কাল,পুরুষ এবং কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ

কাল : ক্রিয়া সংঘটনের সময়কে কাল বলে ।

১) আমরা বই পড়ি । “ পড়া “ ক্রিয়াটি এখন অর্থাৎ বর্তমানে সংঘটিত হচ্ছে ।

২) কাল তুমি শহরে গিয়েছিলে । “ যাওয়া “ ক্রিয়াটি পূর্বে অর্থাৎ অতীতে সম্পন্ন হয়েছে ।

৩) আগামীকাল স্কুল বন্ধ থাকবে । “ বন্ধ থাকা “ কাজটি পরে বা ভবিষ্যতে সম্পন্ন হবে ।

সুতরাং ক্রিয়া, বর্তমানে, অতীত বা ভবিষ্যতে সম্পন্ন হওয়ার সময় নির্দেশই ক্রিয়ার কাল ।

এ হিসাবে ক্রিয়ার কাল প্রধানত তিন প্রকার : ১) বর্তমান কাল , ২) অতীত কাল এবং ৩) ভবিষ্যৎ কাল ।

ক্রিয়াপদ : ক্রিয়ামূল অর্থাৎ ধাতুর সঙ্গে কাল সময় ও পুরুষ গ্রাপক ( ক্রিয়া ) বিভক্তিযোগে ক্রিয়াপদ গঠিত হয় ।

ক)  পুরুষভেদে ক্রিয়ার রুপের পার্থক্য দেখা যায় । যেমন: –

আমি যাই । তুমি যাও । আপনি যান । সে যায় । তিনি যান।

( সাধারণ ভবিষ্যৎ কালে নাম পুরুষ ও মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার রুপ অভিন্ন । ) 

খ) বচনভেদে ক্রিয়ার রুপের কোনো পার্থক্য হয় না । যথা –

আমি ( বা আমরা ) যাই । তুমি ( বা তোমরা ) যাও। আপনি ( বা আপনারা ) যান । সে ( বা তারা ) যায় ।

গ) সাধারণ , সম্ভ্রমাত্মক , তুচ্ছার্থকভেদে মধ্যম ও নাম পুরুষের ক্রিয়ার রুপের পার্থক্য হয়ে থাকে ( উত্তম পুরুষে হয় না ) । যেমন: –

 সাধারণসম্ভ্রমাত্মকতুচ্ছার্থক/ঘনিষ্ঠার্থক
উত্তম পুরুষআমি যাই
মধ্যম পুরুষতুমি যাও তোমরা যাওআপনি যান আপনারা যানতুই যা তোরা যা
নাম পুরুষসে যায় তারা যায়তিনি যান তাঁরা যানএটা যায় এগুলো যায় ।

কালের প্রকারভেদ :

ক্রিয়া সংঘটনের প্রধান কাল বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় :

১) বর্তমান কাল :

ক) সাধারন বর্তমান বা নিত্যবৃত্ত বর্তমান

খ) ঘটমান বর্তমান

গ) পুরাঘটিত বর্তমান

২) অতীত কাল :

ক) সাধারণ অতীত

খ) নিত্যবৃত্ত অতীত

গ) ঘটমান অতীত

ঘ) পুরাঘটিত অতীত ।

৩) ভবিষ্যৎ কাল :

ক) সাধারণ ভবিষ্যৎ

খ) ঘটমান ভবিষ্যৎ

গ) পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ

বর্তমান কাল :

১) সাধারণ বর্তমান কাল : যে ক্রিয়া বর্তমানে সাধারণভাবে ঘটে, তার কালকে সাধারণ বর্তমান কাল বলে । যেমন: – সে ভাত খায় । আমি বাড়ি যাই ।

ক) নিত্যবৃত্ত বর্তমান কাল : স্বাভাবিক বা অভ্যস্ততা বোঝালে সাধারণ বর্তমান কালের ক্রিয়াকে নিত্যবৃত্ত বর্তমান কাল বলে । যথা-

সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যায় । ( স্বাভাবিকতা )

আমি রোজ সকালে বেড়াতে যাই । ( অভ্যস্ততা )

নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ :

১) স্থায়ী সত্য প্রকাশে : চার আর তিনে সাত হয় ।

২) ঐতিহাসিক বর্তমান : অতীতের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনায় যদি নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালের প্রয়োগ হয় , তাহলে তাকে ঐতিহাসিক বর্তমান কাল বলে । যেমন: বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন ।

