বই পড়া

প্রমথ চৌধুরী

বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে । প্রথমত , সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না; কেননা, আমরা জাতি হিসাবে শৌখিন নই । দ্বিতীয়ত, অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন ; কেননা , আমাদের এখন ঠিক শখ  করবার সময় নয় ।  আমাদের এই রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্রের দেশে সুন্দরে জীবন ধারণ করায় যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সেই জীবনকেই সুন্দর করা , মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে । আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বহু । আমাদের বিশ্বাস শিক্ষা আমাদের গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দুই-ই দুর করবে । এ আশা সম্ভবত দুরাশা ; কিন্তু তাহলেও আমরা তা ত্যাগ করতে পারি না । কেননা , আমাদের উদ্ধারের জন্য কোন সদুপায় আমরা চোখের সুমুখে দেখতে পাইনে । শিক্ষার মাহাত্যে আমিও বিশ্বাস করি এবং যিনিই যাই বলুন সাহিত্যচর্চার যে শিক্ষার সর্ব প্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । লোকে যে তা সন্দেহ করে , তার কারন এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোন নগদ বাজার দর নেই । এই কারণে ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না,ত বোঝে শুধু অর্থের সার্থকতা । ডেমোক্রেসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে কিন্তু তাদের শিষ্যরা তাদের কথা উল্টো বুঝে সকলেই হতে চায় বড় মানুষ । একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ডেমোক্রেসির গুণগুলো আয়ত্ত করতে না পেরে তার দোষগুলো আত্মসাৎ করছি।  এর কারণ ও স্পষ্ট । ব্যাধিই সংক্রামক , স্বাস্থ্য নয় । আমাদের শিক্ষিত সমাজের লোলুপদৃষ্টি আজ অর্থের ওপরই পড়ে রয়েছে । সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল সম্বন্ধে অনেকেই সন্দিহান । যারা হাজারখানা ল-রিপোর্ট কিনেন , তারা একখানা কাব্যগ্রন্থ কিনতে প্রস্তুত নয় ; কেননা , তাতে ব্যবসার কোন সুসার নেই । নজির না আউড়ে কবিতা আবৃত্তি করলে মামলা যে হারতে হবে সে তো জানা কথা , কিন্তু সে কথা জজে  শোনে না , তার যে কোন মূল্য নেই ,  এইটেই হচ্ছে পেশাদারদের মহাভূল । জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ । কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শুন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী । তারপর সে জাতি মনে বড় নয় , সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয় ; কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টি মন সাপেক্ষ এবং মানুষের মনকে সরল, সচল, সরাগ ও সমৃদ্ধ করার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের ওপরও ন্যস্ত হয়েছে । কেননা, মানুষের দর্শন, বিজ্ঞান,  ধর্মনীতি,  অনুরাগ-বিরাগ , আশা -নৈরাশ্য , তার অন্তরের সত্য ও স্বপ্ন এই সকলের সমবায় সাহিত্যের জন্ম । অপরাপর শাস্ত্রের ভিতর যা আছে সেসব হচ্ছে মানুষের মনের ভগ্নাংশ ; তার পুরো মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় শুধু সাহিত্যে । দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি হচ্ছে তার মনগঙ্গার তোলা জল, তার পূর্ন স্রোত আবহমানকাল সাহিত্যের ভেতরেই সোল্লাসে সবেগে বয়ে চলেছে এবং সেই গঙ্গাতে অবগাহন করেই আমরা আমাদের সকল পাপ মুক্ত হব । 

অতএব , দাঁড়াল এই যে, আমাদের বই পড়তে হবে , কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ন্তর নেই । ধর্মের চর্চা চাই কি মন্দিরের বাইরেও করা চলে , দর্শনের চর্চা গুহায় , নীতির চর্চা ঘরে এবং বিজ্ঞানের চর্চা জাদুঘরে ; কিন্তু সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরী ; ও-চর্চা মানুষে কারখানাতেও করতে পারে না ; চিড়িয়াখানাতেও নয় । এইসব কথা যদি সত্য হয় , তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে , সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে । সেজন্য আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব , দেশের ততো বেশি উপকার হবে । 

আমাদের মনে হয় এ দেশের লাইব্রেরীর সার্থকতা হাসপাতালে চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি । একথা শুনে অনেকে চমকে উঠবেন । কেউ কেউ আবার হেসেও উঠবেন ;কিন্তু আমি জানি , আমি রসিকতাও করছিনে , অদ্ভুত কথা বলছিনে; যদিও এ বিষয়ে লোকমত যে আমার মতের সমরেখায় চলে না, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন । অতএব আমার কথার আমি কৈফিয়ত দিতে বাধ্য । আমার বক্তব্য আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি তার সত্য মিথ্যার-বিচার আপনারাই করবেন । সেই বিচারে আমার কথা যদি না টেকে তাহলে রসিকতা হিসেবেই গ্রাহ্য করবেন । 

আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না । সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত । আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই । এমন কি , এ ক্ষেত্রে দাতাকর্নেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি এই বিশ্বাসে যে , সেখান থেকে তারা একটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে যার সুদে তার বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে । কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক । মনোরাজ্যের দান গ্রহনসাপেক্ষ , অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারেই ভুলে যাই । এ সত্য ভুলে না গেলে আমরা বুঝতাম যে , শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষাদান করার নয় , কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায় । শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন , তার কৌতুহল উদ্বেগ করতে পারেন , তার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগ্রত করতে পারেন,  মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন , তার জ্ঞানপিপাসা কে জ্বলন্ত করতে পারেন , এর বেশি আর কিছু পারেন না । ‍যিনি যথার্থ গুরু তিনি শিষ্যের আত্মাকে উদ্বোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে ব্যাপ্ত করে তোলেন । সেই শক্তির বলে শিষ্য নিজের মন নিজে গড়ে তোলে , নিজের অভিমত বিদ্যা নিজে অর্জন করে বিদ্যার সাধনা  শিষ্যকে নিজে অর্জন করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র । 

আমাদের ইস্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি ঠিক উল্টো । সেখানে ছেলেদের বিদ্যে গেলানো হয়, তারা তা জীর্ন করতে পারুক আর না পারুক । এর ফলে ছেলেরা শারীরিক ও মানসিক মন্দাগ্নিতে জীর্ণশীর্ণ হয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে । একটা জানাশোনা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যায় । আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন যারা শিশু সন্তানকে ক্রমান্বয়ে গরুর দুধ গেলানোটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষা ও বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন । দুগ্ধ অবশ্য অতিশয় উপাদেয় পদার্থ , কিন্তু তার উপকারিতা যে বক্তার ছিন্ন করবার শক্তির উপর নির্ভর করে এ জ্ঞান ওশ্রেনির মাতৃকুলের নেই । তাদের বিশ্বাস ও-বস্তু পেটে গেলেই উপকার হবে । কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে তাহলে সে যে বেয়াড়া ছেলে , সে বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না । অতএব এখন তাকে ধরে বেঁধে জোর জবরদস্তি করে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয় । শেষটায় সে যখন এই দুগ্ধপান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করার জন্য মাথা নাড়াতে , হাত-পা ছুড়তে শুরু করে , তখন স্নেহমহি মাতা বলেন, আমার মাথা খাও , মরামুখ দেখ , এই ঢোক, আর এক ঢোক , আর এক ঢোক ইত্যাদি । মাতার উদ্দেশ্য যে খুব সাধু , সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই , কিন্তু এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, উক্ত বলা কওয়ার ফলে মা শুধু  ছেলের যকৃতের মাথা খান এবং ঢোকার পর ঢোকে তার মরা মুখ দেখবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন । আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষা পদ্ধতিতেও ঐ একই ধরনের । এর ফলে কত ছেলের সুস্থ সরল মন যে ইনফ্যান্টাইল লিভারে গতাসু হচ্ছে তা বলা কঠিন । কেননা দেহের মৃত্যুর রেজিস্ট্রি রাখা হয় , আত্মার হয় না । 

আমরা কিন্তু এই আত্মার অপমৃত্যুতে ভীত হওয়ার দূরে থাক , উৎফুল্ল হয়ে উঠি । আমরা ভাবি দেশে যত ছেলে পাস হচ্ছে ততো শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে । পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয় , এ সত্য স্বীকার করতে আমরা কুণ্ঠিত হই । শিক্ষা শাস্ত্রের একজন জগদ্বিখ্যাত ফরাসি শাস্ত্রী বলেছেন যে , এক সময়ে ফরাসি দেশের শিক্ষা পদ্ধতি এতই বেয়াড়া ছিল যে , সে যুগে France was saved by her idlers ; অর্থাৎ যারা পাশ করতে পারেনি বা চায় নি তারাই ফ্রান্সকে রক্ষা করেছেন । এর কারণ,  হয় তাদের মনের বল ছিল বলে কলেজের শিক্ষাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল , নয় সে শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেই তাদের মনের বল বজায় ছিল । তাই এই স্কুল পালানো ছেলেদের দল থেকে সে যুগের ফ্রান্সের যত কৃতকর্মা লোকের আর্বিভাব হয়েছিল । 

