সুভা

      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে । তাহার দুটি বড়ো বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে । এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে সুভা বলে । 

দস্তরমত অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করিতেছে । 

যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না , এইজন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করিত । সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জম্মগ্রহন করিয়াছে এ কথা সে শিশুকাল ইহতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারনের দুষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত । মনে করিত, আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি । কিন্তু , বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে ? পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরূক ছিল । 

বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরুপ দেখিতেন; কেননা , মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরুপে দেখেন- কন্যার কোনো অসম্পূর্নতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন । বরঞ্চ , কন্যার পিতা বাণীকন্ঠ – সুভাকে তাঁহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেনে একটু বেশি ভালোবাসিতেন; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক গ্রান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন । সুভার কথা ছিণ না ,  কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল- এবং তাহার  ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্র কচি কিশলয়ের মতো কাঁপিয়া উঠিত ।  

কথায় আমরা যে ভাব প্রকাশ করি সেটা আমদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয় , কতকটা তর্জমা করার মতো; সকল সময়ে ঠিক হয় না , ক্ষমতার অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয় । কিন্তু কালো চোখকে কিছিু তর্জমা করিতে হয় না – মন আপনি তাহার উপরে ছায়অ ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো ্রিসারিত কখনো মুদিত হয় ; কখনো উজ্জ্বলভাবে জ্বলিয়া উঠে, কখনো স্ম্লনভাবে নিবিয়া আসে , 

কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগবিদিকে ঠিকরিয়া উঠে । মুখের ভাব বৈ আজম্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর- অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ বঙ্গভূমি । এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে । এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না । সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন । 

গ্রামের নাম চন্ডীপুর । নদীটি বাংলাদেশের  একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো , বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে; নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কূল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায়; দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তহার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে । দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট ; নিম্নতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্ল হৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলিয়াছে । 

বাণীকন্ঠের ঘর নদীর একেবারে উপরেই । তাহার বাঁখারির বেড়া , আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা , আম কাঁঠাল এবং কলার বাগান নেীকাবাহী – মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে । এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কাহারও নজরে পড়ে কি না জানি না , কিন্তু কাজকর্মে যখনি অবসর পায় তখনি সে এই নদীতীরে আসিয়া বসে । 

প্রকৃতি যেন তহাহার ভাষার অভাব পূরন করিয়া দেয় । যেন তাহার হইয়া কথা কয় । নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান , পাখির ডাক, তরুর মর্মর-সমস্ত মিশিয়ে চারিদিকের চলাফেরা-আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়-উপকূলের নিকটে আসিয়া ভাঙ্গিয়া পড়ে । প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি , ইহাও বোবার ভাষা – বড়ো বড়ো  চক্ষুপল্লববিশিষ্ট সুভার যে ভাষা তাহারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার; ঝিল্লিরবপূর্ন তৃনভূমি হইতে শব্দতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত , ভঙ্গি , সংগীত , ক্রন্দন এবং দীঘৃনিশ্বাস । 

এবং মধ্যাহ্নে যখন মাঝিরা জেলেরা খাইতে যাইত , গৃহস্ত্রেরা ঘুমাইত, পাখিরা ডাকিত না , খেয়া-নেীকা বন্ধ থাকিত, সজন জগৎ সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে সহসা থামিয়া গিয়া ভয়ানক বিজনমূর্তি ধারণ করিত, তখন রুদ্র মহাকাশের তলে কেবল একটি বোবা প্রকৃতি এবং একটি বোবা মেয়ে মুখামুখি চুপ করিয় বসিয়া থাকিত- একজন সুবস্তীর্ণ রেীদ্রে, আর-একজন ক্ষুদ্র তরুচ্ছায়ায় । 

সুভার যে গুটিকতক অন্তরঙ্গ বন্ধুর দল ছিল না তাহা নহে । গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি । সে নাম বালিকার মুখে তাহারা কখনো শুনে নাই, কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত- তাহার কথাহীন একটা করূণ সুর ছিল, তাহার মর্ম তাহারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝিত । সুভা কখন তাহাদের আদর করিতেছে, কখন ভর্ৎসনা করিতেছে, কখন মিনতি করিতেছে, তাহা তাহারা মানুষের অপেক্ষা ভালো বুঝিতে পারিত । 

সুভা গোয়ালে ঢুকিয়া দুই বাহুর দ্বারা সর্বশীর গ্রীবা বেষ্টন করিয়া তাহার কানের কাছে আপনার গন্ডদেশ ঘর্ষন করিত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তাহার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার গা চাটিত । 

বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যাইত, তাহা ছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল; গৃহে যে দিন কোনো কঠিন কথা শুনিত সে দিন সে অসময়ে তাহার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসিত – তাহার সহিঞ্ষতাপরিপূর্ন বিষাদশান্ত দৃষ্টিপাত হইতে তাহারা কী -একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদনা যেন বুঝিতে পারিত, এবং সুভার গা ঘেঁষিয়া আসিয়া অল্পে অল্পে তাহার বাহুতে শিং ঘষিয়া ঘষিয়া তাহাকে নির্বাক ব্যাকুলতার সহিত সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করিত । 

ইহারা ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল; কিন্তু তাহাদের সহিত সুভার এরুপ সমকক্ষভাবে মৈত্রী ছিল না, তথাপি তাহারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করিত । বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন- তখন সুভার গরম কোলটি নিঃসংকোচে অধিকার করিয়া সুখনিদ্রার আয়োজন করিত এবং সুভা তাহার গ্রীবা ও পৃষ্ঠে কোমল আঙ্গুলি বুলাইয়া দিলে সে তাহার নিদ্রাকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গেতে এরুপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিত । 

উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার আরো একটি সঙ্গী জুটিয়াছিল । কিন্তু তাহার সহিত বালিকার ঠিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল তাহা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ , সে ভাষাবিশিষ্ট জীব; সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমভাষা ছিল না । 

গোঁসাইদের ছোটো ছেলেটি-তাহার নাম প্রতাপ । লোকটি নিতান্ত অকর্মণ্য । সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন । অকর্মণ্য লোকের একটা সুবিধা এই যে , আত্মীয় লোকেরা তাহাদের উপরে বিরক্ত হয় বটে , কিন্তু প্রায় তাহারা নিঃসম্পর্ক লোকদের প্রিয়পাত্র হয়-কারণ, কোনো কার্যে আবন্ধ না থাকাতে তাহারা সরকারি সম্পত্তি হইয়া দাঁড়ায় । শহরের যেমন এক – আধটা গুহসম্পর্কহীন সরকারী বাগান থাকা আবশ্যক তেমনি গ্রামে দুই-চারিটা অকর্মণ্য সরকারি লোক থাকার বিশেষ প্রয়োজন । কাজে-কর্মে আমোদ-অবসরে সেখানে একটা লোক কম পড়ে সেখানেই তাহাদিগকে হাতের কাছে পাওয়া যায় । 

প্রতাপের প্রধান শখ-ছিল ফেলিয়া মাছ ধরা । ইহাতে অনেক সময় সহজে কাটনো যায় । অবরাহ্নে নদীতীরে ইহাকে প্রায় এই কাজে নিযুক্ত দেখা যাইত । এবং এই উপলক্ষে সুভার সহিত তাহার প্রায় সাক্ষাৎ হইত । সে-কোনো কাজেই নিযুক্ত থাক, একটা সঙ্গী পাইলে প্রতাপ থাকে ভালো । মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শেষ্ঠ-এইজন্য প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝিত । এইজন্য সকলেই সুভাকে সুভা বলিত, প্রতাপ আর-একটু অতিরিক্ত আদর সংযোগ করিয়া সুভাকে ‘সু’ বলিয়া ডাকিত । 

সুভা তেতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতিদূরে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত । প্রতাপের জন্য একটি করিয়া পান বরাদ্দ ছিল , সুভা তাহা নিজে সাজিয়া আনিত । এবং বোধ করি অনেকক্ষন বসিয়া বসিয়া চাহিয়া ইচ্ছা করিত, প্রতাপের কোনো-একটা বিশেষ সাহায্যে করিতে, একটা-কোনো কাজে লাগিতে, কোনোমতে জানাইয়া দিতে যে এই পৃথিবীতে সেও একজন কম প্রয়োজনীয় লোক নহে । কিন্তু কিছুই করিবার ছিন না । তখন সে মনে মনে বিধাতার কাছে অলেীকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করিত- মন্ত্রবলে সহসা এমন একটা আশ্চর্য কান্ড ঘটাইতে ইচ্ছা করিত যাহা দেখিয়া প্রতাপ আশ্চর্য হইয়া যাইত, বলিত, ‘ভাই তো, আমাদের সুভির যে এত ক্ষমতা তাহা তো জানিতাম না ।’ 

