খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন একটি গেীরবোজ্জল ও যুগান্তকারী অধ্যায় । এ আন্দোলন ভারতের শহরে ও গ্রামাঞ্চলে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিল । নানাবিধ কারণে এ আন্দোলন ব্যর্থ হয় , তথাপি এ আন্দোলন পরবর্তীকালে ভারতে হিন্দু-মুসলমানদের  এক বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিল ।

খিলাফত আন্দোলন :

ভারতীয় মুসরমানদের মধ্যে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের মনোভাব প্রবল ছিল । ভারতীয় মুসলমানের কাছে তুরস্কের খিলাফত ছিল মুসলিম জাহানের ঐক্যের প্রতীক । তারা তুরস্কের সুলতানকে খলিফা এবং ইসলামের রক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধা করতেন ।  ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তুরস্ক জার্মানির পক্ষে যোগদান করে ।   এ অবস্থায় ভারতীয় মুসরমানগণ এক অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হয় । কারণ একদিকে তারা তুরস্কের সুলতানের প্রতি ধর্মীয়ভাবে অনুগত ছিলেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন । তুরস্কের ভাগ্য সম্পর্কে মুসলমানরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, এ যুদ্ধ কেবলমাত্র তুর্কী সরকারের বিরুদ্ধে , খিলাফতের বিরুদ্ধে নয় । ব্রিটিশ সরকার সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দেন যে, ইসলামের পবিত্রতম স্থানসমূহের মর্যদা রক্ষা করা হবে । সরকারের এ প্রতিশ্রুতিতে ভারতীয় মুসলমানগণ বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন । কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের কাছে দেওয়া প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন । গ্রিসের হাতে তুলে দেওয়া হয় তুরস্কের অধিকারভুক্ত থ্রেস । প্যালেস্টাইন সহ মধ্যপ্রাচ্যের  “ফার্টাইল ক্রিসেন্ট “ বৃটেন হস্তগত করে । গ্রিক বাহিনী স্মার্ণায় অনুপ্রবেশ করে । এসব ঘটনায় মুসলমানরা চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয় ।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে জার্মানি পরাজিত হয় এবং জার্মানির পরাজিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের পরজয় ঘটে । ফলে ইংরেজরা তুরস্ক সাম্রাজ্য ( অটোমান সাম্রাজ্য ) ব্যবচ্ছেদের পরিকল্পনা করে ।

১৯১৯ সালে বোম্বাই শহরের কতিপয় মুসলমান ব্যবসাদার খলিফার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য মজলিশ-ই-খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন । একই বছরে উত্তর প্রদেশের মুসলিম নেতা মেীলানা আব্দুর বারি লক্ষ্নেীতে একটি সর্বভারতীয় মুসলিম বৈঠক আহ্বান করেন । এই বৈঠকে সর্বভারতীয় মুসলিম বৈঠক আহ্বান করেন । এই বৈঠকে সর্বভারতীয় খিলাফত কমিটি গঠিত হয় । বোম্বাইতে খিলাফত কমিটির প্রধান দফতর স্থাপিত হয় এবং এর শাখা বিভিন্ন প্রদেশে খোলা হয । ১৯১৯ সালের ১০ অক্টোবর সারা ভারত জুড়ে খলিফার জন্য একটি প্রার্থনা দিবস পালন করা হয় । বাংলায় এ.কে. ফজলুল হক ও মনিরূজ্জামানের নেতৃত্বে হকের সভাপতিত্বে দিল্লিতে সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এ সম্মেলনে গান্ধীসহ বহু কংগ্রেস নেতা যোগদান করেন । গান্ধী এক বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে মুসলমানদের সমস্ত দাবী দাওয়া সমর্থন করে কংগ্রেস ও হিন্দুদের সর্বপ্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন । 

খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন কমিটির মূল দাবি ছিল তিনটি – ১) খলিফা অর্থাৎ তুরস্কের সুলতানের পার্থিব ও ধর্মীয় অধিকার এবং সম্মান রক্ষা করা ; ২) আরব , সিরিয়া , ফিলিস্তিন ও মেসোপটেমিয়ার উপর খলিফার আধিপত্য বজায় রাখা ; ৩) মুসলমানদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কা-মদিনার উপর বিদেশি হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করণ। 