৩) কাব্যের ভণিতায় : মহাভারতের কথা অমৃত সমান ।

৪) অনিশ্চিয়তা প্রকাশে : কে জানে দেশে আবার সুদিন আসবে কি না ।

৫) “ যদি “; যখন” যেন” প্রভৃতি শব্দের প্রয়োগে অতীত ও ভবিষ্যৎ কাল গ্রাপনের জন্য সাধারণ বর্তমান কালের ব্যবহার হয় । যেমন: –

বৃষ্টি যদি আসে, আমি বাড়ি চলে যাব ।

সকলেই যেন সভায় হাজির থাকে  ।

বিপদ যখন আসে , তখন এমনি করেই আসে ।

সাধারণ বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ :

১) অনুমতি প্রার্থনায় ( ভবিষ্যৎ কালের অর্থে ) : এখন তবে আসি ।

২) প্রাচীন লেখকের উদ্ধুত দিতে ( অতীত কালের অর্থে ): চন্ডীদাস বলেন, “ সবার উপরে মানুষ সত্য , তাহার উপরে নাই । “

৩) বর্নিত বিষয় প্রত্যক্ষীভূত করতে ( অতীতের স্থলে ) : আমি দেখেছি , বাচ্চাটি রোজ রাতে কাঁদে ।

৪) ” নেই “ নাই “ বা “নি” শব্দযোগে অতীত কালের ক্রিয়ায় : তিনি গতকাল হাটে যান নি ।

খ) ঘটমান বর্তমান কাল : যে কাজ শেষ হয়নি , এখনও চলছে , সে কাজ বোঝানোর জন্য ঘটমান বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয় । যথা – হাসান বই পড়ছে । নীরা গান গাইছে ।

ঘটমান বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ :

১) বক্তার প্রত্যক্ষ উক্তিতে ঘটমান বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয় । যথা- বক্ত বললেন , “ শত্রুর অত্যাচারে দেশ আজ বিপন্ন , ধন-সম্পদ লুন্ঠিত হচ্ছে, দিকে দিকে আগুন জ্বলরছ । “

২) ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অর্থে : চিন্তা করো না , কালই আসছি ।

গ) পুরাঘটিত বর্তমান কাল : ক্রিয়া পূর্বে শেষ হলে এবং তার ফল এখনও বর্তমান থাকলে , পুরাঘটিত বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয়। যেমন: –

এবার আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি।

এতক্ষণ আমি অঙ্ক করেছি ।

অতীত কাল :

১) সাধারণ অতীত: বর্তমান কালের পূর্বে যে ক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, তার সংঘটন কালই সাধরন অতীত কাল । যেমন: –

প্রদীপ নিভে গেল ।শিকারি পাখিটিকে গুলি করল ।

সাধারণ অতীতের বিশিষ্ট ব্যবহার :

১) পুরাঘটিত বর্তমান স্থলে : “ এক্ষনে জানিলাম, কুসুমে কীট আছে ।

২) বিশেষ ইচ্ছা অর্থে বর্তমান কালের পরিবর্তে : তোমরা যা খুশি কর , আমি বিদায় হলাম ।

২) নিত্যবৃত্ত অতীত: অতীত কালে যে ক্রিয়া সাধারণ অভ্যস্ততা অর্থে ব্যবহৃত হয় , তাকে নিত্যবৃত্ত অতীত কাল বলে । যেমন: –

আমরা তখন রোজ সকালে নদী তীরে ভ্রমন করতাম ।

নিত্যবৃ্ত্ত অতীতের বিশিষ্ট ব্যবহার :

১) কামনা প্রকাশে : আজ যদি সুমন আসত, কেমন মজা হত ।

২) অসম্ভব কল্পনায় : “ সাতাশ হত যদি একশ সাতাশ” ।
৩) সম্ভবনা প্রকাশে : তুমি যদি যেতে , তবে ভালোই হত ।

৩) ঘটমান অতীত কাল :  অতীত কালে যে কাজ চলছিল এবং যে সময়ের কথা বলা হয়েছে , তখনও কাজটি সমাপ্ত হয়নি- ক্রিয়া সংঘটনের এরুপ ভাব বোঝালে ক্রিয়ার ঘটমান অতীত কাল হয় । যেমন: –

কাল সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা তখন বই পড়ছিলাম । বাবা আমাদের পড়াশুনা দেখছিলেন ।

৪) পুরাঘটিত অতীত কাল : যে ক্রিয়া অতীতের বহু পূর্বেই সংঘটিত হয়ে গিয়েছে এবং যার পরে আরও কিছু ঘটনা ঘটে গেছে , তার কালকে পুরাঘটিত অতীত কাল বলা হয় । যেমন: –

সেবার তাকে সুস্থই দেখেছিলাম । কাজটি কি তুমি করেছিলে?

