আইন অমান্য আন্দোলন ( ১৯৩০-১৯৩২ )

আইন অমান্য আন্দোলনের প্রথম পর্ব  ( ১৯৩০-৩২ ) 

১৯২২ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের অবসান ঘটে । ১৯২৪ সালে তুর্কি নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক খেলাফত ভেঙ্গে দিয়ে তুরস্ককে আধুনিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন । এর ফলে ভারতে খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায় । ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যখন মৃতপ্রায় তখন ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন গঠন করেন । ১৯৩০ সালের মে মাসে দু’খন্ডে সাইমন কমিশন রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । কিন্তু সাইমন কমিশন রিপোর্টে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি না থাকায় তা ভারতের বিভিন্ন মহল কর্তিক নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যান হয় । ১৯২৮ সালে মোতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে এক কমিটি সাইমন কমিশন রিপোর্ট এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে এক রিপোর্ট তৈরি করে । ইতিহাসে এ রিপোর্ট “ নেহেরু রিপোর্ট “ নামে পরিচিত । জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতৃবৃন্দ এ রিপোর্টকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করলেও গোঁড়াপন্থী মুসলিম নেতৃবৃন্দ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন । তাছাড়া দেশের রাজ্যের নৃপতিগনও এ  রিপোর্ট গ্রহণ করেননি । ১৯২৯ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেহেরু রিপোর্টের প্রতিবাদস্বরূপ মুসলমানদের দাবি-দাওয়ার সংবলিত তার বিখ্যাত “ ১৪ দফা “ ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেন ।  জিন্নাহর কতৃৃক ১৪ দফা দাবির ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাংবিধানিক সরকারের ব্যাপারে মতপার্থক্য ক্রমেই ব্যাপক হয়ে উঠতে থাকে । 

১৯২৯ সালের মে মাসে ইংল্যান্ডের সংশোধনীয় নির্বাচনে শ্রমিক দল ক্ষমতাসীন হয় এবং ম্যাকডোনাল্ড প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ভারতের স্বার্থ শাসনের প্রতি ম্যাকডোনাল্ডের যথেষ্ঠ সহানুভূতিশীল ছিল । ১৯২৯ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড আরউইন ইংল্যান্ড থেকে ফিরে ঘোষণা করেন যে , ভারতকে শীঘ্রই ডোমিনয়িনের  মর্যাদা দান করাই ব্রিটিশ সরকারের লক্ষ্যে । আরউইনের ঘোষণার ফলে কংগ্রেটস নেতৃবৃন্দ আশান্বিত হন । কিন্তু ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেতা রক্ষণশীল দলের উইনস্টন চার্চিল ভারতরেক ডোমিনিয়ন মর্যাদা দান এর সরকারি সিদ্ধান্তকে “ এক গুরুতর অপরাধ “ হিসাবে মন্তব্য করেন । এমত অবস্থায় শ্রমিক সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি পালনে টাল-বাহানা শুরু করেন । প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের উদাসীনতার ফলে ভারতের রাজনীতি আবার চঞ্চল হয়ে উঠে । এছাড়া , ১৯২৯ সালে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র বিপ্লবের পুনঅভ্যুদয় ভারতের দারুন উত্তেজনার সৃষ্টি করে । 

দেশের এইরূপ উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে  ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় কংগ্রেসর  লাহোর অধিবেশন শুরু হয় । এ অধিবেশনে কংগ্রেস  সভাপতি জহরলাল নেহেরু পূর্ণ স্বরাজের দাবি উত্থাপন করেন । এই অধিবেশনেই মহাত্মা গান্ধীর ইচ্ছা অনুসারে কংগ্রেস সমগ্র জাতির প্রতি আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বান জানায় । ১৯৩০ সালের ২ জানুয়ারি কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠকে প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি দেশব্যাপী স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । 

ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নেহেরু রিপোর্টের প্রস্তাবগুলো অগ্রাহ্য করা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে আইন অমান্য আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে । ১৯৩০ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ভারতকে অনুভূত হয় । এর ফলে ভারতের শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে । শুরু হয় সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন । সরকার কঠোর হাতে এসব আন্দোলন দমন করেন এবং কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে আটক করে রাখেন । ফলে একদিকে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও অন্যদিকে সরকারের দমনমূলক নীতি ভারতে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে । এ অবস্থা গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করার পূর্বে সরকারের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়ার  করার চেষ্টা করেন । কিন্তু ব্যর্থ হন । শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ  গান্ধীজী তার বাছাই করা  ৭৮ জন শিষ্য নিয়ে লবণ আইন অমান্য করার জন্য বিখ্যাত ডান্ডি অভিযান আরম্ভ করেন । লবণ সত্যাগ্রহ ছিল গান্ধীজীর প্রতিবার এক অপূর্ব নিদর্শন । অহিংসবাদী শত্রুকে চারদিক হতে পদস্থ করাই ছিল এই লবণ সত্যাগ্রহের পরিকল্পনা । এখানে উল্লেখ্য যে , সমুদ্রের জল হতে লবণ প্রস্তুত করার অধিকার একমাত্র সরকারের ছিল । সাধারণ লোকদের হত্যা করা ছিল বে-আইনি । লবণ সত্যাগ্রহের ফলে সমগ্র দেশে এক অভাবনীয় উত্তেজনা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হয় এবং দেশপ্রেমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রবাহিত হয় । গান্ধীজী নিজ হাতে সমুদ্রের জল তুলে লবণ তৈরি শুরু করেন । এভাবে লবণ আইন ভঙ্গ করা হয় এবং আইন অমান্য আন্দোলনের প্রথম পর্বে সূচনা হয়।  পাশাপাশি বিদেশি দ্রব্য বর্জন,  স্কুল-কলেজে ধর্মঘট সরকারি দপ্তরে পিকেটিং  সোৎসাহে  চলতে থাকে । মেয়েরাও দলে দলে এ আন্দোলনে অংশ নেয় । আইন অমান্য বয়কট আন্দোলনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে সরকারের কঠোর দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করে । কলকাতা মাদ্রাজ বোম্বাই মেহেদিপুর প্রভৃতি স্থানে সত্যাগ্রহীদের উপর পুলিশ নির্বিচারে লাঠি চালায় । জাতীয় কংগ্রেসকে বে-আইনি ঘোষণা করা হয় এবং প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয় । গান্ধীজীর সরকারি লবনগোলা দখল করার পরিকল্পনা করলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয় । গান্ধীজী গ্রেফতার হলে আব্বাস তৈয়াবজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন , কিন্তু তাকেও গ্রেপ্তার করা হয় । এ অবস্থায় ধরসানার লবণ কারখানা আক্রমণ করার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন ভারতের উন্নত খ্যাতিসম্পন্ন কবি সরোজিনী নাইডু । তার নেতৃত্বে সত্যাগ্রহীরা ধরসানার লবণ কারখানায় দিকে অগ্রসর হয় । পুলিশ সত্যাগ্রহীদের উপর লাঠির চালালে শতশত সত্যাগ্রহী আহত হয় । পুলিশি নির্যাতন ও বর্বর অত্যাচারের ফলে লবণ কারখানা বা গুদাম দখল করা সম্ভব হয়নি ।  

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আফগান খ্যাতনামা অহিংসবাদী নেতা খান আবদুল গফফর খান নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে । মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে গফর  খাঁ অহিংসা নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন । তিনি দুর্ধর্ষ পাঠানদের মধ্যে অহিংসার বাণী প্রচার করেন।  সীমান্ত প্রদেশ এ আন্দোলন দমন করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয় । পেশোয়ারে সত্যাগ্রহীদের উপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ করলে তিন শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে । কিন্তু সরকারের কঠোর দমননীতির সত্তেও আন্দোলন অহিংসভাবে চলতে থাকে । আইন অমান্য আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে গফর খাঁর সাফল্য তাকে ভারতবাসীর সম্মানের  আসনের স্থাপন করেছিলেন । গফর খাঁ ভারতবাসীর কাছে “ সীমান্ত গান্ধী “ নামে পরিচিত । 

