সাহসী জননী বাংলা

                      কামাল চৌধুরী 

তোমার অসুর নৃত্য….ঠা ঠা হাসি….ফিরিয়ে দিয়েছি 

তোদের রক্তাক্ত হাত মুচড়ে  দিয়েছি নয় মাসে 

চির কবিতার দেশ …ভেবেছিলি অস্ত্রে মাত হবে 

বাঙালি অনার্য জাতি , খর্বদেহ … ভাত খায় ,ভীতু 

কিন্তু কি ঘটলো শেষে ,কে দেখালো মহা প্রতিরোধ 

অ আ ক খ বর্ণমালা পথে পথে তেপান্তরে ঘুরে 

উদ্বাস্ত আশ্রয়হীন…পোড়াগ্রাম … মাতৃ অপমানে 

কার রক্ত ছুঁয়ে শেষে হয়ে গেল ঘৃণার কাতুর্জ । 

সাহসী জননী বাংলা, বুকে চাপা মৃতের আগুন 

রাত জেগে পাহারায়…বুড়িগঙ্গা পদ্মা নদীতীরে 

ডাকাত পড়েছে গ্রামে,মধ্যরাতে হানাদার আসে 

ভাই বোন কে ঘুমায় ? জাগে ,নীলকমলেরা জাগে । 

গ্রেনেড উঠেছে হাতে…কবিতার হাতে রাইফেল 

এবার বাঘের থাবা, ভোজ হবে আজ প্রতিশোধে 

যার সঙ্গে যে রকম ,সে রকম খেলবে বাঙালি 

খেলেছি ,মেরেছি সুখে …কান কেটে দিয়েছে তোদের । 

এসেছি আবার ফিরে …রাতজাগা নির্বাসন শেষে 

এসেছে জননী বঙ্গে স্বাধীনতা উড়িয়ে উড়িয়ে… 

শব্দার্থ টীকা

অসুর নিত্যহিন্দু পুরাণ মতে অসুর হলো দেবতাদের শত্রু । দৈত্য বা মানব । অসুর নিত্য হলো দানবদের নৃত্য । এখানে অসুর নিত্য বলতে কবি বাংলাদেশের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দানবীয় ধ্বংসলীলাকে  বুঝিয়েছেন ; রক্তাক্ত হাত মুচড়ে দিয়েছি –  পাকিস্তানি বাহিনী বাঙ্গালীদের রক্তে তাদের হাত রঞ্জিত করেছিল । প্রতিশোধ হিসেবে কবি সেই কলঙ্কিত হাতকে মুছড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন । চির কবিতার দেশ বাংলা ও বাঙালি জাতি কবিতার জন্য বিখ্যাত । এদেশে আছে কবিতার সমৃদ্ধি এক ঐতিহ্য । চির কবিতার দেশ বলতে কবি বাংলাদেশকে বুঝিয়েছেন । বাঙালি অনার্য জাতিআর্যগণ ভারতে আসার বহু পূর্ব থেকেই অনেক জাতির লোক এদেশে বসবাস করতেন । তারা অনার্য হিসেবে পরিচিত । আর্যগণ অনার্যদের ঘৃণার চোখে দেখতেন , অত্যাচার-অবিচার করতেন । কবি বাঙ্গালীদের ও অনার্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন । কিন্তু বাঙালি যে ভীতু নয় , বরং বীরের জাতি কবি তাদের এই ঐতিহাসিক ও সাহসী পরিচয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন ।  বর্নমালা পথে পথেবাঙালির বীরত্ব আর শেীর্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে । সেই ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন । ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের সুমহান প্রেরণার পথ ধরে বাঙালি জাতি এগিয়ে এসেছে মুক্তির পথে,  স্বাধীনতার পথে । কবিতার এই অংশে কবি আমাদের ভাষা প্রেমের উদ্দীপনার চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন । ঘৃণার কার্তুজকার্তুজ শব্দটি এসেছে কারটিজ শব্দ থেকে । এর অর্থ হলো বন্দুকের টোটো । ঘৃনার কার্তুজ বলতে কবি বাঙালি জাতির বিস্ফোরণোম্মুখ ঘৃনার সম্মেলনকে বুঝিয়েছেন । নীলকমলেরা জাগে  নীল কলম অর্থ নীল রঙের পদ্ম । কিন্তু কবি এখানে রূপকথার রাজকুমারদের কথা বলেছেন । আর এই রাজকুমারগন হলেন ৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য দীর্ঘদিন রাত জেগে কাটিয়েছেন । কবিতার হাতে রাইফেলকথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ।১৯৭১ সালে বাঙালি কবিরা কবিতাকেও যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন । অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে প্রতিরোধ ও মুক্তির কথা বলা হয়েছে । এবার বাঘের থাবা –  মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী আক্রমণ বুঝাতে প্রতীকটি ব্যবহার করা হয়েছে । রাতজাগা নির্বাসন শেষে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের ফলে এ দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিটেমাটি ছাড়া হয় । তারা দীর্ঘ নয় মাস নিজ দেশেই কিংবা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয় । কিন্তু তারা এই অবস্থাতেই গড়ে তোলেন প্রবল প্রতিরোধ । নির্ঘুম রাত্রিতে তারা উৎসর্গ করেন প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্য । এক সময় শত্রুকে পরাজিত করে তারা ফিরে আসেন বীরের বেশে । আলোচ্য অংশে কবি তাদের গর্বিত প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হয়েছে । 

পাঠ-পরিচিতি : 

কবি কামাল চৌধুরী ” ধূলি ও সাগর দৃশ্য “ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “ সাহসী জননী বাংলা “ কবিতাটি তার “ কবিতাসংগ্রহ” গ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে- ভীতু ও ভেতো বলে যাদের অভিহিত করা হয়েছিল , সেই মিথ্যাচার ব্যর্থ করে দিয়ে বাঙালি জাতি তাদের শেীর্যের মহিমায় জয় করে নেয় স্বাধীনতা । মুক্তির পতাকা তাদের হাতে । শত্রুর আসুরিক আচরণ , বিকট উল্লাস আর নিসংসতা স্বল্প সময়ে পরাভূত করা সম্ভব হয় এ দেশের মানুষের মনে কাব্যময় স্নিগ্ধতার সঙ্গে সাহসের ইস্পাতদৃঢ়তা আছে বলে । অনাদি অতীতের সংগ্রাম , ভাষার জন্য রক্ত দানের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধকালে ছিল বাঙালির প্রেরণার সম্মনিত সংহতিতে পরাভূত করে অশুভ শক্তিকে । আসলে এসবই বাংলা জননীর প্রাণের উত্তপ্ত স্পন্দনজাত , তার মাটি থেকে উঠে আসা সাহসের ফোয়ারাস্নাত । সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে এই বীরের জাতি বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে ফিরে এসেছে দেশমাতৃকার ক্রোড়ে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

90 ÷ = 18