স্বাধীন বাংলাদেশ

 ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে । স্বাধীনতা লাভের জন্য বাঙালিরা অনেক দুঃখ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছে । ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে  । পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের হাত থেকে মুক্তি লাভের আশায় পূর্ববাংলার জনগণ আওয়ামী লীগকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয় । কিন্তু প্রচুর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগেকে ক্ষমতা প্রদান করতে নানারকম ষড়যন্ত্র শুরু করে  । ১৯৭১  সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন  । ২ মার্চ এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন । ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানায়  । ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়  । ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । ১০  এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠিকতা  শুরু হয় । দীর্ঘ নয়  মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে  ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন হয়  । ৯৩ হাজার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্য এই দিন আত্মসমপর্ণ করে । বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে । স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারকে মোকাবেলা করতে হয় । ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামরিক শাসনের সূত্রপাত ঘটে ।  বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা শুরু হয় । দেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যায় । 

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় : 

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে । পাকিস্তানি সামরিক শাসন চক্র আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তরের নানা চক্রান্ত শুরু করে । ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন । ভুট্টো ঢাকায় অধিবেশনে যোগদান করতে অস্বীকার করেন , অন্যান্য সদস্যদেরও তিনি হুমকি দেন । এসবই ছিল ভুট্টো ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্রের ফল । ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ ভুট্টোর ঘোষণাকে অজুহাত দেখিয়ে ৩  মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন । সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোন প্রকার আলোচনা না করে অধিবেশন স্থগিত করায় পূর্ববাংলার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে উঠে । অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহব্বানে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয় । ফলে সকল সরকারি কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে । হরতাল চলাকালে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু লোক হতাহত হয় । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন । এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ তারিখে বিশাল এক জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ দান করেন । এ ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান ।  দীর্ঘ ৯ মাস রক্ত ক্ষয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে  । 

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষন ও স্বাধীনতার আনুষ্ঠিকতা যাত্রা : 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন ।  এ ভাষনে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষন-শাসন , বঞ্চনার ইতিহাস , নির্বাচনে জয়ের পর বাঙ্গালীর সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমিতে তুলে ধরেন । বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ ভাষন এক স্মরণীয় দলিল । পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ঐতিহাসিক ভাষণের নজির আছে ৭ মার্চের ভাষন তার অন্যতম ; পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের নিকট এ ভাষন অমর হয়ে থাকবে । 

৭ মার্চের ভাষন থেকে বাঙ্গালী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায় । এ ভাষন এর পরেই বাঙালি জাতির সামনে একটি গন্তব্য নির্ধারণ হয়ে যায় , “ তা হল স্বাধীনতা “ । ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ডাক দেন ,  সে ডাকেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে । বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পরবর্তী করণীয় ও স্বাধীনতা লাভের দিকনির্দেশনা ছিল – “ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল । তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে । তিনি আরো বলেছেন  “ রক্ত যখন দিয়েছি,  রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ । এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,  এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম । এ ভাষণে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রাম , যুদ্ধের কলাকৌশল  ও  শত্রু মোকাবেলা উপায় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দেন । ৭ মার্চের ভাষনে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ চালায় এবং নৃশংস গণহত্যা শুরু করে । বাঙালিরা আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং বঙ্গবন্ধুর ৭  ই মার্চের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে । 

স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা : 

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত কর্মসূচি এবং আহ্বানের প্রতি সকল স্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয় । পূর্ব বাংলার সকল অফিস , আদালত,  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,  কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় । পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করতে । এ সময় ভুট্টো ও ঢাকায় আসেন । অপরদিকে গোপনে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ , পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য,  গোলাবারুদ এনে পূর্ববাংলায় সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে । ১৭ মার্চ টিক্কা খান , রাও ফরমান আলী  “ অপারেশন সার্চ লাইট “ বা বাঙালির উপর নিরস্ত্র হত্যাকাণ্ড নীল নকশা তৈরি করেন । ২৫ সার্চ রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা , অপারেশন সার্চলাইট “ শুরূ হয় । ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো  ২৫ মার্চ গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন  । ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । হত্যা করে বহু মানুষকে । পাকিস্তানি বাহিনীর ঢাকা রাজার বাগ পুলিশ ক্যাম্প , পিলখানা বিডিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আক্রমণ চালায় এবং নিরস্ত্র হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে ইতিহাসে যা ২৫ মার্চের কালো রাত্রি নামে পরিচিত । ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং ওয়্যারলেসযোগে তা পাঠিয়ে দেন । বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী শোনামাত্রই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় । শুরু হয় পাকিস্তানি সশস্ত্র সেনাদের সঙ্গে বাঙালি, আনসার ও  নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের এক অসম লড়াই যা বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত ।  ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুমানিক রাত ১টা ৩০ মিনিটে ( মধ্যরাতে ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় । 

স্বাধীনতার ঘোষণা : 

গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ২৫ মার্চ রাত ১২ টার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । ঘোষণাটি ছিল ইংরেজিতে , যাতে বিশ্ববাসী ঘোষনাটি বুঝতে পারেন । স্বাধীনতা ঘোষণার বাংলা অনুবাদ , “ ইহাই হয়ত আমর শেষ বার্তা, আজ হইতে  বাংলাদেশ স্বাধীন । আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি যে , যে যেখানে আছো , যাহার যা কিছু আছে , তাই নিয়ে রুখে দাড়াও , সর্বশক্তি নিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ কর । পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও “ ( বাংলাদেশ গেজেট , সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী , ৩ জুলাই, ২০১১ । স্বাধীনতার এই ঘোষণা বাংলাদেশের সকল স্তরের তদানিন্তন ইপিআর এর ট্রান্সমিটার , টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়  । বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ হান্নান চট্টগ্রামের বেতারকেন্দ্র থেকে একবার এবং সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দ্বিতীয়বার প্রচার করেন । ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় একই বেতার কেন্দ্র থেকে সামরিক অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সমর্থনে বক্তব্য প্রদান করেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং এর প্রতি বাঙালির সামরিক , আধা সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর সমর্থন ও অংশগ্রহণের খবরে স্বাধীনতাকামী জনগণের উজ্জীবিত হয় । 

