একাত্তরের দিনগুলি

                    জাহানারা ইমাম 

১৩ এপ্রিল : মঙ্গলবার ১৯৭১ 

চারদিন ধরে বৃষ্টি । শনিবার রাতে কি মুষলধারেই যে হলো, রোববার তো দিনভর একটানা । গতকাল সকালের পর বৃষ্টি থামলেও সারাদিন আকাশ মেঘলা ছিল । মাঝে মাঝে রোদ দেখা গেছে । মাঝে মাঝে এক পশলা বৃষ্টি ।  জামী ছড়া কাটছিল, ‘ রোদ হয় বৃষ্টি হয় , খ্যাঁক- শিয়ালির বিয়ে হয় ।’ কিন্তু আমার মনে পাষাণভার । এখন সন্ধ্যার পর বৃষ্টি নেই , ঘন ঘন মেঘ ডাকছে আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । বসার ঘরে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম , আমার জীবনেও এতদিনের সত্যি সত্যি দুর্যোগের মেঘ ঘন হয়ে আসছে । এই রকম সময়ে করিম এসে ঢুকলো ঘরে , সামনে সোফায় বসে বলল , ‘ ফুফুজান এ পাড়ার অনেকেই চলে যাচ্ছে বাড়ি ছেড়ে । আপনারা কোথাও যাবেন না ?” 

’ কোথায় যাব ? অন্ধ , বুড়ো শশুরকে নিয়ে কেমন করে যাব ? কিন্তু এ পাড়া ছেড়ে লোকে যাচ্ছে কেন ? 

এখানে তো কোন ভয় নেই !’ 

’নেই , মানে ? পেছনে এতকাচে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো -’

 ‘হল তো সব খালি , বিরান, যা হবার তা তো প্রথম দুদিনেই হয়ে গেছে । জানো , বাবুদের বাড়িতে তার মামার বাড়ির সবাই এসে উঠেছে শান্তিনগর থেকে ? ‘ 

 ‘ তাই নাকি ? আমরা তো ভাবছিলাম শান্তিনগরে আমার দুলাভাইয়ের বাসায় যাব ।’ 

 ‘ তাহলে দেখ – ভয়টা আসলে মনে । শান্তিনগরের মানুষ এলিফ্যান্ট রোডে আসছে মেলেটারি হাত থেকে পালাতে , আবার তুমি এলিফেন রোড থেকে শান্তিনগরেই যেতে চাচ্ছ নিরাপত্তার কারণে ।’ 

যুক্তিতে বুঝে করি মাথা নাড়ল, ‘ খুব দামি কথা বলছেন ফুফুজান । আসলে যা কপালে আছে তা হবেই । নইলে দ্যাখেন না , ঢাকার মানুষ খামোখা জিঞ্জিরায় গেল গুলি খেয়ে মরতে । আরো একটা কথা শুনছেন ফুফুজান ? নদীতে নাকি প্রচুর লাশ ভেসে যাচ্ছে । পেছনে হাত বাঁধা, গুলিতে মরা লাশ ।’ 

শিউরে উঠে বললাম, “ রোজই শুনছি করিম । যেখানেই যাই এছাড়া আর কথা নেই । কয়েকদিন আগে শুনলাম ট্রাকভর্তি করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে হাত আর চোখ বেঁধে,  কত লোকে দেখেছে । এখন শুনছি সদরঘাট , সোয়ারীঘাট নাকি দাঁড়ানো যায় না পচা লাচের দুর্গন্ধে । মাছ খাওয়াই বাদ দিয়েছি এজন্য ।’ 

১০ মে: সোমবার ১৯৭১

বেশ কিছুদিন বাগানের দিকে নজর দেওয়া হয় নি । আজ সকালে নাস্তা খাবার পর তাই বাগানে গেলাম । বাগানে বেশ কয়টা হাই-ব্রীড টি-রোজের গাছ আছে । এই ধরনের গোলাপ গাছের খুব বেশি যত্ন করতে হয় – যা গত দুই মাসে হয়নি । খুপরি হাতে কাজে লাগার আগে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম । মাখনের মত রঙ্গের ‘পিস্ ‘ অর্থাৎ ‘ শান্তি ‘ । কালচে-মেরূর ‘বনি প্রিন্স ‘ আর ‘এনা হার্কনেস । ফিকে ও গাঢ় বেগুনি বঙের ‘ সিমোন ‘ আর ‘ ল্যাভেন্ডার ।’ হলুদ ‘ বুকানিয়ার , ‘ সাদা ‘ পাসকালি ‘ । 