পেশোয়ারের ন্যায় বাংলা ,লাহোর ,বিহার ,মুম্বাই , মাদ্রাজ,  আসাম উত্তর-প্রদেশ মধ্য-প্রদেশ প্রভৃতি ভারতের বিভিন্ন স্থানে আইন অমান্য আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে । সেইসঙ্গে সরকারি  দমনীতিও প্রচন্ড রূপ ধারণ করে । আইন অমান্য আন্দোলনের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় । 

আইন অমান্য আন্দোলন যখন মাঝ পথে সেসময় সাইমন কমিশনের রিপোর্ট ( মে, ১৯৩০ ) প্রকাশিত হয় । ভারতের সকল রাজনৈতিক দল রিপোর্টে উল্লেখিত প্রস্তাবগুলো গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করে । এ অবস্থা ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণ আন্দোলনকে স্থগিত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার লন্ডনে ১৯৩০ সালে এক গোলটেবিলে বৈঠক আহ্বান করেন । ১৯৩০ এর নভেম্বর থেকে  ১৯৩১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত লন্ডনে প্রথম গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় । এ বৈঠকে কংগ্রেস যোগদানে বিরত থাকে । কংগ্রেসের অনুপস্থির কারণে বৈঠক ফলপ্রসূত হয়নি। ইতিমধ্যে মহাত্মা গান্ধীকে বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।  কংগ্রেসের ওপর থেকেও সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।  এরপর শুরু হওয়া বড়লাট  আরইউনের সঙ্গে গান্ধীজীর দীর্ঘ আলোচনা । ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ গান্ধী- আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তির শর্ত অনুসারে গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার ও লন্ডনের দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে সম্মত হয় । অপরদিকে সরকারও হিংসাত্মক কার্যকলাপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তারা অপর সব রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেন এবং অত্যাচারমূলক আইন ও অডিন্যান্স প্রত্যাহার করে নেন । 

১৯৩১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের লন্ডনের দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক বসে।  এ বৈঠকে গান্ধীজী কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন।  বৈঠকে গান্ধীজী সংবিধান রচনার খুঁটিনাটির মধ্যে না গিয়ে ভারতের জন্য ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস লাভের লক্ষ্যের উপর সবিশেষ গুরুত্ব দেন । কিন্তু ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজীর দাবি মেনে নিতে অস্বীকার জানায় । সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে ও গান্ধীজীর শত চেষ্টা সত্ত্বেও এ বৈঠক সফলকাম হয় নি । ফলে গান্ধীজী শূন্য হাতেই স্বদেশে ফিরে আসেন।  

আইন অমান্য আন্দোলন দ্বিতীয় পর্বঃ ( ১৯৩২-১৩৪) 

দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক হতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর গান্ধীজি দেশের সর্বত্র এক ব্যাপক ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করেন । এসময় সরকার গান্ধী-আরউইন চুক্তির শর্তাবলী অমান্য করে জনগণের উপর চরম দমন নীতি প্রয়োগ করেন । এমত অবস্থায় গান্ধীজী বড়লাট লর্ড  ওয়েলিংডনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন এবং তিনি বড়লাটকে গান্ধী-আরিইউন চুক্তি বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন । কিন্তু বড়লাট ওয়েলিংডনের কাছে গান্ধী-আরউইন চুক্তি ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অমর্যাদাকর এবং তিনি এই চুক্তিকে কার্যকর করার পরিবর্তে বানচাল করতেই বেশি তৎপর হোন।  সরকারের এই মনোভাবের জন্য গান্ধীজী হতাশ হয়ে পড়েন । এ পরিস্থিতিতে গান্ধীজি পুনরায় আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন । 