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম : 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন । পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করলে তা প্রতিহত করার নির্দেশ দেন ।  দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ , বঞ্চনা , অত্যাচার-নিপীড়ন থেকে স্থায়ী মুক্তির প্রত্যাশায় বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করে । 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মেহেরপুর জেলায় বৈদ্যনাথ তলায় আম্রকাননকে নামকরণ করা হয় মুজিবনগর । মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা , সুহংহত করা  এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০ – এর সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ ই এপ্রিল “ মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয় । এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার । ঐ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় , বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ । মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ ই এপ্রিল । শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় । 

মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কাঠামো ছিল নিম্নরূপ : – 

১) রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।

২) উপ-রাষ্ট্রপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম ( বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ) 

৩) প্রধানমন্ত্রী : তাজউদ্দিন আহমেদ 

৪) অর্থমন্ত্রী : এম.মনসুর আলী 

৫) স্বরাষ্ট্র , ত্রান ও পুনর্বাসন মন্ত্রী : এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান 

৬) পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী : খন্দকার মোশতাক আহমেদ 

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে উপদেশ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয় । ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ( ভাসানী ন্যাপ ) মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী , ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি , ( মোজাফফর ন্যাপ ) অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ , কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং , জাতীয় কংগ্রেসের শ্রী মনোরঞ্জন ধর , তাজউদ্দিন আহমেদ ( বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ) ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ  ( বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী )- কে নিয়ে মোট ছয় সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয় । মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল এম এ জি ওসমানী । 

মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম : 

১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য দ্বারা মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয় । 

বাঙালি কর্মকর্তাদের নিয়ে এ সরকার প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেছিল । এতে মোট  ১২ টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ছিল । এগুলো হলো : – প্রতিরক্ষা,  পররাষ্ট্র,  অর্থ,  শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়,  মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়,  সাধারণ প্রশাসন,  স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ,  ত্রাণ ও পূনর্বাসন বিভাগ,  প্রকৌশল বিভাগ,  পরিকল্পনা কমিশন ও  যুব ও অভ্যর্থনা শিবির  নিয়ন্ত্রণ বোর্ড । মুজিবনগর সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর : – কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ,  স্টকহোম প্রভৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন করেন । এসব মিশন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে  । সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করেন । তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব নেতৃত্ব ও জনমতের সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করেন । ১০ ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক , বেসামরিক জনগণকে নিয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় । সরকার বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করেন ।  এছাড়া বেশকিছু সাব-সেক্টর এবং তিনটি ব্রিগেড ফোর্স গঠিত হয় । এসব বাহিনীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তা , সেনা সদস্য,  পুলিশ,  ইপিআর,  নেী ও  বিমান বাহিনীর সদস্যগণ যোগদান করেন । প্রতিটি সেক্টরে নিয়মিত সেনা , গেরিলা ও  সাধারণ যুদ্ধ ছিল ।  এরা মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিফৌজ নামে পরিচিত ছিল । এসব বাহিনীতে দেশের ছাত্র , যুবক ,নারী ,কৃষক ,রাজনৈতিক দলের কর্মী ,- সমর্থক শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল । বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধোগণ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সামরিক ছাউনি বা আস্তানায় হামলা চালায় । মুক্তিযুদ্ধে সরকারের অধীন বিভিন্ন বাহিনীর ছাড়াও বেশ কয়েকটি বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছিল । এসব সংগঠন স্থানীয়ভাবে পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল । যেমন , টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর কথা স্মরণীয় হয়ে আছে । ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাগণ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে দেশকে পাকিস্তানের দখলমুক্ত করার জন্য রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছেন , অনেকেই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন , অনেকে আহত হয়েছিলেন । 

মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণ ও পেশাজীবীদের ভূমিকা : 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে বাঙালি ছাত্র ,জনতা ,পুলিশ  ইপিআর ( ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল ) সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়  । বিনা প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালিরা ছাড় দেয়নি। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন রণাঙ্গনে শহীদ হন । তাই মুক্তিযোদ্ধাদের এ ঋণ কোনও দিন শোধ হবে না । জাতির চিরকাল মুক্তিযোদ্ধাদের সূর্য সন্তান হিসেবে মনে করবে । মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তারা ছিল দেশপ্রেমিককে ,অসীম সাহসী এবং আত্মত্যাগে উদ্বদ্ধ যোদ্ধা । মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্ট সৈনিক , ইপিআর, পুলিশ ,আনসার, কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের বাঙালিরা অংশগ্রহণ করে । তাই এই যুদ্ধকে “ গনযুদ্ধ “ বা জনযুদ্ধ ও বলা যায় । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ । তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, পেশাজীবী ,নারী ,সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে । জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে । 

রাজনৈতিক দল : 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ । রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুক্তিযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ । আওয়ামী লীগ প্রথমে পূর্ব বাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনের সংঘটিত করে , এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর জনগণকে স্বাধীনতা উদ্বুদ্ধ করে । ফলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে । মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশ সরকার গঠন করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে ১০ এপ্রিল , ১৯৭১  আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে । এতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও উপযোগিতা এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণীত হয় । ২৫ মার্চের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বে সংঘটিত হয় সরকার গঠন,  মুক্তিবাহিনী গঠন,  বিদেশে জনমত সৃষ্টি ও সমর্থন আদায়ে যুদ্ধের অস্ত্র সংগ্রহ এবং জনগণের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে সকল শক্তি মেধা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়  । মুক্তিযুদ্ধ নেতৃত্বদান,  ভারত ১ কোটি  শরণার্থী ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা , মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব । 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – ন্যাপ ( ভাসানী ) , ন্যাপ ( মোফাফ্ফর ) , কমিউনিস্ট পার্টি , জাতীয় কংগ্রেস ইত্যাদি । এসব দলের নেতা ও কর্মীরা অনেকেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন । 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর সমর্থনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ,পিডিপিসহ কতিপয় দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে । দলগুলো শান্তি কমিটি,  রাজাকার,  আলবদর ,  আলশামস নামক বিশেষ বাহিনী গঠন করে । এসব বাহিনী হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও নারীর সম্মান হানির মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের লিপ্ত ছিল। স্বাধীনতাবিরোধী এ বাহিনীগুলো মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙ্গালীদের মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের কে হত্যা করে। 