বনি প্রিন্স – এর আধাফোটা কলিটি এখনো আমার বেড-সাইড টেবিলে কালিদানিতে রয়েছে । কলি অবশ্য আর নেই , ফুটে গেছে এবং প্রায় ঝরে পড়ার অবস্থা। ’পিস’ – এর গাছটায় একটা কলি কেবল এসেছে – যদিও সারাদেশ থেকে ‘পিস’ উধাও । 

বাগান করা একটা নেশা । এ নেশায় দুঃখ-কষ্ট খানিকক্ষণ ভুলে থাকা যায় । গত কয়েক মাস ধরে নেশাটার কথা ভাববারই অবকাশ পাই নি ।এখন ভয়ানক বিক্ষোভ মনকে ব্যস্ত রাখার গরজেই বোধ করি নেশাটার কথা আমার মনে পড়েছে । 

১২ই মে : বুধবার ১৯৭১ 

জামীর স্কুল খুলেছে দিন দুই হলো । সরকার এখন স্কুল-কলেজ জোর করে খোলার ব্যবস্থা করেছে । এক তারিখে প্রাইমারি স্কুল খোলার হুকুম হয়েছে, নয় তারিখে মাধ্যমিক স্কুল । 

জামী স্কুলে যাচ্ছে না । যাবে না ।শরীফ, আমি, রূমী, জামী – চারজনে বসে আলাপ-আলোচনা করে আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম স্কুল খুললেও স্কুলে যাওয়া হবে না । দেশে কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে না, দেশে এখন যুদ্ধাবস্থা । দেশবাসীর উপর হানাদার পাকিস্তানী জানোয়ারদের চলছে নির্মম নিষ্পষণের স্টিমরোলার । এই অবস্থায় কোন ছাত্রের উচিত না বই-খাতা বগলে  স্কুলে যাওয়া । 

জামী অবশ্য বাড়িতে পড়াশোনা করছে । এবার ও দশম শ্রেণির ছাত্র । রূমী যতদিন আছে, ওকে সাহায্য করবে । তারপর শরীফ আর আমি – যে যতটা পারি । 

জামী তার দু-তিনজন বন্ধুর সাথে ঠিক করেছে – ওরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করে পড়াশোনা করবে । এটা বেশ ভালো ব্যবস্থা , পড়াও হবে, সময়টাও ভালো কাটবে । অবরুদ্ধ নিষ্ক্রিয়তায় ওরা হাঁফিয়ে উঠবে না । 

১৭ই মে : সোমবার ১৯৭১ 

রেডিও-টিভিতে বিখ্যাত ও পদস্থ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে প্রোগ্রাম করিয়েও ‘কর্তাদের ‘ তেমন সুবিধা হচ্ছে না বোধ হয় ! তাই এখন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের ধরে ধরে  তাদের নিয়ে খবরের কাগজে বিবৃতি দেওয়ানোর কুটকৌশল শুরু হয়েছে । আজকের কাগজে ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর নাম দিয়ে এক বিবৃতি বেরিয়েছে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন টিচার , রেডিও-টিভিল কোনো কর্মকর্তা ও শিল্পীর নাম বাদ গিছে বলে মনে হচ্ছে না । এদের মধ্যে কেউ কেউ সানন্দে এবং সাগ্রহে সেই দিলেও বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীও শিল্পী যে বেয়নেটের মুখে সই দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই । আর যে বিবৃতি তাদের নামে বেরিয়েছে , সেটা যে তারা অনেকে না দেখেই সই করতে বাধ্য হয়েছেন , তাতেও আমার সন্দেহ নেই । আজ সকালে কাগজে বিবৃতিটি প্রথমবারের মতো পড়ে তারা নিশ্চয়ই স্তম্ভিত হয়ে বসে রইবেন খানিকক্ষণ ! এবং বলবেন , ধরণী দ্বিধঅ হও ! এরকম নিলজ্জ মিথ্যাভাষণে বিবৃতি স্বয়ং গোয়েবলসও লিখতে পারতেন কিনা সন্দেহ । এই পূর্ব বাংলার কোন প্রতিভাধর বিবৃতিটি তৈরি করেছেন , জানতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে । 

