রানার

সুকান্ত ভট্টাচার্য 

রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে 

রানার চলছে খবরের বোঝা হাতে , 

রানার চলছে , রানার ! 

রাত্রির পথে পথে চলে কোন নিষেধ জানে না মানার । 

দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার – 

কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার । 

রানার ! রানার ! 

জানা-অজানার 

বোঝা আজ তার কাঁধে , 

বোঝাই জাহাজ রানার চলছে চিঠি আর সংবাদে ; 

রানার চলছি , বুঝি ভোর হয় হয় , 

আরো জোরে , আরো জোরে , এ রানার দুর্বার দুর্জয় । 

তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন , 

আরব পথ, আরো পথ – বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ । 

অবাক রাতের তারারা , আকাশে মিটমিট করে চায় ; 

কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায় ! 

কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে – 

শহরে রানার যাবেই পেীঁছে ভোরে ; 

হাতে লন্ঠন করে ঠনঠন, জোনাকিরা দেয় আলো 

মাভৈ:রানার ! এখনো রাতের কালো । 

এমনি করেই জীবনের বহু বছরের পিছু ফেলে, 

পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘ মেলে ‘ । 

ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে 

জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে । 

অনেক দুঃখে , বহু বেদনায় , অভিমানে ,অনুরাগে ,

ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে । 

রানার ! রানার !

এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে ? 

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে ? 

ঘরেতে অভাব ; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া , 

রাত নির্জন , পথে কত ভয় , তবুও রানার ছোটে, 

দস্যুর ভয় , তার চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে । 

কত চিঠি লেখে লোকে – 

কত সুখে , প্রেমে , আবেগে , স্মৃতিতে , কত দুঃখে ও শোকে । 

এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও , 

এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ , 

এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে , 

এককথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে । 

দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি , 

এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি – 

রানার ! রানার ! কি হবে এ বোঝা বয়ে ? 

কিভাবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ? 

রানার ! রানার ! ভোর তো  হয়েছে – আকাশ হয়েছে লাল 

আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল ? 

রানার ! গ্রামের রানার ! 

সময় হয়েছে নতুন খবর আনার ; 

শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ 

   ভীরুতা পিছনে ফেলে – 

পেীঁছে দাও এ নতুন খবর , 

অগ্রগতির  ‘ মেলে “ ; 

দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি – 

নেই, দেরি নেই আর , 

ছুটে চলো, ছুটে চলো, আরো বেগে 

দুর্দম , হে রানার ।। 

শব্দার্থ টীকা : রানার ইংরেজি শব্দ “ runner “ – এর আভিধানিক অর্থ যিনি দৌড়ান । এখানে , ‘ডাক হরকরা “ অর্থে ব্যবহার । নতুন খবর আনারডাক হরকরার ব্যাগে মানুষের সুখ-দুঃখের অনেক অজানা সংবাদ থাকে । চিঠি বিলি হলে সে সংবাদ মানুষ জানতে পারে । তাই ডাক হরকরাকে নতুন খবরের বাহক বলা হয়েছে । দুর্বারযাকে নিবারণ করা যায় না । হরিণের মত যার এটি একটি উপমা । হরিণ যেমন নিঃশব্দে  কিন্তু অতি দ্রুত দৌড়ায় , রানারও তেমনি । লন্ঠনহারিকেন বা  তেল দিয়ে চালিত আলোর আধার । ভোর তো হয়েছেআকাশ হয়েছে লালএটি প্রতীক । বাচ্যার্থে রাত্রির অন্ধকারে শেষ হয়ে আকাশে সূর্য উঠেছে । কিন্তু প্রতীকী অর্থে কষ্টের কালিমা দূরীভূত হয়ে সুখের সোনালী আলো দেখা দিচ্ছে । 

পাঠপরিচিতি :  

কবিতাটি শ্রমজীবী মানুষ রানারদের নিয়ে লেখা । তাদের কাজ হচ্ছে গ্রাহকদের কাছে ব্যক্তিগত ও প্রয়োজনের চিঠি পৌঁছে দেওয়া । রানাররা এতটাই দায়িত্বশীল যে কোনো কিছুতেই তাদের কাজের বাঁধা হয়ে উঠে না । রাত হোক , দুর্গম পথ হোক , দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হোক – নিরন্তন তাদের এই কাজ করে যেতে হয় । চিঠি মানে সুখে-আনন্দে দুঃখে-সুখে ভরা সংবাদ । এই সংবাদের জন্যই অপেক্ষায় থাকে প্রিয়জনরা । প্রিয়জনদের কাছে যথা সময়ে এই খবর পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী । রানারদের তাই ক্লান্তি নেই , অবসর নেওয়ার অবকাশ নেই । তারা ছুটছেন তো ছুটছেনই ।  এই মহান পেশায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন তারা যে মানুষ হিসেবে কতটা মহৎ , কবিতাটিতে এই ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 × = 70