ছাত্র সমাজ: 

পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে বাঙালি জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্র সমাজ । ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন , ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এর বিরুদ্ধে আন্দোলন , ১৯৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলন , ১৯৬৮ সালে ১১ দফার আন্দোলন , ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান , ১৯৭০ এর নির্বাচন , ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন,  প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ।১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় । অনেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করে । মুক্তিবাহিনীতে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি । মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখায় এক বিরাট অংশ ছিল ছাত্র । মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল মূলত : ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে । ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো । 

পেশাজীবী : 

সাধারণ অর্থে যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তারাই হলেন পেশাজীবী । যেমন : -শিক্ষক ,চিকিৎসক ,প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিক ,প্রযুক্তিবিদ ,সাংবাদিক ,আমলা, বিজ্ঞানী সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদের ভূমিকা অনন্য ও গৌরবদীপ্ত । পেশাজীবীদের বরং সব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নেয় । পেশাজীবীরা মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে বিশ্ববাসীর কাছে বাঙ্গালীদের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ ,সাহায্য আবেদন ,বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তাদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন । 

মুক্তিযুদ্ধে নারী : 

মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল । ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তাদের নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বত:স্ফূর্ত । মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়  । অপরদিকে সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-যত্ন , মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ দেশের অগণিত নারী মুক্তি সেনা । 

ওয়ালপেপার সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হয় প্রায় তিন লক্ষ নারী । তারাও মুক্তিযুদ্ধাদের সহযাত্রী এবং তাদের স্বীকৃতি হিসাবে সরকারিভাবে তাদের ” বীরাঙ্গণা “ উপাধি দেওয়া হয় । 

গণমাধ্যম : 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম । সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে । ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন । পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ , দেশাত্মবোধক গান , মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে । মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে। এ ছাড়া , মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে । 

জনসাধারণ : 

সাধারণ জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বাধীনতার প্রতি ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষার ফলেই মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে । পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক সদস্য ব্যতীত সবাই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে , শত্রুর অবস্থান ও চলাফেরা তথ্য দিয়েছে , খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করেছে , সেবা দিয়েছে ও খবরা-খবর সংগ্রহ করেছে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষুদ্রনীগোষ্ঠী জনগণ এতে অংশগ্রহণ করে । অনেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ছিল অধিক । এদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন মানচিত্র , লাল-সবুজ পতাকা । 

প্রবাসী বাঙালি : 

প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন । বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন । বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে পার্লামেন্ট সদস্যদের নিকট জুড়ে দিয়েছেন , বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন , পাকিস্তানের অস্ত্র গোলাবারুদ সরবরাহ না করতে সরকারের নিকট আবেদন করেছেন । এক্ষেত্রে বৃটেনের প্রবাসী বাঙ্গালীদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে তারা কাজ করেছেন । 

শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী : 

মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ । তথাপি যুদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী , বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীরা অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয় । পত্র-পত্রিকা লেখা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খবর পাঠ , দেশাত্মবোধক গান ,মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান ,কবিতা পাঠ, নাটক , কথিকা , এম আর আকতার মুকুলের অত্যন্ত জনপ্রিয় “ চরমপত্র “ অনুষ্ঠান এবং “ জল্লাদের দরবার “ ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে । এসব রণক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধাদের মানসিক ও নৈতিক বল ধরে রাখতে সহায়তা করেছে , সাহস যুগিয়েছে , জনগণকে শত্রুর বিরুদ্ধে দুর্দমনীয়  করেছে । 

স্বাধীনতা অর্জনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান : 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান অপরিসীম । বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন । নানা অত্যাচার নিপীড়ন সহ্য করেছেন । স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবন বাজি রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন । 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব : 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তার সারা জীবনের কর্মকাণ্ড , আন্দোলন-সংগ্রাম নির্দেশিত হয়েছে বাঙালির জাতির মুক্তির লক্ষ্য । এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা উদ্যোগী হন । “ ৪৮ ও “ ৫২ – র ভাষা আন্দোলনের তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন । তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের মধ্যে অন্যতম । কি সংবাদ, কি রাজপথ , বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে তার কন্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার । ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন , ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান , ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ,১৯৬৬ সালে “ আমাদের বাঁচার ছয় দফা দাবি ও ৬- দফা ভিত্তিক আন্দোলন , “ ৬৯ – এর গণঅভ্যুত্থান , ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয় , ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা অর্জনে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । 

পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন । ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্র আক্রমণ ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রত্যুষে তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । সংগ্রামের পথধরে ১৯৭১‘ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন । তার নামেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় । তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি । তাঁর বলিষ্ঠ ও আপোষহীন নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন জাতির জনক, স্বাধীনতার মহানায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি । 

তাজউদ্দিন আহমেদ : 

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন । তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর । মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত মুজিবনগর সরকারের ( ১০ এপ্রিল , ১৯৭১ ) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এই মহান নেতা । ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল তিনি বেতার ভাষণে মুজিবনগর সরকার গঠনের কথা প্রচার করেন । বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তিনি সফল নেতৃত্ব প্রদান করেন । মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত উপদেষ্টা কমিটির তিনি আহ্বায়ক ছিলেন । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত । 

সৈয়দ নজরুল ইসলাম : 

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা । তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন । বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও সফল করার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান । সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অন্যতম সংগঠক ও পরিচালক ছিলেন । 

ক্যাপ্টেন এম.মুনসুর আলী : 

ক্যাপ্টেন এম.মনসুর আলী আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন । সে সময়ে খাদ্য ,বস্ত্র ,অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য অর্থের সংস্থান খুবই গুরু দায়িত্ব ছিল । তিনি সফল ভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন । 

এ.এইচ.এম . কামরুজ্জামান : 