২৫ শে মে : মঙ্গলবার ১৯৭১ 

আজ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম জয়ন্তী । বেশ শান-শওকতের সঙ্গে পালিত হচ্ছে ঢাকায় । এমনকি ইসলামিক ফাউন্ডেশন পর্যন্ত একটা অনুষ্ঠান করেছে । 

সন্ধ্যার পরে টিভির সামনে বসেছিলাম, জামী সিঁড়ির মাথা থেকে মুখ বাড়িয়ে ডাকল, “ মা শিগগির এস । 

নতুন প্রোগ্রাম ।’ 

দৌড়ে ওপরে গেলাম , স্বাধীন বাংলা বেতারের বাংলা সংবাদ পাঠ করছে নতুন এক কণ্ঠস্বর । খানিক শোনার পর চেনা চেনা ঠেকল কিন্তু ঠিক চিনে উঠতে পারলাম না । সালেহ আহমদ নামটা আগে কখনো শুনি নি । রুমী বলল, “ নিশ্চয়ই ছদ্মনাম ।’ 

বললাম, ‘হতে পারে । তবে ঢাকারই লোক এ । এই ঢাকাতেই এই গলা শুনেছি । হয় নাটক , নয় আবৃত্তি ।’ 

এইসব গবেষণা করতে করতে বাংলা সংবাদ পাঠ শেষ । 

আজকের প্রোগ্রাম ও বেশ নতুনত্ব । কণ্ঠস্বরও সবই নতুন শুনছি । একজন একটা কথিকা পড়লেন – চরমপত্র । বেশ মজা লাগলো শুনতে , শুদ্ধ ভাষা বলতে বলতে হঠাৎ শেষের দিকে এক্কেবারে খাঁটি ঢাকাইয়া ভাষাতে দুটো লাইন বলে শেষ করলেন । 

অদ্ভুত তো । কিন্তু এখানে আলটিমেটামের মতো  কিছু তো বোঝা গেল না । 

শরিফ বলল , ‘ ঐ যে বলল না একবার যখন এদেশের কাদায় পা ডুবিয়েছ , আর রক্ষে নেই । 

গাজুরিয়া রাইরের চোটে মরে কাদার মধ্যে শুয়ে থাকতে হবে , এটা আলটিমেটাম ।’ 

 ‘কি জানি ।’ 

জামী জানতে চাইল, ‘ গাজুরিয়া মাইর কি জিনিস ?’ 

রুমী বলল, ‘ জানি না । আমারে ঢাকাইয়া বন্ধু কাউকে জিগ্যেস করে নেব ।’ 

ঐ যে মুক্তিফৌজের গেরিলা তৎপরতায় কথা বলল – ঢাকার ছ’জায়গায় গেনেট ফেটেছে , আমরা তো সাত আট দিন আগে এরকম বোমা ফাটার কথা শুনেছিলাম , কিন্তু ঠিক বিশ্বাস করি নি । ব্যাপারটা তাহলে সত্যি ? আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি ! সত্যি সত্যিই তাহলে ঢাকার আনাচে-কানাচে মুক্তিফৌজের গেরিলারা প্রতিঘাতের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে শুরু করেছে ? 

একদিন জানছিলাম বর্ডারঘেঁষা অঞ্চলগুলোতেই গেরিলা তৎপরতা । এখন তাহলে খেঅদ ঢাকাতেও? 