১৯১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আলী ভ্রাতৃদ্বয় ও আবুল কালাম আজাদের জেল থেকে মুক্তি লাভের ফলে খেলাফত আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় । এ সময় লক্ষ্নেীতে মাওলানা শওকত আলীর সভাপতিত্বে খেলাফত দ্বিতীয় বৈঠক বসে । এ বৈঠকে তুরস্ক খলিফার ব্যাপারে মুসলমানদের মনোভাব জানানোর জন্য বড়লাট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নিকট একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর প্রস্তাব গৃহীত হয় । এর প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসাবে ড. আনসারীর নেতৃত্বে হিন্দু ও মুসলমানদের একটি মিলিত প্রতিনিধি দল ১৯২০ সালের ১৯ জানুয়ারি বড়লাট চেমসফোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন । বড়লাট প্রতিনিধিদলকে তার সহানুভূতির কথা জানালেও একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে , জার্মানিকে সমর্থন করার জন্য তুরস্ককে তার প্রাপ্য শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে । ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ মাওলানা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে একটি ভারতীয় প্রতিনিধি দল ইউরোপে গমন করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর লয়েড জর্জ ও মিত্রশক্তির উন্নয়নে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তুরস্কের খেলাফতের ব্যাপারে ভারতীয় মুসলমানদের তীব্র মনোভাব ব্যক্ত করে । কিন্তু মিত্রশক্তি অথবা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কেউ এ প্রতিনিধিদলকে গুরুত্ব প্রদান করেননি । ফলে প্রতিনিধিরা ব্যর্থ হয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন । এতে ভারতে মুসলমানদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আরো তীব্র জোরদার হয় । ১৯২০ সালে ১৯ মার্চ সমগ্র ভারতে  খিলাফতের দাবিতে হরতাল পালিত হয় । সারা দেশে বহু খিলাফত কমিটি গঠিত হয় । 

১৯২০ সালের ১৪ মে সেভার্সের চুক্তির শর্তাদি প্রকাশিত হয় । এই চুক্তির মূল কথা ছিল তুর্কি সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়া হবে এবং আরব দেশগুলো জাতিপুঞ্জের অছি ( Mandaroty ) শাসনাধীনে থাকবে । এ ঘটনায় ভারতীয় মুসলমানরা আরো উত্তেজিত হয় । সেভার্স চুক্তির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ১৯২০ সালের জুন মাসে ( ১,২ ও৩ তারিখ ) এলাহাবাদে কেন্দ্রীয় খেলাফত কমিটির উদ্যোগে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । সম্মেলনে খিলাফত কমিটি মুসলমানদের দাবির পুনরাবৃত্তি করে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে । একই বছর জুন মাসে খিলাফত কমিটি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে , যথা ব্রিটিশ পণ্য ও পদবী বর্জন , আইনসভার সদস্যপদ ত্যাগ , পুলিশ ও সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ এবং খাজনা দেওয়া বন্ধ ইত্যাদি কার্যকলাপ শুরু করে । এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মহাত্মা গান্ধী ও ৬ জন মুসলিম নেতার সমন্বয়ে একটি সাব কমিটি গঠিত হয় । গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে । এ সময় গান্ধীজি ব্রিটিশের দেওয়া ‘ কাইজার-ই-গিন্দ ‘ স্বর্ণপদক ফেরত দেন । 

খেলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ : 

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে যে হিন্দু মুসলিম ঐক্য ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয় তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । নানা কারণে খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয় । 

প্রথমত , ১৯২৪ সালে তুরস্কের কামাল পাশা খিলাফত ভেঙ্গে দিয়ে তুরস্ককে আধুনিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন । এর ফলে খিলাফত আন্দোলন তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে । 

দ্বিতীয়ত, অসহযোগ আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করলে গান্ধীজী ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন । এর ফলে খিলাফত আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে । 

তৃতীয়ত, ব্রিটিশ সরকার আলী ভ্রাতৃদ্বয়কে গ্রেফতার করলে আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে । 

চতুর্থত , মুসলিম লীগ ও এর নেতৃবৃন্দ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি । ফলে একে ভারতের সকল মুসলমানদের আন্দোলন হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি ।