কামরুজ্জামান আওয়ামী লীগের আর একজন শীর্ষ নেতা । মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সরকারের স্বরাষ্ট্র , ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন । সে সময় তিনি ভারতে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ লক্ষ শরনার্থীদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহের,  ত্রান শিবিরের ত্রান বিতরণ এবং পরবর্তীতে শরণার্থীদের পুনবার্সন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন । বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার অবদান অপরিসীম । 

অন্যান্য নেতৃবৃন্দ : 

অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকা ছিল  উল্লেখযোগ্য । তিনি ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা ( ১৯৬৮-৬৯ ) থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির ব্যাপারে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থান করে বিভিন্ন দেশের প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন দান ও পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান । এছাড়া অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ( ন্যাপ মোজাফফার ) ও কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিংও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য গঠি “ উপদেষ্টা কমিটিত “ এ তিন নেতা সদস্য ছিলেন। 

মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব জনমত ও বিভিন্ন দেশের ভূমিকা: 

971 সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। পাকিস্তানি ও স্বাধীনতাবিরোধী তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা সংঘটিত লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ,নারী দর্শধর্ষন, হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হয় । বিভিন্ন দেশের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে । ২৫ মার্চের কাল রাত এবং পরবর্তী সময়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে বিশ্ব জনমত সোচ্চার হয়ে উঠে । গোটা বিশ্বে জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থন জানায় । 

ভারতের ভূমিকা : 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি সমর্থন জানায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাত্রির বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী নয় মাস ধরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও হত্যাযজ্ঞ চালায় , ভারত তা বিশ্ববাসীর নিকট সার্থকভাবে তুলে ধরে । এর ফলে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হয় । লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় , মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ,অস্ত্র-সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান ভারতে বিমান হামলা চালায় । ভারত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে । মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী “ যৌথ কমান্ড “ গড়ে তোলে । যৌথবাহিনীর তীব্র আক্রমণের ফলে ৯৩ হাজার পাক সেনা নিঃশর্তে  যৌথ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় । ভারতের বহু সৈন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারায় । 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভূমিকা : 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের পর সর্বাধিক অবদান রাখে অধুনা বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন ( বর্তমান রাশিয়া ) । পাক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশকে গণহত্যা , অগ্নিসংযোগ, নারী-নির্যাতন বন্ধ করার জন্য সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে আহ্বান জানান । তিনি ইয়াহিয়াকে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যও বলেন । সোভিয়েত পত্র-পত্রিকা, প্রচার মাধ্যমগুলো বাংলাদেশ পাক বাহিনীর নির্যাতনের কাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি প্রচার করে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে । জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব সোভিয়েত ইউনিয়ন “ ভেটো “ ( বিরোধিতা করা ) প্রদান করে বাতিল করে দেয় । কিউবা , যুগোশ্লাভিয়া , পোল্যান্ড , হাঙ্গেরি , বুলগেরিয়া  , চেকোশ্লোৈভাকিয়া , পূর্ব জার্মানি প্রভৃতি তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন জানান । 

গ্রেটবৃটেনের ভূমিকা: 

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বৃটেনের প্রচারমাধ্যম বিশেষ করে বিবিসি এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা বাঙ্গালীদের উপর পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন , প্রতিরোধ , বাঙ্গালীদের সংগ্রাম , ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের করুন অবস্থা , পাক বাহিনীর গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ব জনমতকে জাগ্রত করে তুলে । ব্রিটিশ সরকার ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে খুবই সহানুভূতিশীল ছিল। উল্লেখ্য , লন্ডন ছিল বহিঃবিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার এর প্রধানকেন্দ্র । তাছাড়া লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি ও দান সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ৪০,০০০ লোকের সমাগমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ভিত্তিক গান পরিবেশন করেন । ব্রিটেনের ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া , পশ্চিম জার্মানি , ফ্রান্স , ইতালি, জাপান ও কানাডার প্রচার মাধ্যমগুলো পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে সাহায্য করে । ইরাক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানায় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ , প্রচার মাধ্যম , কংগ্রেসের অনেক সদস্য এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার ছিল । তবে বিশ্বের কোন কোন দেশে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল । 

জাতিসংঘের ভূমিকা : 

বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য । বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান যখন বাঙালি নিধনে তৎপর তখন জাতিসংঘ বলতে গেলে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে । নারকীয় হত্যাযজ্ঞ , মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি । প্রকৃতপক্ষে “ ভেটো “ ক্ষমতা সম্পূর্ণ পাঁচটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে জাতিসংঘে নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্রুপ করার ক্ষমতা ছিল সীমিত । 

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য : 

বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কবে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা । বাংলাদেশ হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে প্রথম দেশ , যে দেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে । ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তারা পূর্ব বাংলার জনগণ সর্বপ্রকার অত্যাচার , শোষণ , বৈষম্য , নিপীড়নের শিকার হয়েছে । কিন্তু এই ভূখণ্ডের সংগ্রামী মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় । ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে । ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ডাক দেন এবং ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র করেন , ১৬ ডিসেম্বর তা বাস্তবে পূর্ণতা পায় । মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের সাধারণমানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করে । ফলে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় বাঙালির শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ । মুক্তিযুদ্ধে অঞ্চলের বাঙালি এবং এ ভূখন্ডে বসবাসকারী অন্যান্য নিগোষ্টির জনগণের মধ্যে নতুন যে দেশপ্রেমের জন্ম দেয় , তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধ শেষে জনগণ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং সমৃদ্ধি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আত্মনিয়োগ করে । মুক্তিযুদ্ধের ফলে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র , যা বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে । এর মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণ হলো । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের নিপীড়িত , স্বাধীনতাকামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করে । 

স্বাধীন বাংলাদেশের পুর্ণগঠনে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল ও পরবর্তী ঘটনাবলী : 

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় । ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে ঢাকায় আসে এবং শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন । ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী দেশ শাসিত হতে থাকে । ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং সরকারপ্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন , প্রশাসনিক পুনর্গঠন , এক কোটি শরণার্থীর পুনবার্সন , সংবিধান প্রণয়ন , নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান , ভারতের মিত্র বাহিনীর সদস্যদের ফেরত পাঠানো , বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ে ইত্যাদি তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য অর্জন । ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির চক্রান্তে কতিপয় বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’ অভ্যুত্থানে বিদেশে অবস্থানরত দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যতীত পরিবারের সদস্যসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন । 

