আশা

সিকান্দার আবু জাফর 

আমি সেই জগতে হারিয়ে যেতে চাই , 

যেথায় গভীর -নিশুত রাতে 

    জীর্ন বেড়ার ঘরে 

নির্ভাবনায় মানুষরা ঘুমিয়ে থাকে ।। 

যেথায় লোকে সোনা-রূপায় 

   পাহাড় জমায় না , 

বিত্ত-সুখের দুর্ভাবনায় 

     আয়ু কমায় না ; 

সেথায় লোকে তুচ্ছ নিয়ে  

     তুষ্ট থাকে ভাই ।।

সারাদিনের পরিশ্রমেরও 

  পায় না যারা খোঁজে 

একটি দিনের আহার্য-সঞ্চয় , 

তবু যাদের মনের কোণে 

    নেই দুরাশা গ্লানি  , 

নেই দীনতা , নেই কোনো সংশয় । 

যেথায় মানুষ মানুষেরা 

    বাসতে পারে ভালো 

প্রতিবেশীর আঁধার ঘরে 

     জ্বালাতে পারে আলো , 

সেই জগতের কান্না-হাসির 

    অন্তরালে ভাই 

আমি হারিয়ে যেতে চাই ।। 

শব্দার্থ টীকা : আমি সেই জগতেঘুমিয়ে থাকে ভাই কে কিভাবে সুখী হবে তা নির্ধারিত নয় । মানুষ গতানুগতিক যেভাবে সুখী হয় কবি সেভাবে সুখী হওয়ার কথা এখানে বলেননি । সুখের চিন্তায় মানুষের রাতে ঘুম হয় না । কিন্তু সুখী মানুষের ঘুমের সমস্যা হয় না । সারাদিন কাজের পর বিছানায় গেলে শান্তির ঘুম তাকে তৃপ্তি দেয় । কবিও তেমনি সে রকম এক জীবনযাপনের মাঝে যেতে চান যেখানে ভাঙ্গা বেড়ার ঘরেও মানুষ নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে থাকে ;ঘুমিয়ে যেতে পারে । বিত্তসুখেরকমায় না সমাজের বেশিরভাগ মানুষ টাকা পয়সাও সম্পদের লোভে দিনাতিপাত করে;  এতে সুক হারাম হয়ে যায়; জীবন হয় যন্ত্রনাময়। এতে তাদের জীবন দীর্ঘ না হয়ে বিভিন্ন রোগবালাই এ দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। বিত্ত-সুখের দুর্ভাবনা মানুষকে সুখ তো দেয় না বরং তাদের আয়ু আরো কমে যায় । যেথায় মানুষজ্বালাতে পারে আলোজীবনের সার্থকতা কোথায় এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন । কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের উপকার ও মঙ্গলের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে । মানবপ্রেমী বা মানুষকে ভালবাসতে পারার মাঝে জীবনের মহত্ত্ব নিহিত থাকে । প্রতিবেশীর দুঃখে গিয়ে আসা তাদের দুঃখ কষ্ট দূর করার মাঝেও এক ধরনের তৃপ্তি আছে । কবি তাই বলেছেন যে , যেখানে মানুষকে ভালোবাসা যায় , প্রতিবেশীর দুঃখ কষ্ট দূর করে আলো জ্বালানো যায় – সেখানেই তিনি থাকতে চান । 

পাঠপরিচিতি

সিকান্দার আবু জাফরের ” মালব কেীশিক “ কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতাটি সংকলিত হয়েছে । জাগতিক এই পৃথিবী ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে । মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে । মানুষের সঙ্গে মানুষের বাড়ছে ব্যবধান । কারো মনে যেন শান্তি নেই । বিত্ত-বৈভব অর্জন করা আর সুখের দুর্ভাবনা তাদের আয়ু কমে যাচ্ছে । কিন্তু কবি এসব অতিক্রম করে যেতে চাইলেন সেইসব মানুষের কাছে যারা প্রকৃত অর্থেই মানুষ । মনুষ্যত্বের আলো যারা জ্বালিয়ে রেখেছেন । দরিদ্র হলেও এই মানুষ বিত্তের পেছনে ছুটে না । সোনা-রুপার পাহাড় গড়ে তোলে না । জীর্ণ ঘরে বসবাস করেও তারা সুখী । তুচ্ছ , ছোট ছোট আনন্দ অবগাহনেই কাটে তাদের দিন । সারাদিন তারা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে , তাতে হয়তো একটি দিনের আহার্যও জোটে না । তবু কোন দুরাশা গ্লানি তাদের গ্রাস করে না ।  কোন দীনতা বা সংশয়ে তাদের জীবন ক্লিষ্ট  নয় । বরং দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও তারা মানুষকে ভালবাসতে পারে । প্রতিবেশীকে সাহায্য করে । কবি মনুষ্যত্বের অধিকারী এসব মানুষের সান্নিধ্য পেতে চাইছেন , হারিয়ে যেতে চাইছেন তাদের মাঝে । তিনি মনে করেন , এরাই হচ্ছে সত্যিকারের মানুষ । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 1 = 1