শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব

                 মোতাহের হোসেন চৌধুরী 

মানুষের জীবনেকে একটি দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে । জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা, আর মানবসত্ত্বা বা মনুষ্যত্ব উপরের তলা । জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্ত্বার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা । শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে । অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও যে কাজ করে ; ক্ষুৎপিপাসা ব্যাপারটি মানবিক করে তোলাই , তার অন্যতম কাজ । কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া । অন্য কথায় , শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে , তেমনি ও প্রয়োজনীয় দিকও আছে । আর অপ্রয়োজনে দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক । সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয় , কি করে মনোমালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায় । শিক্ষার এ দিকটা যে বড় হয়ে ওঠে না , তার কারন ভুল শিক্ষা ও নিচের তলায় বিশৃংখল জীবসত্তার ঘরটি এমন বিশৃংখল হয়ে আছে যে , হতভাগ্য মানুষকে সব সময় সে সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হয় । উপরের তলার কথা সে মনেই আনতে পারে না । অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি । ধনী-দরিদ্র সকলের অন্তরে সেই একই ধ্বনি উত্থাপিত হচ্ছে : চাই ,চাই আরোও চাই । তাই অন্নচিন্তা তথা অর্থ চিন্তা থেকে মানুষ মুক্তি না পেলে , অর্থসাধনাই জীবনসাধনা নয় – একথা মানুষকে ভালো করে বুঝাতে না পারলেও মানবজীবনে শিক্ষা সোনা ফলাতে পারবে না । ফলে শিক্ষার সুফল হবে ব্যক্তিগত , এখানে সেখানে দু’একটি মানুষ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যটি উপলব্ধি করতে পারবে, কিন্তু বেশিরভাগ লোকেই যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যাবে । 

তাই অন্য চিন্তার নিগড় থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে তা অভিনন্দনযোগ্য । কিন্তু লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন না থাকলে সে চেষ্টাও মানুষকে বেশি দূর নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে হয় না । কারারুদ্ধ আহারতৃপ্ত মানুষের মুল্য কতটুকু ? প্রচুর অন্নবস্ত্র ফেল আলো হওয়ার স্বাদ বঞ্চিত মানুষ কারাগারকেই স্বর্গতুল্য মনে করে । কিন্তু তাই বলে যে তা সত্য সত্যই স্বর্গ হয়ে যাবে, তা নয়। বাইরের আলো হওয়ার স্বাদ পাওয়া মানুষ প্রচুর অন্নবস্ত্র পেলেও কারাগারকে কারাগারেই মনে করবে, বরং কী করে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তাই হবে তার একমাত্র চিন্তা । আকাশ বাতাসের ডাকে যে পক্ষী আকুল, সে কি খাঁচায় বন্দি হবে সহজে দানাপানি পাওয়ার লোভে ? অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড় , এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচায়ক । 

চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধির স্বাধীনতা , আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা যেখানে নেই সেখানে মুক্তি নেই । মানুষের অন্নবস্ত্রের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে এই মুক্তির দিকে লক্ষ রেখে। ক্ষুৎপিপাসা তৃপ্তির মানুষটিকে তৃপ্তি রাখতে না পারলে আত্মার অমৃত উপলব্ধি করা যায় না বলেই ক্ষুৎপিপাসা তৃপ্তির প্রয়োজন । একটা বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখেই অন্নবস্ত্রের সমাধান করা ভালো , নইলে আমাদের বেশি দূর নিয়ে যাবে না । 

তাই মুক্তির জন্য দুটি উপায় অবলম্বন করতে হবে । একটি অন্নবস্ত্রের চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা , আরেকটি শিক্ষা-দীক্ষার দ্বারা মানুষকে মনুষত্বের স্বাদ পাওয়ানোর সাধনা । এ উভয়বিধ চেষ্টার ফলেই মানব জীবনের উন্নয়ন সম্ভব । শুধু অন্নবস্ত্রের সমস্যাকে বড় করে তুললে সুফল পাওয়া যাবে না । আমরা শুধু শিক্ষার উপর নির্ভর করলে সুদীর্ঘ সময়ের দরকার । মনুষ্যত্বের স্বাদ না পেলে অন্নবস্ত্রের চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েও মানুষ সেখানে আছে সেখানেই পড়ে থাকতে পারে ; আবার শিক্ষা-দীক্ষার মারফতে মনুষ্যত্বের স্বাদ পেলেও অন্নবস্ত্রের দুশ্চিন্তায় মনুষ্যত্বের সাধনা ব্যর্থ হওয়া অসম্ভব নয় । 