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গঠন প্রক্রিয়া : 

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন চারদিকে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা , কান্না , হাহাকার আর ধ্বংসযজ্ঞ । অসংখ্য রাস্তাঘাট , পুল, কালভার্ট , কল কারখানা , নৌবহর ও সমুদ্র বন্দর ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত । রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল অর্থশূন্য । স্বাধীন বাংলাদেশের ছিল না কোন সামরিক-বেসামরিক বিমান । ৩০  লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের এক  কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন , গ্রাম গঞ্জের লক্ষ-লক্ষ বাড়িঘর পুননির্মাণ , সর্বোপরি সাড়ে সাত কোটি মানুষের অন্ন , বস্ত্র , চিকিৎসা ও বাসস্থানের চাহিদা পূরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল দেশের বড় চ্যালেঞ্জ । যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্গঠন এর দায়িত্ব নিয়েই যাত্রা শুরু হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর শাসন আমল । 

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে কঠিন দায়িত্ব পালন ছাড়াও ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামল এর উল্লেখযোগ্য অর্জন সমূহ নিম্নরূপ : 

নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করা : 

১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি “ খসড়া সংবিধান প্রণয়ন “ কমিটি গঠিত হয় । এ কমিটি ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদে পেশ করে । ৪ নভেম্বর উক্ত সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয় । ১৬ ডিসেম্বর থেকে তা বলবৎ হয় । এই সংবিধানের মূলনীতি হচ্ছে – গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র , ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ । সংবিধানে সার্বজনীন ভোটাধিকার , মৌলিক অধিকার , ন্যায় বিচার সহ জনগণের সকল রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার স্বীকৃতি হয় । 

গণপরিষদ : 

১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু  “ বাংলাদেশ গণপরিষদ “ নামে একটি আদেশ জারি করেন । এই আদেশ বলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণ  গনপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হন । ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় আইন কানুন পাস ও  কার্যকর করা সম্ভব হয় । বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় এটি অতীব তাৎপর্যপূর্ণ  ঘটনা । 

পরিত্যক্ত কারখানা জাতীয়করণ : 

পাকিস্তানের শাসনামলে আদমজীসহ বিভিন্ন কল-কারখানা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের শিল্পপতিগণ স্থাপন করেন । ওইসব মালিক বাংলাদেশ ত্যাগ করলে মুজিব সরকার ১৯৭২ সালে সেগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এনে বাংলাদেশের সম্পদে পরিণত করেন । 

প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরন : পাকিস্তান আমলে প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছিল। এগুলোতে কর্মরত শিক্ষকগণ সরকারের কাছ থেকে যৎসামান্য বেতন-ভাতা পেতেন । বঙ্গবন্ধুর সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন । এর মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে । 

নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি: 

বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড.কুদরত-এ-খুদাকে প্রদান করে একটি শিক্ষা কমিশন প্রণয়ন কমিটি গঠন করে । এই কমিটি  ১৯৭৪ সালে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতির রূপকল্প উপস্থাপন করে । বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশের জন্য একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনের উদ্যোগ শুরু করে।  

রিলিফ প্রদান ও রেশনিং প্রথা : 

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং মানুষজনকে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত কম্বল , খাদ্যদ্রব্য , অর্থ সাহায্য বন্টন করে । এছাড়া শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপক ভাবে ন্যায্যমূল্যে ক্রয় সহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী ক্রয় করার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে । 

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচন : ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । উক্ত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ । বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠিত হয় । 

নতুন অর্থনৈতিক পাঁচশালা পরিকল্পনা : 

বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার জন্য একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে । কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক বঙ্গবন্ধুর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প ,কৃষি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢেলে  সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে । ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বকেয়ার সুদসহ কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করে দেওয়া হয় । 

  শোষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষে “ দ্বিতীয় বিপ্লবের “ কর্মসূচি : 

মুক্তিযুদ্ধের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ যখন ব্যস্ত তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি , খাদ্য সংকট ১৯৭৩-৭৪ সালে বন্যায় দেশে আদ্যোৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হয় । ফলে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয় । দেশের অভ্যন্তরে মওজুদদার , দুর্নীতিবাজ এবং ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী তৎপর হয়ে থাকে । বঙ্গবন্ধুর সরকারের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও শোষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ , ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি সহ বিভিন্ন দল নিয়ে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী ( বাকশাল ) গঠন করে । দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি নতুন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন । এটিকে তিনি “ দ্বিতীয় বিপ্লব “ বলে অভিহিত করেন । 

পররাষ্ট্র নীতি : 

পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পদাপর্ন করে বঙ্গবন্ধু বলেন , বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাস করে , কারো সাথে শত্রুতা নয় “ – এ নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারিত হবে। তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান এবং পুনঃগঠন সহযোগিতা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ করেন । ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৪০ টি দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে । সোভিয়েত ইউনিয়ন  চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইন যুক্ত করাসহ নানাভাবে সহযোগিতা প্রদান করে । অন্যান্য  বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোও খাদ্যদ্রব্য ,ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে । 

ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ফেরত যাওয়া : 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনী মিত্রবাহিনী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে তাদের গুরূত্বপূর্ন অবধান ছিল ।  কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতির নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলকে অপপ্রচারের সুযোগ না দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে মিত্র বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন । ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেই তারা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে ফিরে যায় । এতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় । 

আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ : 

১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ব্রিটিশ কমনওয়েলখের সদস্য হন । ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে । বঙ্গবন্ধুর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় প্রথম ভাষণ প্রদান করেন । এছাড়া বাংলাদেশে জোট-নিরপেক্ষ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে । বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুুলিওকুরি শান্তি পদকে ভূষিত করে । বাংলাদেশে তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের মর্যাদা লাভ করে । 

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের হাল ধরতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয় । এর মধ্যেও স্বল্প সময়ে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয় । 

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন পটভূমি : 

সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল । সংবিধানের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য , আদর্শ ও লক্ষ্য প্রতিফলিত হয় । ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন । এতে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় । অস্থায়ী সংবিধান আদেশ এর বিভিন্ন দিক হলো : এই আদেশ বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ । এটি অতিলম্বে বলবৎ  হবে । এটি সমগ্রবাংলাদেশ প্রযোজ্য হবে । বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান রচনার উদ্দেশ্য একটি গণপরিষদ গঠিত হবে । দেশে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার থাকবে । প্রধানমন্ত্রী হবেন এর প্রধান । রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রপ্রধান । 

একটি সংবিধান প্রণয়ন করে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার পূরণের জন্য রাষ্ট্রপতি ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ “ বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ “ নামে একটি আদেশ জারি করেন । এ আদেশ অনুসারে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য হবেন । ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ড.কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ” খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি  “ গঠন করা হয় । একজন মহিলা সদস্য এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন ।ন্যাপ ( মোজাফফর ) – এর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত  ( বর্তমানে আওয়ামী লীগ ) সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন । খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিগনের কাছ থেকে সংবিধান সম্পর্কে প্রস্তাব আহ্বান করেন । 

১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন খসড়া সংবিধান বিল আকারে পেশ করা হয় । ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ( বিজয় দিবস ) থেকে কার্যকর হয় । গণপরিষদের সংবিধানের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন , “ এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত , এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে” । এখানে উল্লেখ্য যে , পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করতে সময় লেগেছে প্রায় নয় বছর ( ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ ), ভারতের সময় লেগেছে প্রায় তিন বছর ( ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ ) । কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সরকার মাত্র দশ মাসে বাংলাদেশকে একটি সংবিধান উপহার দিতে সক্ষম হন । 

১৯৭২ সারের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য : 

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য মহিমান্বিত । ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি হয় : – 

১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল লিখিত । পরবর্তী ক্ষেত্রে এ সংবিধান ছিল দুষ্পরিবর্তনীয় । সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি লিপিবদ্ধ হয় । জাতীয়তাবাদ , গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা করা হয় । মানুষের মৌলিক প্রয়োজন যেমন : অন্ন ,বস্ত্র ,শিক্ষা, বাসস্থান ইত্যাদি মেটানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পিত হয় । সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে এ সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য । জীবন ধারণের অধিকার , চলাফেরার অধিকার , বাক-স্বাধীনতার অধিকার , চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা , ধর্ম চর্চার অধিকার , ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগের অধিকার ইত্যাদি সংবিধানে সন্নিবেশিত হয় । সংবিধানে বাংলাদেশকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় । জাতীয় সংসদ সার্বভৌম আইন প্রয়োগকারী সংস্থা । এ সংবিধানে বাংলাদেশকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়  , যা, “ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ “ নামে পরিচিত । জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস সংবিধানের এ ঘোষণা দ্বারা জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এর মর্যাদা প্রদান করা হয় । সংবিধান পরিপন্থী কোন আইনকে অসাংবিধানিক বলে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে পারবে । এ সংবিধানের সংশোধনী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় । সংবিধানে ৭৭নং অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে । বাংলাদেশ সংবিধানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়স্ক যেকোনো নাগরিক “ এক ব্যক্তি এক ভোট’- এ নীতির ভিত্তিতে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রদান করা হয়েছে। এ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় , সমবায় এবং ব্যক্তিগত মালিকানা নীতি লিপিবদ্ধ আছে । বাংলাদেশের আইনসভা এককক্ষ বিশিষ্ট হবে । ১৯৭২ সালের সংবিধান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার এ পর্যন্ত সতেরো বার সংশোধন করেছেন । তম্মধ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী জেনারেল এরশাদের সপ্তম সংশোধনী এবং দ্বাদশ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল করা হয়েছে । 

১৫ আগস্টর নির্মম হত্যাকান্ড : 

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালির জাতীয় জীবনে ঘটে এক নির্মম , নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। খুব ভোরে স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চবিলাসী ও উৎশৃংখল সেনাসদস্য স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির মনদে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২নং সড়কের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে হত্যা করে । বঙ্গবন্ধু পরিবারের উপস্থিত কোন সদস্যের ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি । এমনকি ঘাতকদের নিষ্ঠুর বুলেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেল ও । একটি আধুনিক ও শোষণ দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে  “ দ্বিতীয় বিপ্লব’র কর্মসূচি নিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিলেন , ঠিক তখন দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি মহলের সহযোগিতা দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে । তারা বোঝাতে পেরেছিল যে , বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের মত “ দ্বিতীয় বিপ্লবের “ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সফল হবেন । তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই ১৫ আগস্টের নিশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল । এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ পুন:প্রতিষ্ঠিত হয় । এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি নৃশংস তম মানবতাবিরোধী অপরাধ । এটি ঘটেছিলো গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে । ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়ে । ১৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় শোক দিবস । 

বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় অধ্যায় এবং জেলখানায় পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ( ১৫আগস্ট -৩নভেম্বর ১৯৭৫ ): 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন । ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ দিন পর সামরিক শাসন জারি করে । ১৯৭৫ সালের ২২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে গ্রেফতার করে । ২৪ আগস্ট জেনারেল কে. এম . শফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর চিফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত করে। ৩১ আগস্ট এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ আগস্ট এর হত্যাকারীদের বিচারের হাত থেকে রেহাই দেয়ার জন্যখন্দকার মোশতাক “ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স” নামে সংবিধান ও আইনের শাসন বিরোধী একটি অধ্যাদেশ’ জারি করে। ১৫ আগস্ট এর হত্যার সঙ্গে জড়িত জুনিয়র সেনা অফিসাররা ব্যারাকে ফিরে না গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে বসে দেশ পরিচালনার হস্তক্ষেপ করতে থাকে । এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন । ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁর নেতৃত্বে এক সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ।৫ ই নভেম্বর খন্দকার মোশতাক পদত্যাগের ঘোষণা দেয় । ৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ.এস.এম . সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন । 

জেলখানায় পৈশাচিক হত্যাকান্ড ( ৩ নভেম্বর , ১৯৭৫ ) : 