 মুক্তিফৌজ!  কথাটা এত ভারী যে এইরকম অত্যাচারী সৈন্য দিয়ে ঘেরা অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে বসে মুক্তিফেীজ শব্দটা শুনলেই কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয় । আবার ঐ  অবিশ্বাসে ভেতর থেকে একটা আশা , একটা ভরসার ভাব ধীরে ধীরে মনের কোণে জেগে উঠতে থাকে । 

৫ই সেপ্টেম্বর : রবিবার ১৯৭১ 

একটা কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে গত দুদিন থেকে শরীফ আর আমি খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগছি । রূমীকে কি করে বের করে আনা যায় , তা নিয়ে শরিফের বন্ধুবান্ধব নানা রকম চিন্তাভাবনা করছে । এরমধ্যে বাঁকা আর ফকিরের মত হলো : যে কোন প্রকারে রুমিকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে । বাঁকা আর ফকির মনে করছে- শরিফকে দিয়ে রুমির প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটা মার্সি পিটিশন করিয়ে তদবির করলে রুমী হয়তো ছাড়া পেয়ে যেতেও পারে । 

রুমীর শোকে আমি প্রথম চোটে ‘তাই করা হোক’ বলেছিলাম । কিন্তু শরীফ রাজি হতে পারছে না । যে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে , সেই সরকারের কাছে মার্সি পিটিশন করলে রুমি সেটা মোটেও পছন্দ করবে না এবং রুমি তাহলে আমাদের কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে না । বাঁকা ও ফকির অনেকভাবে শরিফকে বুঝিয়েছে – ছেলের প্রাণটা আগে । রুমির মত এমন অসাধারণ মেধাবী ছেলের প্রাণ বাঁচলে দেশেরও মঙ্গল । কিন্তু শরীফ তবু মত দিতে পারছে না । খুনি সরকারের কাছে রুমির প্রাণভিক্ষা চেয়ে দয়া ভিক্ষা করা মানেই রুমির আদর্শ কে অপমান করা , রুমির উঁচু মাথা হেঁট করা । গত দু’রাত শরীফ ঘুমায় নি, আমি একবার বলেছি , ‘ তোমার কথাই ঠিক । ঐ খুনি সরকারের কাছে মার্সি পিটিশন করা যায় না ।’ আবার খানিক পরে কেঁদে আকুল হয়ে বলেছি , ‘না, মার্সি পিটিশন কর । 

এইভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে কেটেছে দু’দিন দু’রাত । শেষ পর্যন্ত শরীফ সিদ্ধান্ত নিয়েছে – না , মার্সি পিটিশন সে করবে না । চোখের জলে ভাসতে ভাসতে আমিও শরীফের মতকে সমর্থন করেছি । রুমিকে অন্যভাবে বের করে আনার যতরকম চেষ্টা আছে , সব করা হবে ; কিন্তু মার্সি পিটিশন করে নয় । 

১১ অক্টোবর : সোমবার ১৯৭১ 

শরিফ বলল , ‘ সেই যে মাসখানেক আগে কাগজে পড়েছিলাম ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের কথা , তার সম্বন্ধে আর শুনে এলাম ।’ 

 ‘কী শুনে এলে ? কোথায় শুনলে ? 

ডাক্তার রাব্বির কাছে । রাব্বি – জানো তো, আমাদের সুজার ভাস্তে।’ 

শরিফের এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু সুজা সাহেব, তাঁর ভাস্তে ডা. ফজলে রাব্বি । 

শরিফ বলল , “ আজ ফকিরের অফিসে গিছিলাম , ওখানে রাব্বির সঙ্গে দেখা । ওর মুখেই শুনলাম মতিউর রহমানের ফ্যামিলি ২৯ সেপ্টেম্বর করাচি থেকে ঢাকায় এসেছে । মতিউর রহমানের শশুর গুলশানের এক বাড়িতে থাকেন । সেইখানে ৩০ তারিখে মতিউরের চল্লিশা হয়েছে । রাব্বি গিয়েছিল চল্লিশায় । মিসেস মতিউর নাকি বাংলা বিভাগের মনিরুজ্জামানের শালী ।’ 