সে যুগে ফ্রান্সে কি রকম শিক্ষা দেওয়া হতো তা আমার জানা নেই । তবুও আমি জোর করে বলতে পারি যে , এ যুগে আমাদের স্কুল কলেজে শিক্ষার যে রীতি চলছে , তার চাইতে সে  শিক্ষাপদ্ধতি কিছুতেই নিকৃষ্ট ছিল না । সকলেই জানেন যে , বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার মহাশয়েরা নোট দেন এবং সেই নোট মুখস্থ করে তারা হয় পাস । এর জুড়ি আর একটি ব্যাপারও আমাদের দেশে দেখা যায় । এদেশে একদল বাজিকর আছে , যারা বন্দুকের গুলি থেকে আরম্ভ করে উত্তরোত্তর  কামানের গুলি পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে । তারপর একে একে সবগুলো উগলে দেয় । এর ভেতরে যে অসাধারণ কৌশল আছে,  সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই  । কিন্তু এই  গেলা আর ওগলানো দর্শকের কাছে তামাশা হলেও বাজিকরের কাছে তা প্রাণান্তকর ব্যাপার । ও কারদানি করা তার পক্ষে যেমন কষ্টসাধ্য , তেমনি অপকারী । বলা বাহুল্য,  সে বেচারা ও লোহার গোলাগুলির এক কনাও জীর্ন করতে পারে না । আমাদের ছেলেরাও তেমনি নোট নামক গুরুদত্ত নানা আকারের ও নানা প্রকারের গোলাগুলি বিদ্যালয় গলাধঃকরণ করে পরীক্ষালয়ে তা উদগীরণ করে দেয় । এ জন্য সমাজ বাহবা দেয় দিক, কিন্তু মনে যেন তা ভাবে যে , এ জাতির প্রাণশক্তি বাড়ছে । স্কুল কলেজের শিক্ষার যে অধিকাংশ ব্যর্থ হয় , অনেক স্থলে মারাক্তক । কেননা আমাদের স্কুল কলেজের ছেলেদের স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ দেয় না , শুধু তাই নয়,  স্বশিক্ষিত হবার শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে । আমাদের শিক্ষা যন্ত্রের মধ্যে যে যুবক নিষ্পেষিত হয়ে বেরিয়ে আসে , তার আপনার বলতে বেশি কিছু থাকে না , যদি না তার প্রাণ অত্যান্ত কড়া হয় । সৌভাগ্যের বিষয় , এই ক্ষীনপ্রাণ জাতির মধ্যেও জনকতক এমন কঠিন প্রাণের লোক আছে , এহেন শিক্ষাপদ্ধতিও তাদের মনকে জখম করলেও একেবারে বধ করতে পারে না । 

আমি লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের উপরে স্থান দেই এই কারনে যে , এর স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায় : প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে । স্কুল-কলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করেছে সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয় , গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য । আমি পূর্বেই বলেছি যে , লাইব্রেরি হাসপাতালে চাইতে কম উপকারী নয় , তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে এক রকম মনের হাসপাতাল । অতঃপর আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে , বই পড়ার পক্ষ নিয়ে এ ওকালতি করবার , বিশেষত প্রাচীন নজির দেখাবার কী প্রয়োজন ছিল ? বইপড়া যে ভালো , তা কে না মানে ? আমার উত্তর- সকলে মুখে মানলেও কাজে মানে না । মুসলমান ধর্মে মানবজাতির দুই ভাগে বিভক্ত । যারা কেতাবি , আর এক যারা তা নয় । বাংলায় শিক্ষিত সমাজে পূর্বদলভুক্ত নয় , একথা নির্ভয় বলা যায় না ; আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মোটের উপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নোট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির পড়েন , দুই-ই বাধ্য হয়ে , অর্থাৎ পেটের দায়ে । সেজন্য সাহিত্যচর্চা দেশে একরকম নেই বললেই হয় ; কেননা , সাহিত্য সাক্ষাৎভাবে উদরপূর্তির কাজ লাগে না । বাধ্য হয়ে বই পড়ায় আমরা এতটা অভ্যস্থ হয়েছি যে , কেউ স্বেচ্ছায় বই পড়লে আমরা তাকে নিস্কর্মার দলেই ফেলে দেই ; অথচ একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না , যে জিনিসের স্বেচ্ছায় না করা যায় , তাতে মানুষের মনের সন্তোষ নেই । একমাত্র উদরপূর্তিতে মানুষের সম্পূর্ণ মনস্তষ্টি হয় না । একথা আমরা সকলেই জানি যে , উদরের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচে না । দেহরক্ষা’ অবশ্যই সকলের কর্তব্য কিন্তু আত্মরক্ষা ও অকর্তব্য হয় । মানবের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে যে মানুষের প্রাণ মনের সম্পর্ক যত হারায় ততই তার দুর্বল হয়ে পড়ে । মনকে সজাগ ও সবল রাখতে না পারলে যাত্রীর প্রাণ যথার্থ স্ফুর্তিলাভ করে না ; তারপর সে জাতি যত নিরানন্দ সে জাতি তত নির্জীব । একমাত্র আনন্দের সংস্পর্শেই মানুষের মনপ্রাণ সজীব, সতেজ ও সরাগ হয়ে ওঠে । সুতরাং সাহিত্যচর্চার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে জাতির জীবনে শক্তির হ্রাস করা । অতএব , কোন নীতির অনুসারেই তা কর্তব্য হতে পারে না । অর্থনীতিতেও নয় , ধর্মনীতিরও নয় । 