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর গভীর রাতে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের খুনিচক্র সেনা সদস্য দেশ ত্যাগের পূর্বে খন্দকার মোশতাকের অনুমতি নিয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে সেখানে বন্দি অবস্থায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা – সৈয়দ নজরুল ইসলাম , তাজউদ্দিন আহমেদ , ক্যাপ্টেন এম .মনসুর আলী , এ.এইচ.এম . কামরুজ্জামান-কে নিঃসংশভাবে হত্যা করে । সংঘটিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কময় অধ্যায় । এ ঘটনা মোশতাকের পতন ত্বরান্বিত করে । খুনিরা দেশত্যাগে বাধ্য হয় । এ হত্যাকাণ্ড ছিল ৭১- এর মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত , স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গুষ্টির সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও নীলনকশার বাস্তবায়ন । উভয় হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অর্জনসমূহ দেশকে নেতৃত্বশূন্য এবং পাকিস্তানী ভাবাদর্শ  প্রতিষ্ঠা করা । ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড একই গুষ্টি সংঘটিত করে । 

সেনা শাসন আমল ( ১৯৭৫-১৯৯০ ) : 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সেনাশাসন বহাল ছিল । দেশের সংবিধানকে উপেক্ষা করে খন্দকার মোশতাক , বিচারপতি সায়েম , জেনারেল জিয়াউর রহমান , বিচারপতি আহসান উদ্দিন এবং জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন । দেশের সেনা শাসন বহাল রেখে সুবিধামতো সময়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান ( ১৯৭৫-১৯৮১ ) এবং জেনারেল এরশাদ ( ১৯৮২-১৯৯০ ) নির্বাচন সম্পন্ন করে বেসামরিক শাসন চালু করেন । তাদের অগণতান্ত্রিক শাসন , জনগণের ভোটাধিকার হরণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কার্যকলাপ দেশের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলে। ফলে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর অবশেষে ১৯৯১ সালে পুনরায় গণতন্ত্রের যাত্রার শুরু হয় । 

জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামল ( ১৯৭৫-১৯৮১ ) : 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর মেজর ছিলেন । বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে পাঠ করেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ নাম্বার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন । ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক সংবিধান লংঘন করে রাষ্ট্রপতি পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন । ২৪ আগস্ট তিনি সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ পদে জেনারেল জিয়াউর রহমান কে নিযুক্ত করেন । ৩ নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থানে খন্দকার মোশতাকের পতন এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী হন । ৭ নভেম্বর পাল্টা সেনা অভ্যুত্থান ঘটে এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে ক্ষমতায় কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন । রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এস.এম. সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন । কিন্তু ১৯৭৬ সালের ৩০ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করেন । জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সামরিক বাহিনীর মধ্যে বেশকিছু ব্যর্থ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় । এতে বিচারের নামে অনেক নিরপরাধ সামরিক কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড , সাজা কিংবা চাকরিচ্যুত হয় । জেনারেল জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় । ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ এর সংবিধানে বর্ণিত যেসব মৌলিক নীতি ও চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়ে আসছিল , তার বেশির ভাগেই এসময় বাতিল করে দেওয়া হয় ।  

নির্বাচন ও দল গঠন : 

১৯৭৬ সালে কিছু শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোকে “ ঘরোয়া রাজনীতি “ করার অনুমতি দেওয়া হয় । ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতা বৈধকরণের লক্ষ্যে হ্যাঁ , না ভোটের আয়োজন করেন । এরপর তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা মতে বিভিন্ন দল থেকে নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল ( জাগদল ) গঠন করেন । 

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন । ফলে বাংলার মানুষ একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছে । এর মধ্য দিয়ে  রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাড়ে পাঁচ বছরের সেনা শাসনের অবসান ঘটে । 

জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামল ( ১৯৮২-১৯৯০ ) : 

১৯৮১ সালের ৩০ মে জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন । এ সময় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ । একই বছর ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিচারপতি আবদুস ছাত্তার জয়লাভ করেন । কিন্তু বিচারপতি সাত্তারের দুর্বল নেতৃত্ব , রাজনৈতিক অস্থিরতা , দুর্নীতি , দলীয় কোন্দল , আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ দেখিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাত্তার সরকারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন । ক্ষমতায় এসে সংবিধান স্থগিত করেন , জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেন । সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আহসান উদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয় । সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন প্রশাসক হন । ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট আহসান উদ্দিনকে সরিয়ে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন । ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসন জারির পর দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় । পত্র-পত্রিকা স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় । শেখ হাসিনা , ডঃ কামাল হোসেন , মোহাম্মদ ফরহাদ সহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার বা অন্তরীণ করা হয় । ছাত্রলীগ , ছাত্র ইউনিয়ন , জাসদ ছাত্রলীগ সহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ শুরু করে । শুরু হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন । সেলিম , দেলোয়ার , শাহজাহান সিরাজ , জয়নাল , দিপালী সাহাসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত হন । শুরু হয় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন । এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট গঠিত হয় । এ আন্দোলনে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র রূপ দেয় । অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হয় । 

 দল গঠন ও নির্বাচন : 

জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকেই ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়েন । ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলসমূহের দাবির মুখে দ্রুত রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হন ।  ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল ঘরোয়া রাজনীতি এবং ১৪ নভেম্বর প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতি প্রদান করেন । ১৯৮৩ সালের ১৭ মার্চ ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে এরশাদ নিজেই জনদল নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন । ১৯৮৩ সালে দেশে ইউনিয়ন পরিষদ এবং ১৯৮৪ সালে পুরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ তথা হ্যাঁ, না ভোটের আয়োজন করেন । 

জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এর লক্ষ্যে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন । ১৯৮৫ সালের ১৬ ও ২০ মে নতুন প্রবর্তিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও অনুষ্ঠিত হয় । ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট জনদলসহ ৫টি ছোট দল নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয় । ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এই ফ্রন্টে ’ জাতীয় পার্টি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে । জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন । 

১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এতে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি , আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ২৮ টি দল অংশগ্রহণ করে । বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করে । নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে । আওয়ামী লীগ এককভাবে ৭৬টি আসন লাভ করে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয় । নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করে । পর্যবেক্ষকগণ এ অভিযোগের যথাযথ সমর্থন করেন । ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করে । প্রহসনমূলক নির্বাচনের জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় । 

