পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থান ( ১৯৪৭ – ১৯৭০ )

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ।  জন্ম নেয় ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র । ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট জন্ম হয় পাকিস্তানের  এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম হয় ভারতের । পূর্ববাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান । মূল পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে । তবে শুরু থেকে পাকিস্তানের শাসনভার প্রথম পাকিস্তানের ধনিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি , অর্থনীতি, রাজনীতি ও  সমাজব্যবস্থাকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে । এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে । মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্য ভাষা আন্দোলন শুরু করে । এর মাধ্যমে পূর্ববাংলার বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয় । মাতৃভাষা রক্ষার চেতনা থেকে পুরো বাংলার জনগণ ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তোলে । ঐতিহাসিক ছয় দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে ভোট প্রদানের মাধ্যমে পূর্ববাংলার জনগণ বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে । বাংলা ভাষা, ইতিহাস- ঐতিহ্য ,  সংস্কৃতি ও  বাঙালি জাতিগত পরিচয়ের জাতীয় ঐক্য  গঠিত হয় ।  এই জাতীয় ঐক্যই  বাঙালি জাতীয়তাবাদ ।   এ বাঙালি  জাতীয়তাবাদই   অসাম্প্রদায়িক  বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে জনগণকে অনুপ্রাণিত করে ।  এরই ধারাবাহিকতায় নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ । 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন : 

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি : 

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এই রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় । ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করলে বাঙ্গালীদের নেতা শেরে বাংলা এ . কে ফজলুল হক এর বিরোধিতা করেন । ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় তখনই বিতর্কটি পুনরায় শুরু হয় । ১৯৪৭ সালের ১৭ মে তারিখ  চৌধুরী খলিকুজ্জামান  এবং জুলাই মাসে  আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন । তাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ভাষা বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. মোহাম্মদ এনামুল হক সহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর প্রবন্ধ লিখে প্রতিবাদ জানান ।  ১৯৪৭ সালে কামরূদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় আজাদী লীগ মাতৃভাষা “  শিক্ষাদান “  এর দাবি জানান ।   ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ নামক একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে । ৬-৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উক্ত সংগঠনের যুবকর্মী সম্মেলনে  “  বাংলাকে শিক্ষা ও আইন-আদালতের বাহন “ করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় । ১৫ সেপ্টেম্বর এই সংগঠন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু , একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয় । এই সময় তমদ্দুন মজলিস “ ভাষা সংগ্রাম পরিষদ “ গঠন করে । ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচীতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পূর্ববাংলা তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় । বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠে , লেখালেখি শুরু হয়  এবং  ডিসেম্বর মাসেই “ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ “  নতুনভাবে গঠিত হয় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,  সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মিছিল সভা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ।  পাকিস্তান  সরকার ১৪৪ ধারা জারিসহ সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের দাবি জানান । তার দাবি অগ্রাহ্য হলে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয় । ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পূর্ণ গঠিত হয় । ১১ মার্চ “ বাংলা ভাষা দাবি দিবস ” পালনের ঘোষণা দেওয়া হয় । ঐদিন সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয় । ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এ কর্মসূচি পালনের বিশিষ্ট  ভূমিকা পালন করে । পিকেটিং করা অবস্থার শেখ মুজিব , শামসুল হক,  অলি আহাদ সহ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করলে ঢাকায়  ১৩ -১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয় । বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৫  মার্চ সংগ্রাম পরিষদ ভেঙ্গে ৮  দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন । চুক্তিগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল : – 

১) বাংলা ভাষার প্রশ্নে গ্রেফতারকৃত সকলকে অবিলম্বে মুক্তি দান করতে হবে । 

২) পুলিশি অত্যাচারের বিষয়ে তদন্ত করে একটি বিবৃতি প্রদান করা হবে । 

৩) বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে । 

৪) পূর্ববাংলার সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি উঠে যাওয়ার পর বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রবর্তন করা হবে । 

৫) সংবাদপত্রের উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করা হবে । 

৬) আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না । 

৭) ২৯ ফেব্রুয়ারি হতে জারিকৃত ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার  করা হবে । 

৮) রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন,  রাষ্ট্রের  দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই , মর্মে মুখ্যমন্ত্রী কর্তিক বক্তব্য দান । 