 ‘ আমাদের স্যার মনিরুজ্জামানের ? তার মানে ডলির বোন ? দাঁড়াও, দাঁড়াও- এই বোনকে তো দেখেছি ডলিদের বাসায় – মিলি এর নাম ।’ 

ডলির কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল । ডলি , মনিরুজ্জামান স্যার , ওদের কোন খোঁজেই জানি না । দুটো বাচ্চা নিয়ে কোথায় যে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে – কে জানে । ওপারেও যায় নি, গেলে বেতারে নিশ্চয় গলা শুনতে পেতাম । স্বাধীন বাংলা বেতারের বহু পরিচিতিজনের গলা শুনি , তারাক ছদ্মনাম ব্যবহার করে , কিন্তু গলা শুনে চিনতে পারি । প্রথম যেদিন স্বাধীন বাংলা বেতারে সালেহ আহমেদের কন্ঠে খবর শুনি , খুব চেনা-চেনা লেগেছিল , দু একদিন পরেই চিনেছিলাম – সে কন্ঠ হাসান ইমামের । 

ইংরেজি খবরও ভাষ্য প্রচার করে যারা, সেই আবু মোহাম্মদ আলী ও আহমদ চৌধুরি হলো আলী যাকের আর আলমগীর কবির। গায়কদের গলা তো সহজে চেনা যায় – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , আব্দুল জাব্বার,  অজিত রায়,  ইন্দ্রমোহন রাজবংশী , হরলাল রায় । কথিকা সৈয়দ আলী আহসান , কামরুল হাসান , ফয়েজ আহমেদ প্রায় সকলেই গলা শুনে বুঝতে পারি । নাটকের রাজু আহমেদ , মাধুরী চট্টোপাধ্যায় – এদের সবার গলায় এক লহমায় বুঝে যাই । 

১৬ই ডিসেম্বর : বৃহস্পতিবার ১৯৭১ 

আজ সকাল নটা পর্যন্ত যে আকাশযুদ্ধ বিরতির কথা ছিল , সেটা বিকেলে তিনটে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে । দুপুর থেকে সারা শহরে ভীষণ চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা । পাকিস্তানি আর্মি নাকি সারেন্ডার করবে বিকেলে । সকাল থেকে কলিম ,হুদা, লুলু যারােই এলো সবার মুখেই এক কথা । দলে দলে লোক ‘জয় বাংলা ’ ধ্বনি তুলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে কারফিউ উপেক্ষা করে । পাকিস্তানি সেনারা , বিহারিয়া সবাই নাকি পালাচ্ছে । পালাতে পালাতে পথে-ঘাটে এলোপাথারি গুলি করে বহু বাঙালিকে খুন জখম করে যাচ্ছে । মঞ্জুর এলেন তার দুই মেয়েকে নিয়ে , গাড়ির ভিতরে বাংলাদেশের পতাকা বিছিয়ে । তিনিও ঐ এক কথাই বললেন । বাদশা এসে বলল , এলিফ্যান্ট রোডের আজিজ মোটরসের মালিক খান জীপে করে পালানোর সময় বেপরোয়া গুলি চালিয়ে রাস্তা বহুলোক জখম করেছে । 

মুঞ্জুর যাবার সময় পতাকাটা আমাকে দিয়ে গেলেন । বললেন , ‘ আর যদি সারেন্ডার হয় , কাল সকালে এসে পতাকাটা তুলব ।’ 

আজ শরীফের কুলখানি । আমার বাসায় যারা আছেন,  তারাই সকাল থেকে দোয়া-দুরুদ কুল  পড়ছেন । পাড়ার সকলকে বলা হয়েছে বাদ মাগরিবের মিলাদে আসতে । এ.কে.খান , সানু মঞ্জু , খুকু সবাই বিকেল থেকেই এসে কুল পড়ছে । 

জেনারেল নিয়াজী নব্বই হাজার  পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে আজ বিকেল তিনটের সময় । যুদ্ধ তাহলে শেষ ? তাহলে আর কাদের জন্য সব রসদ জমিয়ে রাখব ? 

