বঙ্গবাণী

   আব্দুল হাকিম

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস । 

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ ।। 

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন ।। 

আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোনো রাগ । 

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ ।। 

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত । 

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত ।। 

যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন ।। 

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা নিন্দুয়ানী । 

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী ।। 

মারফত ভেদে যার নাহিক গমন । 

হিন্দুর অক্ষরে হিংসে সে সবের গণ ।। 

যে সবে বঙ্গেত জন্ম হিংসে বঙ্গবাণী ।। 

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি ।। 

দেশে ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায় । 

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায় ।। 

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি । 

দেশী ভাষা উপদেশ  মনে হিত অতি ।।  

শব্দার্থ টীকা : হাবিলাষ অভিলাষ ও প্রবল ইচ্ছা । ছিফত গুন । নিরঞ্জন নির্মল ( এখানে সৃষ্টিকর্তা , আল্লাহ ) । বঙ্গবাণী বাংলা ভাষা । মারফতমরমী সাধনা , আল্লাহকে সম্যকভাবে জানার জন্য সাধনা । জুয়ায়যোগায় । ভাগভাগ্য । দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে জুয়ায়এই কবিতাটির সপ্তদশ শতকে রচিত । তৎকালে ও এক শ্রেণীর লোক নিজের দেশ, নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি এমনকি নিজের আসল পরিচয় সম্পর্কেও ছিল বিভ্রান্ত এবং সংকীর্ণচেতা । শিকড়হীন পরগাছার স্বভাবের এসব লোকের প্রতি কবির তীব্র ক্ষোভ বলিষ্ঠ বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন , নিহ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায় ’ । আপে স্বয়ং , আপনি । 

পাঠপরিচিতি : “ বঙ্গবাণী “ কবিতাটি কবি আবদুল হাকিমের “ নূরনামা “ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে । মধ্যযুগীয় পরিবেশে বঙ্গবাষী এবং বঙ্গভাষার প্রতি এমন বলিষ্ঠ বাণীবদ্ধ কবিতার নিদর্শন দুর্বল । 

কবি এই কবিতায় তার গভীর উপলব্ধি ও বিশ্বাসের কথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন । আরবি ফারসি ভাষায় প্রতি কবির মোটেই বিদ্বেষ নেই । এসব ভাষায় আল্লাহ ও মহানবীর স্ততি বর্ণিত হয়েছে।  তাই এসব ভাষার প্রতি সবাই পরম শ্রদ্ধাশীল । যে ভাষায় জনসাধারণের বোধগম্য নয় , যে ভাষায় অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করা যায় না সেসব ভাষাভাষী লোকের পক্ষে মাতৃভাষার কথা বলা বা লেখায় একমাত্র পন্থা । এই কারণেই কবি মাতৃভাষায় গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেছেন । কবির মতে , মানুষ মাত্রেই নিজ ভাষায় স্রষ্টাকে ডাকে আর স্রষ্টাও মানুষের বক্তব্য বুঝতে পারেন । কবির চিত্তে তীব্র ক্ষোভ এজন্য যে , যারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে , অথচ বাংলা ভাষার প্রতি তাদের মমতা নেই , তাদের বংশ জন্মপরিচয় সম্পর্কে কবির মনে সন্দেহ জাগে । কবি সখেদে বলেছেন, এ সব লোক, যাদের মনে স্বদেশের ওর ভাষার প্রতি কিছুমাত্র অনুরাগ নেই তারা কেন এ দেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় না । বংশানুক্রমে বাংলাদেশেই আমাদের বসতি , বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষায় বর্ণিত বক্তব্য আমাদের মর্ম স্পর্শ করে । এই ভাষার চেয়ে হিতকর আর কি হতে পারে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 × 1 =