পল্লী জননী

জসীমউদ্দীন 

 রাত থম থম স্তব্ধ নিঝুম , ঘোর-ঘোর- আন্ধার , 

নিঃশ্বাস ফেলে তাও শোনা যায় নাই কোথা সারা কার । 

রুগণ ছেলের শিয়রে বসিয়া একলা জাগিযছে মাতা , 

শিয়েরের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে , 

তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরান দোলে । 

বন বন বন জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান 

এদো ডোরা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রান । 

ছোট্ট কুঁড়েঘর , বেড়ার ফাঁকিতে আসিছে শীতের বায়ু । ,

শিহরে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে আয়ু । 

ছেলে কয় ,’ মারে , কত রাত আছে , কখন সকাল হবে।, 

ভালো যে লাগে না , এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে ।, 

মা কয় , “ বাছারে ! চুক্তি করিয়া ঘুমো ত একটি বার, , 

ছেলে রেগে কয় , ‘ ঘুম যে আসে না কি করবো আমি তার ।, 

পান্ডুর গালে চুমু খায় মাতা । সারা গায়ে দেয় হাত , 

পারে যদি বুক যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ । 

নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে , দরগায় মানে দান, 

ছেলেরা তাহার ভালো করে দাও কাঁদে জননীর প্রাণ । 

ভালো করে দাও আল্লাহ রাসুল ভালো করে দাও পীর , 

কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর ! 

বাঁশ বনে বসি ডাকে কানা কুয়ো , রাতের আঁধার ঠেলি, 

বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারির বন হেলি । 

চলো বুনো পথে জোনাকি মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি , 

দূ: ছাই ! কিবা শঙ্কায় মার পরান উঠিছে ভরি । 

যে কথা ভাবিতে পরান শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে , 

বালাই বালাই , ভালো হবে যাদু মনে মনে জাল বোনে । 

ছেলে কয় ,” মাগো , পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল, 

করিমের সাথে খেলিবার গেলে দিবে না তো তুমি গাল । 

আচ্ছা মা বল , এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া , 

এখনি আমারে এত রোগ হতে করিতে পারে তো খাড়া ? ‘ 

মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে , 

ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে । 

” শোনো মা , আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে , 

রাখিও ঢঁ্যাপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি সিকা ভরে । 

খেজুরের গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে । 

ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পারে । , 

ছেলে চুপ করে , মাও ধীরে ধীরে মাথায় বোলায় হাত , 

বাহিরেতে নাচে জোনাকির আলো’ থম থম কাল রাত । 

রুগ্ন ছেলের শিহরে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে  , 

কোন দিন যে সে মায়েরে না বলে গিয়েছিল দুর বনে । 

সাঁঝ হয়ে গেল তবু আসে নাকো , আই টাই মার প্রান , 

হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান । 

এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে, 

ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি সাঁঝে । 

কত কথা আজ মনে পড়ে তা , গরীবের ঘর তার , 

ছোটখাটো কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার । 

আড়ঙ্গের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই , 

বলেছে আমরা , মুসলমানদের আরঙ্গ দেখিতে নাই । 

করিম সে গেল ? আজিজ চলিল ? এমনই প্রশ্ন মালা , 

উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা । 

আজও রোগে তার পথ্য জোটে নি, ঔষধ হয়নি আনা , 

ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা । 

ঘরের চালেতে হুতুম ডাকিতে , অকল্যানে এ সুর , 

মরণের দূত এলো বুঝি হায় , হাঁকে মায় , দূর-দূর । 

পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডাক ডাকিতেছে ঝুরি ‘ ঝুরি ; 

কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি । 

ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে , বুুড়ো পাতা ঝরে বনে , 

ফোঁটায় ফোটাঁয় পাতা-চোঁয়া জল ঝরিছে তাহার সনে । 

রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা, 

সম্মুখে তার ঘোর কুজ্বটি মহাকাল রাত পাতা । 

পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল; 

আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল । 

শব্দার্থ টীকা : পচানপচে গেছে এমন । নামাজের ঘরে মোমবাতি মানেনামাজের ঘর হল মসজিদ, মোমবাতি মানে অর্থ হলো মোমবাতি দেওয়ার মানত করা। কোন অসুখ-বিসুখ বা বিপদ-আপদ হলে এদেশের মানুষ তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার অভিপ্রায়ে এক ধরনের মানত করে। ‘ নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে’ অর্থ হল মসজিদে মোমবাতি দেওয়ার প্রতিজ্ঞা বা মানত করা । নয়ন নীরনয়ন হল চোখ , নীর হলো পানি , নয়নের নীল হলো চোখের পানি । রহিম চাচার ঝাড়াআমাদের দেশে রোগবালাই থেকে মুক্তি লাভের জন্য পানি পড়া , ঝাড়-ফুঁকের প্রচলন আছে । নানা ধরনের অসুখে অনেকে পানি পড়ে তার রোগীকে খেতে দেয় , রোগ থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে । ” রহিম চাচার ঝাড়া , মানে হলো রহিম চাচার সেই রকম একটি চিকিৎসা পদ্ধতি , যাতে “ রহিম চাচা “ রোগী ছেলেটিকে ফু দিয়ে সুস্থ করে তুলবে । আড়ঙ্গের দিনেআরঙ্গ হলো হাট  বা বাজার বা মেলা । আড়ঙ্গের  দিনে মানে হলো মেলার দিনে বা হাটের দিনে বা বাজারের দিনে । 

পাঠ পরিচিতি

” পল্লী জননী “ কবিতাটি কবি জসীমউদ্দীনের “ রাখালী “ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে । মায়ের মত মমতাময়ী আর কেউ নেই । রুগ্ন পুত্রের শিহরে বসে রাত জাগা এক মায়ের মনোকষ্ট , পুত্রের চঞ্চলতা স্মরণ আর দারিদ্র্যের কারণে তাকে প্রয়োজনীয় খাদ্য আনন্দ-আয়োজন করতে না পারার ব্যর্থতা কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে । পুত্রের শিহরে নিবুনিবু প্রদীপ , চারদিকে মশার অত্যাচার , বেড়ার ফাঁক গলে আসে রাতের শীত । রূগ্ন পুত্রের ঘুম স্বাভাবিকভাবেই আসে না । মা পুত্রকে আদর করে , তার রোগ ভালো করে দেওয়ার জন্য দরগায় মানত করে । দুরন্ত ছেলে ভালো হয়েই খেলতে যাবে এবং তখন মা তাকে কিছু বলতে পারবে না , এমন অঙ্গীকার সে মায়ের কাছ থেকে আদায় করে নেয় । সেক্স করার জন্য আমরা আপনারমুখো পুত্রের দিকে চেক গ্রামীন মায়ের মনে অনেক কথা জাগে । রুগ্ন পরিবেশে রোগী সামনে নিয়ে এক পল্লী মায়ের মনে পুত্র হারানোর শঙ্কা জেগে উঠে । অপত্যস্নেহের অনিবার্য আকর্ষণ এই এই কবিতার মূলকথা । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + 8 =