জিন্নার ১৪ দফা

১৯২৮ সালের ১০ আগস্ট নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় । এ রিপোর্ট বিচার-বিবেচনা করার জন্য ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় এক সর্বদলীয় অধিবেশন আহ্বান করা হয় । এই অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের পক্ষে নেহেরু রিপোর্টের মৌলিক সংশোধনী হিসাবে কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করেন । সংশোধনীগুলো হল : – 

১) কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১/৩ আসন মুসলিম সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে । 

২) বাংলা ও পাঞ্জাবের আইনসভায় মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ চালু করতে হবে । 

৩) ভারতীয় সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রীয় হবে । 

৪) সিন্দুকে বোম্বাই প্রদেশ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত করতে হবে । 

সর্বদলীয় সম্মেলনে নানা কারণে জিন্নাহর সংশোধনী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয় । ফলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি ভারতে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি ১৯২৯ সালে নেহেরু রিপোর্টের প্রতিবাদস্বরূপ মুসলমানদের দাবি-দাওয়া সংবলিত একটি প্রস্তাব বৃটিশ সরকারের কাছে পেশ করেন । উক্ত প্রস্তাবে ১৪ টি দফা ছিল বিধায় একে জিন্নাহর চৌদ্দ দফা বলা হয় । দফাগুলো ছিল নিম্নরূপ : 

১) ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রীয় হবে এবং রেসিডুয়ারী বা অবশিষ্ট ক্ষমতা প্রদেশ সমূহের উপর ন্যাস্ত  করতে হবে । 

২) ভারতের প্রদেশসমূহ একই রূপ স্বায়ত্তশাসন  ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে । 

৩) সকল আইনসভা এবং স্থানীয় পরিষদসমূহ সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে । কোন প্রদেশকেই  তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হতে সংখ্যালঘু কিংবা সমসংখ্যক কমিয়ে আনার চেষ্টা করা যাবে না । 

৪) কেন্দ্রীয় আইন সভায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এক-তৃতীয়াংশের কম হবে না । 

৫) পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হবে । তবে কোন সম্প্রদায় ইচ্ছা করলে পৃথক নির্বাচন বাদ দিয়ে যুক্ত নির্বাচন গ্রহণ করতে পারবে । 

৬) কোন রাষ্ট্রীয় ভাগ-বাটোয়ারা বাংলা , পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষুন্ন করতে পারবে না । 

৭) সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের মৌলিক অধিকারসমূহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে । 

৮) কোন আইনসভা বা  নির্বাচনমূলক প্রতিষ্ঠানে কোন বিল বা প্রস্তাব গৃহীত হবে না যদি উক্ত আইনসভা বা প্রতিষ্ঠান কোন সম্প্রদায় ভুক্ত সদস্য গনের তিন-চতুর্থাংশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে । 

৯) বোম্বে প্রেসিডেন্সি হতে সিন্দুকে পৃথক করতে হবে । 

১০) অন্যান্য দেশের ন্যায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে সাংবিধানিক সংস্কার প্রবর্তন করতে হবে । 

১১) সরকারি চাকরি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশসমূহ অন্যান্য ভারতীয়দের ন্যায় মুসলমানদের ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে । 

১২) মুসলমানদের শিক্ষা , সংস্কৃতি , ভাষা , আইন ইত্যাদি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য “ সাংবিধানিক গ্যারান্টি  “ প্রদান করতে হবে । 

১৩) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ মন্ত্রী মুসলমানদের মধ্যে গ্রহণ করতে হবে । 

১৪) ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত রাজ্য গুলোর সম্মতি ব্যতিরেকে কেন্দ্রীয় আইনসভা সংবিধানে কোন পরিবর্তন সাধন করতে পারবেনা । 

জিন্নাহ প্রনীত ১৪ দফা দাবি ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা । যদিও এ দফাগুলোর মাধ্যমে ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল তথাপি ১৯৩২ সালের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে এই চোদ্দদফা হুকুম মেনে নেওয়া হয়েছিল।  

জামাল উদ্দিন আহমদের মতে , “ জিন্নাহর চোদ্দ দফা গুলো খুটিয়ে  বিবেচনা করলে দেখা যায় যে , কোন-না কোন-প্রকারে ওগুলোতে পরবর্তীকালে পাকিস্তান সৃষ্টির বীজ অন্তর্গত ছিল । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

× 2 = 12