মমতাদি

          মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় 

শীতের সকাল । রোদে বসে আমি স্কুলের পড়া করছি , মা কাছে বসে ফুলকপি কুটছেন । সে এসেই বলল , আপনার রান্নার জন্য লোক রাখবেন ? আমি ছোট ছেলে-মেয়েও রাখবো । 

নিঃসঙ্কোচ আবেদন । বোঝা গেল সঙ্কোচ অনেক ছিল , প্রাণপণ চেষ্টায় অতিরিক্ত জয় করে ফেলেছি । তাই সেটুকু সংঙ্কোচ নিতান্তেই থাকা উচিত তাও এর নেই । 

বয়স আর কত হবে , বছর তেইশ । পরনে সেলাই করা ময়লা শাড়ি, পাড়টা বিবর্ণ লাল । সীমান্ত পর্যন্ত ঘোমটা , ঈষৎ বিশীর্ণ মুখে গাঢ় শ্রান্তির ছায়া, স্থির অচঞ্চল দুটি চোখ । কপালে একটি ক্ষত-চিহ্ন-আন্দাজে পরা টিপের মতো। 

মা বললেন , তুমি রাধুনী ? 

চমকে তার মুখ লাল হলো । সে চমক ও লালিমার বার্তা বোধহয় মার হৃদয় পেীঁছল, কোমল স্বরে বললেন , বোসো বাছা। 

সে বসল না । অনাবশ্যক জোর দিয়ে বলল , হ্যাঁ আমি রাধুনী । আমায় রাখবেন ? আমি রান্না ছাড়া ছোট ছোট কাজও করব । 

মা তাকে জেরা করলেন । দেখলাম সে ভারি চাপা । মার প্রশ্নের ছাঁকা জবাব দিল, নিজে থেকে একটি কথা বেশি কইল না । সে বলল , তার নাম মমতা । আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে জীবনময়ের গলি  , গলির ভেতরে সাতাশ নাম্বার বাড়ির একতলায় সে থাকে । তার স্বামী আছে আর একটি ছেলে । স্বামীর চাকরি নেই চার মাস , সংসার আর চলে না, সে তাই পর্দা ঠেলে উপার্জনের জন্য বাইরে এসেছে । এই তার প্রথম চাকরি । মাইনে ? সে তা জানে না । দুবেলা রেঁধে দিয়ে যাবে , কিন্তু খাবে না । 

পনের টাকা মাইনে ঠিক হলো । সে বোধ হয় টাকা বারো আশা করেছিল , কৃতজ্ঞতায় দুচোখ সজল হয়ে উঠল । কিন্তু সমস্তটুকু কৃতজ্ঞতায় সে নিরবে প্রকাশ করল , কথা কইল না । 

মা বললেন , আচ্ছা , তুমি কাল সকাল থেকে এসো । 

সে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ চলে গেল । আমি গেটের কাছে থাকে পাকড়াও করলাম । শোন । এখুনি যাচ্ছ কেন ? রান্নাঘরে দেখবে না ? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি এসো । 

কাল দেখবো, বলে সে এক সেকেন্ড দাঁড়ালো না , আমায় তুচ্ছ করে দিয়ে চলে গেল।  ওকে আমার ভাল লেগেছিল , ওর সঙ্গে ভাব করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম , তবু, আমি ক্ষুন্ন হয়ে মার কাছে গেলাম । একটু বিস্মিত হয়েও । যার অমন মিষ্টি গলা , চোখে মুখে যার উপচে পড়া স্নেহ  , তার ব্যবহার এমন রুঢ় ! 

মা বললেন , পিছনে ছুটেছিলি বুঝি ভাব করতে ? ভাবিস না , তোকে খুব ভালবাসবে । বার বার তোর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিল ! 

