আমি কোন আগন্তুক নই

                  আহসান হাবীব 

আসমানের তারা সাক্ষী

    সাক্ষী এই জমিনের ফুল , এই 

নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী 

সাক্ষী এই জারুল জামরুল , সাক্ষী 

পুবের পুকুর , তার ঝাকড়া ডুমুরের ডালে স্থির দৃষ্টি 

মাছরাঙ্গা আমাকে চেনে 

আমি কোন অভ্যাগত নই 

খোদার কসম আমি ভিনদেশী প্রতীক নই 

আমি কোন আগন্তুক নই । 

আমি কোন আগন্তুক নই , আমি

ছিলাম এখানে , আমি স্বাপ্নিক নিয়মে 

এখানেই থাকি আর 

এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা – 

সারা দেশে । 

আমি কোন আগন্তুক নই । এই 

খর রোদ্র জলজ  বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলে

পাখিরা আমাকে চেনে 

তারা জানে আমি কোন আত্মীয় নই । 

কার্তিকের ধানের মঞ্জুরি সাক্ষী 

সাক্ষী তার চিরোল পাতার 

টলমল শিশির  – সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা 

নিশিন্দার ছায়া 

অকাল বার্ধক্যের নত কদল আলী 

      আমি ক্লান্ত চোখের আধাঁর- 

আমি চিনি ,আমি তার চিরচেনা স্বজন একজন । আমি 

জমিলার মা’র 

শূন্য খা খা রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি 

সে আমাকে চেনে । 

হাত রাখো বৈঠায় লঙলে , দেখো 

আমার হাতের স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর ? দেখেঅ 

মাটিতে আমার গন্ধ , আমার শরীরে 

লেগে আছে এই সিগ্ধ মাটির সুবাস । 

আমাকে বিশ্বাস করো , আমি কোন আগন্তুক নই। 

দু’পাশে ধানের ক্ষেত 

      সরু পথ 

      সামনে ধু ধু  নদীর কিনার 

আমার অস্তিত্বে গাঁথা । আমি এই উধাও নদীর 

মুগ্ধ এক অবোধ বালক । 

শব্দার্থ ও টীকা : আসমান আকাশ । সাক্ষী  – কোন কিছু নিজ চোখে দেখেছেন এমন কেউ । জমিনভূমি । নিশিরাইত “ নিশীথ রাত্রি’র গ্রামীণ কথ্যরুপ ( গভীর রাত বোঝাতে ) । অভ্যাগতগৃহে এসেছে এমন ব্যক্তি , আগন্তুক , নিমন্ত্রিত অতিথি । ধানের মঞ্জুরীমঞ্জুরি হল মুকুল বা শিষ , ধানের মঞ্জুরি হলো ধানের শীষ বা মুকুল । নিশিন্দা গ্রামীণ এক ধরনের গাছ ।  জমিলার মাসব চিনিগরিব, অভাবী শ্রেনীর প্রতিনিধি জমিলার মা । তাদের রান্নাঘর শূন্যই থাকে সাধারণত  । কারণ রান্না করার জন্য উপাদান তাদের নেই । যেহেতু রান্না করা হয় না , খাবারও খাওয়া হয়ে উঠে না । তাই থালা-বাসনও শুকনো থাকে । কবিও সেই অবস্থার কথা জানেন । স্নিগ্ধ মাটির সুবাসমাটির মিষ্টি গন্ধ । অর্থাৎ মায়াবী ও আকর্ষণীয় গ্রাম বাংলা । দুপাশে ধানের ক্ষেতআমার অস্তিত্বে গাঁথা  – কবি গ্রামীণ জীবনে বেড়ে উঠেছেন ।  গ্রামের মাঠ-ঘাট পথ প্রান্তর এর মত ক্ষেতের সরু পথ , তার পাশে ধানের সমারোহ এবং একটু এগিয়ে গেলে বিশাল নদীর কিনার কবির মনের ভেতর অস্থি মজ্জায় গ্রথিত হয়ে আছে । এরা সবাই কবির খুবই চেনা জানা । 

পাঠপরিচিতি : জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের আজীবনের সম্পর্ক । এর সবকিছু এই তার মনে হয় কত চেনা , কত জানা। জন্মভূমির মধ্যে শিকড় গেড়ে থেকেই মানুষ তার সমগ্র দেশকে আপন করে পায় । এই অনুভূতি তুলনাহীন । দেশ মানে তো শুধু চারপাশের প্রকৃতি নয় , একে আপন সত্তায় অনুভব করা । আর দেশকে অনুভব করলেই দেশের মানুষ কেউ আপন মনে হবে আমাদের । এই কবিতায় সেই অনুভবেই আন্তরিক মমতায় সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন কবি । তিনি উচ্চারণ করেছেন , তিনি কোনো আগন্তুক নই । তিনি যেমন ঐ আসমান , জমিনের ফুল , জোনাকি,  পুকুর , মাচারাংগাকে চেনেন , তেমনি তারাও তাকে চেনে । পাখি , কার্তিকের ধান কিংবা শুধু শিশির নয়  , তিনি এই জনপদের মানুষ কেউ ভালোভাবে চেনেন । তিনি কদম আলী জমিলার ম ‘র মত মানুষের চিরচেনা স্বজন । কবি অনুভব করেন , যে-নাঙ্গল জমিতে ফসল ফলায় ,সেই নাঙ্গল আর মাটির গন্ধ লেগে আছে তার হাতে , শরিলে । ধানক্ষেতে আর ধু ধু নদীর কিনার , অর্থাৎ এই গ্রামীণ জনপদের সঙ্গেই তার জীবন বাঁধা । এই হচ্ছে তার অস্তিত্ব । এই হচ্ছে মানবজীবন , জন্মভূমির সঙ্গে সে-মানুষ গভীরভাবে সম্পর্কিত  ।  

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

÷ 1 = 3