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন । ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ) অনুষ্ঠিত জনসভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে “  উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা । ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি অনুরোধ ঘোষণা দিলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে এবং না , না বলে তার উক্তির প্রতিবাদ জানায় । জিন্নাহর রেসকোর্স ময়দানের ঘোষণাও তারা তখন প্রতিবাদ জানিয়েছিল । পাকিস্তান সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদ আরো তীব্র হয়ে উঠে । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ববাংলার ভাষা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন শুরু হয় তা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি  আস্থার বহি: প্রকাশ । মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণ জাতীয় ভাবে নিজেদের বিকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে । এ ভূখন্ডে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠিরগুলো রাষ্ট্রভাষা উর্দু নয় বরং বাংলাকে সমর্থন করে । 

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্দাকে অনুকরণ করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা প্রদান করেন । এর প্রতিবাদে ছাত্র সমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে । আব্দুল মতিনকে আহ্বায়ক করে “ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ  “ নতুন ভাবে গঠিত হয়  । নতুনভাবে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে  । এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো যুক্ত হয়  । ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় । ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং ঐ দিন রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। 

ভাষার  দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করা হয় । কারাবন্দি শেখ মুজিব ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি পালনে ছাত্র ও আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের ডেকে পরামর্শ দেওয়া হয় । এরপর শেখ মুজিব ও  মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয় । সেখানে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদ রাজবন্দিদের মুক্তি ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে । দেশব্যাপী জনমত গড়ে উঠতে থাকে । ২০ ফেব্রুয়ারি সরকারি এক ঘোষণায়  ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারিসহ ,  সভা সমাবেশ , মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ১৪৪ ধারা বঙ্গ করা না করা নিয়ে অনেক আলোচনা শেষে ১৪৪ ধারা বঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে  । ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়  ( ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মূখ চত্বর  ) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়  । সবাই সিদ্ধান্ত হয় যে , ১০ জন করে মিছিল শুরু করা হবে । ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিক থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল এগিয়ে চলে । পুলিশ প্রথমে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে , মিছিলে লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে । এক পর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে আব্দুল বরকত , জব্বার , রফিক , সালামসহ , আরো অনেকে শহীদ হন , অনেকে আহত হন । ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে । ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশাল শোক রেলি বের হয় । এখানে পুলিশের হামলায় শফিউর নামে একজনের মৃত্যু হয় । 

শহীদের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য ঢাকায় ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা মেডিকেল কলেজের সামনে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে । ২৩ ফেব্রুয়ারি  শফিউরের পিতাকে নিয়ে প্রথম শহীদ মিনার উদ্বোধন করা হয় । ২৪ তারিখ পুলিশ উক্ত শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলে । ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে কবি মাহবুব-উল-আলম চেীধুরী “ কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি  , শীর্ষক প্রথম কবিতা এবং তরুণ কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ “ স্মৃতির মিনার “ কবিতাটি রচনা করেন । ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম , রাজশাহী,  রংপুর , খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন শহরের ছাত্র , যুবকসহ সাধারন মানুষ ভাষার দাবিতে আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন । পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা পোষণ শুরু করে । এসব হত্যাকান্ড পূর্ব বাংলার জনগণের মনের উপর বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ।  আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচনা করেন   “ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি , আমি কি ভুলিতে পারি ; সংগীত শিল্পী আব্দুল লতিফ রচনা ও সুর করেন  “ ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায় ; এছাড়া , তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি “ র মত সঙ্গীত । ড. মুনীর চৌধুরী জেলে বসে  রচনা করেন  “ কবর নাটক ; জহির রায়হান রচনা করেন “ আরেক ফাল্গুন ‘ উপন্যাসটি । ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় শিল্প , সাহিত্য ও  সংস্কৃতির হ্যালো হ্যালোচ হ্যালো হ্যালো চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে । বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্বারা একটি গুরুত্বপূর্ণ  স্থান দখল করে । ১৯৪৭ সালে সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের রূপ লাভ করে । ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়  হয় । ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । নিজের ইতিহাস , ঐতিহ্য , ভাষা ও সংস্কৃতির নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ও আত্তপ্রত্যয় খুজেঁ পায় । ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরআখ  পঞ্চাশের দশক ব্যাপী ছিল বাঙ্গালীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ  অধিকার প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিকাল । ভাষা আন্দোলনে পরবর্তীকালে সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল । এই আন্দোলনে দেশের মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে । পাকিস্তানি শাসন পর্বে এটি তাদের জাতীয় মুক্তির প্রথম আন্দোলন । 