শুনে খুশি হলাম । রাধুনী পদপ্রার্থীনীর স্নেহ সেদিন অমন কাম্য মনে হয়েছিল কেন বলতে পারি না । 

পরদিন সে কাজ এল । নিরবে নত মুখে কাজ করে গেল। সে বিষয়ে উপদেশ পেলে পালন করল , যে বিষয়ে উপদেশ পেল না নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করল- অনর্থক প্রশ্ন করল না , 

নির্দেশের অভাবে কোন কাজ ফেলে রাখলো না । সে যেন বহুদূর এই বাড়ীতে কাজ করছে কিনা আড়ম্বরে এমন নিখুঁত হলো তার কাজ । 

কাজের শৃঙ্খলা ও ক্ষিপ্রতা দেখে সকলে তো খুশি হলেন , মার ভবিষ্যৎ বাণী সফল করে সে যে আমায় খুব ভালবাসবে তার কোনো লক্ষণ না দেখে আমি হলাম ক্ষুন্ন । দুবার খাবার জল চাইলাম , চার-পাঁচবার রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম  , কিন্তু কিছুতেই সে আমায় ভালোবাসলো না । বরং রীতিমতো উপেক্ষা করল । শুধু আমাকে নয় সকলকে । কাজগুলোকে সে আপনার করে নিল , মানুষগুলির দিকে ফিরেও তাকাল না । মার সঙ্গে মৃদুস্বরে দু একটি দরকারি কথা বলা ছাড়া ছটা থেকে বেলা সাড়ে দশটা অবধি একবার কাশির শব্দ পর্যন্ত করলো না । সে যেন ছায়াময়ী মানবী, ছায়ার মতোই স্লানিমার ঐশ্বর্য মহীয়সী কিন্তু ধরাছোঁয়ার অতীত শব্দহীন অনুভূতিহীন নির্বিকার । 

রাগ করে আমি স্কুলে চলে গেলাম । সে কি করে জানবে মাইনে করা রাঁধুনির দূরে থাকাটাই সকলে তার কাছে আশা করছে না , তার সঙ্গে কথা কইবার বাড়ির ছোট কর্তা চটপট করেছে  ! 

সপ্তাহখানেক  নিজের নতুন অবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সে আমার সঙ্গে ভাব করল । 

বাড়িতে সেদিন কুটুম এসেছিল , সঙ্গে এসেছিল একগাদা রসগোল্লা আর সন্দেশ । প্রকাশ্য ভাগটা প্রকাশ্যে খেয়ে ভাঁড়ার ঘরে গোপন ভাগটা মুখে পুরে চলছি , কোথা থেকে সে এসে খপ করে হাত ধরে ফেলল । রাগ করে মুখের দিকে তাকাতে সে এমন ভাবে হাসল যে লজ্জা পেলাম । 

বলল , দরজার পাশ থেকে দেখেছিলাম,আর কটা খাচ্ছ গুনছিলাম। যা খেয়েছ তাতে বোধ হয় অসুখ হবে , আর খেয়ো না । কেমন ? 

ভর্ৎমনা নয়, আবেদন । মার কাছে ধরা পরলে বকুনি খেতাম এবং এক খাবলা খাবার তুলে নিয়ে ছুটে পালাতাম । এর আবেদনে হাতের খাবার ফেলে দিলাম । সে বলল , লক্ষী ছেলে । এস জল খাবে । 

বাড়ির সকলে কুটুম নিয়ে অন্যত্র ব্যস্ত ছিল , জল খেয়ে আমি রান্নাঘরে আসন পেতে তার কাছে বসলাম । এতদিন তার গম্ভীর মুখে শুধু দেখেছিলাম , আজ প্রথম দেখলাম , সে নিজের মনে হাসছে । 

আমি বললাম , বামুনদি- 

সে চমকে হাসি বন্ধ করলো । এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি তাকে গাল দিয়েছি । বুঝতে না পেরেও অপ্রতিভ হলাম । 

কি হলো বামুনদি ? 

সে এদিক ওদিক তাকালো । ডালে খানিকটা নুন ফেলে দিয়ে এসে হঠাৎ আমার গা ঘেঁষে বসে পড়ল । 

গম্ভীর মুখে বলল , আমায় বামুনদি বোলো না খোকা । শুধু দিদি বোলো । তোমার মা রাগ করবেন দিদি বললে ? 