কোন ভারি জিনিসকে উপরে তুলতে হলে তাকে নিচের থেকে ঠেলতে হয় , আবার উপর থেকে টানতেও হয়; শুধু নিচের থেকে ঠেললে তাকে আশানুরূপ উপরে উঠানো যায় না । মানব উন্নয়নের ব্যাপারে শিক্ষা সেই উপর থেকে টানা , আর সুশৃংখল সমাজব্যবস্থার নিচের থেকে ঠেলা । অনেকে মিলে খুব জোরে উপরে থেকে টানলে নিচের ঠেলা ছাড়াও কোন জিনিস উপরে উঠানো যায় – কিন্তু শুধু নিচের ঠেলায় বেশিদূর উঠানো যায় না । তেমনি আপ্রান প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষার দ্বারাই জীবনের উন্নয়ন সম্ভব , কিন্তু শুধু সমাজ ব্যবস্থার সুশৃঙ্খলতার দ্বারা তা সম্ভব নয় । শিক্ষা-দীক্ষার ফলে সত্যিকার মনুষ্যত্বের ফলে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে , ‘ লোভে পাপ , পাপে মৃত্যু ’ কথাটা বুলিমাত্র সত্য । লোভের ফলে যে মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটে , অনুভূতির জগতে সে ফতুর হয়ে পড়ে , শিক্ষা মানুষকে সে-কথা জানিয়ে দেয় বলে মানুষ লোভের ফাঁদে ধরা দিতে ভয় পায় । ছোট জিনিসের মোহে বড় জিনিস হারাতে যে দুঃখবোধ করে না , সে আর যাই হোক , শিক্ষিত নয় । শিক্ষার আসল কাজ জ্ঞাণ পরিবেশন নয় , মূল্যবোধ সৃষ্টি ; জ্ঞান  

পরিবেশন মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায় হিসেবেই আসে । তাই যেখানে মূল্যবোধের মূল্য পাওয়া হয় না, সেখানে শিক্ষা নেই। 

শিক্ষার মারফতে মূল্যবোধ তথা মনুষত্ব লাভ করা যায়; তথাপি অন্নবস্ত্রের সুব্যবস্থাও প্রয়োজনীয় । তা না হলে জীবনের উন্নয়নে অনেক বিলম্ব ঘটবে । মনুষ্যত্বের তাগিদে মানুষকে উন্নত করে তোলার চেষ্টা ভালো ; কিন্তু প্রাণিত্বের বাঁধন থেকে মুক্তি না পেলে মনুষ্যত্বের আহ্বান মানুষের মর্মে  গিয়ে পৌঁছাতে দেরি হয় বলে অন্ন বস্ত্রের সমস্যার সমাধান একান্ত প্রয়োজন । পায়ের কাঁটার দিকে বারবার নজর দিতে হলে হাঁটার আনন্দ উপভোগ করা যায় না , তেমনি অন্নবস্ত্রের চিন্তায় হামেশা বিব্রত হতে হলে মুক্তির আনন্দ উপভোগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় । তাই দু দিক থেকেই কাজ চলা দরকার । একদিকে অন্নবস্ত্রের চিন্তার বেড়ি উম্মোচন , অপরদিকে মনুষ্যত্বের আহ্বান , উভয়ই প্রয়োজনীয় । নইলে বেড়িমুক্ত হয়েও মানুষ ওপরে যাওয়ার অভাব বোধ করবে, পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো উড়বার আকাঙ্ক্ষা পাখা ঝাপটাবে, কিন্তু উড়তে পারবে না । 

শব্দার্থ টীকা : নিগড় শিকল, বেড়ি । তিমির অন্ধকার । ক্ষুৎপিপাসা ক্ষুধা ও তৃষ্ণা । ফতুর নিঃস্ব , সর্বস্বান্ত । লেফাফাদুরস্তি বাইরের দিক থেকে ত্রুটিহীনতা  কিন্তু ভিতরে প্রতারণা । বেড়িশিকল, শৃঙ্খল । হামেশা সবসময় , সর্বক্ষণ । উম্মোচনউম্মক্ত করা । পিঞ্জরবদ্ধখাঁচায় বন্দী । জীবসত্তাজীবের অস্তিত্ব ।জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্নবস্ত্র চাই । 

মানবসত্তামানুষের অস্তিত্ব । মানবসত্তা বলতে লেখক মনুষ্যত্বকে বুঝিয়েছেন । শিক্ষার মাধ্যমেই মনুষ্যত্ব অর্জন করা যায় । অর্থ চিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি লেখকের মতে আমরা জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে অধিক মনোযোগী । ফলে অর্থচিন্তা আমাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে । অর্থ চিন্তায় ব্যস্ত মানুষ প্রকৃত মনুষত্ব অর্জনে সক্ষম নয় । 

কারারুদ্ধ আহারতৃপ্ত মানুষের মুল্য কতটুকু ? – খাওয়া-পরার সমস্যা মিটে গেলেই জীবনের উন্নয়ন সম্ভব হয় না । এজন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা , বুদ্ধির স্বাধীনতা ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা । শিক্ষার মাধ্যমেই এ স্বাধীনতা অর্জিত হয় । 

পাঠপরিচিতি :  “ শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব “ প্রবন্ধটি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর “সংস্কৃতি কথা “ গ্রন্থের “ মনুষ্যত্ব ” শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ । মানুষের দুটি সত্তা – একটি তার জীবসত্তা , অপরটি মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব । জীবসত্তার প্রয়োজনে অন্নবস্ত্রের চিন্তা থেকে মুক্তি এবং শিক্ষা লাভের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে । শিক্ষার ফলে মনুষ্যত্বের স্বাদ ফেলে অন্নবস্ত্রের  সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে ওঠে । শিক্ষার আসল কাজ মূল্যবোধ সৃষ্টি , জ্ঞান দান নয় ; জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টি উপায়মাত্র । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 5 =