১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর থেকেই জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দল , সাধারণ জনগণ এবং নাগরিক সমাজ বিক্ষোভে ফেটে উঠছে । জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর পদত্যাগ ও একটি অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে বিরোধীদল দুর্বার গণআন্দোলন শুরু করে । ১৯৮৭ সালে সংসদ থেকে একযোগে বিরোধীদল পদত্যাগ করলে ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া হয় । ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয় । আওয়ামী লীগ , বিএনপিসহ দেশের প্রধান দলগুলোর নির্বাচন বর্জন করে । ভোটারবিহীন , দলবিহীন  এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১ টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয় এবং সরকার অনুগত আ.স.শ.রবিন নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বিরোধী জোট ( কপ ) ১৯টি আসন পায় । বাকি আসনের ৩টি জাসদ (সিরাজ ) , ২টি ফ্রিডম পার্টি এবং ২৫টি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পান । জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর নয়  বছরের দীর্ঘ শাসনকালে রাস্তাঘাট নির্মাণসহ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় । 

গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা : 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় । ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক,  বেসামরিক আদলে সেনাশাসন অব্যাহত ছিল । 

১৯৯০ সালে ৬ডিসেম্বর জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুন যাত্রা শুরু হয় । ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারির সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক ধারা চালু হয় । জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সরকারের দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে জনগণ দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হয় । এ অগ্রযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ এক বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখে । একটি প্রকৃত জনপ্রতিনিধি মূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের জেল-জুলুম নির্যাতন এমনকি মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে অকাতরে প্রাণ দেয় । ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এর ফলে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে । জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তিক শাসনব্যবস্থা পরিচালনার পথ উন্মুক্ত হয় । রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি দেশে পুনঃপ্রবর্তন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় । 

১৯৯০- এর গণঅভ্যুত্থান ও গণতন্ত্রের পুন:যাত্রা : 

১৯৮২ সালের শেষদিকে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায় ছাত্রসমাজ । ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান অক্ষুন্ন রেখে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট গঠিত হয় । ১৫ দল ও ৭ দল সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনকে সফল করার লক্ষে ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে । ৫ দফা কর্মসূচির মূল দাবি ছিল অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার , সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং যে কোনো নির্বাচনের আগে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান । 

১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখল বাংলাদেশের জনগণ ভালো চোখে দেখেননি । ফলে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ দীর্ঘ প্রায় নয়  বছরের শাসনকালের প্রবল গণআন্দোলনের সম্মুখীন হন । এ আন্দোলনে রাজনৈতিক দল ছাড়াও ছাত্র , শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাংবাদিক ,কৃষিবিদ ,কৃষক-শ্রমিক সর্বস্তরের শ্রেণী ও পেশার জনগণ অংশগ্রহণ করে । তাই এ আন্দোলন গণআন্দোলন থেকে ক্রমান্বয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় । ১৫ দল, ৭দল, স্কপসহ বিভিন্ন জোটের আন্দোলনের চাপে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দেন । 

১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন , প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর বদ্ধমূল ধারণা জন্মে যে, জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় । তাই ১৯৮৭ সালে ৮দল, ৭দল ও ৫ দল জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে একমত পোষণ করে এবং সকল জোট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে । তিন জোটের হরতাল এবং ‘ ঢাকা অবরোধ ‘ কর্মসূচির ফলে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে । আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন বুকে ও পিঠে ‘ গণতন্ত্র মুক্তি পাক , স্বৈরাচার নিপাত যাক ‘ স্লোগান লেখা ঢাকার জিপিও ( পোস্ট অফিস ) এর নিকট জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন । এতে আন্দোলনকারী জনগণ ক্ষুব্দ হয় । ১৯৮৭ সালের ১২ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে এবং ২৭ নভেম্বর এরশাদ সরকারের দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে । ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের শেখ হাসিনার এক সমাবেশে সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে জনতার উপর গুলি চালায় , অল্পের জন্য শেখ হাসিনার প্রাণ রক্ষা পায় । এর বিরুদ্ধে সমগ্র দেশে প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে । ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর বিরোধী জোট ও দলগুলোর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তোলে । ঐদিন মিছিলে গুলি করলে ৫ জন নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয় । ১০ অক্টোবর ২২ টি ছাত্র সংগঠন “ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য “ গঠন করে এবং এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন । বিরোধীদলের একের পর এক আন্দোলন কর্মসূচির কারণে জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ পিছু হাটতে থাকেন । আন্দোলন থামানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেও এরশাদ সরকার আবার তা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় । তিনি জোট কর্তৃক জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও তার সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ফর্মুলার সহ একটি যুদ্ধ ঘোষণা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয় , যা, তিন জোটের রূপরেখা ‘ নামে খ্যাত । ২৭ নভেম্বর বিএমএ নেতা ডাক্তার শামসুল আলম মিলনের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে চরম রূপ দেয় । ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ একযোগে পদত্যাগ করেন । পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ পদত্যাগের ঘোষণা দেন । সংঘটিত হয় এরশাদ বিরোধী ৯০-এর গনঅভ্যুত্থান । এ সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং ৫ দলীয় বাম জোট একটি অভিন্ন কর্মসূচিতে অক্ষ বদ্ধ হলে  ১৯৯০ – এর ৪ ডিসেম্বর জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা দেন । ৬ ডিসেম্বর তিন  জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকারের হাতে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন । নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ গণতন্ত্রের অভিযাত্রার জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন । 

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতন্ত্রের পুন:যাত্রা শুরু করে । ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক ধারা চালু হয় । সংসদীয় সরকার পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় । দেশে অবাধ তথ্য প্রবাহ সৃষ্টি , মত প্রকাশের স্বাধীনতা , পত্র-পত্রিকার ওপর থেকে বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার ইত্যাদি ব্যবস্থা হয় । বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পৃথিবীতে পরিচিতি পায় । ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন লাভ করে । সরকার গঠনের জন্য ১৫১ জনের সমর্থন প্রয়োজন হয় । এ অবস্থায় বিএনপি জামায়াতে ইসলামের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

66 ÷ = 11