জাতীয়তাবাদের উন্মেষ : 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে । পাকিস্তানের প্রতি আগে যে মোহ ছিল তা দ্রুত কেটে যেতে থাকে । নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক এবং গুরুত্ব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে । বাঙালি হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয়ে রাজনীতি,  অর্থনীতি, শিক্ষা , সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে থাকে । ভাষঅ কেন্দ্রিক এই ঐক্য জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি রচনা করে, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । 

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : 

১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে । প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ মিনারে নগ্নপায়ে হেঁটে ফুল অর্পন করে আমরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই । বাঙ্গালী জাতির কাছে দিনটি একটি শোকের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার দিন । কানাডা প্রবাসী কয়েকজন বাঙালির উদ্বেগ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা , বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বাংলাদেশের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসকে “ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস “ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে । পৃথিবীতে ৬০০০ – এর বেশি ভাষা রয়েছে  । এই দিন পৃথিবীর সব বাসার মানুষ যেন অন্য ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানায় সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে । এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ২১ ফেব্রুয়ারীতে বাসার জন্য জনগণের আন্দোলন ও রক্তদানের ইতিহাস পৃথিবীর জাতিসমূহের নিকট উপস্থাপিত হওয়ার সুযোগ হল । পৃথিবীর সকল জাতি ২১ ফেব্রুয়ারি নিজ নিজ ভাষার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছে । আমাদের দেশেও ক্ষুদ্রনীগোষ্ঠী সমূহের ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে আমরা তৎপর হব । দিবসটি পালনের সময় বাংলা ভাষার পাশাপাশি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আমরা সম্মান প্রদর্শন করতে শিখব । 

 বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভূমিকা : 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র এবং একই সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুলগুলো বুঝতে পারে । পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনায় ,প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগসহ   সর্বক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কৃতিত্ব শুরু করে । বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে থাকে । তখন রাজনৈতিক দল ও  নেতৃত্তের মধ্যে তিনটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। এগুলো হচ্ছে – 

১) পাকিস্তানের প্রতি অনুগত রাজনৈতিক দল । যেমন : – মুসলিম লীগ ও ইসলাম নামধারী দলসমূহ । 

২) পূর্ববাংলার স্বার্থ রক্ষার জন্য সোচ্চার রাজনৈতিক দল  যেমন:- আওয়ামী লীগ,  ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি – ন্যাপ , 

৩) সাম্যবাদী আদর্শের রাজনৈতিক ধারা । 

আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন : 

মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয় অসম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে ” পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ  “ গঠন করেন । সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী , সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক  এবং যুগ্ম সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান । শুরুতেই দলটি বাঙালিদের সাথে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করে । এরমধ্যে প্রদেশিক স্বায়ত্তশাসন , জনগণের সার্বভৌমত্ব,  বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান , পাট ও চা শিল্প জাতীয়করণ , বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ  , কৃষকদের মধ্যে ভূমি বন্টন , সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য  । এসব দাবি উদযাপনের কারণে দলটি দ্রুত পূর্ববাংলার জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে  । মাওলানা ভাসানী,  শামসুল হক  এবং শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলে পড়েন । শেখ মুজিবকে ১৯৪৯ সালে কারাগারে প্রেরণ করা হয়  । তিনি  ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘকাল যাবত বন্দিজীবন কাটান । ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল উদ্যোগ ছিল আওয়ামী লীগের । ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দলের নাম “ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ “ নামকরণ করা হয় । ফলে ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সকল বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহ জাতীয়তাবাদের ধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায় । এই সময়ে দলটি পূর্ববাংলার জনগণের রাজনৈতিক,  অর্থনৈতিক সহ সকল স্বার্থরক্ষায় একদিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখে , অন্যদিকে সংসদ ও পরদেশী সরকারের সদস্যগণ সর্বত্র সোচ্চার হয়ে থাকেন । 