পঞ্চমত , এ আন্দোলনের কর্মসূচিতে কৃষক-শ্রমিকের কোন দাবি-দাওয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি । ফলে বিশাল জনগোষ্ঠী এই আন্দোলনে আগ্রহ দেখায়নি । 

খিলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব : 

বিভিন্ন কারণে খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে খিলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য । কারণ এই আন্দোলন সর্বপ্রথম ভারতে হিন্দু মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিত্তিভূমি সৃষ্টি করেছিল । ইংরেজ সরকারের ‘ ভাগ কর ও শাসন করো ‘ নীতি ভারতের হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে চরম রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল । কিন্তু গান্ধীজী , প্রখ্যাত আলী ভ্রাতৃদ্বয় মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা খিলাফত আন্দোলনের ফলে ভারতে হিন্দু মুসলমান ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক রাজনৈতিক আবহাওয়া সৃষ্টি হয় । ১৮৫৭-৫৮ সালের মহাবিদ্রোহের পর এই ধরনের হিন্দু মুসলিম ঐক্য এর আগে কখনো চোখে পড়েনি । হিন্দু মুসলমানদের রাজনৈতিক ঐক্য ইংরেজ সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল । 

খিলাফত আন্দোলন সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে গান্ধীজীর ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল । তিনি হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র ভারতের নেতার মর্যাদা লাভ করেছিলেন । মুসলমানদের তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু । কংগ্রেসের ঘরোয়া রাজনীতিতে তিনি এ সময় থেকেই একাধিপত্য স্থাপন করার সুযোগ পান । 

কোন আন্দোলনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় নাই । খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি । এই আন্দোলন মুসলিম জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিল । স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মুসলিম যুবকদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে এবং ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে উপদেশ দিয়েছিলেন । খিলাফত আন্দোলন তার এই উপদেশ অগ্রাহ্য করা হয় । খেলাফত কে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল । K.K Aziz এর ভাষায়, “ The Khalifat movement destroyed the myth of Muslim loyality .” 

অসহযোগ আন্দোলন: 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, যুদ্ধ অবসানের পর ভারতে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন করা হবে। ভারতীয় জনগণ সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ বল ও জনবল জুগিয়ে সরকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করে । গান্ধী নিজেই ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে সৈন্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালায় । কিন্তু যুদ্ধের অনতিকাল পরে শাসকগোষ্ঠী ভারতে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করে । ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন ভারতবাসীকে সন্তুষ্ট করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় । এই আইনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস “ সত্যগ্রহ “ আন্দোলন শুরু করলে সরকার আন্দোলনের গতিধারাকে স্তব্ধ করার জন্য কুখ্যাত “ রাওলাট আইন” পাস করে । এই আইন অনুযায়ী যে কোন ব্যক্তিকে যে কোন মুহূর্তে কারনে-বিকারনে বিনা-বিচারে আটক রাখা যেত । গান্ধীজী এ আন্দোলনের প্রতিবাদে সত্যগ্রহ আন্দোলন শুরু করে । রাওলাট আইনের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের ১৩ মার্চ দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয় । স্থানে স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামার শুরু হয় । ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ও অমৃতসরের শাসনকর্তা জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে সুসজ্জিত সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের জালিয়ান ওয়ালাবাগের নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালিয়ে শত শত লোককে হত্যা করে । এ  নিশংস ঘটনা সমগ্র ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে এক দারুন ঘৃনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে । এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেন  “ Jallinwalabagh Kindled a conflagration throughout India.” কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘটনার প্রতিবাদে  “ নাইট “ উপাধি বর্জন করেন । এরূপ অবস্থায় কংগ্রেস স্বশাসনের দাবিতে দেশব্যাপী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । কলকাতা ও নাগপুর সম্মেলনে কংগ্রেস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন । কর্মসূচির মধ্যে ছিলঃ ১) বিদেশি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহার ; ২) খেতাব ও পদবী বর্জন ; ৩) স্কুল-কলেজ আদালত, পরিষদ এবং চাকুরী বর্জন ইত্যাদি । এসব বয়কট কর্মসুচি ছাড়াও কংগ্রেস গঠনমূলক কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল । এর মধ্যে ছিল ব্রিটিশ আদালতের পরিবর্তে পঞ্চায়েত গড়ে তোলা , চরকায় সুতা কাটার উৎসাহ দান , সাম্প্রদায়িক সাম্প্রতী বজায় রাখা , অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ইত্যাদি । 

