স্বরাজ দল এবং চিত্তরঞ্জন দাস

স্বরাজ দল গঠনের পটভূমি : 

১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে ১৯২০ সালের অনুষ্ঠিত বাংলার প্রথম আইন সভার নির্বাচনে কংগ্রেস অংশগ্রহণ করেননি । সমগ্রদেশের তখন গান্ধীজীর নেতৃত্বে  অসহযোগ আন্দোলন চলছিল । কিন্তু ১৯২২ সালে হঠাৎ করে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন । অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার হলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ , মতিলাল নেহেরু সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন । তাদের অনেকেই জেলে থাকা অবস্থায়ই গান্ধীজীর সংগ্রাম প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন । তারা গান্ধীজীর নেতৃত্বে প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেন । কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর তাদের একটি বিরাট অংশ মতিলাল নেহেরু এবং চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে জাতীয় আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । 

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ১৯২২ সালের জুন মাসে নিখিল ভারতে কংগ্রেস কমিটির এক অধিবেশন শুরু হয় । ইতিমধ্যে খবর আসে যে , আন্দোলন প্রত্যাহার করা সত্তেও ব্রিটিশ সরকার ভারতের নানা স্থানে জনসাধারণের ওপর দমনপীড়ন অব্যাহত রেখেছে । এজন্য অধিবেশনে কংগ্রেস নেতাদের একাংশ আইন অমান্যের কথা ভাবেন । লক্ষ্নেী অধিবেশনের পর কংগ্রেস সভাপতি আইন অমান্যের জন্য দেশবাসী প্রস্তুত আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন । শীঘ্রই কমিটি কংগ্রেস সভাপতির কাছে এই মর্মে রিপোর্ট প্রদান করেন যে , বর্তমানে দেশে আইন অমান্য আন্দোলনের কোনো পরিবেশ নেই । 

এমত অবস্থায় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের একাংশ চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে দাবি জানায় যে , ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইনসভার ভেতর থেকে সরকারকে নাস্তানুবুদ করা হোক । অপরদিকে গান্ধীজীর অনুসারে রাজা গোপালাচারী , কস্তরী রঙ্গ আইয়ার, ড. আনসারী প্রভৃতি নেতা চিত্তরঞ্জনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন যে , আইন সভায় যোগ দিলে কার্যতঃ গান্ধীজী কর্তৃক গৃহীত আইন সভা বয়কট নীতি পরিত্যাগ করা হবে । তাহলে কংগ্রেসও আদর্শ ভ্রষ্ট হয়ে পড়বে । জনগণের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে । অন্যদিকে একবার আইন সভায় প্রবেশ করলে প্রথমে অসহযোগিতা নীতি গ্রহণ করা হলেও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা অনিবার্য হয়ে পড়বে । 

কংগ্রেটস নেতৃবৃন্দর এই বিরোধিতা অবসান হয়  ১৯২২ সালে ডিসেম্বর মাসে আয়োজিত গয়া সম্মেলনে । গয়া সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস স্বয়ং । এই অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন দাস আইনসভা বার কাউন্সিলের যোগদানের স্বপক্ষে জোর সওয়াল করেন । কিন্তু রাজা গোপালাচারী  আনীত কাউন্সিল বয়কট প্রস্তাব  ১৭৪৮-৮৯০ ভোটে পাশ হলে চিত্তরঞ্জন সভাপতির পদত্যাগ করেন । এরপর থেকে কংগ্রেস দুই উপদলে বিভক্ত হয় । চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহেরু ,বিঠল ভাই প্যাটেল , মদনমোহন মালব্য ও জয়কারের সহযোগিতা গঠন করেছেন কংগ্রেটস খিলাফত-স্বরাজ দল বা সংক্ষেপে স্বরাজ দল । চিত্তরঞ্জন হলেন এই দলের সভাপতি এবং মতিলাল হলেন অন্যতম সম্পাদক । এখানে উল্লেখ্য যে , স্বরাজ দল কংগ্রেসের মধ্যে গঠিত হয় । চিত্তরঞ্জন ও তার অনুগামীদের বলা হতো পরিবর্তনশীল । এবং গান্ধীজীর দলকে বলা হতো পরিবর্তন-বিরোধী । স্বরাজ দল গঠিত হওয়ার পর এই দলে বাংলার বিপ্লবীরা এবং সুভাষচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ অনেক যুবনেতা যোগদান করেন । 