যুক্তফ্রন্ট গঠন , নির্বাচন ও সরকার : 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসক দল মুসলিম লীগ দীর্ঘদিন নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার গঠনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি । এছাড়া প্রদেশিক সরকারের নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের টালবাহানা পূর্ব বাংলার জনগণের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে । পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ।  ২১ দফা প্রনয়ন শেষে ৪ টি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় । দল ৪ টি হলো : ১) আওয়ামী লীগ , ২) কৃষক শ্রমিক পার্টি , ৩) নেজামে ইসলাম এবং ৪) গণতন্ত্রী দল । ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচনে জনগণ যুক্তফ্রন্টের ২১- দফাকে তাদের স্বার্থ রক্ষার সনদ বলে বিবেচনা করে । পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭ টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ টি , মুসলিম লীগ মাত্র ৯ টি আসন লাভ করে । বাকি আসন অন্যরা পায় । এই নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃতিত্ব ও প্রভাব থেকে মুক্তি হওয়ার রায় প্রদান করে । পূর্ব বাংলায় বাঙ্গালীদের শাসন দেখতে তারা আর চায় না , তা প্রকাশিত হয় । যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক সরকার গঠনের রায় লাভ করে । জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস-  এই নির্বাচন তা প্রমাণ করে । জনগণ এ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে এবং পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের শাসনের অবসান ঘটায় । 

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা: 

১) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে ।

২) বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ,  সকল প্রকার মধ্যস্বত্ব  ও সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল করা হবে । 

৩) পাট ব্যবসায়ী জাতীয়করণ , পাটের ন্যায্য মূল্য প্রদান এবং পাট কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে । 

৪) সমবায় কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন , কুটির ও হস্ত শিল্পের উন্নতি সাধন করা হবে । 

৫) পূর্ব বাংলার লবণ শিল্পের সম্প্রসারণ ও লবণ কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে । 

৬) বাস্তুহারাদের  পুনর্বাসন করা হবে । 

৭) সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন,  বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হবে । 

৮) পূর্ব বাংলাকে শিল্পায়িত ও শ্রমিকের ন্যায় সঙ্গত অধিকার রক্ষা করা হবে । 

৯) অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হবে । শিক্ষকদের ন্যায় সঙ্গত বেতন ভাতার ব্যবস্থা করা হবে । 

১০) বাংলাকে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে । 

১১) ঢাকা ও  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সকল প্রকার কালাকানুন বাতিল করা হবে । 

১২) প্রদেশিক ব্যয় সংকোচন,  উচ্চ ও  নিম্নবেতনভুক্ত কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য হ্রাস করা হবে । 

১৩) সকল প্রকার দুর্নীতি নির্মূল করা হবে । 

১৪) রাজবন্দিদের মুক্তি দান,  বাক স্বাধীনতা,  সভা-সমিতি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে । 

১৫) শাসন বিভাগ হতে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হবে । 

১৬) বর্ধমান হাউস কে আপাতত ছাত্রাবাস ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষনাগার করা হবে। 

১৭) বাংলা ভাষার শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মান করা হবে। 

১৮) একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হবে। 

১৯) ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ববাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হবে। 

২০) নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। 

২১) পরপর তিনটি উপ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট পরাজিত হলে মন্ত্রিসভার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবে। 

যুক্তফ্রন্ট সরকার: 

১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টভুক্ত কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন । যুক্তফ্রন্ট সরকার মাত্র ৫৬ দিন ক্ষমতায় ছিল  । পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি । তারা ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয় । আদমজী পাটকল ও কর্ণফুলীতে বাঙালি-অবাঙালি অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে । উল্লেখ্য পাকিস্তান সরকারের ইন্ধনে ওই দাঙ্গা হয়েছিল । শেরে বাংলাকে গৃহবন্দি করা হয় , শেখ মুজিব সহ তিন হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয় । এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী চরম বৈরী মনোভাব প্রকাশ পায় । পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের অরাজক শাসনের পর্ব শুরু হয় । কেন্দ্র এবং প্রদেশে  ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে সংকট ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় । গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তান  রক্ষার শেষ চেষ্টা করা হয় । 

সামরিক শাসন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ : 

পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীর তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে সংসদ ও সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি । কেন্দ্রে এবং প্রদেশের ঘন ঘন সরকারের পরিবর্তন করতে থাকে । ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল । পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের পরস্পরবিরোধী এম এল এদের মধ্যে মারামারি মত এক অপ্রীতিকর ঘটনায় ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী গুরুতর আহত হয়ে পরবর্তীকালে হাসপাতালে মারা যান । এরেই সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জারি করেন । তিনি দায়িত্ব নিয়ে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হচ্ছে : – 

১) ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল 

২) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া 

৩) রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা 

৪) শেখ মুজিব সহ বেশ কয়েকজন নেতাকে জেলে প্রেরণ 

৫) সকল মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া । 

আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল : 

