আমার পরিচয়

   সৈয়দ শামসুল হক 

আমি জন্মেছি বাংলায় , আমি বাংলায় কথা বলি ,

আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি । 

চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে । 

তেরশত নদীর শুধায় আমাকে , ‘ কোথায় থেকে তুমি এলে ?’ 

আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে । 

আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে । 

আমি তো এসেছি কৈতর্বের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে । 

আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে । 

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে । 

এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির-বেদি থেকে । 

এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমি সোনা মসজিদ থেকে । 

এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে । 

আমি তো এসেছি ”কমলার দীঘি ”  ‘ মহুয়ার পালা’ থেকে । 

আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরীয়ত থেকে । 

আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে । 

এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্য সেনের থেকে । 

এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে । 

এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে । 

এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে । 

আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে । 

আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে । 

এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে । 

শুধাও আমাকে ‘এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে ?’ 

তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির বীজমন্ত্রটি শুনো নাই-

’সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’

একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজও একসাথে থাকবই-

সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবো । 

শব্দার্থ টীকা : আলপথ জমির সীমানার পথ । এখানে হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতির পথ চলার কথা বলা হয়েছে ;চর্যাপদবাংলা ভাষা ও সাহিত্য-ঐতিহ্যের প্রথম নিদর্শন । হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে চর্যাপদ এর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেন । ছয়শ’ শতক খেকে এগারশ’ শতকের মধ্যে পদগুলো রচিত হয়েছে । এই পথ গুলোরমধ্যে প্রাচীন বাংলার অতি সাধারণ মানুষের জীবন চিত্র ফুটে উঠেছে । সওদাগরের ডিঙার বহর মঙ্গলকাব্য চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যের কথা আছে । কবি আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহ্য বুঝাতে এই লোককাহিনীর আশ্রয় গ্রহণ করেছেন । কৈতর্ব বিদ্রোহএকাদশ শতক থেকে আনুমানিক ( ১০৭০-১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে ) মহীপালের বিরুদ্ধে অনন্ত -সামন্ত-চক্র মিলিত হয়েছে বিদ্রোহ করেন তাই আমাদের ইতিহাসের কৈতর্ব বিদ্রোহ নামে খ্যাত । এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন কৈতর্ব সম্প্রদায়ের লোক । তার নাম দিব্য বা দিবোক । বাঙালি জাতির বিদ্রোহের ঐতিহ্য বুঝাতে এই বিদ্রোহের উল্লেখ করা হয়েছে । পালযুগ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপালের রাজ্যশাসনের মধ্য দিয়ে বঙ্গে পাল যুগের সূচনা হয় । তারপর চারশত বছর পাল বংশের রাজত্ব টিকি ছিল । এ সময় শিল্প-সাহিত্যের অসামান্য বিকাশ সাধিত হয় । চিত্রকলাও এই সময়ের সমৃদ্ধি লক্ষ্যযোগ্য । কবি আমাদের শিল্পের সমৃদ্ধি ঐতিহ্য বুঝাতে পাল যুগের চিত্রকলার উল্লেখ করেছেন । পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার বর্তমান নওগাঁ জেলার বদলগাছী থানার পাহাড়পুর গ্রামে এই প্রাচীন বিহার অবস্থিত । ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন । দ্বিতীয় পাল রাজা স্ত্রী ধর্মপালদেব ( রাজত্বকাল ৭৭৭-৮১০ খ্রি. ) এই বিশাল বিহার তৈরি করেছেন। একে সোমপুর বিহার বলাও বলা হয় । পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিহার গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম । কবি আমাদের প্রত্নতাত্ত ঐতিহ্যের পরিচয় দিতে পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের উল্লেখ করেছেন । বরেন্দ্রভূমি সোনামসজিদবরেন্দ্রভূমি সোনামসজিদ বলতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ছোট সোনামসজিদকে বুঝানো হয়েছে । বড় সোনামসজিদ ভারতের গেীড়ে অবস্থিত । হোসেন শাহের ( রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি. ) আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয় । অসাধারণ শিল্পসৌন্দর্যমন্ডিত স্থাপত্যকর্ম হিসেবে সোনামসজিদ অন্যতম । কবি আমাদের মুসলিম ঐতিহ্যের সুমহান নির্দেশনা দিয়ে এটি উল্লেখ করেছেন । দেউল দেবালয়। সার্বভেীম বারোভূঁইয়া বাংলায় পাঠান কোরবানি বংশের রাজত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে খুলনা, বরিশাল, সোনারগাঁও , ময়মনসিংহ ও শ্রীহট্টে স্বাধীন জমিদারদের উত্থান  ঘটে । ১৫৭৫ সাপলে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা জয় করার পর এই স্বাধীন জমিদারগণ ঈশা খাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মূল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় । ইতিহাসে এরাই বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত । এরা হলেন ঈশা খাঁ , চাঁদ রায় , কেদার রায় , প্রতাপাদিত্য , লক্ষণ মানিক প্রমুখ । কমলার দীঘিমৈমনসিংহ গীতিকার একটি পালা । মহুয়ার পালামৈমনসিংহ গীতিকার একটি পালা । তিতুমীর  – চব্বিশ পরগনা জেলার হায়দরপুর গ্রামে ১৭৮২ সালে মঅর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর জন্মগ্রহণ করেন । তিনি অত্যাচারী ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন । ১৮৩১ সালের ১৯শে নভেম্বর ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে তিনি শহীদ হন । হাজী শরীয়তহাজী শরীয়ত উল্লাহ ( ১৭৮১-১৮৪০ খ্রি: ) মাদারীপুর জেলার শিবচর থানায় শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি দীর্ঘকাল মক্কায় অবস্থান করে ইসলাম ধর্ম বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন । তিনি ধর্মকে আশ্রয় করে সকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন । তার এই আন্দোলনকে ফরাযেজি আন্দোলন বলে । এরপর তিনি আব্দুল ওয়াহাব নামক এক ধর্ম সংস্কারের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও ওয়াবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন । তিনি সাধারণ মানুষকে ধর্মের প্রকৃত রূপ ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন । এছাড়া বিদেশী শাসন-শোষণ ; জমিদার , জোতদার ও মহাজনদের অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্তি করার জন্য আন্দোলন করেন । ক্ষুদিরাম ক্ষুদিরাম বসু ( ১৮৮৯-১৯০৮ খ্রি: ) মেদিনীপুর জেলার মেীবনি গ্রামি জন্মগ্রহণ করেন । শৈশব থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অত্যাচারী মেজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে ভুলবশত দুইজন ইংরেজ নারীকে হত্যা করেন । ১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট এই মহান বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয় । সূর্যসেনমাস্টার দা সূর্যসেন ( ১৮৯৩-১৯৩৪ খ্রি: ) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । আজীবন তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন । ১৯৩০ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইংরেজ মুক্ত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । কিন্তু বেশিদিন তা রক্ষা করতে পারেন নি । ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি তার ফাঁসি হয় । জয়নুল জয়নুল আবেদিন ( ১৯১৪-১৯৭৬ খ্রি: ) কিশোরগঞ্জের কেন্দুয়া থানায় জন্মগ্রহণ করেন । “ শিল্পাচার্য “ হিসাবেও তিনি খ্যাত । দেশজ ইতিহাস , ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পটভূমিতে তার বিপুল শিল্পকর্ম রচিত । দুর্ভিক্ষ তাড়িত জীবন ও জগতের ছবি এঁকে তিনি অসামান্য এক জীবনের পরিচয় দিয়েছেন । বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনের তিনি পথিকৃৎ । অবনঠাকুর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ( ১৮৭১-১৯৫১ খ্রি: ) কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী । তবে শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন । রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকারের জন্য এ দেশের মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ । আর সেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাফল্যের পথ ধরেই সূচিত হয় স্বাধীনতা আন্দোলন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ( ১৯২০-১৯৭৫ খ্রি : ) ফরিদপুর জেলায় ( বর্তমান গোপালগঞ্জ ) টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বাঙালি জাতির তিনি অসাংবিধানিক নেতা , জাতির পিতা । তার বিস্ময়কর প্রতিভাদতীপ্ত নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় লাভ করে । তিনি আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক , মুক্তির প্রতীক , সমৃদ্ধির প্রতিক । জয় বাংলামুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয় স্লোগান হিসেবে অসাধারণ এক প্রেরনা সঞ্চারী  শব্দমালা । এই শ্লোগান ঐক্য ও সংহতির প্রতীক । 