মনে করো , সুভা যদি জলকুমারী হইত , আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটা সাপের মাথার মণি ঘাটে রাখিয়া যাইত; প্রতাপ তাহার তুচ্ছ মাছ ধরা রাখিয়া সেই মানিক লইয়া জলে ডুব মারিত; এবং পাতালে গিয়া দেখিত, রূপার অট্টালিকায় সোনার পালঙ্কে- কে বসিয়া ? – আমাদের বাণীকন্ঠের ঘরের সেই বোবা মেয়ে সু- আমাদের সু সেই মণিদীপ্ত গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা । তাহা কি হইতে পারিত না । তাহা কি িএতই অসম্ভব । আসলে কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু তবুও সু প্রজাশূন্য পাতালের রাজবংশে না জন্মিয়া বাণীকন্ঠের ঘরে আসিয়া জন্মিয়াছে এবং গোসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না । 

গভীর পূর্ণিমারাত্রে সে এক-একদিন ধীরে শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখে পূণিমাপ্রকৃতিও সুভার মতো একাকিনী সুপ্ত জগতের উপর জাগিয়া বসিয়া- যেীবনের রহস্যে পুলকে বিষাদে অসীম নির্জনতার একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত , এমন-কি, তাহা অতিক্রম করিয়াও ধম্থম্ করিতেছে, একটি কথা কহিতে পারিতেছে না । এই নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রান্তে একটি ব্যাকুল বালিকা দাঁড়াইয়া । 

এদিকে কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা চিন্তিত হইয়া উঠেয়াছেন । লোকেও নিন্দা আরম্ভ করিয়াছে । এমন-কি এক-ঘরে করিবে এমন জনরবও শুনা যায় । বাণীকন্ঠের সচ্ছল অবস্থা, দুই বেলাই মাছভাত খায়, এজন্য তাহার শত্রু ছিল । 

স্ত্রীপুরুষে বিস্তর পরামর্শ হইল । কিছুদিনের মতো বাণী বিদেশে গেল । 

অবশেষে ফিরিয়া আসিয়া কহিল, “চলো, কলিকাতায় চলো।” 

বিদেশযাত্রার উদ্যোগ হইতে লাগিল । কুয়াশা-ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে একেবারে ভরিয়া গেল । একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা- বশে সে কিছুদিন হইতে ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তাহার বাপ-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত-ডাগর চক্ষু মেলিয়া তাঁহাদের মুখের দিকে চাহিয়া কী-একটা বুঝিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তাঁহারা কিছু বুঝাইয়া বলিতেন না । 

ইতিমধ্যে একদিন অপরাহ্নে ছিপ ফেলিয়া প্রতাপ হাসিয়া কহিল, “কি রে সু, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস? দেখিস আমাদের ভুলিস নে ।” বলিয়া আবার মাছের দিকে মনোযোগ করিল । 

মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, নীরবে বলিতে থাকে ‘আমি তোমার কাছে কী দোষ করিয়াছিলাম’, সুভা তেমনি করিয়া প্রতাপের দিকে চাহিল; সেদিন গাছের তলায় আর বসিল না । বাণীকন্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিলেন, সুভা তাঁহার পায়ের কাছে বসিয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া কাঁদিতে লাগিল । অবশেষে তাহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া বাণীকনে্ঠর শুষ্ক কপোলে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল । 

কাল কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির হইয়াছে । সুভা গোয়ালঘরে তাহার বাল্য – সখীদের কাছে বিদায় লইতে গেল, তাহাদিগকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া, গলা ধরিয়া একবার দুই চোখে যত পারে কথা ভরিয়া তাহাদির মুখের দিকে  চাহিল- দুই নেত্রপল্লব হইতে টপটপ করিয়া অশ্রুজল পড়তে লাগিল । 

সেদিন শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি । সুভা শয়নগৃহ হইতে বাহির তাহার সেই চিরপরিচিত নদীতটে শষ্পশয্যায় লুটািইয়া পড়িল- যেন ধরণীকে, এই প্রকান্ড মূক মানবতাকে দুই বাহুতে ধরিয়া বলিতে চাহে, “ তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না , মা । আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো ।  ( সংক্ষিপ্ত ) 