১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জা কে উৎখাত ও দেশত্যাগে বাধ্য করে ক্ষমতা দখল এবং নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত করেন । তিনি উক্ত পদে বসে যেসব পদক্ষেপ নেন তা হল : – 

১) নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা 

২) পূর্ব ঘোষিত ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন স্থগিত করা 

৩) দুর্নীতি ও চোরাচালানী দূর করার অঙ্গীকার করা 

৪) রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা । 

সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেন । এই ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোট  ৮০ হাজার নির্বাচিত ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন হবে । তাদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি , জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচন হওয়ার বিধান রাখা হয় । এটি ছিল পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি । ১৯৬৫ সালে ৮০ হাজার মেম্বারদের ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।  সামরিক শাসনের ফলে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করতে থাকে।  

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য সমূহ : 

পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক , সামাজিক , শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে অগ্রসর ছিল । কিন্তু  ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন- শোষন প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব পাকিস্তান দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকে ।  বৃদ্ধি পেতে থাকে দুই অঞ্চলের মধ্যকার বৈষম্য। 

অর্থনৈতিক বৈষম্য : 

পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ববাংলার চাইতে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল । যেমন: – ১৯৫৫- ৫৬ সাল থেকে ১৯৫৯-৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তান লাভ করেছিল  ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা , অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান তখন পেয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা । একইভাবে  ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান লাভ করে  ৬,৪৮০ মিলিয়ন টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল ২২,২৩০ মিলিয়ন  টাকা । ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য,  শিল্প উৎপাদন,  কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান এর চাইতে অনেকগুলো পিছিয়ে পড়ে । 

প্রশাসনিক বৈষম্য : 

পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল অতি নগন্য ।  প্রশাসনিক ক্ষেত্রে  বৈষম্য ব্যাপক । ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের প্রশাসনের চিত্র নিম্নে দেওয়া হলঃ- 

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য: 

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর স্থল, নেী ও বিমান বাহিনীতে বাঙ্গালীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য বিরাজ করেছিল । মোট অফিসারের মাত্র ৫% , সাধারণ সৈনিকদের মাত্র ৪  শতাংশ ,  নৌবাহিনীর উচ্চপদে ১৯% , নিম্ন পদে ৯% , বিমান বাহিনীর পাইলটদের ১১% ,  টেকনিশিয়ানদের ১.৭ %  ছিলেন বাঙালি   । 

শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় এগিয়ে ছিল । পাকিস্তান সৃষ্টির পর শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিগুণের বেশি লাভ করতে থাকে । ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাথমিক , মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে। 

সামাজিক বৈষম্য  : 

পাকিস্তানের বৈষম্য মূলক নীতির কারণে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ মন্তর হয়ে পড়ে  । বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে থাকে ।  উভয় অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় ।  মানুষ প্রতিবাদ করে ।  আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে । 

সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন : 

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬১ সালেই পূর্ব বাংলার আন্দোলন শুরু হয় । ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে বাঙ্গালীদের প্রিয় নেতা ও পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে । এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হলে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়  । ১৯৬২ সালে আইয়ুবের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে ।  ঐ সময় ছাত্র সমাজ ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে  । শিক্ষানীতি বিষয় আন্দোলনে বিভিন্ন পেশাজীবীর অংশগ্রহণ করে ।  এই সঙ্গে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ( এনডিএফ ) গঠিত হয় । এই সংগঠন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে । ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক  দলগুলো সামরিক শাসন বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়  । 

ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ : 

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হয় । এই যুদ্ধ ১৭  দিন ধরে অব্যাহত ছিল । তখন পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত ছিল । বিষয়টি পূর্ববাংলার জনগণের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং বৈষম্যমূলক মনে হয়েছিল । যুদ্ধে পাকিস্তান হেরে যাওয়ার পরেও পাকিস্তান সরকার ভারত বিরোধী “ জিগির “ তোলে । একই সঙ্গে “ ইসলাম বিপন্ন হওয়ায় “ , রবীন্দ্র সংগীতকে “ হিন্দু সংস্কৃতি “ , নজরুল ইসলামের গানে “ হিন্দুয়ানি’র অভিযোগ তুলে এসব বাদ দেওয়ার যুগপৎ চেষ্টা করা হয়।  ফলে পুরো বাংলার জনগণ নিজেদের সংস্কৃতি,  ইতিহাস,  ঐতিহ্য,  এবং রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করে । বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হয়ে থাকে  । 