স্বরাজ দলের নীতি ও কর্মসূচি : 

স্বরাজ দলের সঙ্গে কংগ্রেসের বড় ধরনের কোনো নীতিগত পার্থক্য ছিল না । কংগ্রেসের অধিকাংশ নীতির প্রতি তাদের আস্থা ছিল । শুধু স্বরাজ অর্জনের পথ কি হবে এ নিয়ে কিছুটা মতভেদ  ছিল । নিম্মে স্বরাজ দলের কর্মসূচি উল্লেখ করা হলোঃ 

১) আইন সভায় প্রবেশ করে সরকারের কাজের বিরোধিতা করা ;

২) বাজেট প্রত্যাখ্যান করা ; 

৩) নানাবিধ বিল ও প্রস্তাব উত্থাপন করে জাতীয়তাবাদের অগ্রগতিকে সহায়তা করা ; 

৪) সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে বিদেশী শোষণ বন্ধ করা । এক কথায় , ১৯১৯ সালের সন্টেগু- চেমসফোর্ড প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থাকে ব্যর্থ করাই ছিল স্বরাজ দলের প্রধান উদ্দেশ্য । স্বরাজ দলের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করা । 

১৯২৩ সালের নির্বাচন : 

খিলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতা এবং অসহযোগ আন্দোলনের অবসানের পটভূমিকায় ১৯২৩ সালে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচনের সর্বত্র স্বরাজ দলের জয়জয়কার হয় । কেন্দ্রীয় আইন সভায় ১০১ টি আসনের মধ্যে এই দল লাভ করে  ৪৫ টি আসন । প্রদেশীক আইনসভাতেও তাদের সাফল্য হলো চমকপ্রদ । বাংলায় ৮৫ টি আসনের মধ্যে তারা ৪৭ টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ; যার মধ্যে ২১ জন মুসলমান সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন । বাংলায় স্বরাজ দলের এই জয়ের কারণ হলো দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব । বাংলা ছাড়াও বোম্বাইতে ( ২টি আসন) , যুক্ত প্রদেশ ( ২৯ টি আসন ) , মধ্যপ্রদেশ ( ৪১ টি আসন ) এবং আসামেও ( ১৩টি আসন ) স্বরাজ দল উল্লেখযোগ্য সদস্য লাভ করেছিল । 

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভার সঙ্গে সঙ্গে স্বরাজ দল পৌরসভার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল । কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে স্বরাজ দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় । চিত্তরঞ্জন দাস কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নিযুক্ত হন এবং সুভাষচন্দ্র বসু হন এর প্রধান কার্য নির্বাহক । মেয়র পদ লাভ করে চিত্তরঞ্জন স্বরাজ দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার নীতি নেন । শিক্ষা , স্বাস্থ্য ,  পয়:প্রণালী প্রভৃতি ক্ষেত্রে স্বরাজ দল উল্লেখযোগ্য কাজ করেন । এলাহাবাদ কর্পোরেশনের জহরলাল নেহেরু ও আমেদাবাদে বল্লভ ভাই প্যাটেল উল্লেখযোগ্য কাজ করেন এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । চিত্তরঞ্জন দাস বঙ্গে মুসলমানদের সাহায্য-সহযোগিতা লাভের জন্য ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষর করেন । এই চুক্তিতে সি.আর.দাস মুসলমানদের সরকারি প্রশাসনে ৫৫% চাকরি , মসজিদের সামনে দিয়ে গান-বাজনা সহকারে কোনো মিছিল না করতে দেওয়া এবং মুসলমানদের গোহত্যার বিষয়ে কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেন । 

বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় স্বরাজ দল নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যারিস্টার র‌্যামফেল  চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে আঁতাত করে । আইন সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় কারণে স্বাভাবিকভাবেই বাংলার ছোটলাট লর্ড লিটন স্বরাজ পার্টির নেতা চিত্তরঞ্জন দাসকে মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ জানান । কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাস দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বলে এই আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করেন । ফলে ছোটলাট সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক , এ. কে. ফজলুল হক এবং গজনবীকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন । 

১৯২৫ সালে সি.আর.দাস আইন সভায় বর্তমান ভূয়া সংবিধানের পরিবর্তে এক “ প্রাণবন্ত ও স্বাধীন সংবিধান ” দাবি জানান । ১৯২৬ সালের ২৩ মার্চ স্বরাজ দলের উৎসাহে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নতুন মন্ত্রীদের বেতন সংক্রান্ত প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হয় । ফলে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। এভাবে চিত্তরঞ্জন দাস ভেতর থেকে দ্বৈতশাসনকে বানচাল করে দিতে সক্ষম হন । এ অবস্থায় বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন ১৯২৬ সাল পর্যন্ত সংবিধান স্থগিত ঘোষণা করেন । 

অপরদিকে , কেন্দ্রীয় আইন সভায় স্বরাজ দল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ , মদনমোহন মালব্য প্রভৃতি নেতার সঙ্গে একত্রিত হয়ে কাজ করার নীতি গ্রহণ করেন । সব মিলিয়ে ৭০ জনের একটি জাতীয় দল গঠন করা হয় । কিন্তু কেন্দ্রীয় আইন সভায় স্বরাজ দল সরকারের বিভিন্ন আইন বিষয়ক প্রস্তাব পাসে নিরন্তন সংশোধনী করা  ও বাধা দান করেও আইনসভা গুলোকে আটকাতে ব্যর্থ হন । ফলে  কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভায় কাজের কাজ কিছু না হওয়ায় স্বরাজ দলের সদস্যরা ক্রমে ক্রমে হতাশ হয়ে পড়েন । 

শীঘ্রই স্বরাজ দলের মধ্যে ঐক্য ফাটল ধরে । ১৯২৪ সালে সুভাষ চন্দ্র বসু ও অন্য ৮০ জন বিপ্লবীকে সরকার গ্রেফতার করে । ফলে স্বরাজ দলের অনেক নেতা আর আইনসভায় থাকা অর্থহীন বলে ঘোষণা করেন । আইনসভা সরকারকে অপদস্ত করে বা পৌরসভা দখল করে যে কাজের কাজ হয় না তা এই দলের নেতারা অচিরেই বুঝতে পারেন । এদিকে চিত্তরঞ্জন দাস ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বাংলা প্রাদেশিক সম্মেলনে স্বাধীনতার পরিবর্তে ডোমিনিয়ন ষ্টেটাস সমর্থন করেন এবং তিনি এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করার কথাও ঘোষণা করেন । চিত্তরঞ্জন দাশের এই ঘোষণা তাঁর সহকর্মী ও অনুগামীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষর সঞ্চার করে । সরকারপক্ষ যখন দাসের পরিকল্পনা কার্যকর করতে আগ্রহ হয় , সে সময় চিত্তরঞ্জন দাস হঠাৎ দার্জিলিং -এ  মৃত্যুবরণ করেন ( ১৯২৫) । তার মৃত্যুর পর স্বরাজ দল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উহার কর্মসূচি হতে বিচ্যুত হয় । অনেক হিন্দু নেতা স্বরাজ দল ত্যাগ করে কংগ্রেসে ফিরে আসেন । এতে মুসলমান নেতৃবৃন্দ মর্মাহত হন । তারা ১৯২৬ সালে “ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি” নামক আলাদা মুসলিম দল গঠন করেন । এই দলের অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন এ.কে. ফজলুল হক , মৌলভী আব্দুল করিম , খান বাহাদুর আজিজুল হক , ড. এ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ । 