পাঠ পরিচিতি : সৈয়দ শামসুল হকের “ কিশোর কবিতা সমগ্র “ থেকে “ আমার পরিচয় “ শীর্ষক কবিতাটি সম্পাদিত আকারে চয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ । আত্মমর্যাদাবোধ সম্পূর্ণই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার পথে আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস । সৈয়দ শামসুল হক গভীর মমতায় কবিতার আঙ্গিকে বিচিত্র করেছেন সমৃদ্ধ সেই ইতিহাস , ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পটভূমি । সহজিয়াপন্থী বৌদ্ধ কবিদের সৃষ্ট চর্যাপদ এর মধ্যে বাঙালি জাতিসত্ত্বার যে অসাম্প্রদায়িক জীবন বোধের পরিচয় মুদ্রিত হয়ে আছে – যুগে যুগে নানা আন্দোলন , বিপ্লব বিদ্রোহ , আর মতাদর্শের বিকাশ হতে হতে আমরা এসে পৌঁছেছি আজকের বাংলায় । সৈয়দ শামসুল হক এই বিবর্তনের বিচিত্র বাঁক ও মোড় তাৎপর্যময় করে তুলেছেন । চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রা , কৈবর্তবিদ্রোহ , পালযুগের চিত্রকলা আন্দোলন , বৌদ্ধ বিহারের জ্ঞানচর্চা , মুসলিম ধর্ম ও সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ , বারো ভূঁইয়াদের উত্থান , ময়মনসিংহ গীতিকার জীবন , তিতুমীর আর হাজী শরীয়ত এর বিদ্রোহ , রবীন্দ্র নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি , ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন,  ভাষা আন্দোলন এবং পরিশেষে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে “ আমার পরিচয় “ কবিতাটির মধ্যে এই বিপুল বাংলাদেশের অনবদ্যরূপ লাভ করেছে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

÷ 2 = 5