৬ দফা: পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ : 

পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সুস্পষ্টরূপে লাভ করে ৬ দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবি নামায় । ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি  লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে যোগদান করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান । সেখানে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য ৬ দফা তুলে । দফাগুলো হচ্ছে : – 

১) যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হবে। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । 

২) কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে , প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় । অন্যান্য সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে । 

৩) সারাদেশে হয় অবাধে বিনিয়োগযোগ্য দুই ধরনের মুদ্রা ,  না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা করা যাবে  । 

৪) সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে  । আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে । 

৫) অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে,  এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে । 

৬) অঙ্গ রাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা সামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া । 

গুরুত্ব : 

৬ দফা পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক,  রাজনৈতিক,  সামরিক সহ  সকল অধিকারের কথা তুলে ধরে ।  আইয়ুব সরকার একে “ বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি “  হিসাবে আখ্যায়িত  করে ।  এ কর্মসূচি বাঙালির জাতীয় চেতনা মূলে- বিস্ফোরণ ঘটে । এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এ ৬ – দফা কর্মসূচি বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে  । এটি ছিল পূর্ব বাংলা  বা বাঙালির জাতীয় মুক্তির সনদ  । পাকিস্তান সরকার এটি গ্রহণ না করে দমন-পীড়ন শুরু করলে আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে  । 

ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা ( “ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য “ ) : 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং তার বিশ্বাস ছিল শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হবে না । তাই তিনি সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে সময় গোপনে গঠিত বিপ্লবী পরিষদের সদস্যদের তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সম্মতি দিয়েছিলেন ।  বিপ্লবী পরিষদ এর পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট রাত্রে  এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দী করবে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবে ।  পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বে তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে ঐতিহাসিক আগরতলা ( রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য ) মামলা দায়ের হয় । এ মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নাম্বার আসামি করে রাজনীতিবিদ , বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা,  সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সহ মোট ৩৫  জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান দন্ডবিধির ১২১ -এ ও ১৩১ ধারায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে সশস্ত্র পন্থায় স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করার অভিযোগে আনা হয় । বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ১৯৬৮ সনের ১৯ জুন তারিখে এ মামলার শুনানি শুরু হয় । 

মামলার শুরু হওয়ার পর তা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলন শুরু হয় এবং ছাত্র সমাজের ১১-  দফার ভিত্তিতে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে  । ৬- দফা ও ১১- দফার আন্দোলনের ফলে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয় তারই ধারাবাহিকতা “  ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা “  বাঙ্গালীদের স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করতে অনুপ্রেরণা যোগায় । 

১৯৬৯ সালের গনউত্থাপন : 

পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ১৯৬৯ সালে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংঘটিত হয় । ইতিহাসে এটি 69 এর গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত । এটি বিপ্লবাত্মক রূপ পরিগ্রহ করে । সকল গণতান্ত্রিক দল,  পেশাজীবি সংগঠন ও মানুষ যার যার অবস্থান থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত হয় । এই আন্দোলনের যুক্ত হতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ , রাজশাহী  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা শহীদ হন  । প্রদেশব্যাপী  ছাত্র , শিক্ষক,  কৃষক , শ্রমিকসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ তখন রাস্তায় নেমে আসে । অবশেষে  ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হন । অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দেওয়া হয় । আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় । ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান )  ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় । সেখানে তাক “ বঙ্গবন্ধু “  উপাধিতে ভূষিত করা হয় । 

গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রভাব : 

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এর ফলে পাকিস্তানে সামরিক শাসন আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় । এর পূর্বে তিনি “ ঐতিহাসিক আগরতলা মামল “  তুলে নেন । ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন দিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নতুন সামরিক সরকার  বাধ্য হয় । গণঅভ্যুত্থান এর ফলে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার বিকাশ ঘটে । বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রয়োজনীতা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে । ১৯৭০- এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ -এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ১৯৬৯ -এর গণঅভ্যুত্থানের ব্যাপক প্রভাব ছিল  । মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শে এসব অর্জন সম্ভব হয় । 

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী ঘটনা : 

