা আইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । এ আইনের কার্য মেয়াদ শেষ হবার পর যুদ্ধোত্তর বিপ্লবী আন্দোলন ও গণ অসন্তোষ দমনের জন্য সরকার আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের তৎপর হোন । এ ব্যাপারে তদন্ত করে রিপোর্ট প্রদানের জন্য সরকার আইন সচিব মি রাওলাটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন । ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে কমিটি তার রিপোর্ট পেশ করেন । এই রিপোর্টে বিপ্লবী তৎপরতা মোকাবেলার দুই ধরনের আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয় । সরকার কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দুইটি বিল তৈরি করেন । এ দুইটি বিল রাওলাট বিল  বা কালাকানুন নামে পরিচিত । ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিল দুটি ভারতীয় আইনসভা পাস হয় । প্রথম রাওলাট বিলে  রাজদ্রোহ মামলা বিচারের জন্য একটি নতুন বিচারালয় গঠন করার প্রস্তাব করা হয় । দ্বিতীয় বিলে রুদ্ধদ্বার আদালতে বিনা উকিল এর সাহায্যে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিচার করে অন্তরীণ বা বিনাবিচারে আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয় । অর্থাৎ এই বিধি প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার জাতীয় আন্দোলন স্তব্ধ করার ক্ষমতা পায় । গান্ধীজী এই আইনের সমালোচনা করে বলেছিলেন  “ আপিল নেহি , দলিল নেহি , আপিল নেহি ।” রাওলাট আইন পাস হওয়ার সময় আইন সভায় ভারতীয় সদস্য শঙ্কর নায়ার এ আইনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন । গান্ধীজী এই আইনের প্রতিবাদে সত্যাগ্রহ’ অভিযান শুরু করেন । ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে এই আইনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে একদিন অভূতপূর্ব সাফল্যের সঙ্গে হরতাল পালিত হয় । তবে এ হরতাল সকল স্থানে অহিংস ছিল না । ভারতের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে হরতালকারীদের সংঘর্ষ হয় । দিল্লিতে পুলিশ জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে । হান্টার কমিটির প্রতিবেদনে জানা যায় যে , রাওলাট আইন বিরোধী আন্দোলনে দুইজন কর্মচারীসহ আটাশ জন আন্দোলনকারী মৃত্যু হয় এবং প্রায় দেড়শ জন আহত হন । পশ্চিম ভারতে বিশেষ করে পাঞ্জাবে রাওলাট বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে । গান্ধীজিকে দিল্লিও পাঞ্জাবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় । গান্ধীজিকে দিল্লিও পাঞ্জাবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় । গান্ধীজী সরকারের আদেশ অমান্য করে দিলে অভিমুখে যাত্রা করলে পথিমধ্যে তাকে আটক করা হয় । গান্ধীজীর গ্রেফতারের সংবাদ এ সমগ্র ভারতে দারুন উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং স্থানে স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটে । এ সময় রাওলাট আইনের প্রতিবাদ করায় পাঞ্জাবের অমৃতসরে দুজন জনপ্রিয় নেতা ডঃ সত্যপাল ও ডক্টর কিচলিউকে গ্রেফতার করা হয় । এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে অমৃতসরে  হরতাল পালিত হয় । অমৃতসরের হলগেট সেতুর কাছে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয় । এই গুলি বর্ষণে প্রায় ৩০ জন লোকের মৃত্যু ঘটে । এই ঘটনার সমগ্র পাঞ্জাব স্তম্ভিত হয় । পাঞ্জাবের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে বেসামরিক কর্তৃপক্ষ অমৃতসরের  শাসনভার সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করেন । ১৯১৯ মালের ১২ এপ্রিল,  জেনারেল ডায়ার অমৃতসরের শাসনভার গ্রহণ করেন । ১৩ এপ্রিল ও মিসরের নাগরিকগণ জালিয়ানওয়ালাবাগে এক জনসমাবেশ আহ্বান করেন । প্রায় দশ  হাজার লোক এই সমাবেশে যোগদান করেন।  এই সমাবেশে পূর্ব হুঁশিয়ারি ছাড়াই জেনারেল ডায়ার জনতার উপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে নির্দেশ দেন । গুলি বর্ষণের ফলে প্রায় ১ হাজার লোকের মৃত্যু হয় । এঘটনায় সমগ্র দেশ শিহরিত হয় । সর্বত্র প্রতিবাদি সভা ও হরতাল পালিত হয় । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে , “ জালিয়ানওয়ালাবাগ সমগ্র ভারতে এক মহাযুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে ।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ঘটনার প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া “নাইট ” উপাধি ত্যাগ করেন । এ ঘটনার তদন্তের জন্য কংগ্রেস একটি কমিটি গঠন করে । এ কমিটি হত্যাকাণ্ডের জন্য জেনারেল ডায়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে । কিন্তু ভারত সরকার ডায়ারের কার্যকলাপ সম্পূর্ণ সমর্থন করেন । 

ইতিপূর্বে রাওলাট বিরোধী আন্দোলন ক্রমশঃ সহিংস হয়ে উঠলে গান্ধীজী  ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে রাওলাট সত্যাগ্রহ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন । 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : 

#) ১৯১৯ সালে রাওলাট আইন প্রণয়নের পটভূমি লেখ । 

#) রাওলাট আইন কি ? 

#) জালিয়ানওয়াবাগের হত্যাকান্ড সম্পর্কে কি জানো । 

#) জালিয়ানওয়াবাগের হত্যাকাণ্ডের ফলাফল কি হয়েছিল ? 

রচনামূলক প্রশ্ন : 

#) রাওলাট আইনের পটভূমি আলোচনা করো । 

#) রাওলাট আইন বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে কি জানো লেখ । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 × 1 =