শব্দর্থ টীকা : গর্ভের কলঙ্কসন্তান হিসেবে কলঙ্ক , গর্ভ হলো মায়ের পেট যে ব্যক্তি বা বস্তকে পরিবারে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয় তা হলো কলঙ্ক । সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্টবড় পাতাবিশিষ্ট, দীর্ঘ হলো বড়, ‘ সু ‘ যুক্ত হয়ে ‘বড়’ কে বিশেষায়িত করা হয়েছে । পল্লব হলো পাতা । এখানে চোখের পাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে । ওষ্ঠাধরওষ্ঠ এবং অধর, উপরের ও নিচের ঠোঁট [ ওষ্ঠ + অধর= অষ্ঠধর ] কিশলয়গাছের নতুন পাতা । তর্জমাঅনুবাদ, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় বলা বা লেখা । অস্তমানডুবন্ত, ডুবে যাচ্ছে এমন, চন্দ্র-সূর্যের পশ্চিম দিকে অদৃশ্য অবস্থা । অনিমেষঅপলক, পলকহীন , উদয়াস্ত উদয়+অস্ত=উদয়াস্ত= উদয়াস্ত, আবির্ভাব ও তিরোভাব উঠা ও ডুবা । ছায়ালোকছায়া+আলোক= ছায়ালোক । কোনো বস্তুর ওপর আলো পড়লে যে প্রতিবিম্ব হয় তা হলো ছায়া  । বিজন সহত্ত্ব  – বিজন- জনশূন্য , নির্জন । মহত্ত্ব – অবদান । বিজন মহত্ত্ব- কোলাহলমুক্ত প্রকৃতির অবস্থার যে আকর্ষনীয় দিক । তন্বীক্ষীন ও সুগঠিত অঙ্গবিশিষ্ট । বাঁখারিকাঁধের দুদিকে দুপ্রান্তে ঝুলিয়ে বোঝা বহনের বাঁশের ফালি । ঢেঁকিশালাযে ঘরে ঢেঁকি রাখা হয় । ঢেঁকি হলো ধান থেকে চাল তৈরীর লোকজ যন্ত্র । এখনো গ্রামীণ জীবনে অনেক বাড়িতে ঢেঁকির ঘর আছে । গার্হস্থ্য সচ্ছলতাপারিবারিক দৈনন্দিন জীবনের সচ্ছলতা । চিরনিস্তব্ধ হৃদয় উপকূলশান্ত হৃদয় । নিস্তব্ধ হলো আলোড়নহীন অবস্থা । উপকূল হলো কূলের সদৃশ । এখানে হৃদয় উপকূল বলতে হৃদয়ের কিনাবার কথাই বলা হয়েছে । ঝিল্লিরবপূর্ন ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ / শব্দে মুখর । বিজনমূর্তি নির্জন অবস্থা । বিজন হলো নির্জন বা জনমানবশূন্য , মূর্তি হলো কোনোকিছুর প্রতিকৃতি । বিজনমূর্তি শব্দটি এখানে কোলাহলহীন অবস্থা বা নির্জন / জনমানবশূন্য অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে । গন্ডদেশগাল । মূকবধির , বোবা । বিষাদশান্ত দুঃখমগ্ন , বিষাদ= স্ফূর্তিশূন্যতা , বিষন্নতা । বিষাদশান্ত হলো খুববেশি বিষাদগ্রস্ততা থেকে যে শান্ত অবস্থা । পূুর্ণিমাতিথিচাঁদের পরিপূর্ন রূপ হওয়ার সময় । কন্যাভারগ্রস্থ পিতামাতাযে পিতা মাথার বিবাহযোগ্যা কন্যা সন্তানের বিয়ে হয়নি । কপোলগাল । নেত্রপল্লব চোখের পাতা । শুক্লাদ্বাদশীচাঁদের দ্বিতীয় দিন । 

পাঠ-পরিচিতি : সুভা গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত “গল্পগুচ্ছ ‘ থেকে সংকলিত হয়েছে । বাক্প্রতিবন্ধী কিশোরী সুভার প্রতি লেখকের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও মমত্ববোধে গল্পটি অমর হয়ে আছে । সুভা কথা বলতে পারে না । মা মনে করেন , এ তার নিয়তির দোষ, কিন্তু বাবা তাকে ভালোবাসেন । আর কেউ তার সঙ্গে মেশে না খেলে না । কিন্তু তার বিশাল একটি আশ্রয়ের জগৎ আছে । যারা কথা বলতে পারে না সেই পোষা প্রাণীদের কাছে সে মুখর । তাদের সে খুবই কাছের জন । আর বিপুল নির্বাক প্রকৃতির কাছে সে পায় মুক্তির আনন্দ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত প্রতিবন্ধী মানুষের আশ্রয়ের জন্য একটি জগৎ তৈরি করেছেন এবং সেই সঙ্গে তাদের প্রতি আমাদের মমত্ববোধের উম্মেষ ঘটাতে চেয়েছেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 3 =