১৯২০ সালের জুন মাসে এলাহাবাদে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির উদ্যোগে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । খিলাফত কমিটির উদ্যোগে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । গান্ধীজী তার কংগ্রেস দলের মধ্যে কিছু বিরোধিতা সত্ত্বেও মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলনের সাথে সহযোগিতা করতে কংগ্রেসকে রাজি করাতে সক্ষম হন । এভাবে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন সম্মিলিত হয় । এলাহাবাদ সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরুর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । এই সম্মিলিত আন্দোলনের নেতৃত্ব অর্পিত হয় মহাত্মা গান্ধীর উপর । খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ভারতের হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে । গান্ধীজী খেলাফত আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের নানা স্থানে সভা-সমিতি আহ্বান করে জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন । ছাত্র-ছাত্রীরা ইস্কুল কলেজ ছেড়ে আসে । একটি হিসেব থেকে জানা যায় ,  ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসেই ৯০,০০০ ছাত্র-ছাত্রী স্কুল কলেজ ছেড়ে এই আন্দোলনে যোগদান করে । ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে বাংলার অধিকাংশই কলেজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । এ সময় চিত্তরঞ্জন দাস বলেছিলেন, “ Education can wait, Swaraj can not,” বিদেশী পণ্য সামগ্রী বর্জন ও পুড়িয়ে ফেলার শুরু হয় এবং সমগ্র স্বদেশী পণ্য দ্রব্য ব্যবহারের হিড়িক পড়ে যায় । গান্ধীজীর আহবানে আইনজীবীগণ আদালত ত্যাগ করেন । নামজাদা আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন মতিলাল নেহেরু , চিত্তরঞ্জন দাস , রাজেন্দ্র প্রসাদ, সৈফুদ্দিন কিচলু, বল্লভভাই প্যাটেল, সি. রাজাগোপালাচারী ইত্যাদি । আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় পরিত্যাগ করে ‘ জমিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া’ নামে নতুন এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে । ১৯২১ সালে কংগ্রেসের চেষ্টায় কাশি বিদ্যা পাঠ , বারানসী বিদ্যাপীঠ, কলকাতা জাতীয় মহা বিদ্যালয় স্থাপিত হলে সর্বত্র এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা দেখা যায় । আচার্য নরেন্দ্র দেব , রাজেন্দ্র প্রসাদ , জাকীর হোসেন ও সুভাষচন্দ্র বসুর মতো শিক্ষাবিদ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অধ্যাপনার কাজে এগিয়ে আসেন । জানাজায় অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রায় ৮০০ টি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, অন্যদিকে পঞ্চায়েত আদালতের মাধ্যমে বিচারকার্য শুরু হয় । 

কিন্তু খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে যে হিন্দু মুসলিম ঐক্য ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয় তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । অচিরেই এ আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ না হওয়ায় সহিংস রূপ গ্রহণ করে । অনেক স্থানে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয় । ১৯২১ সালের আগস্ট মাসে দক্ষিণ ভারতের মালাবারের মুসলিম কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে কয়েকজন ইউরোপীয় ও বহু হিন্দুকে হত্যা করে । ১৯২২ সারের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের কাছে চেরিচেীরা থানায় এক হিংস্র জনতা ২১ জন পুলিশকর্মীকে জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করে । এসব ঘটনায় গান্ধীজি ভীষণ মর্মাহত হন এবং সিদ্ধান্তে আসেন যে , দেশবাসী অহিংস সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয় । এ পরিস্থিতিতে তিনি, ১৯২২ সারের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন । 

