বেঙ্গল প্যাক্ট , ১৯২৩

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক মৈত্রীপূর্ন ছিল । কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর এদেশের হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবনতি শুরু হয় । খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় সমগ্র ভারতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল । কিন্তু এই আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিরোধ তীব্রভাবে দেখা দেয় । দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয় । হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যবধান যখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল তখন বাংলার কয়েকজন বিখ্যাত নেতা ও উদার ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা নিরসন কল্পে আলোচনা শুরু করেন এবং একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেন । এসব নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ , শরৎচন্দ্র বসু , যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত . ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, ফজলুল হক , এইচ.এম. সোহরাওয়ার্দী , স্যার আব্দুর রহিম , মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য । 

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন অসম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন কংগ্রেসের একজন জনপ্রিয় নেতা । অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের সাথে তার মতানৈক্য দেখা দেয় । এ সময় সি.আর.দাস ও মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের একাংশ ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নিয়ে আইন পরিষদে যোগ দেওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন । আইন সভায় যোগ দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সংস্কার আইনকে বানচাল করে দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য । কিন্তু রাজা গোপালাচারী , কস্তরীরঙ্গ আইয়ার, ড. আনসারী প্রমুখ কংগ্রেস নেতা চিত্তরঞ্জনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন যে , কাউন্সিলে যোগ দিলে কার্যতঃ গান্ধীজী কর্তৃক গৃহীত আইন সভা বয়কট নীতি পরিত্যাগ করা হবে । এর ফলে কংগ্রেস একটি আদর্শ ভ্রষ্ট দল হিসেবে পরিগণিত হবে । ১৯২২ সালের গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে সি.আর. দাস কাউন্সিলে যোগদানের স্বপক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ করেন। কিন্তু অধিবেশনে রাজাগোপালাচারী আনীত কাউন্সিল বয়কট প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হলে সি.আর.দাস,  মতিলাল নেহেরু কে সাথে নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক দল “ স্বরাজ পার্টি “ গঠন করেন । অল্পদিনের মধ্যে স্বরাজ পার্টির সদস্যগণ বাংলা প্রদেশিক কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং সি. আর.দাস ও সুভাষ বসু যথাক্রমে এর সভাপতি ও কর্মসচিব  নির্বাচিত হন । সি.আর.দাস একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং বাস্তবধর্মী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন যে, তার পরিকল্পনাকে সফল করতে হলে বাংলা ব্যবস্থাপক সবাই মুসলমান সদস্যদের সাহায্য ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন । তাছাড়া , তিনি মুসলমানদের নির্যাতনের স্বীকার করতেন এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে তাদের সহযোগিতার প্রয়োজন তা বিশ্বাস করতেন । এ সময় বাংলার প্রখ্যাত দুজন নেতা ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সি.আর.দাসের সাথে সহযোগিতা করতে সম্মত হন । হিন্দু-মুসলিম স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় খুব শীঘ্রই তাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এ চুক্তি “ বেঙ্গল প্যাক্ট “ নামে পরিচিত ।

বেঙ্গল প্যাক্টের শর্তগুলো নিম্নরূপঃ 

১) লোক সংখ্যার অনুপাতে ও স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথায় বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক পরিষদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হবে । 

২) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গুলোতে প্রত্যেক জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়  শতকরা ৬০টি আসন পাবে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শতকরা ৪০ টি আসন পাবে । 

৩) দফতরে মুসলমানরা শতকরা ৫৫টি চাকুরী এবং ও মুসলমানরা শতকরা ৪৫ টি চাকুরী লাভ করবে । 

৪) ব্যবস্থাপক পরিষদের কোন সম্প্রদায়ের ধর্ম বিষয়ে কোনো আইন পাস করতে হলে সে সম্প্রদায়ের ৩/৪  অংশ সদস্যদের সমর্থন থাকতে হবে । 

৫) মুসলমানদের ধর্মীয় উপাসনালয় মসজিদের সামনে দিয়ে গান-বাজনা সহকারে কোনো মিছিল করা হবে না । মুসলমানদের গোহত্যার বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না । 

পরিশেষে , এই প্যাক্টে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের স্বায়ত্বশাসন  প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায় নিজ নিজ অধিকার লাভ করবে । 

গুরুত্ব : 