আমি মাথা নাড়লাম । সে ছোট এক নিঃশ্বাস ফেলে আমাকে এত কাছে টেনে নিল যে আমার প্রথম ভারি লজ্জা করতে লাগল । 

তারপর কিছুক্ষন আমাদের যে গল্প চললো সে অপূর্ব কথোপকথন মনে করে লিখতে পারলে সাহিত্য না হোক আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান লেখা হয়ে উঠত । 

হঠাৎ মা এলেন। সে দুই হাতে আমাকে একরকম জড়িয়েই ধরে ছিল , হাত সরিয়ে ধরা পড়া চোরের মতো হঠাৎ বিব্রত হয়ে উঠল, দুচোখে ভয় দেখা দিল । কিন্তু সে মূহূর্তের জন্য । পরক্ষণে আমার কপালে চুম্বন করে মাকে বলল , এত কথা কইতে পারে আপনার ছেলে । 

তখন বুঝিনি , আজ বুঝি স্নেহে সে আমায় আদর করেনি , নিজের গর্ভ প্রতিষ্ঠার লোভে । মা যদি বলতেন , খোকা উঠে আয় , – যদি কেবল মুখ কালো করে সরে যেতেন, পরদিন থেকে সে আর আসত না । পনের টাকার খাতিরেও না, স্বামী পুত্রের অনাহারে তাড়ণাতেও না । 

মা হাসলেন । বললে ও ওইরকম । সারাদিন বকবক করে । বেশি আস্কারা দিও না , জ্বালিয়ে মারবে । বলে মা চলে গেলেন । তার দু চোখ দিয়ে দুফোঁটা দুর্বোধ্য রহস্য টপটপ করে ঝরে পড়ল । মা অপমান করলে তার চোখ হয়তো শুকনোই থাকত, সম্মানে, চোখের জল ফেলল ! সে সম্মানের আগাগোড়া করুণা ও দয়া মাখা ছিল , সেটা বোধহয় তার সইল না । 

তিন চারদিন পরে তার গালে তিনটে দাগ দেখতে পেলাম। মনে হয় , আঙ্গুলের দাগ । মাস্টারের চড়ে একদিন অবনীর গালে যে রকম দাগ হয়েছিল তেমনি । আমি ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করলাম , তোমার গালে আঙ্গুলের দাগ কেন ? কে চড় মেরেছে ? 

সে চমকে গালে হাত চাপা দিয়া বলল , দূর ! তারপর হেসে বলল , আমি নিজে মেরেছি ! কাল রাত্রে গালে একটা মশা বসেছিল , খুব রেগে – 

মশা মারতে গালে চড় ! বলে আমি খুব হাসলাম । সেও প্রথমটা আমার সঙ্গে হাসতে আরম্ভ করে গালে হাত ঘষতে ঘষতে আনমনা ও গম্ভীর হয়ে গেল । তার মুখ দেখে আমারও হাসি বন্ধ হয়ে গেল । চেয়ে দেখলাম ভাতের হাঁড়ির বুদবুদফাটা বাষ্পে কি দেখে যেন তার চোখ পলক হারিয়েছে , নিচের ঠোঁট দাঁতে দাঁতে কামড়ে ধরছে, বেদনায় মুখ  হয়েছে কালো । 

সন্দিগ্ধ হয়ে বললাম , তুমি মিথ্যে বলছো দিদি । তোমায় কেউ মেরেছে । 

সে হঠাৎ কাঁদ কাঁদ হয়ে বলল , না ভাই, না । সত্যি বলছি না । কে মারবে ? 

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে না পেয়ে আমাকে চুপ করে থাকতে হলো । তখন কি জানি তার গালে চড় মারার অধিকার একজন মানুষের আঠারো আনা আছে ! কিন্তু চর যে কেউ একজন মেরেছে সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ ঘুচল না । শুধু দাগ নয় , তার মুখ চোখের ভাব, তার কথার সুর সমস্ত আমার কাছে ওকথা ঘোষণা করে দিল । বিবর্ণ গালে তিনটি রক্তবর্ণ দাগ দেখতে দেখতে আমার মন খারাপ হয়ে গেল । আমি গালে হাত বুলিয়ে দিতে গেলাম কিন্তু সে আমার হাতটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল । 

চুপি চুপি বলল , কারো কাছে যা পাই না , তুমি তা দেবে কেন ? 

আমি অবাক হয়ে বললাম , কি দিলাম আমি ? 