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন । ইয়াহিয়া খানকে  উক্ত পদে বসান ।  তিনি ২৮ মার্চ তারিখ এক ঘোষণায় পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন  । তবে পাকিস্থানে ইতিপূর্বে কোন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এই নির্বাচন নিয়েও নানা আশঙ্কা ছিল , কোন নিয়ম কানুন ছিল না । অবশেষে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম “  এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে “  নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ।  নির্বাচনে আওয়ামী লীগ , ন্যাপ ( ওয়ালী ) , মুসলিম লীগ ( কাইয়ু্ম ) , মুসলিম লীগ ( কনভেনশন ) , পাকিস্তানি পিপলস পার্টি , ডেমোক্রেটিক পার্টি , Jamaat-e-islami , প্রভৃতি দল অংশগ্রহণ করে  । আওয়ামী লীগ ৬ দফার পক্ষে নির্বাচনকে গণভোট হিসেবে অভিহিত করে । নির্বাচনে ৫ কোটি ৬৪ লক্ষ ভোটারের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ছিল ৩ কোটি ২২ লাখ । ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের  ( এবং কিছু আসনে ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭১ ) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন ( ৭ টি মহিলা আসনসহ ) লাভ করে । ১৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রদেশিক পরিষদ নির্বাচনে  ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসন আওয়ামী লীগ পায়  । নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ বিজয়ী ছিল নজিরবিহীন আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন ও ৬ -দফার পক্ষে গণরায় লাভ করে  । 

নির্বাচনের গুরুত্ব : 

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় এবং প্রদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে  । ফলে ৬ দফা ১১ দফার প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় । বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় ঘটে । অন্যদিকে,  পাকিস্তানের সরকার ও স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য এটি ছিল বিরাট পরাজয়  । তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্র করতে থাকে  । পূর্ব বাংলার জনগন পশ্চিম পাকিস্তানের কৃতিত্বের বিরুদ্ধে  দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করে । ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এর পেছনে এই নির্বাচনের অপরিসীম গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। পরিণতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।  

১) ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় কত সালে ? 

ক) ১৯৪৬ সালে 

খ) ১৯৪৭ সালে 

গ) ১৯৪৮ সালে 

ঘ) ১৯৪৯ সালে 

উত্তর : খ 

২) ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান কয়টি রাষ্ট্রের জন্ম হয় ? 

ক) ২টি 

খ) ৩টি 

গ) ৪টি 

ঘ) ৫টি 

উত্তর : ক 

৩) কত তারিখে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ? 

ক) ১৪ জুন, ১৯৪৭ সালে 

খ) ১৪ জুলাই, ১৯৪৭ সালে 

গ) ১৪ আগস্ট , ১৯৪৭ সালে 

ঘ) ১৪ সেপ্টেম্বর , ১৯৪৭ সালে 

উত্তর : গ

৪) দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা কে ? 

ক) শেখ মুজিবুর রহমান 

খ) মহাত্মা গান্ধী 

গ) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ 

ঘ) মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী 

উত্তর : গ 

৫) কোনটি পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিল ? 

ক) পূর্ব বাংলা 

খ) আসাম 

গ) ত্রিপুরা 

ঘ) পশ্চিম পাকিস্তান 

উত্তর : ক 

৬) পূর্ব বাংলার জনগন কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে ? 

ক) তাদের শোষণের কারণে 

খ) তাদের প্রতি শত্রুতার কারণে 

গ) তাদের ভন্ডামির কারণে 

ঘ) তাদের উপর বিরক্ত কারণে 

উত্তর : ক 

৭) দ্বিজাতি তত্ত্ব বলতে কি বুঝ ? 

ক) দুটি দেশ ভিত্তিক 

খ) দুটি রাষ্ট্রভিত্তিক 

গ) দুইটি ধর্মভিত্তিক 

ঘ) দুটি জাতিভিত্তিক 

উত্তর : ঘ 

৮) “ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই “ স্লোগানটি নিচের কোনটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ? 

ক) স্বাধীনতা যুদ্ধ 

খ) গণঅভ্যুত্থান 

গ) লাহোর প্রস্তাব 

ঘ) ভাষা আন্দোলন 

উত্তর : ঘ

৯) ১৯৪৭ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কে ছিলেন ? 

ক) শেরে বাংলা একে ফজলুল হক 

থ) ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ 

গ) কামরুদ্দিন হামেদ 

ঘ) ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ 

উত্তর : ঘ 

১০) তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হয় কত তারিখে ? 

ক) ২ সেপ্টেম্বর 

খ) ৩ সেপ্টেম্বর

গ) ৪  সেপ্টেম্বরে 

ঘ) ৫  সেপ্টেম্বর 

 উত্তর: ক 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

× 1 = 1