ক) অতীতে সংঘটিত ঘটনার নিশ্চিত বর্ণনায়: পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে এক লক্ষ সৈন্য মারা গিয়েছিল। আমি সমিতিতে সেদিন পাঁচ টাকা নগদ দিয়েছিলাম।

খ) অতীতে সংঘটিত ক্রিয়ার পরস্পরা বোঝোতে শেষ ক্রিয়াপদে পুরাঘটিত অতীত কালের প্রয়োগ হয় । যেমন: – বৃষ্টি শেষ হওয়ার পূর্বেই আমরা বাড়ী পেীঁছেছিলাম ।

ভবিষ্যৎ কাল :

১) সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল : যে ক্রিয়া পরে বা অনাগত কালে সংঘটিত হবে , তার কালকে সাধারন ভবিষ্যৎ কাল বলে । যথা: –

আমরা মাঠে খেলতে যাব ।

শীঘ্রিই বৃষ্টি আসবে ।

সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ :

১) আক্ষেপ প্রকাশে অতীতের স্থলে ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহার হয় । যেমন: – কে জানত , আমার ভাগ্য এমন হবে ? সেদিন কে জানত যে ইউরোপে আবার মহাযুদ্ধের ভেরি বাজবে ?

২) অতীত কালের ঘটনা সম্পর্কিত যে ক্রিয়াপদে সন্দেহের ভাব বর্তমান থাকে , তার বর্ণনায় সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের ব্যবহার হয় । যেমন: – ভাবলাম , তিনি এখন বাড়ি গিয়ে থাকবেন । তোমরা হয়ত “ বিশ্বনবি “ পড়ে থাকবে ।

২) ঘটমান ভবিষ্যৎ ক্রিয়ার রূপ:

নাম পুরুষ সাধারণ: -হতে থাকিবে/-তে থাকবে । ( করিতে থাকিবে/করতে থাকবে ) ।

নাম পুরুষ ও মধ্যম পুরুষ : – ইতে থাকিবেন/-তে থাকবেন । ( করিতে থাকিবে/ করতে থাকবে )।

মধ্যম পুরুষ সাধারণ : – ইতে থাকিবে/ – তে থাকবে । ( করিতে থাকিবে/করতে থাকবে) ।

মধ্যম পুরুষ তুচ্ছার্থক : – ইতে থাকিবে/- তে থাকবি । ( করিতে থাকিবে / করতে থাকবি ) ।

উত্তম পুরুষ: – ইতে থাকিব / তে থাকব । ( করিতে থাকিব / করতে থাকব ) ।

যে কাজ ভবিষ্যৎ কালে চলতে থাকবে তার কালকে ঘটমান ভবিষ্যৎ বলে ।

লক্ষ করার বিষয়,  এখানে মূল ক্রিয়ার সঙ্গে অসমাপিকা ক্রিয়ার – হতে/ – তে বিভক্তি যুক্ত হয় এবং সেই সঙ্গে থাক্ ধাতুর , সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়াবিভক্তি যুক্ত হয় ।

গ্রাতব্য : মূল ধাতুর সঙ্গে – হতে/তে – বিভক্তি যোগে যে অসামাপিকা ক্রিয়া সৃষ্টি হয় , তা অপরিবর্তনীয় এবং কোনো কালবাচক নয় । মূল ধাতুর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কালের কোন রূপ ক্রিয়া বিভক্তিই যুক্ত হয় না । অর্থের দিক থেকে ঘটমান ভবিষ্যতের ক্রিয়াপদ সৃষ্টি হয়েছে মনে করা যেতে পারে । রূপে দিক থেকে এগুলো সাধারণ ভবিষ্যতের ক্রিয়ার রূপ মাত্র । তাই অনেকে ঘটমান ভবিষ্যতের ক্রিয়াপদের রূপ আছে বলে স্বীকার করেন না ।

৩)পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ ক্রিয়ার রুপ : – যে ক্রিয়া সম্ভবত ঘটে গিয়েছে , সাধারণ ভবিষ্যৎ কালবোধক শব্দ ব্যবহার করে তা বোঝাতে পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ কাল হয় ।

পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ কালের অর্থ প্রকাশের জন্য মূল ধাতুর সঙ্গে অসমাপিকা ক্রিয়া বিভক্তি – ইয়া / এ যোগ করে এবং যাক্ ও গম্ ধাতুর সঙ্গে সাধারণ ভবিষ্যতের ক্রিয়াবিভক্তি যুক্ত করে যেীগিক ক্রিয়াপদ তৈরী হয় । যথা – গিয়ে থাকব / যাইয়া থাকিব ।

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

+ 52 = 56