এ প্রশ্নের জবাব পেলাম না । হঠাৎ এসে তরকারি নামাতে ভারি ব্যস্ত হয়ে পরল । পিঁড়িতে বসামাত্র খোঁপা খুলে পিঠে বাঁচিয়ে একরাশি চুল মেজে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল কি একটা অন্ধকার রহস্যের আড়ালে সে যেন নিজেকে লুকিয়ে ফেলল । 

রহস্য বৈকি । গালে চড়ের দাগ , চিরদিন যে ধৈর্যময়ী ও শান্ত তার ব্যাকুল কাতরতা, ফিসফিস করে ছোট ছেলেকে শোনানো; কারোও কাছে যা পাইনা তুমি তা দেবে কেন ? বুদ্ধির পরিমাণের তুলনায় এর চেয়ে বড় রহস্য আমার জীবনে কখনো দেখা দেয়নি । ভেবেচিন্তে আমি তার চুলগুলো নিয়ে বেনি ‍পাকাবার চেষ্টা আরম্ভ করে দিলাম । আমার আশা পূর্ণ হলো সে মুখ ফিরিয়ে হেসে  রহস্যের ঘোমটা খুলে সহজ মানুষ হয়ে গেল। 

বিকালে আমি জিগ্রাসা করলাম, আচ্ছা , তোমার বরের চাকরি হলে তুমি কি করবে ? 

তুমি কি করতে বল ? হরির লুট দেব? না তোমায় সন্দেশ খাওয়াব । 

ধেৎ তা বলছি না । তোমার বরের চাকরি নেই বলে আমাদের বাড়ি কাজ করছ, তা তো চাকরি হলে করবে না ? 

সে হাসল, করব । এখন করছি যে ! 

তোমার বরের চাকরি হয়েছে । 

হয়েছে বলে সে গম্ভীর হয়ে গেল । 

আহা স্বামীর চাকরি নেই বলে ভদ্রলোকের মেয়ে কষ্টে পড়েছে, পাড়ার মহিলাদের কাছে মার এই মন্তব্য শুনে মমতাদির বরের চাকরির জন্য আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উছেছিলাম ।তার চাকরি হয়েছে শুনে পুলকিত হয়ে মাকে সংবাদটা শুনিয়ে দিলাম । 

মা তাকে ডেকে পাঠোলেন , তোমার স্বমীর চাকরি হয়েছে ? 

সে স্বীকার করে বলল, হয়েছে । বেশি দিন নয় , ইংরাজি মাসের পয়লা থেকে । 

মা বললেন, অন্য লোক ঠিক দিতে পারছ না বলে কি তুমি কাজ ছেড়ে দিতে ইতস্তত করছ ? তার কোনো দরকার নেই । আমরা তোমায় আটকে রাখব না । তোমার কষ্ট দূর হয়েছে তাতে আমরাও খুব সুখী । তুমি ইচ্ছে করলে এবেলাই কাজ ছেড়ে দিতে পার, আমাদের অসুবিধা হবে না । 

তার চোখে জল এল , সে শুধু বলল, আমি কাজ করব । 

মা বললেন, স্বামীর চাকরি হয়েছে , তবু ? 

সে বলল, তাঁর সামান্য চাকরি, তাতে কুলবে না মা । আমায় ছাড়বেন না । আমার কাজ কি ভালো হচ্ছে না ? 

মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, অমন কথা তোমার শত্রুও বলতে পারবে না মা । সেজন্য নয় । তোমার কথা ভেবেই আমি বলছিলাম । তোমার ওপর মায়া বসেছে, তুমি চলে গেলে আমাদেরও কি ভালো লাগবে ? 

সে একরকম পালিয়ে গেল । আমি তার পিছু নিলাম । রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম সে কাঁদছে । আমায় দেখে চোখ মুছল । 

আচমকা বলল, মিথ্যে বললে কি হয় খোকা? 

মিথ্যে বললে কি হয় জানতাম । বললাম, পাপ হয় । 

শুরুনিন্দা বাঁচাতে মিথ্যে বললে ? 

এটা জানতাম না । শুরুনিন্দা পাপ, মিথ্যা বলা পাপ । কোনটা বেশি পাপ সে গ্রায়ান আমার জম্ময়নি । 

কিন্তু না জানা কথা বলেও সান্ত্বনা দেওয়া চলে দেখে বললাম, তাতে একটুও পাপ হয় না । সত্যি ! কাঁদছ কেন ? 