বাংলাদেশি হিন্দু মুসলিম রাজনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতায় স্থাপনের ক্ষেত্রে বেঙ্গল প্যাক্টের গুরুত্ব অপরিসীম । এ চুক্তিতে মুসলমানদের প্রথা  সদাচরণ , তাদের ন্যায্য অধিকার ও ধর্মীয় মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব প্রদর্শন করা হয় । ফলে এই চুক্তি বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের সম্প্রীতির ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে । বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান কল্পে সি.আর. দাসের বাস্তব পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে । বেঙ্গল প্যাক্ট এর ফলেই বাংলায় স্বরাজ পার্টি  সি.আর.দাসের নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে বহু প্রস্তাব পাস করতে এবং অনেক প্রস্তাব বাতিল করতে সমর্থ হয় । 

বেঙ্গল প্যাক্ট এর ফলেই স্বরাজ পার্টি বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে । বাংলার ৮৫টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে এ দল ৪৭টি আসন লাভ করে । কলকাতায় করপোরেশন নির্বাচনেও স্বরাজ পার্টি ৩/৪ অংশ আসন দখল করে । সি.আর.দাস মেয়র এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী  ডেপুটি মেয়র নিযুক্ত হন । বেঙ্গল প্যাক্টের সূত্র অনুযায়ী কলকাতা কর্পোরেশনের চাকরিতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয় । ২৫ জন মুসলমান নিযুক্ত হন । 

ব্যর্থতার কারণ : 

১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট ব্যর্থ হওয়ার পেছনে নিম্নে বর্ণিত কারণগুলো দায়ী ছিল । 

১) ভারতীয় পত্রিকাগুলো বেঙ্গল প্যাক্টের বিরূপ আলোচনা করে । সপ্তাহিক “ The Englishman “ পত্রিকায় বলা হয় , মুসলমান সমর্থকদের ঘুষের প্রস্তাব এর ফলে চিত্তরঞ্জন দাস বেঙ্গল প্যাক্ট করেন । কলকাতা হিন্দু পত্রিকাগুলো চুক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালাতে থাকে । হিন্দু প্রেস বেঙ্গল প্যাক্টের সমালোচনা করে বলেন যে , সি.আর.দাস মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাকে বিক্রি করেছেন । 

২) রক্ষণশীল হিন্দুরা বেঙ্গল প্যাক্টকে সমর্থন করেননি । কারণ তাদের মতে , এটি ছিল একটি জোড়াতালি ব্যবস্থা । হিন্দু মহাসভা চুক্তির বিরুদ্ধে কলকাতা বিক্ষোভ মিছিল করে । 

৩) ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের কোকনাদ অধিবেশনে বেঙ্গল চুক্তি সম্পর্কে বিতর্ক হয় । কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের ব্যাপারে কোন প্রদেশের চুক্তি মেনে নিতে অস্বীকার জানায় । এতে মুসলমান নেতাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় । অন্যান্য দলের মুসলিম নেতৃবৃন্দ বেঙ্গল প্যাক্টের অসারতা প্রমাণ করতে সুযোগ পান । 

৪) সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে স্বরাজ দলের সম্পর্ক থাকার এর প্রতি মুসলমান প্রতিনিধিদের আস্থা কমে যায় । চিত্তরঞ্জন দাস নিজের সন্ত্রাসবাদের বিরোধী ছিলেন , কিন্তু তার সহচরদের কেউ কেউ সন্ত্রাসবাদীদের সাথে সম্পর্ক রাখছেন । এর ফলে মুসলমান সভ্যগণ বিপদের আশঙ্কা করতেন । 

৫) ১৯২৫ সালের ১৬ জুন চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু হয় । তার মৃত্যুতে স্বরাজ দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয় । তার মৃত্যু দলকে নাবিক বিহীন তরণীর মত দিশেহারা করে দেয় । 

৬) চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর তার সহযোগী জে. এম. সেনগুপ্ত স্বরাজ পার্টির নেতা নির্বাচন হন । কিন্তু তিনি বেশিদিন নেতৃত্ব থাকতে পারেনি । এর পরেই নেতৃত্ব লাভ করেন সুভাষ চন্দ্র বসু । অল্পদিনের মধ্যে স্বরাজ দলের কর্মসূচিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা দেয় । ফলে. সি.আর দাসের প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মুসলিম ঐক্য ভাঙ্গনের সূত্রপাত হয় এবং বেঙ্গল প্যাক্ট অচল হয়ে পড়ে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

÷ 5 = 1