সাইমন কমিশন ১৯২৭

১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে একটি বিধান ছিল যে , এ আইন বলবৎ হওয়ার দশ বছর পর ভারতের শাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করার জন্য একটি বিধিবদ্ধ কমিশন গঠিত হবে । সে অনুযায়ী কমিশন গঠিত হওয়ার কথা ১৯২৯ সালে । কিন্তু ভারতের বড়লাট লর্ড  আরউইন নির্দিষ্ট সময়ের দু বছর আগেই একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন । এ কমিশন গঠনের স্বপক্ষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, ভারতীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সংবিধানের আগু সংস্কারের প্রয়োজন । কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের আগাম কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল । ভারতীয়দের মতে, বৃটেনের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা ছিল না । নির্বাচনের শ্রমিক দল জয়লাভ করলে ভারতে ব্রিটিশদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে এই আশঙ্কায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ব্রিটিশ সরকার একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেন । ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ উদারনৈতিক দলের সদস্য স্যার জন  সাইমনের নেতৃত্বে লর্ডসভায় ২ জন এবং কমন্সসভায় ৪ জন মোট ৭ জন সদস্য নিয়ে একটি কমিশন গঠন করেন । ভারতের পূর্বের সংবিধানের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা , প্রদেশের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্বাচন করাই ছিল কমিশনের উপর অর্পিত দায়িত্ব । তাছাড়া ভারতে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরো অধিকতর অগ্রগতি সাধন এর প্রয়োজন আছে কিনা তা নিরূপণ করা ও কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল । 

সাইমন কমিশন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৭ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় । এতে কোন ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি । স্বাভাবিক কারণেই ভারতীয়রা এ কমিশন গঠনের শুনজরে  দেখেননি । ভারতের সব রাজনৈতিক দলই এ কমিশন গঠনের নিন্দা জানাই । বড়লাট লর্ড  আরউইন ভারতীয়দের শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলেন যে , কোন ভারতীয় কমিশনের না থাকায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করা সম্ভব হবে । বড়লাটের এই মন্তব্য ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে । ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় সব দলই কমিশন বর্জন করে । ১৯২৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশনের সদস্যবৃন্দ ভারতে পৌঁছলে ভারতের বিভিন্ন শহরে হরতাল পালিত হয় । তাদেরকে কালোপতাকা দেখানো হয় । কংগ্রেস সাইমন কমিশন বিরোধী বয়কটকে সরকার বিরোধী গণ আন্দোলনে পরিণত করে । বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে কংগ্রেসের নেতা জহরলাল নেহেরু এবং গোবিন্দ পল্লব পন্থ পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন । লাহোরে সাইমন বিরোধী মিছিল পরিচালনার সময় পুলিশের লাঠির আঘাতের লালা লাজপৎ রায়ের মৃত্যু হয় । ১৯২৮ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় আইনসভা সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস করে । এভাবে কমিশন বিরোধী আন্দোলন ক্রমে ক্রমে আইন অমান্য আন্দোলনে পরিণত হয় । 

কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ও বয়কট করলেও এক্ষেত্রে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতাদের একটি অংশ কমিশনের বিরোধিতা করলেও স্যার শফির নেতৃত্বে মুসলিম লীগের অপর অংশ কমিশনের সাথে সহযোগিতা করার মনস্থির করেন । 

সাইমন কমিশনের রিপোর্ট : 

১৯৩০ সালের মে মাসে দুখণ্ড সাইমন কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । এ রিপোর্ট ছিল ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার এক আকর্ষণীয় এবং ব্যাপক পর্যালোচনার দলিল । P.E.Roberts যথার্থই বলেছেন, “ The report will stand out as one of the greatest of Indian states papers.”  এই রিপোর্টের প্রথম খন্ডে ভারতীয় সমস্যাগুলোকে বিষয় এবং পক্ষপাতহীনভাবে আলোচনা করা হয়েছে । রিপোর্টের দ্বিতীয় খন্ড ছিল কমিশনের সুপারিশ এবং সুপারিশনের কারণ সম্পর্কিত বিবৃতি । 

কমিশনের সুপারিশ সমূহ : 

১৯৩০ সালে সাইমন কমিশন যেসব সংস্কারের সুপারিশ করেন তা নিম্নে আলোচনা করা হল : 

১) প্রদেশগুলোতে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটাতে হবে । প্রদেশের সমগ্র প্রশাসন ক্ষেত্রকে মন্ত্রিসভার অধীনে ন্যস্ত করতে হবে এবং মন্ত্রিসভা আইনসভার কাছে দায়ী থাকবেন । প্রতিটি প্রদেশ হবে স্ব স্ব  এলাকায় আপন ভাগ্যের নেয়ামক  ।  প্রদেশগুলোতে সংরক্ষিত বিষয়সমূহ বাতিল করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যতদূর সম্ভব কমাতে হবে । গভর্নর আইন পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মধ্যে হতে প্রদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করবেন । আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক বিষয়ে প্রদেশিক মন্ত্রীগণ কেন্দ্রীয় সরকার এবং গভর্নরের হস্তক্ষেপ হতে মুক্ত থাকবেন । তবে প্রদেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিলে এবং সংখ্যালঘু শ্রেণীর স্বার্থ বিপন্ন হলে সে ক্ষেত্রে গভর্নর এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা থাকবে । তাছাড়া কোনো কারণে প্রদেশের শাসন ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে সে ক্ষেত্রে গভর্নর হস্তক্ষেপ করতে পারবেন । 

২) প্রদেশে ভোটাধিকারের সাম্প্রতিক এবং আইন সভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে । আইন পরিষদে কোন সরকারি “ সদস্য গোষ্ঠী” কাটবে না এবং পরিষদগুলো কে সম্পূর্ণরূপে নির্বাচিত সংস্থায় পরিণত করতে হবে। প্রদেশগুলোতে আর্থিক সম্পদ বৃদ্ধি করতে হবে। 