তখন তার চাকরির এক মাস বোধহয় পূর্ন হয়নি । একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরবার সময় দখলাম জীবনময়ের গলির মোড়ে ফেরিওয়ালার কাছে কমলা লেবু কিনছে । 

সঙ্গে নেবার ইচ্ছে নেই টের পেয়েও এক রকম জোর করেই বাড়ি দেখতে গেলাম । দুটি লেবু কিনে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সে গলিতে ঢুকল । বিশ্রী নোংরা গলি । কে যে ঠাট্টা করে এই যমালয়ের পথটার নাম জীবনময় লেন রেখেছিল ! গলিটা আস্ত ইট দিয়ে বাঁধানো, পায়ে পায়ে ক্ষয় হয়ে গেছে । দুদিকের বাড়ির চাপে অন্ধকার, এখানে ওখানে আবর্জনা জমা করা আর একটা দূষিত চাপা গন্ধ । আমি সঙ্কুচিত হয়ে তার সঙ্গে চলতে লাগলাম । সে বলল, মনে হচ্ছে পাতালে চলেছ, না ? 

সাতাশ নম্বরের বাড়িটা দোতলা নিশ্চয় , কিন্তু যত ক্ষুদ্র দোতলা হওয়া সম্ভব । সদর দরজার পরেই ছোট একটি উঠান, মাঝামাঝি কাঠের প্রাচীন দিয়ে দুভাগ করা । নিচে ঘরের সংখ্যা বোধহয় চার, কারণ মমতাদি আমায় যে ভাগে নিয়ে গেল সেখানে দুখানা ছোট ছোট কুঠরির  বেশি কিছু আবিস্কার করতে পারলাম না । ঘরের সামনে দুহাত চওড়া একটু রোয়াক, একপাশে একশিট করোগেট আয়রনের ছাদ ও চটের বেড়ার অস্থায়ী রান্নাঘর । চটগুলি কয়লার ধোঁয়ায় বর্ণ পেয়েছে । 

সে আমাকে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে টুলে বসাল । ঘরে দুটি জানালা আছে এবং সম্ভবত সেই কারণেই শোবার ঘর করে অন্য ঘরখানার চেয়ে বেশি মান দেওয়া হয়েছে । কিন্তু জানালা দুটির এমনি অবস্থান যে আলো যদিও কিছু ‍ ‍কিছু আসে, বাতাসের আসা-যাওয়া একেবারে অসম্ভব । 

সুতরাং পক্ষপাতিত্বের যে খুব জোরালো কারণ ছিল তা বলা যায় না । সংসারের সমস্ত জিনিসই প্রায় এঘরে ঠাঁই পেয়েছে । সব কম দামী শ্রানীন জিনিস । এই শ্রীহীনতার জন্য সযত্নে গুছিয়ে রাজা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে  বিশৃঙ্খলতার অন্ত নেই । একপাশে বড় চেীকি, তাতে গুটানো মলিন বিছান । চেীকির তলে একটি চরকা আর ভাঙ্গা বেতের বাস্কেট চোখে পড়ে, অন্তরালে হয়তো আরও জিনিস আছে । ঘরের এক কোণে পাশাপাশি রক্ষিত দুটি ট্রাংক – দুটিরই রঙ চটে গেছে, একটি তালা ভাঙ্গা । অন্য কোণে কয়েকটা মাজা বাসন , বাসনের ঠিক ঊর্ধ্বে কোনাকুনি টাঙ্গানো দড়িতে খানকয়েক কাপড় । এই দুই কোণের মাঝামাঝি দেওয়াল ঘেঁষে পাতা একটি ভাঙ্গা টেবিল, আগাগোড়া দড়ির ব্যান্ডেজের জোরে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে । টেবিলে কয়েকটা বই-খাতা ,  একটি অল্প দামী টাইমপিস, কয়েকটা ওষুধের শিশি, একটা মেরামত করা আর্সি , কয়েকটা ভাঁজ করা সংবাদপত্র , এই সব টুকিটাকি জিনিস । টেবিলের ঊর্ধ্বে দেওয়ালের গর্তের তাকে কতকগুলি বই । 

ঘরে আর একটি জিনিস ছিল- একটি বছর পাঁচেকের ছেলে । চেীকিতে শুধু মাদুরের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে সে ঘুমিয়ে ছিল । মমতাদি ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে ছেলেটির গায়ে হাত দিল, তারপর শুটানো বিছানার ভেতর থেকে লেপ আর বালিশ টেনে বার করল । সন্তর্পণে ছেলেটির মাথার তলে বালিশ দিয়ে লেপ দিয়ে গা ঢেকে দিল । 

বলল, কাল সারারাত পেটের ব্যথায় নিজেও ঘুমোয়নি, আমাকেও ঘুমোতে দেয়নি । উনি তো রাগ বরে- কই , তুমি লেবু খেলে না ? 