স্বরাজ দলের ব্যর্থতার কারণ : 

মহাত্মা গান্ধী কর্তিক অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর এবং গান্ধীজী কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর কংগ্রেস কর্মীদের একাংশ চিত্তরঞ্জন দাস,  মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে স্বরাজ দল গঠন করে । স্বরাজ দল কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভায় যোগ দিয়ে সরকারি নীতির বিরোধিতা করে সরকারকে বিব্রত করার পরিকল্পনা নেন । তারা আশা করেছিলেন সরকার শেষ পর্যন্ত ভারতকে ডোমিনিয়ন ষ্টেটাস দিতে বাধ্য হবেন । কিন্তু স্বরাজ দলের পরিকল্পনা সফল হয়নি । স্বরাজ দলের ব্যর্থতার জন্য নিম্নলিখিত কারণ গুলো দায়ী ছিল :- 

প্রথমত , প্রদেশ ডায়ার্কি ( দ্বৈত শাসন) প্রথাকে অচল করা যায়নি । আইন সভায় সরকারি বাজেট প্রস্তাব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের স্বরাজ দলের সদস্যরা বাধা দিলে গভর্নর তার ক্ষমতা দ্বারা বাজেট ও সরকারি আইন পাস করিয়ে দেন । স্বরাজ দলের বাধাদান নিষ্ফল হয় । 

দ্বিতীয়ত, ডায়ার্কী প্রথা অনুসারে প্রস্তাবিত বিষয়গুলোতে স্বরাজ দলের অনেক নির্বাচিত মন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা না থাকলেও স্বজন-পোষণ দুর্নীতিতে আকৃষ্ট পদের লোভে সরকারকে পদলেহন করতে থাকেন । তার ফলে দলে ভাঙন ধরে । স্বরাজ দল থেকে তিরস্কার করা হলে তারা নতুন দল গড়ার হুমকি দেয় । 

তৃতীয়ত, স্বরাজ দলের ব্যর্থতার একটা বড় কারণ ছিল গান্ধীজীর বিরূপ মনোভাব । কাউন্সিলের রাজনীতি গান্ধীজী কোনদিননেই মন থেকে মেনে নেয় নি । তার মতে , এই যোগদান ছিল অসহযোগ আন্দোলনের আদর্শের পরিপন্থী । গান্ধীজীর পরিচালিত পথ কে উপেক্ষা করে স্বরাজ পন্থীদের আইন সভায় যোগদান জনগণ ভালো চোখে দেখেননি । ফলে জনগণের কাছে স্বরাজ পন্থীদের বিপ্লবী ভাবমূর্তি মলিন হয়ে যায় । 

চতুর্থত , স্বরাজ দলের ব্যর্থতার অপর কারণ হলো এই দলের কাজকর্মের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক ছিল না । সাধারণ মানুষ কাউন্সিলের রাজনীতি বুঝতো না । তাদের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিল না । কিন্তু তখন দেশের যে পরিস্থিতি তাতে সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে কোন আন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল না । 

পঞ্চমত , সরকারও চিত্তরঞ্জন দাসকে একজন দায়িত্বশীল নেতার মর্যাদা দেয় নি । বাংলাদেশ ছোটলাট লর্ড লিটন স্পষ্ট ভাষায় ভারত  সচিবকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে , চিত্তরঞ্জন এমন বড় মাপের নেতা নন যে , তাকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে । 

ষষ্ঠত, সরকারের দমননীতি ও স্বরাজ দলের ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল । সন্ত্রাসবাদীদের দমন করার নামে সরকার বাংলাদেশ  ১৯২৪ সালে এক অর্ডিন্যান্স  জারি করেন এবং কংগ্রেস কার্যালয় ও কংগ্রেস নেতাদের বাড়ির উপর হামলা ও তল্লাশি চালায় । বহু বিপ্লবীও স্বরাজ দলের নেতা কারারুদ্ধ হয় । গান্ধী এই দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন । 