গান্ধীজীর এই ঘোষণায় গোটা দেশে হতাশার সৃষ্টি হয় । মতিলাল নেহেরু, জহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু , আন্দোলন প্রত্যাহারকে জাতীয় বিপর্যয় বলে বর্ণনা করে । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জেলে বসে আক্ষেপ করে বলেন যে  “ সারা জীবনের মতো এই সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল ।” কংগ্রেস নেতা লালা লাজপৎ রায় দুঃখ করে বলেন যে , আমরা একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলাম । গান্ধীজী দেশের গৌরব ও সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন । খেলাফত নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ক্ষুব্দ হয়ে মন্তব্য করেছেন যে , “ এ হচ্ছে আত্মসমপর্ণের নামান্তর । ১৯২২ সালে গান্ধীজিকে গ্রেফতার ও ৬ মাসের কারাদণ্ডের দণ্ডিত করা হয় । ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের উপর নির্যাতন নিপীড়ন শুরু করে । ফলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে । অন্যদিকে তুরস্ক মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও নবজাগরণ দেখা দেয় । ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সুলতান চতুর্থ মুহাম্মদ পদচ্যুত হন এবং কামাল পাশার নেতৃত্বে নতুন তুরস্ক সরকার গঠন হয় । ১৯২৪ সালে কামাল পাশার তুরস্ক থেকে রাজতন্ত্র ও খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে তুরস্ককে একটি আধুনিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন । এর ফলে খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায় । 

অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব ও ফলাফল : 

১৯২২ সালের মার্চ সাসে অসহযোগ আন্দোলনের অবসান ঘটে । বিশ্বের ইতিহাসে এই আন্দোলন ছিল সর্বপ্রথম সামরিক শক্তিতে বলিয়ান বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র ভারতবর্ষের সংগ্রাম । এ আন্দোলনের স্বরাজ অর্জনে ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল । 

১) এ আন্দোলনের ফলে ভারতের জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাগরণের সঞ্চার হয় । ইংরেজরা সম্পর্কে জনগণের ভয় অনেকাংশেই কেটে যায় । ভারতীয় জনগণ ক্রমশঃ হতাশামুক্ত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে । 

২) এতদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয় তা প্রধানত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতো । কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনে কৃষক , শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে । এটা নিঃসন্দেহে আন্দোলনের একটা বড় অবদান । ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার যথার্থই বলেছেন  “ The Movement served as baptism of fire which initiated the people to a new confidence in their power to fight for freedom. As a result the Congress movement for the first for freedom. As a result the Congress movement for the first for freedom. As a result the Congress movement for the first time became a really mass movement.” 

৩) ১৮৮৮ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডাফরিন মন্তব্য করেছিলেন যে  “ কংগ্রেস হচ্ছে এমন এক সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান , যাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয় । অসহযোগ আন্দোলনের প্রমাণ করলো এ ধরনের ধারণা ভিত্তিহীন । 

৪) অসহযোগ আন্দোলনের ফলে জাতীয় কংগ্রেসের শক্তি ও প্রচার বৃদ্ধি পায় এবং কংগ্রেস সুসংবদ্ধ ও সুনিয়ন্ত্রিত সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । এ আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত কংগ্রেস সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন এর মাধ্যমে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষপাতী ছিল । কিন্তু এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস সর্বপ্রথম সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় । 

৫) এ আন্দোলনের ফলে কংগ্রেস দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে । গান্ধীজীর আইন সভা বর্জন নীতির প্রতিবাদে চিত্তরঞ্জন দাস , মতিলাল নেহেরু প্রমুখ কংগ্রেস নেতা কংগ্রেস ত্যাগ করে “স্বরাজ পার্টি” নামে পৃথক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন । 

৬) এ আন্দোলনের ফলে ভারতে হিন্দু মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হয় । গান্ধীজীর কর্তৃক হঠাৎ করে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার মুসলমানদের ক্ষুব্দ করেছিল । ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় । এক চরম হতাশা ও বেপরোয়া মনোভাব জাগিয়ে আক্রমণ করে । রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের পথ আলাদা হয়ে যায় । 

পরিশেষে বলা যায় যে , অসহযোগ আন্দোলন ইংরেজ শাসকদের মনে এক গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে । ভারতের সকল শ্রেণীর জনগণের প্রতি তাদের অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠে । ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যত নিয়েও তাদের মনে সংশয় সৃষ্টি হয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

× 9 = 36