আমি একটা লেবু খেলাম । সে চুপ করে খাওয়া দেখে বলল, মুড়ি ছাড়া ঘরে কিছু নেই, দোকানের বিষও দেব না, একটা লেবু খাওয়াতে তোমাকে ডেকে আনলাম ! 

আমি বললাম, আর একটা লেবু খাব দিদি । 

সে হেসে লেবু দিল, বলল , কৃতার্থ হলাম । সবাই যদি তোমার মতো ভালোবাসত! ঘরে আলো ও বাতাসের দীনতা ছিল । খানিক পরে সে আমায় বাইরে রোয়াকে মাদুর পেতে বসাল । কথা বলার সঙ্গে সংসারের কয়েকটা কাজও করে নিল । ঘর ঝাঁট দিল, কড়ােই মাজল, পানি তুলল, তারপর মশলা বাটতে বসল । হঠাৎ বলল, তুমি  এবার বাড়ি যাও ভাই । তোমার খিদে পেয়েছে । 

শব্দার্থ টীকা : বাছাবৎস বা অল্পবয়সী সন্তান । পর্দা ঠেলে উপার্জন এখানে নারীদের অন্তঃপুরে থাকার প্রথাভঙ্গ করে বাইরে এসে আয়-রোজগার করা বোঝাচে্ছ । অনাড়ম্বরজাঁকজমকহীন । বামুনদিব্রাক্ষ্মনদিদির সংক্ষিপ্ত রূপ । আগে রান্না বা গৃহকর্মে যে ব্রাক্ষ্মণকন্যাগণ নিয়োজিত হতেন তাদের কথ্যরীতিতে বামুনদি ডাকা হতো । অপ্রতিভঅপ্রস্তত । পরদিন থেকে সে আর আসত না না আসার কানণ আত্মসম্মান । মমতাদি টাকার জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ নিয়েছে সত্য কিন্তু তাকে অসম্মান করলে বা সন্দেহের চোখে দেখলে নিজে অপমান বোধ করে চাকরি ত্যাগের সাহস তার ছিল । হরির লুট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দান করা । সংকীর্তনের পর হরির নামে যেভাবে বাতাসা ছড়ানো হয় । 

পাঠপরিচিতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ সরীসৃপ ‘ ( ১৯৩৯ ) গ্রন্থের  অন্তর্ভুক্ত ” মমতাদি গল্প ” । এই গল্পে গৃহকর্মে নিয়োজিত মানুষের প্রতি মানবিক আচরণের দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে । স্কুল পড়ুয়া একটি ছেলে যখন দেখে তাদের বাড়িতে মমতাদি নামে এক গৃহকর্মী আসে , তখন সে আনন্দিত হয় । তাকে নিজের বাড়ির একজন বলে ভাবতে শুরু করে ছেলেটি । মমতাদির সংসারে অভাব আছে বলেই মর্যাদাসম্পন্ন ঘরের নারী হয়েও তাকে অপরের বাড়িতে কাজ নিতে হয় । এই আত্মমর্যাদাবোধ তার সবসময়ই সমুন্নত ছিল । সে নিজে যেমন আদর ও সম্মানপ্রত্যাশী , তেমটি অন্যকেও স্নেহ ও ভালোবাসা দেবার ক্ষেত্রে তার মধ্যে দ্বিধা ছিল না । স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি তাই মমতাদির কাছে ছোট ভাইয়ের মর্যাদা লাভ করে । তাকে নিজ বাসায় নিয়ে গিয়ে যথাসামর্থ্য আপ্যায়ন করে মমতাদি । সম্মান ও সহমর্মিতা নিয়ে মমতাদির পাশেও দাঁড়ায় স্কুলপড়ুয়া ঐ ছেলে ও তার পরিবার । প্রকৃতপক্ষে, আমাদের গৃহকর্মে যাঁরা সহায়তা করে থাকেন তাঁদের সঙ্গে সেীহার্দ্যপূর্ন সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরী । আত্মসম্মানবোধ তাদরও আছে । এই বোধকে মান্য করলে তাঁরাও গৃহস্থের পরিবারকে নিজ পরিবার  হিসেবে গণ্য করবেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 ÷ 2 =