সপ্তমত, ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন এর মৃত্যুর স্বরাজ দলের পতন ডেকে আনে । তার মৃত্যুর পর স্বরাজ দল কান্ডারীহীন হয়ে পড়ে । কেন্দ্রীয় আইন সভায় মতিলাল নেহেরুর সঙ্গে জাতীয়তাবাদী দলের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতভেদ ঘটে । বাংলা নেতৃত্ব নিয়ে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও রবীন্দ্র নাথ শ্বাসমলের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় । সুভাষচন্দ্র বসু জেল থেকে মুক্তি পেলে সেনগুপ্তের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানান । উত্তর প্রদেশে নেহেরু বনাম মদনমোহন মালব্য স্বরাজ দলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় । 

অষ্টমত, দেশবন্ধু বেশিরভাগ এলিটিস্ট রাজনীতি করেন । কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনের ব্যাপারে তিনি বিশেষ উৎসাহ দেখাননি । এ যুগে কৃষক-শ্রমিকদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কাউন্সিলের আন্দোলন দ্বারা স্বায়ত্বশাসন লাভ সম্ভব ছিল না । 

নবমত, চিত্তরঞ্জন দাস বাংলায় হিন্দু-মুসলিম যে প্যাক্ট করেন তাতে ৫৫% চাকরি তিনি মুসলমানদের ছেড়ে দিতে রাজি হন । কিন্তু প্যাক্ট ছিল জোড়াতালি । মুসলিম নেতাদের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি । অপরদিকে, রক্ষণশীল হিন্দুরা এজন্য চলে যান । এটি ছিল একটি সুবিধাবাদী বিবাহ’ যা বেশীদিন টিকেনি । 

দশমত, চিত্তরঞ্জন দাস হিংসার বিশ্বাস করতেন না , তথাপি তিনি বিপ্লবীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেননি । আবার চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে বিপ্লবীদের বনিবনা হয়নি । তিনি দল চালাতে তার সর্বস্ব ব্যয় করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর কেহ এ কাজ করেননি । 

স্বরাজ দলের সফলতা : 

স্বরাজ দল তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বরাজ দলের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য করা যায় না । 

প্রথমত , স্বরাজ দলের সবচেয়ে বড় অবদান অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতার পর দেশ যখন মুহ্যমান ও স্বাধীনতা আন্দোলনের গতি স্তব্ধ হয়ে আসে , তখন এই দলের নেতারাই স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখেছিল । 

দ্বিতীয়ত, আইন সভায় সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখান , বাজেট ও মন্ত্রীদের বেতন নামঞ্জুর করে তাদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে শাসনতন্ত্র অচল করার ব্যাপারে স্বরাজ দলের আদর্শ অনেকাংশে সফল হয়েছিল । 

তৃতীয়ত, আইন সভায় যোগদান করে তারা যেভাবে সুশৃংখলভাবে ও যোগ্যতার সঙ্গে সরকারের কাজ-কর্মের সমালোচনা করেছিলেন , যে বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এর উদাহরণ তারা রেখেছিলেন , তার শুধু সরকারের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেনি , তা আরও প্রমাণ করেছিল যে , ভারতীয় জনগণ দায়িত্বশীল সরকারে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে উপযুক্ত । ইংরেজরা , আগাগোড়াই বলে আসছিল যে , ভারতীয়রা স্বায়ত্তশাসনের উপযুক্ত নয় । স্বরাজ দলের কার্যাবলী ইংরেজদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত করেছিল । 

চতুর্থত , ১৯২৪ সালের রাজনৈতিক কারণে কারারুদ্ধ ব্যক্তিদের মুক্তি এবং বঙ্গদেশে বিবর্তন মূলক ১৮১৯ সালের ৩নং আইনের অধীনে বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির ব্যাপারে স্বরাজ দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল । 

পঞ্চমত , স্বরাজ দলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি । এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য  ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বেঙ্গল প্যাক্ট । কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর স্বরাজ দলের নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উদাসীন থাকেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 3 = 2