আইন অমান্য আন্দোলন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গান্ধীজিকে এবং কংগ্রেসের কার্যকরী কমিটির সদস্যদের গ্রেফতার করা হয় । কংগ্রেস এবং কংগ্রেস এর অন্যান্য সংগঠনগুলোকে বেআইনি ঘোষণা করা হয় । কংগ্রেস পরিচালিত সংবাদপত্রগুলোকেও নিষিদ্ধ করা হয় ।  সত্যাগ্রহীদের উপর শুরু হয় নৃশংস অত্যাচার । কিন্তু সত্যাগ্রহীরা সরকারি নির্যাতন উপেক্ষা করে আন্দোলন চালাতে থাকেন । প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার সত্যাগ্রহী কারারুদ্ধ হন । 

১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড “ সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা ঘোষণা করেন । এই বাটোয়ারা দ্বারা ব্রিটিশ সরকার মুসলমান , শিখ, খ্রিষ্টান এবং হিন্দুদের অনুন্নত সম্প্রদায়কে নাম দিয়ে পৃথক নির্বাচনের সুযোগ দান করেন । হিন্দু সমাজকে বর্ণহিন্দু ও তফসিলভুক্ত হিন্দু এই দুই ভাগে ভাগ করার প্রতিবাদে ১৯৩৩ সালের ২৫ সেপটেম্বর গান্ধীজী অনশন শুরু করেন।  অনশন আন্দোলনের ৫ দিন পর পুণা শহরে একটি সম্মেলন বসে । এ সম্মেলনে অনুন্নত শ্রেণীর নেতা  ডঃ আম্বেকারের সাথে গান্ধীজীর এক আপোষরফা হয় । এ আপস-রফার ‘ পুণা চুক্তি ‘ নামে পরিচিত । এ চুক্তিতে অনুন্নত শ্রেণির হিন্দুদেরকে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে যে আসন দেয়া হয় তার দ্বিগুণ আসন দেওয়া হয়।  এভাবেই হিন্দু সমাজকে বিচ্ছিন্ন করার সরকারি প্রচেষ্টা বন্ধ হয় । ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পুনা চুক্তি স্বীকৃতি হয় । 

পুনা চুক্তির পর গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলন থেকে হরজন আন্দোলনের তার দৃষ্টি নিবন্ধন করেন । ১৯৩৩ সারের মে মাসে তিনি আবার অনশন শুরু করেন । গান্ধীজীর এবারের অনশন ছিল সরকারের বিরুদ্ধে নয় , ভারতবাসীর মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য । তিনি কংগ্রেসের অস্থায়ী সভাপতিকে সাময়িকভাবে আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন । ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে বিনা শর্তে মুক্তি দেন । 

১৯৩৩ সালের জুলাই মাসে কংগ্রেস নেতৃত্ব আইন অমান্য গণ-আন্দোলন সম্পূর্ণই স্থগিত রেখে ব্যক্তিগত আইন অমান্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । ব্যক্তিগত আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ও সরকারি নিপীড়ন বৃদ্ধি পায় । গান্ধীজিকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।  জেলে থাকা অবস্থায় গান্ধীজী অস্পৃশ্যা দূর করার আন্দোলন করতে আগ্রহী হলে সরকার তাকে বাধা দেয় । গান্ধীজী এই জন্য অনশন শুরু করেন এবং তার অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় । এরপর তিনি হরিজনের উন্নয়নের কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন । 

১৯৩৩ সালের শুরু থেকে আইন অমান্য আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে পড়ে । ১৯৩৪ সালের মে মাসেই সারা ভারত কংগ্রেস কমিটি বিনাশর্তে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় । কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । 

মূল্যায়ন : 

আইন অমান্য আন্দোলন ব্যর্থ হয় । এ ব্যর্থতার জন্য কংগ্রেসের নবীন সদস্যবৃন্দ প্রধানত গান্ধীজিকে অভিযুক্ত করেন । জহরলাল নেহেরু গান্ধীজী সম্পর্কে মন্তব্য করেন , “ আজ থেকে গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হলো ।” সুভাষ বসু গান্ধীজী সম্পর্কে বলেন  ‘ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গান্ধীজীর সম্পূর্ণ ব্যর্থ ।” অনেক ঐতিহাসিক ও গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহারকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন । তাদের মতে , গান্ধীজি ও কংগ্রেস জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন । ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মত প্রকাশ করেন এভাবে যে , “ সৈন্যরা অস্ত্র সমপর্ণ না করলেও সেনাপতিরা অস্ত্র সমপর্ন করেছেন ।” 