কাব্যামৃতে যে আমাদের অরুচি ধরেছে সে অবশ্য আমাদের দোষ নয় , আমাদের শিক্ষার দোষ । যার আনন্দ নেই সে নির্জীব একথা যেমন সত্য , যে নির্জীব তারও আনন্দ নেই , সে কথাও তেমনি সত্য । আমাদের শিক্ষাই আমাদের নির্জীব করেছে । জাতির আত্মরক্ষার জন্য এ শিক্ষার উল্টো টান যে আমাদের টানতে হবে , এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহে । এই বিশ্বাসের বলেই আমি স্বেচ্ছায় সাহিত্যচর্চার স্বপক্ষে এত বাক্য ব্যয় করলুম । সে বাক্য আপনাদের মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছে কিনা জানিনে । সম্ভবত হয়নি । কেননা , আমাদের দুরবস্থার কথা যখন স্মরণ করি , তখন খালি কোমল সুরে আলাপ করা আর চলে না ; মনের আক্ষেপ প্রকাশ করতে মাঝে মাঝেই কড়ি লাগাতে হয় । 

শব্দার্থ টীকা

শেীখিন -রুচিবান । উদ্বাহূ – ঊর্ধ্ববাহু । আহ্লাদে হাত ওঠানো । ডেমোক্রেসি – গণতন্ত্র । সন্দিহান – সন্দেহযুক্ত । সুসারপ্রাচুর্য,স্বচ্ছলতা, সুবিধা । জজ – বিচারক । ভাঁড়েও ভবানী – রিক্ত , শূন্য । আবহমানকাল – চিরকাল । সোল্লাসেআনন্দে । অবগাহন – সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে গোসল । উপায়ান্তর – অন্য কোন উপায় । স্বশিক্ষিত – নিজে নিজে শিক্ষিত । প্রচ্ছন্ন – গোপন । জীর্ণ – হজম । অব্যাহতি – মুক্তি । গতাসু – মৃত । গলাধঃকরণ – গিলে ফেলা । কারদানি – বাহাদুরি । উদরপূর্তি – পেট ভরানো । ডেমোক্রেটিক – গণতান্ত্রিক । দাতাকর্ণমহাভারতের বিশিষ্ট চরিত্র , কুন্তীপুত্র; দানের জন্য প্রবাদতুল্য মানুষ । কেতাবি – কেতাব অনুসরণ করে চলে যারা । 

পাঠ পরিচিতি

” বই পড়া “ প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহ থেকে নির্বাচন করা হয়েছে । একটি লাইব্রেরির বার্ষিক সভায় প্রবন্ধটি পঠিত হয়েছিল । আমাদের পাঠচর্চার অনভ্যাস যে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির জন্য ঘটেছে তা সহজে লক্ষণীয় । আর্থিক অনটনের কারণে অর্থকরী নয় এমন সব কিছুতেই এদেশে অনর্থক বলে বিবেচনা করা হয় । সেজন্য বই পড়ার প্রতি লোকের অনীহা দেখা যায় । শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লব্ধ শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয় বলে ব্যাপকভাবে বই পড়া দরকার । তার জন্য বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে । এর জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন । বাধ্য না হলে লোকে বই পড়ে না । লাইব্রেরিতে লুকিয়ে নিজের পছন্দ অনুযায়ী বই পড়ে যথার্থ শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে । প্রগতিশীল জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সাহিত্য চর্চা করা অবশ্যই বলে লেখক মনে করেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 ÷ 2 =