৩) কমিশন এই মর্মে সুপারিশ করেন যে, সিন্ধু এবং উড়িষ্যা কে স্বতন্ত্র প্রদেশে পরিণত করার বিষয়টি আরও পরীক্ষা করে দেখা দরকার। বার্মাকে অবিলম্বে ভারত থেকে পৃথক করতে হবে । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জন্য একটি আইন পরিষদ গঠন করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের প্রতিনিধি লাভের অধিকার দিতে হবে । 

৪) কেন্দ্রীয় শাসন বিভাগের ক্ষেত্রে কমিশন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তনের সুপারিশ করেননি । বলা হয় , স্ব- পরিষদ গভর্নর-জেনারেল কেন্দ্রীয় শাসন বিভাগ হিসেবে বহাল থাকবেন । কেন্দ্রীয় সরকার আইন পরিষদের কাছে দায়ী থাকবেনা । গভর্নর জেনারেলের হাতে শাসন পরিষদের সদস্যদের বাছাই ও নিয়োগ দানের ক্ষমতা থাকবে । কেন্দ্রে দ্বৈত শাসনের ধারণাকে প্রত্যাহার করা হয় । 

৫) কেন্দ্রীয় আইনসভা যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে । কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নিম্নকক্ষ ফেডারেল এসেম্বলি  নামে পরিচিত হবে । নিম্নকক্ষের সদস্যরা ভারতীয় জনগণ কর্তৃক সরাসরি নির্বাচিত না হয়ে বরং প্রদেশিক আইনসভা গুলোর দ্বারা নির্বাচিত হবেন । কেন্দ্রীয় পরিষদের দ্বিতীয় কক্ষ অর্থাৎ কাউন্সিল অফ স্টেট  এর সদস্যবৃন্দ প্রাদেশিক আইনসভা গুলোর দ্বারা নির্বাচিত বা মনোনীত হবেন । কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে প্রদেশগুলোর জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ করা হবে । প্রত্যেক প্রদেশ হতে কাউন্সিল অব স্টেটে থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি থাকবেন । 

৬) কমিশনের মতে ভারতের চূড়ান্ত সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রকৃতির হতে হবে , কারণ এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ভারতের জন্য কাম্য নয় । সামগ্রিকভাবে ভারতের নিরাপত্তা উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বার্থেই প্রদেশসমূহ ও দেশীয় রাজ্য গুলোকে নিয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন অপরিহার্য । 

৭) মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টের নয় সাইমন কমিশনের রিপোর্ট ও মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে মত প্রকাশ করা হয় । কমিশনের মতে , যেসব পরদেশী মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ সেসব দেশে তাদের জন্য প্রচলিত ওয়েটেজ ব্যবস্থা বা গুরুত্ব দান চালু রাখতে হবে । তবে কমিশন পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলমানদের সংরক্ষিত আসন রাখার মুসলিম দাবি প্রত্যাখ্যান করেন । কেন্দ্রীয় আইন সভায় মুসলমানদের অন্তত এক তৃতীয়াংশ নির্বাচিত আসুন থাকতে হবে মুসলমানদের এই দাবিও কমিশন নাচক  করে দেন । কমিশনের মতে , কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার অনুপাত এর ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে । সাইমন কমিশন তাদের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে , অমর প্রশ্নগুলোতে যতক্ষণ পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলমান না একটা মৌলিক চুক্তিতে উপনীত না হবে , ততক্ষণ ভারতে বৃটেনের মত দায়িত্বশীল সরকার কার্যকর হবে না । 

৮) সেনাবাহিনীকে ভারতীয়করণ করার প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করা হয় । কিন্তু প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারত যতক্ষণ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হয় ততক্ষণ ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী রাখার সুপারিশ করা হয় । 

৯) এ কমিশনের সময় ভিত্তিক পার্লামেন্টারি অনুসন্ধান পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করে এবং সুপারিশ করে যে , নতুন শাসন নীতি এমনভাবে রচনা করতে হবে যাতে সময় মত এর পরিবর্তন , পরিবর্ধন করা যায় । 

রিপোর্টের  মূল্যায়ন : 

এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে , সাইমন কমিশনের রিপোর্ট ভারতের বিভিন্ন মহল হতে কঠোরভাবে নিন্দিত  হয় ।  Sir Sivaswamy Aiyer  এ রিপোর্ট সম্পর্কে মন্তব্য করেন , “ The Report Should be placed in a scrap heap. “ কিন্তু নিরপেক্ষ বিচারের রিপোর্ট সম্পর্কে বলা যায় যে , এর সুপারিশ সমূহ  ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অপেক্ষা খারাপ ছিল না । এটা ঠিক যে , সাইমন কমিশন ভারতে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে ডোমিনিয়ন স্টাটাস দেওয়ার বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি । কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন এবং সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের সংরক্ষণের প্রস্তাব ভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি । তথাপি , ভারতকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে কমিশনের বিরোধিতা , ভারতে ক্রমান্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত এবং প্রদেশের পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের প্রদানের বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছিল তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না । অনেকে মনে করেন , সাইমন কমিশনের সুপারিশ সমূহ কে যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হতো তাহলে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন  যেটি ১৯৩৭ সালে কার্যকরী হয়েছিল , তা অনেক আগেই অর্জন করা যেত । এ প্রসঙ্গে Prof. Keith  যথার্থই বলেছেন ,” It was probably foolish of Indian opinion to repudiate the report out and out. If it had been accepted, the British Govt. could hardly have failed to work on it and responsible government in the provinces would have been achieved much earlier than it could be under any latter scheme…… 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 2 = 2