আমি গেস্টরুমের তালা খুলে চাল, চিনি, ঘি , গরম মসলা বের করলাম কুলখানি জর্দা রাঁধবার জন্য । মা, লালু, অন্যান্য বাড়ির গৃহিণীরা সবাই মিলে জর্দা রাঁধতে বসলেন । রাতের রান্নার জন্যও চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি এখান থেকেই নিলাম । আগামীকাল সকালের নাস্তার জন্যও ময়দা , ঘি, সুজি, চিনি , গরম মসলা এখান থেকে বের করে রাখলাম । 

শব্দার্থ টীকা : জামী লেখিকার ছোট ছেলে । বিরানজনমানবহীন, পরিত্যক্ত, ফাঁকা । খুরপি মাটি খোঁড়ার জন্য ব্যবহৃত একপ্রকার ছোট খন্তা । শরীফলেখিকার স্বামী । রুমি জামীর বোন । অবরুদ্ধ নিষ্ক্রিয়তারুদ্ধ বা আটক অবস্থা কর্মহীনতা । কুটকৌশল চতুরতা , দুর্বুদ্ধি । বেয়নট বন্দুকের সঙ্গীন , বন্দুকের অগ্রভাগে লাগানো এক প্রকার বিষাক্ত ও ধারাল ছোরা । স্তম্ভিতহতবাক,  বিস্মিত । গোয়েবলস্ ( ১৮৯৭১৯৪৫ ) – জার্মান বংশদুত হিটলারের সহযোগী , রাজনীতিতে প্রতিহিংসা ও মিথ্যা রটনা প্রবর্তক । কথিকানির্দিষ্ট ও ক্ষুদ্র পরিসরে বর্ণনাত্মক রচনা । চরমপত্র মৃত্যুর পূর্ব সময়ে লিখিত উপদেশ , শেষবারের মতো সতর্ক করে দেওয়ার জন্য প্রেরিত পত্র , ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীকে অনুপ্রেরণার দেওয়ার জন্য “  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র “  থেকে এম.আর.  আকতার মুকুল কর্তৃক লিখিত হানাদার বাহিনীর অপকীর্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য নিয়ে হাস্যরসাত্মক এই কথিকাগুলো প্রচারিত হতো । এই কথিকা গুলো “ চরমপত্র “ নামে খ্যাত । আলটিমেটাম – চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ । গাজুরিয়া মাইরগজারি কাঠের মতো শক্ত ও ভারী কাঠের লাঠি দিয়ে মার দেওয়া । মার্সি পিটিশন শাস্তি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন । লহমায় মুহূর্তে । 

পাঠপরিচিতি : জাহানারা ইমাম রচিত “ একাত্তরের দিনগুলি “ শীর্ষক দিনপঞ্জীর আকারের রচিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ থেকে পাঠ্যভুক্ত অংশটুকু গৃহীত হয়েছে । শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধের তার সন্তান রুমিকে হারিয়েছেন । এই রচনায় গভীর বেদনার সঙ্গে আভাসে-ইঙ্গিতে তিনি তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ এর কথা ব্যক্ত করেছেন । পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় প্রথমেই ঢাকার নগর-জীবন বিশৃংখল হয়ে পড়েছিল । শিশু-কিশোররা স্কুলে যাবে না । কিন্তু হানাদার বাহিনী জোর করেই স্কুল-কলেজ খোলা রাখবে ; বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে জোর করে রেডিও-টিভিতে বিবৃতি প্রদান করাবে ; আর হত্যা লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগ তো আছেই- এই ছিল সেই দুঃসময়ের ঢাকার অবস্থা । সেই দুর্বিষহ অবস্থার মর্মন্তুদ বিবরণ পাওয়া যায় এই স্মৃতিচারণে । বিশেষ করে গর্ভজাত সন্তান রুমিকে বাঁচানোর জন্য হানাদার বাহিনীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে লেখিকা যে  আত্মমর্যাদা ও স্বাধিকার চেতনা পরিচয় দেন তার তুলনারহিত । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × = 8