তবে গান্ধীজীর যতই সমালোচনা করা হোক না কেন আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহারের পেছনে গান্ধীজীর বিশেষ কয়েকটি কারণ ছিল : 

প্রথমত , আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার কঠোর দমননীতির প্রয়োগ করে আন্দোলন স্তব্ধ করার নীতি গ্রহণ করেন । সরকারি দমননীতির ফলে লক্ষাধিক ভারতবাসী কারাবরণ করেন।  তাদের ধন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় । এ আন্দোলনে লক্ষাধিক সত্যাগ্রহী নিহত হন । এতে গান্ধীজী অত্যন্ত মর্মাহত হন।  

দ্বিতীয়ত, এ সময় কংগ্রেসের মধ্যে অন্ত দ্বন্দ্ব চলছিল । এ অবস্থায় ঘৃণ্য দলাদলিতে যোগ না দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারকে গান্ধীজী সমীচীন মনে করেন ।

তৃতীয়ত , সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা প্রস্তাবে হরিজনদের স্বতন্ত্র ভোটাধিকার দেওয়া হয় । হিন্দু সমাজের ঐক্য ধ্বংসকারী এ প্রস্তাবে গান্ধীজি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন । ফলে তিনি স্বরাজ অর্জন অপেক্ষা হরিজন আন্দোলনকে অধিক গুরুত্ব দেন । 

মোটকথা গান্ধীজী বুঝতে পেরেছিলেন যে , আইন অমান্য আন্দোলন ও অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন সফল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই । 

তবে আইন অমান্য আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ আন্দোলনের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না । এ আন্দোলনের ফলে স্বরাজ লাভের আশায় হাজার হাজার ভারতবাসী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচন্ড সরকারি নির্যাতনের মুখে তারা আন্দোলন চালাতে থাকে । গান্ধীজী কর্তিক হঠাৎ করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ফলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে ঠিক এই , কিন্তু আন্দোলন শেষ হয়নি’ । পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয় । আইন অমান্য আন্দোলনের গৌরবজ্জ্বল অবদান সম্পর্কে রজনীপাম দত্ত যথার্থই লিখেছেন  “ ১৯৩০-৩৪ এর বিরাট আন্দোলনের এমন শোচনীয় পরিণতি ঘটায় জন্য আমরা যেন এক মুহূর্তের জন্য এর ঐতিহাসিক কীর্তি , গভীর শিক্ষা ও অপরিসীম স্থায়ী ফলাফলের কথা বিস্মিত না হই । যে আন্দোলনের পেছনে ছিল জনগণের অপরিসীম সমর্থন, উদ্দীপনা ও দুঃখবরণ , যে আন্দোলন সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, তার এই বেদনাদায়ক ব্যর্থতার কারণগুলো ভাববার, বোঝবার বিষয়, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বারবার পর্যালোচনা করার বিষয় ……….। যাহোক , জাতীয় আন্দোলনের ঐ ক’বছরের ইতিহাস গর্বের বস্তু । ঐ ক’বছরের নির্যাতনের সর্বপ্রকার আধুনিক অস্ত্র প্রয়োগ করে সাম্রাজ্যবাদ ভারতের জনগণকে বর্তমান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চূর্ণ করার স্বপ্ন দেখেছিল , সে স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছিল।  এত আঘাত সত্বেও দু’বছরের মধ্যেই জাতীয় আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় আবার সামনের দিকে যেতে থাকে । সংগ্রাম ব্যর্থ হয়নি । ঐ ক’বছরের অগ্নি সংস্কার এর মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে এক নতুন ও বৃহত্তম জাতীয় ঐক্য । আত্মবিশ্বাস , গর্ব ও দৃঢ় সংকল্প ….. । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × = 15